Sayandipa সায়নদীপা

Drama Fantasy


4  

Sayandipa সায়নদীপা

Drama Fantasy


হিনা : মুক্তি বন্ধন

হিনা : মুক্তি বন্ধন

31 mins 2.5K 31 mins 2.5K

“বহুত দূর মুঝে চলে যানা হ্যা… বহুত নজদিক মুঝে আনা হ্যা..

তেরি বাহো মে মুঝে আজ মর যানা হ্যা…”

হিনার গলার গান সৌম্যকের কাছে চিরকালই এক লোভনীয় বস্তু। সেই কলেজের ফার্স্ট ইয়ারে একদিন ক্লাসে আড্ডার মাঝে গেয়ে উঠেছিল একটা রবীন্দ্র সংগীত, সেদিনই প্রথম ওকে নজর করে সৌম্যক। আর তার পরের বাকিটা তো ইতিহাস। এখন দুজনের অফিসের কাজ আর পাশাপাশি বাড়ির কাজের চাপে গানটা গাইতেই চায় না মেয়েটা। নেহাৎ সৌম্যক কোনোদিনও জোর করলে ওই দু’কলি গায় আরকি। তবে সেটা এমন প্রাণখোলা হয়না। শারীরিক ক্লান্তিটা গলায় স্পষ্ট বোঝা যায়। আজ অনেকদিন পর তারা ছুটি পেয়েছে। আসলে কালকে ওরা সৌম্যকের বাড়ি যাচ্ছে। দুপুরে ফ্লাইট। লাগেজ গোছানোর জন্য আজকের দিনটাও ছুটি নিয়ে নিয়েছিল ওরা। সারাটা দিন ব্যস্ততার মধ্যে কাটলেও একটু আগেই হিনা কফির মগ হাতে ছাদে উঠে গেছে আর তারপরেই এই প্রাণ খোলা গান।

পায়ে পায়ে ছাদে উঠে এলো সৌম্যক। পূর্ণিমা আজ, জ্যোৎস্না এসে যেন স্নান করিয়ে দিচ্ছে হিনাকে। হিনা দুলে দুলে ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে চলেছে আপন মনে। ওকে দেখে মনে হচ্ছে ঠিক যেন রূপকথার রাজ্যের কোনো রাজকুমারী। সৌম্যক ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরল হিনাকে। তারপর ওর সুরে সুর মিলিয়ে গেয়ে উঠল, “কিসিকো ইস জাগা পে নেহি আনা হ্যা… কিসিকো ইস জাগা সে নেহি যানা হ্যা

তেরি বাহো মে মুঝে আজ মর যানা হ্যা…”

দুজনে এভাবে কতক্ষণ দাঁড়িয়েছিল জানেনা ওরা। হিনা নিজেকে এবার ছাড়াতে যেতেই সৌম্যক ওকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে আলতো করে বলে উঠল, “আমাকে ছেড়ে চলে যাবেনা তো কোনোদিন? তোমাকে ছাড়া আমি পাগল হয়ে যাবো...”

চাঁদহীন নির্মেঘ আকাশটায় ঝিকমিক করে ওঠে দুটো তারা। আর ওই সুবিশাল আকাশটার ঠিক নীচেই দাঁড়িয়ে ছটফট করছে মেয়েটা, কখনও ছাদে পায়চারি করছে ব্যস্ত ভাবে। কোনো কিছু নিয়ে খুব অস্থির আছে বোধহয়। চারিদিকের বাতাস যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে আজ, দক্ষিণের নারকেল গাছগুলোও হাওয়ায় শব্দ তুলতে ভুলে গেছে। আচমকা বাড়ির পেছনের পুকুরটায় একটা আলো ঝলসে উঠল, চমকে গিয়ে সেদিকে ছুটে গেল মেয়েটা আর তারপরেই একটা আর্ত চিৎকার…

ঘুম ভেঙে গেল সার্থকের। দরদর করে ঘাম দিচ্ছে তাকে। ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখলো সিলিং ফ্যানটা ঘুরছে নামমাত্র। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো ভেতর থেকে। বোতল খুলে খানিকটা জল গলায় ঢালল সার্থক। কি ব্যাপার কে জানে, আজ প্রায় কদিন ধরেই এই একই স্বপ্ন দেখে চলেছে সে। গল্পটার হয়তো সামান্য এদিক ওদিক হয় কিন্তু মেয়েটার চরিত্র একই থাকে প্রতিটা স্বপ্নে। কে এই মেয়েটা! একে কোনোদিনও দেখেছে বলে তো মনে পড়েনা সার্থকের। বিরক্তি লাগছে ওর, একে অচেনা জায়গা তার ওপর এরকম রাতে ঘুম ভেঙে গেলে অস্বস্তিকর লাগে। মোবাইলটা জ্বেলে দেখলো রাত আড়াইটা বাজে। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো সার্থক। সারা বাড়ি জুড়ে এখন এক অদ্ভুত নৈঃশব্দ্য বিরাজ করছে। ঘরের সামনের প্যাসেজটায় একটা হালকা সবুজ আলো জ্বলছে, প্যাসেজেরই এক প্রান্তে বাথরুম। বাথরুমের কাছে গিয়ে দরজাটা খুলতে যেতেই ওর হাতের ওপর হাত পড়ল অন্য কারুর। চমকে উঠে হাতটা সরিয়ে নিয়ে সার্থক দেখলো প্রনবেশ পাল দাঁড়িয়ে। তাকেও খানিক অপ্রস্তুত মনে হল। সার্থক মৃদু হাসার চেষ্টা করে বলল, “আপনি আগে যান দাদু।”

“আচ্ছা। কিছু মনে কোরো না বাবা, বয়েস হচ্ছে তো…”

“না না ঠিক আছে।”

প্রনবেশ পাল বাথরুমে ঢুকে দরজা লাগানো মাত্রই আবার গোটা প্যাসেজে নিস্তব্ধতা নেমে এলো। এই তিনতলা বাড়িটার গ্রাউন্ড ফ্লোরের দক্ষিণ কোণের ঘরটা সার্থকের, বাকি অংশ জুড়ে থাকে প্রনবেশ পালের পরিবার। প্যাসেজ দিয়ে আলাদা করা আছে সার্থকের ঘরটা, তবে এই ফ্লোরে একটাই কমন বাথরুম ব্যবহার করতে হয় ওদেরকে। ফার্স্ট ফ্লোরে একটা অবাঙালি পরিবার থাকে, যেতে আসতে চোখে পড়েছে কিন্তু আলাপ করা হয়ে ওঠেনি এখন অবধি।

প্রনবেশ পাল বাথরুম সেরে বেরিয়ে আসতেই এবার দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতে গেল সার্থক, আর তখনই শুনতে পেলো সেই তীক্ষ্ণ চিৎকারটা। ছাদ থেকে আসছে বলে মনে হল, কেউ যেন কারুর নাম ধরে ডাকছে। দু তিনবার ডাকার পরেই আবার সব চুপচাপ। এখানে আসার পর থেকে রাতে ঘুম ভাঙলেই এই ঘটনাটা ঘটতে দেখেছে ও, কিংবা বলা ভালো ঘটতে শুনেছে। কিন্তু সকাল হলেই অফিস যাওয়ার ব্যস্ততায় এ নিয়ে কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছে। এই বাড়ির সেকেন্ড ফ্লোরে কে থাকে তা এখন অবধি জানা হয়ে ওঠেনি ওর। চিৎকারটা থেমে যেতেই প্রনবেশ পালের মুখের দিকে তাকাল সার্থক। বৃদ্ধ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “সৌম্যক...।”

“সেটা কে?” অবাক হয়ে প্রশ্ন করল সার্থক।

“তুমি জানোনা?”

“না।”

“ওহ… ওকে এই বাড়ির মালিক বলতে পারো।”

“কি?”

“হুমম। সেকেন্ড ফ্লোরে থাকে।”

“উনি একরকম চিৎকার করেন কেন প্রতি রাতে?”

“রাতে শুধু নয়, দিনেও অনেক সময় চিৎকার করে ওঠে।”

“কিন্তু কেন?”

“ঠিক জানিনা তবে শুনেছি ও নাকি চাকরিসূত্রে ব্যাঙ্গালোরে থাকত। এখানে স্বামী স্ত্রী ছুটি কাটাতে এসেছিল তারপর আচমকা ওর স্ত্রী হঠাৎ একদিন উধাও হয়ে যায়। কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি তাকে। এমনিতেই স্ত্রী হারিয়ে যেতে মুষড়ে পড়েছিল ছেলেটা, তার ওপর তো জানোই পুলিশি সন্দেহ জেরার মুখে পড়ে প্রায় আধ পাগল হয়ে গেছে। মাঝেমাঝে ঠিক থাকে কিন্তু মাঝে মাঝেই…”

“আশ্চর্য তো! ওনার স্ত্রীর কোনো ট্রেসই পাওয়া যায়নি?”

“না।”

“উনি কি একাই থাকেন?”

“ওর মা বাবা একটা দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর ওর বোন আত্মজা বাড়ির এই দুটো ফ্লোর ভাড়া দিয়ে দেয় আর ওপরে দাদার জন্য এক চব্বিশ ঘন্টার পরিচারক বরাদ্দ করে গেছে। সেই থাকে সঙ্গে।”

“তার মানে ইনি আত্মজা বৌদির দাদা।”

“হুমম।”

“আমি এসব কিছুই জানতাম না। খুব প্যাথেটিক...”

একটা সরু গলি পথের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা… না না গলি তো নয়, একটা লম্বা হল ঘর যেন… দেওয়ালের ওপর অদ্ভুত আলোর খেলা চলছে… আরেকটা মেয়ে এসে দাঁড়াল… দ্বিতীয় মেয়েটা হাত বাড়িয়ে ডাকছে… কোথায় ডাকছে!

চোখ দুটো খুলে ফেলল সার্থক। আজ গরমের জন্য ভালো করে ঘুমটা ধরেইনি, তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থাতে দেখছিল স্বপ্নটা। আবার সেই মেয়েটা, আজ আবার আরেকটা মেয়েও ছিল। কি জ্বালা, কে এরা! রোজ রোজ একটা অচেনা মানুষের স্বপ্ন দেখা কি সম্ভব! কি হচ্ছে এসব! বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল সার্থক, আর তখনই শুনতে পেল সেই একই চিৎকার, ছাদের উপর থেকে আসছে। দরজা খুলে দ্রুত বেরিয়ে এলো সার্থক। বেরিয়ে এসে পা রাখল সিঁড়িতে। কিন্তু উঠতে গিয়েও থমকে গেল। এভাবে ওপরে যাওয়াটা কি ঠিক হবে! এখানে আসা অবধি ওপরের সিঁড়িতে ওঠেনি ও। আচ্ছা ও যদি ভদ্রলোককে বলে যে ও তাঁর ভগ্নিপতির কলিগ তাহলেও কি তিনি অসন্তুষ্ট হবেন! খানিক দোনামনা করেই সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল সার্থক। আসলে এক অদম্য কৌতূহল হচ্ছে ভেতরে। যদিও প্রনবেশ দাদু বললেন ভদ্রলোকের মাথার ঠিক নেই, তবুও তাঁকে একবার দেখতে ভীষণ ইচ্ছে হচ্ছে ওর।

ছাদে উঠে এলো সার্থক। প্রকান্ড ছাদটা, তবে শ্যাওলা জমে আছে সর্বত্র। বেশি কেউ ওঠে না নিশ্চয়। ছাদের এক কোণে ডাই করে রাখা আছে কিছু ভাঙা আসবাবপত্র, বাকিটা ফাঁকা। ভদ্রলোককে দেখতে পেলো সার্থক। ঠিক দক্ষিণ দিকে দাঁড়িয়ে আছেন উল্টো দিকে মুখ করে, তাই সার্থকের উপস্থিতি টের পেলেন না। একটা ঢোঁক গিলল সার্থক, এবার কি করবে সে! কেনই বা উঠে এলো এখানে, শুধুই লোকটাকে দেখতে! লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই ওর হঠাৎ নজরে পড়ল নারকেল গাছগুলো। হাওয়া দিচ্ছে না এক ফোঁটাও তাই স্থির হয়ে আছে একদম। মুখটা এমনিই একটু ওপর দিকে তুলতেই দেখতে পেলো চাঁদ শূন্য আকাশে মিটমিট করতে থাকা কয়েকটা তারা। আচমকা মাথাটা ঘুরে গেল সার্থকের। এই দৃশ্যটা ওর ভীষণ চেনা চেনা ঠেকছে কেন? যেন মনে হচ্ছে এর আগেও ও এসেছে এই ছাদে! কেমন একটা অস্বস্তি করছে মনে। জোরে জোরে দু’বার নিশ্বাস নিলো ও, আর সেই শব্দেই বোধহয় ওর দিকে ফিরে তাকালেন ভদ্রলোক। সার্থক একটু ঘাবড়ে গেল কিন্তু ভদ্রলোকের মুখ দেখে তার প্রতিক্রিয়া ঠিক বোঝা গেল না। মিনিট দুয়েক এক দৃষ্টিতে সার্থকের দিকে তাকিয়ে থাকার পর জড়ানো গলায় তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কে?”

“আ… আমি! আমার নাম সার্থক। গ্রাউন্ড ফ্লোরে ভাড়া এসেছি। রজত দা’র কলিগ আমি।” আমতা আমতা করে নিজের পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করল সার্থক।

“ওহ। ভালো। আমি তো নীচে যাইনা তাই চিনিনা।” এবার শুকনো কিন্তু পরিষ্কার গলায় কথাগুলো বললেন ভদ্রলোক, “তা হাওয়া খেতে এসেছিলেন?”

এখানে আসার আসল কারণটা চট করে বলে উঠতে পারল না সার্থক, কেমন যেন বাধো বাধো ঠেকল। প্রনবেশ দাদু বলেছিলেন লোকটা অর্ধ পাগল, কে জানে! চিৎকার করাটা বাদ দিলে এখন অবধি কথাবার্তা তো খুবই স্বাভাবিক লাগছে।

“হ্যাঁ… মানে ওই ঘুম ভেঙে গেল তাই…”

“বাড়ি কোথায়?”

“মেদিনীপুর।”

“মেদিনীপুর টাউন!” জায়গাটার নাম শুনেই যেন চমকে উঠলেন ভদ্রলোক, “আমার স্ত্রী’র বাড়িও ওখানে। আপনি চেনেন ওকে? ওর নাম হিনা, হিনা ইয়াসমিন।” উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন ভদ্রলোক।

একটা ঢোক গিলে সার্থক নিচু গলায় বলল, “না। মানে…”

“আপনি এক মিনিট দাঁড়ান আমি ওর ছবি আনছি, দেখলে নিশ্চয় চিনতে পারবেন। আপনি দাঁড়ান আমি আসছি।” এই বলে সার্থককে পাশ কাটিয়ে ছুটে গেলেন ভদ্রলোক। তাঁর ছোটা দেখে সার্থকের মনে হল এই বুঝি পড়ে যাবেন তিনি, তাই ওউ ছুটল তাঁর পেছন পেছন। সিঁড়ি দিয়ে নেমে ঘরে ঢোকার মূল দরজার কাছাকাছি পৌঁছতেই সার্থক দেখতে পেল একজন লোক সৌম্যককে শক্ত করে ধরে নিয়ে ধমক দিয়ে বলছে, “আর পারিনা বাবা, রোজ রাতে এই একই নাটক। চলো ঘুমোবে চলো।”

“না না আমাকে হিনার ছবি দেখাতেই হবে ওনাকে, উনিও…” সৌম্যকের শেষ কথাগুলো আর শোনা গেল না, তার আগেই সশব্দে দরজাটা লাগিয়ে দিলো লোকটা।

ঘুমটা বোধহয় পাতলা হয়েই এসেছিল, কাঁচের জানালায় ক্রমাগত একটা ঠুকঠুক শব্দে তাই এতো সহজেই ভেঙে গেল ঘুমটা। চোখ খুলে উঠে বসল সার্থক, দেখলো একটা চড়াই পাখি জানালার ওপারে বসে কাঁচে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে তার সঙ্গে ঝগড়া করতে ব্যস্ত। অন্যদিন হলে ব্যাপারটা দেখে হাসি পেতো ওর কিন্তু আজ কেন না জানি হাসতে ইচ্ছে করল না। বাইরে ইতিমধ্যেই চড়া হয়ে রোদ উঠেছে। মোবাইলটা টেনে সময় দেখলো সার্থক, ন’টা তেইশ। আশ্চর্য এতক্ষণ ঘুমিয়েছে ও! এলার্ম দিয়ে শুয়েছিল, সেটাও কতক্ষণ ধরে না জানি বেজে বেজে বন্ধ হয়ে গেছে। আজ রবিবার অফিস যাওয়ার তাড়া নেই কিন্তু বাইরে যেতে হবে ব্রেকফাস্ট করতে, ইচ্ছে করল না সার্থকের। সারা শরীর জুড়ে কেমন একটা অস্বস্তি; নাহ, অস্বস্তিটা ঠিক শরীরে নয়, মনে। আবার ধপ করে শুয়ে পড়ল ও, আর তখনই মোবাইলটা বেজে উঠল রিনরিনিয়ে। বৃষ্টি… হুমম... আজ রবিবার, এখানে আসার পর থেকে সপ্তাহে এই একটা দিনই কথা হয় মেয়েটার সঙ্গে। অন্যদিনগুলো অফিস থেকে ফিরে এতোই ক্লান্ত লাগে যে আর ইচ্ছে করেনা কথা বলতে, ফোন করলেও হুঁ হাঁ করে ছেড়ে দেয় সার্থক। হয়তো বোঝে বৃষ্টির মনে তখন জমে অভিমানের চোরাবালি। তবে সার্থকও জানে কিভাবে ওই চোরাবালিতে ডুব দিয়ে উদ্ধার পেতে হয়; তাই তো রবিবার দিনটা রাখা থাকে তোলা। কিন্তু আজ ইচ্ছে করল না ফোনটা ধরতে, তাই ও আঙ্গুল চালিয়ে দিল লাল রঙে। তারপরেই মুখ দিতে একটা গরম নিশ্বাস বেরিয়ে এলো ওর ভেতর থেকে। আচ্ছা একটা মানুষ যাকে চেনেনা জানেনা তাকে কিভাবে রোজ রোজ দেখতে পারে স্বপ্নে? তাও এতো স্পষ্ট ভাবে? ছোটবেলার থেকে এখন অবধি স্মৃতি হাতড়িয়ে বেড়িয়েছে সার্থক কিন্তু কোথাও খুঁজে পায়নি ওই মেয়েটার স্মৃতি। এখন তো আবার নিজের মনের সন্দেহের দোলাচলে মাঝে মধ্যেই কল্পনায় কোনো স্বল্প পরিচিত মহিলার মুখের ওপর বসিয়ে ফেলছে এই মেয়েটার আদল। পরক্ষণেই ভুল ভাঙছে, আবার আত্ম সন্দেহের তীরে ক্ষত বিক্ষত হয়ে যাচ্ছে ওর ভেতরটা। কে ওই মেয়েটা? প্রশ্নটা এখন ওকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে সর্বত্র- ঘরে, বাইরে, অফিসে… কোথাও যেন শান্তি নেই। কিছুতেই ঠিক করে যেন আর মনও লাগে না। সেদিন ছাদটা দেখে ফিরে আসার পরেই ওর মনে পড়েছিল কেন এতো চেনা চেনা লাগলো ছাদটা, স্বপ্নে তো এই ছাদটাতেই মেয়েটাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ও। কিন্তু সত্যিই এই ছাদটাই নাকি অন্য কোনো ছাদ শুধু ওর মনে হচ্ছে এটাই বলে! সব ছাদই তো একই রকম হয়, কিন্তু ওই দক্ষিণের নারকেল গাছ, নীচে পুকুর… এতোটাও মিলে যায় সব কিছু! অথচ সেদিনের আগে কোনোদিনও ছাদে তো দূরের কথা ওই সিঁড়িতেই পা রাখেনি সার্থক। তার ওপর সেদিনের পরে আরও একটা আশ্চর্য জিনিস ঘটে গেছে, মেয়েটাকে এখন যেন আরও স্পষ্ট ভাবে দেখতে পাচ্ছে ও, মনে হচ্ছে যেন মেয়েটা ওকে কিছু বলতে চাইছে কিন্তু সার্থক শুনতে পাচ্ছে না তার কথা। উফফ...অস্বস্তিকর!

সার্থক বরাবরই একটু চাপা স্বভাবের, ওর মনের হদিস চট করে দিতে চায়না কাউকে। কিন্তু আজ মনে হল কারুর সাথে ব্যাপারটা শেয়ার করা দরকার, হয়তো অস্বস্তিটা খানিক হলেও কমবে। ফোনটা হাতে তুলল ও, ডায়াল করল বৃষ্টির নম্বরে।

বৃষ্টি পুরোটা শোনার পর চুপ করে গিয়েছিল খানিক, হয়তো ভাবছিল কি বলবে কিন্তু তার আগেই সার্থকের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হল। প্রথমে মৃদু, তারপরেই যেন কেউ উদ্ভ্রান্তের মত আওয়াজ করতে শুরু করল দরজায়। ভ্রু কুঁচকে তড়িঘড়ি ফোনটা কেটে এসে দরজা খুলল সার্থক। দরজায় দাঁড়িয়ে সৌম্যক রায়, বুকের সামনে উল্টো করে চেপে ধরা একটা মাঝারি সাইজের ফটোগ্রাফ। সৌম্যক রায়কে দরজায় দেখে চমকে গেল সার্থক, “আপনি?”

“হ্যাঁ হ্যাঁ আমি। চলুন ঘরে ঢুকে দরজাটা লাগিয়ে দিন।” এই বলে সার্থককে প্রায় ঠেলেই ঘরে ঢুকে গেল সৌম্যক তারপর নিজেই দরজার ছিটকিনিটা আটকে দিলো। পুরো ব্যাপারটায় এতোটাই হতভম্ব হয়ে গেল সার্থক যে এই মুহূর্তে মুখ দিয়ে কোনো কথা সরল না তার। সৌম্যক এবার ওর দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “সেদিনের জন্য সরি। আমার কাজের লোকটা কোনো ম্যানার্স জানে না, আপনার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিলো।”

“আরে না না ঠিক আছে।”

“ঠিক নেই, খুব খারাপ হয়েছে ব্যাপারটা। জানেন তো তারপর কদিন আমাকে ঘর থেকেও বেরোতে দেয়নি তাই তো আপনার কাছে আসতে পারিনি। সবই আমার বোনের নির্দেশ, ওরা বলে আমি নাকি পাগল। অদ্ভুত! তা… আপনার নামটা কি যেন…!”

“সার্থক।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ সার্থক। তা সার্থক বাবু আপনাকে বলেছিলাম না আমার স্ত্রীর ছবি দেখাবো, এই দেখুন…” এই বলে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরা ছবিটা সামনের দিকে ঘোরাল সৌম্যক। একটা বছর ঊনত্রিশ তিরিশের মেয়ের ছবি, মুঠো করা আঙুলের ওপর থুতনিটা ঠেকিয়ে হাসছে মেয়েটা…

ঘরের মধ্যে কোথাও যেন একটা বাজ পড়ল আচমকা। মেদিনীপুরে সার্থকদের আদি বাড়ি হলেও কখনও সেখানে থাকেনি তারা, বাবার চাকরি সূত্রে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হয়েছে তাদের। কাজেই মেদিনীপুরের কোনো বাসিন্দাকে চেনা যে তার পক্ষে সম্ভব নয় একথা সেদিনই বলতে চেয়েছিল সার্থক, সৌম্যক সে সুযোগ দেয়নি। কিন্তু এখন ও যা দেখছে সেটা কি করে সম্ভব!

“জানেন তো আমার স্ত্রী হারিয়ে যাওয়ার কিছুদিন আগে থেকে বড্ড চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল। কোনো কথা বলতো না সারাদিন। আবার রাত হলেই ছাদে চলে যেত, সেখানে গিয়ে কি করত কে জানে! তাই তো এখন আমি রোজ ছাদে গিয়ে ওকে ডাকি মাঝেমাঝে, বিশেষ করে রাতের দিকে। আমি জানি আমার ডাক ও ঠিক শুনতে পাবে…”

সৌম্যকের কথাগুলো আর কানে ঢুকছেনা সার্থকের, ওর শরীরটা কাঁপতে শুরু করেছে, কেমন একটা অজানা ভয় যেন এসে ঘিরে ধরছে ওকে। এ কি করে সম্ভব? যাকে এর আগে কোনোদিনও চোখে দেখেনি, যে এই বাড়িতে সার্থক আসার বেশ কয়েকবছর আগেই নিখোঁজ হয়ে গেছে তাকে কিভাবে স্বপ্নে দেখা সম্ভব?

পরলোক সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে একটা আলোচনা সভায় যোগ দিতে যাবেন বলে প্রস্তুত হয়ে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন ত্রিলোকেশ। দেখলেন বৌমা বিনতা কর্ডলেস ফোনটা হাতে নিয়ে কেমন যেন উদ্ভ্রান্তের মত বসে রয়েছে।

“কি হয়েছে বৌমা? তোমাকে এরকম লাগছে কেন?”

“কাকু… বাবু…”

“কি হয়েছে সার্থকের?”

“জানিনা। আজ দু’দিন ধরে একবারও না নিজে ফোন করেছে না ফোন তুলছে আমার।”

“সে কি? শেষ কবে কথা হয়েছিল?”

“শনিবার রাতে। রোজ যেমন ও অফিস থেকে ফিরে ফোন করত একবার সেদিনও তেমনই…”

“আমাকে বলোনি কেন আগে?”

“ঠিক বুঝতে পারিনি কাকু আসলে ভেবেছিলাম রবিবার হয়তো ঘুরতে টুরতে বেরিয়েছিল তাই আর ফোন করেনি কিন্তু কাল সারাদিনও... তারপর আজ…”

“ফোন বন্ধ?”

“নাহ রিং হচ্ছে তো।”

“স্ট্রেঞ্জ!”

বাড়ির থেকে বেরিয়ে এলেন ত্রিলোকেশ। একসময় এই সংসার জীবন ত্যাগ করে সন্ন্যাস নিয়েছিলেন তিনি তারপর আবার সময়ের ফেরে সংসারের মধ্যে ফিরে এলেও মূল স্রোতে আর গা ভাসাতে চাননি তিনি। ফলস্বরূপ আত্মীয়-পরিজন, মোহ মায়া এসব তার মধ্যে খুব একটা আর লক্ষ্য করা যায়না। কিন্তু সার্থকের ক্ষেত্রে তাঁর সব হিসেব যেন ওলট পালট হয়ে যায়, তাঁর ভাইপো সুনন্দর এই একমাত্র পুত্রটির প্রতি তিনি সবসময়ই একটা বিশেষ টান অনুভব করেন যেন। সার্থক সদ্য চাকরি পেয়ে প্রবাসী হওয়ার পর থেকে এই নাতিটির প্রতি কতটা মায়া জমে আছে তাঁর হৃদয়ে তা আরও ভালো করে টের পাচ্ছেন ত্রিলোকেশ। সংসারের কোনো ব্যাপারে বিচলিত হওয়ার মানুষ তিনি নন কিন্তু আজ সার্থকের এই ফোন না তোলার কথাটা শুনে মনটা বড় অস্থির লাগছে তাঁর, আলোচনা সভায় যোগ দিতেও আর ইচ্ছে করছে না যেন। রাস্তা থেকে একপাশে একটা গাছের ছায়ায় সরে এলেন ত্রিলোকেশ, পকেট থেকে ছোটো ফোনটা বের করে ডায়াল করলেন একটা নাম্বারে। কিছুক্ষণ রিং হওয়ার পরেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো একটা নারী কন্ঠ, “হ্যালো দাদু”

“এখন কি ক্লাসে আছো দিদিভাই?”

“না দাদু ক্লাসে একটু পরে যাবো।

তুমি বলো।”

“বলছি যে আমার দাদাভাইয়ের সাথে এই দুদিনে কথা হয়েছে তোমার?”

“দুদিন বলতে রবিবার সকালে কথা হয়েছিল।”

“রবিবার সকালে…! আচ্ছা তারপর?”

“নাহ তারপর তো আর হয়নি। কেন দাদু কি হয়েছে?”

“নাহ সেরকম কিছু না। আসলে দাদাভাই দুদিন হল বাড়িতে ফোন করেনি একবারও, বৌমা খুব দুশ্চিন্তা করছে। তুমি কি কিছু জানো এই ব্যাপারে?”

“দাদু…”

“কি বলো।”

“দাদু সেদিন কথা বলতে বলতে আচমকা ওর দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হয়, এতো জোরে কেউ কড়া নাড়ছিল যে আমি ফোনের এপ্রান্ত থেকে শুনতে পাচ্ছিলাম। এরপর কিছু না বলে সার্থক ফোনটা কেটে দেয় আর তারপর সেদিন আমি আরও দু’বার ফোন করেছিলাম কিন্তু ও ধরেনি।”

“কি বলছো কি!”

“হ্যাঁ দাদু, আমার মাথায় তখন কিছু আসেনি কিন্তু এখন তোমার কথা শুনে খুব ভয় করছে দাদু।”

“ভয় পেয়ে লাভ নেই দিদিভাই, তুমি যা বললে তাতে তো ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম। কিছু একটা করতে হবে আমাদের, ফোনটা ছাড়ছি এখন।”

বৃষ্টির ফোনটা কেটে দিয়ে সার্থকের নম্বরে বার দুয়েক চেষ্টা করলেন ত্রিলোকেশ। বিনতা ঠিকই বলেছিল রিং হয়ে হয়ে ফোনটা কেটে যাচ্ছে, ধরছে না কেউ। ফোনটা চুরি হলে কিংবা হারিয়ে ফেললে সার্থক নিশ্চয় কোনোভাবে চেষ্টা করত বাড়িতে খবরটা জানানোর কিন্তু সেটা তো সে করেনি আর বৃষ্টির কথা অনুযায়ী রবিবার সকালে কেউ এসেছিল ওর ঘরে আর তারপর থেকেই…

কয়েক মুহূর্ত একটু ভেবে নিলেন ত্রিলোকেশ, আর তারপরেই খুব দ্রুত সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেললেন।

ভোরবেলায় যখন ট্রেন থেকে নামলেন ত্রিলোকেশ তখনই স্টেশন চত্বর গমগম করছে, শুরু হয়ে গেছে নিত্য যাত্রীদের আনাগোনা। রিজার্ভেশন ছাড়া এতটা পথ আসতে এখন আর শরীর সায় দেয়না যেন, তাও শরীরের কষ্টটাকে মন থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করলেন ত্রিলোকেশ। এই মুহূর্তে সার্থকের নিরাপত্তার চেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় তাঁর কাছে আর কিছুই নয়। সুনন্দ অফিসের কাজে মুম্বাই গিয়েছে কয়েকদিনের জন্য, তাই ত্রিলোকেশ একাই এসেছেন আজ। বিনতা আসতে চেয়েছিলেন কিন্তু ত্রিলোকেশ আনেননি। তিনি সার্থকের মুখেই শুনেছিলেন স্টেশন থেকে খুব বেশি দূরে নয় তার অফিসটা, তাই খোঁজ করতে করতে ত্রিলোকেশ পৌঁছে গেলেন সেখানে। কিন্তু এখন সবে সাতটা বাজে, অফিসে লোকজন আসতে অন্তত দশটা বাজবে। সিকিউরিটি গার্ড দুজনকে জিজ্ঞেস করেও বিশেষ লাভ হল না, ওদের ডিউটি রাতে তাই অফিসের নতুন লোকজনকে চেনেনা বিশেষ। তবে ওদেরকে সার্থক যে বাড়িতে ভাড়া এসেছে তার ঠিকানা বলতেই দেখা গেল ওরা বাড়িটাকে চেনে, এমনকি বাড়িটার নাম শুনে দুজনের মুখে একটা চাপা হাসিও ত্রিলোকেশের নজর এড়ালো না। গার্ড দুজনের নির্দেশ মত একটা টোটোয় চেপে বসলেন তিনি। কিছুদূর যাওয়ার পরেই টোটোচালক হঠাৎ বলে উঠল, “কার কাছে যাবেন মেসোমশাই? কোনো ভাড়াটে নাকি ওই পাগল রায়ের কাছে?”

“পাগল রায়?” অবাক গলায় জিজ্ঞেস করলেন ত্রিলোকেশ।

“হেঁ হেঁ মানে ওই বাড়ির মালিক আরকি।”

“তিনি কি মানসিক ভাবে অসুস্থ?”

“কি? ওহ হ্যাঁ হ্যাঁ পাগল পাগল। পুরো পাগল। বউটা হারিয়ে যাওয়ার পর থেকে পাগল হয়ে গেছে।”

“ওহ।”

“তা আমরা বলি বউ নিশ্চয় অন্যকারুর সঙ্গে পালিয়েছে তা তুই পাগল হয়ে কি করবি?”

লোকটার এসব কথাবার্তা ত্রিলোকেশের মোটেই ভালো লাগছিল না, এখন তাকে সার্থকের কাছে পৌঁছতে হবে তাড়াতাড়ি। “আর কতদূর?”

“এই যে বেশিদূর নয়, আর একটু। তা বুঝলেন মেসোমশায় ছেলেকে ইঞ্জিনিয়ার বানাতে রায় বুড়ো কোথায় যেন একটা পাঠিয়ে দিলো আর ছেলে কী করল না এক মোসলমান মেয়েকে বিয়ে করে ফেলল। দুজনে নাকি একসঙ্গে পড়ত আবার চাকরিও করত একসঙ্গে। কোনোদিনও এদিকের পথও মাড়াত না বিয়ের পর, তারপর যদিও বা এলো তো সেই মোসলমান বউ ভাগলবা।”

এসব কথা অসহ্য লাগছিল ত্রিলোকেশের। তাঁর মাথায় শুধু ঘুরছে বৃষ্টির বলা কথাগুলো। তিনি ট্রেনে চাপার পরেই আবার ফোন করেছিল বৃষ্টি, তারপর বলেছিল রবিবার সার্থকের বলা শেষ কথাগুলো। সেই সব শুনে মাথাটা কেমন যেন জট পাকিয়ে গেছে, ত্রিলোকেশ বুঝতে পারছেন কোনো নতুন এক রহস্যের মুখোমুখি হতে চলেছেন তিনি কিন্তু সার্থককের সাথে দেখা না হওয়া অবধি এ রহস্যের একটা গিঁটও খোলা সম্ভব নয়।

এবার তিনি কর্কশ গলায় বলে উঠলেন, “তোমরা কি করে জানলে মেয়েটি স্বেচ্ছায় চলে গেছে বলে?”

“তা নয়তো কি। কত খোঁজাখুঁজি হল, পুলিশ এলো গেল কোথাও খুঁজে পাওয়া যেত না!”

“তার মানেই কি সে স্বেচ্ছায় পালিয়েছে? ভালোবেসে বিয়ে করেছিল যখন তখন এভাবে পালাতে যাবে কেন? না জেনে কারুর সম্বন্ধে কিছু বলা বোধহয় ঠিক নয়।”

ত্রিলোকেশের কথাটা মোটেও পছন্দ হলনা টোটোচালকের, এ চত্বরে ওই বাড়ির উল্লেখ হলেই সবাই বৌটাকে গাল মন্দ করতেই বেশি পছন্দ করে কিন্তু এই লোকটা তো বড্ড ঢ্যাঁটা, কত রকমের প্রশ্ন করছে।

“চলে এসেছি মেসোমশায়। এই বাড়িটা।”

টোটো থেকে নেমে ভাড়া মেটালেন ত্রিলোকেশ। তারপর তাকালেন বাড়িটার দিকে, একটা প্রকান্ড তিনতলা বাড়ি। একসময় যে খুব যত্ন করে তৈরি করা হয়েছিল তা দেখলেই বোঝা যায় কিন্তু এখন উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জৌলুস হারিয়েছে। বাইরের গেট খুলে সিমেন্টে বাঁধানো উঠোনে পা রাখলেন ত্রিলোকেশ। দেখলেন মূল ঘরের সামনে একটা বড়সড় কোলাপসিবল গেট লাগানো। আর তারই পাশে ওপর নিচ করে তিনটে কলিংবেলে। খানিক ইতস্তত করে নিচের কলিংবেলটায় চাপ দিলেন তিনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই সালোয়ার কামিজ পরা এক মহিলা বেরিয়ে এলেন, “আপনি?”

“আ… আমি সার্থক ঘোষের কাছে যাবো।”

“সার্থক! ওহ আচ্ছা।

আসুন এইদিকে দিয়ে।”

ভদ্রমহিলার কথার ধরণ দেখে ত্রিলোকেশের মনে হল কোথাও যেন অস্বাভাবিক কিছু একটা আছে।

“ওই রুমটা সার্থকের।” খানিক দূর থেকে সার্থকের রুমটা দেখিয়ে দিলেন ভদ্রমহিলা। পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে দরজায় চাপ দিলেন ত্রিলোকেশ। দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। দরজায় কড়া নাড়লেন তিনি আর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মনে হল ভেতর থেকে যেন একটা গোঙানির আওয়াজ উঠল। ব্যস্ত হয়ে আরও কয়েকবার জোরে জোরে কড়া নাড়লেন ত্রিলোকেশ, এবার তিনি নিশ্চিত হয়ে গেলেন ভেতরে কেউ যেন গোঙাচ্ছে, মনে হচ্ছে যেন খুব ভয় পেয়ে আছে সে। কিন্তু দরজা না খুললে ত্রিলোকেশ কিভাবে বুঝবেন ভেতরে কে রয়েছে! আরও কয়েকবার কড়া নেড়ে হতাশ হলেন তিনি, কিছুতেই খুলছে না দরজাটা। এখন কি করা উচিৎ তাঁর! ভেতরে কে আছে জানেন না ত্রিলোকেশ, তবুও গলাটা ঝেড়ে নিয়ে শেষ চেষ্টা হিসেবে তিনি ডেকে উঠলেন, “দাদাভাই দরজা খোলো, আমি দাদু।

দাদাভাই… দাদাভাই…”

কয়েকমুহূর্ত সব কিছু চুপচাপ, তারপর যেন খুট করে একটা শব্দ হল দরজায়। তড়িঘড়ি দরজাটা ঠেললেন ত্রিলোকেশ, খুলে গেল সেটা। ঘরটা একটা লালচে অন্ধকারে ছেয়ে আছে। বন্ধ কাঁচের জানালার গায়ে লাল পর্দা সেই অন্ধকারটা তৈরি করছে। ঘরের মধ্যে গা গোলানো একটা বোঁটকা গন্ধে ভর্তি। আর এসবের মাঝেই খাটের এক কোণে একটা বিছানার চাদরকে আপাদমস্তক মুড়ি দিয়ে বসে আছে একটা মানুষ, তার শরীরটা কাঁপছে তিরতির করে। ত্রিলোকেশ নিচু গলায় ডাকলেন একবার, “দাদাভাই…”

মুখের চাদরটা সরল খানিক, আর তাতেই মুখটা দেখতে পেয়ে চমকে উঠলেন ত্রিলোকেশ।

জানালার ধারে দাঁড়িয়ে এক মনে বাইরের দিকে তাকিয়েছিল ত্রিলোকেশ। আচমকা ফোনটা বেজে উঠতেই স্বম্বিৎ ফিরল তাঁর। পাঞ্জাবির পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখলেন স্ক্রিনের ওপর বৃষ্টির নামটা জ্বলজ্বল করছে। একটু ইতস্তত করে ফোনটা ধরলেন ত্রিলোকেশ আর সঙ্গে সঙ্গে অপ্রান্ত থেকে ভেসে এলো বৃষ্টির উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর, “দাদু কেমন আছে ও?”

“ভালো দিদিভাই।” গলাটা কেঁপে উঠল ত্রিলোকেশের, “আসলে ওর ফোনটা খারাপ হয়ে গেছে তাই তোমাদের একটা কলও ঢোকেনি ওর ফোনে আর…”

“তুমি মিথ্যে কথা বলছো তাই না দাদুভাই?”

বৃষ্টির কথায় চমকে উঠলেন ত্রিলোকেশ। একটু আগেও যখন এই একই মিথ্যে বুলি গুলো ফোনে আওড়ে সুনন্দ আর বৌমাকে সান্ত্বনা দিলেন তখনও অনেকটা ঠিক ছিলেন কিন্তু যত সময় যাচ্ছে অস্থির লাগছে তাঁর। কি হচ্ছে কিছুই যেন বুঝে উঠতে পারছেন না। কি করবেন, কিভাবে রক্ষা করবেন সার্থককে কিচ্ছু ভাবতে পারছেন না তিনি! কেমন যেন দিশেহারা লাগছে নিজেকে।

“কি হল দাদু চুপ করে আছো কেন?” অধৈর্য গলায় জিজ্ঞেস করে উঠল বৃষ্টি।

“নাহ দিদিভাই… সত্যি বলছি সব ঠিক আছে।

এখন রাখছি বুঝলে, খেতে হবে কিছু, বড্ড খিদে পেয়েছে।” বৃষ্টির উত্তরের অপেক্ষা না করেই ফোনটা কেটে দিলেন ত্রিলোকেশ। এরপর ফোনটা নিয়ে পাঞ্জাবীর পকেটে ঢোকাতে যাওয়ার ঠিক আগে মুহূর্তে শুনতে পেলেন এক আর্ত চিৎকার। ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন তিনি। বাথরুম থেকে এসেছে চিৎকারটা। ওপাশের দিকে যারা থাকে তাদের পরিবারের লোকজনও ছুটে এসেছে চিৎকার শুনে। ত্রিলোকেশ ধাক্কা দিলেন দরজায়, “দাদা কি হল? দাদা… দাদা…”

ভেতর থেকে কোনো উত্তর এলোনা, চিৎকারও শোনা গেল না আর। শুধু একটানা কল থেকে জল পড়ার শব্দ এসে বাজতে লাগলো কানে।

চোখে মুখে জল দিতে দিতে অবশেষে জ্ঞান ফিরলো সার্থকের। অনেক কষ্টে বুঝিয়ে সুজিয়ে সার্থককে স্নান করতে পাঠিয়েছিলেন ত্রিলোকেশ। কিন্তু একটু আগে ওর চিৎকার শুনে ছুটে গিয়ে বাথরুমের দরজার ক্রমাগত ধাক্কা দিয়েও আর কোনো সাড়া শব্দ পাওয়া যায়না। তাই লোক ডেকে দরজাটা শেষমেশ ভাঙতেই হয়। আর ভাঙতেই দেখা যায় ভেতরে পড়ে রয়েছে সার্থকের অচৈতন্য দেহ। পাল পরিবারের সবাই আর ওপরে যারা থাকে তারা খুব সাহায্য করল ওনাকে। ওরাই ডাক্তারও ডেকে দিলেন। পাল পরিবারের যে মহিলা দরজা খুলে দিয়েছিলেন ত্রিলোকেশকে তিনি বললেন এই দুদিন নাকি সার্থক রুম থেকে বেরোয়ইনি। ওনারা বেশ কয়েকবার নক করেছিলেন কিন্তু প্রত্যেকবার সার্থক ভেতর থেকে জোরে চিৎকার করে উঠেছিল, “চলে যান চলে যান” বলে। সব শুনে গুম হয়ে গেলেন ত্রিলোকেশ। ডাক্তার কিছু ওষুধ আর কয়েকটা টেস্ট লিখে দিয়ে গেলেন। যারা সাহায্যের জন্য এসেছিলেন তারাও এক এক করে বিদায় নিলেন। দরজাটা লাগিয়ে এসে সার্থকের পাশে বসলেন ত্রিলোকেশ। এখনও শুয়ে আছে ছেলেটা, তবে ওর চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে সিলিং এর দিকে। কোনো কারণে যেন একবার পলকও ফেলতে চাইছে না ও।

“দাদা..” সার্থকের গায়ে আলতো করে হাত রাখলেন ত্রিলোকেশ। চমকে উঠল সার্থক। তারপর ধড়পড় করে উঠে বসে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল ত্রিলোকেশকে।

“কি হয়েছে দাদাভাই? আমাকে বলো কি হয়েছে?” সার্থকের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন ত্রিলোকেশ।

“আমার খুব ভয় করছে দাদু, খুব ভয় করছে।” কাঁপা কাঁপা গলায় জবাব দিলো সার্থক।

“কেন? কিসের ভয় তোমার? আমাকে বলো সব।”

“দাদু ওই মেয়েটা আমাকে ডাকছে… ও আমাকে নিয়ে চলে যাবে… ও আমাকে ডাকছে…” কথাগুলো বলতে বলতে ডুকরে কেঁদে উঠল ছেলেটা।

“কে ডাকছে দাদু? কে সে?”

“জানিনা.. আমি কিচ্ছু জানিনা…”

“এরকম করেনা দাদা। শান্ত হও দিয়ে সব বলো আমাকে। সব…”

“ও আগে খালি স্বপ্নে আসতো তারপর…”

“তারপর কি?”

“এখন সবসময় আসে। ডাকে আমাকে শুধু… ওর সঙ্গে যেতে বলে। দাদু চোখ বন্ধ করলেই ওকে দেখতে পাই। জলের মধ্যেও ও আসে, আয়নাতেও ও থাকে… দাদু আমার খুব ভয় করছে… খুব ভয় করছে…”

সার্থককে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলেন ত্রিলোকেশ। কিচ্ছু বুঝতে পারছেন না তিনি। মাথাটা কেমন খালি খালি লাগছে তাঁর।

“দাদাভাই মেয়েটাকে তুমি চেনো?”

ত্রিলোকেশের প্রশ্নটা শুনে আচমকাই মুখটা তুলল সার্থক। তারপর সোজা ত্রিলোকেশের চোখে চোখ রেখে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, “চিনি।”

“কে?”

“হিনা।”

“হিনা?”

“সৌম্যক রায়ের স্ত্রী।”

সার্থকের কথা শুনে সারা শরীরে বিদ্যুৎ প্রবাহ খেলে গেল ত্রিলোকেশের। তাঁর মনে পড়ে গেল আজকে আসার পথে শোনা টোটো চালকের কথাগুলো। এই হিনাই কি তাহলে একদিন আচমকা নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল!

ত্রিলোকেশ কিছু বলার আগেই সার্থক আগের মত ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, “সবাই বলে ও নিখোঁজ হয়ে গেছে, কিন্তু আমি জানি ও আছে… ও এখানেই আছে… আমি দেখতে পাই ওকে।”

আজ বিকেলে কালবৈশাখী আসবে নিশ্চিত, তাই ঝিরিঝিরি হাওয়া দিচ্ছে বাইরে। রোদটা পড়ে গেছে অনেকক্ষণ। আকাশটা কালো হয়ে উঠছে ক্রমশ। সার্থক দেখল দাদু ঘুমিয়ে পড়েছেন। পড়বেনই তো কাল থেকে এই বুড়ো মানুষটার ওপর ধকল তো কম যায়নি। মাঝেমাঝে নিজের ওপরেই খুব রাগ উঠছে ওর, পরক্ষণেই আবার মনে হচ্ছে যা কিছু হচ্ছে তাতে ওর নিজেরই বা কি করার আছে! ও তো কিছুই ইচ্ছে করে করছে না।

আচমকা একটা হাওয়ার দমক উঠলো বাইরে, কিছু ধুলো পাক খেতে খেতে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। আর তখনই সার্থক আবার দেখতে পেলো তাকে। ওই আলমারির মধ্যে লাগানো আয়নাটায় দাঁড়িয়ে আছে সে… হাতছানি দিয়ে ডাকছে সার্থককে… এই হাতছানিকে উপেক্ষা করার সাধ্যি কারুর নেই। খাট থেকে নেমে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল সার্থক। মেয়েটা আয়নার ওপ্রান্ত থেকে নিজের বাম হাতের তালুটা বাড়িয়ে ধরল, সার্থক এপাশ থেকে নিজের বাম হাতটা তুলে মেয়েটার হাতের ওপর রাখল। আর সঙ্গে সঙ্গে সার্থক দেখলো ওর আশেপাশের দৃশ্যপটগুলো কেমন করে যেন পাল্টাতে শুরু করেছে। সিনেমার দৃশ্যের মত সার্থকের আশেপাশে ভেসে উঠছে অনেকগুলো টুকরো টুকরো ছবি…

একটা অন্ধকার ঘর… ঝুল ফাঁদে ভর্তি… একটা মেয়ে সেইসব ঝুল ফাঁদ ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে… কিছু একটা যেন খুঁজছে মেয়েটা…

একমিনিট এই মেয়েটাকে তো সার্থক চেনে… এই তো হিনা… কোথায় যাচ্ছে ও?

সামনের ঝুল ফাঁদ সরিয়ে এগোচ্ছে হিনা, আশেপাশে রাখা বেশ কয়েকটা সিন্দুক… এগিয়ে গিয়ে একটা মোহর ভর্তি সিন্দুকের গায়ে হাত ছোঁয়াল হিনা...কিন্তু একি কোথায় মোহর! এতো কিলবিল করছে অজস্র সাপ …. ভয়ে ছিটকে দূরে সরে এলো হিনা… আবার এগোতে শুরু করল সে... তারপর আস্তে আস্তে পৌঁছে গেল একটা প্রাচীন পালঙ্কের কাছে, সেই পালঙ্কের ওপর শুইয়ে রাখা আছে একটা মমির মত জিনিস.. সেটাকে পাশ কাটিয়ে আবার এগোলো হিনা… সেখানে দেখলো সাত আট বছরের একটা ছেলের কঙ্কাল বসানো রয়েছে মাটিতে… গুবরে পোকার মত একটা বড় পোকা ওটার চোখ থেকে বেরিয়ে ঢুকে গেল পাঁজরের হাড়ে…

“কে তুমি?”

সামনে চলতে থাকা চলচ্চিত্রের টুকরো টুকরো ঝলকের মধ্যে যখন বিভোর হয়ে গিয়েছিল সার্থক তখনই আচমকা ওর ডান হাতটা কেউ যেন টেনে ধরল পেছন থেকে আর সেই সঙ্গে ভেসে উঠল এই বজ্র গম্ভীর কন্ঠ। হাতটায় জোরে টান লাগার ফলে মাটিতে ধপ করে পড়ে গেল ও, আর সঙ্গে সঙ্গে আয়নাটা সশব্দে ফেটে দু ফাঁক হয়ে গেল। চমকে উঠল সার্থক। দেখলো আগের মতোই ও ওর ঘরের মেঝেতে বসে রয়েছে আর ওর কাছে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে হাঁফাচ্ছেন ত্রিলোকেশ। তাঁর গোটা শরীর ঘামে ভেজা।

“দাদু…” ডেকে উঠল সার্থক। ত্রিলোকেশ হাতটা বাড়িয়ে সার্থককে তুললেন মেঝে থেকে। তারপর হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন, “চলে গেল… চলে গেল… আমি পারলাম না ধরতে।”

“কাকে?”

“যে তোমায় ডেকে নিয়ে গিয়েছিল। উফফ… কেন যে ঘুমিয়ে পড়তে গেলাম!” আফসোসের সুরে বিড়বিড় করে কথাগুলো বলতে বলতে দেওয়ালে একটা ঘুঁষি মারলেন ত্রিলোকেশ। তারপর বললেন, “যদি না ঘুমিয়ে পড়তাম তাহলে…

আচ্ছা দাদা একটু আগে ঠিক কি ঘটেছিল বলতে পারবে তুমি?”

মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো সার্থক। তারপর বোতল থেকে খানিকটা জল খেয়ে পরপর বলতে লাগলো যতটা মনে পড়ে। কিছুটা মনে পড়ছিল কিছুটা আবার ধোঁয়াশার মত লাগছিল। সব টুকু মন দিয়ে শোনার পর চোখ বন্ধ করলেন ত্রিলোকেশ। ব্যাপারটা কিছুটা আঁচ করতে পারছেন তিনি। কাল এখানে এসে সার্থকের সাথে কথা বলে নিজের কয়েকজন সাধন সঙ্গীকে ফোন করেছিলেন তিনি। তাঁদের সাথে কিছু আলোচনা হয়েছে আর কিছুটা তাঁর নিজের জ্ঞান থেকে ত্রিলোকেশ মোটামুটি এটুকু বুঝতে পেরেছেন যে হিনার অন্তর্ধান কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। হিনা বলে মেয়েটি আর ইহলোকে নেই একথা যেমন সত্যি তেমনই সত্যি এই যে হিনার আত্মা আজও মুক্তি পায়নি। কিন্তু কেন? কীভাবে মারা গিয়েছিল সে? আর সার্থককেই বা তার কি প্রয়োজন?

প্রশ্নগুলো মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে ত্রিলোকেশের, সেই সাথে তিনি আজকে একটু আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা মেলানোর চেষ্টা করছেন। সার্থক বলল হিনাকে সে একটা ঘরের মধ্যে দেখেছে, সেই ঘরে আবার একটা মমি আর বাচ্চা ছেলের কঙ্কালও রয়েছে…! আশ্চর্য এরকম ঘর কোথায় থাকতে পারে!

“দাদু।” সার্থকের ডাকে সম্বিৎ ফিরল ত্রিলোকেশের।

“বলো।”

“দাদু তুমি ওকে দেখেছিলে?”

“কাকে?”

“হিনাকে?”

“না।”

“তাহলে তুমি ওকে প্রশ্নটা করলে কি করে?”

“আন্দাজে। তোমাকে আয়নার সামনে অমন অচৈতন্য অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই আমার সন্দেহ হয়। আসলে আমার কি মনে হয় জানো দাদা মেয়েটি তোমার মস্তিস্ককে নিয়ন্ত্রণ করে তোমার সাথে যোগাযোগ করতে চায়। ওর কিছু বলার আছে তোমাকে।”

“আমাকে? কিন্তু…”

সার্থকের কথা শেষ হওয়ার আগেই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হল। ত্রিলোকেশ উঠে গিয়ে দরজা খুললেন। আর দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে ত্রিলোকেশকে ঠেলে দিয়ে ঘরে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ল সৌম্যক। তারপর লাফিয়ে গিয়ে সার্থকের কলারটা খামচে ধরে চিৎকার করে উঠল, “বলো হিনা কোথায়? বলো বলছি। কোথায় লুকিয়ে রেখেছো আমার হিনাকে?”

ত্রিলোকেশ ছুটে এসে ছাড়ানোর চেষ্টা করলেন সৌম্যককে কিন্তু পারলেননা। লোকটা যেন পাশবিক শক্তিতে চেপে ধরেছে সার্থককে। সার্থক কোনোক্রমে বলল, “আমি জানিনা। আমি কিচ্ছু জানিনা…”

“মিথ্যে কথা। আমি জানি তুমি সব জানো। আমি এসেছিলাম কাল তোমার ঘরের সামনে। তুমি হিনার নাম বলছিলে বারবার… আমি শুনেছি। কিন্তু আমি এই ঘরে ঢোকার আগেই ওই পবন আমাকে ধরে নিয়ে চলে যায়…

বলো আমার হিনাকে কোথায় লুকিয়ে রেখেছো?” গলাটা আরও চড়ে যাচ্ছে সৌম্যকের। ত্রিলোকেশ এবার শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন, “ওকে ছেড়ে দিন সৌম্যক বাবু। ও সত্যিই জানেনা আপনার স্ত্রী কোথায়। তবে আশা করছি শীঘ্রই আমরা জানতে পারবো।”

ত্রিলোকেশের কথায় কাজ হল খানিক। সার্থককে ছেড়ে দিয়ে এবার ত্রিলোকেশের দিকে ঘুরে তাকাল সৌম্যক, “তারমানে আপনারা নিশ্চয় কিছু জানেন ওর ব্যাপারে। প্লিজ আমাকে বলুন না প্লিজ…”

এতোক্ষণে সৌম্যকের গলায় কাতর মিনতি ঝরে পড়ল। একটা ঢোঁক গিললেন ত্রিলোকেশ। কিভাবে বলবেন এই লোকটাকে যে তার স্ত্রী আর বেঁচে নেই! স্ত্রীকে কতটা ভালোবাসলে একটা মানুষ এরকম পাগল হয়ে যেতে পারে তা ঈশ্বরই জানেন। বুকের ভেতরটা চিনচিন করে উঠল তাঁর। সৌম্যকের কাঁধে হাত রেখে তিনি বলেন, “আপনি এখন ঘরে যান। কথা দিচ্ছি আপনার স্ত্রীর সম্বন্ধে খুব তাড়াতাড়ি আপনাকে জানাবো।”

ত্রিলোকেশের আশ্বাসবাণী শুনে আচমকা খুব শান্ত হয়ে গেল সৌম্যক। তারপর আর কিছু না বলে চুপচাপ বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

***************************************************************

“সার্থক… সার্থক…”

“কে?”

“আমাকে তুমি চিনবে না কিন্তু আমি তোমাকে চিনি।”

“কে তুমি? কোথায় তুমি?”

“তুমি আমাকে দেখতে পাবে না। তবে আমাকে তোমার বন্ধু বলতে পারো।”

“নাহ তুমি আমার বন্ধু নও… তুমি আমার বন্ধু হতে পারেনা। তোমার জন্য আমার জীবনটা ওলট পালট হয়ে গেছে।”

“প্লিজ সার্থক এভাবে বোলো না। আমার তোমার সাহায্যের খুব দরকার।”

“আমার সাহায্য?”

“হ্যাঁ। একমাত্র তুমিই পারো আমাকে সাহায্য করতে।”

“আমি কেন তোমায় সাহায্য করব? তোমার জন্যই আজ আমার এই অবস্থা।”

“আগে আমার সব কথাটা শোনো তারপর তুমিই বিচার করে দেখো আমায় সাহায্য করা যায় কিনা।”

“কি কথা?”

“সেদিন তো তোমাকে সব জানাতে চেয়েছিলাম কিন্তু তৃতীয় একজন ব্যক্তি কিভাবে যেন মাঝে এসে সব গন্ডগোল করে দিল!

যাইহোক আমি তোমাকে এখন সব বলছি সার্থক।

আমার নাম…”

“হিনা?”

“তুমি কি করে জানলে?”

“সৌম্যক বাবু বলেছেন।”

“সৌম্যক! তুমি ওকে চেনো? কেমন আছে ও? প্লিজ বলো।”

“ভালো নয়। উনি খুব অসুস্থ। তুমি হারিয়ে যাওয়ার পর পাগল হয়ে গেছেন।”

“কি!”

“তুমি কাঁদছো?”

“জানো তো আমার বাড়ির লোকেরা বলেছিল সার্থক নাকি আমায় একদিন ছেড়ে দেবে। ওকে বিয়ে করে আমি ভুল করছি…

আর আজ আমি হারিয়ে যেতে ও… কতটা ভালোবাসতো ও আমায়…!

উফফ… সবই আমার ভাগ্য…”

“তোমার কি হয়েছিল হিনা?”

“বলবো সব। জানি তোমার অবিশ্বাস্য লাগবে কিন্তু তাও বলতে হবে আমায়।”

“এখন কোনো জিনিসই আমার আর অবিশ্বাস্য লাগে না। যাইহোক বলো তুমি।”

“বলছি। তুমি কি জানো সার্থক এই এলাকায় বিশেষ করে এই বাড়িটা যেখানে সেখানে কয়েক হাজার বছর আগে একটা রাজপ্রাসাদ ছিল?”

“রাজপ্রাসাদ!”

“হ্যাঁ। সেই রাজপ্রাসাদে থাকতেন রাজকুমারী রাজন্যা। রূপে গুণে অনন্যা ছিলেন তিনি। সবাই ধন্য ধন্য করতো তাঁকে।”

“কিন্তু আমাকে এসব গল্প বলছো কেন? আমি জানতে চাই তোমার কি হয়েছিল।”

“সেটাই তো বলছি। আমার কথা জানতে হলে তোমায় রাজন্যার কথা আগে জানতে হবে।

শোনো, রাজন্যার ওই রূপই একদিন ওর কাল ডেকে আনলো। প্রতিবেশী এক রাজ্যের রাজার কুনজর পড়ল ওর ওপর। তিনি হুমকি দিলেন হয় রাজন্যাকে তাঁর চাই নয়তো রাজন্যার বাবার পুরো রাজ্য ধ্বংস করে দেবেন তিনি।”

“তারপর?”

“তারপর…! তারপর রাজন্যার বাবা এক অভিনব পরিকল্পনা করলেন যাতে সাপও মরবে কিন্তু লাঠিও ভাঙবে না।”

“কি পরিকল্পনা?”

“তাঁর রাজপ্রাসাদের তলায় এক গুপ্ত কক্ষ বানানো ছিল, যার সন্ধান কেউ সহজে পেতে পারত না। তিনি যতটা সম্ভব রাজকোষাগারের ধন দৌলত এনে মজুত করলেন সেই ঘরে। এদিকে রাজন্যা নিজের সম্মান রক্ষার্থে আত্মহননের পথ বেছে নেবে বলে স্থির করেছিল, একথা তার বাবা ছাড়া আর কেউ জানতো না। পরিস্থিতি বিচার করে মেয়েকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেননি তিনি। রাজন্যা ওই গুপ্ত কক্ষেই নিজের বুকে ছুরিকাঘাত করে আত্মহত্যা করে। এরপর ওর বাবা দুজন বিদেশ থেকে শিক্ষালাভ করে আসা দুই বিশারদকে দিয়ে ওর দেহটাকে মমি বানিয়ে সংরক্ষণ করে রাখেন ওই ঘরেই। এইভাবে একদিকে রাজ সম্পদও রইল আর অন্যদিকে মেয়ের দেহও রইল সংরক্ষিত।”

“তার মানে ওই মমিটা… আর ওই বাচ্চাটা তাহলে কে?”

“ধ্রুপদ। রাজন্যার পালিত পুত্র। রাজন্যার বাবা নিজের কন্যাকে যেমন ভালোবাসতেন তেমন নিজের স্বার্থের জন্য ভয়ঙ্কর রকমের ক্রুরও হতে পারতেন। রাজন্যার মৃত্যুর পর তিনি রাজন্যার দেহ এবং নিজের যাবতীয় ধনসম্পদকে রক্ষা করার জন্য একটা ভয়ঙ্কর কাজ করলেন।”

“কি কাজ?”

“তিনি নিষ্পাপ ধ্রুপদকে কৌশলে একটা মন্ত্রপূত ছুরি দিয়ে শপথ নেওয়ালেন যে সে যখ হয়ে এই ধনসম্পদ আর রাজন্যাকে রক্ষা করবে। আর তারপর চিরকালের জন্য ছেলেটাকে ওই কুঠুরির অন্ধকারে বন্দি করে দিলেন।”

“যখ…! এসব তো গল্প কথা!”

“গল্প নয় সার্থক। পুরোটা শোনো তাহলেই বুঝতে পারবে। সব কিছু ওখানেই শেষ নয়। ধ্রুপদ ওই কুঠুরির অন্ধকারে দম বন্ধ হয়ে মারা গেল কিন্তু ওখানেই আটকা পড়ে রইল ওর আত্মাটা। যে শপথ সে নিয়েছিল সেই শপথ রক্ষা করা ছাড়া তার মুক্তি নেই। এদিকে ছেলের জন্য রাজন্যার আত্মাও আটকে রইল ওখানেই। ছেলেকে কষ্টে দেখতে কোন মা’ই বা পারে! ওরা হাজার হাজার বছর ধরে অপেক্ষা করল এমন কারুর আসার যে ওদেরকে মুক্তি দিতে পারবে। তারপর এই বাড়িতে এলাম আমি, ওদের মুক্তির দূত।”

“তুমিই কেন? এর আগে আর কেউ পারেনি?”

“আমিই কেন সেটা বলবো পরে। তার আগে শোনো বাকিটা। রাজন্যা আমার সঙ্গে অনেক কষ্টে যোগাযোগ স্থাপন করল। ঠিক যেমন করে আমি তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তারপর আমি গেলাম ওদের মুক্ত করতে, ওরা মুক্তি পেলো দুজনেই কিন্তু ভাগ্যের ফেরে আমি বন্দি হয়ে গেলাম ওই অন্ধকার কুঠুরিতে।

তাই তো এখন তোমার কাছে সাহায্য চাইতে এসেছি সার্থক। আমাকে তুমি মুক্ত করো। প্লিজ…”

“কিন্তু কিভাবে?”

“তুমি একটু আগে জানতে চেয়েছিলে না আমিই কেন ওদের মুক্ত করতে পারলাম?”

“হ্যাঁ।”

“তোমার বাম হাতটা তোলো।”

সার্থক নিজের বাম হাতটা তুলে ধরল। এরপর হিনাও আস্তে আস্তে নিজের বাম হাতটা তুলে ধরতেই সার্থক অবাক হয়ে দেখল ওরই মতন হিনারও বাম হাতের মধ্যমার তুলনায় তর্জনীটা অনেক বেশি লম্বা। সার্থক ভাবত এই ধরণের হাত বোধহয় তার ছাড়া আর কারুর নেই কিন্তু এ তো…”

“এই বিশেষ ধরণের আঙ্গুলদুটোই হল ওই গুপ্ত কুঠুরি খোলার চাবি কাঠি। রাজন্যাদের পরিবারের সবার আঙ্গুল ছিলো এই ধরণের।

এরকম তো সচরাচর কারুর দেখা যায়না। তাই অপেক্ষা করতে হয় সঠিক মানুষ আসার…”

“বহুত দূর মুঝে চলে যানা হ্যায়… বহুত নজদিক মুঝে আনা হ্যা

তেরি বাহো মে মুঝে আজ মর যানা হ্যা…”

হিনার গলায় শোনা এই শেষ গানটা আজও কানে বাজে সৌম্যকের। ওরা ব্যাঙ্গালোর থেকে এখানে আসার ঠিক আগের দিন রাতে ওদের ব্যাঙ্গালোরের বাড়িটার ছাদে ঘুরতে ঘুরতে খোলা গলায় এই গানটা সেদিন গেয়েছিল হিনা। পূর্ণিমা ছিল সেদিন, জ্যোৎস্নার আলো এসে ধুইয়ে দিচ্ছিল হিনার উন্মত্ত শরীরটা। সৌম্যক অবাক চোখে তাকিয়েছিল ওর দিকে, মনে হচ্ছিল যেন কোনো রূপকথার গল্পের রাজকন্যা। সৌম্যক ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরেছিল ওকে তারপর ওর সুরে সুর মিলিয়ে গেয়ে উঠেছিল, “কিসিকো ইস জাগা পে নেহি আনা হ্যা… কিসিকো ইস জাগা সে নেহি যানা হ্যা

তেরি বাহো মে মুঝে আজ মর যানা হ্যা…”

সবাই বলে সৌম্যক পাগল হয়ে গেছে। সত্যিই তো… সেই রাতে হিনাকে জড়িয়ে ধরে সৌম্যক তো এই কথাটাই বলেছিল, “তোমাকে ছাড়া আমি পাগল হয়ে যাবো।”

লোকটা আচমকা সৌম্যকের কাঁধে হাত রাখল। সৌম্যক চমকে উঠল মুহূর্তের জন্য, তারপরেই নিজেকে সামলে নিল। এই লোকটা বলেছে যে ও আজ জানতে পারবে হিনা কোথায় আছে। তাই তো এক ডাকে সৌম্যক চলে এসেছে এখানে। লোকটা কে সৌম্যক জানেনা ঠিক, ওর উদ্দেশ্যই বা কি কে জানে! লোকটা মেঝের ওপর কিসব অদ্ভুত জিনিস সাজিয়েছে। তারই একপাশে বসে আছে সৌম্যক, ওর থেকে ঠিক নব্বই ডিগ্রি কোণ করে বসে আছে লোকটা। আর সৌম্যকের ঠিক সোজাসুজি ওপাশে মেঝেতে শুয়ে ঘুমোচ্ছে সার্থক বলে ছেলেটা। এই পরিবেশে কেউ ঘুমোতে পারে! অবশ্য সৌম্যক ঘরে আসার পর লোকটা বলেছিল, “এই ঘুমোলো সার্থক। যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে, নয়তো লাভ হবে না।” এই বলে রোবটের মত গতিতে মেঝেতে ওই হাবিজাবি জিনিসগুলো সাজিয়ে ফেলেছিল লোকটা। সৌম্যকের ভারী অদ্ভুত লাগছে সব কিছু। সার্থক বলেছিল এই লোকটা তার দাদু, কে জানে এ কেমন দাদু! লোকটা করতেটাই বা কি চাইছে! আর যাই করুক সৌম্যকের কাছে হারানোর মত আর আছেটা কি!

লোকটা কিসব মন্ত্র বিড়বিড় করতে করতে মেঝের কয়েকটা জিনিস নাড়াচাড়া করল খানিক। তারপর একটা রুদ্রাক্ষের মালার মত জিনিস ডান হাতে নিয়ে সেই হাতটা দিয়ে চেপে ধরল সৌম্যকের হাত। ওই মালাটায় স্পর্শ হওয়া মাত্রই সৌম্যকের শরীরে একটা বিদ্যুৎ প্রবাহ খেলে গেল যেন। লোকটা ইশারা করে চোখ বন্ধ করতে বলল ওকে। সৌম্যক চোখ বন্ধ করার আগে খেয়াল করল লোকটা বাম হাতে এরকমই আরেকটা মালা নিয়ে ঘুমন্ত সার্থকের হাতটাও চেপে ধরল।

****************************************************************

“ওই লোকটা কে যে রোজ বাধা দেয় আমায়?”

“আমার দাদু।”

“কিন্তু উনি কিভাবে আমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করেন? এটা তো কারুর পক্ষে করা সম্ভব নয়।”

“আমার দাদু এমন অনেক কিছুই পারেন যা আর পাঁচটা সাধারণ মানুষ পারে না।”

“কিন্তু ওনার জন্য আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে যে। আমি ওনার সাথে কথা বলতে পারব না। তোমার সাথে ছাড়া আর কারুর সাথে কথা বলা আমার সম্ভব নয়।

আর তোমার সাথে যোগাযোগ করতেও আমার খুব কষ্ট হয় সার্থক, প্লিজ বোঝার চেষ্টা করো। এখন বোধহয় ওনার কারণেই তোমার সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা অনেক কঠিন হয়ে পড়ছে আমার পক্ষে। আমি বেশিদিন পারব না এভাবে। আর একবার যদি ব্যর্থ হই তাহলে আবার কতদিনের অপেক্ষা কে জানে! সার্থক প্লিজ তুমি আমাকে একবার এই অন্ধকার জীবন থেকে মুক্তি দাও… প্লিজ…”

“কথা দিচ্ছি মুক্ত করব তোমায়। কিন্তু কিভাবে?”

“এসো আমার সঙ্গে?”

“কিন্তু আমি যে তোমাকে দেখতে পাচ্ছিনা, শুধু তোমার গলার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি।”

“জানি। তুমি সামনে যে সাদা আলোটা দেখতে পাচ্ছ ওটা বরাবর এগিয়ে এসো।”

হিনার কথা মত সামনের উজ্জ্বল সাদা আলোটাকে লক্ষ্য করে এগোতে লাগলো সার্থক। দ্যুতির প্রাবল্য চোখ খুলে রাখা দায়। কোনোমতে এগোতে এগোতে একসময় ওর মনে হল যেন সাদা আলোটার ঠিক মাঝখানে প্রবেশ করেছে ও। তারপর আরেকটা পা সামনে বাড়াতেই আচমকা চারিদিকে নেমে এলো নিকষ অন্ধকার। ঘটনার আকস্মিকতায় চমকে উঠল সার্থক। চোখদুটো খানিক কচলে নিয়ে আবার তাকাতেই এবার বুঝতে পারল ও আসলে একটা ঘরের মত জায়গায় এসে পৌঁছে গেছে। এতক্ষণে আবার হিনার গলার আওয়াজ পাওয়া গেল, “সামনে সোজাসুজি তাকাও সার্থক।”

হিনার কথা শুনে সামনে তাকাল সার্থক। অন্ধকারে চোখটা আস্তে আস্তে সয়ে যাচ্ছে, তাই সার্থক এবার দেখতে পেলো দরজাটা। পায়ে পায়ে সেদিকে এগিয়ে গেল ও। হিনা বলল, “চাবির খোপ দুটো দেখতে পাচ্ছ?”

চোখটা আবার কচলে নিয়ে দরজাটার দিকে ভালো করে তাকাতে সার্থক দেখতে পেলো পাশাপাশি দুটো লম্বা খোপ, একটা বড় একটা ছোটো। ও আস্তে আস্তে নিজের বাম হাতের তর্জনী আর মধ্যমা রাখলো খোপটায়। এমন ভাবে আঙ্গুল দুটো মিশে গেল সেখানে যেন মনে হল ওরই হাতের ছাঁচ নিয়ে তৈরি করা হয়েছিল খোপ দুটো। আঙ্গুল দুটো দিয়ে এবার ওখানে চাপ দিতেই খুট করে একটা আওয়াজ হল প্রথমে তারপর ঘড়ঘড় করতে করতে সরে গেল দরজাটা। দরজার চৌকাঠ পেরিয়ে ঘরটার ভেতর ঢুকলো সার্থক। ঘরটা ওর অচেনা নয়। সেদিন হিনা এরই ছবি দেখিয়েছিল ওকে। এই ক’বছরে ঘরটার চরিত্র পাল্টায়নি কিছু। অবশ্য পাল্টাবেই বা কি করে! যেখানে মানুষ তো দূর আলো বাতাস অবধি প্রবেশ করতে পারেনা সেখানে কিছু কেমন করে আর পাল্টাবে!

“সার্থক।”

চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঘরটার চারিদিক দেখতে ব্যস্ত ছিলো সার্থক। হিনার গলা শুনে সম্বিৎ ফিরল ওর। দেখলো ওর থেকে বেশ খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা। ওর সারা শরীর থেকে এক অদ্ভুত সাদা দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে। এই প্রথম সার্থক একেবারে সামনা সামনি দেখলো হিনাকে, “হিনা…!”

হাতছানি দিয়ে ওকে কাছে ডাকলো হিনা। মন্ত্রমুগ্ধের মত ওর কাছে এগিয়ে গেল সার্থক। হিনা আস্তে আস্তে নিজের হাতের মুঠো খুলে সার্থকের দিকে বাড়িয়ে দিলো। সার্থক দেখলো হিনার হাতে একটা ছুরি। মোহাবিষ্টের মত হাত বাড়িয়ে ছুরিটা ধরতে গেল সার্থক কিন্তু তার আগেই ওকে ঠেলে দিয়ে কে যেন ছুটে এসে ধরে নিলো ছুরি সুদ্ধ হিনার হাত। চমকে উঠল হিনা, “সৌম্যক!”

“ছুরিটা আমাকে দাও। আমি এসে গেছি।”

“নাহ…”

“হিনা আমি তোমাকে এই নরক যন্ত্রনা ভোগ করতে দেবো না আর। এতদিন আমি জানতেই পারিনি এতো কষ্টে এখানে এইভাবে তুমি বন্দি হয়েছিলে…! আমাকে দিয়ে দাও এটা।”

“না… না… তুমি এখান থেকে চলে যাও সৌম্যক। এই জীবন খুব কষ্টের, তুমি ভাবতেও পারবে না...”

“তা হয়না হিনা। তুমি সার্থককে ছেড়ে দাও। তুমি আমার কষ্টের কথা ভাবছো কারণ তুমি আমাকে ভালোবাসো কিন্তু জানো কি সার্থকের জন্যও কেউ অপেক্ষায় দিন গুনছে। আমি চাইনা হিনা তুমি হারিয়ে যেতে আমার যে অবস্থা হয়েছিল সেই মেয়েটারও ওই একই অবস্থা হোক।

কেঁদোনা হিনা। আমি জানি তুমি কাউকে ইচ্ছে করে আঘাত দিতে পারোনা। তুমি যা করেছো নিরুপায় হয়ে করেছো। আমাকে ছুরিটা দিয়ে দাও লক্ষীটি।”

“নাহ সৌম্যক। আমি আবার এই বন্দি জীবন কাটাতে রাজি আছি কিন্তু তোমাকে আমি কিছুতেই…”

“দাও বলছি।” হিনাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই ওর হাতের ছুরিটা টেনে ধরল সৌম্যক। ফলাটায় ওর হাত কেটে দু’ফোঁটা রক্ত ঝরে পড়ল মাটিতে পড়ে থাকা একটা মোহরে। আর সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে চমকে দিয়ে প্রচন্ড শব্দে কাঁপতে শুরু করল ঘরটা। ঝনঝন করে পড়তে শুরু করল সিন্দুকে থাকা রাশি রাশি মোহর আর গহনা। একটা বীভৎস শব্দে মুখরিত হল চারিপাশ। একটু একটু করে এবার ঘরটার ছাদ আর দেওয়ালগুলো অবধি খসে পড়তে শুরু করল। চারিদিকে যেন ধুলোর ঝড় উঠল আচমকা। এই ধ্বংসলীলার মাঝেই মন্ত্রপূত ছুরিটার দুপ্রান্ত দুজনে ধরা অবস্থাতেই সৌম্যক জড়িয়ে ধরল হিনার বায়বীয় শরীরটাকে, তারপর ফিসফিস করে বলল, “ভয় পেয়োনা। আজ থেকে আর কেউ আলাদা করতে পারবে না আমাদের…”

*****************************************************************

মুখে জলের ঝাপটা এসে লাগতেই ধড়পড় করে উঠে বসল সার্থক। তার সারা শরীর ঘামে ভিজে জবজব করছে। সে তাকিয়ে দেখলো পাশে বসে একটা জলের বোতল হাতে একই ভাবে হাঁফাচ্ছেন ত্রিলোকেশ।

“দাদু তুমি ঠিক আছো?”

সার্থকের কথার উত্তর দিলেন না ত্রিলোকেশ, “আমি জানতাম যখ যতক্ষণ না নিজের দায়িত্ব অন্য কাউকে হস্তান্তরিত করে ততক্ষণ তার মুক্তি নেই। ধ্রুপদ হিনাকে দায়িত্ব দিয়ে মুক্তি পেয়েছিল আর হিনা তোমাকে দিতে চেয়েছিল। তাই আমি সৌম্যককে গিয়ে গতকাল রাতে গিয়ে চুপিচুপি বলে আসি আজ আসার জন্য। হিনা তোমার মস্তিস্ক নিয়ন্ত্রণ করতো আর আমি আমার সীমিত ক্ষমতা বলে তোমার মস্তিষ্ককের চিন্তা প্রবাহগুলোকে ধরে হিনার কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছিলাম। আজ আমি ভেবেছিলাম সৌম্যককেও নিয়ে যাবো হিনার দুনিয়ায়। নিশ্চিত ছিলাম না সাফল্য পাবো কিনা। এমন অভিজ্ঞতা তো এই প্রথম। কিন্তু মনে মনে ভেবেছিলাম সৌম্যক বারণ করলে হিনা নিশ্চয় শুনবে তার কথা, ছেড়ে দেবে তোমায়। কিন্তু এটা ভাবিনি যে সৌম্যক নিজেই হিনার কাছ থেকে ওর ওই বন্দি দশা নিতে চাইবে…!”

“সেটাই কি স্বাভাবিক নয় দাদু? আফটার অল সৌম্যক দা নিজের স্ত্রীকে প্রচন্ড ভালোবাসতেন আর হিনা দিও তাই। তাই তো সেও কিছুতেই ওই ছুরিটা তুলে দিতে রাজি হয়নি সৌম্যকদার হাতে।

আচ্ছা দাদু হিনা দি কি মুক্তি পেলো শেষমেশ? আর সৌম্যক দা… তারই বা কি হল?”

“এর উত্তর আমিও ঠিক জানিনা দাদাভাই। শপথের ওই মন্ত্রপূত ছুরি একসঙ্গে দুজনে ধরেছিল ওরা আর তাতেই তো শুরু হল প্রলয়। এরপর কি হয় আমার জানা নেই। তবে শুধু এটুকু বুঝেছি যে আজ থেকে ওরা যেখানেই থাকুক একসঙ্গে থাকবে।

কিন্তু আমি সত্যিই ভাবিনি সৌম্যক…”

কথাটা অসম্পূর্ণ রেখেই দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলেন ত্রিলোকেশ। এই প্রকৃতির বিভিন্ন রহস্য নিয়েই ত্রিলোকেশের কাজ কারবার। কিন্তু সংসারের ঝামেলায় তিনি কোনোদিনও জড়াননি আর তাই হয়তো আজ অবধি তাঁর অজানাই ছিলো আসলে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রহস্যময় জিনিসটার নাম হল ভালোবাসা। এর টানে মানুষ কত কিই না করতে পারে…সব বোঝা দায়!

শেষ।


Rate this content
Log in