Debdutta Banerjee

Fantasy Inspirational Others


3  

Debdutta Banerjee

Fantasy Inspirational Others


আগার্থা - এক রহস‍্য (শারদ সংখ‍্যা)

আগার্থা - এক রহস‍্য (শারদ সংখ‍্যা)

12 mins 24 12 mins 24

আজ তৃতীয় দিন তৃষঙ্কর একা তার ছোট বিমানটা নিয়ে নীল আকাশের বুক চিরে মেঘেদের রাজ‍্যে চলে এসেছে। সাদা মেঘের ফাঁক দিয়ে বহু নিচে চোখে পড়ে তার চেনা আবছা সবুজ পৃথিবী। তৃষঙ্করের ছোট থেকেই ইচ্ছা ছিল সে একদিন ফাইটার প্লেন চালাবে। অবশেষে সেই ইচ্ছা বাস্তবের পথে। ট্রেনিং শেষে প্রথমে পাঞ্জাবে ছিল ও একটা বছর। তারপর প্রমোশন পেয়ে ফ্লাইং অফিসার হয়ে উত্তর সিকিমের এই এয়ারবেসে একমাস হল পোষ্টিং পেয়েছে তৃষ।হিমালয়ের বরফ মোড়া এই তুষারধবল প্রান্তরে একসময় ওর বাবা উইং কমাণ্ডার বেহাগ বসুও অতন্দ্র প্রহরী ছিলেন। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছিল তৃষঙ্কর। উত্তর সিকিমে পাহারারত বেহাগ বসু একদিন সকালে এভাবেই বিমানের মহড়া দিতে গিয়ে হারিয়ে গেছিল কোথায় যেন। ওঁর বিমানের ধ্বংসাবশেষ বা কোনো বিপদবার্তা এসে পৌঁছয়নি কন্ট্রোল রুমে। দুটো সরকারি দল হিমালয়ের গিরিকন্দরে নিয়ম মাফিক তদন্ত করেছিল। কিন্তু হিমালয়ের গহীনে এমন ভাবে অনেক বিমান অনেক সময় হারিয়ে যায়। সব সময় ধ্বংসাবশেষ বা চিহ্ন পাওয়া যায় না। তবে মা শ্রুতির একান্ত ইচ্ছায় তৃষ নিজেও ফ্লাইং অফিসার হয়েছে। আর ভাগ‍্যের জোরেই হয়তো কিছুটা কাকতালীয় ভাবে কিছুদিনের ভেতর পোষ্টিং পেয়েছে এই সিকিমেই। দলের সঙ্গে বেশ কয়েকবার যুগ্ম মহড়া দিলেও একা বিমান নিয়ে আকাশে ওঠা তার এই নিয়ে আজ তৃতীয় বার। নীল সাদা মেঘের মাঝে ভাসতে ভাসতে তৃষের মনে হয় বাবাও কি এভাবেই মহড়া দিত! ঠিক কি হয়েছিল বাবার সঙ্গে সে যদি জানতে পারত। ট্রেনিং পিরিয়ডে শেষের এক মাস ও প্রশিক্ষণ পেয়েছিল এয়ার কমেণ্ডার কবির সখাওতের কাছে, বাবা আর উনি একসঙ্গে সিকিমে পোষ্টেড ছিলেন সতেরো বছর আগে। দুজনেই ছিলেন উইং কমাণ্ডার। ট্রেনিংএর ফাঁকে বাবার সাহসিকতার অনেক গল্প বলতেন উনি।ট্রেনিং শেষে সিকিমে এসে তাই অনেক কিছুই কেমন চেনা মনে হত। উড়তে উড়তেই হঠাৎ নিচে বরফের মাঝে নীল জলের ছোলামু লেকটা চোখে পড়ল। লেকটা পার করে ঐ বড় পাহাড়টার পিছনে নো ম‍্যানস ল‍্যাণ্ড। রেডিও বার্তায় সর্তক বাণী ভেসে আসে যে আর যাওয়ার অনুমতি নেই। আকাশসীমা লঙ্ঘন করলেই হয়ত ওধার থেকে ছুটে আসবে গরম বুলেট। তৃষ গোল করে পাহাড়ের মাথায় একটা চক্কর খায়। একটু অবাক হয়ে দেখে দূরের ঐ কালচে নীল পাহাড়টার আজও ধুসর মেঘের চাদরে মোড়া। সখাওত সারের কাছেও ঐ পাহাড়টার গল্প ও শুনেছিল।ঐ পাহাড়টা সব সময় ধুসর মেঘেই ঢাকা থাকে। তৃষ আরেকটু কাছে যেতে চেষ্টা করেছিল আগেরদিন। কিন্তু কন্ট্রোল রুম থেকে ওকে ফিরে আসতে বলা হয়েছিল। ওদিকটা তিব্বত ও লাল চীনের বিতর্কিত অংশ। যাওয়ার পারমিশন নেই।কিন্তু কি যেন এক অজানা রহস‍্য ওকে হাতছানি দিয়ে ডাকে ঐ মেঘের পেছন থেকে। কিন্তু সেই অদৃশ‍্য আকর্ষণকে উপেক্ষা করে ফিরে আসতে বাধ‍্য হয় তৃষ। মন পড়ে থাকে ঐ নীলচে কালো পাহাড়ের গায়ে। ঐ উচ্চতায় প্রায় সব পাহাড়ের চূড়াই যখন তুষার ধবল কি এক অজানা কারণে ঐ বেশ দূরের পাহাড়টায় বরফ পড়ে না সেভাবে। 

সেদিন রাতে ডাইনিং এর এক কোনে তৃষ খেতে বসে শুনছিল সিনিয়ারদের গল্প। স্কোয়াড্রন লিডার গিরেবাল বলছিলেন -''ঐ দূরের পাহাড়ে মনে হয় কোনো শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র রয়েছে । ওদিকে গেলেই দেখবে তোমাদের সব যন্ত্রের কাঁটা কাঁপতে থাকবে। তখনি যদি ফিরে না আসো বিপদে পড়তে পাবো। ''-''ঐ চৌম্বক ক্ষেত্রের জন‍্য ঐ অঞ্চলে বরফ জমে না। সব পাহাড়ের মধ‍্যে ঐ পাহাড়টা কেমন ধুসর কালো।'' মিশেল তামাং আরেক অফিসার বলেন।প্রথমদিন তৃষের সঙ্গে ছিলেন ফ্লাইং অফিসার সিব্বল। উনিও সাবধান করেছিলেন ওকে। শূণ‍্যের মাঝেও একটা সীমারেখা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল ওদের উড়ানের। দুদিন পর আবার যখন নীল আকাশে ডানা মেলেছিল তৃষ অভ‍্যাস বসে একবার তাকিয়েছিল উত্তর পশ্চিমের ঐ পাহাড়টার দিকে। সেদিন পাহাড়টা আবার পুরোই ঢাকা পড়েছিল মেঘের আড়ালে, তবে জোড়া রামধনু ভেসে উঠেছিল ঐ মেঘের গায়ে। অপূর্ব সে দৃশ‍্য। মুহূর্তের জন‍্য তৃষ ভুলে গেছিল সে এখন অন ডিউটি। বোধহয় উচ্চতা কমিয়ে এগিয়ে গেছিল একটু। পরক্ষণেই নির্দেশ ভেসে এসেছিল যে ওকে আরো উপরে উঠে যেতে হবে। মুখ ঘুরিয়ে ছোলামু পার করে বড় গ্লেসিয়ারটার কাছে চলে আসে ও। আর তখনি ওর চোখে পড়ে কালো বিন্দুগুলোর নড়াচড়া। লাইন অফ কন্ট্রোলের এ পারে নীল লেকের ধারে সাদা বরফের ভেতর ওগুলো ঠিক কি!! পূব দিকে আরেকটু এগিয়ে যায় তৃষ। আরেকটু নিচে নামতে চেষ্টা করে কিন্তু আবার বাধা আসে কন্ট্রোল থেকে, এলোসির কাছে একটা নির্দিষ্ট উচ্চতায় থেকে তাকে ফিরতে হবে। দক্ষিন মুখো হয়ে মাইল খানেক এগিয়ে এসে ও কন্ট্রোল রুমকে কোডেড মেসেজ পাঠায়। ওকে আরেকবার জায়গাটার ছবি তুলে আনতে বলা হয়। তৃষ মনে মনে এটাই চাইছিল। নীল জলের হ্রদটা ঘুরে ও অনেকটা নিচে নেমে আসে, এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, বড় বড় ট‍্যাঙ্কার গুলোকে সাজাচ্ছে ওরা, বাঙ্কার বানিয়েছে বেশ কয়েকটা। ফটাফট ছবি তুলে পাঠাতে থাকে তৃষ। কিন্তু হঠাৎ করে গুলি ছুড়তে শুরু করে শত্রুপক্ষ। উত্তেজনায় অনেকটাই নেমে এসেছিল তৃষের বিমান। ধরা পড়ে গেছে ও, শত্রুপক্ষ ওকে ফিরতে দিতে রাজি নয়। তৃষ বাদিকে ঘুরে গতিবেগ বাড়ায়, উপরে উঠতে উঠতে বুঝতে পারে আগুন লেগে গেছে বিমানে, কন্ট্রোল রুমকে জানায় ওর হাতে সময় কম, ওকে বিমান ছেড়ে ঝাঁঁপিয়ে পড়তে হবে প‍্যারাশুটের ভরসায়। কিন্তু সিগ‍্যনাল ঠিক তক্ষুণি কেটে যায় , সব প‍্যারামিটারের কাঁঁটা গুলো কাঁপছে যেন। প‍্যারাশুটটা চেক করে ঝাঁপ দিতে তৈরি তৃষ বুঝতে পারে আগুনের লেলিহান শিখা ওর তিনদিক ঘিরে ধরেছে। ওদিকে ওর মনে হয় ও সেই ধুসর মেঘের আস্তরণ ভেদ করে রামধনুর ভেতর দিয়ে ঢুকে পড়েছে। লাফ দিয়েই ও বুঝতে পারে ওর প‍্যারাশুটেও আগুন ধরে গেছে কোনো ভাবে। নিচের দিকের পাহাড়ের চূড়াগুলো যেন বর্ষার তীক্ষ্ণ ফলার মত ওর দিকে চেয়ে আছে। প‍্যারাশ‍্যুটের থেকে শরীরটা মুক্ত ক‍রতে করতে ও নেমে আসে আরো হাজার ফিট নিচে। এবার প্রচণ্ড গতিতে ঐ বরফ আর পাথরের পাহাড়ের উপর আছড়ে পড়ার জন‍্য মানসিক ভাবে প্রস্তুত তৃষ চোখ বুজে ফেলে। কয়েকটা সেকেণ্ড, মায়ের মুখটা ভেসে ওঠে চোখের সামনে। বাবা ওকে দু হাত বাড়িয়ে ডাকছে, একটা বিকট শব্দ কানে আসতেই তৃষ বুঝতে পারে ওর এয়ারক্র‍্যাফটটা ধ্বংস হয়ে গেলো। একটা টুকরো ছিটকে এসে লাগে পিঠের কাছে, মোটা ইউনিফর্ম ছিড়ে গেঁথে যায় কি একটা! কয়েকটা সেকেণ্ড মাত্র, এবার সব যন্ত্রণার অবসান। কিন্তু সময় কি একটু বেশিই লাগছে?হঠাৎ তৃষের মনে হয় সে একা নয় কেউ রয়েছে তার পাশে। পরম যত্নে কেউ তাকে লুফে নিয়েছে। জ্ঞান হারানোর আগে চোখ খুলে বহুবছর আগে দেখা সেই চির পরিচিত মুখটা দেখতে পায় ও। সেই চেনা গন্ধ.... স্পর্শ...।

******

আস্তে আস্তে চোখ খুলে তৃষঙ্কর চারদিকটা দেখে, ধীরে ধীরে মনে পড়ে এলওসির কথা। সে ছবি তুলছিল। তারপর ওর এয়ারক্র‍্যাফটটায় গুলি লেগেছিল। ও যখন নিচে পড়ে যাচ্ছিল....পিঠে কি একটা লেগেছিল যেন। কিন্তু ব‍্যাথা নেই তো! লাফ দিয়ে উঠে বসে তৃষ। এ কোন জায়গা? সবুজ ঢেউ খেলানো ঘাম জমি, মখমলের মত নরম পুরু ঘাসের বিছানায় সে শুয়ে ছিল। ও ধারে একটা দুধ সাদা ঝরণা। পাতলা সরের মত কুয়াশার চাদরে ঢাকা উপত‍্যকা ধাপে ধাপে সিঁড়ির মত নেমে গিয়েছে। প্রাচীন বৃক্ষ থেকে ঝুড়ি নেমে এক মায়া কাননের সৃষ্টি করেছে। নিচের দিকে নদীর ধারে ধারে ফুলের ঝার।পাহাড়ের গায়ে ভেজা ভেজা নীলচে মেঘের দল। হঠাৎ কানে আসে মিষ্টি কলতান, পাখির ডাক। ঐ তো ঝোপের ধারে খেলে বেড়াচ্ছে দুটো খরগোস। নাম না জানা রকমারি ফুলে ছেড়ে আছে চারদিক। একি স্বর্গ! সে কি মরে গেছে! শরীরে তো তেমন যন্ত্রণা নেই আর। আকাশটা এখানে কেমন বেগুনী নীল আসমানী রঙের। তৃষ আশেপাশে ঘুরে দেখে, ওধারে আরেকটা ঝরণা, স্ফটিক স্বচ্ছ জলের নিচে রঙিন পাথর যেন চুনী পান্না। মাছের ঝাঁক খেলে বেড়াচ্ছে। ঐ সাদা ফুলের গাছটা কি মিষ্টি গন্ধ ছড়াচ্ছে! ওটাই কি পারিজাত। মখমলের মত ঘাসে পা ডুবিয়ে এগিয়ে চলে তৃষ। সামনেই এক নগর, পাহাড়ের গায়ে মৌচাকের মথো ঝুলে থাকা ঘর, প্রাসাদ, উদ‍্যান.... সামনের বাঁকটা পেরিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে তৃষ। স্বর্গ যে এতো সুন্দর হয় ওর কোনো ধারণাই ছিল না। হঠাৎ ওর মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায় একটা সাদা বেশ বড় কিছু... একটা সাদা ঘোড়া, ইউনিকর্ণ। ওর কপালের মাঝ বরাবর রয়েছে একটা সিং। ঐ তো আরো দুটো ইউনিকর্ণের পিঠে চড়ে উড়ে গেলো কেউ। সামনের বড় ঝুড়ি ওয়ালা গাছের নিচে সাদা পোশাক পরিহিত এক বৃদ্ধকে দেখে এগিয়ে যায় তৃষ। বৃদ্ধর গায়ের থেকে কি জ‍্যোতি বার হচ্ছে! কেমন এক মায়াবী সাদা আলোয় মোড়া গাছের নিচটা। তৃষকে দেখেই বৃদ্ধ বলেন -''এখন কেমন বোধ করছ? সুস্থ তো?''-''এটা কি স্বর্গ?'' তৃষ প্রশ্ন করে।মিষ্টি হেসে বৃদ্ধ বলেন -'' কেন? স্বর্গের খোঁজ করছ কেনো?''-''এতো সুন্দর জায়গা... আমি এখানে কী করে এলাম?আমি কি মারা গেছি?''-''আত্মার তো মৃত‍্যু হয় না, মৃত‍্যু হয় দেহের। তুমি তো এখনো দেহ নিয়েই বিরাজ করছ।'' বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ান। তৃষ হাত জোর করে বলে -''এই জায়গাটা কোথায়?''-'' কালচক্রর নাম শুনেছো? তুমি কালচক্রের এপারে রয়েছো। ''তৃষের মাথায় কিছু ঢোকে না, কুয়াশার আবরণ ভেদ করে তুষারাবৃত গিরি শিখর দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এই সবুজ উপত‍্যকা, এতো সুন্দর ঝরণা, ঘরবাড়ি এসব তো তার ম‍্যাপে নির্দিষ্ট করা নেই! আর ঐ উড়ুক্কু ঘোড়ার মত প্রাণী? সিব্বল অবশ‍্য বলেছিল এমন প্রানীর কথা নাকি উপকথায় আছে। পাহাড়ের কোনো গুহায় ওরা ছবিও দেখেছিল এমন ডানা ওয়ালা ঘোড়ার। এবার কয়েকজন নারী পুরুষ কেও দেখতে পায় তৃষ, কিন্তু এ কোন দেশের পোশাক বুঝতে পারে না। এদের চেহারা দেখে তো বোঝাও যায় না কোন দেশের লোক! নিজেকে চিমটি কেটে দেখে তৃষ, জেগেই তো রয়েছে। বৃদ্ধ বলেন -'' আমাদের এই দেশটা একদম আলাদা, হিংসা, অহংকার, হানাহানি নেই এখানে। সবাই সবার বন্ধু। সবাই মিলে কাজ করে, সম্পদের সমবন্টনে বিশ্বাসী সকলে, এখানে জরা জন্ম মৃত‍্যু সব আমাদের ইচ্ছা মত নিয়ন্ত্রিত হয়। সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নেই এই দেশে। তবে তুমি তৃষঙ্কর, তথাগতর অংশ তুমি। তাই তোমার জন‍্য আগার্থার দ্বার উন্মুক্ত।''

 সামনেই একটা আপেল গাছে লাল টুকটুকে আপেল ঝুলছে, আরো কত রকমের ফলের গাছ চারদিকে। একটা আপেল ছিড়ে ওর হাতে দেন বৃদ্ধ। বড় পাথরের বেদিতে বসে তৃষ কে বলেন -''আগার্থা, আমাদের এই দেশ। যেখানে বিদ্বেষ হিংসা যুদ্ধ হানাহানি নেই। নেই ধর্মের নামে বিভেদ। ফল খেয়েই বেঁচে থাকে এখানে সবাই। আমাদের পবিত্র ঝরণার জলে খিদে তৃষ্ণা দূর হয়। এখানে একটাই ধর্ম মানবতা। তোমাদের বিষ্ণুপূরাণে এই দেশের নাম বলা হয়েছে, তিব্বত একে চেনে সাংগ্ৰিলা নামে। কেউ কেউ ভাবেন, এটি ঈশ্বরের আবাসভূমি। হিন্দুদের কাছে আর্যদের পবিত্র রাজ্য এই শাম্ভালা। চীনাদের কাছে এই রাজ্য 'হেসি তিয়ান' নামে পরিচিত। পশ্চিমা জগত আবার একে 'হোসি ওয়াং মু' নামে চেনে। তুষার পর্বত দিয়ে আবৃত এ দেশের প্রবেশ দ্বার রামধনু দিয়ে ঘেরা। কেউ খুঁজে পায় না এর প্রবেশ দ্ব।''-''আমি এখানে এলাম কি করে?''-'' আহত অবস্থায় তোমায় এখানে এনেছে এক মহান আত্মা, এই তুষার রাজ‍্যের এক অতন্দ্র প্রহরী, তোমার পিতা।''-''বাবা... বাবা বেঁচে রয়েছে! কোথায় বাবা''-''আত্মা অবিনশ্বর।উনি রয়েছেন। তবে তোমায় এখানে আনার উদ্দেশ্য অন‍্য। পৃথিবী হিংসা আর লোভের নীল বিষে বিষাক্ত হয়ে গেছে। এই যুগের শেষ হবে যখন আমাদের এই আগার্থার শেষ রাজা রুদ্রন জাঁপো পৃ থিবী জয় করবে। কিন্তু এই মুহূর্তে যদি পৃথিবীর লোকেরা নিজেদের মধ‍্যে হিংসা দলাদলি আর যুদ্ধে এভাবে মেতে থাকে তবে পৃথিবী আগেই ধ্বংস হয়ে যাবে। কলি যুগের শেষ উপস্থিত। এই সৌরমণ্ডলের বাইরে অন‍্য সৌরমণ্ডলে পৃথিবীর থেকে অনেক উন্নত উপগ্ৰহে ছিল প্রাণীদের বসবাস। সব ধ্বংস হয়ে গেছে শুধু এই ক্ষমতার লোভে। পৃথিবী কে রক্ষা করার জন‍্য মানুষকে বোঝাতে হবে এই সমস‍্যার কথা। ''তৃষ অবাক হয়ে শুনছিল। আনমনে আপেলটায় একটা কামড় বসায়, এমন মিষ্টি ফল ও আগে খায়নি। সিকিমে এসেই এক প্রাচীন বৌদ্ধমঠ দর্শনে গেছিল ও একবার বন্ধুদের সঙ্গে। সেখানে এক অতিপ্রাচীন বৌদ্ধ লামা হঠাৎ ওকে দেখে গড় হয়ে প্রণাম করে পালি ভাষায় কি সব বলেছিল। একটি অল্প বয়সি লামা ছুটে এসে বৃদ্ধকে টেনে নিয়ে যায় আর তৃষকে বলে কিছু মনে করতে না। কিন্তু আরো দুজন বয়স্ক লামা সেদিন দূর থেকে ঐ ঘটনা দেখে চমকে উঠেছিল। ও সামনে গেলে তারাও ওকে বাও করে বলেছিল সে নাকি তথাগত। লাচেনের বৌদ্ধ মঠের অধ‍্যক্ষ ওর নাম শুনে বলেছিলেন-'' তুমিতো বৌদ্ধের অংশ। '' মায়ের কাছে তৃষ গল্প শুনেছে বিয়ের পর বাবা ছিলেন ধরমশালায়। সে সময় গর্ভবতী মা কে দেখে এক বৃদ্ধ লামা বলেছিলেন 'তৃষঙ্কর রয়েছে তোমার ভেতর মা, ও বদল আনবে।'সেই জন‍্য মা বাবা ওর নাম রেখেছিল তৃষঙ্কর।এমন ছেড়া ছেড়া আরো কথা মনে পড়ে হঠাৎ। আপেলটা পকেটে রাখে ও। বৃদ্ধ ওর কাঁধে হাত রাখেন। বলেন -''কিছুই ভাবতে হবে না তোমায়। শুধু শান্তির বাণী ছড়িয়ে দাও, যে যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই।''-''কিন্তু আজ যারাএলওসি টপকে এপারে আসছে, আমাদের জওয়ানদের যারা গুলি করছে, বর্ডারে যারা অশান্তি করছে তাদের যদি বাধা না দেওয়া হয়....''-''জঙ্গলের পশুরাও এলাকা দখলের জন‍্য লড়াই করে। রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়। বাস্তুতন্ত্র ভেঙ্গে পড়ে না তাতে। পশুরা খিদা পেলেই অন‍্য পশুকে আক্রমন ক‍রে। কিন্তু শিক্ষিত মানুষ যা করছে তা লোভ ও হিংসার বলে বলীয়ান হয়ে করছে। তাতে ক্ষতিই হচ্ছে। রাজা প্রজাদের যুদ্ধে লেলিয়ে নিজে আরামে বসে মজা দেখছে।এই যে সমুদ্রতল থেকে প্রায় কুড়ি হাজার ফুট ওপরে তুষার রাজ‍্যে ওরা নিজেদের সীমানা বাড়াতে ব‍্যস্ত এতে কি লাভ। ঐ অনুর্বর অঞ্চলটা কাউকে কিছুই দিচ্ছে না তবু জমির লোভ, ক্ষমতার লোভ... প্রকৃতির হাতে ছেড়েই দেখো না। হয়তো তুষার ঝড়েই ওরা শেষ হয়ে যাবে, হয়তো প্রবল ঠাণ্ডায় ওরা জমে যাবে। তোমরা রক্ষা করো দেশের জনগনকে। কিন্তু ভরসা রাখো প্রকৃতির উপর।''তৃষঙ্কর অবাক হয়ে শোনে। বৃদ্ধ বলে চলেছেন -''আগে মুনি ঋষিরা মন্ত্র বলে প্রকৃতিকে আয়ত্বে আনতে পেরেছিল। বৃষ্টি আনতে পারত যজ্ঞ করে, নদীপথ ঘুরিয়ে দিতে পারত। গঙ্গাকে মর্তে এনেছিল এক ঋষি শুধু তপস‍্যা করে। সমুদ্র বন্ধন করে পথ নির্মান থেকে সমুদ্র মধ‍্যে নগর স্থাপন সব সম্ভব ছিল। কিন্তু সে ঐতিহ‍্য‍ ভুলে তোমরা বিজ্ঞানের অপপ্রয়োগ করছ। ''-''কিন্তু আমি একা কি করতে পারবো? কে শুনবে আমার কথা? কেনই বা শুনবে?'' তৃষ প্রশ্ন করে।-''একা একটা মানুষ অনেককে বোঝাতে পারে, একটা মানুষ যীশু পেরেছিল ভালোবাসার প্লাবন আনতে। একটা মানুষ গুরু নানক সেও পেরেছিল জাতিকে সঙ্গবদ্ধ করতে, এমন অনেক একটা মানুষের উদাহরণ রয়েছে। এই আগার্থার জল বায়ু বিশুদ্ধ, দেখো তোমার শরীরে কোনো ক্ষত নেই, এখানে চির বসন্ত। এখানে সবাই নির্ভিক।লোভ নেই কারোর মনে। তাই এই জায়গা স্বর্গের মত। কারণ সবাই পবিত্র। মনের শুদ্ধতা প্রকৃতিকে শুদ্ধ করে। ছোট ছোট শিশুদের মধ‍্যে হিংসা আর লোভের বিজ বপন না করে অন্তরকে শুদ্ধ করলেই পৃথিবী টাও স্বর্গ হয়ে উঠবে জেনো। তোমার অন্তর শুদ্ধ, পবিত্র তাই তোমার জন‍্য আগার্থার দরজা খুলে গেছিল। এবার তোমায় ফিরিয়ে দেবো। তুমিই পারবে, পারতেই হবে পৃথিবীর স্বার্থে, মানুষের স্বার্থে তুমি এগিয়ে চলো। ''বৃদ্ধ ওকে নিয়ে এক পাকদণ্ডি পথ বেয়ে মেঘের আড়ালে হারিয়ে যান। বেশ কিছুক্ষণ একটা গিরিখাতের ভেতর দিয়ে এসে একটা গুহায় প্রবেশ করে ওরা। বৃদ্ধ বলেন -'' এ বার তুমি কালচক্র পার করতে চলেছো। তুমি যদি আগার্থার কথা বলো লোকে বিশ্বাস করবে না, তোমায় পাগল বলবে। আবার কিছু লোভী মানব এই রাজ‍্য প্রবেশ করতে চাইবে। তাই আগার্থা থাকুক ঘন মেঘের আড়ালে। তুমি কতটা কি বলতে হবে জানো। আমাদের দ্বার রক্ষি তোমায় কালচক্রর ওপারে ছেড়ে আসবে। ''-''শেষ প্রশ্ন, আমার বাবা কি এই আগার্থাতেই রয়েছে? একবার কি দেখা হবে?''বৃদ্ধ স্মিত হেসে ডান হাতটা সামনে তোলে।বৃদ্ধের কথা মত সামনের পাহাড়ের ফাটলের দিকে তাকাতেই তৃষ দেখতে পায় তার মিলিটারি পোশাকে বাবাকে, সতেরো বছরে এতোটুকু বদলায়নি বেহাগ বসু। 'বাবা' বলে বাবার বুকে ঝাঁঁপিয়ে পড়ে তৃষঙ্কর। সেই চেনা গন্ধ। কিন্তু পাহাড়টা কেমন যেন কেঁপে ওঠে। বাবাকে আঁঁকড়ে ধরে তৃষ। পুরো পাহাড় টলছে। এক তীব্র আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যায়। মাথাটা ঝিমঝিম করে ওঠে।

*******

জ্ঞান ফিরতেই তৃষ দেখে সে মিলিটারি হাসপাতালে ভর্তি। বেশ কিছু উদ্বিগ্ন মুখ তাকে ঘিরে। একে একে সব মনে পড়ে ওর। তীব্র তুষার ঝড়ের ভেতর ওকে উদ্ধার করে স্কোয়াড্রন লিডার গিরেবাল ও তার দুই সঙ্গী। ওর পাঠানো ছবিগুলো দেখে গোয়েন্দারা বুঝতে পেরেছিল বিদেশী শত্রু এগিয়ে আসছে ধীরে ধীরে। কিন্তু ভারতীয় সৈন‍্যরা কিছু করার আগেই তুষার ঝড় ও গ্লেসিয়ারের ভাঙ্গনে শত্রুপক্ষ নিশ্চিন্ন হয়ে যায়। দু দিন ধরে খুঁজে আজ ওকে উদ্ধার করেছেন গিরেবাল সার। তৃষ ভাবছিল বরফের রাজ‍্যে বিমান ভেঙে পড়ে সে বোধহয় একটা স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু এখনো যে তার সমগ্ৰ চেতনা জুড়ে বাবার গন্ধ। একটু পরেই গিরেবাল সার এসেছিলেন দেখা করতে।উনি বললেন ও দারুণ কাজ করেছে, ওর পুরো টিম গর্বিত। হঠাৎ গিরেবাল সার পকেট থেকে একটা ব‍্যাচ বার করে ওর হাতে দিয়ে বলে ওকে যখন পাওয়া গেছিল ওর হাতের মুঠোয় এই ব‍্যাচটা ছিল। তৃষ দেখে ব‍্যাচের গায়ে লেখা উইং কমান্ডার বি বসু। ব‍্যাচটা পকেটে রাখতে গিয়ে ওর হাতে ঠেকে একটা আধ খাওয়া আপেল! চমকে ওঠে তৃষ। আগার্থা আছে, আগার্থা রয়েছে ঐ ঘন মেঘের আড়ালে কুয়াশা ঘেরা কালচক্রের ওধারে। ওর বাবা অবিনশ্বর হয়ে রয়েছে ওখানে। ওকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবার তা পালন করতে হবে ওকে। বাবার ব‍্যাচটা পকেটের ভেতর চেপে ধরে ও মনে মনে বলে 'আমি পারবো। পারতেই হবে, এই পৃথিবীকে জঞ্জাল মুক্ত করে স্বর্গ গড়ে তুলতে হবে। আগার্থার মতো সুন্দর হবে একদিন আমাদের এই চেনা পৃথিবী।


*******


Rate this content
Log in