Debdutta Banerjee

Romance Classics Fantasy

2.0  

Debdutta Banerjee

Romance Classics Fantasy

চিনাম্পা

চিনাম্পা

5 mins
992



পাহাড়ের ঢালে ধাপে ধাপে নেমে গেছে চাষের ক্ষেত, জেহারা সেই শুস্ক ক্ষেতের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এবছর আর আকাশ দেবতা মুখ তুলে চাইবে না মনে হয়। বৃষ্টির অভাবে ক্ষেতগুলো শুকিয়ে হলুদ হয়ে উঠেছে। সূর্যদেবের রোষানলে পুড়ছে গোটা রাজ‍্য। কাল থেকে সূর্যমন্দিরে সব পুরোহিতরা বসে গননা শুরু করেছে। প্রকৃতি দেবীকে সন্তুষ্ট করতেই হবে, তার উপায় বার করতে আলোচনা চলছে। 

কিন্তু প্রতি বছর তো বড় করে প্রকৃতি উৎসব পালন করা হয় এ দেশে। অতি বৃদ্ধরা বলে আজটেকরা যখন এ উপত্যকায় প্রথম এসেছিল তখন এই স্থানে এক ক্যাকটাসের উপর ঈগলের নখরবন্দি অবস্থায় একটি সাপ দেখতে পায়। প্রকৃতি দেবতার প্রতিক সে মূর্ত্তি। তাই এই স্থানেই তারা সভ্যতার সূচনা করেছিল যা পরবর্তীতে এই জন বসতি

টেনোচতিৎলিন অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। প্রকৃতি নিজে অনুমতি দিয়েছিল এই অববাহিকা অঞ্চলে বসবাসের, এখানকার জমি উর্বর। এই উপত্যকা ছিল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৪০০ মি উচ্চতায় এবং পাঁচটি হ্রদের সংযোগস্থলে বলে ফসল ফলত প্রচুর। কিন্তু গত কয়েক বছর যাবৎ এ রাজ‍্যে কারো কুনজর লেগেছে। 

মন্দিরের দিক থেকে একটা সমবেত মন্ত্র উচ্চাযণের আওয়াজ ভেসে আসে। আজকের মত হয়তো গননা শেষ। এবার শুরু হবে দেবতার বন্দনা। কিন্তু এসব গননার শেষ হয় কোথায় কিশোরী জেহারা বুঝতে শিখেছে। পুরোহিত বিধান দেবে যে নরবলি একমাত্র উপায় দেবতাকে খুশি করার। এর আগেও বলি হয়েছে, কারাগার থেকে বন্দীদের এনে সূর্যদেবতাকে ভেট দেওয়া হয়েছে তাজা রক্ত। মন্দিরের সিঁড়ি বেয়ে সে রক্ত গিয়ে মিশেছে চাষের ক্ষেতে। শস‍্য শ‍্যামলা হয়ে উঠেছে ধরিত্রী। জনগন খুশি হয়েছে তা দেখে। কিন্তু সে সব ভাবলেই বুকের ভেতরটা কেমন টনটন করে ওঠে জেহারার। কানে বাজে অসহায় বন্দীদের আর্ত চিৎকার। কিন্তু সম্রাট তো পুরোহিতের হাতের পুতুর। তাই তিনি জনগনের কথা ভেবে এই প্রথা রদ করতে ভয় পান। প্রকৃতি দেবী রুষ্ঠ হলে মহাপ্রলয় আসবে সবাই জানে। প্রতিদিন সূর্যাস্তের পর প্রার্থনা করতে হয় পরদিন সূর্যদয়ের। না হলে অন্ধকার গ্ৰাস করবে রাজ‍্যকে। সূর্য যতক্ষণ দেখা না দেয় শান্তি নেই এ দেশে। কিন্তু এবারের সমস‍্যাটা ভিন্ন। প্রকৃতি দেবী রুষ্ঠ হয়েছেন কেন কেউ জানে না। জলের অভাবে ধুকছে চাষের ক্ষেত। নিচু জমি গুলোতে তবু খাল কেটে হ্রদের জল দিয়ে চাষ হচ্ছে। কিন্তু উঁচু জমি গুলোতে জল দেওয়ার কোনো ব‍্যবস্থা নেই। পাহাড়ের উপরের সব জলাশয় শুকিয়ে গেছে।


বহুদূরে হ্রদের গায়ে ভাসমান একটা সবুজ বিন্দু দেখে একটু অবাক হয় জেহারা। সবুজ এমন জলযান আগে তো দেখেনি ও। পায়ে পায়ে জুম চাষের ধাপগুলো পেরিয়ে নেমে যায় নিচের দিকে। এবার অনেকটাই স্পষ্ট, জলযানটা ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে! কিন্তু এ কেমন যান? সবুজ শস‍্যে ভয়ে রয়েছে যেন এক খণ্ড জমি। খুব ধীরে ধীরে ভেসে বেড়াচ্ছে হ্রদের নীল জলে। খুব ভালো করে লক্ষ‍্য করে জাহারা। সবুজ ভূখন্ড, কত পর এক খণ্ড সবুুজ চোখে পড়ল। মৃদু হাওয়ায় দোল খাচ্ছে সবুুুজ চারাগাছ গুলো। কিন্তু এমন ভাসমান


ভূখণ্ড! তবে কি দেবতা মুখ তুলে চাইলেন? এই হ্রদ থেকে চাষের জন‍্য জল শস‍্যক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়ার জন‍্য নানা পরীক্ষা চলছে। কিন্তু জল উপরে তোলার কোনো ব‍্যবস্থা এখনও হয়নি। সবুজ ভাসমান ভূখণ্ড আরো কাছে আসতেই যুবককে দেখতে পায় জাহারা। সে ও তাকিয়ে আছে ওর দিকে।

হ্রদের কিনারে ভেসে আসতেই জাহারা প্রশ্ন করে -''এ কেমন জলযান? আগে দেখিনি।''

-'' জল যান নয়, এ আমার শস‍্যক্ষেত্র। জমিতে জলের অভাবে যখন শস‍্য নষ্ট হতে বসেছে তখন হ্রদের জলে এভাবেই আমি চাষ করেছি।'' যুবক মৃদু হেসে উত্তর দেয়।

-'' কিন্তু এ কি করে সম্ভব, এই ভাসমান ভূখণ্ড তোমার সৃষ্টি ? তুমি কি জাদুকর?''

-'' না, জাদুকর নই। তবে এ আমার সৃষ্ট শস‍্য ক্ষেত্র। ''

-'' এ কেমন করে!''

নলখাগরার চাদর বুনে তার উপর মাটি ফেলেএ ভুখন্ড বানিয়েছি। মাটিতে সার দেই রীতিমতো, শস‍্যদানা ছড়িয়ে দিয়েছি। হ্রদের জলে ভেজা মাটিতে চারাগাছ বেড়ে উঠেছে। এমন আরো বানাতে হবে। তবেই আমাদের চাষের সমস‍্যা মিটবে। ''

ততক্ষণে আরো কয়েকজন চাষী ও দুজন পেয়াদা চলে এসেছে। সবাই অবাক হয়ে দেখছে এক খন্ড চাষের ক্ষেত ভেসে বেড়াচ্ছে হ্রদের বুকে। মুহূর্তে খবর গেছে সূর্য মন্দিরে রাজার সঙ্গে পুরোহিতরা ছুটে এসেছে এই অদ্ভুত চাষপ্রথা দেখতে। 

রাজার প্রশ্নের উত্তরে যুবক বলে

-'' রাজ‍্যে এমনিতেই চাষযোগ‍্য জমি কম, পাহাড়ের ঢালে কষ্ট করে শস‍্য ফলাতে হয়। তাই এ ব‍্যবস্থা করেছিলাম। এই খড়ার মরশুমে এভাবেই আরো 'চিনাম্পা' তৈরি করে চাষ করা যেতেই পারে। '' নিভৃক যুবকের উত্তরে জনগনের মুখে হাসি ফোটে।

কিন্তু পুরোহিতদের পছন্দ হয়নি এ ব‍্যবস্থা। প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে এ কেমন যেন জেহাদ ঘোষণা। এতে যে তাদের কথা আর মানবে না সাধারণ মানুষ।প্রতিবাদ করতে চেয়েছিল তারা। কিন্তু রাজা ও প্রজা মেতে উঠেছে ততক্ষণে এই নতুন সৃষ্টির আনন্দে। 


রাজ‍্যের প্রতিটা বড় জলাশয়ে এভাবেই তৈরি হয়েছিল ভাসমান শস‍্যক্ষেত্র। আর অন্তত কিছু পক্ষকালের জন‍্য নরবলি বন্ধ হয়েছিল। 


কিন্তু পুরোহিতদের মধ‍্যে গোপনে চলছিল শলা পরামর্শ। অবশেষে পরের চন্দ্রমাসে সবাই একসঙ্গে রাজার কাছে আবেদন করে। প্রধাণ পুরোহিতের বক্তব‍্য -'' যুবক দামাস্কার এই কাজেইরুষ্ঠ হয়েছেন প্রকৃতির দেবী। ওর এই সৃষ্টিতে দেবী কুপিত হয়ে জলসিঞ্চন বন্ধ করেছেন। তাই এই পূর্ণ চন্দ্রে দেবীকে খুশি করতে বলি চাই। এই দামাস্কার বলি দিলেই বৃষ্টি নামবে আকাশ জুড়ে। 

রাজা স্তব্ধ হয়ে যান। পুরোহিতরা সব ভগবানের অংশ। তাদের উপর কথা বলা যায় না। কিন্তু ঐ নিরিহ ছেলেটা যেটা করেছে তাতে তো জনগন উপকৃত হয়েছে। তাই ওর বলি জনগন মেনে নেবে না। একটা দিন সময় চেয়ে নেয় রাজা। 


জেহারা ছুটে চলেছে, পায়ের নিচে নুড়ি, পাথর, কাটা কোনো কিছুই আজ বাধা নয়। রক্তাক্ত পায়ে ও ছুটে চলেছে হ্রদের দিকে। দামাস্কাকে বাঁচাতেই হবে। ওকে নিয়ে পালিয়ে যাবে জেহারা পুরোহিত দের নাগালের বাইরে। অবশেষে হ্রদের ধারে ওর ছোট্ট সবুজ ভূখণ্ডে দেখা পেলো দামাস্কার। জেহারাকে দেখে মৃদু হেসে এগিয়ে এল দামাস্কা।

 হাপাতে থাকে জেহারা। উত্তেজনায় গুছিয়ে কথা বলে উঠতে পারে না। দামাস্কাকে টেনে নিয়ে উঠে যায় চিনাম্পায়। ছোট ছোট ঢেউ ভেঙ্গে ভেসে চলে দামাস্কার সবুজ স্বর্গ।

-'' আমাদের পালাতে হবে। আজ, এখনি, এই মুহূর্তে। '' জেহারা দামাস্কার একটা হাত শক্ত করে ধরে।

-''পালাবো কেন? কী আমার অপরাধ?''

-''অপরাধ... তুমি বুদ্ধিমান। পুরোহিতদের থেকে বেশি বুদ্ধিমান। তুমি যে ভাসমান চাষের প্রচলন করেছো তার জন‍্য পুরোহিতরা ক্ষেপে গেছে। ওরা নরবলি চায়। আর তুমি ওদের শত্রু তাই তোমার বলি দেবে ওরা। ’' জেহারা এক নিশ্বাসে বলে ওকে।

-'' আমি তো কারও ক্ষতি করিনি। ''

-''পালিয়ে চল। আমিও যাবো তোমার সঙ্গে। ওরা আসছে, তোমায় ধরে ফেলবে। আমায় নিয়ে পালিয়ে যাও। ''

-'' কিন্তু পালিয়ে যাবো কোথায়?''

-''অন‍্য কোথাও। অন‍্য দেশে, ঐ নীল সমুদ্রে ভেসে যাবো চলো। ''

-''কিন্তু তুমি কেন যাবে আমার সঙ্গে? তুমি ফিরে যাও ।''

দু চোখ জলের ভারে টলটলিয়ে ওঠে। জেহারা বলে -'' তোমার সঙ্গে কাটাতে চাই এ জীবন। ভেসে যেতে চাই তোমার সঙ্গে।''

চমকে ওঠে দামাস্কা, মেয়েটার গললার স্বরে কিছু একটা রয়েছে। ও না করতে পারে না।তাড়াতাড়ি সমুদ্রের দিকে চলে যায় ওরা। পাহাড়ের খাঁজে লুকানো ছোট্ট নৌকাটা নিয়ে নীল সমুদ্রে ভেসে পড়ে দুজনে। জল ছাড়া কোনো খাবার নেই সঙ্গে। হয়ত এভাবে ভাসতে ভাসতে এক নতুন ভূখণ্ডে গিয়ে ওরা পাতবে নতুন সংসার। তৈরি হবে নতুন গোষ্ঠি। এভাবেই গোষ্ঠিগুলো ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। চিনাম্পা স্মরণীয় হয়ে থাকলেও তার স্রষ্টার নাম নেই ইতিহাসে। এভাবেই হারিয়ে রায় কত আবিস্কার। বদলে যায় ইতিহাস।




Rate this content
Log in

Similar bengali story from Romance