Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

arijit bhattacharya

Action Thriller


4.4  

arijit bhattacharya

Action Thriller


এখানে মৃত্যুর হাওয়া

এখানে মৃত্যুর হাওয়া

25 mins 2K 25 mins 2K

ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে রাস্তা দুভাগ হয়ে গেছে।একটা চলে গেছে বামদিকে ,আরেকটা চলে গেছে ডানদিকে,কিছুদূর যাওয়ার পর আবার টার্ন নিয়েছে। মোড়ের সামনে গাড়ি থামাল অমিত। ডানদিকের শাখাটার ওপর তীরচিহ্ন দিয়ে লেখা রয়েছে বুন্দেলী-30 কিলোমিটার। যদিও বোর্ড টা অনেক পুরনো,ধূলিধূসরিত,ভেঙে পড়েছে প্রায় বলতে গেলে। সুনীপ বলে উঠল,"কি রে পাগলা,সামনে তো গ্রাম রয়েছে দেখছি,সুরজ সিং তো খুব জোর বলছিল যে,"ইয়ে জঙ্গল বহৎ খতরনাক হ্যায়। আস পাস কোয়ি গাঁও নেহী হ্যায়। ইঁহাপে সির্ফ ছলাবা হ্যায়,ছলাবা। ইঁহা পে যো রেহতা হ্যায় ও না তো ইনসান হ্যায়,অউর না পিরেত।" হু,যত্তসব স্ক্রাউন্ডেল। আর তোরা ওর কথাতেই ভয় পাচ্ছিলিস।যদি ভয় ই পেতিস,তাহলে এলি কেন আমার সাথে এই ছেদিসগড়ের ঘন জঙ্গলে।" সুজয় বলে উঠল,"আমি তো আগেই বুঝতে পেরেছিলাম এগুলো সুরজ সিং এর না বেরনোর বাহানা। ও আমাদের কে নিয়ে জঙ্গল ঘোরাতে যাবে না আজ,সেজন্যই ওর এই ভয় দেখানো ,এই অপদেবতার কথা বলা।বুঝলে ভায়া!"দাঁতে দাঁত চেপে সুনীপ বলল,"হতচ্ছাড়াটা জানে না ওর থেকে আমরা ছত্তিশগড়ের ব্যাপারে অনেক বেশি জানি। আরে পাগলা ওকে জিজ্ঞাসা করতো, ছত্তিশগড়কে কেন ছেদিসগড় বলি আমি! জাস্ট ওর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে।আমরা এমনি এমনিই এরকম বোহেমিয়ান হই নি।"

এইসময় রূপালী বলে উঠল,"সে তো হল সুনীপদা।হতভাগা সুরজের কথা এখন রাখ। আমরা এখন কোনদিকে যাব,ডান দিকে না বাম দিকে!"

সুনীপ বলে উঠল-"অবশ্যই ডান দিকে। দেখেছিস তো এই রাস্তা বুন্দেলীর দিকে যাচ্ছে। নিশ্চয়ই বুন্দেলী কোনো গ্রামের নাম হবে। শাল সেগুনের অরণ্যে অধ্যুষিত এই গ্রামগুলি উপজাতিদের আবাসস্থল,যাদের আমরা 'ট্রাইবস' বলি। বুঝলি তো এবার! আরেকটা ব্যাপার জেনে রাখ,ছত্তিশগড়ের এই গোণ্ড উপজাতি সারা ভারতের বৃহত্তম উপজাতি। জানিস ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক,ডিসকভারি চ্যানেলে কতো প্রোগ্রাম হয় এইসব উপজাতিদের নিয়ে!"একটু থেমে সুনীপ বলতে শুরু করল,"আমার গোণ্ড উপজাতির সংস্কৃতি নিয়ে খুব ইন্টারেস্ট আছে। বলা তো যায় না, যদি লাক বাই চান্স গোণ্ডের সাক্ষাৎ পাই , আর সংস্কৃতি আমরা আমাদের ফেসবুকের পেজে বা ইউটিউবের চ্যানেলে শেয়ার করি,তাহলে আমরা কতো ফেমাস হয়ে যাব! লোকে আমাদের চিনবে,আমাদের জানবে।আমাদের নামে সবাই ধন্য,ধন্য করবে।"এতক্ষণে অরুণিমা চুপচাপ বসে ছিল। এখন সেও বলে উঠল,"আমারও মন বলছে আমাদের ডানদিকের রাস্তাটা ধরা উচিত। সেটা সুনীপদার ফেমাস গোণ্ড ট্রাইবের জন্য নয়,সেটা যথেষ্ট প্র্যাকটিকাল। এমনিই এখন সূর্য মধ্যগগনে। আমাদের সাথে যা খাবার দাবার আর তিন বোতল জল যেটা চম্পা থেকে আনছি, জাস্ট ফুরিয়ে আসছে। আমরা এখন জঙ্গলের অনেকটা ভেতরে চলে এসেছি। প্লাস,এই মরা জঙ্গলে কাছাকাছি কোনো নদী আছে বলে মনে হয় না। তাই গ্রামে গেলে আমরা জল আর খাবার দাবার তো পাবই, শেলটার পাওয়াটাও বিচিত্র নয়।শুনেছি এই সরল গ্রামবাসীরা খুব অতিথিপরায়ণ হয়।"

এতক্ষণে জয়দীপ প্রতিবাদ করল,"সুনীপভাই,আমার মন কিন্তু কু-ডাক ডাকছে। দেখছিস তো দুটো রাস্তার লে আউট,বামদিকের রাস্তাটা কতো পরিষ্কার ,কতো সুন্দর। মনে হয় টুরিস্টরা এখান দিয়ে যাতায়াত করে। আর ডানদিকের রাস্তাটা দেখ,একদম ভাঙাচোরা। ঝোপ জঙ্গলে ভর্তি।দুপাশে গহন শাল অরণ্য। সুরজ আগেই বলেছিল,এখানে অনেক কিছু আছে!অত্যন্ত ক্ষতিকর।অতি অশুভ। আমার তো এখনি গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।"

সুনীপ রুদ্রমূর্তি ধারণ করল।"দেখ আমি সুরজ নই, আমি গাড়ি ডানদিকেই চালাব। আমরা ডানদিকেই যাব, তোর যদি অসুবিধা হয় -এখানেই নেমে যা । আমাদের সাথে যেতে হলে বেশি ভাট বকবি না। আর তোর ওপর আমার আগে থেকেই রাগ আছে। আগের মিশনে তোল ক্যাবলামির জন্যই আমরা হিমালয়ান ভল্লুকের দেখা মিস করে গেলাম। সো ডোন্ট মেক মি অ্যাংরি ফার্দারমোর ,অ্যান্ড স্টে সাইলেন্ট।তাহলে গাইস, আমরা ডানদিকের রাস্তাই ধরব।"

সুনীপকে বোঝাতে ব্যর্থ হয়ে নিরস্ত হল জয়দীপ। সে বরাবরই ঈশ্বরে বিশ্বাসী।এদিকে বাক বিতণ্ডার মধ্যে কেউ খেয়াল করল না, ডানদিকের রাস্তার পাশে আরেকটি বোর্ড ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে। এটি একটি সাবধানবাণী-"Don't take this route. This will lead you to your death."


সুনীপ গাড়িতে স্টার্ট দিতে যেতেই এক গুরুগম্ভীর গলায় আওয়াজ হল,"বাচ্চেলোগ,ইতনি ঘনে জঙ্গল মে তুম সব কিধার যা রহে হো!"সুনীপ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল , তাদের জীপের পাশেই এক ভদ্রলোক। কাঁধ অবধি লম্বা চুল,আর পাশের দিকে আর জুলপিতে কিছুটা পাক ধরেছে,যা বলে দেয় ভদ্রলোক এখন যৌবন ছেড়ে প্রৌঢ়ত্বে প্রবেশ করেছেন। কটা কটা নীল চোখ বলে দেয় যে ,মায়ের দিক থেকেই হোক বা বাবার দিক থেকে এনার শরীরে সাহেবি রক্ত বইছে। কোমরে দামী বেল্ট,পরণে কালো লেদারের জ্যাকেট আর ঋজু চেহারা আর হাতে দেশী গাদা বন্দুক আর বলিষ্ট হাত বলে দেয় যে, যৌবন বিদায় নিতে এলেও ইনি এখনও যৌবনকে বিদায় জানাতে প্রস্তুত নন। চওড়া কপালে ভাঁজের রেখা বলে দেয় যে, তিনি যথেষ্ট জ্ঞানী আর অভিজ্ঞ। মস্তিষ্কই তো চিন্তনশীলতার আধার,জ্ঞানের মন্দির।ভদ্রলোককে এক নজরে দেখলেই রীতিমতো সম্ভ্রম জাগে।

জয়দীপ বলল-"আপনি?"

ভারী অথচ দৃঢ় গলায় ভদ্রলোক উত্তর দিলেন-"আমার নাম দুর্জন সিং। বুঝলেন এককালে নামী শিকারী ছিলাম। ভূভারতের পাহাড় জঙ্গল সব দাপিয়ে বেরিয়েছি।এখন বয়স হয়েছে। কিন্তু শিকার থেকে অবসর নিইনি।"

কিছুক্ষণ থেমে বললেন-"তোমরা কোথা থেকে আসছ?তোমাদের বেশ সাহসী মনে হচ্ছে। আমি বুন্দেলি যাচ্ছি,অ্যানিওয়ে। তোমরাও তো ঐ দিকে যাচ্ছ শুনলাম,লিফ্ট দেবে।"সুনীপরা এমনিই অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়,একজন নামী শিকারীর সান্নিধ্য এত সহজে পাওয়া যাবে এটা ছিল তাদের কল্পনারই অতীত। এখন সুনীপ,সুজয়, জয়দীপ,রূপালী আর অরুণিমা যারা ঘনিষ্ট মহলে পঞ্চপাণ্ডব নামেই পরিচিত,হাতে চাঁদ পেল। এটা তাদের কতোদিনের স্বপ্ন!

জিপে এসে বসল দুর্জন সিং। পাথুরে পথে ধূলো উড়িয়ে স্টার্ট নিল গাড়ি। জয়দীপ ঠিকই বলেছিল,ডানদিকের রাস্তাটা সত্যিই খারাপ,জায়গায় জায়গায় ভাঙাচোরা এবড়োখেবড়ো।

সুনীপ চালাতে চালাতে জিজ্ঞাসা করল-"আচ্ছা স্যার, এখানে গ্রামগুলিতে তো উপজাতিরাই বাস করে। বুন্দেলিতে গেলে কি গোণ্ডদের দেখতে পাব!"

অনেক আশা নিয়ে প্রশ্ন করেছিল সুনীপ। উত্তর যা পেল তাতে হতাশই হল।মাথা নেড়ে দুর্জন সিং বললেন,"জানি না,কিন্তু জায়গাটা ভালো না। ওখানে আজ রাত না কাটানোই ভালো আমার মতে । তোমরা দিনের আলো থাকতে থাকতে ফিরে এসো। আর বাচ্ছা ছেলেপিলে তো! কোনো কথা বা কারোর প্রলোভনে বেশি নেচ না।" অরুণিমা বলল-"আপনি আমাদের সাথে থাকবেন তো?" মৃদু হেঁসে মাথা নেড়ে দুর্জন সিং বললেন-"বুঝলে আমি যাচ্ছি অন্য কাজে। আমি যাচ্ছি শিকার করতে। এই শিকার আমার কাছে খুব খুব স্পেশাল।"সুনীপদের গ্রুপের নাম পঞ্চপাণ্ডব, অফিসিয়াল নাম না হলেও বন্ধুবান্ধবরা অন্তত এই নামেই এদের একসঙ্গে ডাকে। বলা যেতে পারে, ভারতের বিভিন্ন অচেনা অজানা স্থানে ঘুরে বেড়ানো এবং ঘুরতে গিয়ে সেই জায়গাটাকে এক্সপ্লোর করা ,সেখানকার সংস্কৃতি আর লোকদের সম্পর্কে জানা এদের নেশা। এগুলো তারা সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটেও শেয়ার করে আর তাতে লাইকের বন্যা ছোটে।

পাঁচজনেই ভালো পরিবারের ছেলে। এই নয় যে তারা পড়াশুনায় অবহেলা করে। ভারতের বিভিন্ন অজানা অচেনা স্থানে ঘুরে বেড়ানো,যে জায়গাগুলো বেড়াবার দিক থেকে খুব একটা জনপ্রিয় নয়,সেই সব জায়গায় ঘুরতে যাওয়া আর সেখানকার ভূপ্রকৃতি আর লোকসংস্কৃতিকে এক্সপ্লোর করা ওদের কাছে একটা প্যাশন।আগের বার পুজোর ছুটিতে গিয়েছিল কুমায়ুন হিমালয়ের নন্দাদেবী পাহাড়ে আর এবার যাচ্ছে ছত্তিশগড়ের গহন শাল সেগুন অরণ্য আর সেখানকার উপজাতিদের লোকসংস্কৃতি পর্যবেক্ষণ করার জন্য।বহু প্রাচীন জায়গা এই ছত্তিশগড়।ছত্তিশগড়ের পাথুরে পটভূমিতে শাল সেগুনের গহন অরণ্যের বুকে অবস্থিত সুপ্রাচীন গণ্ডোয়ানাল্যান্ডের অংশ। পুরাতাত্ত্বিকদের মতে,মধ্যপ্রদেশের উত্তরাংশে যখন কলাচুরি বংশের শাসন ছিল,তখন এখানে রাজত্ব করতেন চেদি বা ছেদি বংশের রাজারা। আর তাদের নাম থেকেই এই জায়গাটার নাম হয় ছেদিসগড়,যেটা লোকমুখে বিকৃত হয়ে পরিণত হয় ছত্তিশগড় নামে। আবার কেউ কেউ বলেন,চেদি বংশের রাজাদের ছত্রিশ টা দুর্গ বা গড় ছিল,যার থেকে জায়গাটার নাম ছত্তিশগড়। এদের মধ্যে রায়গড়,বিশালগড় এখনো আছে,কিছু কিছু দুর্গ পুরোপুরি ধ্বংসপ্রাপ্ত বা ধ্বংসস্তূপে পরিণত। আবার কিছু কিছু দুর্গ আছে গহন শাল সেগুনের অরণ্যের মধ্যে,সভ্যসমাজ দ্বারা এখনোও অনাবিষ্কৃত।

যাই হোক,ছত্তিশগড় মানেই হিল ময়না আর ভারতীয় বুনো ষাঁড়,ছত্তিশগড় মানেই শাল সেগুনের গহন অরণ্য,ছত্তিশগড় মানেই বায়লাডিলার পাহাড়শ্রেণী।সুনীপরা সাতসকালে হাওড়া থেকে হাওড়া মুম্বাই দুরন্ত এক্সপ্রেস ধরে বিলাসপুর নেমেছে সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটায়। সেখানে হোটেল এমারেল্ডে এক রাত কাটিয়ে পরের দিন সকালে বাসে করে সেখান থেকে তিনশো কিলোমিটার দূরে কোরবা।সেখানে মহারাজা হোটেলে ঘর বুকিং করেছে। সেখানেই পরিচয় জিপের ড্রাইভার সুরজ সিং এর সাথে। সুরজ সিং এর জিপে চড়ে এরা সারা কোরবা ঘুরেছে।

এরপরই কোনো একটা সোর্সের মাধ্যমে সুনীপ জানতে পারে,এই কোরবা তেহসিলের ঘন শাল অরণ্যের কোলে চেদি বংশের রাজাদের একটি গড় আছে,যেটির সম্পর্কে সভ্য সমাজ বিন্দুবিসর্গও জানে না। আবিষ্কারের নেশা পেয়ে বসে সুনীপকে ।অজানাকে জানার,অদেখাকে দেখার অদম্য এক তীব্র কৌতুহল। এই কৌতুহলের হাতছানি উপেক্ষা করা বড়োই কঠিন।

সুনীপ ঠিক করে সে জঙ্গলের গভীরে যাবে গড়টিকে খুঁজতে। পঞ্চপাণ্ডবের সবাই এক কথায় সায় দেয়। কথাটা সুরজকে বলতেই সে দোনামনা করতে থাকে। তার মতে অরণ্যের গভীরে এমন কিছু মানুষের মতো প্রাণীর বাস যারা না পুরোপুরি মানুষ ,না প্রেতাত্মা! তারা নরপিশাচ। সুনীপরা বেশ বুঝতে পারে যে ,সুরজ দায়িত্ব এড়াবার ছুতো খুঁজছে। কিন্তু,তারা ইয়ং ব্লাড,ভয় কি বস্তু,তারা জানে না। সুনীপরা সুরজ কে টাকা দিয়ে বলে জিপটা অন্তত এক সপ্তাহ তাদের ভাড়া দিতে। আর এতে সুরজ যেমন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ,তেমন সুনীপদেরও মনস্কাম সিদ্ধ হয়। শুরু হয় ছত্তিশগড়ের কোরবাতে পঞ্চপাণ্ডবের জঙ্গল সাফারি।


বুন্দেলী যাবার পথে কিছু পাহাড়ি হিল ময়না আর কিছু রংবেরঙের প্রজাপতি ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ল না সুনীপদের।উবড়ো খেবড়ো রাস্তা,কেন্দ্রীয় সরকার যতই প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনা নিয়ে মাতুক, এখানকার এই রাস্তাকে দেখে বিমাতার সন্তান অপেক্ষা আর ভিন্ন কিছু বলে মনেই হয় না। 

দুর্জন সিং বলছিলেন-"তিনি নেকড়ে শিকার করতে এসেছেন।" অবাক হয়ে গেল সুনীপ। নেকড়ের মতো এক তুচ্ছ প্রাণীকে শিকারের জন্য দুর্জন সিং এতোটা ফোকাসড! তিনি এতোটা সিরিয়াস। ভুরু কপালে উঠে গেল তার!কিন্তু,সুনীপের মনের কথা হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন দুর্জন সিং। তিনি বললেন,"জান আমি অ্যাংলো ইন্ডিয়ান। আমার মা ইংল্যান্ডের কাউন্ট পরিবারের মেয়ে,যারা বংশপরম্পরায় শিকারী। আমার বাবা ছিলেন এক দেশী রাজপুত। শিকার আমাদের মজ্জাগত।""নেকড়ে হল এই পৃথিবীর বিচক্ষণ প্রাণীদের মধ্যে অন্যতম। দেখলে কুকুরের মতো হলে কি হবে,এরা যে কতো হিংস্র আর নৃশংস হতে পারে,এই সম্পর্কে তোমাদের কোনো ধারণা নেই। নেকড়ে কখনো একা শিকার করে না,শিকার করে দল বেঁধে সাধারণত। আবার মাঝে মাঝে একাও করে। এদের শিকার ধরার এক বিশেষত্ব হল,এরা দুম করে শিকারকে আক্রমণ করে না। অনেকক্ষণ ধরে শিকারকে ফলো করার পর দুম করে লাফিয়ে পড়ে। আর তখন শিকারের কিছু করার থাকে না।সে জাস্ট অসহায়।"

রূপালী বলে উঠল-"হাউ ডেঞ্জারাস!"

হাসলেন দুর্জন সিং।

বেলা সাড়ে তিনটের সময় লাল ধুলো উড়িয়ে জিপ প্রবেশ করল বুন্দেলি গ্রামে। যেটা সুনীপকে নিরাশ করল সেটা এই গ্রামে গোণ্ড নয়,মূলতঃ বইগা আর মুরিয়াদের বাস। এরাও অতি প্রাচীন উপজাতি। না,সুরজ তো ডাহা মিথ্যেবাদী। কতো সরল এই উপজাতি লোকেরা,আর সুরজের মতে এরাই নরপিশাচ। না,মাথাটা গরম হয়ে গেল সুনীপের। কোরবায় মহারাজা হোটেলে পৌঁছে এর একটা জবাব সে সুরজকে দেবেই দেবে। তবে যে জিনিসটা সুনীপকে অবাক করল,সেটা হল এই অক্টোবরের পড়ন্ত বিকেলেও গ্রামে গিয়ে একটা গরম হলকা টের পাচ্ছে। অপরদের হাবভাব দেখে সুনীপ বুঝতে পারল,শুধু সুনীপের নয় ,বাকি সবাইদের এই একই অনুভূতি হচ্ছে।সুজয় তো বলেই উঠল,বাপরে বাপ যা গরম!

শুধু ছত্তিশগড়ের পাহাড় জঙ্গল নয়,সুজয় পড়েছে এই বইগাদের বাস মধ্যপ্রদেশ,উত্তরপ্রদেশ ,ঝাড়খণ্ড এমনকি এই বাংলায়। এই মানুষেরা গভীর অরণ্যে বাস করে,সভ্য সমাজের মেকি কৃত্রিমতা এদেরকে গ্রাস করে নি। পাহাড় জঙ্গলে ঝুমচাষের মাধ্যমে এরা খাদ্যশস্য উৎপাদন করে। সুনীপ আগে পড়েছে যে,এই উপজাতিদের মধ্যে উল্কি সংস্কৃতি বা Tattoo Culture বহুল প্রচলিত। কিন্তু,একটা ব্যাপার ওকে অবাক করল যে সব ছেলেমেয়েদের শরীরে এক রকম উল্কি। পূর্ণিমারাতে পূর্ণচন্দ্রের দিকে তাকিয়ে গর্জনরত নেকড়ে। 

সুনীপের মনে হল দুর্জন সিং আগেই বলেছিল যে,এই অঞ্চলটা নেকড়ের আতঙ্কে অধ্যুষিত। তাহলে কি সুন্দরবনে যেমন বনবিবিকে পূজা করা হয়,এরাও কি নেকড়েকে দেবতাজ্ঞানে পূজা করে!

গ্রামের লোকেরা তো এইসব শহুরে ছেলেমেয়ে দের দেখে খুব খুশি। তাদের মুখে হাসি আর ধরে না। শুরু হল আদর আপ্যায়ন। এলাহি ব্যাপার। পঞ্চপাণ্ডবকে খেতে দেওয়া হল কুয়োর ঠাণ্ডা জল আর কুটকি(একরকমের খাবার)।গ্রামের মোড়ল স্বয়ং এগিয়ে এলেন। ঠিক হল সুনীপরা তার বাড়িতেই থাকবে।

এইসময় এক আঠারো উনিশ বছরের মেয়েকে দেখতে পেল জয়দীপ,যে এক নজরে দিয়ে গেল তাকে এক ঝলক মুক্ত হাওয়া,এক নজরে কেড়ে নিল তার মন,না জানি কি জাদু ছিল সেই টানা টানা আঁখিতে!পশ্চিম দিগন্তের ধূসর পাহাড়ের আড়ালে অস্ত যাচ্ছে সূর্য আকাশে ভালোবাসার গোলাপী রঙ ছড়িয়ে। দুর্জন সিং সুনীপদের থেকে আলাদা হবার আগে বলে দিলেন,"সাবধানে থাকো ভায়ারা,বুঝেশুনে পা ফেলো। এটাই নেকড়ের ডেরা।"

দুর্জন সিং এর শেষ কথাটা ঠিক বুঝতে পারল না সুনীপ। তার নজর পুব আকাশের দিকে। যেখানে দূরে জঙ্গলের মাথায় দেখা যাচ্ছে প্রায় গোল চাঁদ। সুনীপ বুঝতে পারল,পূর্ণিমা আসতে আর বেশি দিন নেই।


অন্ধকার রাত। আকাশে গোল থালার মতো চাঁদ তার রূপোলী চন্দ্রকিরণে বিশ্বচরাচরকে উদ্ভাসিত করেছে। মোড়লের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে সুনীপরা। না,অতিথি আপ্যায়নে খামতি রাখে নি গ্রামের লোকেরা, খেতে দেওয়া হয়েছে চিরোটা ভাজি আর মাশরুম। বইগারা এই মাশরুম খেতে খুবই ভালোবাসে। তবে মোড়লের সাথে প্রথমবার দেখা হবার পর থেকে আর বেশি আলাপ হয় নি। টিম টিম করে পিদিম জ্বলছে,এদিকে ইলেকট্রিসিটি আসে নি এখনও।একটা ব্যাপার সুনীপকে খুব অবাক করছে,দুর্জন সিং বললেন যে,এই গ্রামেই নেকড়ের আস্তানা,যে নেকড়ে শিকার করতে তিনি এখানে এসেছেন।কিন্তু,গ্রামব­াসীরা তো বেশ হাসিখুশি প্রাণোচ্ছ্বল। তাদের মুখচোখে তো আতঙ্কের চিহ্নমাত্র নেই,মনে তো হল না তারা নেকড়ের আতঙ্কে ভীত।এই অঞ্চলের আদিবাসীরা অনেক গাছপালা,পাথর ও প্রাকৃতিক ঘটনাকে দেবতাজ্ঞানে পূজা করে। আজ শনিবার। হয়তো মোড়লও কোথাও পুজো দিতে গেছেন। কিন্তু,একটা ব্যাপার বোঝা যাচ্ছে না,এদের সবার শরীরে নেকড়ের উল্কি রয়েছে কেন! তাহলে কি এরা নেকড়েকেও দেবতাজ্ঞানে আরাধনা করে!আরেকটা কথা,দুর্জন বলেছিলেন এখানে হিংস্র নেকড়ে আছে। যদিও ছত্তিশগড়ের এই কোরবার জঙ্গলে হিংস্র নেকড়ের আক্রমণে সাধারণ নিরীহ কাঠুরেদের মৃত্যু বিচিত্র কিছু নয়। কিন্তু এখানে আসবার সময় নেকড়ে দেখা তো দূরের কথা ,ওরা একটা হাউলিং পর্যন্ত শুনল না!এদিকে জয়দীপের মনেও চলছে চিন্তার ঢেউ। কে ছিল সেই আদিবাসী অষ্টাদশী তরুণী,যাকে দেখা মাত্রই কামদেবের শর বিদ্ধ করেছিল তাকে।না,সে আর স্থির থাকতে পারছে না! শীতের সকালে সবুজ ঘাসের আগায় যেমন মুক্তোর ন্যায় শিশিরবিন্দু ক্ষণস্থায়ী,বেশিক্ষণ­ এর সৌন্দর্য দর্শন করা যায় না,তেমনও সেই প্রথম প্রেমের সন্দর্শনও কতো ক্ষণস্থায়ী! না,খুব ইচ্ছে করছে তার হৃদয়হারিণী প্রেমাস্পদাকে আর এক ঝলক দেখার জন্য। কোথায় সে থাকে,কি তার নাম সবই তার কাছে অজানা।পরক্ষণেই নিজের নির্বুদ্ধিতায় হেসে উঠল জয়দীপ। কোথায় আর যাবে,সে তো এই গ্রামেরই মেয়ে। তারা তো এখানে আরও কয়েকদিন থাকবে। আজ হোক বা কাল, দেখা হবেই তার প্রিয়তমার সাথে।মাথার ওপর পূর্ণচন্দ্র সাক্ষী।গ্রামের লোকেরা কত তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে। এখনও ঘড়ির কাঁটা আটটা পেরোয় নি,সারা গ্রাম নিঝুম। শুধু ঝিঁঝির ডাক কানে আসছে। কোথায় এই ছত্তিশগড়ের পাহাড়ঘেরা অখ্যাত গণ্ডগ্রাম বুন্দেলী,আর কোথায় হাজার মাইল দূরে তাদের তিলোত্তমা কোলকাতা,দীর্ঘশ্বাস ফেলল সুনীপ।এইসময় শোনা গেল হাড় হিম করা নেকড়ের ডাক,কেঁপে উঠল চারদিক। দুলে উঠল সুনীপের বুকের ভিতরটাও। খড় ছাওয়া বাড়ির বাইরে থেকেই চাপা গর্জনটা আসছে। হয়তো নেকড়েটা তাদের জানলার পাশে দাঁড়িয়ে গর্জন করছে চাপা গলায়। না,সুজয়টা আবার কোথায় গেল। ঘরের ভিতর তারা চারজন রয়েছে। অরুণিমা তো বলেই উঠল,এই সুজয়দা যে মাঝে মাঝেই কোথায় গুম হয়ে যায়,তখন ভগবান চাইলেও হয়তো খুঁজে পাবে না!নেকড়েটা একটানা চাপা গলায় গর্জন করেই যাচ্ছে। না আর থাকতে পারল না সুনীপ। শক্তিশালী টর্চ টা নিয়ে আর মেঝেতে পড়ে থাকা একটা লোহার ডাণ্ডা নিয়ে বেরিয়ে এল সে। আকারে মনে হয় না নেকড়েটা বেশি বড়ো,অন্তত হাউলিং শুনে তো তাই মনে হল।বুক ধুক পুক করছে তার। টিপটিপ পায়ে এগিয়ে গেল সুনীপ। আর জানলার কাছে গিয়ে যা আবিষ্কার করল তাতেই তার মাথার রক্ত গরম হয়ে উঠল। "হতভাগা তুই,তোকে আমি মেরেই ফেলব!"এই আওয়াজ আর কেউ নয় ,যিনি করছেন তিনি হলেন সুনীপ সাহার পরম বন্ধু শ্রীযুক্ত সুজয় দাস। হ্যাঁ,সুজয়ের একটা বিশেষ গুণ বা অ্যাসেট রয়েছে। যেকোনো জীবজন্তুর আওয়াজ হুবহু নকল করতে পারে।সেজন্য সুনীপরা সুজয়ের অপর নাম দিয়েছে 'হরবোলা'।"ইডিয়ট,পাগলামির আর জায়গা পাও নি। এখানেও শুরু করলে!"রেগে আগুন হয়ে বলল সুনীপ।


সুজয় হাসতে হাসতে বলল,"ভাই,জিপে আসবার সময় তো খুব হম্বিতম্বি করছিলি,হ্যান করেগা,ত্যান করেগা। আর ঐ দুর্জন না কার্জনের কথা শুনে তোর সমস্ত সাহস ডাউন হয়ে গেল। ঐ দুর্জন বলল এখানে নেকড়ের আস্তানা আর তাতেই তুই ভয়ে কুপোকাৎ। হা হা,সাহসের বলিহারি!"সুনীপ হাসতে হাসতে বলল,"অ্যাক্টিং তা তো ভালোই শিখেছিস। হমম। আর ঐ দুর্জন সিং। উনি শুধু একজন নামী শিকারী নন,একজন ক্রিপটোজুলজিস্টও বটে। ওনার লেখা একটা বই পড়েছি,"The Werewolf -Worshiper of The Saturn."বুঝলি?তো তুই যাই কর,আর ওনাকে নিয়ে ইয়ার্কি মারিস না।"সুজয় হেসে বলল," এবার তো ভাবছি একটা নেকড়ের চামড়ার কস্টিউম পরে পূর্ণিমার রাতে মায়াবী চাঁদের আলোয় ঐ কার্জনের সামনে গিয়ে দাঁড়াবো। দেখব,ওনার পাহাড়প্রমাণ সাহস কোথায় থাকে!হা হা।" এবার হাসি ফুটে উঠল সুনীপের মুখে। "এজন্যই তোকে এত ভালো লাগে। মস্করাও করতে পারিস তুই! হা হা,বিক্রম ভাট যদি কোনোদিন ওয়্যারউল্ফ নিয়ে সিনেমা করে ,তাহলে লিড রোলটা তোকেই দেবে। বুঝলি পাগলা!" সুজয় একটু সিরিয়াস হল।"আচ্ছা,এই নৃ বৃক বা ওয়্যারউল্ফদের কথা তো মধ্যযুগের ইউরোপের কবি বা লেখকরা উল্লেখ করেছেন। বিশ্বচরাচর যখন জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে,তখন চাঁদের আলোয় একজন সাধারণ মানুষের হিংস্র নেকড়েয় রূপান্তর। এরকম ব্যাপার কি বাস্তবে সম্ভব ?মানে নেকড়ে মানবের কি সত্যিই অস্তিত্ব আছে?"

সুনীপ মাথা নেড়ে বলল,"দেখ ভাই,আমার যা পড়াশুনা তাতে আমার মনে হয় চাঁদের আলোয় ফেস শিফটিং করে কোনো মানুষের পক্ষেই নেকড়েতে রূপান্তরিত হওয়া সম্ভব নয়। একটা কথা আছে,'ক্লিনিক্যাল লাইক্যানথ্রোপি'। মানে ধর একটা মানুষ যাকে দেখে এমনিতে যথেষ্ট সুস্থ-স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে,পূর্ণিমারাতের মায়াবী চাঁদের আলোয় সে হিংস্র নেকড়ে বলে ভাবতে শুরু করে।হিংস্র কাজকর্ম শুরু করে। তুই নিজের চোখে দেখলে জাস্ট বিশ্বাস করতে পারবি না,সেই নিরীহ মানুষটা তখন কতোটা নির্মম ,কতোটা ফেরোশাস হয়ে ওঠে। এটা আর কিছুই নয়,একধরণের মানসিক রোগ বা সাইকোলজিক্যাল ডিসঅর্ডার।আরেকটা জেনেটিক ডিসঅর্ডার আছে,তাতে কোনো শিশু জন্মাবার সাথে সাথে আস্তে আস্তে যখন বেড়ে ওঠে ,তখন তাদের শরীরে ও মুখমণ্ডলে এত রোমের আধিক্য থাকে আর রোমগুলি এত বড়ো আর ঘন হয়,যে তাকে মানুষের আদলে কোনো পশু বলে মনে হয়। আমার মতে,এই দুটো মিশিয়ে তৈরি হয়েছে নেকড়ে মানবের কনসেপ্ট।"

সুজয় বলল-"ও মাই গড!"সুনীপ-"হ্যাঁ তাই, ভাব তো এখন ভারতের গ্রামাঞ্চলে এরকম জেনেটিক ডিসঅর্ডারের বাচ্ছারা জন্মালে সমাজ তার অশিক্ষার ফলে তাকে নৃ-বৃকের শিশু বলেই আক্ষা দেয়। তারপর সেই নিরীহ অভাগা শিশুদের সমাজ থেকে বের করে দেয়। ভারত কেন,পৃথিবীর অনেক দেশেই কমবেশি এরকম ঘটনা ঘটে। ওয়্যারউল্ফ যতো না নৃশংস,তার থেকেও বেশি নৃশংস কুসংস্কারাচ্ছন্ন অন্ধবিশ্বাসী মানবসমাজ।"এবার সুজয় বলল,"ভাই আমার একটা ব্যাপার আশ্চর্য লাগল। তোর কার্জন বলল যে,এখানেই নেকড়ের আস্তানা। অথচ আসার সময় বা গ্রামে আমাদের চোখে নেকড়ে পড়া তো দূরের কথা,একটা হাউলিংও শুনতে পেলাম না। অথচ,গ্রামের মানুষদের প্রত্যেকে নেকড়ের উল্কি ধারণ করেছে। ব্যাপারটা কি বল তো?"সুনীপ বলল-"ব্যাপারটা তো আমিই ঠিকঠাক বুঝতে পারছি না,শুধু ভাবছি আর ভেবেই চলেছি।"হাসতে হাসতে দুই বন্ধু ঘরে ঢুকল। সুনীপের সাথে সুজয়কে টিপিক্যাল ভঙ্গিতে হাসতে দেখে পঞ্চপাণ্ডবের বাকিদের বুঝতে বাকি রইল না,নেকড়ের ডাক টা কার গলা থেকে বেরিয়েছে! সবাই জানে সুজয়ের এই অদ্ভূত দক্ষতার কথা।এসময় গাঁয়ের মোড়লও উপস্থিত। তিনিও বাড়ি আসার সময় দূর থেকে নেকড়ের ডাক শুনেছেন। কিন্তু,তার চোখমুখে যত না ভয় ফুটে বেরোচ্ছে,তার থেকে তিনি বেশি অবাক হয়েছেন যে,তার এলাকায় নেকড়ে ডাকছে।সুনীপ তাকে দেখে হেসে উঠল,"আরে এটা আমার বন্ধুর কীর্তি। এইসব কাজে ও খুব পারদর্শী। বলতে পারেন এটা ওর এক অনন্য দক্ষতা।"মোড়লকে দেখে মনে হল খুব একটা খুশি হননি। তিনি বললেন,"আমি গিয়েছিলাম দেও এর পুজো দিতে। দেও এর আশীর্বাদে এদিকে ভেড়িয়ারা খুব একটা আসে না। ভেড়িয়ারা থাকে জঙ্গলের দিকে। তাই দেও এর পুজো দিয়ে ফিরছি আর আমার বাড়ির সামনেই ভেড়িয়া ডাকছে। এটা আবার কি রকম অশুভ সংকেত!এখন জেনে স্বস্তি পেলাম যে,এটা তোমার বন্ধুর কাজ।"মাথায় দু হাত প্রণামের ভঙ্গিতে ঠেকালেন মোড়ল।"সবই তাঁরই আশীর্বাদ। আর আমরা তো তাঁরই।""ঠিক আছে ,তোমরা সবাই শুয়ে পড়ো। কথা দিলাম কাল থেকে ছেলে আর মেয়েদের জন্য আলাদা আলাদা ঘরের বন্দোবস্ত করে দেব। আজ রাতটা তোমরা কোনোমতে কাটিয়ে দাও। আশা করি আমাদের গাঁয়ে এক সপ্তাহ কাটাতে তোমাদের খারাপ লাগবে না। যাই হোক,আর চারদিন পরে পূর্ণিমা। আমাদের এখানে পূর্ণিমার রাতে উৎসব হয়। আশা করছি,আমাদের সাথে তোমরাও যোগদান করবে।"এই বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন মোড়ল।মধ্যরাত। ঘুম আসছে না সুনীপের। মাথাই শুধু একটাই চিন্তা,দুর্জন সিং বললেন যে,এখানেই নেকড়েদের আস্তানা আর মোড়ল বললেন,নেকড়েরা এদিকে আসে না তাও আবার দেও এর জন্য! দুর্জন সিং যথেষ্ট নামী শিকারী।তিনি তো মিথ্যা কথা বলার লোক নন। তাহলে মোড়ল কি মিথ্যাবাদী!সুনীপের চিন্তা ছিন্ন হয়ে গেল,যখন তার কানে এল এক অদ্ভূত খস খস শব্দ। মাথার কাছের জানালা থেকে আসছে শব্দটা। বাড়ির পাশে শুকনো পাতা ছড়িয়ে ছিল। কেউ যেন তার ওপর পা ঘষটে ঘষটে হাঁটছে। সুনীপ হল্ফ করে বলতে পারে,এই আওয়াজ কোনো মানুষের পায়ের নয়। এই আওয়াজ থাবাযুক্ত কোনো পশুর। আর শুধু তাই নয়,জানলা থেকে এবার সুনীপের কানে প্রবেশ করল জন্তুটার উষ্ণ নিঃশ্বাস নেবার শব্দ। 

জানালাটা খোলাই আছে,চাঁদের আলো জানলা দিয়ে ঘরে পড়ে এক অদ্ভূত মায়াময় পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। বইছে শীতল হাওয়া।

জন্তুটা নিঃশ্বাস নিয়েই চলেছে সুনীপের মাথার কাছে। কিন্তু,এটা হরবোলা সুজয়ের অ্যাক্টিং নয়। কারণ সুজয় এখন সুনীপের পাশেই অঘোরে ঘুমোচ্ছে। সুনীপের ইচ্ছা হল জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখে জন্তুটাকে,বাইরে চাঁদের আলোয় দেখতে অসুবিধা হবে না জন্তুটাকে। কিন্তু পরক্ষণেই এক অজানা আতঙ্কে কেঁপে গেল তার বুক।

যদি সুনীপ জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখত,তবে সে দেখতে পেত একজোড়া লাল চোখ ব্রহ্মাণ্ডের ক্ষুধা আর হিংস্রতা নিয়ে তারই দিকে নির্নিমেষ নয়নে তাকিয়ে আছে। না,এখন সে আক্রমণ করবে না। অপেক্ষা করছে সঠিক সময়ের,যে সময় খুব শিগগির আসতে চলেছে।



পরদিন কাকভোরে ঘুম ভাঙল সুনীপের। শুনতে পেল মন মাতাল করে দেওয়া বনমোরগ আর হিল ময়নার ডাক। চারিপাশে পাতলা কুয়াশার চাদর,এমনি আবহাওয়া পরিষ্কারই বলা চলে। আর তাতেই সুনীপ দেখল সেই নৈসর্গিক দৃশ্য। পুবাকাশকে ভালোবাসার রঙে রাঙিয়ে দূরে পাহাড়ের বুক চিরে উঠছে দিবাকর। এক নতুন ভোরের আশা নিয়ে,এক নতুন দিনের স্বপ্ন নিয়ে।

শুরু হল এক সোনা ঝরা সকালের। সকালেই দেখা মোড়লের সাথে। সুনীপের দিকে তাকিয়েই একগাল হেসে ফেললেন। সত্যিই ,এই গ্রামের মানুষেরা কতো সরল। সুনীপের মন অনেক হাল্কা হয়ে গেল। বেলা দশটা নাগাদ কুটকি আর চাউল খেয়ে গ্রাম ঘুরতে বেরলো সুনীপরা। কিছুদূর গিয়ে দেখা দুর্জন সিং এর সাথে। দেখা গেল এখানে তিনি এক বন্ধুও বানিয়ে নিয়েছেন এবং এখন তার বাড়িতেই আছেন। তার এই বন্ধুর নাম ঝিন্দারাম। তিনিই পরিচয় করিয়ে দিলেন সকলের সাথে ঝিন্দারামের। উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হল,তার মতো ঝিন্দারামও একজন শিকারী আর অন্তত সারা দেশে না হোক , ছত্তিশগড়ের এই ছোট্ট গ্রামে ঝিন্দারামের প্রতিপত্তি যথেষ্ট।গ্রামের সবাই ঝিন্দারামকে মোটামুটি ভক্তি করে। ঝিন্দারামের বক্তব্য,গ্রামে নেকড়ের হানা এখন তেমননা হলেও মাঝে মাঝে জঙ্গল থেকে নেকড়ে গ্রামে চলে আসে। আর সব থেকে মারাত্মক ব্যাপার হল,নেকড়েটা নাকি নরখাদক মানে আদমখোর!তারপর দুর্জন বললেন,"আমার ভয় নেকড়ে নিয়ে নয়। আমার চিন্তা অন্য কিছু নিয়ে,যারা না মানুষ,না নেকড়ে। জাস্ট মাঝামাঝি।"

অরুণিমা বলল-"ইউ মিন ওয়্যারউল্ফ?"

উত্তরে দুর্জন বলল-"এগজ্যাক্টলি তাই। আমি ওয়্যারউল্ফ বা আদম ভেড়িয়াকেই মেনশন করছি। আমি শুনেছি এই গ্রামে আদম ভেড়িয়া (নেকড়ে মানব)রয়েছে। তাই আগে থেকেই সাবধান হয়ে এসেছি। ভয় পেও না,ওরা আমার ক্ষতি করতে পারবে না। প্রথমে বলি আমার কাছে সিলভার বুলেট রয়েছে।দ্বিতীয় কথা,তোমাদের একটা জিনিস দেখাই।"

এই বলে নিজের গলার লকেটটা ধরে সুনীপদের দেখিয়ে দুর্জন বললেন,"জয় শ্রী রাম!"

সুনীপ দেখল ,লকেটটা রামচন্দ্রের নামাঙ্কিত। আর লকেটের হারটা রূপোর। এখন সূর্যের কিরণে ঝলসে উঠছে।

সুজয় ঠাট্টা করে বলল-"রূপোকে ওরা খুব ভয় পায় ,তাই না। "

দুর্জন বললেন,"এগজ্যাক্টলি,রূপোকে ওরা খুব ভয় পায়। আর সবচেয়ে বড়ো কথা প্রভু রামচন্দ্র আমার সাথে আছেন। জয় শ্রী রাম।"

সুজয় সুনীপকে চুপি চুপি বলল,"মনে হয় তোর কার্জন একেবারেই পাগল হয়ে গেছে।দাঁড়া আরেকটু বাজিয়ে দেখি।"সুজয়ের দিকে কটমট করে চাইল সুনীপ।

এরপর সুজয় দুর্জনকে বলল-"আর কোনো এক্সট্রা প্রোটেকশন?"

সুজয়ের চোখের দিকে নির্নিমেষ নয়নে চেয়ে থাকলেন দুর্জন। খুব সম্ভবত মনোভাব বোঝার চেষ্টা করলেন। তারপর বললেন,"না প্রোটেকশন তো নেই,কিন্তু অস্ত্র রয়েছে। হ্যাঁ,শয়তানকে খতম করার অস্ত্র। আর এই অস্ত্র অমোঘ। তাই একে তোমরা ব্রহ্মাস্ত্রও বলতে পার। আমার ব্যাগের মধ্যে আছে,সময় আসলে তোমরা নিজেরাই দেখতে পাবে।"দুর্জনের কথাতে সুজয় হাসলেও ব্যাপারটিকে উড়িয়ে দিতে পারছে না সুনীপ। সে আজ সকালে গিয়েছিল জানলার কাছে। সেখানে আগের দিনের ঘটনার কিছুটা ক্লু তো পেয়েছে। আর সে যা দেখেছে,তাতে সে উড়িয়ে দিতে পারল না দুর্জনের কথা।চুপিচুপি গিয়ে সে সুজয়কে বললও আজ সকালে সে যা দেখেছে। চুপ করে একদৃষ্টিতে সুনীপের দিকে তাকিয়ে থাকল সুজয়।বদলে গেছে তার চোখমূছ। কিছুক্ষণ পরে বলল,"আমারই ভুল ছিল। হয়তো দুর্জনই ঠিক। যাই হোক,আমি মনে করি এখন আমাদের ওনার কাছাকাছিই থাকা উচিত। কেননা ভাই,এই জায়গাটা আমার খুব একটা ভালো লাগছে না। লোকগুলি সরল হলে কি হবে,এদের চাউনি কেমন যেন। আজ সকালে ফল কাটতে গিয়ে ছুরিতে আঙুল কেটে ফেলেছি । রক্ত পড়ছিল বিশ্রী ভাবে। তো তোর ঐ মোড়লের কাছে ব্যান্ডেজ বা কিছু ফার্স্ট এড চাইতে গেলাম।উনি আমার কাটা জায়গার দিকে এমনভাবে চেয়ে থাকলেন,যেন তার সামনে সুস্বাদু কিছু রয়েছে। আমাকে অবাক করে তিনি জিভ দিয়ে ওপরের ঠোঁট চাটতে লাগলেন ,তারপর তোর মোড়ল আজ আমার হাতের ঘা এর দিকে এমনভাবে চেয়ে করতে লাগলেন যাতে ওর লালা ঝরতে লাগল। তারপর একবার ফার্স্ট এড এর কথা বলতেই উনি আমাকে অবাক করে জাস্ট ছুটে বেরিয়ে গেলেন।তারপর রূপালী আমার হাতে ব্যান্ডেজ করে দিল।" সুনীপ বিড় বিড় করে বলল,"কালকে যখন বললাম নেকড়ের ডাক তুই ডাকছিলি,তাতে উনি এমন করলেন যেন আমরা একজন শ্রদ্ধেয় লোককে অপমান করেছি। উনি যতোটা না ভয় পেয়েছিলেন,তার থেকে বেশি রেগে গিয়েছিলেন।"

জয়দীপ এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল সব। এখন সে বলল,"সুনীপদা তোমাকে আমি বলেছিলামই,ডানদিকের রাস্তাটা না ধরতে। আজ তোমার জন্যই আমরা বিপাকে পড়েছি। অ্যাণ্ড গড সোয়্যার,এর থেকে বেরনোর রাস্তা তোমাকেই করতে হবে। আর তা যদি না কর

আর আমরা যদি ভগবানের আশীর্বাদে কোনোমতেই কোলকাতা ফিরতে পারি,তাহলে বলে দিলাম তোমার সাথে ফিরে কোনো সম্পর্কই রাখব না। দেখে নিও তুমি।"জয়দীপের সঙ্গে তর্কে গেল না সুনীপ। চুপ করে রইল। সমস্যা তো একটা হয়েছেই!

দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সুনীপরা। দোকানে যেটা ভাজা হচ্ছে সেটা না লুচি,না পরোটা বরং দুটোর মাঝামাঝি। সুনীপরা যেটা লক্ষ্য করল না সেটা হল দোকানদার স্থির দৃষ্টিতে তাদের লক্ষ্য করে তাদের কথোপকথন শুনছে। তার দুচোখে ঝরে পড়ছে যুগ যুগান্তের ক্ষিদে।এসময় একটা কারণে শিহরণ বয়ে গেল জয়দীপের সারা শরীরে। মনে বাড়ল উত্তেজনা। কারণ তার থেকে একশো মিটারের মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে তার প্রেম,তার ভালোবাসা।শ্যামবর্ণা উদ্ভিন্নযৌবনা এক আদিবাসী মেয়ে,যার চোখের দিকে তাকালেই শিহরণ হয় জয়দীপের মনে। যার শরীরকে স্পর্শ করার জন্য উত্তেজিত হয়ে ওঠে ওর সারা শরীর।আজ মেয়েটাও দেখল তাকে। একটানা চেয়ে রইল তার দিকে। বলা হয়,মেয়েরা ছেলেদের চোখের ভাষা খুব সহজে পড়ে ফেলে। তবে কি মেয়েটা বুঝতে পেরেছে যে,জয়দীপ মেয়েটাকে ভালোবাসে।পুলকিতহল জয়দীপের মন।হাতছানি করে মেয়েটা ডাকল জয়দীপকে। সুনীপরা নিজেদের মধ্যে আলোচনাতেই ব্যস্ত ছিল।তাদের কে এড়িয়ে মেয়েটার দিকে এগিয়ে গেল জয়দীপ। চুপি চুপি জয়দীপকে বলল,"আজ রাতে নদীর ধারে দেখা হবে।"প্রেমের স্বর্গে ভাসতে লাগল জয়দীপ।


পূর্ণিমায় জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে বিশ্বচরাচর। যেরাস্তা দিয়ে সুনীপরা গ্রামে ঢুকেছিল,তার বিপরীত দিকেই গ্রামের ল্যান্ডস্কেপকে আরো সুন্দর করে কুলকুল করে বয়ে চলেছে শঙ্খ নদী,যা পরে ওড়িশার কোয়েল নদীতে পড়েছে। এই নদীর ওপর সাদনি জলপ্রপাত তো বিখ্যাত। যাই হোক,আমরা আবার গল্পে ফিরি।চাঁদের রূপালী কিরণে মনে হচ্ছে নদীর জলের ওপর কেউ রূপালী আস্তরণ দিয়েছে। ডি লা মেয়ারের লেখা কবিতার একটা লাইন মনে পড়ল জয়দীপের। By silver reeds in a silvery stream!কিন্তু তার প্রেমিকার আসতে এত দেরি হচ্ছে কেন। নদীর ওপাশে গভীর অরণ্য। তা থেকে হঠাৎ ভেসে আসল নেকড়ের ডাক। এইরকম প্রাগৈতিহাসিক পরিবেশে জয়দীপ আগে আসে নি!ঝিঁ ঝি ডাকছে। হাতের রেডিয়াম ঘড়িতে দেখল রাত আটটা বাজে। না,তার বন্ধুদের একবার জানিয়ে আসা উচিত ছিল। সুনীপরা নিশ্চয়ই তাদের বন্ধুর জন্য দুশ্চিন্তা করছে। এতক্ষণে খোঁজাখুঁজিও শুরু করে দিয়েছে হয়তো!এইসময় পায়ের শব্দে সম্বিৎ ফিরল জয়দীপের। কেউ নিশ্চয়ই পা টিপে টিপে এইদিকে আসছে। সামনে তাকিয়ে জয়দীপ যা দেখল তাতে অকস্মাৎ বেড়ে গেল তার হৃদস্পন্দন। সামনে আর কেউ নয় আসছে তারই প্রেমাস্পদা,সেই শ্যামবর্ণা আদিবাসী তরুণী।

না আর অপেক্ষা সহ্য হল না জয়দীপের। শক্ত আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরল মেয়েটিকে। রাখল ঠোঁটে ঠোঁট,অনুভব করতে লাগল তার প্রেমিকার প্রত্যেক হৃদস্পন্দন। শরীরের উষ্ণ স্পর্শে শিহরিত হল তার শরীর। জয়দীপ জিজ্ঞাসা করল -"তোমার নাম জানতে পারি কি?" মৃদু গলায় উত্তর এল যে কন্ঠস্বর জয়দীপকে ষড়রিপুর এক রিপুতে আচ্ছন্ন করে দিল,"মল্লিকা!"কতো সুন্দর নাম। একটা উপজাতি মেয়েরও যে এত সুন্দর নাম হতে পারে তা জয়দীপ কল্পনাই করতে পারে নি। কতো সুন্দর লাগছে মল্লিকাকে।মোহময়ী আঁখি,রক্তিম ওষ্ঠ, স্ফীত হৃদয়,শুভ্রধবল দন্ত-আর তাকে আরও বেশি সুন্দর করে তুলেছে একজোড়া গজদন্ত।গায়ের শ্যামবর্ণ আকর্ষণ করেই চলেছে জয়দীপকে।

"জান আমি তোমায় খুব ভালোবাসি।পছন্দ করো আমায়?"

"আরে পাগল। করি বলেই তো ডেকেছি আজ মায়াবী রাতে এই নদীর ধারে। তোমার সাথে দেখা করতেই এসেছি আজ অভিসারে!"

না আর থাকতে পারল না জয়দীপ। মল্লিকার সাথে মেতে উঠল প্রেমের খেলায়।না প্রেম বললে ভুল হবে,কামের খেলায়।

কিন্তু এরকম আচরণ করছে কেন মল্লিকা!পরিবর্তন আসছে মল্লিকার শরীরে। চাঁদের আলোয় মল্লিকার শরীর আয়তনে বড়ো হতে শুরু করেছে,সুন্দর মনোমুগ্ধকর মুখমণ্ডল ছুঁচালো আকৃতি ধারণ করেছে,কানগুলি লম্বা এবং খাড়া হয়ে যাচ্ছে,মুখের যেখানে গজদন্ত ছিল সেগুলি পরিণত হচ্ছে ধারালো তীক্ষ্ণ ক্যানাইন দাঁতে। নারীর পেলব শরীর ঢেকে ফেলছে ঘন কালো রোম। কল্পনা থেকে বাস্তবের রুক্ষ মাটিতে পড়ল জয়দীপ। মনে পড়ল আজ সকালেই দুর্জন সিংএর কথা। হ্যাঁ,আদম ভেড়িয়া।'এখানেই নেকড়েদের আস্তানা।' জয়দীপের মনে হল সুনীপদের কথা। যতই মন কষাকষি থাকুক না কেন,তারা তো তারই বন্ধু। বন্ধুদের মাঝে মন কষাকষি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। ইশ,এই সময় যদি সুনীপরা তার সাথে থাকত! বা সাথে থাকত অভিজ্ঞ পোড়খাওয়া শিকারী দুর্জন সিং। ইশ,কতোই না সাহায্য হত! লেকটাউনের বাড়িতে বৃদ্ধ মা বাবার কথা মনে পড়ল জয়দীপের।

কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে জয়দীপের । তার সামনে এখন দাঁড়িয়ে আছে এক নেকড়ে মানব থুড়ি নেকড়ে মানবী। নিঃশ্বাসের তীব্র গন্ধে আটকে যাচ্ছে তার শ্বাস।এইসময় আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে হল রাইফেলের গর্জন। এক গগনভেদী আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল নেকড়েমানবী। কেঁপে উঠল জয়দীপের বুক। একসময় ছটফট করতে করতে সেটা পরিণত হল মল্লিকার নিথর দেহ। চমকে উঠল জয়দীপ। তার সামনে এখন রাইফেল হাতে দাঁড়িয়ে আছেন দীর্ঘদেহী দুর্জন সিং স্বয়ং।কিন্তু এই দুর্জন সিংকে সে এর আগে দেখে নি। তার লম্বা চুল হাওয়ায় উড়ছে।চোখদুটি জ্বলছে প্রবল জিঘাংসায়!


"ঈশ,এতো রাত হয়ে গেল,জয় এখনোও ফিরল না। কোথায় যে গেল ছেলেটা।"দুশ্চিন্তাপূর্ণ গলায় বলে উঠল সুজয়। "আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। এই বাড়িটা মূল লোকালয় থেকে কেমন যেন দূরে। গাঁয়ের একপ্রান্তে। আর একটা ব্যাপার দেখেছিস তো। এই গাঁয়ে একটু সন্ধ্যা হতেই চারপাশ কেমন যেন নিঝুম হয়ে যায়। কেমন যেন ভৌতিক পরিবেশ। রীতিমতো গা ছমছম করে।" বলে উঠল সুনীপ।

"ভাব তো তোরা ,আর দুদিন পরেই সারা কোলকাতা মেতে উঠবে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার আনন্দে। আর আমরা পড়ে থাকব এই অখ্যাত বনবাদাড়ে। একদমই ভালো লাগছে না আর।" বলে উঠল অরুণিমা।

"কেন এখানেও তো অনুষ্ঠান হবে। মোড়লজি তো আমাদের আগে থেকেই আমন্ত্রণ করে রেখেছেন।"সুজয়ের গলায় শ্লেষ।

"আর ভালো লাগে না এই হতচ্ছাড়া জায়গায় থাকতে। আজ জয় ফিরে আসলেই কাল সকালে আমরা মোড়লের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে রওনা হব বিলাসপুর। "বলে উঠল রূপালী।অরুণিমা বলল,"অনুমতি আবার কি!অশিক্ষিত একটা গেঁয়ো লোক ,ঠিকঠাক হিন্দি বলতে জানে না ,আর তার কাছে অনুমতি!জাস্ট বললেই হবে। আজ আমার হাতে নিমের দাঁতন দেখে কেমন যেন করছিল! সাইকোপ্যাথ একটা কোথাকার!"সুনীপ বলল,"শুনেছি এইসব উপজাতি লোকেরা অপদেবতার পূজা করে। দেও কি কোনো অপদেবতা!"

"দেও কোনো অপদেবতা কিনা তা ঠিক জানি না,কিন্তু তোমাদের ঐ মোড়ল নিমের ডাল কেন,যেকোনো কাষ্ঠখণ্ড বা রূপোর টুকরোকে ভয় পাবে। কেননা নৃ বৃকদের এটাই স্বভাব।"ঘরের মধ্যে বাজ পড়লেও কেউ এত অবাক হত না,যতটা না অবাক হল এই কথায়। সুনীপ ঘুরে দেখতে পেল দরজায় ঘেমেনেয়ে ক্লান্ত জয়ের সঙ্গে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন,তিনি আর কেউ নন । স্বয়ং শিকারী দুর্জন সিং।

সুনীপের কাঁধে হাত রেখে দুর্জন বললেন,"শুধু মোড়ল কেন,পুরো গ্রামটাই নরপিশাচদের গ্রাম। এদের বাইরে থেকে যতই নিরীহ বলে মনে হোক না কেন,পূর্ণিমার চাঁদের রূপোলী আলোয় পরিণত হবে এক একজন ভয়ঙ্কর নরপিশাচে। এক একটা বিভীষিকা।"

সুজয় চেঁচিয়ে উঠল,"কেন ,আপনি কি বলতে চান?আমরাও আপনার এই আজগুবি গল্পে বিশ্বাস করব!কথায় বলে,গল্পের গরু গাছে চড়ে।আর আপনার গল্পে গরু তো ডানা মেলে আকাশে উড়ছে!"আত্মবিশ্বাসের সাথে দৃঢ় গলায় দুর্জন বললেন,"কেন সত্যি করে বল তো!তোমরা এখানে নেকড়ে মানব থাকার কোনো লক্ষণ খুঁজে পাও নি!একবার নিজের সাথে সম্পূর্ণ সৎ হয়ে সত্যি কথা বলে দেখোই না।

"সেদিন রাতে মনে হয় জানালার কাছে কোনো জন্তু এসেছিল। ওর নিঃশ্বাসের শব্দ আর গন্ধ দুটোই আমি অনুভব করেছি। বিকট গন্ধ বড়ো!যাই হোক,পরের দিন সকালে বাইরে বেরিয়ে জানলার কাছে যেতেই জাস্ট বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। এরা শুনলাম মাছ মাংস কিছু ছোঁয় অবধি না! কিন্তু আমি দেখলাম ঐ জানালার সামনে পড়েছিল পাঁচ ছটা বনমোরগের ছাল ছাড়ানো ক্ষতবিক্ষত দেহ। আর কয়েকদিন আগে হয়তো বৃষ্টি হয়েছে কারণ সবে বর্ষাকাল বিদায় নিয়েছে। ভেজা মাটি। সেই ভিজে মাটিতে দেখলাম কুকুর বা তার থেকে বড়ো কোনো চারপেয়ে জন্তুর পায়ের ছাপ। আর কিছু দূর গিয়ে সেই পায়ের ছাপের বদলে দেখলাম দু পেয়ে মানুষের পায়ের ছাপ। কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব!"

"বুঝলে বাবা ইহজগতে সবকিছুই সম্ভব। গ্রীক পণ্ডিত হেরোডোটাস যিনি 'ইতিহাসের জনক'হিসাবে ভুবনবিখ্যাত,তিনিও সাইথিয়ার ঘন জঙ্গলে নেউরি (Neuri) নামের এক উপজাতিকে সচক্ষে নৃ বৃক বা নেকড়ে মানব বা তোমরা যাকে ওয়্যারউল্ফ বলো ,তাতে পরিণত হতে দেখেছিলেন। নেহাত ভগবানের আশীর্বাদের হাত মাথায় ছিল,তাই সে যাত্রায় তিনি বেঁচে ফিরে আসতে পেরেছিলেন। সেইবার যদি পুরো গ্রাম নরভেড়িয়া হতে পারে,এবার আর আশ্চর্য কোথায়!"চুপ করলেন দুর্জন।পঞ্চপাণ্ডবের মুখচোখে চিন্তার ছাপ। দুর্জন আবার শুরু করলেন ,"ওয়্যারউল্ফ আমার অনেক ক্ষতি করেছে। আমার মায়ের মৃত্যু হয়েছিল ওয়্যারউল্ফের হাতে। সে ঘটনা খুলে পরে বলবো। যাই হোক,এখানে আমি ভেবেছিলাম যে,দু চারজন মানুষই নরপিশাচ। কারণ প্রথমত,আমার কাছে বিশ্বস্ত সোর্স থেকে ইনফরমেশন ছিল। আর কোথাও ওয়্যারউল্ফ থাকলে আমি তার গন্ধ টের পাই। আমার ষষ্ঠেন্দ্রিয় জানান দেয় যে,এখানে নলপিশাচের বাস। তাই আমি তোমাদের আগেই সাবধান করে দিয়েছিলাম যে,এখানে নেকড়ের আস্তানা। কিন্তু এখানে এসে দেখলাম যে গোটা গ্রামটাই নেকড়েতে ভর্তি।" "ঝিন্দারামকে বিশ্বাস করতাম,মনে করতাম যে আমি যে নেকড়ে মানবের বংশকে ধ্বংস করার অভিযানে নেমেছি,তাতে ঝিন্দারামই আমার যোগ্য সঙ্গী হয়ে উঠবে। আগেই দেখেছি রূপার প্রতি ওর ভীতি। আমার গলায় প্রভু শ্রীরামের লকেটের ও বারবার অবজেকশন করেছে। কিন্তু,আজ সন্ধ্যা বেলা ওকে চাঁদের আলোয় দুপেয়ে লেজবিহীন

নেকড়েতে পরিণত হতে দেখে আমার সমস্ত ভুল চিন্তা খান খান করে ভেঙে গেল!"


"বাও জায়গাটা কি সুন্দর। একেই বলে ন্যাচারাল বিউটি।"তিরতির করে বয়ে চলা শঙ্খ নদীর পাশে দাঁড়িয়ে ছিল পঞ্চপাণ্ডব। যুবতীর গলায় যেমন মুক্তোহার যুবতীর শারীরিক সৌন্দর্যকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে তোলে,তেমন এই পাহাড়ি নদীও এই গ্রামের সৌন্দর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। সুনীপের মুখে হাসি ছিল না। সে ভাবছিল দুর্জনের কথা নিয়ে। "এই গ্রামে তারাই আসে,যাদের কে শয়তান ডেকে আনে। এমনিই সাধারণ মানুষ এই গ্রামের রাস্তা খুঁজে পায় না। এই গ্রাম মায়ার বন্ধনে বাঁধা। যখনই শয়তানের ক্ষুধার প্রবৃত্তি জাগে,তখনই সে সাধারণ মানুষকে এই গ্রামে ডেকে আনে। আর এই গ্রাম থেকে বেরনোর একটাই উপায়। শয়তানী কেন্দ্রিয় শক্তিকে সাময়িক ভাবে দুর্বল করে দেওয়া। তাতেই খুলে যাবে গ্রাম থেকে বাইরে বেরনোর রাস্তা।"সুজয় হাত রাখল সুনীপের কাঁধে।"আমাদের গাড়ি তো খুঁজে পাওয়া গেল না ভাই। মোড়ল বললেন,ওনারা সরিয়ে রেখেছেন। উৎসব সেরে আমরা যখন এই গ্রাম থেকে রওনা হব,তখন ওনারা গাড়িটা ঠিক আমাদের কাছে পৌঁছে দেবেন।" সুজয় মৃদু হেসে বলল,"তুই ফালতু চিন্তা করিস ভাই। সব ঠিক আছে।" সুনীপ মৃদু হাসল। যদিও দুজনে জানে যে,কিছুই ঠিক নেই!পূর্ণিমার রাত। বিশ্বচরাচর চাঁদের জ্যোৎস্নায় ভাসছে। হচ্ছে ঢাকের চড়াম চড়াম শব্দ। উপজাতি নারী পুরুষরা নিজেদের সুন্দর সাজে সজ্জিত করেছে। আজ দেও এর পুজো,তাই এত ধুমধাম। 

সুনীপ দের দলবল এবং দুর্জন সিং কে নিয়ে দেও এর থানে এলেন মোড়ল। কাছাকাছি কোথাও শকুনীর বাচ্ছা কাঁদছে! মোড়ল আজ সুনীপদের প্রমিস করেছেন,আজ তিনি ওদের জন্য মাংসের অ্যারেঞ্জমেন্ট করবেন।

এটা কি দেখছে সুনীপ! এটা কি দেওয়ের মূর্তি না কোনো বিভীষিকার। পাথর কেটে তৈরি করা হয়েছে। শরীরের গড়ন মানুষের মতো হলেও মুখের আদল এক হিংস্র নেকড়ের কথাই মনে করিয়ে দেয়। মোড়ল দেখিয়ে বললেন,এটাই দেও। গ্রামের মানুষের চরম মঙ্গলকারী। মূর্তিটা দেখে ব্যাপারটা বুঝতে বাকি রইল না সুনীপের। এই মূর্তিই তাহলে শয়তানের প্রতিভূ,নরকের দ্বার!তাহলে কি দুর্জন সিং এর কথাই সত্যি! হা ভগবান,এও কি সম্ভব!

শুরু হল পূজা। এক দুর্বোধ্য মন্ত্রপাঠ। তারপর ধীরে ধীরে এই মন্ত্রোচ্চারণ পরিণত হল হিংস্র গোঙানিতে। সুনীপ নিজের চোখে যা দেখল তাতে সে নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারল না। প্রতিটি মানুষের ফেস শিফটিং শুরু হয়েছে। কিছুক্ষণ পরে প্রত্যেকটা নরনারী পরিণত হল দুপেয়ে নেকড়েতে যারা মূর্তির দিকে থাকিয়ে করতে লাগল গোঙানি। এই মূর্তিটাই তাহলে কি কেন্দ্রীয় শক্তি,মনে প্রশ্ন জাগল সুনীপের।

এইসময় দুর্জন সিং করলেন এক অধ্ভূত কাণ্ড। তিনি তার ব্যাগ থেকে বের করলেন অদ্ভূত এক অস্ত্র,যাকে হয়তো তিনি আগে ব্রহ্মাস্ত্র বলে অভিহিত করেছেন। একটা কাঠের শূল ,যেটার অগ্রভাগে ধারালো রূপোর ফলা। চাঁদের আলোয় চকচক করে উঠল। তিনি সেই শূল ছুড়ে মারলেন সরাসরি দেও এর বুকে আর তাতেই ঘটল অদ্ভূত এক কাণ্ড। মূর্তিটার গায়ে যেন আগুন জ্বলে উঠল। আর সেই নেকড়েরাও ছটফট করতে লাগল। তারা যেন মারাত্মক কোনো কিছুর দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটপট করছে। দুর্জন বললেন,"আমাদের হাতে আর বেশি সময় নেই। বেশিক্ষণ এই শয়তানকে বশ করতে পারব না। সো কুইক!"ছুটতে ছুটতে তারা যেখানে গাড়িটা রেখেছিল সেখানে পৌঁছাল। গিয়ে দেখল গাড়িটা যথাস্থানেই আছে। দুর্জন বললেন,"এখন মায়ার বন্ধন ভেঙে গেছে। ঘন্টা দুয়েক আমরা নিরাপদ।"

সুনীপরা যখন কোরবার মহারাজা হোটেলে গিয়ে পৌঁছাল,তখন পুবাকাশকে রাঙিয়ে অরুণ উদিত হচ্ছেন।দুদিন পর। বিশালগড় ফিরে যাবে সুনীপরা। দুর্জনকে বিদায় জানাতে সুনীপ দুর্জনের ঘরে এল। একটা ব্যাপার যেটা সুনীপকে অবাক করল সেটা দুর্জনের গলায় শ্রীরামচন্দ্রের নামাঙ্কিত রূপার লকেটের অনুপস্থিতি। আরেকটা ব্যাপার কাঁধে ব্যান্ডেজ করা। দুর্জন বলল,ঝিন্দারাম যখন নেকড়ের রূপ নিয়ে আক্রমণ করে,তখনই এই ক্ষত টা হয়।

ফিরে আসছিল সুনীপ। হঠাৎ দুর্জনের গলা শুনে ঘুরে তাকালো। এক অদ্ভূত ঘড়ঘড়ে গলায় দুর্জন বলল,"জান তো ভাই,আমি নিজের শিকার কখনো মিস করিনা। "অবাক হয়ে ভয়ার্ত চোখে সুনীপ দেখল, দুর্জনের চোয়াল থেকে বেরিয়ে আসছে একজোড়া তীক্ষ্ণ শ্বদন্ত!


Rate this content
Log in

More bengali story from arijit bhattacharya

Similar bengali story from Action