Suva Chakraborty [ অগ্নিদ ]

Action Thriller

4.3  

Suva Chakraborty [ অগ্নিদ ]

Action Thriller

দংশন

দংশন

14 mins
443


                   ১


সে বছর প্রমোশন পেতে বড্ড দেরি হয়েছিল | সারা বছর অক্লান্ত পরিশ্রমের পরেও যখন প্রমোশন পেলাম না, তখন বেশ রাগ হয়েছিল কোম্পানির উপর | কোম্পানির উপর ক্ষোভ যখন ধীরে ধীরে বেড়ে আগুনের নীল শিখা ক্রমশ লালে পরিণত হল, তখন প্রতি সপ্তাহে একদিন করে ছুটি নেওয়াটাও আমাদের অভ্যাসে পরিণত হল | ব্যতিক্রম ছিল, আমাদেরই এক সহকর্মী, শিবেশ শঙ্কর লাল, সংক্ষেপে - শিবা |


শিবা, বিহারের দুমরাও গ্রামে জন্ম থেকে বড় হয়েছে | বয়স যখন তেরো, তখন মাতৃহারা শিবা, বাবার হাত ধরে এসেছে কলকাতা শহরে | কলকাতার মত বড় শহরে কি করে মানিয়ে নিতে হয়, তা শিখেছে খুব কষ্ট করে | বাবা তো বেশিদিন কলকাতা থাকতে পারেন নি! নিজের গ্রামের বাড়ি, চাষের জমি, সব সামলানোর জন্যে ছেলেকে একা এই শহরে রেখে চলে গিয়েছিলেন জন্মভিটা দুমরাও গ্রামে |


সেই থেকেই একা পথ চলা এই কিশোরের | মাধ্যমিকের পর, একা টিউশনি করে গ্রাজুয়েশন অবধি কোনো রকমে টেনেটুনে পাশ করে অবশেষে এক নামকরা প্রাইভেট কোম্পানিতে ঢুকেছে | 'টেনেটুনে' শব্দটা এই কারণেই বললাম, কারণ শিবা কোনো মাস্টারের কাছে পড়ে নি | আর কোনো মাস্টার ছাড়া পাশ করাটা আজকালকার দিনে খুবই কষ্টকর |


                   ২


আমরা যখন কোম্পানির এইরকম প্রমোশন না দেওয়ার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশে একমত, তখন এর সম্পূর্ণরূপে বিপরীত মনোভাব শিবার মধ্যে দেখে আমরা একপ্রকার অবাক হয়েছিলাম | ওকে অনেক গালিগালাজও করেছি | বলাবাহুল্য, ও সেসব গায়ে মাখে নি | যেন, ওর এসবে কোনো মাথাব্যাথাই নেই!বরং, ওর মধ্যে আমরা এক, বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করেছিলাম! উচ্চাভিলাষী হবার বৈশিষ্ট্য |


হাজার চেষ্টা সত্ত্বেও, যখন ওকে ওর পথ, ওর চিন্তাধারা থেকে ওকে সরিয়ে ফেলতে ব্যর্থ হলাম, সেই মুহূর্তেই ওর প্রমোশন হল | সেই সময়ে ওর মধ্যে এক অসীম আনন্দের অস্তিত্ব অনুভব করেছিলাম | যেন কোনো খেলাত্ পেয়েছে | হাসিমুখে ও সবাইকে বলেছিল,' কাল কোনো খাবার আনবি না | '




                   ৩



দুই বছর পরের ঘটনা | শিবা এখন কোম্পানিতে ভালো অবস্থায় আছে | আমরা, যারা একসাথে কাজ করতাম, তারা একে একে বেরিয়ে গেছে | কেউ বেকার বসে আছে, তো কেউ অন্য জায়গায় কাজের ব্যবস্থা করে নিয়েছে | আমি, টিউশনি করাই | একদিন আমরা সবাই মিলে শিবার বাড়ি যাব বলে ঠিক করলাম |


দিনটা ছিল রবিবার | সবাই মিলে একটি নির্দিষ্ট স্থানে মিলিত হয়ে যখন ওর বাড়ি যাব বলে পা বাড়িয়েছি, এমন সময়, ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল | গরম ভালোই পড়েছিল, তাই বৃষ্টি এসে পড়াতে একটু খুশিই হয়েছিলাম | কিন্তু, দুর্ভাগ্য এটাই যে, একমাত্র আমিই, ছাতা নিয়ে বেরোই নি | অগত্যা ভিজে কাকের মত শিবার বাড়ি গিয়ে পৌঁছলাম | শিবা তো দেখেই অবাক | তড়িঘড়ি করে ব্যাস্ত হয়ে কতকগুলো গামছা নিয়ে এসে আমাদের হাতে ধরিয়ে দিল | আমি ওকে ব্যাস্ত হতে বারণ করলাম | কিন্তু ও কি শুনবার ছেলে? ঘরে ঢুকে বুঝলাম, ওর ঘরটা সত্যিই ছোট! খুবই ছোট!


ঘরে আসবাব বেশি নেই | দরজা দিয়ে ঢুকে বাঁ দিকে একটা ছোট্ট কাঠের আলমারি | ডানদিকের কোণটিতে একটি ছোট্ট খাট | একজনের শোবার জন্য যতটুকু জায়গার প্রয়োজন, ঠিক ততটুকু | উপরে সিলিং ফ্যান এবং খাটের ঠিক চার হাত উপরে, একটি জানালা | শিবেশ, আমাদের বসবার জন্যে একটি চেয়ার দিল | দুজন বসল খাটে, আর আমি চেয়ারে আর শিবা নিচে, মাটিতে |


চারজনে মিলে গল্প করতে করতে কখন যে সন্ধ্যে হয়ে গেছে, বুঝতে পারিনি | এদিকে বৃষ্টির থামার কোনো গল্পই নেই | আমরা চারজন, অর্থাৎ এতক্ষণ যাদের কথা বলছি - পিকু, সঞ্জয়, সত্যেন আর আমি, আমাদের মধ্যে আমার বাড়িটাই শিবেশের বাড়ির থেকে একটু দূরে | আমার বাড়ি, সেই কলেজ স্ট্রিট কে শিবার বাড়ি, হুগলী | স্বভাবতই, হুগলী থেকে উত্তর কলকাতার বাস পাওয়াটা বেশি রাত্রি হয়ে গেলে দুস্কর হয়ে ওঠে | রাত আটটা বাজার পরও যখন বৃষ্টি থামল না, তখন বাকিরা বাড়ি যাবার জন্য প্রস্তুত হল | আমি চিন্তা করছি, আমি যাব কিকরে? ওদের আরও কিছুক্ষণ প্রতীক্ষা করবার জন্যে অনুরোধ করলাম ; কিন্তু পরক্ষণেই বৃষ্টি ও রাতের পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকা অবস্থা দেখে নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম - ' তোরা যা, আমি একটু পরে যাচ্ছি |'


ওরা, চলে গেল |



                    ৪


বৃষ্টি যখন থামল, তখন রাত ১২টা | বাকিরা চলে যেতে, শিবা আমাকে আমার জামা ও প্যান্ট ছাড়তে বলে ওর একটা হাফ প্যান্ট ও একটা সাদা কালো হাফ হাতা গেঞ্জি ধরিয়ে দিয়ে রান্নাঘরে ঢুকল | বেশ অস্বস্তি বোধ করছিলাম | ঘড়িতে যখন দশটা, তখনই শিবা খাবার বেড়ে দিল | রুটি ও কষা মুরগির মাংস চিবোতে চিবোতে ওকে জিজ্ঞেস করলাম, এই অল্প সময়ের মধ্যে কখন ও এত সুস্বাদু খাবার রান্না করল! আর এইসব বার্তালাপের মধ্যেই, ওর হাতে ধরিয়ে দিলাম, একটা প্রেসক্রিপশন ; আসলে বাকিরা চলে যাবার পর, যখন শিবা রান্নার কাজে লেগে ছিল আমি সারা ঘরে একটু পায়চারি করছিলাম, ঐ আলমারির পিছনে একটা কাগজ দেখে ওটাকে তুলে ভালো করে দেখে বুঝলাম, ওটা একটা প্রেসক্রিপশন! সম্ভবত, শিবা এটা আমার কাছ থেকে লুকাতে চেয়েছিল |


ও চুপ করে রইল | আমার কৌতূহল, আরও কিঞ্চিৎ বেড়ে গেল | ওকে চেপে ধরলাম, বললাম - 'প্রেসক্রিপশনে যে ওষুধগুলো দেখছি, এগুলো তো সব এন্টিপইসনাস ড্রাগস্! তোমায় কি কখনো সাপে কামড়েছিল? নাকি বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলে?'


শিবা, আমার কথাগুলো শুনে একটু অবাক হল | কিছুক্ষণ আমার দিকে চেয়ে বলল -'তুমি কি ডাক্তার নাকি? এগুলো যে শরীর থেকে বিষ নির্মূল করারই ওষুধ, তা বুঝলে কি করে?'

-'তুমি বোধহয় ভুলে যাচ্ছ, আমার বাবার ওষুধের দোকান | শনি ও রবি ছুটির দিনগুলোতে, একবেলা করে আমি দোকান সামলাই | এই ওষুধগুলো যে কি, তা আমার খুব ভালো করেই জানা | এবার বলে ফেলোতো ব্যাপারটা কি?'


শিবা, খানিক বিস্মিত হয়ে আমার দিকে আরও কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে, হঠাৎ খাওয়া বন্ধ করে দিল | তারপর, রুটি ও মাংসের বাটি হাতে নিয়ে উঠে, রান্নাঘরে চলে গেল | ওর এরকম আচরণ, আমার প্রত্যাশার বাইরে ছিল | খাবার ইচ্ছে সম্পূর্ণ মরে গেছে | তাই আমিও থালা হাতে নিয়ে রান্নাঘরের পথে পা বাড়ালাম |



                    ৫


হাত ধুয়ে আমরা যখন ঘরে এলাম, তখনও ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হয়ে চলেছে | বাইরের মৃদু ঠান্ডা হাওয়া ঘরে প্রবেশ করছে খাটের উপরের জানালা দিয়ে | ছোট্ট একজনের খাটে বিছানা পেতে আমরা দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসলাম | ঘর একপ্রকার নিস্তব্ধ | ঘড়ির টিকটিক আওয়াজ, ও ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মৃদু শব্দ, কানে যেন এক অসীম শান্তির সৃষ্টি করেছে | নীরবতাটা শিবাই ভাঙল |


ও বলতে লাগল -" সাপে আমাকে কামড়ায় নি সুভাষ | আমি বিষ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টাও করিনি | সাপ কামড়েছিল আমার পরিবারকে | মাকে আমি বাঁচাতে পারিনি সুভাষ | এখনও ঐ মৃত্যুর জন্য আমি নিজেকে খানিকাংশে দায়ী করি | দেখো, তুমি জানো যে আজ তেরোটা বছর কেটে গেছে আমি কলকাতাতে আছি | এখানকার স্কুলে, কলেজে পড়াশোনা করেছি; আর তখন থেকেই এই ঘরটিতে একা রাত কাটিয়েছি, আজ তেরোটা বছর | মাঝে মাঝে এমনও রাত গেছে, যে রাত কেটেছে আমার জেগে জেগে, নিদ্রাহীন হয়ে কেঁদেছি, তুমি জানো? নিজেকে কেবলই দায়ী করেছি | জানি, যে যেটা হয়েছিল, তা নিছকই দুর্ঘটনা, কিন্তু তবু, আমি মাকে বাঁচাতে পারতাম, বাঁচাতে পারতাম সুভাষ!

-'শিবেশ, ভাই, কি হয়েছিল আমায় খুলে বল, আর কেঁদো না ভাই |'


শিবেশ কান্নাধরা গলায় -"পারিনি ভাই, পারিনি " এই কথাটাই বারবার বলতে লাগল | দুই চোখ দিয়ে বইতে লাগল করুণ অশ্রুধারা | আমি তৎক্ষণাৎ উঠে গিয়ে রান্নাঘর থেকে একগ্লাস জল এনে শিবাকে দিলাম | একঢোকে সমস্ত জল শেষ করে, নিজেই রান্নাঘরে গ্লাসটি রেখে এল | তারপর নিজেকে একটু সামলে আবার বলতে লাগল -

" তখন শ্রাবণ মাস | আমাদের গ্রামে সেইবার বন্যাও হয়েছিল | স্কুল ছুটি দিয়েছিল প্রায় একমাস | চাষের জমি নষ্টও হয়েছিল অনেক | অনেকে না খেতে পেয়ে শেষে মারা গিয়েছিল | পুরো দুই সপ্তাহ ধরে চলেছিল ঐ সর্বনেশে বৃষ্টি | দুই সপ্তাহ কেটে যাবার পর, জলও যখন নেমে গিয়েছিল, আমরা খানিক সোয়াস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলাম | কিন্তু, তারপর আর এক বিপদের আভাস পেতে শুরু করেছিল আমাদের দুমরাও গ্রাম | কয়েক চাষী গত কয়েকদিনেই সাপের কামড়ে মারা যেতে শুরু করেছিল | আস্তে আস্তে মৃতের সংখ্যা বাড়তে লাগল | যেন মহামারী লেগেছে | এক এক সপ্তাহে প্রায় ত্রিশ জন করে মারা যাচ্ছিল সাপের কামড়ে | কি সাপ কামড়াচ্ছে, কিসের উপদ্রবে গ্রামের এই অবস্থা হচ্ছে, তা কেউ বলতে পারছিল না | মরছে, কিন্তু সাপের কামড়েই | ডাক্তার, কবিরাজি ওষুধ, টোটকা, সব দিচ্ছে, কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না | এমনকি কিছুজন বডি কলকাতাতেও পাঠিয়েছিল, পোস্ট মর্টেমের জন্য, কলকাতার মত বড় শহরের ডাক্তাররা যদি কিছু বের করতে পারেন, এই ভেবে ; কিন্তু পোস্ট মর্টেমেও কিছু সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেল না | কখনও এই সাপ, কখনও ঐ সাপ, এই করে সবাই নিজেদের অক্ষমতা ঢাকতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল | অনেকে ওষুধ পেয়ে মারা যাচ্ছিল, তো আবার অনেকে ওষুধ পাবার অনেক আগেই | "


শিবা একটু থামল |খানিক থেমে, আবার বলতে আরম্ভ করল - " সেবার পঞ্চায়েত থেকে এক সভা বসল | সভায় স্থির হল, গ্রামের যে সকল চাষী, ধনী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ আছে, তারা তাদের বাড়ির দরজা, জানালা, রাতে ভালো করে বন্ধ করে শোবে | পুকুর, খাল-বিল যে সকল স্থানে জল জমে, সেই সকল স্থান ভালোভাবে পরিষ্কার রাখতে হবে |


আমাদের বাড়িটা পাকা ছিল না, মাটির ছিল | তবে ছোট নয়, বেশ বড় | আমাদের অবস্থা তো খুব একটা খারাপ ছিল না! একটা বারান্দা ছিল, বাড়ির পিছন দিকটাতে বড় বাগান ছিল!

আমি শিবাকে হাত নেড়ে থামালাম | বললাম - ' দাঁড়াও, দাঁড়াও, ছিল বলছ কেন? এখন কি নেই?'

-' না, এখন আর নেই ' বলে শিবা বাইরে চলে গেল |



        

                   ৬



প্রায় একঘন্টা কেটে গেল | ঘড়িতে, বারোটা বেজে দশ | জানালা দিয়ে দেখলাম, বৃষ্টি থেমেছে | বাইরেটা কেমন যেন থমথমে | মৃদু ঠান্ডা বাতাসে শরীর, মন সব যেন জুড়িয়ে যায় | ঘুমানোর চেষ্টা করলাম বটে, কিন্তু কেন জানি, ঘুম এল না! নতুন জায়গা বলে হয়ত!


দেখলাম, শিবাও জেগে রয়েছে | ওকে বললাম, ' ঘুম যে আসছে না ভাই, বাকিটা বল | '


শিবা, আবার বলতে লাগল - " সময় বেশি দূর নিয়ে যায় নি | বৃষ্টি থামবার প্রায় কুড়ি দিন পর, যখন গাঁয়ের স্বাভাবিক জনজীবন ভয়ের সাথে মানিয়ে নিতে সক্ষম হয়, ঠিক তখনই আমাদের পরিবারে আসে এক ভয়ঙ্কর বিপদ | তুমি আগে থাকতেই জানো যে বর্তমানে আমার পরিবারে বাবা ছাড়াও এবং আরও একজন সদস্য আছে | আমার একমাত্র ছোট বোন | বোন এখন কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে, ভাবতে পারো, সেই পুচকি, এখন কলেজে উঠে গেছে! যাইহোক, সেইদিনের কথায় আসি | সেইদিনটা ছিল সম্ভবত রবিবার | ও! আগে থাকতেই বলে রাখি, আমার বাবা তখন চোখে কম দেখতে শুরু করেন | চোখের জন্য চিকিৎসাও চলছিল | এমন সময় সেইদিন অন্য দিনগুলোর মতই আমি ও বাবা একটা ঘরে শুয়েছি | মা ও বোন একটি ঘরে আর দাদু অন্য আর এক ঘরে শুয়েছেন | ঘড়িতে যখন প্রায় রাত তিনটে, তখনই বাবার ছটফটানিতে আমার ঘুম ভেঙে যায় | বাবা উঠে বসেছেন | প্রশ্ন করলাম - এত রাত্রে আবার কি হল?


ঘর অন্ধকার ; তাই বাবার মুখ দেখতে পেলাম না | বাবা, আমাকে উঠে আলো জ্বালাতে বললেন | আমি উঠে সুইচ দিলাম | কিন্তু জানি না কেন, আলো জ্বলল না | হয়ত, লোডশেডিং!


এমন সময়, শুনলাম এক বীভৎস চিৎকার | গলাটা চেনা! গলাটা, আমার বোনের |বাবা ও আমি হুড়মুড় করে ছুটে গেলাম পাশের ঘরে | বাবা বললেন, 'শিবা একটা লম্ফ জ্বেলে নিয়ে আয় |' আমি তৎক্ষণাৎ রান্নাঘরে ছুটলাম লম্ফ আনতে | লম্ফ জ্বালিয়ে মায়ের ঘরে ছুটে এলাম, আর ঠিক তখনই দেখলাম এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য........."


শিবেশের গলা যেন শুকিয়ে গেছে | ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম ঠোঁটটাও শুকিয়ে গেছে |শিবা ফোঁপানো কান্নায় ভেঙে পড়ল | বড়বড় শ্বাস নিচ্ছে, কতকটা গোঙানির মত শব্দও বের করল | আমি তো ভয় পেয়ে গেছি | উঠে সঙ্গে সঙ্গে ওকে এক গ্লাস জল এনে দিলাম | ও আমার হাত থেকে তাড়াতাড়ি গ্লাসটি নিয়ে একঢোকে সব জল খেয়ে আমার হাতে গ্লাসটা ধরিয়ে দিল | তারপর ধড়পড় করে উঠে বাথরুমে ঢুকে গেল |




                    ৭


সকাল হয়েছে | শিবা ও আমার, দুজনের কারোর ভালো ঘুম হয় নি | শিবার অফিস আছে | কিন্তু, ওর শরীরের অবস্থা দেখে, আমিই যেতে বারণ করলাম |


ব্রেকফাস্ট শেষ করে দুজনে একটু বসলাম | ওকে বললাম, ' বাকিটা বল শিবেশ | পুরোটা না শুনে আমি এখান থেকে উঠছি না | '

- " ঐ তো দেখলাম, আমাদের ঠিক সামনে, খাটের উপর একটি বড় সাপ, ফণা তুলে আছে! বোন, ভয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে গেছে | কিন্তু, মায়ের দিকে চোখ পড়তেই, মুহূর্তের মধ্যে আমার হাত পা, সব ঠান্ডা হয়ে গেল! যেন কোনো এক বিপদ আচমকাই হাতছানি দিয়ে আমায় ডাকছে! মাকে হাত দিয়ে ডাকলাম, কোনো সাড়া নেই, কেমন যেন নিথর! তখনও কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না, যদি সাপটা কিছু করে বসে! আশ্চর্যের বিষয়, কি সাপ তা দেখেও বুঝে উঠতে পারছিলাম না | দেখতে খানিকটা শঙ্খচূড়ের মত হলেও ঠিক শঙ্খচূড় নয়, কেমন যেন অন্য প্রজাতির | গ্রামে জন্ম, সাপ অনেক দেখেছি, মাঠে, খাল-বলে, কিন্তু এরকম আগে কখনও দেখি নি ; আর সত্যি বলতে নতুন প্রজাতির সাপ দেখে আনন্দ পাবার মত মানসিক অবস্থাও তখন নেই | কতক্ষণ সময় ঐভাবেই কেটে যাচ্ছে, সেই খেয়ালও নেই | এমন সময়, বাবার দিকে চোখ পড়তেই, আঁতকে উঠলাম! বাবা, কোথা থেকে একটা বড় লাঠি জোগাড় করেছেন | কি সর্বনাশ! বাবার চোখের দিকে চোখ পড়তেই, বাবাকে ইশারায় তাঁকে থামতে বললাম | বাবা আস্তে আস্তে পা টিপে টিপে আমার দিকে আসতে আসতে যখন একেবারে আমার গা ঘেঁষে দাঁড়ালেন, আমি বাবার হাত থেকে লাঠিটা কেড়ে নিলাম | সাপটা কেমন যেন ঘোরে আছে | নেশাগ্রস্ত মাতালের মত কেমন যেন অসাড় | তার সম্মোহনী দৃষ্টি আমাকেও যেন সম্মোহিত করে তুলল! 'হিপনোটিজম্' শব্দের অস্তিত্ব তখন বেশ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম!


প্রায় পাঁচ মিনিট স্থির অবস্থায় থাকার পর, সহ্যের সীমা যখন অতিক্রম করল, সাপটিকে লক্ষ্য করে দিলাম এক লাঠির বাড়ি! সাপটি যেন হেলে উঠল! এক ঘা, দুই ঘা, করে পাঁচবারের মত যখন মারতে যাব, ঠিক তখনই বোনের হাত থেকে লম্ফটা মাটিতে পড়ে গেল! মুহূর্তের মধ্যে এক ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে গেল! যাকে বলে সর্বনাশ! সেই সময় যে দৃশ্যের সাক্ষী আমি হয়েছি, সেই দৃশ্য আজও আমার স্বপ্নে বাস্তব রূপ ধারণ করে প্রতিদিন! ক্ষনিকের মধ্যে লম্ফ থেকে আগত অগ্নিরেখা এক ছোঁয়াচে রোগের মত ছড়িয়ে যেতে লাগল ঘরের চারিদিকে! সমস্ত দিকে অগ্নিশিখা পর্বতের মত মাথা উঁচু করে আমাদের ঘিরে তান্ডব নৃত্য শুরু করে দিল! প্রথমে চাদর, তারপর জানালার পর্দা, ঘরের আলনায় রাখা সমস্ত জামা কাপড়, এবং সব শেষে বিছানার চাদরে আগুনের লেলিহান শিখার আঁচড় পড়তে এক মিনিট সময়ও বাকি রইল না!


সৌভাগ্যের বিষয় এই যে, ততক্ষণে বাবা, মাকে কোলে তুলে নিয়ে বাইরে চলে গেছেন! বোন আগেই ছুটে পালিয়েছে! কিন্তু আমি, নিয়ন্ত্রণহীন এক ছায়ার মত ধীরে ধীরে এক পা, দুই পা করে বাড়ির বাইরে চলে এসেছি! এমন সময় পর্দায় ধরা আগুন আমার প্যান্টে ধরে যাওয়ায় একপ্রকার পাগলের মত দৌড় লাগানোর পর, পা পিছলে পড়লাম, আমাদের ছোট্ট পানক্ষেতে! আমার মাথাটা একটা কিছুতে আঘাত লাগার পর আমি জ্ঞান হারালাম!


  


                    ৮



জ্ঞান ফিরতে যখন চোখ খুললাম, মা, বাবা আর বোনের জন্য চিন্তায় মাথাটা যেন যন্ত্রনায় ফেটে পড়বার উপক্রম হল | গ্রামের প্রতিবেশীরা আমার চোখে, মুখে জলের ছিটা দিল | জলের একটা গ্লাস আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে আমায় সান্ত্বনা দিতে লাগল! কিসের সান্ত্বনা যে তারা আমায় দিচ্ছে তা বুঝবার আগেই, আমি জলের গ্লাস রেখে দিয়ে ছুটলাম আমাদের গ্রামের স্থানীয় সরকারি হাসপাতালে! পৌঁছে দেখলাম, গেটের সামনে মা, বাবার কোলে শুয়ে আছেন! আর বাবা, অঝোরে, অসহায়ের মত কাঁদছেন! বোন পাশে বসে আছে মায়ের পা ধরে! আমি ছুটে গেলাম! হাঁটু গেড়ে বসে মায়ের গায়ে যখন হাত রাখলাম, বুঝলাম, সব শেষ! ঠান্ডা, নিথর দেহে আর প্রাণ নেই!


ডাক্তার নাকি মায়ের মৃত্যুর কারণ বলে দিয়েছিলেন, হার্ট অ্যাটাক! কি হাস্যকর, বুঝলে সুভাষ, কি হাস্যকর! সাপের কামড়ে মৃত্যু হল, আর ডাক্তার বলছে হার্ট অ্যাটাক! আমার মাথার ঠিক ছিল না, ইচ্ছে হল ডাক্তারের মাথায় একটা থান ইঁটের বাড়ি দিয়ে ডাক্তারকে মেরে ফেলি, কিন্তু হাজার হোক তিনি পেশায় ডাক্তার তো, কত প্রাণ তাঁর হাতে, এই ভেবে নিজেকে সামলে নিলাম!


সৎকার শেষে যখন বাড়ি ফিরলাম, বাড়ির অবস্থা দেখে মনে হল, এ তো বাড়ি বলতে কিছুই নাই, পোড়ো বাড়ি যেমন হয়, মাটির দেওয়াল ভেঙে পড়েছে, মাথার ছাদ বলে আর আর কিছুই নেই! আমরা এখন থাকব কোথায় ? "


শিবেশের চোখে এখন জল, গলা যেন বুজে এসেছে | ও একটু থামল | আমি কৌতূহল যেন আর চেপে রাখতে পারছিলাম না | শিবেশকে জিগ্যেস করলাম - 'কিন্তু শিবেশ, এই প্রেসক্রিপশন টা কিসের? তুমি যে বললে তোমায় সাপে কামড়েছিল!'


কান্নাচাপা গলায় শিবেশ আবার বলতে শুরু করল - " মায়ের শ্রাদ্ধ-শান্তির কাজ পর্যন্ত আমরা এক প্রতিবেশীর বাড়িতেই ছিলাম | তেরো দিন পর সব মিটে যাবার পর, আমরা ঠিক করি এখান থেকে অনেক দূরে চলে যাব | এই সকল স্মৃতি আমাদের কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল | আমাদের গ্রাম থেকে ঠিক বাইশ কিলোমিটার দূরে বক্সার গ্রামে আমার বাবার বন্ধুর বাড়ি, তিনিই আমাদের থাকার জন্যে তাঁদেরই বাড়ির একটি বড় ঘরে আমাদের ভাড়াটে রূপে থাকতে দেন | বাবার বন্ধু বলে ভাড়া অতি সামান্য হলেও, বাবার তো কোনো কাজ ছিল না, চাষের জমি আমাদের দুমরাও গ্রামে, এখান থেকে বাইশ কিলোমিটার পথ গিয়ে তবে চাষ করে, চাষের ফসল বিক্রি করে ঐ ভাড়ার টাকা উপার্জন করা, তার সাথে সংসার চালানো তাঁর একার পক্ষে আর সম্ভব ছিল না | তাই আমি বাবাকে বললাম, আমি কলকাতা চলে যাই, অন্তত আমার খাবার খরচাটা তাঁর বাঁচবে | আমি কোনো দোকানে ঠিক কাজ খুঁজে নেবো, আর মাসে মাসে টাকা পাঠাবো | 


আমি কলকাতা চলে এলাম | কলকাতায় সামান্য ভাড়ায় একটা বাড়ি পেয়ে গেলাম | হয়ত, বাড়ির মালিকের আমায় দেখে করুণা হয়েছিল | তারপর একটা তেলেভাজা দোকানে কাজ খুঁজলাম | একবছর পর, যখন পরিস্থিতি একটু ঠিক হল, আমি কলকাতার একটা স্কুলে ভর্তি হলাম | হাজার হোক, পড়াশোনা করার ইচ্ছে ছিল তো | বোনের পড়াশোনার খরচা, নিজের ভাড়া বাড়ির টাকা, নিজের পড়াশোনার খরচা ও খাওয়া খরচা বাদ দিয়ে যা বাঁচতো তার পুরোটাই বাবাকে পাঠিয়ে দিতাম | কিছুদিন এভাবে চলার পর খবর পেলাম বাবা আমাদের চাষের জমি বিক্রি করে দিয়েছেন | আর সেই টাকায় একটা মাটির বাড়ি তৈরী করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন | জমি বিক্রির কথা শুনে কষ্ট হলেও আনন্দিত হয়েছিলাম বাড়ি তৈরীর কথা শুনে | "


শিবার মুখে এখন হাসির রেখা | আবার সে বলতে লাগল |

-" এবার তোমার প্রশ্নের উত্তরে আসি, শ্রাদ্ধের দিন, সকাল থেকে সব ঠিকই চলছিল | কিন্তু বিপদ আমাদের তখনও পিছু ছাড়ে নি! আমি সেদিন একটা দোকানে বেরিয়েছিলাম শ্রাদ্ধের ফর্দ নিয়ে | আমি ছিলাম একা | সব কিনে নিয়ে ফিরব বলে জাগরথ ক্লাবের পথ ধরে চলেছি, এই পথটা একটু শর্টকার্ট | সময়, তখন বেলা বারোটার কাছাকাছি হবে | কারণ সূর্য আমার ঠিক মাথার উপর | ভারি ব্যাগ নিয়ে নিজের মনেই হাঁটছি, এমন সময় এক অতিলৌকিক দৃশ্যে আমার পা দুটো ওখানেই আটকে গেল | দেখলাম, সরু সবুজ রঙের একটি শঙ্খচূড় ফণা তুলে দাঁড়িয়ে আছে | সাপের সারা গা আগুনে পুড়ে ঝলসে গেছে | একটা বীভৎস গন্ধে হাতের ব্যাগ মাটিতে রেখে আমি আগে আমার নাক টিপে ধরলাম | বুঝলাম, এইটা সেই সাপ যে আমার মাকে কামড়েছিল |


বাবার একটা কথা তৎক্ষণাৎ মনে পড়ে গেল - সাপেদের স্মৃতিশক্তি খুব তীক্ষ্ণ | একবার ওরা যাদের মনে রাখে, যদি বেঁচে থাকে, জীবনের শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত তাদের মনে রাখে | বুঝলাম, এই সাপ সেদিনের অগ্নিকান্ডে মরে নি! আগুন লাগার পর, সাপের কথা সেদিন বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম | লাঠির চার ঘা সত্ত্বেও, সে মরে নি | আগুনের হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য, সে পালিয়েছিল |


ফণা তুলে মুখ উঁচিয়ে আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে সে | আমার কেন জানি তখন বেশ রাগ হল | ভয়ের বদলে রাগের কারণ যে কি, তা আজও বুঝতে পারি না | কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করেই - 'দাঁড়া, দেখাচ্ছি তোর মজা' বলে পিছন ফিরেছি লাঠি আনার জন্য, আর ঠিক তখনই আলোর গতিতে ছুটে এসে সাপটা আমার পায়ে দিল ছোবল, একবার নয় দুইবার | শেষের বারের টা অবশ্য আমার পায়ে নয়, হাতে | পায়ের ছোবল মারার সাথে সাথেই যন্ত্রনায় হাতদুটো চলে যায় পায়ের কাছে, আর ঠিক তখনই, হাতেও বসিয়ে দেয় ঐ তীক্ষ্ণ দাঁতের ছোবল | সঙ্গে সঙ্গে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই |


যখন জ্ঞান ফিরল, তখন আমি হাসপাতালে | কে কখন আমায় হাসপাতালে ভর্তি করেছিল, কিছুই জানি না | বাড়ি ফিরে মায়ের শ্রাদ্ধের কাজ মিটেছিল |"


- 'ছোবলের দাগ দুটো আছে এখনও?'


শিবা সঙ্গে সঙ্গে প্যান্ট টা উঠিয়ে, পা টা উঁচিয়ে আমাকে দেখাল | ডানপায়ের গোড়ালির কাছে দুটো কালশিটে পড়ে যাওয়া দাগ!


-'আর হাতে?'


শিবা ডান হাতটি আমার সামনে মেলে ধরল | দেখলাম, ডান হাতের কব্জির পাশে সেই এক দাগ | কালশিটে পড়ে যাওয়া শঙ্খচূড়ের দুই দাঁতের দাগ |







সমাপ্ত |



Rate this content
Log in