Snigdha Jha

Drama Tragedy


4.7  

Snigdha Jha

Drama Tragedy


পণ্যা

পণ্যা

10 mins 16.8K 10 mins 16.8K

  "খেলিছো বিশ্ব লয়ে...বিরাট শিশু...আনমনে..." গানটা বেজে চলেছে বালিশের পাশে রাখা ট্যাবলেটে। মোহিতের প্রিয় গান। বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি নাচের সাথে প্রকৃতিকে তার নিজের গান শুনিয়ে যাচ্ছে। কাচের জানালার ভেতর দিয়ে তার নৃত্যধারা দেখা তো যাচ্ছে কিন্তু ধুন কানে আসছে না। তাই রেকর্ডের গানেই সে মগ্ন হয়ে আছে। সেই গানের সুরকেই মুগ্ধ হয়ে সে বৃষ্টিধারার নাচের সাথে সেট করে যাচ্ছে অপলকে। হঠাৎ বেডসাইড টেবিলে ঠক করে আওয়াজে তার চমক ভাঙ্গে। মদিরা টেবিলের ওপর চায়ের ট্রে রেখে বেরিয়ে যাচ্ছে। 

" মদিরা....", আকুল স্বরে ডাক দেয় মোহিত।  

মদিরা পেছনে ফিরে ঠান্ডা চোখে একটু দেখে তাকে, তারপর কিছু না বলেই চলে যায়। মোহিতের বুকের ভেতর ছলাৎ ছলাৎ করে ওঠে। আজও আগেকার মতই মোহময় তার তাকানো, তার চলে যাওয়া! নিজের অক্ষম অবস্থাকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারে না। ধীরে ধীরে শরীরের ওপরের অংশ টেনে তুলে চায়ের ট্রে বিছানায় উঠিয়ে নেয়। চা খেয়ে টেবিলে রাখা নিউজ পেপার তুলে চোখের সামনে রাখে, কিন্তু লেখাগুলো ঝাপসা হয়ে যায়। মন অতীতের তরঙ্গায়িত জীবনে ঝাঁপ দেয়। 

কলেজের প্রথম বছর। স্কুলের বাধানিষেধের গন্ডী ছাড়িয়ে প্রায় যা খুশী তাই করতে পারার স্বাধীনতায় মন লাগাম ছাড়া। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে অফ পিরিয়ডে কলেজ ক্যান্টিনে উদ্দাম আড্ডা। সেদিন ক্যান্টিনে শাহরুখ আর সলমানকে নিয়ে তুমুল বিতর্ক সভা বসেছে পাঁচ বন্ধু মিলে। আশপাশের খেয়াল নেই। হঠাৎ ধড়াম্....আহ্...হ্...হ্... ইত্যাদি আওয়াজে সম্বিত ফেরে। তাদের কলেজেরই কয়েকটি মেয়ে নিজেদের মধ্যে গল্প করতে করতে ক্যান্টিন থেকে বেরোচ্ছিল, তার ছড়ানো পায়ে পা জড়িয়ে গিয়ে তাদেরই একজন পপাত ধরণীতলে। হড়বড় করে উঠে দাঁড়ায় সে। মেয়েটির বন্ধুরা ততক্ষণে তাকে তুলে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সে "সরি" বলে মাফ চাওয়ার আগেই তারা তাড়াতাড়ি সেখান থেকে বেরিয়ে গেল। সে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। পরবর্তী ক্লাসের সময় হয়ে গেছে। তারাও ক্লাসের দিকে এগোলো। ক্লাসে গিয়ে বসতেই দ্বিতীয় সারিতে মেয়ে তিনটিকে নজরে পড়লো। তার মানে এরাও তারই ব্যাচমেট। কিন্তু আছাড় খাওয়া মেয়েটিকে চিনতে পারে না। তখন অপরাধবোধে হতভম্ব হয়ে যাওয়ার জন্য ভালো করে দেখেই নি। ক্লাস শেষ হওয়ামাত্র দরজায় পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। ওরা বেরোচ্ছে। কাছে গিয়ে বলে,"সরি, বেশী লাগে নি তো?" ওদের মধ্যে একটি মেয়ে চোখ উঠিয়ে শান্ত স্বরে বলে ওঠে, "না""। মিষ্টি আওয়াজ, এড়িয়ে যাওয়ার সুর। 

ভালো করে দেখে মেয়েটিকে৷দেখতে আহামরি কিছু না হলেও এক অদ্ভুত মায়াবী আকর্ষণ তার চোখদুটোতে। চলে যাচ্ছে মেয়েটি,কারও হাঁটাতেও যে এত সুন্দর নাচের ছন্দ থাকে আজ প্রথম দেখলো মোহিত। তার বুকে ঢেউ খেলে যায়। আরে, নাম কি ওর! যাক, পরে জেনে নেওয়া যাবে। আজ আর ঘাঁটানো উচিত নয়। তার বন্ধুরা তাকে ঘিরে ধরলো এসে, " কি রে এত আপসেট কেন লাগছে তোকে?" সে এ বিষয়ে কিছু না বলে শরীর খারাপের অজুহাতে বাড়ীর রাস্তা ধরে। সেদিন সে এক অদ্ভুত অস্বস্তিতে বাকী সময় কাটায়। 

   পরের দিন কলেজে গিয়ে মেয়েটিকে একা দেখতে পেয়ে সোজা তার কাছে গিয়ে তার নাম জিজ্ঞেস করে বসে। অবাক হলেও নিজের নাম বলতে দ্বিধা করে না মেয়েটি, " আমার নাম মদিরা। কিন্তু আপনি এত আগ্রহ কেন নিচ্ছেন বলুন তো?" 

" আমার নাম মোহিত।" প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়ে বলে ," দু' জনের নামের মধ্যে বেশ একটা কানেকশন আছে, তাই না?" 

" তাই তো দেখছি", মিষ্টি হেসে বলে মদিরা। 

দু' জনে কথা বলতে বলতে ক্যান্টিনের দিকে এগিয়ে যায়। গল্প করতে করতে তাদের খেয়াল নেই কতখানি সময় কেটে গেছে। হঠাৎ ঘড়ির দিকে নজর পড়ে। ফার্স্ট পিরিয়ড ওভার হবার সময় হয়ে গেছে প্রায়। তারা উঠে দাঁড়াতেই মোহিতের বন্ধুরা হৈ হৈ করতে করতে এসে পড়ে। সবাই একই ব্যাচের, তাই তাদের সবার সাথে বন্ধুত্ব হতে দেরী হয় না। এর পর মোহিত আর মদিরা ক্রমশ একে অন্যের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে দাঁড়ালো। গতবার এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পাশ করতে না পারার জন্য কম্প্যুটার সায়েন্সে অনার্স নিয়ে এই কলেজে ভর্তি হয়ে গেছিল মোহিত। কিন্তু তার ইচ্ছে ট্রিপল আই টিতে সুযোগ পাওয়ার চেষ্টা করার। তার মা- বাবার ইচ্ছেও তাই। সে এবার কঠোর পরিশ্রম করে তার লক্ষ্য হাসিল করে ফেললো। তাকে অন্য কলেজে চলে যেতে হবে। মদিরাকে আর রোজ সাথে পাবে না। তবে রোজ দেখা না হলেও থাকবে তো একই শহরে। কেবল কলেজ অন্য হলো। তাই কম হলেও তাদের দেখাসাক্ষাৎ বজায় রইলো। এতে সম্পর্কের গভীরতা যেন আরও বেড়েই গেলো। 

     সময়মত দু'জনেরই পড়া শেষ হলো। সে এতদিন কখনও মদিরার বাড়ী যায় নি বা তার অ্যাড্রেস জানতে চায় নি। তার পারিবারিক ব্যাপারে কিছুই জানে না সে। মদিরাও এব্যাপারে কোন আগ্রহ দেখায় নি একবারও। সবসময় তারা বাইরেই দেখা করে সময় কাটিয়েছে। আলাদা কলেজ হয়ে যাওয়াতে দেখা কমই হতো, তাই যেটুকু সময় পেত নিজেদের গল্পেই মগ্ন থাকতো। সেও অবশ্য তার বাড়ীতে যাওয়ার জন্য কখনও বলেনি মদিরাকে। চাকরী পেয়ে এবার সে তাকে বিয়ের জন্য অ্যাপ্রোচ করে আর তার মা-বাবার সাথে কথা বলার ইচ্ছে জানায়। এর মধ্যে সে নিজের বাবা-মার সাথে এ ব্যাপারে কথা বলে নিয়েছে। তাঁরা দুই পরিবারের মধ্যে দেখাসাক্ষাৎ করতে চান। তাঁরা মদিরাকে এখনও দেখেন নি। একেবারে ফর্মালিটি করেই দেখতে চান। এমনিতে ছেলের পছন্দে তাঁদের কোন আপত্তি নেই। মোহিত তাঁদের একমাত্র ছেলে। মদিরাকে একথা জানাতেই সে কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেল যেন ! এমন দিনের সম্মুখীন হতে হবে এটা ভাবার চেষ্টাও করেনি হয়তো কোনদিন। কেবল মোহিতের ভালোবাসার স্রোতেই ভেসে থাকতো সে। আজ কেঁপে ওঠে তার কথায়। কিন্তু নিজেকে শক্ত করে৷ কঠোর বাস্তবকে মেনে নেব ভেবে মোহিতকে সব কথা খুলে বলাই উচিত মনে করে। 

   মদিরা এক যৌনকর্মীর মেয়ে, তার মা অসুস্থ এবং শয্যাশায়ী,এখন "জাগৃতি" নামে এক স্ত্রীসদনে তাদের আস্তানা,বাবার পরিচয় নেই। তার যখন ছয়/সাত বছর বয়েস তখন তার অসুস্থ মা আর তাদেরই মত আরও কিছু অসহায়কে রেড লাইট এরিয়া থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে "দিশারী "র ( এক এন জি ও) কিছু কর্মী। "জাগৃতি" "দিশারী" র পরিচালিত এক প্রতিষ্ঠান। মদিরার মত পড়াশোনায় আগ্রহী যারা তাদের প্রতি এই প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ সহযোগীতা থাকে। তাদের সাহায্যেই আজ মদিরার কলেজে পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে। এই সত্য কিছুক্ষণের জন্য মোহিতের বোধবুদ্ধিকে শূণ্য করে দেয়। মোহিত খুব ভালো করে জানে যে তার মা- বাবা কিছুতেই একথা বরদাস্ত করতে পারবেন না। তাঁদের একমাত্র ছেলের জন্য এ সম্বন্ধ মেনে নেওয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়। মদিরা মুখ নীচু করে বসে আছে, তার দু' চোখে শ্রাবণের ধারা, শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে। 

এখন মোহিতকে ডিসিশন নিতে হবে। মা- বাবা এখনও সক্ষম। তাঁদের আর্থিক স্থিতিও মন্দ নয়। তাঁদের থেকে কিছুদিন দূরে চলে গেলে তাঁরা কষ্ট পাবেন ঠিকই, কিন্তু অথৈ জলে পড়বেন না। তাছাড়া সে তাঁদের খবর রাখবে। কিন্তু এখন এই পরিস্থিতিতে মদিরার সে ছাড়া আর কেউ নেই। সে মদিরার দু'হাত জড়িয়ে তাকে শান্ত করে। পরের দিন চিঠিতে সবকিছু মা- বাবাকে জানিয়ে মোহিত বাড়ী ছাড়ে। তার আশা একদিন মা-বাবা মদিরাকে ঠিক মেনে নেবেন। তাছাড়া একমাত্র ছেলেকে ছেড়ে থাকতেই পারবেন না বেশীদিন।তার নতুন চাকরীতে পোস্টিং দিয়েছে গুড়গাঁওয়ে। মদিরাকে মন্দিরে নিয়ে গিয়ে বন্ধুদের সাহায্যে বিয়ে করে, তারপর বিয়ে রেজিস্ট্রিও করে নেয়। এতে "দিশারী " র পক্ষ থেকেও আন্তরিক সাহায্য পায়। তারা মদিরার অসুস্থ মায়ের দেখাশোনা চালিয়ে যাবে কথা দেয় এবং তার জন্য কোন চিন্তা করতে বারণ করে। মদিরা নিশ্চিন্ত হয়ে মোহিতের সাথে তার চাকরির জায়গায় রওয়ানা হয়। সেখানে দিন যেন খুশীর পাখা মেলে উড়তে থাকে। এর মধ্যে তার বন্ধু রত্নেশের ট্রান্সফার গুড়গাঁওয়ে হয়। সেও তাদের কাছাকাছিই থাকতে শুরু করে। সে মদিরারও খুব ভালো বন্ধু ছিল কলেজে। এখনও বিয়ে করে নি সে। তাই তার ছুটির দিনের খাওয়া- দাওয়াটা মোহিতদের সাথেই হয় আর কলেজের দিনগুলোর মত জমিয়ে আড্ডা দিয়ে ছুটির দিন কাটে তাদের। 

    সেদিন ক্রমাগত বৃষ্টির তৃতীয় দিন। রাস্তাঘাট প্রায় জলমগ্ন। মদিরা আবদার ধরে," আজ আর অফিস যেও না তো। আজ অলসভাবে কেবল আমি আর তুমি গল্প করে কাটাবো।" মোহিত একটু আদর করে বলে," ঘন্টাখানেকের একটা ইম্পর্ট্যান্ট মিটিং আছে। সেটা সেরেই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরে আসছি"। বলেই তৈরী হয়ে বৃষ্টির মধ্যেই বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। অফিসের প্রায় কাছাকাছি পৌঁছতেই তার বাইক পেছল রাস্তায় স্কিড করে যায়। সে ছিটকে মাটিতে পড়ে আর বাইক উলটে পড়ে ঠিক তার দুই পায়ের ওপর। আশেপাশের লোকজন ছুটে এসে বাইক ওঠায়। সে কিন্তু দাঁড়াতে পারে না কিছুতেই। অফিসের তরফ থেকে তাকে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করে দেয়। প্রায় একমাস সেখানে থাকতে হয়। এরমধ্যে রত্নেশ, তার আর মদিরার খুব খেয়াল রাখে। রত্নেশ তার মা-বাবাকে তার অবস্থার কথা ফোন করে জানায়। তাঁরা তীব্র অভিমানে এই বিপদেও একমাত্র ছেলেকে শুধুমাত্র দেখা করার জন্যও আসতে রাজী হন না। অভিমান কখনও কখনও অত্যন্ত আপনকেও পর করে দেয়। এই ঘটনার পর মদিরার প্রতি তাঁদের বিতৃষ্ণা আরও বেড়ে যায়। মোহিতের এই দুর্গতির জন্য মদিরাকেই দায়ী করেন তাঁরা। হাসপাতাল থেকে ছুটি পেয়ে বাড়ী ফেরে মোহিত। শরীরের নীচের অংশ তার এখনও সম্পূর্ণ অবশ। ঠিক হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। মদিরা কেমন চুপ হয়ে গেছে। সে কম্প্যুটার সায়েন্সে এম এস সি করেছিল। তাই মোহিতের অফিসেই তার চাকরী হয়েছে। বেশ কিছুদিন কেটে গেছে এর পর। তার শরীরের অবস্থার কোন পরিবর্তন নেই । রত্নেশ যথাসাধ্য তাদের খেয়াল রেখে যাচ্ছে। কৃতজ্ঞ সে রত্নেশের কাছে।  

মোহিতের আকুল ডাক কে অবহেলা করে নিজেকে আর সামলাতে পারে না মদিরা।

রান্নাঘরে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। মেঝেতে ধপ করে বসে পড়ে দু'হাত দিয়ে মুখ ঢাকে। মনে পড়ে যায় তার সেই ছোটবেলার কথা। সারাদিন আলুথালু হয়ে থাকলেও সন্ধ্যাবেলা থেকে মা সুন্দর করে সাজতে বসতো। মাথায় ফুলের মালা জড়িয়ে কি সুন্দর লাগতো মাকে। মায়ের খুব কাছে গিয়ে গা ঘেঁসে দাঁড়াতো সে, কি মিষ্টি একটা গন্ধ মায়ের গায়ে। কিন্তু বেশীক্ষণ থাকতে পেত না। একটা দুষ্টু মাসী এসে জোর করে টেনে নিয়ে যেত অন্য ঘরে। সেখানে তার মত আরও কয়েকজন বাচ্চা থাকতো। কেউ কাঁদতো, কেউ বা গোমড়া মুখে চুপ করে বসে থাকতো। তাদেরকে ঢুকিয়ে দরজা বাইরের থেকে বন্ধ করে দেওয়া হতো। রাত্রে একজন এসে খাবার দিয়ে যেত আর বলে যেত খেয়ে সবাই যেন শুয়ে পড়ে। এই মা'ই আবার দুপুরবেলা নিজের কোলে বসিয়ে গল্প শোনাতে শোনাতে খাইয়ে দিত। কত আদর করতো। " রাত্রে তুমি কাছে কেন থাকো না মা?" জিজ্ঞেস করলে মা কিছু না বলে কেঁদে ফেলতো। "ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু.... "গাইতে গাইতে পিঠে মাথায় হাত বুলিয়ে দিত। খুব ভালো লাগতো। কিন্তু একটু গাইতে গাইতেই মায়ের পেটে ব্যথা শুরু হয়ে যেত আর বালিশের ওপর পেট চাপা দিয়ে শুয়ে ছটফট করতো। আমি মাথায় হাত বুলিয়ে ব্যথা কমাবার চেষ্টা করতাম। তখন আমার বয়স প্রায় ছয় বছর হবে। আমার বয়সী যে ক'টা মেয়ে ছিলো তাদের টেনে নিয়ে গিয়ে নাচ আর গান শেখানোর চেষ্টা চলতো। একটু ভুল হলেই মার পড়তো। মায়ের পেটে ব্যথা দিন দিন বাড়তেই থাকে, কিন্তু কোন চিকিৎসা হয় না। ঠিক সেই সময় একদিন "দিশারী "র কর্মীরা অসুস্থ যৌনকর্মীদের চিকিৎসার জন্য দেবদূতের মত এসে হাজির হন। মা এবং আরও কয়েকজনের কান্নাকাটিতে ব্যথিত হয়ে দূরারোগ্য রোগের বাহানায় তাদের সেখান থেকে উদ্ধার করেন। তবে তার মত ছোটদের ছাড়িয়ে আনতে তাঁদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। "জাগৃতি"তে এসে চিকিৎসা চলায় মায়ের শরীর একটু সুস্থ হয়। মা এবং বাকীদের যোগ্যতা অনুযায়ী বিভিন্ন কাজে লাগিয়ে দেওয়া হয়। বাচ্চারা স্কুলে ভর্তি হয়। সবার মধ্যে সেই ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট করে করে কলেজ পর্য্যন্ত এগিয়ে যায়। তার ইচ্ছে ছিল পাশ করে চাকরী করবে, আর সেই টাকা "জাগৃতি" র ফান্ডে দিতে থাকবে যেন তার মত অন্যদের পড়াশোনাতেও সাহায্য হয়। " দিশারী" আর "জাগৃতি " র দান সে কখনও ভুলবে না। কিন্তু কলেজে মোহিত তার জীবনে এসে সব ওলট পালট করে দিল। তার আগে বিয়ে করার কথা সে স্বপ্নেও ভাবে নি। মোহিত তার জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেল। আর এখন সেই মোহিত নিজেই নিজেকে তার থেকে দূর করে নেওয়ার জন্য দায়ী। মোহিতের ইঙ্গিতে আর প্রশ্রয়েই আজ রত্নেশ তার এত কাছে আসতে পেরেছে। মদিরা মানছে এই বিপদে রত্নেশ তাদের যা উপকার করেছে তা ভোলার নয়, কিন্তু তাই বলে..... না না, এর জন্য রত্নেশকে নয়, মোহিতকে কক্ষণও ক্ষমা করতে পারবে না সে। তার এত ভালোবাসাকে সে কি করে এত তুচ্ছ করতে পারলো আজ ! তার অতীতের কালো ছায়াকে পরোয়া না করে নিজের মা-বাবার সাথেও সম্পর্ক কাটাতে পিছপা হয় নি যে মোহিত, আজ কি করে সে এত বদলে গেল! তাকে চিনতে এত ভুল করেছিল মোহিত! 

সেদিন ছুটির দিন। আজ দুপুরে মদিরা নিজের হাতে মোহিতকে খাইয়ে দিচ্ছে। অন্যদিন তার সময় থাকে না। মোহিতকে দেখাশোনা করার জন্য একজন আয়া রেখে দিয়েছে। তাদের অফিসেরই পিয়নের বৌ। সকালে আসে আর মদিরা অফিস থেকে ফিরলে চলে যায়। মায়ের মতই সেবাযত্ন করে মোহিতের। খেতে খেতে হঠাৎ মদিরার হাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মোহিত," কেন,কেন তুমি আমার থেকে এমন পালিয়ে পালিয়ে থাকছো? তুমি কি আর আমায় একটুও ভালোবাসো না!" মদিরার শরীর শক্ত হয়ে ওঠে। ঠোঁটের ওপর দাঁত চেপে বসে। 

মোহিত কাতর হয়ে বলে, "কি অপরাধ করেছি বলো? তোমারও তো শখ সাধ আছে। আমি সারা জীবনের মত অক্ষম হয়ে পড়েছি। তোমার কোন আকাঙ্ক্ষা আমি পূর্ণ করতে পারবো না কোনদিন। শুধু সেইজন্য ডার্লিং,শুধু সেইজন্য... কেন বোঝো না! তোমার প্রতি আমার অত্যধিক ভালোবাসাই আমাকে তোমার জন্য রত্নেশকে তোমার কাছে পাঠাতে বাধ্য করেছে। তোমার শূণ্য জীবন আমি সহ্য করতে পারছিলাম না।" 

মদিরার কান্নায় জড়িয়ে যাওয়া গলার আওয়াজ শোনা যায়," আমি যদি বলি তুমি আমার অতীতকে ক্ষমা করো নি। তাই আমার ইচ্ছে অনিচ্ছের কথা একবারও জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন মনে করোনি। আমার অতীতের কালো ছায়া নিজের মনের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিলে, ভেবেছিলে আমি তো..... আর সেই জন্যই এত সহজে সেই মাপকাঠিতেই আমাকে মেপে নিয়েছিলে! আমার প্রতি কেবল তোমার অসীম ভালোবাসায় নয়, তোমার নিজের ভবিষ্যতের সুরক্ষার জন্যও তুমি আমায় পণ্যা হিসেবে ব্যবহার করেছো।" 

   মোহিতের হাত থেকে মদিরার হাত খুলে পড়ে যায়। সে স্তব্ধ হয়ে মদিরার কান্নায় ভেঙ্গেচুরে যেতে থাকা মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।  


Rate this content
Log in

More bengali story from Snigdha Jha

Similar bengali story from Drama