Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

Ananya Podder

Drama Classics Inspirational


5.0  

Ananya Podder

Drama Classics Inspirational


পাপ পুণ্য

পাপ পুণ্য

11 mins 522 11 mins 522

চ্যাটার্জী বাড়িতে আজ ভীষণ ব্যস্ততা !! ... সমীরণের বড় পিসি এই যায় কী সেই যায় | প্রায় সত্তর পেরিয়ে যাওয়া পিসির রক্তে সোডিয়াম পটাসিয়াম একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে | শরীরে কিছুই নেই, একেবারে অন্তঃসারশূন্য | ক্যালসিয়াম, ভিটামিন, প্রোটিন সব কিছুরই অভাব | বিছানায় শায়িত এই মানুষটাকে স্থির ভাবে দেখে চলেছে শর্মিষ্ঠা | মাত্র বছর দুয়েক হয়েছে সে এই বাড়ির বউ হয়ে এসেছে | একান্নবর্তী পরিবারে এই পিসিই ছিলেন পরিবারের কর্ত্রী | শর্মিষ্ঠার শ্বশুররা পাঁচ ভাই | ছোটো কাকা বিয়ে করেননি | বাকি চার ভাইয়ের মধ্যে সেজো ভাই নিঃসন্তান | তিন ভাইয়ের ঘরে তিন ছেলে আর দুই মেয়ে | শর্মিষ্ঠা বাড়ির সবচেয়ে ছোটো ছেলের বউ | মিত্র পদবী নিয়ে সমীরণের বউ হয়ে এ বাড়িতে প্রবেশ করার সময় সে টের পেয়েছে এদের ব্রাহ্মণত্ব রক্ষা করার প্রবল প্রচেষ্টাকে | সমীরণের ধনুক ভাঙা পণ আর তার বৌদিদের সাহচর্য না থাকলে সে সমীরণকে কোনোদিনই পেতো না হয়তো, আর এ ব্যাপারে সবচেয়ে বাধা সৃষ্টিকারী ছিলেন বড় পিসি |


শর্মিষ্ঠা এ বাড়ির বউ হয়ে আসার বেশ কয়েক মাস পরেও বড় পিসি তার হাতে জলস্পর্শও করতেন না, পাছে ব্রাহ্মণত্ব নষ্ট হয় তার | কিন্তু বাড়ির সবার সাথে শর্মিষ্ঠার সম্পর্ক এমন ভাবেই তৈরী হয়েছিল যে উনি আর মুখ ফিরিয়ে রাখতে পারেননি শর্মিষ্ঠার থেকে, ভালো যে বাসতেই হয়েছে উনাকে |


সেই বড় পিসি আজ শয্যাশায়ী | ডাক্তার চক্রবর্তী বড় জ্যেঠুর বাল্যবন্ধু | তিনি পিসিকে দেখার পরে হতাশ মুখ নিয়ে পিসির ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন | বাড়ির সবাই উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে তার দিকে !! বড় জ্যেঠু জিজ্ঞেস করলেন, "কী অমিয়, কী বুঝলি?? দিদি সেরে উঠবে তো?? "


চক্রবর্তী জ্যেঠু ম্রিয়মান হয়ে বললেন, "দেখ ভাই অম্লান, দিদির শরীরের যা অবস্থা তাতে তাঁর এখন পুথির চেয়ে পথ্যের প্রয়োজন বেশি | দিদিকে এখন মুসুরি ডালের জল, মাছের ঝোল, মুরগির মাংসের স্যুপ এসব খাওয়াতে হবে | তবেই দিদির শরীরে রিকভারি হবে তাড়াতাড়ি | কিন্তু দিদি কী এসব খাবার খাবেন?? "


চক্রবর্তী জ্যেঠুর কথা শুনে সবাই এক প্রকার আঁতকে ওঠে | এ কাজ তো করা যাবে না !!!


বড় জ্যেঠু বলে ওঠেন, "না, না, অমিয় | অন্য রাস্তা বল | এ কাজ করা যাবে না | তার চেয়ে তুই ওষুধ প্রেস্ক্রাইব কর সে যত দামেরই হোক না কেন, আমরা কিনে নেবো | "


"দেখ ভাই আমি ওষুধ লিখে দিয়েছি | কিন্তু সেগুলি দিদির সুস্থ হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয় | ওষুধের পাশাপাশি পথ্যগুলিরও প্রয়োজন আছে বইকি | "


শর্মিষ্ঠা সবার মাঝে দাঁড়িয়ে সব শুনছিলো | সে হঠাৎ করে বলে উঠল, "আমি খাওয়াবো পিসিকে|"


শর্মিষ্ঠার কথায় তার বড় জা অনুরাধা ধমক দিয়ে ওঠে, "চুপ কর তুই | না বুঝে শুনে মন্তব্য করিস শুধু | "


এরপরে আর কথা এগোয় না | চক্রবর্তী জ্যেঠু চলে গেলে অনুরাধা খুব বকাবকি শুরু করে শর্মিষ্ঠাকে | "তোর কী কোনো কান্ডজ্ঞান হবে না নাকি শর্মী !! ... বিধবা ব্রাহ্মণ বউকে বলছিস আমিষ খাওয়াবি?? "


"তাতে কী হয়েছে বড়দিভাই?? ব্রাহ্মণের বিধবা বলে কী প্রয়োজনেও আমিষ খেতে নেই??.... এখন কী এসব কেউ মানে?? "


"কেউ মানে না, কিন্তু পিসি মানেন | আমি পনেরো বছর বিয়ে হয়ে এসেছি এ বাড়িতে | প্রথম থেকেই শুনেছি, মাত্র পনেরো বছরে বিয়ে হয়েছিল পিসির | বিয়ের মাত্র আট মাসের মাথায় উনি বিধবা হন | পিসেমশাইকে সাপে কামড়িয়েছিলো | দাদু নিয়ে আসেন তারপর পিসিকে এ বাড়িতে তার বৈধব্যের বাকি জীবন কাটাতে | সেই যে আমিষের সঙ্গে সম্পর্ক ঘুচালেন, আর কখনো মাছ, মাংস বা ডিম ছুঁয়ে দেখেননি | মাছ মাংসে তার এমনই অনীহা | "


"কিন্তু বড়দিভাই মাছ মাংসে যদি অনীহাই থাকবে পিসির, তাহলে অত সুন্দর করে মাছ মাংস রান্না করতেন কী ভাবে?? ..... মাছের মাথা দিয়ে ডাল, মুড়ো ঘন্ট, দই কাতলা, ইলিশ ভাপা -- এসব রান্নায় তো তার জুড়ি মেলা ভার ছিল | তোমাদেরকেও তো রান্না করতে দিতো না |. মেনকাদি শুধু পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্য করতো | "


"সে, পিসি সবাইকে খাওয়াতে ভালো বাসতেন তাই !! .... কিন্তু নিজে কী কখনো খাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন?? .... আমিষ রান্না করার পরে প্রতিদিন উনি স্নান করেছেন | তাই না?? "


"নিজে ওসব খেতে না পারার আক্ষেপটা উনি অন্যদের খাইয়ে পুষিয়ে নিতেন হয়তো | "


"তুই থাম শর্মী !! ... এসব গন্ডগোলের মধ্যে আর জড়াস না নিজেকে | এমনিতেই তোর বিয়ে নিয়ে বাড়িতে একটা মন কষাকষি ছিল, তার উপর যদি তুই পিসিকে আমিষ খাওয়ানোর চেষ্টা করিস, তাহলে তোর ভাগ্যে যে কী শাস্তি জুটতে পারে তুই ভাবতেও পারছিস না | "


"শাস্তি পাবার ভয়ে একটা মানুষকে মরে যেতে দেবো বড়দিভাই?? "


"তুই মরবি শর্মী!! বার বার তোকে না করছি | বাবা, কাকারা জানলেও যথেষ্ট রুষ্ট হবেন | এ বাড়ির সবাই গোড়া ব্রাহ্মণ | আর ব্রাহ্মণত্ব বজায় রাখার সবচেয়ে বড় প্রচেষ্টা ছিল বড় পিসির | তার দাপটেই কেউ কখনো নিয়ম নিয়ে ছেলে খেলা করেনি | এই বাড়ির ছেলেরা পর্যন্ত কোনোদিন বাড়িতে মুরগির মাংস ঢোকাতে পারলো না | মুরগির মাংস খেলে বাইরে খায় আর তুই কিনা সে বাড়িতে থেকে পিসিকে খাওয়াবি মুরগির ঝোল?? .... "


" দেখোই না কী করি | তুমি আর ভেবো না | বড় পিসিকে সুস্থ করে তোলার দায়িত্ব আমার | "


রাতে খাবার টেবিলে জ্যেঠু জেঠিমাদের সামনে কথাটা পাড়ে শর্মিষ্ঠা | তার সাহসে বাড়ির সবাই স্তম্ভিত হলেও বড়ো জ্যেঠু বললেন, "তুমি যে এসব খাওয়াতে চাইছো দিদিকে, তো এসব কথা তো আয়ার মাধ্যমে বাইরে প্রচার হবে | তাই নয় কী?? "


"আয়া ছাড়িয়ে দাও বড়ো জ্যেঠু | বড়ো পিসির সব দায়িত্ব আমি নিচ্ছি | তাহলেই তো আর ঘরের কথা বাইরে যাবে না | "


"কিন্তু দিদি সুস্থ হয়ে ওঠার পরে সব কিছু জেনে যদি তোমায় বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন, কী করবে তুমি?? আমরা তো কেউ তাঁর উপরে কথা বলার সাহস রাখি না | "


"নিঃশব্দে বেরিয়ে যাব | কিন্তু এখন আমায় অনুমতি দাও | "


"বেশ, তবে তাই হোক | "


বড়ো জ্যেঠুর অনুমতি পেয়ে পরদিন থেকেই লেগে পড়ল শর্মী | পিসির অর্ধ চেতন শরীরটাকে সুস্থ করার জন্য শুরু হোলো পথ্যের প্রয়োগ | মুরগির টেঙড়িকে সেদ্ধ করে তার মধ্যে হেলথ ড্রিঙ্কস মিশিয়ে খাওয়ানোর চেষ্টা করলো | প্রথম দিনেই মনোরমা মানে শর্মীর বড়ো পিসি শাশুড়ি সেই খেয়ে দিলেন বমি করে | শরীরের সামান্য শক্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "কী খাওয়ালি আমায়?? কী গন্ধ !! "


"বড়ো পিসি, এর নাম প্রোটিনেক্স, এটা একটা প্রোটিন পাউডার | তুমি তো আর মাছ মাংস খাও না, তাই এই পাউডারটা চক্রবর্তী জ্যেঠু দিয়েছেন তোমাকে খেতে | তোমার সব খাবারেই থাকবে এই পাউডার টা এখন থেকে | একটু গন্ধ সহ্য করেই খেতে হবে তোমায় | "


ছেলে বৌয়ের কান্ড দেখে সমীরণের মা বললেন, "পাউডারের নাম যখন করলে তখন সেটা খাওয়ালেই তো পারো | এসব মিথ্যে নাটক করে পাপের তলে পড়ছো কেন তুমি?? "


"পাউডার টা আর কদিন বাদে থেকে খেলে হবে | ঘোলের স্বাদ দিয়ে দুধের গুণ টুকু কী পাওয়া যায় মা?? "


"তবুও এটা পাপ শর্মী | তাকে না জানিয়ে এভাবে তাকে এসব খাওয়ানো !!! .... এ পাপ কেন করছো তুমি কে জানে?? "


শর্মী চুপ করে থাকে | ওর জীবনে এমন ঘটনা প্রথম নয় | ওর ঠাম্মা ছিল ওর হরিহর আত্মা | তিনি ছিলেন বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত | তাই আমিষের ধারে কাছেও তিনি থাকতেন না | জ্যেঠু আর বাবা মিলে ঠাম্মার জন্য আলাদা রান্নাঘর তৈরী করে দিয়েছিলো | সেই রান্নাঘরেই ঠাম্মা তার নিরামিষ রান্না করে খেত | সেই ঠাকুমা যখন বার্ধক্যের কামড় সইতে না পেরে বিছানা নিল, তখন ডাক্তার বলেছিল, শরীরকে চাঙ্গা করতে প্রোটিন রাখতে হবে খাবারের তালিকায় | কিন্তু প্রোটিন মানে তো ডিম, দুধ, মাছ, মাংস !! .... সে জিনিস নিয়ে যাবে কে শর্মীর ঠাম্মার কাছে?? .... বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী মানুষকে আমিষ খাইয়ে পাপ বহন করার ইচ্ছে দেখালো না কেউ | মাস দেড়েক পরে পথ্যের অভাবে ঠাম্মা বিদায় নিল | শুধু দুধ আর ফলের রস বাঁচাতে পারলো না শর্মীর ঠাম্মাকে | তাই শর্মী এখানে আর সে ভুল করবে না | মানুষের জীবনের চেয়ে কতো গুলি গোড়া নিয়ম বড়ো হতে পারে না কখনো !!!


এরপর শুরু হোলো মাছ খাওয়ানোর পালা | মাছ ধুয়ে তাকে ভিনিগার দিয়ে মাখিয়ে রাখতো, যাতে মাছের কোনো গন্ধ না লাগে | আলু পোস্তর সাথে একপিস মাছও রান্না হয়ে যেত তার জন্য | তারপর সেই মাছকে চটকে ভাতের ভিতর লুকিয়ে চাটনি দিয়ে খাইয়ে দিতো | মাংসকে সেদ্ধ করে মিক্সিতে পেস্ট করে তার মধ্যে পাতিলেবু, চিনি, গোলমরিচের গুঁড়ো মিশিয়ে বল বানিয়ে তার ভাজা করতো আর সেই মাংসের বল ভাজার ঝোল তৈরী করে বলতো, "তোমাকে যে সোয়াবিনটা খেতেই হবে পিসি | "


প্রথম প্রথম নাক সিঁটকোলেও দিন চার পাঁচের পর থেকে পিসি আর না খাওয়ার বায়না করতো না | শর্মীর সেবায় দিন কুড়ি বাইশ পরেই মনোরমা সুস্থ হয়ে উঠলেন |


চক্রবর্তী জ্যেঠু দেখে বললেন, "এই তো দিদি | সুস্থ হয়ে গেছেন তো !! ... "


"হ্যাঁ, কিসব ছাইপাস দিয়েছিলে তুমি | সেগুলি খেতেই হোলো | শর্মীটা ছাড়লো না কিছুতেই | "


বাড়ির সবাই খুব খুশি মনোরমা সুস্থ হয়ে ওঠায় |কিন্তু মনের মধ্যে সবার ভয়টা রয়েই গেল, যদি কখনো মনোরমা জানতে পারেন শর্মী তার সাথে কী করেছে !!


তবুও কে আর বলবে সে সব কথা মনোরমার কাছে,  তাই আর শর্মীর বিপদ নেই কোনো, এমনটাই ভাবলো সবাই |


রোজ সকাল বেলায় পিসিকে স্নান করিয়ে সকালের টিফিন দিয়ে রান্না ঘরে ঢোকে শর্মী | বাকি রান্না মেনকাদি আর দুই জা মিলে করে | মাঝে মধ্যে শাশুড়িরা সাহায্য করে দেন | কিন্তু মনোরমার খাবার তৈরিতে কেউ যায় না, যদি পাপ লাগে !!


সেদিন সকাল বেলায় রান্না ঘরে সবে ঢুকেছে শর্মী | বড়ো পিসির জন্য আনা মুরগির মাংসটা তখনও ভিনিগার জলে ডুবিয়ে রাখা আছে | পাত্রটা রাখা আছে রান্না ঘরের এক টেবিলের উপরে | মেনোকাদি বৌদিদের সাথে গল্প করতে করতে বড়াই করে বলছে, "ছোটো বৌদি দেখালো কিছু খেল, তাই না বৌদি !! বড়ো পিসি কী সুন্দর রোজ ওই মুরগির মাংস খায় আর ভাবে সোয়াবিন খাচ্ছে | এই বুড়ো বয়সে এসে যে বড়ো পিসি এভাবে বোকা বনে যাবে সে কথা কী জানতো কোনোদিন !! "


"ওভাবে বোলো না মেনকাদি | শর্মী যা করেছে সেটা তো পিসির ভালোর জন্যই করেছে | "


"তোমরা এবার একটু সরো তো | মাংসটাকে সেদ্ধ করতে বসাই, সাড়ে বারোটার মধ্যে আবার পিসিকে খেতে দিতে হবে | " কথা গুলি বলতে বলতে পিছন ফিরে মাংসের পাত্রটা নিতে গিয়ে শর্মী স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে |


"কী হোলো রে, ওরকম পুতুলের মতো সিধে হয়ে দাঁড়িয়ে রইলি যে?? " অনুরাধা প্রশ্ন করতে গিয়ে হাতের বাটিটা ফেলে দেয় | দরজার কাছে বড়ো পিসি দাঁড়িয়ে !!!


গম্ভীর মুখে বললেন, "অনেকদিন নিজের ঘর থেকে বেরোইনি | তাই ভাবলাম আজ কী রান্না হচ্ছে একটু দেখে আসি | দোতলার ঘরে বন্দী ছিলাম বলে তোরা আমাকে এভাবে ঠকাতে পারলি?? .... এর চেয়ে মরে গেলে আমার ভালো হতো | জীবনে কোনোদিন যে পাপ করিনি, সেই পাপ করালি তোরা আমাকে দিয়ে?? "


"পিসি শোনো ", বলে মনোরমার হাতটা ধরে বসাতে যায় শর্মী |


"ছুবি না তুই আমাকে | তোর মতো পাপীর সংস্পর্শে থাকাও পাপ | তুই কী করে জানবি ব্রাহ্মণ বিধবার নিয়ম রীতি?? .... শিখেই তো আসিসনি কিছু !! "


হট্টগোল শুনে মনোরমা দেবীর ভাই আর ভাইবৌ রা ছুটে আসেন |


বড়ো ভাইকে দেখে মনোরমা কেঁদে ওঠেন, "দূর করে দে এক্ষুনি এই পোড়া মুখী কে এই বাড়ি থেকে | ব্রাহ্মণ বংশে জন্মালে তবেই তো গুরুত্ব দিতো আমার তপস্যাকে | আমার এত দিনের নিয়ম নিষ্ঠা, আমার বৈধব্যের ব্রত, সব নষ্ট করে দিলো !!! .... কোন কুক্ষনে এবাড়ির বউ হয়ে এসেছিল কে জানে??.... আজ থেকে আমাকে আর তোরা কিছু রান্না করে দিবি না | আমি নিজেই সেদ্ধ ভাত করে খাবো | "


এতক্ষন পিসির কথায় একটাও উত্তর করেছিল না শর্মী | মাথা নিচু করে গ্রহণ করে যাচ্ছিলো পিসির সকল ভর্ৎসনাকে | কিন্তু পিসির শেষ বাক্য প্রয়োগের পরেই বলে উঠল, "সেটা হবে না | মাছ, মাংস তোমাকে খেতেই হবে | "


"কী আস্পর্ধা দেখেছিস অম্লান | কী বলে আমায় ও !!.... দূর হ, দূর হ এই বাড়ি থেকে | "


"এই বাড়ি থেকে সেদিন যাব যেদিন তুমি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাবে | তার আগে আমাকে কেউ এ বাড়ি থেকে বার করতে পারবে না |.... তোমাকে আমিষ খাওয়ানোর পাপটা যখন আমিই করেছি, তখন শেষ পর্যন্ত ওই পাপের ভাগটা আমার জন্যই তোলা থাক | মাছ, মাংস তোমাকে খেতেই হবে | "


শর্মীর কথা শুনে এবার মনোরমা কেঁদে ফেললেন, "তুই আমায় ধর্মভ্রষ্ট করালি | আর আমি রাধামাধবের পায়ে ঠাঁই পাবো না | "


শর্মী আস্তে আস্তে মনোরমার কাছে গিয়ে বলে, "আর তোমার মধ্যে থাকা ঈশ্বরকে যে এত কষ্ট দিচ্ছ তাতে তোমার রাধামাধব রাগ করবেন না বুঝি !! .... এই কদিনে আমি দেখেছি তুমি কতো তৃপ্তি করে মাছ খেতে | তোমার এই তৃপ্তি টুকু নেওয়ার ইচ্ছে আমি এর আগেও বেশ কয়েকবার লক্ষ্য করেছিলাম | তুমি আমিষ রান্না করে তার গন্ধটাকে প্রাণ ভরে গ্রহণ করতে | কিন্তু সমাজের দেওয়া বিধানে বাঁধা পরে সেই স্বাদকে গ্রহণ করার সাহস দেখাওনি |.... আমি সব লক্ষ্য করেও কোনোদিন কিছু বলিনি কাউকে | কিন্তু যখন তোমার শরীরের প্রয়োজন আছে তখন কেন খাবে না তুমি আমিষ?? .... লোকলজ্জা, সমাজ, তার বিধান, নিয়ম কানুন বেশি নাকি তোমার জীবনের দাম বেশি?? "


শর্মীর কথা শুনে বড়ো জ্যেঠি এগিয়ে আসে, "সত্যি কী দিদি, আপনি জোর করে এসব নিয়মের মধ্যে নিজেকে বেঁধে রেখেছিলেন?? "


মনোরমা মাথা নিচু করে বলে, "যৌবন আসার আগেই বিধবা হয়ে বাবার সংসারে ফিরে আসি | পাছে কোনো লোভে পড়ে যদি কোনো চাহিদা করে বসি তাই বুড়ি বিধবা ঠাকুমা হাতে ধরে ধর্ম, নীতি, নিয়মের মধ্যে ঠেলে দিলো আমাকে | বাবা মা বেঁচে থাকতে তাঁদের কষ্ট দিতে চাইনি বলে কোনোদিন নিয়মের বাইরে যাইনি | তারপর তোদের অভিভাবক হয়ে গেলাম | এই বাড়ির অভিভাবক হয়ে লোভীর মতো আচরণ করে ধর্মভ্রষ্ট হতে ভয় লাগতো আমার | তাই নিজের ইচ্ছে গুলিকে নিয়মের নামে গলা টিপে খুন করতাম |.... দিনের পর দিন এভাবে থাকতে থাকতে এটাই অভ্যেস হয়ে গিয়েছিলো আমার | "


"আর সেই অভ্যেসেই নিজের জীবনকে নষ্ট করে দিলে তুমি !! .... তোমার আত্মার সাথে যে অধর্ম করলে তুমি সেটা কী পাপ নয় পিসি?? .... তোমাকে যদি এই গুলি না খাইয়ে মৃত্যুর মুখে ফেলে দেওয়া হতো, তাহলে কী এবাড়ির মানুষদের ভাগে পাপ আসতো না?? .... মানুষের জন্য নিয়ম নাকি নিয়মের জন্য মানুষ?? .... কোনো মানুষের জীবন রক্ষা করতে যদি পাপ কাজও করতে হয়, তবে সেই পাপটাও আমার কাছে পুণ্যের চেয়ে কিছু কম নয় | এমন পাপ আমি একবার না, বারবার করতে পারি | "


"তুই মানুষ নাকি অন্য কিছু?? আমি তোকে তাড়িয়ে দিচ্ছি আর তুই আমার জীবন বাঁচাবার কথা বলছিস?? একজন বিধবার প্রাণ বাঁচাতে যে অধর্ম করলি তুই তাতে যদি ঈশ্বর কোনোদিন তোকে শাস্তি দেন, তখন কী করবি?? "


"ঈশ্বরকে তুমি দেখেছো পিসি?? আমরা কেউ দেখেছি?? তাহলে ঈশ্বরকে এত নিষ্ঠুর আমরা ভাবি কী করে?? ... আমরা যদি তার সন্তানই হই, তাহলে আমাদের কষ্ট দিয়ে তার কী লাভ?? ... তোমার রাধামাধব তোমাকে নিজে এসে বলেছেন কী, যে, আমিষ গ্রহণ করলে তিনি তোমাকে তাঁর পাদপদ্মে ঠাঁই দেবেন না | বলেননি তো?? ... তাহলে যুগের পরে যুগ এই ভুলগুলি আমরা করি কী করে?? .... তুমি আমার উপর রুষ্ট হয়ে সমীরণের সাথে হয়তো আমাকে আর থাকতে দেবে না | কিন্তু সমীরণের সাথে থাকার জন্য ভুলের সঙ্গে আপোষ করতে পারবো না | "


"দিদি, এর পরেও আমার ছেলে বউটাকে তাড়িয়ে দেবেন বাড়ি থেকে?? ", পাশ থেকে সমীরণের মা বলে ওঠেন |


"আরে না রে, না | তোর ব্যাটার বউকে কোথাও যেতে বলবো না আমি | ও তো আমার মা জননী | যখন নিজের মাই মেয়ের ইচ্ছে, আহ্লাদ কে গলা টিপে মেরে ছিল সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে, তখন আমার এই মা কেমন করে কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে আমায় মৃত্যু মুখ থেকে ফিরিয়ে আনলো |.... আমি এতদিন তোমার সেবা করে যে পুণ্য কামিয়েছি তার সবটুকু তুমি এই পাজি মেয়েটাকে দিও রাধামাধব | "


"ও কথা বোলো না পিসি.... তাহলে তো পুরো পাপের বোঝা এসে চাপবে আমার উপরে !! ... তুমি নিজেকে কষ্ট দিয়ে কোন পুণ্যটা কামিয়েছো শুনি !! "


"দূর হ আমার চোখের সামনে থেকে | "


শর্মীকে আদর করে গলায় জড়িয়ে ধরলেন মনোরমা | ব্রাহ্মণ ঘরের না হয়েও তাকে পাপ পুণ্যের জ্ঞান অর্জন করালো যে এই অব্রাহ্মণ মেয়েটি |



Rate this content
Log in

More bengali story from Ananya Podder

Similar bengali story from Drama