Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

Sanghamitra Roychowdhury

Fantasy Classics


4.3  

Sanghamitra Roychowdhury

Fantasy Classics


হারানো সুর

হারানো সুর

15 mins 12.1K 15 mins 12.1K

নয়নিকার সাথে আমার সম্বন্ধ করে বিয়ে, অঘ্রাণের প্রথম লগ্নে। অষ্টমঙ্গলায় শ্বশুরবাড়ী আসা হয়নি, ছুটি পাই নি বলে। বিয়ের মাসখানেকের মাথায় দু-একটা এটাসেটা ছুটি মাথায় মাথায় পড়ায় সঙ্গে শনিরবির সাথে দিন তিনেকের ছুটি ম্যানেজ করে সাতদিনের জন্য শ্বশুরবাড়ী এসেছি। ঘুরে ঘুরে বাড়ীর এধার ওধার সব দেখছি, সত্যিই দেখবার মতোই বটে বাড়ীটা। বিরাট চকমেলানো দু'মহলা তিনতলা বাড়িটাতে সব মিলিয়ে সাকুল্যে মাত্র জনা ছয়েক মানুষের বসবাস। তাও কাজের রান্নার সব লোকজনকে ধরে। একেবারে গঙ্গার গা ঘেঁষে ওঠা ঐ বিশাল বড়ো বাড়ীটার আনাচেকানাচে কেমন যেন একটা গা ছমছমে, ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা নিঃঝুম ভয় ভয় পরিবেশ ছড়িয়ে রয়েছে। দিনে বা রাতে সর্বত্রই, যেন সবসময়েই। ও, আচ্ছা, আমার নামটাই বলা হয় নি, আমি আলোকময় বসুরায়.... ডাকনাম আলোক।


নতুন জামাই আমি, সারা বাড়ী ঘুরে বেড়াচ্ছি একা একাই। দেখেই হয়তো আমার বৌ নয়নিকা আর ওর মা, মানে আমার শাশুড়ি বললো, "সারাদিন এধার ওধার ঘুরে না বেড়িয়ে, একটু শুয়ে বসে বিশ্রাম নাও। অতদূর থেকে মাত্র সাতদিনের জন্য আসা, আবার ফিরতে হবে এতোটা পথ। ধকল তো আছেই, কাজেই বিশ্রামও দরকার।" সংক্ষিপ্ত "হুম" বলে আমাদের জন্য বরাদ্দ হলঘরাকৃতির বিশাল শোবার ঘরটায় গিয়ে সেঁধিয়ে গেলাম ঠিকই, তবে আমার মন টিকছে না, ঐ ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে। আমার এই শ্বশুরবাড়ীতে সবচেয়ে সমস্যার বিষয় হোলো, সমবয়সী তো দূরের কথা, পরিবারে কোনো পুরুষ সদস্য নেই। ঐ অতবড়ো বাড়ীটায় পুরুষমানুষ বলতে, এক বুড়ো মালী। বাড়ীর পেছন দিকের বাগানের একপাশে একটা পাকা দেওয়াল আর টিনের চালাওয়ালা ঘরে সে একাই থাকে। আর আছে এক ড্রাইভার, এ বাড়ীর পুরনো আমলের এক সাদা অ্যাম্বাসাডরকে চালানোর জন্য। সেও মধ্যবয়সী, সকালে হাজিরা দিয়ে যায়, কোথাও যাবার থাকলে জানিয়ে দেওয়া হয় তাকে। ঘড়ি ধরে সময়মাফিক ড্রাইভার এসে হাজির হয়।


আদ্যোপান্ত শহুরে ছেলে আমি, কোলকাতায় বাস কয়েক পুরুষের। দিনরাত এরকম ঘরে বদ্ধ হয়ে বসে থাকা আমার অভ্যাস নেই। কিন্তু তবুও কিছু করার নেই। নতুন জামাই আমি, কোলকাতা থেকে এতো দূরে, একেবারে বেনারস বা বারাণসী শহরের গঙ্গার পাড় ঘেঁষে আমার শ্বশুরবাড়ীতে এসেছি। বিয়ের সম্বন্ধ দেখাশোনা, আশীর্বাদ, এমনকি বিয়েটাও হয়েছিলো কোলকাতাতেই, নয়নিকার আপন ছোটমামার বাড়ীতে থেকে। তাই এখন এই বেনারসে আসাটা আমার প্রথমবারের জন্য মূলতঃ বাবা বিশ্বনাথকে প্রণাম করতেই, দুই পরিবারের ইচ্ছেয়। যুবক বয়স, নতুন জায়গা, অন্যরকম অপরিচিত পরিবেশ। স্বভাবতই কৌতূহলটা ঐ জন্যই আরো বেশীই। আবার কবে আসা হয় না হয় তার তো তেমন ঠিক নেই। সাতপাঁচ এলোমেলো চিন্তার চাষ চলছে মন-মস্তিষ্ক জুড়ে।


পরপর গত দু'রাতেই দেখেছি দোতলায় আমাদের থাকার ঘরের পশ্চিম দিকের জানালা দিয়ে, টানা লম্বা করিডোরের ওপাশের বাঁকের পরের অংশের একেবারে শেষপ্রান্তের একটি ঘরে সারা রাত আলো জ্বলছে। হয়তোবা তেমন কোনো বিশেষ কারণ নেই, তবু ওই ঘরটির প্রতি আমার কৌতূহলবশতঃ আগ্রহ বেড়ে গেল একেবারে কয়েকগুণ। শার্লক হোমস, ব্যোমকেশ, কিরিটী, ফেলুদা গুলে খাওয়া ছেলে আমি, তাই মনে হোলো বেশ একটা যেন রোমাঞ্চকর, ঘনীভূত রহস্য রহস্য গন্ধ পাচ্ছি।

    

আমার বৌ নয়নিকা যেন একটু বাড়াবাড়ি রকমের সুন্দরী, এবং ততোধিক বাড়াবাড়ি রকমের ওর যৌবনের ছটা। সুতরাং এহেন নতুন বৌ বিছানায় থাকলে নতুন বিয়ে হওয়া ‌ছেলের রাতের ঘুম উধাও হতে বাধ্য। সুতরাং, তৃতীয় দিনও রাতভর ঘুমের অভাবেই কাটলো বটে, কিন্তু পশ্চিমের জানালায় চোখ পড়তেই আলোজ্বলা ঘর, কৌতূহল শুধু আরো বাড়ালোই। এবং ভোররাতে ঘুমিয়ে পরের দিন ঘুমই ভাঙ্গলো যখন, সূর্যদেব তখন একেবারে বেনারসের গঙ্গার মাথার ওপরের আকাশের ঠিক একেবারে মাঝ মধ্যিখানে প্রায়। দুপুর হতে বেশী দেরী নেই। এরপর বিছানা ছেড়ে উঠেই একেবারে স্নান টান সেরে সোজা খাবার টেবিলে, নয়নিকার সাথে। মধ্যাহ্ন ভোজনের পরে দুপুরবেলা আবার আয়েশী আরেকদফা ভাতঘুম দিয়ে, বৌ নিয়ে সারারাত্রি জাগরণের রসদ জোগাড় করে নিলাম।


দিবানিদ্রা সেরে উঠে চায়ের সাথে টায়ের সহযোগে বিকালবেলার আড্ডায় উঠলো গঙ্গার ঘাটে কাশীর বিখ্যাত গঙ্গারতি দেখতে যাওয়ার কথা। নয়নিকা আর আমি পায়ে পায়ে এগোলাম গঙ্গার ঘাটের দিকে। একান্তে জিজ্ঞেস করে ফেললাম নয়নিকাকে গত তিনদিন ধরেই পশ্চিমের জানালা দিয়ে দেখা সারারাত ধরে একটি ঘরে আলো জ্বলার কথা। নয়নিকা এ প্রসঙ্গ পুরো এড়িয়ে গেলেও ওর হঠাৎ একটু যেন চমকে ওঠা একেবারেই আমার চোখ এড়ায়নি। সকলে যখন প্রবল হৈচৈ সহকারে পূজারীদলের সঙ্গে গঙ্গামাতার জয়ধ্বনি দিচ্ছে তখন আমি ভিড়ের মধ্যে থেকে নয়নিকার হাত শক্ত করে ধরে গুটি গুটি পায়ে বেরিয়ে এলাম। এবং শহরের ভেতরে ঘুরে বেড়ানোর কথা বলে হাঁটতে হাঁটতে একটু এগলি সেগলি ঘুরে বড়ো রাস্তায় এসে নয়নিকাদের বাড়ীর পেছন দিকের রাস্তায় চলে এলাম। দিকনির্দেশ যতটা বুঝি তাতে এটা পশ্চিমের রহস্যময় ঘরের পেছনদিক বলেই মনে হোলো।


নয়নিকা আগডুম বাগডুম কতকিছু বলে চলেছে অনর্গল, তার কতক আমার কানে ঢুকছে, আর কতক কানের পাশ দিয়েই স্রেফ গঙ্গার হাওয়ায় উড়ে চলে যাচ্ছে। লক্ষ্য করলাম সার সার নিশ্ছিদ্র অন্ধকার ঘরের শেষপ্রান্তে একটিই মাত্র ঘরে আলো জ্বলছে, বেশ জোরালো আলো। আমার অনুমান যদি সঠিক হয়, তবে ঐটিই সেই গত তিনরাত ধরে দেখা সারারাত ধরে আলোজ্বলা ঘর। বেশ একটা চাঞ্চল্যকর অনুভূতি হচ্ছে, আসলে আমার হিরোরা, মানে হোমস, ব্যোমকেশ, কিরিটী, ফেলুদা.... সবার কথা একবার মনের মধ্যে দিয়ে ভেসে চলে গেলো। কাশী, বেনারস বা বারাণসী, যে নামেই ডাকা হোক, বেশ একটা রহস্যময় শহর। বেশ অনেকগুলো পড়া রহস্যোপন্যাসের প্রেক্ষাপটই এই শহরের অলিগলি ঘিরে। ততক্ষণে আমি মনস্থির করে ফেলেছি, এই আলোজ্বলা ঘরের রহস্য আমি উদ্ধার করবোই।

নয়নিকা সবসময় আমার সাথেই সেঁটে রয়েছে, ওর মায়ের নির্দেশে। বাড়ীতে লোকজন তো তেমন নেই, তাই রাতের খাওয়ার পরে আমার শাশুড়ি, মানে নয়নিকার মাকেই বললাম, ছাত থেকে একবার গঙ্গার শোভা দেখার ইচ্ছে রয়েছে। তা আমার শাশুড়ি বললো, "রাতে কী আর দেখবে, দিনে দেখো।" আমি মরিয়া তখন, বলে উঠলাম, "শুনেছি কাশীর গঙ্গাবক্ষে রাতে নাকি নৌকায় নৌকায় পান ও গানের মেহফিল বসে। তা একবার দেখতে চাই দূর থেকেই, নিজের চোখে।" শাশুড়ি আমতা আমতা করে বললো, "সেসব দিন কী আর আছে? ওসব আগেকার দিনে রাজা-রাজড়া, জমিদার, আর বড়ো বড়ো হাভেলিওয়ালাদের ব্যাপারস্যাপার ছিলো। সেদিন আর নেই..... তবু যখন রাতের গঙ্গা ছাত থেকে দেখতে চাও, দেখে এসো একবার। যা নৈনী, নিয়ে যা," বলে আঁচল থেকে খুলে ছাতের সিঁড়ির দরজার চাবিসমেত চাবির গোছা ধরিয়ে দিলো।


নয়নিকা অবাক চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে চাবির গোছা হাতে নিয়ে আমার হাত ধরে টানলো। আমার উদ্দেশ্য তো আলাদা, ছাতে যাবার সিঁড়িতে পৌঁছতে হলে ঐ সারারাত আলোজ্বলা ঘরের সামনে দিয়েই যেতে হবে। যদি কিছু চোখে পড়ে। অবশ্য লম্বা করিডোরের দিকের জানালা আর দরজা ভেতর থেকে আটকানো বলেই মনে হোলো। তবে বন্ধ জানালার খড়খড়ি আর দরজার নীচের সুক্ষ্ম ফাঁক দিয়ে আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে, খুব হালকা, সরু রেখায়। আর কিছুই দেখতে পেলাম না। অবশ্য ছাতে উঠে সত্যিই ভীষণ ভালো লাগলো। ছাতে না উঠলে এই রাতের বারাণসী শহরের আর অন্ধকার গঙ্গার বুকে প্রতিফলিত শহরের আলোকোজ্জ্বল শোভা দেখাই হোতো না। যেন দীপাবলির রাত।


ছাত থেকে ফেরার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে সেই যে রহস্যময় ঘর, তার দরজায় হাত ছোঁয়ালাম বেশ জোরেই। আমার হাতের চাপে ঘরের ভেজানো দরজা হাট করে খুলে গেলো। নয়নিকা আমার হাত টেনে ধরে রইলো, ঘরের ভেতরে ঢুকতে না দেবার জন্য। কিন্তু ততক্ষণে আমি নয়নিকার হাত শক্ত করে ধরেই খোলা দরজা দিয়ে ঢুকলাম বিশাল এক ঘরে। আমরা যে ঘরটায় শুচ্ছি থাকছি, এটাও ঠিক সেরকমই হলঘরের মতো আকারেরই ঘর। 

ঘরের মেঝেতে একপাশের দেওয়াল জুড়ে বিরাট এক ধবধবে সাদা ফরাস পাতা। সবকটি দেওয়ালই বিভিন্ন রকমের বিদেশী অয়েল পেন্টিং আর অনেকগুলি পোর্ট্রেট দিয়ে সাজানো। ঘরের যেদিকে ঝুলবারান্দা বা ব্যালকনি তার বাইরের দিকে দূর অব্দি গঙ্গা দেখা যাচ্ছে। গোটা ফরাস জুড়ে প্রায় সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র। এতোকিছুর নামও আমি জানি না। একদিকের দেওয়াল জুড়ে, একদম দরজার কাছ পর্যন্ত টানা কাঁচের পাল্লা দেওয়া মেহগনি কাঠের বুকশেলফ ঠাসা চামড়ায় বাঁধানো বইয়ের সারে। আর ব্যালকনির দরজার দিকে মুখ করে, আমাদের দিকে পেছন করে শ্বেতপাথরের মেঝের ওপর বসা এক নারীমূর্তি। নয়নিকা থরথর করে কাঁপছে। আমি এগিয়ে গিয়ে পাশ থেকে ঝুঁকে দেখলাম, সেই নারীমূর্তির কোলে একটা সুরবাহার, এই বাদ্যযন্ত্রটি আমার চেনা।

মনে হোলো কিছুক্ষণ আগেই হয়তো ঐ নারীমূর্তি গান গাইছিলো, বসে থাকার ভঙ্গিটি এমনই। আশেপাশে যে কেউ এসেছে, তাতে ঐ নারীর কোনো ভ্রূক্ষেপই যেন নেই। সুন্দর একটা মৃদু গন্ধ সারা ঘরে ছড়িয়ে রয়েছে। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই নয়নিকা আমার হাত জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলো। এবার ঐ নারীমূর্তি আমাদের দিকে মুখ ফেরালো। আমার ঊনত্রিশ বছর বয়সী পুরুষ শরীরের সমস্ত অস্তিত্ব যেন কেঁপে উঠলো। ছিলা ছেঁড়া ধনুকের মতো ছিটকে উঠলাম যেন আমি।


মানুষ এতো সুন্দর দেখতে হয়, হতে পারে? স্নিগ্ধ শান্ত সৌন্দর্যের প্রতিমূর্তি ঐ নারী.... ঐ ভদ্রমহিলা।

আমি বুঝতে পারছি না, এই মূহুর্তে আমার কী করা উচিৎ। নয়নিকা কাঁদছে এখনও ভয়ার্ত আওয়াজ তুলে। আমার কাছে কিচ্ছু পরিষ্কার হচ্ছে না। আমি নয়নিকার হাতটা আরো শক্ত করে চেপে ধরলাম।


সুরবাহারটা ধীরে ধীরে পাশের ফরাসে নামিয়ে রেখে ভদ্রমহিলা উঠে দাঁড়িয়েছে, এগোচ্ছে আমাদের দিকে। আর আমার পাদুটো কেউ যেন পেরেক দিয়ে আটকে দিয়েছে মেঝের সঙ্গে। বেশ বুঝতে পারছি এই পৌষের শুরুর দিকের রাতেও আমার কপাল বেয়ে ঘাম গড়াচ্ছে। ভদ্রমহিলা আমাদের দিকেই এগোচ্ছে ধীরে ধীরে। বুঝতেই পারছি না এই ভদ্রমহিলা কে, কেন এখানে দরজা বন্ধ করে বাড়ীর সকলের থেকে দূরত্ব রেখে, কেনই বা সারারাত ঘরে আলো জ্বলে, আর যদি এতো বাদ্যযন্ত্রের সাথে ভদ্রমহিলার সহবাস, তবে গত তিনরাত চারদিনের মধ্যে একবারও কোনো গান বা বাজনার আওয়াজ শুনলাম না কেন? প্রশ্নচিহ্নগুলো আমাকে ভীষ্মের শরশয্যার তীরের মতো বিঁধে রয়েছে।

ভদ্রমহিলা আমাদের একেবারে সামনে, মুখে মিষ্টি হাসি, চোখে কৌতুক ভরা। আরো এগিয়ে ভদ্রমহিলা এবার নয়নিকাকে বুকে টেনে নিলো। নয়নিকা ঐ ভদ্রমহিলার কাঁধে মুখ গুঁজে তখনও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, আর ভদ্রমহিলা পরম স্নেহে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে নয়নিকার পিঠে-মাথায়। আমি তখনো যে তিমিরে সেই তিমিরে। লক্ষ্য করছি শুধু ঐ ভদ্রমহিলাকে। সৌন্দর্যের কথা তো আগেই বলেছি, আমার মতো অজ্ঞ পুরুষ মানুষ হয়েও চেষ্টা করছি ভদ্রমহিলার বয়সটা অনুমান করার। কত বয়স হবে? আমার বয়সীও হতে পারে, আবার আমার থেকে দুই-চার বা দশ বছরেরও বড়ো হতে পারে।


মেয়েদের বয়স আন্দাজ করা যে সত্যিই খুব দুরূহ কাজ তা অচিরেই বুঝতে পারলাম আমি।

নয়নিকার কান্নার দমক কমে এসেছে, ভদ্রমহিলা এবার হাসিমুখে আমার দিকে ফিরে তাকিয়ে। আমার গলাটা একটু শুকিয়ে উঠেছে, হাঁটুটাও যেন অকারণেই একটু কেঁপে উঠলো। ভদ্রমহিলা এবার হাত বাড়িয়ে আমার চিবুক স্পর্শ করে চুমো খেলো।

কেমন সম্মোহিতের মতো দাঁড়িয়ে তখনও আমি, চকিতে মনে হোলো ভদ্রমহিলার মুখের আদলের সাথে নয়নিকার ও ওর মায়ের যথেষ্ট মিল রয়েছে।

এ তবে এই পরিবারেরই সদস্য কেউ, খুব আপন নিকটাত্মীয় কেউ হবে হয়তো। সম্বিৎ ফিরলো নয়নিকার মায়ের গলার আওয়াজে। ছাত থেকে ফিরতে আমাদের দেরী দেখে এগিয়ে এসে আমাকে ও নয়নিকাকে এখানে দেখে কখন যে নয়নিকার মা আমাদের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে, তা একটুও টের পাইনি। নয়নিকার মায়ের গলা, যেন অনেক দূর থেকে, কাঁপা কাঁপা, "আমার বড়ো মেয়ে চয়নিকা, নয়নিকার বড়ো দিদি।"


এতোক্ষণে সামান্য পরিষ্কার হয়েছে আমার মাথা, এই ঘটনা অর্থাৎ নয়নিকার একটি দিদি থাকার কথা লুকিয়েই বিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। যদিও তাতে আমার কিছুই যায় আসে না, তবুও প্রশ্ন হোলো যে নয়নিকার এই দিদির কথা গোপন করা হয়েছিলো কেন? নাগরিক ভদ্রতার খাতিরে এবং নতুন জামাই হবার সুবাদে আমার ভারী সংকোচ হোলো নতুন করে পরিবারটিকে বিব্রত করতে। বিয়ে যখন হয়েই গেছে আমার সম্পূর্ণ মতেই, তখন এই মূহুর্তে এই বিষয়টি নিয়ে জলঘোলা করার কোনো মানে হয় না বলেই আপাতত আমার মনে হোলো। আর একটা কথা ভীষণভাবে মনে হোলো আমার, অযাচিত উগ্র কৌতূহলবশতঃ কাউকে অপ্রস্তুত পরিস্থিতিতে ফেলাটাও এক রকমের অন্যায়। আমার বিশ্বাস নয়নিকার মা নিজেই আমাকে জানাবে সব। এই মূহুর্তে অপেক্ষা করাতেই বুদ্ধিমত্তার পরিচয়।


নয়নিকার মা বড়ো মেয়েকে জড়িয়ে ধরে ধরে ঐ বড়ো ঘরটার লাগোয়া একটা ঘরে নিয়ে ঢুকে গেলো। চোখের ভাষায় আমি বুঝলাম আমারও এখন নয়নিকাকে নিয়ে নিজেদের ঘরেই যাওয়া উচিৎ। সে রাতে কেমন যেন নববিবাহিত দাম্পত্য সুখক্রীড়ার সুর-তালটা কেটে গেলো। নয়নিকা চুপচাপ আমাদের ঘর লাগোয়া ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে অন্ধকারে চোখ বিছিয়ে। আমার মনেও এই চয়নিকা পর্বটা কাঁটার মতো বিঁধে রয়েছে। নিজের থেকে কিছু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছেই হোলো না আমার, নয়নিকাকে বা ওদের মা'কে। কে জানে সামান্য স্পর্শেও কোন আগ্নেয়গিরির জ্বলন্ত উত্তপ্ত লাভাস্রোত বেরিয়ে আসবে। নীরবে গিয়ে আমি চুপচাপ আমাদের ঘরের খাটের ওপর শুয়ে পড়লাম, একপাশে, নয়নিকার জন্য জায়গা ছেড়ে রেখে। নয়নিকা তখনও ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে।


খুব ভোরে ঘুম ভাঙলো, নানারকম চিন্তার জট মাথায় নিয়ে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। পাশে তাকিয়ে দেখলাম নয়নিকা জড়সড় হয়ে আমার দিকে পেছন করে শুয়ে রয়েছে, তখনও ঘুমিয়ে আছে। রাতে শেষপর্যন্ত ঠিক কখন নয়নিকা এসে শুয়েছে, তা জানি না আমি। এখন ওর অসহায়ের মতো শুয়ে থাকা, এই সংকুচিত হয়ে থাকা দেখে আন্তরিকভাবে আমি ভারী কষ্ট পেলাম যে। আসলে এই অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আমি নয়নিকার প্রেমে পড়েছি। বাড়ী থেকে পছন্দ করে বিয়ে হলেও, আমি আমার বৌ নয়নিকাকে ভয়ঙ্কর ভালোবেসে ফেলেছি। কাল রাতে এতটাই অদ্ভুত আবেগতাড়িত ও গম্ভীর হয়ে পড়েছিলাম যে, আমার মিষ্টি আদুরে বৌটাকে কাল রাতে আদর পর্যন্ত করতে পারিনি। নয়নিকার দিকে পাশ ফিরে সস্নেহে ওকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে রইলাম। আগের রাতের কথাগুলো মনে পড়লো আবার।

নয়নিকাকে বুকে জড়িয়ে আবার বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। দরজায় ঠুকঠুক করে নক করার আওয়াজে চোখ মেললাম আবার। ততক্ষণে নয়নিকাও ধড়মড়িয়ে উঠে বসেছে। মলিন করুণ হাসি মুখে নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে গিয়ে দরজা খুললো নয়নিকা, তাড়াহুড়ো করে। রান্নার লোক যশোমতী দিদি এসেছে। ট্রেতে টিকোজি দিয়ে ঢাকা টিপটে আমাদের সকালের চা আর জলখাবার নিয়ে আজ ওপরেই, আমাদের শোবার ঘরেই। আমি খালি পেটে জল খেয়ে তারও পরে মিনিট পনেরো পার করে মুখ ধুয়ে তবে চা খাই। বিয়ের পরের এই মাসখানেকের মধ্যেই নয়নিকা এসব ভালো মতোই জেনে গেছে। আমাকে জলের গ্লাস হাতে ধরিয়ে দিয়ে নয়নিকা এটাচড বাথরুমে ঢুকে গেলো।


তখনও খাটেই বসে আমি, পিঠে সবকটি বালিশ জড়ো করে হেলান দিয়ে, পা ছড়িয়ে। নয়নিকা সদ্য স্নান করে বেরিয়েছে, ভারী সুন্দর দেখতে মেয়েটাকে। সাথে সাথেই আমার মনে পড়লো চয়নিকার মুখটা। দু'বোনই অপূর্ব সুন্দরী! আমার হাতে ব্রাশ-পেষ্ট ধরিয়ে দিলো নয়নিকা। ওদের কথা ভাবতে ভাবতেই মুখ ধুয়ে এসে চায়ের কাপে প্রথম চুমুকটা দিলাম আমি। আর তখনই বাইরের বারান্দা থেকে গলা খাকারি দিয়ে নয়নিকার মা, মানে আমার শাশুড়িমা এসে আমাদের ঘরে ঢুকলো।


নয়নিকা তাড়াতাড়ি মা'কে একটা চেয়ার এগিয়ে দিলো বসার জন্য। মা বসলে নয়নিকা মায়ের পেছনে গিয়ে চেয়ারের ব্যাকরেস্টে দু'হাত রেখে নিঃশব্দে দাঁড়ালো।

নয়নিকার মা বলে চলেছে, আর আমি হতবাক হয়ে শুনছি, "পারো তো বাবা আলোক, ক্ষমা করে দিও তুমি আমাকে। এতো বড়ো একটা কঠিন সত্য গোপন করে নৈনীর সাথে তোমার বিয়ে দেবার জন্য।" আমি তাড়াতাড়ি চায়ের কাপটা টেবিলে নামিয়ে রেখে উঠে গিয়ে আমার শাশুড়ির জোড় করে ধরা হাতদুটো ধরে বললাম, "এসব আপনি কী বলছেন মা। নিশ্চয়ই কোনো গুরুতর কারণেই গোপন করেছেন চয়নিকা দিদির কথা। এতো এভাবে বলবেন না। আমিও তো এখন আপনার এই পরিবারেরই একজন সদস্য। আপনি এই নিয়ে এতো দুর্ভাবনা করবেন না।" একটু থেমে আবার বললাম, "আর আপনি আমার বাড়ীর সকলের কথা একদম ভাববেন না, ও যখন প্রয়োজন পড়বে, ঠিক আমি ম্যানেজ করে নেবো। সেটুকু ভরসা আপনি এই ছেলের ওপর রাখতে পারেন মা।" আমার শাশুড়ি মায়ের অসহায় চোখদুটি থেকে ঝরে পড়ছে অপার কৃতজ্ঞতা আর স্নেহ, অশ্রুধারা হয়ে। আমি গিয়ে বসলাম ওনার মুখোমুখি মখমলে মোড়া বড়ো কৌচটার একপ্রান্তে। নয়নিকা এসে জলখাবারের প্লেটটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়েছে।


নয়নিকার মা আঁচলে চোখ মুছে বলতে শুরু করলো, "আমার বড়ো মেয়ে চয়নিকা, জন্মেছে যেমন মাতৃপ্রতিমার মতো রূপ নিয়ে, তেমন গানের গলা। ওর গলায় সাতসুর যখন খেলা করতো তখন মনে হোতো, সাক্ষাৎ সুরের দেবীর বসবাস ওর ঐ গলায়। কিন্তু সবই আমার অদৃষ্টের পরিহাস বাবা, নইলে এতো বড়ো দুর্ঘটনা ঘটে?" আমি আমার শাশুড়ির কথার আগাপাশতলা কিছুই স্পষ্ট উদ্ধার করতে পারছি না। ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করছি ওনার বক্তব্য শোনার। আবার শুরু করলো বলা, "বছর পনেরো বয়স না হতেই মেয়ের আমার গানের গলার সুনাম পুরো বেনারস জুড়ে ছড়িয়ে পড়লো। ঠিক এইসময়েই বিদেশ থেকে এক বিধর্মী ছেলে এলো চৈনীর গানের গুরু ওস্তাদজির কাছে। ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের তালিম নিতে। কিশোরী মেয়ে যৌবনে ঢুকবো ঢুকবো সময়ই মারাত্মক ভুলটা করে বসলো। মন দিয়ে বসলো ঐ বিদেশী বিধর্মী ছেলেকে। তারপর যা হয়, আমার ভয়ানক আপত্তি, চেনা নেই, জানা নেই, কোথাকার সে ছেলে, কেমন তার ঘর পরিবার! অজানা আশঙ্কায় বুক কেঁপে উঠলো। কিন্তু নৈনী চৈনীর বাবা ঠিক উল্টো, মেয়েরা অন্ত প্রাণ। উনিই আমাকে স্বান্তনা দিলেন, বললেন আমাদের মেয়ে, আমরাই আগলে রাখবো। মেয়ের এই শুকনো মুখ আর চোখের জল আর আমি সহ্য করতে পারছি না।


চৈনীর ষোলো পূর্ণ হয়ে সতেরোয় পা দিতেই ওদের বিয়ে দিয়ে দু'জনকেই আমাদের এখানে, এই বাড়ীতেই রাখা হোলো। নৈনী তখন বছর ছয়েকের। এই বিয়েতে আত্মীয় স্বজন জ্ঞাতিগুষ্টি কারোরই সায় ছিলো না। বিদেশী বিধর্মী চালচুলোহীন ছেলের সাথে করগুপ্ত পরিবারের মেয়ের বিয়ে? কিন্তু নৈনী চৈনীর বাবা কোনোকিছুরই তোয়াক্কা না করে মেয়ের বিয়ে দিলো ঐ বিদেশী প্রেমিক ছেলে রবার্টের সাথেই।

মেয়ের মুখে যেন হাজার ঝাড়বাতির রোশনাই ঠিকরে বেরোচ্ছে। চয়নিকা আর রবার্ট, দু'টিতে বেশ আছে, দিনরাত গান নিয়ে। আমারও মনে হোলো, ভুলই হয়তো বুঝেছিলাম, এই তো দিব্যি আছে। মেয়ের সুখই তো বাপ মায়ের সুখ। বেশ সুন্দর হাসিখুশী গানে সারা বাড়ী ঝমঝম করছে। চৈনীর বাবার মোটে যে ইচ্ছে ছিলো না বিয়ে দিয়ে মেয়েদের পরের ঘরে পাঠানো, তাও বেশ স্পষ্ট বুঝলাম। চোখের সামনেই, নিজের কাছেই মেয়ে আছে, এতেই ভারী খুশী উনি। মেয়েও ভারী খুশী। আর ওদের খুশীতেই তো আমারও খুশী।"

থামলেন উনি আবার, বাইরে ঝকঝকে রোদ, শহর হয়তো চূড়ান্ত কর্মব্যস্ততায়। আর আমি বেনারসে আমার শ্বশুরবাড়ীর তিন পুরুষের পুরোনো প্রাসাদোপম বাড়ীতে বসে জলখাবারের প্লেট হাতে খেতে খেতেই শুনছি পরিবারের সাম্প্রতিক অতীতের কাহিনী।


শাশুড়ি মা ঘনঘন চোখ মুছতে মুছতে আবার শুরু করলো, "জানো বাবা, এই বড়ো মেয়ের বিয়ে নিয়ে সারা শহরে ঢিঢি পড়ে গিয়েছিলো। তবে তোমার শ্বশুরমশাই এসবে কান দেবার মানুষ ছিলেন না। এই বাড়ী, মেয়েরা আর পৈতৃক ওষুধের ব্যবসাই ওনার সব ছিলো। বেশ চার পাঁচটা বছর এভাবেই কাটলো। চৈনীর তখন গান রেকর্ড হবার কথা চলছে, চৈনী নিজে নৈনীকে একটু একটু করে গান শেখাচ্ছে। নৈনীর গলাও দিদির মতো না হলেও যথেষ্ট ভালো। নিজের এতো আদরের বোন, তাকে তো চৈনী নিজের মনের মতো করেই তালিম দেবে, এটাই তো স্বাভাবিক। সেদিনও সকালে চৈনী নৈনীকে নিয়েই বসেছে, নৈনী আবার স্কুলে যাবে, তাই একটা রাগের পরিচয়টুকু করাচ্ছিলো ওর। মুখরাটা শুধু ধরেছে, রেকর্ড কোম্পানির এক কর্মকর্তা দেখা করতে এলো হঠাৎ। নৈনীকে মুখরাটা তোলাতে বললো রবার্টকে, নিজে গেলো নীচে, দেখা করতে ভদ্রলোকের সাথে। ওদের বাবাও তখনই ব্যবসার কাজে বেরোবে। ওনার চা জলখাবার নিয়ে ব্যস্ত আমি, কাজের লোকজনেরাও যে যার কাজে ব্যস্ত। চৈনী রেকর্ডিং কোম্পানির লোকের সাথে কথা বলে দেখতে এলো খাবার ঘরে, কি জলখাবার তৈরী হয়েছে? আমাকে বলে গেলো নৈনী আর রবার্টকে ডেকে আনছি। কয়েকটা মিনিটও পার হয় নি, বিকট চিৎকার আর কান্নার আওয়াজ শুনে আমরা ঊর্দ্ধশ্বাসে ছুটলাম ওপরে।"


আমি নির্বাক হয়ে শুনছি, খাওয়া কখন থেমে গেছে। শাশুড়ি মা আবার শুরু করলো, "আওয়াজ আসছে দোতলায় গানঘর থেকে, আমরা পৌঁছে দেখলাম চৈনী দু'হাতে কাঠের ভারী তবলাটা মাথার ওপর তুলে রবার্টের মাথায় আছড়ে মারছে, মেরেই যাচ্ছে, মাথাটা থেঁতলে গেছে, রক্তে ভাসছে ফরাস, চৈনী থামছে না। ফরাসের ওপর পড়ে থাকা রবার্টের ঐ বীভৎস থেঁতলানো মাথাটার ওপরেই একই ভাবে মেরে যাচ্ছে তবলাটা দিয়ে। নৈনী ফরাসের কোণে দেওয়ালে ঠেসে দাঁড়িয়ে তারস্বরে চিৎকার করছে।

চেঁচিয়ে ডাকলো ওদের বাবা "চৈনী".... চৈনী তবলাটা হাতে ধরা অবস্থাতেই ধড়াম করে পড়ে গেলো। তারপর কী ভাবে কী হোলো তা আমার মনে তালগোল পাকিয়ে গেছে। ডাক্তার, হাসপাতাল, থানা, পুলিশ। দু'দিন পর যখন জ্ঞান ফিরলো চৈনীর ততক্ষণে পুরোপুরি স্মৃতি হারিয়ে বসে আছে। নিজের নাম পর্যন্ত মনে নেই। সব ভুলে গেছে। মাত্র বাইশ বছর বয়স তখন চৈনীর।"


দু'চোখ দিয়ে ধারাস্রোতে তখন জল পড়ছে, নৈনী, নৈনীর মা দু'জনেরই। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে আবার শুরু করলো নৈনীর মা, "চৈনী গানঘরে ঢুকতে গিয়ে দেখে, নৈনী প্রবল বাধা দিয়ে কাঁদছে আর রবার্ট জোর করে এগারো বছরের কিশোরী নৈনীকে ফরাসের ওপর ফেলে জবরদস্তি করে শ্লীলতাহানি করার চেষ্টা করছে। সেই সময়ই যে অত তাড়াতাড়ি চৈনী ফিরে আসবে গানঘরে তা বোধহয় রবার্ট আন্দাজ করতে পারেনি। এই দৃশ্য দেখেই চৈনী আর মাথার ঠিক রাখতে পারেনি। আর রবার্টের এই অপকর্মের কথা আমরা, পুলিশ, সবাই শুনেছি নৈনীর জবানবন্দিতে। মেয়েটা আমার ফুরিয়ে গেলো, কী মর্মান্তিক পরিণতি পেলো! আর এই এতোগুলো বছর, এই পনেরো বছর যে আমি কীভাবে কাটিয়েছি, তা কেবল আমি জানি আর আমার ইষ্টাদেবতা বাবা বিশ্বনাথ জানেন।"


আমি শুনছি, আর আমার শাশুড়ি মা বলে চলেছে, "মেয়ের এই করুণ পরিণতির জন্য ওদের বাবা নিজেকেই দায়ী করতে শুরু করলেন, একেবারে ভেঙে পড়লেন। চোখের মণি বড়ো মেয়ে স্মৃতি হারিয়ে পাগলাগারদে, এটা উনি সহ্য করতে পারলেন না। ঐ ঘটনার পর দুটো বছরও কাটলো না, উনি হার্টফেল করে চলে গেলেন। পড়ে রইলাম আমি, এই দুই মেয়ের দায়িত্ব, বাড়ী ঘরদোর, সম্পত্তি, ব্যবসা সব আগলে নিয়ে। আত্মীয় স্বজনরা তো আগেই সরে গিয়েছিলো, এই ঘটনায় পরিস্থিতি আরো খারাপ হোলো। শুধু আমার ছোটভাই যে কোলকাতায় থাকে, সেই আমাদের ঐ দুঃসময়ে আমাদের পাশে থেকেছে। ওর একার উদ্যোগেই তো তোমাদের বিয়ে দেওয়া।"


মনটা ভারী ভার হয়ে গেলো, ঠিক এরকম রহস্যের সন্ধান কিন্তু আমি চাইনি। শাশুড়ি মায়ের গলা পেলাম আবার, "চৈনী পুলিশের হেফাজত থেকে ছুটকারা পেয়ে তো গেলো ঠিকই, মাথাটা খারাপ হয়ে যাওয়া আর বোনকে শ্লীলতাহানির হাত থেকে বাঁচাতে যাওয়া.... এই দুই কারণে খুনের সাজা মাফ হয়েছিলো। তবে ওর মানসিক ভারসাম্য আর ফেরেনি। যে গান ওর প্রাণ ছিলো, সেই গান ওর কোথায় হারিয়ে গেলো। এই মাস ছয়েক হোলো মানসিক হাসপাতাল ওকে ছুটি দিয়েছে সম্পূর্ণ সুস্থ বলে। কিন্তু বাড়ীতে আসার পরেও এতোদিনের মধ্যেও একদিনও কোনো গান গাওয়া তো দূরের কথা একটা কথা পর্যন্ত বলে না। ডাক্তারের পরামর্শ যে ওর কোনো কাজে বাধা না দেওয়াই উচিৎ হবে। নিজের চেনা পরিবেশে নিজের মতো নিজে থাকুূক, যদি এইসব বাদ্যযন্ত্র দেখে তার আবার পুরোনো স্মৃতি বা গান যদি মনে ফিরে আসে আগের মতো।

সামান্য উন্নতি হয়েছে, আমাকে আর নৈনীকে চিনতে পারে। আর গানঘরটা নিজের মতো সাজায় গোছায়। আর রাতের পর রাত জেগে বসে থাকে ঐ ঘরটার ভেতরে, একলা, সারারাত আলো জ্বেলে রাখে, কী আর করবো!"


আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, আমার কি বলা উচিৎ। চুপচাপ বসে আছি শ্বেতপাথরের মেঝের দিকে অপলক। মনটা বেদনায় ভরে গেছে, কানায় কানায়। আমি এই পরিবারের অংশ হয়েছি বিবাহসূত্রে ঠিকই, তবে আমার মনে হোলো এই পরিবারের প্রতিটি মানুষই যেন বড্ড কাছের। তাদের সুখেই সুখ, তাদের দুঃখেই আমার দুঃখ। হঠাৎই কানে এলো সুরবাহারের মিষ্টি তান আর তার সঙ্গে স্বর্গীয় এক সুরের মূর্ছনা, "লাগি লগন পতি সখী সন্...."!


একদম একসাথে তিনজনেই পরস্পরের দিকে তাকালাম, একদম একসাথেই। শাশুড়ি মায়ের, নৈনীর আর আমার তিনজোড়া চোখেই তখন চিকচিকে আনন্দাশ্রু।


Rate this content
Log in

More bengali story from Sanghamitra Roychowdhury

Similar bengali story from Fantasy