Manab Mondal

Abstract Action Inspirational

4  

Manab Mondal

Abstract Action Inspirational

বি বি বাগ

বি বি বাগ

8 mins
332


কলকাতা র বিবাদী বাগ,সরকারের কেন্দ্র, একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অঞ্চল ও প্রধান প্রধান ব্যাংকগুলির প্রধান কার্যালয় এই অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় আজও একে কলকাতার হৃদয় বলা হয়। কলকাতাবাসীদের কাছে এই অঞ্চলটি অবশ্য পরিচিত অফিসপাড়া নামে।বিবাদী বাগ  প্রাচীন দীঘি লালদিঘি কেন্দ্র করে এই স্কোয়ার বা বাগটি গড়ে ওঠে। কলকাতা মহানগরীর পত্তনপূর্ব যুগের ডিহি কলিকাতা গ্রামের কেন্দ্রে অবস্থিত এই অঞ্চলটি ইংরেজ আমলে হোয়াইট টাউন বা কলকাতার শ্বেতাঙ্গ পল্লির অন্তর্ভুক্ত ছিল।


ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড ডালহৌসির নামে মধ্য কলকাতার লালদিঘি সংলগ্ন প্রশাসনিক কেন্দ্রটি ডালহৌসি স্কোয়ার নামে অভিহিত হয়। ১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বর দীনেশ গুপ্ত, বিনয় বসু ও বাদল গুপ্ত নামে তিন অসমসাহসী বাঙ্গালী বিপ্লবী ইউরোপীয় পোষাকে সজ্জিত হয়ে রাইটার্স বিল্ডিং-এ প্রবেশ করে কর্নেল সিম্পসনকে গুলি করে হত্যা করেন। তারপর রাইটার্সের ব্রিটিশ পুলিশের সঙ্গে এই তিন বিপ্লবীর সংঘর্ষ বাধে। পুলিশ অফিসার টোয়াইনাম, প্রেন্টিস ও নেলসন আহত হন। গ্রেফতারি এড়াতে বাদল বসু ঘটনাস্থলেই পটাসিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন। কিন্তু বিনয় বসু ও দীনেশ গুপ্ত নিজেদের উপর গুলি চালিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। পরে হাসপাতালে ডাক্তারি ছাত্র বিনয় সকলের অলক্ষ্যে ক্ষতস্থানে আঙুল দিয়ে সেপটিক করে আত্মহত্যা করেন। দীনেশ অবশ্য সুস্থ হয়ে ওঠেন ও মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। তার ফাঁসি হয়। স্বাধীনতা পর কুখ্যাত লর্ড ডালহৌসির নামাঙ্কিত এই অঞ্চলটি তাই এই মহান বিপ্লবীত্রয়ের সম্মানার্থে উৎসর্গিত হয়। স্কোয়ারের নতুন নাম হয় বিনয়-বাদল-দীনেশ বাগ বা সংক্ষেপে বিবাদীবাগ। রাইটার্স বিল্ডিঙের দ্বিতলে এই বৈপ্লবিক আক্রমনেত স্মৃতিতে একটি ফলক রয়েছে।

সেইদিন লাড়াইএ দীনেশ কোনোরকমে এ চরম আঘাত থেকে বেঁচে ওঠেন।তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছিল এবং বিচারের রায় ছিল সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং খুনের জন্য ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যু। ১৯৩১ সালের ৭ই জুলাই আলীপুর জেলে ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করার সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৯ বছর।

কিশোর বয়সে দীনেশ বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্স (বিভি) নামে একটি গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠনের সদস্য হন।১৯২৮ সালে তিনি ঢাকা কলেজ থেকে আইএসসি পরীক্ষা দেন। ঢাকা কলেজে পড়ার সময় ১৯২৮ সালে দীনেশ 'ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস'-এর কলকাতা সেশনের প্রাক্কালে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস সংগঠিত 'বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সে যোগদান করেন। শীঘ্রই বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স একটি সক্রিয় বিপ্লবী সংগঠনে পরিবর্তিত হয় এবং কুখ্যাত ব্রিটিশ পুলিশ অফিসারদেরকে হত্যা/ নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পনা করে। স্থানীয় বিপ্লবীদের আগ্নেয়াস্ত্র চালনা শেখানোর জন্য দিনেশ গুপ্ত কিছু সময় মেদিনীপুরেও ছিলেন।তার প্রশিক্ষিত বিপ্লবীরা ডগলাস(Douglas), বার্জ(Burge) এবং পেডি(Peddy)--এই তিনজন জেলা ম্যাজিস্ট্রটকে পরপর হত্যা করেছিল।রাইটার্স ভবনে হামলা কথাতো সকলের জানা। 

বিনয় বসু প্রাথমিক শিক্ষা জীবন ঢাকাতেই শুরু করেন। তারপর তিনি মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা পাশ করার পর মিটফোর্ডমেডিকেল স্কুলে ভর্তি হন। বর্তমানে যার নাম স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ। বিনয় বসু তিনি তরুণ বয়সেই ঢাকার সুপরিচিত বিপ্লবী হেমচন্দ্র ঘোষের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন।

যুগান্তর পার্টির সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষাকারী একটি গুপ্ত সংগঠন মুক্তি সংঘ তে যোগদান করেছিলেন। এছাড়া বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের জন্য তার মেডিকেল শিক্ষা জীবন অল্প সময়ের মধ্যেই একেবারে শেষ হয়ে যায়।

বিনয় বসু কে আমরা স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন বিপ্লবী হিসেবে চিনি। আর সেই জন্যই ১৯২৮ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে সুভাষচন্দ্র বসু, মেজর সত্য গুপ্তের নেতৃত্বে বঙ্গীয় স্বেচ্ছাসেবী নামে একটি দল গঠন করেন। সেখানে সুভাষচন্দ্র নিজে এর জিওসি হয়েছিলেন।

বিনয় ও গ্রুপের অনুসারী তার আর কয়েকজন সহযোগী নতুন বিপ্লবী সংগঠনে যোগদান করেন। খুব তাড়াতাড়ি তিনি গ্রুপের একজন একনিষ্ট কর্মী হয়ে ওঠেন এবং ঢাকাতে বঙ্গীয় স্বেচ্ছাসেবী দলের আঞ্চলিক ইউনিট গঠন করেন।

এরপর বন্ধু ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন খুবই অল্প সময়ের মধ্যে একটি কার্যকর বিপ্লবী সংগঠনের পরিণত হয় এবং ২০ শতকের ৩০-এর দশকের প্রথম দিকে সংগঠনটি অপারেশন ফ্রিডম শুরু করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বাংলার বিভিন্ন কারাগারে পুলিশের অত্যাচারের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদ জানানোর জন্যই ঢাকার বঙ্গীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এই ভাবে, এই রূপ নেয়।


মেডিকেল স্কুলের ছাত্র অবস্থায় থাকাকালীন বিনয় বসুকে সংগঠন থেকে তাকে প্রথম শত্রুর উপর আঘাত করার জন্য অথবা আক্রমণ করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়।

১৯৩০ সালের আগস্ট মাসে বিনয় জানতে পারেন যে, পুলিশ ইন্সপেক্টর জেনারেল লম্যান মেডিকেল স্কুল হাসপাতালে ে একজন চিকিৎসাধীন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাকে দেখতে আসবেন।

১৯৩০ এর ২৯ শে আগস্ট বিনয় সাধারন বাঙালির পোশাক পরে সমস্ত পাহারা ভেদ করে হাসপাতালে ভিতরে প্রবেশ করেন এবং খুব কাছ থেকে লম্যান কে গুলি করেন ঘটনা স্থলেই লম্যানের মৃত্যু হয় এবং পুলিশের সুপারিনটেনডেন্ট হডসন মারাত্মকভাবে আহত হন।

পুলিশ তল্লাশি শুরু করে এবং বিনয়ের মাথার দাম পাঁচ হাজার টাকা ঘোষণা করা হয়। সুভাষ বোস এই সময় তাকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিতে চাইলে তিনি তা দৃঢ়তার সাথে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।এইসময় তিনি কলকাতার বিপ্লবী গিরিজা সেনের বাড়িতে আত্মগোপন করেছিলেন। এবং পর এখান থেকে লালবাড়ি হানা দেন।


বাদল গুপ্ত একজন বাঙ্গালি বিপ্লবী। তাঁর আসল নাম সুধীর গুপ্ত। ডাক নাম ছিল বাদল। বাদল গুপ্ত জন্মেছিলেন ১৯১২ সালে। ঢাকার বিক্রমপুর এলাকার পূর্ব শিমুলিয়া গ্রামে। যা বর্তমানে বাংলাদেশের মুন্সীগঞ্জ জেলার অন্তর্গত। তাঁর বাবার নাম অবনী গুপ্ত। 


বাদল গুপ্তের পড়াশুনার হাতেখড়ি পরিবারে বাবা-মার কাছে। তারপর প্রাথমিক পড়াশুনা শেষ হলে তাঁকে ভর্তি করানো হয় বানারিপাড়া স্কুলে। ছোটবেলা থেকেই বাদল গুপ্ত ছিলেন অসীম সাহসী ও দুরন্ত স্বভাবের। পড়াশুনার পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতিও তাঁর বেশ মনোযোগ ছিল। 


বাদল গুপ্ত বানারিপাড়া স্কুলে পড়াশুনার সময় সেখানকার শিক্ষক নিকুঞ্জ সেনের সংস্পর্শে আসেন। তাঁর সান্নিধ্যেই মূলত স্বদেশী রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয় বাদল গুপ্তের। বানারিপাড়া স্কুলের শিক্ষক নিকুঞ্জ সেন ছিলেন বিপ্লববাদী দলের সদস্য। এই শিক্ষকের মাধ্যমে খুব সম্ভবত নবম-দশম শ্রেণীতে পড়ার সময় তিনি বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্স (বিভি) নামে একটি গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠনের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন (বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের ঢাকা শাখা)। 


ব্রিটিশ নরপশুদের চরম শিক্ষা দেওয়ার জন্য সুভাষ চন্দ্র বসু তখন 'বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স' কে এ্যাকশনধর্মী বিপ্লবী প্লাটফর্মে রূপান্তর করেন। উদ্দেশ্য একটাই প্রতিশোধ নেয়া এবং ভারত থেকে ব্রিটিশদের উচ্ছেদ করা। পরিকল্পনা অনুযায়ী শুরু হয় ভলান্টিয়ার্সদের আগ্নেয়াস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ। এই প্রশিক্ষণ কর্মশালায় দীনেশ গুপ্ত ভলান্টিয়ার্সদের প্রশিক্ষণ দিতেন। এক পর্যায়ে সুভাষ চন্দ্র বসুর নেতৃত্বে এই ভলান্টিয়ার্স বিপ্লবীরা কুখ্যাত ব্রিটিশ পুলিশ অফিসারদেরকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ১৯২৯-৩০ সালের মধ্যে দীনেশ গুপ্তের প্রশিক্ষিত বিপ্লবীরা ডগলাস (Douglas), বার্জ (Burge) এবং পেডি (Paddy) কে হত্যা করে। এরা ছিল কুখ্যাত অত্যাচারী ব্রিটিশ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। বাংলার বিপ্লবীরা একের পর এক তাঁদের সহযোদ্ধাদের হত্যার প্রতিশোধ নিতে থাকে। 


১৯৩০ সালে আলিপুর জেলে এত বেশি বিপ্লবীদের ধরে এনে রাখা হয় যে জেলের মধ্যে সৃষ্টি হলো এক অরাজক ও অসহনীয় অবস্থা। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য রাজবন্দীরা ঐক্যবদ্ধ হন। তাঁরা নানা বিষয়ে প্রতিবাদ শুরু করেন। যা এক সময় বিক্ষোভে পরিণত হয়। রাজবন্দীরা জেলকোড অনুযায়ী বেশ কয়েকটি দাবিতে জেলের মধ্যে আন্দোলন শুরু করেন। এই আন্দোলন দমানোর জন্য ব্রিটিশ পুলিশ নির্মমভাবে লাঠিচার্জের উন্মত্ততায় মেতে উঠে। বিপ্লবীরাও নিজেদের বাঁচাতে প্রতিবাদ করেন। হঠাৎ জেলের পাগলা ঘন্টি বাজানো হল। সকল পুলিশ অস্ত্রহাতে রাজবন্দীদের উপর নির্মম-নিষ্ঠুর অত্যাচার শুরু করলো। সুভাষচন্দ্র বসু, যতীন্দ্রমোহন এবং সত্য বকসীরাও বাদ গেলেন না এই অত্যাচার থেকে। এই খবর ছড়িয়ে পড়ল জেলের ভিতরের সমস্ত ওয়ার্ডে। অবশেষে জানা গেল এই নির্মম-নিষ্ঠুর অত্যাচারের পিছনে রয়েছে ইন্সপেক্টর জেনারেল কর্নেল এনএস সিম্পসন । যিনি পূর্বেও বন্দী বিপ্লবীদের উপর অমানুষিক অত্যাচার চালাতেন।


জেলের বাইরের ভলান্টিয়ার্সের বিপ্লবীরা প্রস্তুতি নিলেন অত্যাচারী সিম্পসনকে উচিৎ শিক্ষা দেওয়ার জন্য।ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে কাঁপিয়ে দিতে হবে, বুঝিয়ে দিতে হবে এই দেশমাতৃকা আমাদের।


বিপ্লবীরা জেলের কুখ্যাত ইন্সপেক্টর জেনারেল কর্নেল এনএস সিম্পসনকে টার্গেট করলেন। তৎকালীন সময়ে কলকাতার ডালহৌসি স্কোয়ারে অবস্থিত ছিল ব্রিটিশ শাসকদের সচিবালয়। যার নাম রাখা হয়েছিল 'রাইটার্স ভবন'। এই ভবনেই উচ্চপদস্থ ব্রিটিশ আমলারা নিয়মিত অফিস করতেন।


বিপ্লবীদের পরবর্তী অভিযান ছিল কলকাতার 'রাইটার্স বিল্ডিং' আক্রমণ। অসংখ্য পুলিশ প্রহরী পরিবেষ্টিত দুর্ভেদ্য অফিস 'রাইটার্স বিল্ডিং'। এই ভবন আক্রমণ করে সেখান হতে ফেরার আশা কেউ করতে পারে না। বিপ্লবী নেতৃবৃন্দের মধ্যে আলোচনা চলল কে এই আক্রমণ পরিচালনা করবেন? এই দুঃসাহসী অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব নিলেন বাদল গুপ্ত, দীনেশ গুপ্ত ও বিনয় বসু। কিশোর বয়স থেকেই বিনয় বসু, দীনেশ গুপ্ত ও বাদল গুপ্ত পরস্পর পরিচিত ছিলেন। তিনজনই ছিলেন পূর্ববাংলার (ঢাকার) সন্তান। কৈশোরকাল থেকে তিনজন দেশপ্রেমের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশমাতার মুক্তিযজ্ঞে নিজেদেরকে নিয়োজিত করেন। ঘটনাচক্রে এই তিন বন্ধুই একসঙ্গে 'রাইটার্স বিল্ডিং' আক্রমণের দায়িত্ব নেন।


১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বর সকাল। সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন। খুব গোপনীয়ভাবে এবং সতর্ক অবস্থায় অস্ত্র প্রশিক্ষণের কাজও সমাপ্ত হল। বিনয়-বাদল-দীনেশ ভলান্টিয়ার্সের বিপ্লবী নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা করে বিদায় নিলেন। ৮ ডিসেম্বর দুপুর ১২ টা, এ্যাকশনের জন্য তিন বিপ্লবী প্রস্তুত। 'রাইটার্স বিল্ডিং' এর একটি কক্ষে কারা বিভাগের সর্বময় কর্তা ইনপেক্টর জেনারেল কর্নেল সিম্পসন তার নিয়মিত কাজকর্ম পরিচালনা করছেন। তার ব্যক্তিগত সহকারী জ্ঞান গুহ পাশে দাঁড়িয়ে কি বিষয়ে যেন আলোচনা করছেন। ঠিক এমন সময় সামরিক পোশাক পরে তিনজন বাঙালী যুবক রাইটার্স বিল্ডিংয়ে প্রবেশ করলেন। প্রহরীকে বললেন, তাঁরা কর্নেল সিম্পসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান।


তাঁরা সিম্পসনের ব্যক্তিগত সহকারীকে ঠেলে কামরার ভিতরে প্রবেশ করেন। হঠাৎ পদধ্বনী শুনে কর্নেল তাঁদের দিকে তাকান। বিস্ময়-বিমূঢ় চিত্তে দেখতে পান সম্মুখে মিলিটারী পোশাক পরে তিনজন বাঙালী যুবক রিভলবার হাতে দণ্ডায়মান। মুহূর্তের মধ্যে বিনয়ের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় "প্রে টু গড কর্নেল। ইওর লাষ্ট আওয়ার ইজ কামিং।" কথাগুলি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে তিনটি রিভলবার হতে ছয়টি গুলি সিম্পসনের দেহ ভেদ করে। সিম্পসন লুটিয়ে পড়ে মেঝের উপর। এরপরই গুলির আঘাতে আহত হন জুডিসিয়েল সেক্রেটারী মি. নেলসন। এলোপাথাড়ি গুলি বর্ষণ করতে করতে আততায়ীরা পরবর্তী লক্ষ্য হোম সেক্রেটারী আলবিয়ান মারের কক্ষের দিকে অগ্রসর হন। ততক্ষণে এই আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য ছুটে আসেন পুলিশ- ইন্সপেক্টর জেনারেল মি. ক্র্যাগ ও সহকারী ইন্সপেক্টর জেনারেল মি. জোনস। তাঁরা কয়েক রাউণ্ড গুলিও ছোঁড়েন। কিন্তু বিনয়- বাদল-দীনেশের বেপরোয়া গুলির মুখে তাঁরা দাঁড়াতে পারলেন না। প্রাণ নিয়ে পালালেন। সমস্ত 'রাইটার্স বিল্ডিং' জুড়ে তখন এক বিভীষিকাময় রাজত্ব। চারিদিকে শুধু ছুটাছুটি। কে কোন দিকে পালাবে খুঁজে পায় না। কলরব-কোলাহল- চিৎকার। শুধু এক রব 'বাঁচতে চাও তো পালাও'। 'রাইটার্স বিল্ডিং' আক্রমণের সংবাদ পেয়ে পুলিশ কমিশনার টেগার্ট আসেন। ডেপুটি কমিশনার গার্ডন আসেন সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে। জুডিসিয়েল সেক্রেটারী মি. নেলসন, মি. টয়নয় প্রমুখ অনেক ইংরেজ রাজপুরুষ আহত হলেন। আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য ডেকে আনা হল গুর্খা বাহিনীকেও।


একদিকে তিনজন বাঙালী তরুণ, হাতে শুধু তিনটি রিভলবার। আর অপরদিকে রাইফেলধারী সুশিক্ষিত গুর্খাবাহিনী। আরম্ভ হল 'অলিন্দ যুদ্ধ'। ইংরেজ মুখপত্র 'স্টেটসম্যান' পত্রিকার ভাষায় 'বারান্দা বেটল'। 

দীনেশের পিঠে একটি গুলি বিদ্ধ হল। তিনি তাতে ভ্রুক্ষেপও করলেন না। অসংকোচে গুলিবর্ষণ করতে লাগলেন শত্রুকে লক্ষ্য করে। যতক্ষণ পর্যন্ত বিনয়-বাদল- দিনেশের হাতে গুলি ছিল, ততক্ষণ কেউ তাঁদের আক্রমণ করে প্রতিহত করতে পারেননি। একপর্যায়ে তাঁদের গুলি নিঃশেষ হল। গুর্খা ফৌজ অনবরত গুলিবর্ষণ করে চলল। তখন তিনজন বিপ্লবী একটি শূন্য কক্ষে প্রবেশ করে সঙ্গে আনা 'সায়নাইড'- বিষের পুরিয়াগুলি মুখে দিলেন। বিষক্রিয়ায় অতি দ্রুত জীবনপ্রদীপ নিবে না যাওয়ার আশংকায় এবং মৃত্যুকে নিশ্চিত করার জন্য প্রত্যেকেই নিজ নিজ ললাট লক্ষ্য করে রিভলবারে রাখা শেষ গুলিটি ছুঁড়ে দিলেন। বাদল তৎক্ষণাৎ মৃত্যুবরণ করেন। বিনয় ও দীনেশ সাংঘাতিক আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মেঝের উপর পড়ে রইলেন।,


বিনয় ছিলেন মেডিকেল স্কুলের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। তিনি জানতেন মৃত্যুর পথ। হাসপাতালে থাকা অবস্থায় তিনি ১৪ ডিসেম্বর রাতে আকাঙ্খিত মৃত্যুকে বরণ করার জন্য মস্তিষ্কের ব্যাণ্ডেজের ভিতর অঙ্গুল ঢুকিয়ে স্বীয় মস্তিষ্ক বের করে আনেন এবং মৃত্যুকে বরণ করে নেন। আর বেঁচে যাওয়ায়১৯৩১ সালের ৭ জুলাই দীনেশের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।


ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে বিনয়-বাদল-দীনেশের নামানুসারে কলকাতার ডালহৌসি স্কয়ারের নাম পাল্টে রাখা হয় বি-বা-দী বাগ। অর্থাৎ বিনয়-বাদল-দীনেশ বাগ।


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Abstract