Snigdha Jha

Inspirational


1  

Snigdha Jha

Inspirational


শত্রু

শত্রু

3 mins 1.2K 3 mins 1.2K

---কি হয়েছে?মাছের বাজারের মতো এত হল্লা কেন? 


ক্লাসে ঢুকে বলার সাথে সাথে টেবিলে কয়েকবার ডাস্টার ঠুকে আওয়াজ করেন রঞ্জিতবাবু। তিনি এই ক্লাসে ইকনমিক্স পড়ান। টিফিনের পরের পিরিয়ডটা তাঁর। কথা তো কারও কানে যায় নি,তবে এই তীব্র ঠক ঠক আওয়াজে সম্পূর্ণ ক্লাসে পিনড্রপ সাইলেন্স ছেয়ে গেল। সকলের চোখ মেঝেতে গেঁথে গেল। মনেই হচ্ছে না এখন যে একমুহূর্ত আগে এরাই পুরো ক্লাসরুমে তুফান তুলে রেখেছিল। 


---বসে পড়ো সকলে। এবার আমার দিকে তাকাও। নীরজ... প্রথমে তুমি বলো এই তুলকালামের কারনটা কি?


ছেলেদের দিকে আঙুল তুলে জিজ্ঞেস করেন। কো -এডুকেশন স্কুল। ক্লাসরুমে একদিকে ছেলেদের আর একদিকে মেয়েদের বসার একটা অলিখিত নিয়ম আছে। 


----আমাদের দিকে বেঞ্চ কম। গরমে গাদাগাদি করে বসতে ভীষণ কষ্ট হয়। তাই....

কথা অসম্পূর্ণ রেখে চুপ করে যায় নীরজ।


----আর আমাদের বুঝি কষ্ট হয় না?স্যার, আমাদের দিক থেকে দু'সেট ডেস্ক-বেঞ্চ ওরা টিফিনটাইমে ওদের দিকে নিয়ে নিয়েছে। আর তার ওপরে বইয়ের যে ব্যাগগুলো ছিল সেগুলো মাটির ওপর রেখে দিয়েছিল।

প্রতিবাদের আওয়াজে বলে রাগের ভঙ্গীতে ছেলেদের দিকে তাকায় সুলগ্না। 


হেসে ফেলেন স্যার।

--- ক্লাস টেনের ছাত্র-ছাত্রী তোমরা। এসব কি ছেলেমানুষী হচ্ছে ! যাক গে,যেখানে যা ছিল শিগগির সেই মতো রেখে দিও। দশ মিনিট নষ্ট হলো এমনিতেই। বই খোলো। কোন চ্যাপ্টারে ছিলাম যেন আমরা... হ্যাঁ..." চাহিদা "... শুরু করা যাক....


বলেই পড়ানোতে মগ্ন হয়ে যান। পিরিয়ড শেষের ঘন্টা বাজতেই তিনি আর একবার সবাইকে সচেতন করে বেরিয়ে গেলেন ক্লাস থেকে। পরের ক্লাস শুরু হওয়ার আগেই ছেলেরা তাড়াহুড়ো করে বেঞ্চগুলো যথাস্থানে সেট করতে গেলে একটা ডেস্ক হুড়মুড়িয়ে পড়লো সুলগ্নার পায়ের ওপর। 


---উফ্.....


আর্ত চিৎকার করে বসে পড়ে সে। পা কেটে রক্ত বয়ে যাচ্ছে। সবাই ঘাবড়ে যায়। ছেলেরাও ছুটে আসে পাশে। তার হাত ধরে ওঠাতে যায়, 


----অফিসে চল। ফার্স্ট এইডের ব্যবস্থা আছে ওখানে। চল, তাড়াতাড়ি ব্যান্ডেজ করে দিই।

----তোরা ছুঁবি না আমায়। ইচ্ছে করে আমার পায়ে চোট লাগালি।শত্রু তোরা আমার,আমার সাথে কথাও বলবি না কেউ।

কাঁদতে থাকে সুলগ্না।


----সে কি রে?কি বলছিস তুই? এটা বাই চান্স ঘটে গেছে। আমরা একসাথে ছোটবেলার থেকে পড়াশোনা, খেলাধুলা করে আসছি। এতদিন এত ভালো বন্ধু ছিলাম আমরা,আর আজকের এই ছোট্ট ঘটনায় শত্রু হয়ে গেলাম!

নীরজ দুঃখ পেয়ে বলে। 

সুলগ্না কিছু না বলে খোঁড়াতে খোঁড়াতে অফিসের দিকে রওয়ানা হয়। কিছু মেয়ে তার পিছু নেয়।

 

--- আজ গানের ক্লাসে দিদি যে গানটা আমাদের কালকের জন্য রেওয়াজ করে আসতে বললেন সেটা আমার খুব প্রিয় একটা গান।


সুলগ্না গুনগুনিয়ে ওঠে। তার সাথে গলা মেলায় তার সাথী আরো তিনটি মেয়ে। তারা চারজনই আশেপাশে থাকে আর একসাথেই গান শিখতে যায়। প্রত্যেক রবিবার বিকেলে এই ক্লাস হয়। তাদের বাড়ী থেকে একটু দূরে,কিন্তু হেঁটেই যাওয়া আসা করে। তারা গানের ধুনে এত মগ্ন ছিল যে কখন মেঘ করে এসেছে বুঝতেই পারে নি। হঠাৎ হাওয়াও জোরে বইতে শুরু করে দিল। চোখে মুখে ধুলো ঢুকছে... সকলে ছুটে গিয়ে পাশেই একটা নতুন আধা কন্সট্রাকশন হওয়া বিল্ডিংয়ে ঢুকে পড়ে। আবছা অন্ধকার চোখে সয়ে এলে তাদের নজরে পরে দু'জন ষন্ডা মত লোক আগে থেকেই সেখানে একটা শতরঞ্জি বিছিয়ে বসে তাস খেলছে। বাইরে হাওয়ার তান্ডব শুরু হয়েছে। লোক দু'টো তাদের দেখে উঠে দাঁড়ায়। দাঁত বের করে হাসতে হাসতে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে থাকে তাদের দিকে। ভীষণ ভয় পেয়ে যায় সুলগ্নারা। পালাতে গিয়ে দেখে লোকগুলোই দরজার দিকে। সাহস করে তাদের পাশ কাটাতে গিয়ে ধড়াম করে একটা ইঁটে ঠোকর খেয়ে পড়ে যায় সুলগ্না। ষন্ডা দু'টোর অন্যমনস্কতার সুযোগে বাকিদের পালিয়ে গিয়ে বাড়ীতে খবর দিতে বলে সে। কোনরকমে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করার আগেই লোক দু'টো ধরে ফেলে তাকে। 


বাকিরা বিল্ডিংয়ের বাইরে এসে হাঁফাতে হাঁফাতে ছুটতে থাকে। হঠাৎ তাদের নজরে পড়ে নীরজরা খেলার মাঠ থেকে ছুটতে ছুটতে আসছে। ঝড়ের জন্য সবার বাড়ী পৌঁছাবার তাড়া। মেয়েদের ভয়ার্ত মুখ আর ওই ঝড়ের মধ্যে রাস্তায় ছুটতে দেখে তাড়াতাড়ি কাছে আসে। মেয়েরা সব কথা খুলে বলামাত্র তাদের বাড়ী যেতে বলে নীরজরা ছুট লাগায় সেই বিল্ডিংয়ের দিকে। সুলগ্নার শক্তি ততক্ষণে লড়াই করতে করতে প্রায় নিঃশেষ। তাও আঁচড়ে কামড়ে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে তাদের। কিন্তু আর পারছে না। আর বুঝি নিজেকে রক্ষা করতে সে পারলো না। তার বুকের ওপরে একজনের নিঃশ্বাস ক্রমশঃ এগিয়ে আসছে...টের পাচ্ছে সে। সে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে...চোখ বুজে ফেলে আতংকে। হঠাৎ,

---আহ্.... 


একটা অস্ফুট গোঙানির আওয়াজের সাথে গড়িয়ে পড়লো পাশে জানোয়ারটা। চমকে কোনরকমে চোখ টেনে খোলে সুলগ্না। সামনে কারা দাঁড়িয়ে আছে! ভুল বুঝে যাদের সে শত্রু বানিয়েছিল সেই ছোটবেলাকার বন্ধুরা। নীরজের হাতে উদ্যত ক্রিকেট ব্যাট। বাকিরা পাশে এসে তাকে দাঁড়াতে সাহায্য করে। সুলগ্নার চোখে জল।

তার মনে পড়ে যায় এক বিখ্যাত মনীষীর উক্তি," পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হচ্ছে বন্ধুত্ব"।


Rate this content
Log in

More bengali story from Snigdha Jha

Similar bengali story from Inspirational