Debdutta Banerjee

Thriller Drama Action


1.9  

Debdutta Banerjee

Thriller Drama Action


মন্দিরের সেই গুপ্তধন

মন্দিরের সেই গুপ্তধন

16 mins 1.3K 16 mins 1.3K

(১)


ধৌলাধরের উপর পড়েছে সূর্যের অন্তিম রশ্নিছটা। এক সুন্দর রঙের খেলা শুরু হয়েছে শ্বেত শুভ্র চুড়া গুলোর বুকে। সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্বপ্নিল। শেষ ছয়দিন এই কাংরা ফোর্টের প্রতিটা অংশ চষে ফেলেছে ওরা দুজন। কিন্তু যার জন্য এত দূর ছুটে আসা তার কোনো সূত্র নেই কোথাও। তবে কি স্বপ্নিল কিছু ভুল করল!! ফোর্টের একদম ওপরে উঠে এসে একটা বাঁধানো গাছের ছায়ায় বসে স্বপ্নিল। মোবাইলটা বের করে ইমেজে যায়। সেভ করা ছবি গুলোতে হাত বোলায়।


বড় ঠাকুরের ডাইরিটা কাকতালীয় ভাবেই ওর হাতে এসেছিল। বড় ঠাকুর অর্থাৎ বংশের উত্তর পুরুষ অর্থাৎ ওর দাদুর দাদু শ্রী নন্দন উপাধ্যা য়। ঝুরঝুরে উইয়ে কাটা হলদে খাতাটার ফটো তুলে নিয়েছিল ও মোবাইলে। পাতা উল্টালেই গুড়ো হয়ে ঝরে পড়ছিল খাতাটা। পুরোটা পড়েই সুদূর কলকাতা থেকে কাংরা ছুটে এসেছিল ও বন্ধুকে নিয়ে।


ঋক এতক্ষণ ফটো তুলছিল। এবার এসে ওর পাশে বসে। বলে -''এত বছর পর আর কি সেসব পাওয়ার আশা আছে? সব তো বদলে গেছে। ''


ওর ঝুলে পড়া মুখ দেখে ঋক বলে -''তবে ঘোরাটা খারাপ হল না । পালামপুরটা ঘুরে ধরমশালা হয়ে বাড়ি ফিরি চল। ''


-''তুই ফিরে যা , আমি আশেপাশে আরেকটু দেখবো। '' স্বপ্নিল বলে ওঠে।


দুর্গের ঠিক ওপর থেকে দূরবীন দিয়ে দু জন স্বপ্নিলদেরকে অনেকক্ষণ লক্ষ্য করছিল। ওরা বসে পড়ার পর একজন ওদের দিকে এগিয়ে আসে ।


ওদের পাশে বসে বলল -''মিলা কুছ?''


অপরিচিত আগন্তুক কে দেখে একটু চমকেছিল স্বপ্নিল। বলল -''ক্যায়া? কি? ''


লোকটা ওর দিকে তাকিয়ে একটু হাসে। তারপর বলে -''এক হপ্তা সে আপ ক্যায়া ঢুন্ড রাহে হো স্যারজি ওহি পুঁছ রহা হু। ''


স্বপ্নিল নিজেকে সামলে নেয়। এ প্রশ্ন যে উঠবে ও জানত। ছোট্ট জায়গা, তেমন টুরিস্ট ও নেই এই আগস্ট মাসে। অথচ ওরা রোজ আসছে। প্রথম দু দিন অডিও গাইড নিয়েছিল ওরা। তারপর এক বুড়ো গাইডকে নিয়েও ঘুরেছিল দু দিন। এখন দুর্গের ওলিগলি সব ওদের চেনা হয়ে গেছে বলে দু দিন ধরে নিজেরাই ঘুরছে।


সবাই কে যা বলেছিল একেও তাই বলল, ওরা একটা মুভি বানাবে এই ফোর্টের ওপর, তাই ঘুরে ঘুরে দেখছে। লোকটা একটা বিচ্ছিরি আওয়াজ করে হাসে, গুটকা খাওয়া লাল দাঁত গুলো দেখে গা টা ঘিনঘিন করে ওঠে স্বপ্নিলের। লোকটা বলে -''হাম ছোকুলাল । কোই কাম হ্যায় তো বলো স্যারজি। হো জায়গা। ''


স্বপ্নিল বলে -''দেখছি, কাজ শুরু হোক আগে!!''


লোকটা বলে -''ফোর্ট তো আপনে দেখ লিয়া, খাজানা কা কুছ কাহানী শুনা?''


দুজনেই চমকে ওঠে।


ঋক বলে -''কোনসা খাজানা?''


-''আরে স্যারজি, ইস ফোর্ট মে বহুত খাজানা থা, ইতনা বার লুঠ হুয়া, ফির ভি বহুত খাজানা ছুপা হুয়া হ্যায় সবকো পাতা হ্যায়। আপনে গোল তলাব দেখা? উধার ভি খাজানা হ্যায় সব মানতা হ্যায়। ''


স্বপ্নিল তলাব মানে পুকুর জানে। বড় ঠাকুর ও জলের কথা উল্লেখ করেছেন দু বার। তাই নড়েচড়ে বসে। বলে -''ও তো নেহি শুনা। ''


-''ইস ফোর্ট কে পিছে এক বড়া তালাব হ্যা্য়, চলিয়ে, আপকো দিখাতে হ্যায়। কহতে হ্যায় উসমে ছুপা হ্যায় বহুত বড়া খাজানা। বহুত লোগ ঢুন্ডা, লেকিন নেহি মিলা।''


লোকটা উঠে পড়ে।


ঋক বলে -''কিধার হ্যায় ও তালাব?''


-''আইয়ে সাব, দিখাতে হ্যায়। ''


দুর্গের শেষ মাথায় দেওয়ালের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে বনের পথ ধরে ছোকুলাল। বলে আগে এদিকটাও দুর্গের ভেতরেই ছিল। ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে গেছিল এদিকটা। আর সংস্কার হয়নি। আদিম অরণ্যে, কাঁটা গাছ, শুকনো পাতা মারিয়ে একটা পায়ে চলা পথ ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে চলেছে। সে পথে এগিয়ে চলে ওরা তিন জন। একবার স্বপ্নিল ভাবে এভাবে যাওয়া কি ঠিক হচ্ছে!! অচেনা লোকটা খুব একটা সুবিধার নয়। আবার মনে হয় এই খুঁজতেই তো ও ছুটে এসেছে এই দুর্গে।


ছোট বেলা থেকে বড় ঠাকুরের গল্প শুনেই বড় হয়েছে ওরা সব ভাই বোন। উনি ছিলেন একজন স্বাধীনতা সংগ্ৰামী। সশস্ত্র বিপ্লবে অংশ নিয়ে এই কাংরা ফোর্টে বন্দী ছিলেন বহুদিন। ১৯০৫ সালে হিমাচলে এক ভয়াল ভূমিকম্প হয়, সে সময় ওনারা কয়েকজন বিপ্লবী জেল থেকে পালিয়ে যান। এই দিনপঞ্জি সেই সময় লেখা।


উইয়ে কাটা হলদে হয়ে যাওয়া খাতাটা স্বপ্নিল হঠাৎ খুঁজে পেয়েছিল ওদের এলাহাবাদের পুরানো বাড়িতে। বড় দাদু মারা যান ১৯২৪ সালে। শেষ কয়েকটা দিন বাড়ি এসেছিলেন মা কে দেখতে। সে সময় বোধহয় এই দিনপঞ্জি লুকিয়ে রেখে গেছিলেন বাড়ির চিলেকোঠায়। দেশ ভাগের পর স্বপ্নিলের দাদু চাকরী নিয়ে কলকাতা চলে গেছিল। ছোট দাদু একাই থাকতেন এলাহাবাদে। স্বপ্নিলের বাবার জন্ম কলকাতায়। ছুটিছাটায় আসতেন ওনারা এলাহাবাদে। শরীকী বাড়িতে বড় করে দুর্গা পূজা হত।


প্রায় একশো বছর ধরে এভাবেই চিলেকোঠায় পড়েছিল এই ডাইরি।কয়েকমাস আগে এলাহাবাদের বাড়িটা প্রোমোটারের হাতে তুলে দেওয়া হয়। সে সময় বাবার সাথে স্বপ্নিল এসেছিল শেষবারের মত এলাহাবাদে।


একে একে বাড়ির সব জিনিস বিক্রি হয়ে যাচ্ছিল। চিলেকোঠার ঘরে বেশ কিছু আবর্জনার মাঝে বড় ঠাকুরের নাম লেখা এক ট্রাঙ্কে ঐ হলদে হয়ে যাওয়া ডাইরিটা পেয়েছিল স্বপ্নিল। উইয়ে কাটা, ঝুরঝুরে ডাইরির পাতায় পাতায় ছিল এক বিপ্লবের ইতিহাস। মুগ্ধ হয়ে স্বপ্নিল পড়েছিল সে দিনপঞ্জি। মাঝখানে কিছু পাতা পায়নি ও খুঁজে।


ডাইরিটা পড়েই স্বপ্নিল নিজের প্রিয় বন্ধু ঋক কে নিয়ে চলে এসেছিল এখানে। ভারতের অন্যতম পুরানো কেল্লা কাংরা ফোর্ট৷ ঋক ইতিহাসের ছাত্র। ও বলেছিল আলেকজান্ডারের যুদ্ধ কাহিনীতে যেমন এর উল্লেখ আছে, তেমনি উল্লেখযোগ্য বিভিন্ন শতকে এই কেল্লার হাত বদল৷ গজনীর সুলতান মামুদ থেকে শুরু করে মহম্মদ বিন তুঘলক, ফিরোজ শাহ তুঘলক, জাহাঙ্গীর-এর হাত ঘুরে এই কেল্লার মালিকানা আসে রঞ্জিত সিংহের হাতে, বার বার লুট হলেও শোনা যায় বিপুল ঐশ্বর্য ছিল এই দুর্গে। ১৮৪৬ এ ইংরেজরা আবার এই কেল্লার দখল নেয়, বন্দীদের রাখা হত এ দুর্গে সে সময়। ১৯০৫ এর ভয়াবহ ভূমিকম্পে কেল্লার স্থাপত্যে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হলেও আজও কাংরা ফোর্ট আভিজাত্যে অমলিন, কেল্লা থেকে নীচে বান-গঙ্গা নদী আর উত্তরে জোড়া ধৌলাধার এর রূপ এককথায় অসাধারণ।


দুর্গের মধ্যে দুটো মন্দির রয়েছে। একটা অম্বিকা দেবীর, অন্যটা জৈন মন্দির। একজন বৃদ্ধ পুরোহিত রয়েছেন কয়েকজন চেলা সহ। ডাইরিতেও এক মন্দির ও তালাবের উল্লেখ আছে। মন্দির পেলেও তালাব বা জলাশয়ের হদিশ এতদিন পায়নি স্বপ্নিলরা। বিশাল চাতালের মাঝে ছিল মন্দির দুটি।


ছোকুলালকে অনুসরণ করে বনের পথে বেশ কিছুটা হেঁটে অবশেষে ওরা পৌছায় এক বড় জলাশয়ের সামনে। ভগ্নপ্রায় সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ফটো তুলছিল স্বপ্নিল। ঋক নেমে গেছিল জলের কাছে। শুকনো পাতায় পায়ের শব্দে ঋক ঘুরে তাকায় পেছনে। একটা বিপদের গন্ধ পায় যেন।


(২)


পাঠান-কোট ছাড়াতেই চারদিকের দৃশ্যপট ধীরে ধীরে বদলে গেছিল। ঢেউ খেলানো পাহাড়ের সীমানা বরাবর দিঠিদের গাড়ি ছুটে চলেছে, মাঝে মাঝে রুপালী পাহাড়ের ঝিলিক দেখা দিচ্ছে আকাশের গায়ে। অয়ন একমনে মেল চেক করতে ব্যস্ত। দিঠি মোবাইলে প্রকৃতিকে ধরে রাখছিল। ওদের সাথেই পথের পাশে পাশে চলেছে কারাং ভ্যা লি রেললাইন। ছোট্ট টয় ট্রেন এ পথে যায় পালামপুর হয়ে যোগিন্দর নগর।


এবারের এই ট্যুরটা একটু হঠাৎ করেই ঠিক হয়েছে। দিঠি এখনো সবটা জানে না। অয়নের বসের এক ভাগ্নে তার বন্ধুর সাথে কাংরায় ঘুরতে এসে নাকি হারিয়ে গেছে। পুলিশ অনুসন্ধান করেও কিছু করতে পারেনি। বসের অনুরোধে অয়ন আর দিঠিকে হঠাৎ ছুটে আসতে হয়েছে তাই। অয়নের বসের এই ভাগ্নের এক পূর্বপুরুষ ছিলেন বিপ্লবী। কাংরা ফোর্টে বন্দী ছিলেন তিনি দীর্ঘদিন। তার কোনো ডাইরি পড়েই ছুটে এসেছিল ছেলে দুটো।


পাহাড়ে ঘুরতে অয়নরা বরাবর ভালোবাসে। তার সাথে রহস্যের গন্ধ থাকলে তো কথাই নেই। দিঠি এ বারের পূজার লেখার রসদ পেয়ে যাবে হয়তো এখানেই।


ধৌলাধরের পাদদেশে কাংরা ইতিহাসের গন্ধ মাখা এক জেলা সদর শহর। শহরের মাঝে পাহাড়ের উপর দেবী ব্রজেশ্বরীর মন্দির। একান্ন পিঠের অন্যতম এই মন্দির খুব জাগ্ৰত। মন্দিরের কাছেই ওদের হোটেল ধৌলাধর ভিউ।


এই হোটেলেই উঠেছিল অয়নের বসের ভাগ্নে স্বপ্নিল আর তার বন্ধু ঋক। কলেজে পড়ে ছেলে গুলো। অয়নরা এসেই থানায় যোগাযোগ করেছিল। কিছুই বলতে পারছে না পুলিশ। ছেলেগুলো কাংরা ফোর্টে গেছিল বেশ কয়েকবার। আর তেমন কোনো খবর পাওয়া যায় নি।


অয়ন প্রথমেই হোটেলের ম্যানেজারকে নিজের পরিচয় দিয়ে স্বপ্নিলদের ঘরটা দেখতে চেয়েছিল । অয়নের বসের ফোন এসেছিল থানায় এবং হোটেলে। একটা বড় মিডিয়া হাউসে থাকার অনেক সুবিধা। ওর প্রেস কার্ডটাও কাজে লেগেছিল ।


ম্যা নেজার বলেছিল ঘরটা স্বপ্নিলরা নিখোঁজ হওয়ার পর আর কাউকে দেওয়া হয়নি এখনো। আসলে তেমন টুরিস্টের ভিড় নেই, তাই প্রয়োজন পড়েনি। তবে দুবার চোর এসেছিল এ ঘরে। ওদের ব্যাগ ঘেঁটেছিল চোর। তবে মনে হয় না কিছু নিয়ে গেছে।


অয়ন ঘরটা ভালো করে ঘুরে দেখেও কোনো সূত্র পায়নি। ঘরের দেওয়ালে কাংরা ফোর্টের একটা হাতে আঁকা অয়েল পেন্টিং। এখানে খুব ভালো ভালো আর্টিস্ট আছে। কাংরার আঁকার খ্যাতি আছে সারা বিশ্বে। ছবিটা মন দিয়ে লক্ষ্য করেছিল অয়ন। এই দুর্গ দেখতেই ছুটে এসেছিল ছেলে দুটো।


ওদের দুজনের ব্যাগ ঘেঁটেও তেমন কিছুই পাওয়া যায়নি। ভগবান জানে চোর কি নিয়ে গেছে!!


পরদিন সকালে দিঠি আর অয়ন গেছিল মন্দির দর্শনে। পুরো পথটাই পূজা সামগ্ৰির দোকান আর হাতের কাজের জিনিসে ভর্তি। প্রচুর পুলিশই ঘেরাটোপে মন্দির প্রাঙ্গণ সুরক্ষিত। বহু পুরানো এই মন্দির জাহাঙ্গীর ও আকবরের পদধূলি ধন্য । পুরোহিতের কাছ থেকে মন্দিরের ইতিহাস শুনছিল ওরা দুজন।


পরের গন্তব্য কাংরা ফোর্ট। প্রায় ৩৫০০ বছরের পুরানো এই দুর্গ ভারতের অন্য তম প্রাচীন দুর্গ। অডিও গাইড নিয়ে ওরা ঘুরছিল ওরা। রঞ্জিত-সিং দুয়ার, মাথা নিচু না করে যা পার করা যাবে না কখনো। শত্রুরা এভাবে প্রবেশ করলেই মাথা কাটা যেত। এরপর ছিল অন্ধেরি গলি। পাশাপাশি দু জন হাটাও কষ্ট কর। মোট তিনটে দরজা পার করে ওরা পৌঁছে গেছিল মন্দিরের চাতালে। অনেকটা উঠে এসে দু জনেই ক্লান্ত। জৈন মন্দিরের সামনে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিল। বেশ সময় নিয়েই দুর্গটা ঘুরে ঘুরে দেখছিল ওরা। দিঠি বেশ কিছু ফটো তুলে নিচ্ছিল। পুরোহিতদের ঋক আর স্বপ্নিলের ফটো দেখানোতে ওরা চিনতে পেরেছিল। সবাই বলল ছেলেগুলোকে দুর্গে দেখেছে অনেকেই।


রাতে হোটেলে ফিরে অয়ন বলল -''প্রায় পাঁচ দিন হল ছেলেগুলো হারিয়ে গেছে এই শহর থেকে। ঠিক কি করে খুঁজবো বুঝতেই পারছি না। এই প্রথম কোনো কেসে এত অসহায় লাগছে!!''


তখনি অয়নের ফোনটা বেজে ওঠে। কলকাতা থেকে বসের ফোন।


এক তরফা কয়েকটা ".... হ্যাঁ ,.... না, ...... ঠিক আছে, ...... গেছিলাম, ...... দেখছি।" শুনে দিঠি বুঝতে পারে কেসের ব্যপারেই কথা হচ্ছে ওদের।


ফোনটা কেটে অয়ন বলল


-'' জলজ্যান্ত ছেলে দুটো কোথায় যেতে পারে বলো তো? কোনো বিপদে পড়েছে এতো বোঝাই যাচ্ছে। ''


পরের দিন থানায় যেতেই অফিসার চৌবেজি হিন্দিতে বলল -'' লোকে হিমাচল ঘুরতে এসে কুলু মানালি যায় নয়তো চম্বা খাজিয়ার যায়, কাংরায় ছয় সাত দিন কেউ থাকে না। এই ছেলে দুটো ছয়দিন ধরে শুধু কাংরা ফোর্টেই ঘুরছিল কেন বলুন তো?''


-''ওদের মধ্যে একজনের পূর্বপুরুষ এই দুর্গে বন্দী ছিল বহুবছর। আরেকজন ইতিহাসের ছাত্র। ওরা এসব নিয়ে সিনেমা বানাবে ভেবেছিল। '' অয়ন যা জানত খুলে বলল অফিসার কে।


-''আমাদের কাছে খবর আছে ওরা কোনো খাজানার খোঁজ করছিল। এই দুর্গের খাজানা নিয়ে অনেক গল্প আছে। দুর্গের মধ্যে অনেক গুম ঘর, গুপ্ত কক্ষ আছে। সব জায়গায় টুরিস্ট এলাউ না। ওরা যদি তেমন কোথাও গিয়ে ফেঁসে যায় ....."


অফিসারের গলায় বিরক্তের সুর শুনে অয়ন বলে -'' ফেঁসে যায় বলতে? ঢুকতে পারলে বেরিয়ে আসতেও পারবে নিশ্চই। ওদের দুজনের ফোন আজ পাঁচদিন বন্ধ। এক সাথে দুজন কোথাও ফেঁসে যেতে পারে না। ''


-''দুর্গের এক গার্ড ওদের ছকুলালের সাথে দেখেছিল কথা বলতে। এই ছকুলাল এক লোকাল মস্তান। ঐ দুর্গের আশেপাশে ওর দলের লোক ঠকানো চুরি ছিনতাই চলে। লোকটা আ্যন্টিকের বড় ডিলার। তবে লোকটাকে এই চারদিন দেখা যায়নি। আজ ওর বাড়ি গেছিলাম। ঘরেও নেই। ওর বৌ জানে না ও কোথায়।খবরটা ভাবাচ্ছে।'' অফিসার চৌবেজি বলে।


অয়ন বলে -''লোকটার দলের অন্য কাউকে পেলে তুলে আনুন একটু। ''


-''সেটাই করবো ভাবছি। চলুন ঘুরে আসি একবার।''


ওদের নিয়ে থানার গাড়িতে করে চৌবেজি কাংরা ফোর্টে চলে আসে। বাইরে একটা অস্থায়ী ছাউনি আছে পুলিশের। সেখানে দু এক কথা বলে অফিসার ওদের নিয়ে দুর্গ ঘুরে দেখে আবার। টুরিস্ট একদম নেই। ছেলে দুটোর মোবাইলের শেষ টাওয়ার লোকেশন ও এই দুর্গের ছিল জানা গেছে।


দুজন লোককে তুলে এনেছিল কনস্টেবল। ওরা গাইডের কাজ করলেও সবাই জানে ওরা ছকুলালের লোক। ওদের মধ্যে একজন স্বীকার করেছিল সে ঐ ছেলেদের ঘুরিয়ে দেখিয়েছে দুর্গ। তার বেশি কিছু জানে না। চৌবেজি দুটোকেই থানায় নিয়ে লকআপে ঢোকাতে বলল। অয়ন বলল -''এদের ফোনে ছকুলালের নম্বর পেলে তার লোকেশনটা একটু দেখুন। ওকে পেলে যদি ছেলে গুলোর খবর পাওয়া যায়?''


চৌবেজি সাথে সাথে ওদের ফোন দুটো নিয়ে নিলো। ছোকুলালের নম্বর পাওয়া গেল ফোনেই।


(৩)


সন্ধ্যাতেই ছকুলালের আরেক ডেরার সন্ধান পাওয়া গেছিল। কিন্তু পাখি আগেই উড়ে গেছে। ফোন ও বন্ধ। অয়ন সব শুনে বলল -''মনে হয় আমরা সঠিক পথেই এগচ্ছি। ছেলে দুটো কি অবস্থায় আছে কে জানে!!''


দিঠি বলল -''ওদের এভাবে আটকে রেখে কি লাভ হচ্ছে? মুক্তিপণ চেয়ে কোনো ফোন ও তো আসেনি। ''


-''সেটাই তো চিন্তার বিষয়। মুক্তিপণ যখন চায়নি তখন আটকে রেখেছে অন্য কোনো কারণে।'' অয়ন বলে।


এমন সময় চৌবেজির কাছে ফোনে একটা খবর আসতেই উনি আবার ফোর্স নিয়ে বেরিয়ে পরেন। অয়ন আর দিঠিও সঙ্গে যায়। হাইওয়ের ধারে একটা ধাবাতে ছকুলালকে দেখা গেছে খবর এসেছিল। জায়গাটা পাঞ্জাব বর্ডার।


প্রায় ভোর রাতে ধাবা থেকে অচৈতন্য ছেলে দুটোকে উদ্ধার করে পুলিশ। ওদের উপর বেশি ডোজের ঘুমের ওষুধ প্রয়োগ করা হয়েছিল। একদিন পর ওরা সুস্থ হয়েছিল ধীরে ধীরে। ছকুলাল অবশ্য পালিয়ে গেছিল বিপদ বুঝে।


হোটেলের ঘরে বসে অয়ন স্বপ্নিল কে জিজ্ঞেস করে -''ঠিক কি হয়েছিল বলতে পারবে এখন?''


স্বপ্নিল কাংরা ফোর্টের ফটোটার দিকে তাকিয়ে বলে -''আমার দাদু বহুবছর এই দুর্গের জেল খানায় বন্দী ছিল। তার ডাইরি পড়ে আমরা এসেছিলাম জায়গাটা দেখতে। আমাদের বেশ কয়েকদিন ওখানে ঘুরতে দেখে এই লোকগুলো ভেবেছিল আমরা কোনো গুপ্তধনের খোঁজ করছি। তাই আমাদের আটকে রেখেছিল। আমার ফোনে দাদুর ডাইরির কিছু অংশর ফটো ছিল। যদিও বাংলায় লেখা, ওরা ওগুলোকে সঙ্কেত ভেবে ফোন কেড়ে নিয়েছিল। ''


চৌবেজি বলল -''খাজানে কা তো বহুত কাহানী ছুপা হুয়া হ্যায় ইধর। পেহলে তো বহুত টুরিস্ট আতা থা, লেকিন অব কম হো গয়া হ্যায়। ''


একটু পরেই পুলিশ চলে যেতেই অয়ন বলল -''এবার পুরো ব্যাপারটা খুলে বলো তো। ঠিক কি হয়েছিল। ''


ঋক ও স্বপ্নিল একে অন্যের দিকে তাকায়। অয়ন বলে -''আসল ডাইরিটা কোথায়? গুপ্তধন আছে কিনা একবার দেখলে বুঝতে পারতাম। ''


-''আপনাদের নাম আগেও শুনেছি। দিঠি ম্যাডামের লেখার সাথেও আমি পরিচিত। মামা আপনাদের কতটা কি বলেছে জানি না। তবে বড় ঠাকুরের ডাইরি পড়লে আপনারা অনেক কিছুই জানতে পারবেন, হয়তো পারবেন জায়গাটা উদ্ধার করতে। '' স্বপ্নিল এ কথা বলে উঠে বসে। বলে -'' ডাইরির শেষের দিকটা পড়ে চমকে উঠেছিলাম। ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত কাংরা ফোর্ট থেকে সব ইংরেজ সৈন্য প্রাণ হাতে করে পালিয়ে গেছিল। প্রচুর বন্দী মারা যায়। বড় ঠাকুর আর তার তিন বন্ধু অনেক কষ্টে পালাতে পেরেছিল এক গুপ্ত পথে। কিন্তু পালানোর সময় এই কাংরা ফোর্টেই উনি সন্ধান পেয়েছিলেন এক বিপুল ঐশ্বর্যের। যা যুগযুগ ধরে লোক চক্ষুর অন্তরালে লুকানো ছিল। ভূমিকম্পের ফলেই ওনারা সেই গুপ্ত কক্ষের সন্ধান পেয়েছিলেন। সেই কুবেরের ঐশ্বর্য নিয়ে চারজনের পক্ষে পালিয়ে যাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। আবার ঐ ঐশ্বর্য পেলে স্বাধীনতাও আসবে তাড়াতাড়ি। তাই ঐ সম্পদকে দু ভাগে ভাগ করে ওনারা লুকিয়ে রেখেছিলেন এখানেই কোথাও। পরে একসময় এসে উদ্ধার করবেন ভেবেছিলেন। কিন্তু পরের মাসেই ওনার দুই বন্ধু মারা যায় পুলিশের গুলিতে, আরেক বন্ধু হরদয়াল সিং ছদ্মবেশ নিয়ে পাহাড়ে চলে যায়। উনি দীর্ঘ আঠারো বছর লুকিয়ে বেরিয়েছিলেন। অবশেষে বাড়ি ফিরলেও মাথা খারাপ হয়ে গেছিল। একা একাই চিলেকোঠায় থাকতেন। লোকজন পছন্দ করতেন না। কাংরা ফোর্টে আর ফিরে আসেননি উনি। হরদয়াল সিং এর আর কোনো খবর পাননি। তাই আমার ধারণা ঐ বিপুল সম্পদ আশেপাশেই কোথাও আছে। এখানকার পুরানো লোকেদের মধ্যে ও একটা খাজানার গুজব শোনা যায়। অনেকেই অনুসন্ধান করেছে। তবে কিছুই পাওয়া যায়নি। ছকুলাল অনেক চেষ্টা করলেও ডাইরির সন্ধান পায়নি। ''


-''এমনি কিছু ভেবেছিলাম আমি। যাক, তা ডাইরিটা কি একবার দেখতে পাবো? কোথায় ওটা?" অয়ন বলে।


স্বপ্নিল বলে -''আমরা তো পেলাম না, এবার আপনারা একবার চেষ্টা করুন। ও খাট থেকে নেমে কাংরা ফোর্টের ফটোটার কাছে এগিয়ে যায়, দেওয়াল থেকে ফটোটা খুলে এনে বিছানায় রাখে, পেছনের পিচবোর্ড খুলতেই পাতলা কিছু কাগজ বেরিয়ে আসে। হলদে হয়ে যাওয়া কাগজ গুলো পরপর সাজিয়ে ও অয়নের হাতে তুলে দেয়।


দিঠি অবাক হয়ে দেখছিল কাগজ গুলো। অল্প কয়েকদিনের দিনপঞ্জি। অয়ন আর দিঠি পুরোটাই পড়ে ফেলল। অয়ন বলে -''এর আগে পরের পাতা গুলো কই?''


-''এটুকুই প্রয়োজনীয় অংশ। এর আগে কিছু পাতা ছিল, তবে প্রয়োজনীয় কিছু ছিল না, আর এর পর আর কোনো লেখা ছিল না। এখানেই শেষ।'' স্বপ্নিল বলে।


অয়ন পাতা গুলো খুব ভাল করে লক্ষ্য করে বলে, শেষ পাতায় রয়েছে একটা ছড়া অথবা ধাঁধা -''সবটাই পাষ্টটেন্সে লেখা, অর্থাৎ ঘটনা ঘটার পর লিখেছিলেন। পরিষ্কার লিখেছেন-' দুই ভাগে সমস্ত সম্পদ গচ্ছিত রাখা হল ভগবানের নামে। পুণ্যস্নান করে আমরা এগিয়ে চললাম প্রস্থানের পথে। পাহাড়ের প্রস্তর শিলা পাহারা দেবে এ সম্পদ। পরে সময় মত উদ্ধার করা হবে।' এর পরেই সেই ছড়া-


পাথর ঘেরা দেবের ঘরে


জলাশয়ের অপর পারে


স্বর্গে ওঠার সিঁড়ির মাঝে


পথ সেখানেই লুকিয়ে আছে


খুঁজতে হবে বুদ্ধি করে


দিনের আলো যেথায় পড়ে,


খুঁজে পেলে দেশের ভালো


স্বাধীন সূর্য দেখবে আলো ''


অয়ন দিঠির দিকে তাকায়, বলে মন্দিরের সিঁড়ির কথা বলা হয়েছে।


-''একশো বছরে এখানে অনেকেই গুপ্তধনের সন্ধানে এসেছে, তবে এত বড় কোনো গুপ্তধন উদ্ধারের খবর নেই । এই দুর্গে এত ধরনের হামলা হয়েছে যে মনে হয় আগেই কেউ উদ্ধার করে নিয়েছে।'' ঋক বলে।


-''আগেকার দিনে হামলার হাত থেকে বাঁচতে এমন বিপুল ঐশ্বর্য সবাই মন্দিরে গচ্ছিত রাখত। ব্রজেশ্বরী দেবীর মন্দিরে বহু রাজা মহারাজারা নিজেদের সম্পদ গচ্ছিত রাখতেন। আমরাও মন্দির গুলোয় খোঁজ নিয়েছিলাম। কিন্তু ভূমিকম্পের সময় মন্দির গুলো ক্ষতিগ্ৰস্থ হয়েছিল। মানুষের মনে আতঙ্ক ছড়িয়েছিল যে আরও বড় ভূমিকম্প হবে। ছোটছোট বেশ কিছু আফটার শক ঐ ভয় আরও বাড়িয়ে তুলেছিল। সবাই এলাকা ছেড়ে সমতলে নেমে গেছিল শুনেছি। আমরা চামুন্ডাদেবীর মন্দির অবধি ঘুরে এসেছি, পুণ্যস্নান করার মত নদী সেখানে থাকলেও, শিলা নেই। পাহাড়ে ঠিক নয় সমতলে ঐ মন্দির। সিঁড়ির মাঝে কিছুই পাইনি। নিরেট সিমেন্টের সিঁড়ি। কিছুই লাভ হয়নি। '' স্বপ্নিল বলে।


দিঠি মোবাইলে আশেপাশের বহু পুরানো মন্দির খুঁজছিল। হঠাৎ বলে ওঠে -''মাশরুর পাথর খোদিত মন্দির ঘুরে এসেছ কি? এ ও বহু পুরানো। ঐ ভূমিকম্পে এই মন্দিরের ও বহু ক্ষতি হয়েছিল।''


-''সেটা কোথায়, নাম শুনিনি এর আগে।'' স্বপ্নিল আর ঋক দিঠিকে প্রশ্ন করে।


-''কাছেই, চল কাল একবার ঘুরে আসি। এক ঘন্টার মত লাগবে বলছে।'' নেটের থেকে প্রয়োজনীয় সব খবর জেনে নিয়েছিল দিঠি আর অয়ন। ওদের চেনা গাড়ি এই কয়েকদিনের জন্য বুক করাই ছিল।


পরদিন ভোরে ওরা সবাই চলল মাশরুর প্রস্তর খোদিত মন্দির গুচ্ছ দেখতে। একটি পাহাড়কে কেটে এই মন্দির গুচ্ছ বানিয়েছিল নাকি পাণ্ডবরা। মুল মন্দির ছিল শিবের। যদিও এখন রাম সীতা পূজিত হয়।


শহর ছাড়িয়ে বেশ কিছুদূর গিয়েই পাহাড়ের গায়ে ছবির মত সুন্দর পাথরের মন্দির গুচ্ছ। তবে ভূমিকম্পে বেশ কিছু অংশ ধ্বংস হয়েছিল, তাছাড়া মন্দিরটি সম্পূর্ণ হয়নি। সামনেই বিশাল জলাশয়, টলটল করছে সবুজ জল। অসংখ্য মাছ খেলে বেড়াচ্ছে আপন মনে। ভগ্নপ্রায় সিঁড়ি দিয়ে মন্দিরের মাথায় উঠে গেলে ধরা পরে সুন্দর দৃশ্য পট। চারদিক ভাল করে দেখে অয়ন বলল -''এই মন্দিরটি পাথরের, এর সামনে জলাশয় আছে, তা পার করেই মন্দিরে ঢুকতে হয়। সিঁড়ি রয়েছে, মন্দিরে বহু পুরানো কক্ষ আছে, লুকানোর জায়গা প্রচুর রয়েছে। ''


এমন সময় আড়াল থেকে চারজন বেরিয়ে এসে ওদের ঘিরে ধরে। পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে ছকুলাল। বলে -''ইধার যো ভি খাজানা হ্যায়য় হামারা হ্যা য়, কিউকি হাম হ্যােয় ইশ জাগা কা বাদশা। আপলোগ কিউ তকলিফ উঠাওগে। ''


ওর লোক ততক্ষণে পুরোহিত ও তার শাগরেদ কে ধরে এনেছে। বৃদ্ধ পুরোহিতকে ছকুলাল জিজ্ঞেস করে বারবার কোনো গুপ্ত কক্ষ বা লুকানো খাজানার কথা। পুরোহিত বলে কক্ষ তো অনেক আছে, খাজানার খবর উনি জানেন না। ছকুলালের লোক পুরোহিতের সাথে গর্ভগৃহ ছাড়াও অন্য ঘর গুলো অনুসন্ধান শুরু করে। ছকুলাল ওদের চারজনকে একটা ঘরে ঢুকিয়ে আটকে দেয়। ওদের ফোন গুলো কেড়ে নেয়।


অয়ন বলে -''আমরা মনে হয় ঠিক জায়গায় এসে পৌঁছেছি। এখন শুধু সিঁড়িটা ভাল করে পরীক্ষা করে দেখতে হত।


স্বর্গে ওঠার সিঁড়ির মাঝে


পথ সেখানেই লুকিয়ে আছে


খুঁজতে হবে বুদ্ধি করে


দিনের আলো যেথায় পড়ে,।


সিঁড়ির ঠিক কোথায় আলো পড়ে দেখতে হবে ।


বেশ কিছুক্ষণ পর বাইরে তুমুল চেঁচামেচি শুরু হয়, দু বার গুলির আওয়াজ শোনা যায়। একটু পরেই দুজন পুলিশ এসে ওদের উদ্ধার করে। ড্রাইভারটা ছকুলালের গ্ৰুপটাকে আসতে দেখে থানায় খবর দিয়েছিল। এই কদিন অয়নদের সাথে ঘুরে ও বুঝেছিল এরা ভালো লোক, অন্যদিকে লোকাল মস্তান ছকুলালকে ও চিনত। জানত ওকে পুলিশ খুঁজছিল।


চৌবেজি জলাশয়ের ধারে দাঁড়িয়ে পুরোহিতের সাথে কথা বলছিল। মন্দিরের দু দিক থেকে সিঁড়ি উঠে গেছে ওপরে যাওয়ার। অয়ন এসে পুরোহিত কে হিন্দিতে প্রশ্ন করে-'' আপনি তো বহুদিন এখানে রয়েছেন, স্বর্গের সিঁড়ি বলতে কি বোঝেন?''


পুরোহিত অবাক হয়ে তাকান। বলেন -''এই মন্দিরে বহু বহু বছর আগে এক সাধু বাবা থাকতেন, উনি ঐ পিছনের দিকের অংশে যে সরু সিঁড়ি কিছুটা উঠেই শেষ ওটাকে স্বর্গের সিঁড়ি বলতেন। পাণ্ডবরা স্বর্গে যাওয়ার জন্যই নাকি ঐ সিঁড়ি বানিয়েছিল। ভূমিকম্পে ঐ সিঁড়ি আর ওদিকটা ক্ষতিগ্ৰস্থ হয়েছিল সাংঘাতিক ভাবে। মন্দিরের পেছনের দিকে দুই নিরেট পাথরের দেওয়ালের ফাঁকে এই সিঁড়ি এতক্ষণ কারো চোখেই পড়েনি। প্রতিটা পাথরের সিঁড়িতে শঙ্খ চক্র গদা পদ্ম আঁকা, তবে ঠিক মাঝখানের সিঁড়িতে সূর্যের ছবি। অয়ন সেদিকে তাকিয়ে বলে -


স্বর্গে ওঠার সিঁড়ির মাঝে


পথ সেখানেই লুকিয়ে আছে


খুঁজতে হবে বুদ্ধি করে


দিনের আলো যেথায় পড়ে,


একমাত্র সূর্য দিনের আলো দেয়। ও ঐ সিঁড়ির পাথরটা ভালো করে লক্ষ্য করে। সূর্যটার মধ্যে বার বার চাপ দেয়। কিছুই হয় না। ওর দেখাদেখি স্বপ্নিল ঋক সবাই পাথরটা টানাটানি শুরু করে। হঠাৎ পাথরটা উঠে আসে। আর একটা ছোট্ট সুরঙ্গর মুখ দেখা যায়। পুরোহিত নিজেও অবাক, একটা ঘোরানো সিঁড়ি চলে গেছে সুরঙ্গর ভেতর। মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে অয়নরা একে একে ঐ পাতাল ঘরে নেমে যায়, কিন্তু কোথায় কুবেরের ধন, সারা ঘরে কয়েকটা খালি কলসি আর কারুকার্য করা কাঠের বাক্স রয়েছে। একটা কুলুঙ্গিতে পাওয়া গেল একটা খাতা, দেবনাগরী ভাষায় কিছু লেখা রয়েছে খাতায়। সব দেখে অয়নরা আবার মন্দির চাতালে এসে বসল।


পুরোহিত বলল -'' এক সাধুবাবাকে আমরা ছোট বেলায় এই মন্দিরে দেখছি। আমার বাবা, দাদু সবাই এই মন্দিরের পূজারী ছিলেন। ওনাদের কাছেই শুনেছি সাধু বাবা হিমালয় থেকে এসেছিলেন। বিপ্লবীদের লুকিয়ে থাকতে সাহায্য করতেন। অনেক বিপ্লবী আসত সাহায্যে র আশায়। মন্দিরের পেছনে ওনার সাথে দেখা করত তারা। উনিও হয়ত কোনো এক সময় বিপ্লবী ছিলেন। আমার বাবা লোকটাকে খুব মান্য করতেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার এক বছরের মধ্যের মারা গেছিলেন উনি। পেছনেই ওনাকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। বহুদিন আগের কথা এসব। ''


দিঠি খাতাটা খুব ভালো ভাবে দেখে বলল -''এটাই বিপ্লবী হরদয়াল সিং এর খাতা, পুরো সম্পদটাকে দেশের কাজেই লাগিয়েছিলেন উনি। বিপ্লবীদের বিভিন্ন সময় সাহায্যর করেছেন ঐ গুপ্তধনের মাধ্যমে। প্রতিটা হিসাব এখানে রয়েছে। সাধু সেজে সারাটা জীবন ঐ যখের ধন পাহারা দিয়েছেন নিজে। অবশেষে স্বাধীন ভারতের সূর্যোদয় দেখে পরম নিশ্চিন্তে বিদায় নিয়েছেন। সশস্ত্র বিপ্লব আর করতে পারেননি নিজে। কিন্তু বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে গেছিলেন গোপনে। এই খাতাটি এক মূল্যবান দলিল। যা কোনো গুপ্তধনের চেয়ে কম নয়। সরকারের হাতে প্রমাণ স্বরূপ তুলে দেবো এই খাতাটি। ''


সবাই চুপ করে ঘটনাটা শুনছিল। অয়ন বলে -''ওনারা এটাই চেয়েছিলেন। ঐ সম্পদকে দেশের কাজে লাগিয়ে স্বাধীনতা আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। গুপ্তধন না পাওয়া গেলেও ইতিহাসের গুপ্ত কথা জানা গেল। এই বা কম কি!!''


-''এমন ভাবেই দেশের বিভিন্ন দুর্গে মন্দিরে বিভিন্ন অংশে কত বিপ্লবের কথা লুকিয়ে আছে, কত ইতিহাস এভাবেই হারিয়ে যায়, আমরা জানতেও পারি না। '' ঋক বলে ওঠে ধীরে ধীরে।


সূর্য ততক্ষণে পৌঁছে গেছে পশ্চিম আকাশে, মাশরুর মন্দিরের ক্লান্ত ছায়া পড়েছে জলাশয়ে। ঝাঁকে ঝাঁকে পাখিরা ফিরে চলেছে ঘরের পানে।


সেদিকে তাকিয়ে স্বপ্নিল বলে -''বড় দাদুর শেষ ইচ্ছা তার বন্ধুই রক্ষা করেছিল। দাদু কাংরা ফিরতে না পারলেও তার বন্ধু নিজের কর্তব্য পালন করেছিল সুন্দর ভাবে। দাদু যেখানেই থাকুক এটা জেনেই শান্তি পাবেন। ''


আস্তে আস্তে সবাই গিয়ে গাড়িতে ওঠে। এবার ঘরে ফেরার পালা। বৃদ্ধ পুরোহিত একাই দাঁড়িয়ে থাকেন ইতিহাস প্রসিদ্ধ ঐ মন্দিরের বুকে।


Rate this content
Log in