Exclusive FREE session on RIG VEDA for you, Register now!
Exclusive FREE session on RIG VEDA for you, Register now!

Aritra Das

Drama Action Thriller


4  

Aritra Das

Drama Action Thriller


দ্বিখণ্ডিত

দ্বিখণ্ডিত

46 mins 328 46 mins 328

২০শে জুলাই, ১৯৯৯

-“অবি…অবি…তুই ঠিক আছিস তো রে? আর ভয় দেখাস না ভাই, উঠে পড় এবারে…”


একটু একটু করে চেতনা ফিরে আসছিল; এখন আধো-অচেতন মনের মধ্যে চেনা গলার আওয়াজে সম্পূর্ণ জ্ঞান ফিরে এল আমার। চোখ খুলতেই সর্বপ্রথম যা নজরে এল- ভীমকায় এক পাথরের আড়ালে নিজের ক্ষতবিক্ষত, শায়িত দেহ, পাশে পড়ে আমার অস্ত্র, আর- সামনে আমার দিকে ঈষৎ ঝুঁকে উদ্বিগ্ন মুখে বসে আমার বাল্যবন্ধু ও একান্ত প্রিয় সুহৃদ- শ্রীমান নওসাদ ইকবাল, আমার আদরের ‘নসু’। আমাকে এরকম নির্জীব হয়ে পড়ে থাকতে দেখে নিশ্চই খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল বেচারা; এখন আমাকে চোখ মেলে তাকাতে দেখে একটি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ধপ্ করে পিছনের বড় পাথরটায় ঠেস দিয়ে বসে পড়ল ও, বন্দুকটা একহাতে আলগোছে ধরাই থাকল অবশ্য।

-“কি হয়েছিল…আমি কোথায় রে ভাই?”

ঘাড়ের পিছন দিকে একটা যন্ত্রণা হচ্ছিল; সেখানে হাত বুলোতে বুলোতে ক্ষীণ গলায় প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিলাম বন্ধুবরের দিকে। এই প্রশ্নটা করতে গিয়েই হঠাৎ চোখে পড়ল- নওসাদের গালে একটি আড়াআড়ি ক্ষতচিহ্ন- কোনকিছু যেন হালকা ঘষটে গিয়েছে জায়গাটি দিয়ে, যদিও রক্ত ভালোই বেরিয়েছে বোধ হয় ক্ষতস্থান থেকে; কারণ কালচে-বাদামী, ঘন রক্তের একটি পুরু স্তর জমাট বেঁধে রয়েছে জায়গাটিতে, নওসাদের টুকটুকে ফর্সা মুখে যা বেয়াড়াভাবে চোখে পড়ে সকলের আগে।

আমার করা প্রশ্নের উত্তরে হতাশভাবে মাথা ঝাঁকিয়ে বলে উঠল সে-

-“এত আলপটকা ওরা অ্যাাটাক করে দেবে বুঝতে পারি নি…আমাদের চপারটা…তোর মনে নেই? কি ব্যাপার বল তো?”

বন্ধুবরের সপ্রশ্ন চোখদুটি উপেক্ষা করে মাথা নীচু করে ভাবতে লাগলাম…

দ্রাস সেক্টরের অন্তর্গত পিক নং ১৩৯-এর আশেপাশে রুটিন চেকআপে বেরিয়েছিলাম আমরা, সঙ্গে ইউনিটের কয়েকজন। চপারে ছিলাম আমি, বন্ধু নওসাদ, আর আমাদের ইউনিটের জনা-তিনেক সেপাই। চপারের দায়িত্বে ছিলেন অভিজ্ঞ চালক রাওয়াত; বহু পোড় খাওয়া পুরোন ওয়ারেন্ট অফিসার, আমাদের ইউনিটে দীর্ঘদিন আছেন উনি। সঙ্গী চন্দানিকে নিয়ে চপার সামলাচ্ছিলেন তিনি, এই নৈশ উড়ান-সফরে। যুদ্ধটা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, অনুপ্রবেশকারী কুকুরগুলিকে মেরে ভাগানো গিয়েছে আমাদের বর্ডারলাইন থেকে, নতুন কোন অনুপ্রবেশের খবর নেই কোথাও। পরিস্থিতি এখন অনেকটাই শান্ত। নিশ্চিত ছিলাম আমরা এই ভেবে যে মুখোমুখি আর কোন লড়াইতে অন্তত আর জড়িয়ে পড়তে হবে না।

ভুল ভেবে ছিলাম আমরা!

পিক নং ১৩৯-র ধারে-কাছে অনেকগুলি ছোটখাটো পাহাড় আছে যাদের অবস্থানটি বেশ মজাদার; এই পাহাড়গুলির একদিক আমাদের দিকে, আরেক দিকে বর্ডারের ওপারে! এই পাহাড়গুলি সম্পর্কে বিশেষভাবে সতর্ক করে রাখা ছিল আমাদের; শত্রুর পক্ষে আমাদের লাইনের ভিতরে নতুন করে সরে আসবার একটি আদর্শ পথ এই পাহাড়গুলি। বাড়তি নজর রাখতাম আমরা এই অঞ্চলে; সেদিনও তাই করছিলাম। এরকম দুটি পাহাড়ে নজরদারী সেরে তৃতীয় পাহাড়ের ওপর উড়ে আসতেই-

হঠাৎ দুটি পরপর শেল ধেয়ে এল আমাদের চপার লক্ষ্য করে; সৌভাগ্যবশতঃ কোনটিই অবশ্য আমাদের লাগে নি, কিন্তু এই আকষ্মিক আক্রমণে আমাদের চপার ডানদিকে একবার হেলে গিয়েই পরক্ষণে টাল সামলে আবার সিধে হয়ে দাঁড়ায়, তারপর সোজা এগিয়ে চলে সামনের দিকে দূর্বার গতিতে! কিন্তু দূর্ভাগ্য আমার, ডানদিকেই বসে ছিলাম আমি; ঝাঁকুনিতে টাল সামলাতে না পেরে আমি পড়ে যাই মাটিতে! যদি চপার থেকে সোজা মাটিতে পড়তাম তবে আর প্রাণে বাঁচতাম না; আমি পড়ি তুলনামূলক স্বল্প উচ্চতা থেকে- পাহাড়ের ওপর। যদিও, আচমকা এই পতনজনিত বেগও খুব একটা কম ছিল না- আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি। আর অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ঠিক আগের মুহুর্তে আমার চোখের সামনে চপারটি বিস্ফোরণে উড়ে যায়!

সে তো বুঝলাম, কিন্তু আমি এখাানে পৌঁছলাম কিভাবে? যেখানে পড়েছিলাম সেখানে এত বড় পাথর তো ছিল না! আর নসুই বা এখানে কি করে এল? ওর গালে ঐ ক্ষতচিহ্নটা কিসের? জিজ্ঞাসা করতেই স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে খ্যাঁকখ্যাঁক করে উঠল ব্যাটাচ্ছেলে-

-“একটু ঝাঁকুনি খেতেই যেভাবে পাকা ফলের মত টুপ করে খসে পড়লি তাতে পিছন পিছন লাফ মারা ছাড়া আমার আর তো কোন গতি ছিল না, নাহলে এরপর কাকিমার সামনে দাঁড়িয়ে মুখ দেখাতে পারতাম না! আর এতবড় পাহাড়ের মাথায় পড়লি কোথায়? না, একেবারে ওদের গা ঘেঁষে! নীচে ল্যাণ্ড করবার সময় ওপর থেকে গুলি ছুঁড়ে ওদের আগে মারতে হল; দুজন প্রথমেই নিকেশ হয়, তৃতীয়জন যা একটু গুলি চালাল…তারপর তোকে কাঁধে করে তুলে- ওঃ! হাঁটুখানার অবস্থা দেখেছিস মাইরি! এই পাহাড়ি রাস্তায় তোর মতন খানদানি একমণ বস্তাকে কাঁধে তুলে দৌড়ে এতটা পথ পেরোন কি চাড্ডিখানি কথা নাকি?”

বুঝলাম ওর গালে তৈরি হওয়া কাটা দাগের পিছনে কারণ; ঐ নীচে নামবার সময়তেই নীচ থেকে হানাদারদের ছোঁড়া গুলি ওকে ছুঁয়ে বেরিয়ে গিয়েছে! হঠাৎ এক তীব্র বিবেক-দংশন অনুভব করে চুপ করে রইলাম; আর কথা বেরোল না মুখ দিয়ে।

-“বস্ একটা ভালো খবর আছে-” – সামনের অন্ধকারের দিকে ভালো করে খানিকক্ষণ তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল নওসাদ- “মনে হয় ওদের পুরো দলটি আমাদের খুঁজে পেয়েছে; সামনের দিকে তাকিয়ে দ্যাখ!”

অন্ধকারে সামনের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ পর চোখ সয়ে আসতে বুঝলাম- খুব ভুল কিছু বলে নি নসু; সামনে একসার পাথরের পিছনে স্পষ্ট অনুভব করলাম- বেশ কিছু মানুষের কালো মাথা! এতটা দূর থেকে অন্ধকারে অবশ্য এদের ছায়ার মত লাগছিল।

-“ওরা পোজিশন নিচ্ছে। সমস্যা একটাই- আমাদের গুলি সীমিত!”

চপারে থাকবার সময় পিঠের রুকস্যাকটি খুলে মেঝেতে নামিয়ে রেখেছিলাম সেরকম কোন বিপদের আশংকা না থাকায়, ওর ভিতরেই রাখা ছিল আমাদের সমস্ত গোলাবারুদ! এখন মোক্ষম সময়ে এসে বুঝলাম- কেন একজনও কেউ বন্দুক হাতের নাগালের বাইরে রাখলেই আমাদের কমাণ্ডার বসু ঠাকুর এসে আমাদের গোটা ইউনিটটিকে শাস্তি দিতেন নির্বিচারে! বিপদ আর হানাদার- কখন কোনদিক দিয়ে ঢুকবে তা কেউ কখনও হলপ করে বলতে পারে না। এখন আমাদের সঙ্গে থাকা ছয়টি করে ম্যাগাজিনই যা ভরসা।

হঠাৎ সামনে থেকে প্রবল এক মেঘগর্জ্জনের সাথে সাথে একঝাঁক বুলেট ধেয়ে এল আমাদের দিকে; চমকে উঠে ভীমকায় পাথরের টুকরোর আড়ালে কভার নিলাম সবান্ধব! সঙ্গে যথেষ্ট গোলাবারুদ না থাকলে এর জবাব দেওয়া সম্ভব নয়। এখন শত্রুর এগিয়ে আসার ওপর ভরসা না করে উপায় নেই; ওরা কভার ছেড়ে বেরোলে তখন-

এই পদ্ধতি দুবার কাজ দিয়েছিল; আমাদের গুলি শেষ হয়ে গিয়েছে ভেবে দুবার শত্রুরা কাছিয়ে আসবার চেষ্টা করে। কিন্তু তারপর আমাদের পাল্টা ফায়ারিংয়ে ওদের বেশ কিছু লোক হতাহত হলে ওরা তৃতীয়বার আর সেই চেষ্টা করে নি; পিছিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল পাথরের নিশ্চিত আশ্রয়ে। ওখানে বসে মাঝে মধ্যে দু-একবার ফায়ারিং করা ছাড়া আর কিছু চেষ্টা দেখা যায় নি ওদের মধ্যে। আমাদের অবশ্য পিছোবার কোন উপায় নেই; পিছনে একসার পাথরের ঢিবি আছে বটে, কিন্তু দুজনের কেউই অদ্দুর যেতে পারব না। নওসাদের পায়ে চোট, আমারও অবস্থা তথৈবচ!

-“একটা খটকা লাগছে রে নসু!”- একটানা বেশ কিছুক্ষণ শত্রুপক্ষের ফায়ারিং হওয়ার পর তা বন্ধ হতে এবারে মুখ খুললাম আমি।

-“কিসের খটকা?”

-“ওদের দুজনের কাছে রকেট লঞ্চার আছে। আমি দেখেছি। ওরা চাইলে এক্ষুণি আমাদের ব্যাঙভাজা করে দিতে পারে! কিন্তু ওরা তা করছে না কেন?”

উত্তরে কিছু একটা বলবার জন্য সামনের দিক থেকে নজর ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল নওসাদ; কিন্তু বলতে গিয়ে আটকে গেল ও; পরিবর্তে ভীতি-বিহ্বলিত পাংশু মুখে পিছন দিকে তাকিয়ে থাকল হাঁ করে! ওর দৃষ্টির গতিপথ অনুসরণ করে পিছনে মাথা ঘুরিয়েই টলে গেলাম একবার; অবশ হাত থেকে বন্দুক পড়ে গেল কোলের ওপর!

আমাদের ঠিক পিছনেই আমাদের দিকে বন্দুক তাক করে দাঁড়িয়ে জনাদশেক অস্ত্রধারী লোক- এদের হাতের সবকটি বন্দুক সিধা তাক করা আমাদের দিকে। এই পরিস্থিতিতে অন্য আর কিছু করণীয় ছিল না; দুজনেই অস্ত্র ফেলে হাত তুলে দিলাম ওপরের দিকে।

ওদের মধ্যে দুইজন এগিয়ে এসে প্রথমে একটানে দাঁড় করালো আমাদের, ভালো করে সার্চ করে আমাদের বাদবাকি অস্ত্রশস্ত্রগুলি নিয়ে নিল। তারপর আমাদের বন্দুকদুটো মাটি থেকে কুড়িয়ে নিয়ে পিছনদিকে চলে গেল ওরা। হাত তুলে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আড়চোখে তাকালাম নসুর দিকে- ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে ওর মুখ! আমি জানি ও কি ভাবছে, আর আমিও সেটাই ভাবছিলাম- এই হানাদাররা মেরে ফেলতে চলেছে আমাদের! চোয়াল শক্ত করে প্রতীক্ষা করতে লাগলাম আসন্ন মৃত্যুর জন্য।

আমাদের পিছন দিক থেকে এবার দুজন লোক এসে দাঁড়াল আমাদের সামনে। প্রথমজন লম্বা-চওড়া, বলিষ্ঠ চেহারার একজন পাঠান- সেই যে এই দলটিকে নেতৃত্ব দিচ্ছে এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই; কারণ তাকে দেখামাত্রই সকলে একবার মাথা নুইয়ে সসম্ভ্রমে সম্মান জানাল তাকে। কিন্তু দ্বিতীয়জনকে দেখে আমরা চমকে উঠলাম! আমাদের কাছে খবর ছিল যে প্রতিবেশী জঙ্গীবাজ দেশটির সাথে বাঁটকুলদের একটি সখ্যতা গড়ে উঠেছে, কিন্তু এ বিষয়ে এতদিন চলে আসা এই যুদ্ধে কোন পাকাপোক্ত প্রমাণ পায় নি আমাদের বাহিনীর কেউই- কয়েকটি বিদেশী অস্ত্র ছাড়া। কিন্তু এখন আমাদের সামনেই দাঁড়িয়ে একজন চিনা সামরিক পুরুষ, জঙ্গী হানাদারদের সাথে একই মঞ্চে! বিষ্মিত হয়ে আমরা দুই বন্ধু একবার তাকিয়ে দেখলাম একে অপরের দিকে! এতটা স্পষ্ট প্রমাণ চোখে দেখবার পর কি আমরা আর বেঁচে ফিরতে পারব নিরাপদ আশ্রয়ে?

-“আমার নাম কর্ণেল শ্যাঙ!”- বেশ কিছুক্ষণ নীরবতার পর এবারে বিশুদ্ধ ইংরেজিতে কথা বলে উঠলেন চিনা সামরিক পুরুষটি- “ইংরেজিতে দক্ষতার জন্য আমাদের বিদেশী বন্ধুদের সাথে সহযোগিতার গুরুদায়িত্ব আমার ওপরে অর্পণ করা হয়েছে। তোমাদের নাম-পরিচয় আমি জানি না, তবে জেনে যাব। ইনি আমার বন্ধু- দিলওয়ার হোসেন। তোমরা এখন আমার বন্দী।”

দিলওয়ার হোসেন বলে পরিচয় করানো সেই দলপতিটি এবার এগিয়ে এসে শ্যাঙের কানে কি একটা বললেন; বেশ খানিকক্ষণ তাদের মধ্যে কিছু একটা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলল। তারপর তা শেষ হতে আমাদের দিকে ফিরে শ্যাঙ বলে উঠলেন-

-“দূর্ভাগ্য! আমি চেয়েছিলাম তোমাদের দুজনকেই জীবিত বন্দী করতে, কিন্তু আমার বন্ধু ঠিক রাজি নয়…এখন প্রশ্নটা হল- তোমাদের দুজনের মধ্যে কে বেঁচে থাকতে চাও?”

দিলওয়ার হোসেন এবারে কয়েক পা এগিয়ে এসে নওসাদের মুখোমুখি দাঁড়ালেন। ওর মা ওকে একটি তাবিজ পরিয়ে দিয়েছিলেন যুদ্ধের আগে; সর্বক্ষণ নওসাদের গলায় ঝুলত তা। খানিকক্ষণ সেটিকে ভালো করে দেখে এবারে মুখ তুলে নওসাদকে লক্ষ্য করে হিন্দীতে বললেন-

-“তুমি তো দেখছি আমাদেরই স্বগোত্রীয়, তাহলে কাফেরটাকে মেরে ভাইদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছ না কেন?”

চোখমুখ শক্ত হয়ে এল নওসাদের; ছোটবেলা থেকেই আমরা একে অপরকে চিনি, ওকে বুঝতে আমার কোন অসুবিধাই হয় না। নেহাৎ প্যাঁচে পড়ে গিয়েছি বলে তাই, নাহলে এই সন্ত্রাসবাদী নেতার কপালে যে একটা ভয়ংকর রিষ্টি এসে উপস্থিত হত এ বিষয়ে কোন সন্দেহই নেই! কোনক্রমে রাগ চেপে শক্ত, কঠিন গলায় ও সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল-

-“আমি আমার ভাইয়ের সঙ্গেই ছিলাম, আছি, থাকব!”

রক্তাক্ত চোখে নওসাদের দিকে একবার তাকিয়ে পিচ কেটে তার সামনে থুতু ফেললেন দলপতি, তারপর কোমর থেকে নিজের রিভলবারটি খুলে নিয়ে একটি বাদে আর সমস্ত বুলেট সরিয়ে নিয়ে রিভলবারটি আমাদের দুজনের মাঝখানে ফেলে দিয়ে বললেন-

-“আমাদের দলে এখন ভর্ত্তি প্রক্রিয়া চলছে; মাত্র একটিই আসন। যে বেঁচে থাকবে, আসনটি তার-”

তারপর মুখ ঘুরিয়ে ঠাণ্ডা চোখে নওসাদকে একবার মেপে নিয়ে ভারি বুটের আওয়াজ তুলে দলপতি দিলওয়ার হোসেন সরে গিয়ে দাঁড়ালেন নিজের দলের কাছে। সকলেই এবার কৌতুহলি চোখে দেখতে লাগলেন- আমরা কি করি।

বেশ কিছুটা সময় চলে গেল; কেউই আমরা নড়ি নি নিজেদের জায়গা থেকে। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে একে অপরের দিকে নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম আমরা দুই বাল্যবন্ধু। হা ঈশ্বর! এ কোন কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি এসে দাঁড়ালাম আমরা?

এদিকে সময় যত বয়ে যাচ্ছে, তত অধৈর্য্য হয়ে উঠছে শত্রুরা! ওদের নিজেদের মধ্যে একটি গুঞ্জণ সৃষ্টি হয়ে গিয়েছে, স্পষ্টতই অধৈর্য্য হয়ে উঠছে ওরা সময়ের এই অহেতুক অপব্যয়ে। আড়চোখে তাকিয়ে দেখলাম- হোস্টাইলরা আমাদের ঘিরে রেখেছে দুদিক দিয়েই! শেষে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডরা এক পা এগিয়ে এসে বন্দুক তুলতেই আর বেশি দেরি করলাম না আমি; নীচু হয়ে পড়ে থাকা রিভলবারটি তুলতে যেতেই-

বলিষ্ঠ পায়ের এক লাথিতে পিছনে পড়ে গেলাম আমি! যন্ত্রণা সামলে উঠে কোনমতে আধশোওয়া অবস্থা থেকে মাথা তুলে দেখি- পরিত্যক্ত রিভলবারটি তুলে আমার দিকে সেটি তাক করে দাঁড়িয়ে নওসাদ! বিষ্মিত হয়ে গেলাম ওর মুখের ভঙ্গীতে; একফোঁটা উদ্বেগ নেই সেখানে, অনুতাপও না, শুধু বড় বড় দুটি জ্বলন্ত, স্থির চোখ মেলে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ঐ অবস্থাতেও নীচু গলায় সে বললে-

-“আমায় মনে রাখিস-”

পরপর কয়েকটি ঘটনা ঘটে গেল আমার চোখের সামনে! বিদ্যুৎগতিতে ঘুরে গিয়ে শ্যাঙকে লক্ষ্য করে গুলি চালাতে গেল নওসাদ; কিন্তু ট্রিগার চেপবার আগেই পিছন আর সামনের দিক থেকে ওকে লক্ষ্য করে ধেয়ে এল পরপর গুলি! আধশোওয়া অবস্থায় ছিলাম, তাছাড়া মাথাটাও বিপদের সামনে স্থির রাখতে পারি নি; কিন্তু বাজি রেখে বলতে পারি- কুড়িটার কম বুলেট ঢোকে নি ওর শরীরে; যতক্ষণ নিজের দুপায়ে দাঁড়িয়ে ছিল নওসাদ, ততক্ষণ শত্রুরা বুলেট বর্ষণ করে গিয়েছে ওর শরীরে! শেষে যখন ধপাস্ করে ওর দেহটা মাটিতে পড়ে গেল, হামাগুড়ি দিয়ে ওর কাছে পৌঁছে উপুড় করে শোওয়ালাম ওকে, বাল্যবন্ধুর মুখখানি মেলে ধরলাম নিজের দিকে। হাঁ করে তাকিয়ে থাকলাম সেদিকে!

মারা গিয়েছে নওসাদ; আমার প্রিয় বন্ধু আমার চোখের সামনেই মারা গিয়েছে শত্রুর ছোঁড়া গুলিতে! চোখ খোলা রেখেই মরেছিল ও; এখন মুখটা আমার দিকে ফেরাতেই ওর স্থির, খোলা চোখদুটি চেয়ে রইল আমার দিকে, একভাবে! আমাকে ঘিরে ধরা বিপদ সম্পর্কে পুরোপুরি বিস্মৃত হলাম, গোটা জগৎ মুছে গেল আমার চোখের সামনে থেকে, শুধু আমি, আর আমার কোলে মাথা রাখা বন্ধুর মৃত চোখদুটি, যা আমার দিকে স্থিরভাবে নিবদ্ধ!

-“সিলি ফ্যেলা!”

কতক্ষণ একভাবে নওসাদের দিকে তাকিয়ে বসে ছিলাম জানি না, সম্বিৎ ফিরল কানের কাছে শ্যাঙের গলার আওয়াজ পেয়ে! ধীরেধীরে ঘাড় ফিরিয়ে দেখলাম- আমার ঠিক পিছনেই এসে দাঁড়িয়ে তিনি! আর ঠিক তখনই আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল তার মুখ। মানুষের মুখ যে এতটা নির্মম হতে পারে, তার চোখের দৃষ্টি যে এতটা অমানুষিক, এতটা অপার্থিব হতে পারে, সেটা তখন তাকে না দেখলে জানতে পারতাম না! মনে হল, আমার সামনে দাঁড়িয়ে অনুভূতিহীন এক নরপিশাচ, মানুষের মৃত্যু যাকে স্পর্শ করে না। কঠিন চোখে তার দিকে সম্পূর্ণ চেতনা নিয়ে ফিরে তাকাতে এবার চোখে পড়ল- তার ঠিক পাশেই দিলওয়ার হোসেনের অশুভ মুখ।

-“পুরো গেমটা খারাপ করে দিল তোমার দোস্ত, ওর শাস্তি এখন ও ভোগ করছে; আর তুমি আমাদের সঙ্গে আসবে। কোন চালাকি নয়, বুঝেছ?”

দিলওয়ার হোসেনের কথা শেষ হতেই পিছন থেকে ভারি কিছুর আঘাত লাগল এসে মাথায়, আচমকা এই আঘাতে মাটিতে পড়ে গেলাম আমি। আবার অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ঠিক আগের মুহুর্ত্তে কানে ভেসে এল শ্যাঙের গলা-

-“দিলওয়ার ডিয়ার! মেক শিওর হি কামস ‘নার্গিস’ অ্যালাইভ, অ্যাণ্ড ইন ওয়ান পিস! আই নিড হিম টু ব্রিদ্ অ্যাণ্ড কমপ্লিটলি ফাঙ্কশনাল!!”

বিশ্ব-চরাচর মুছে গেল চোখের সামনে থেকে।


==================================================================


১৫ই ডিসেম্বর, ২০১৯

-“তাহলে আপনার বক্তব্য- আপনার বন্ধু লেফটেন্যান্ট নওসাদ ইকবাল মারা যান ২০শে জুলাই, ১৯৯৯ সালে, আপনার চোখের সামনে, তাই তো?”

ভারী, গমগমে গলাার আওয়াজ ভেসে এল কাঁচের দেওয়ালের অপর পার থেকে; কাউকেই অবশ্য দেখতে পাওয়া যাচ্ছিল না এদিক থেকে। আন্দাজে একবার ঘাড় নাড়লাম আমি। এ ছাড়া আর কিছু করণীয়ও ছিল না। আমার দুটি হাতই আমি যে চেয়ারে বসে আছি তার হাতলের সঙ্গে কষে বাঁধা। যে ঘরে আমাকে এনে বসানো হয়েছে ঘরটা প্রায় অন্ধকার; কাঁচের দেওয়ালের অপর প্রান্ত থেকে ঠিকরে আসা উজ্জ্বল আলোর প্রভা ঘরের অন্ধকার কিছুটা দূর করেছে বটে, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। এই অবস্থায় কিছু করা সম্ভবও নয়, আশেপাশে কিছু বোঝা যাচ্ছিল না।

-“২১শে নভেম্বর রাতে আপনি স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্ত্তি হয়েছিলেন। কি অসুবিধা হয়েছিল?”

-“আপনারা কি জানেন না-”

-“আমাদের প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিন। আপনি তীব্র মাথাধরা নিয়ে হাসপাতালে ভর্ত্তি ছিলেন। কি হয়েছিল?”

‘আমাদের’! অর্থাৎ এরা একাধিক ব্যক্তি। চট করে সম্ভাবনাটি মাথায় চলে এল আমার। কিন্তু আমি কোথায় আছি, এই লোকগুলি কারা- আমি কিছুই জানি না; এই অবস্থায় এদের বিশ্বাস করে কিছু বলাটা কি ঠিক হবে? এক মুহুর্ত মাথা ঝুঁকিয়ে একটু চিন্তা করে নিলাম, তারপর ইতস্তত করে বললাম-

-“প্রচণ্ড মাথাব্যথা, তার সঙ্গে বমি, ঘন ঘন অজ্ঞান হয়ে পড়া। কিন্তু-”

-“কিন্তু?”

-“আমি আধো-অচেতন মনেও যেন বারবার একটা কন্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছিলাম…কেউ যেন বারবার আমার কানের কাছে কয়েকটি সংখ্যা বলে যাচ্ছিল…যেন কোন বিশেষ একটি অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশগত অবস্থানে আমায় যেতে হবে…কিছু একটা করতে হবে…কিন্তু ঐ সময় আমি যেন চলৎশক্তিরহিত হয়ে পড়েছিলাম…”

-“আপনার বাঁদিকে মাথা ঘোরান!”

বাঁদিকে মাথা ঘোরাতেই বেশ কিছুটা দূরত্বে প্রায় গোটা একটা দেওয়াল জুড়ে সচল ছবি ভেসে উঠল। একটি হাসপাতালের কেবিনের ভিতরে একটিই বেড, তার মধ্যে শোয়ানো একজন রোগী, তাকে ঘিরে বিছানার সঙ্গে তাকে প্রায় জাপটে ধরেছে হাসপাতালের কিছু পুরুষ স্টাফ; একপাশে একজন ডাক্তার সিরিঞ্জে ওষুধ পুরছেন। অসম্ভব ছটফট করছে রোগী, তাকে প্রায় থামানোই যাচ্ছে না- আমার বিষ্মিত চোখের সামনে পর্দায় দেখা গেল একজন স্টাফকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে উঠে বসবার চেষ্টা করল রোগী…বাকিরা বিছানার সঙ্গে চেপে ধরল তাকে…এইসময় ডাক্তারবাবু এগিয়ে এসে ঘাড়ের কাছে ইঞ্জেকশনটি জোর করে পুশ করলেন…একটু পরে নেতিয়ে পড়ল রোগী; একদম শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে সে…

চলচ্চিত্রের থেকে মুখ ঘুরিয়ে মাথা নীচে ঝুঁকিয়ে বসে রইলাম; বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে কপালে! একটু জল পেলে ভাল হত। এত কিছু ঘটে গিয়েছিল তখন? কই, মনে পড়ছে না তো কিছু?

-“আপনি হাসপাতাল থেকে প্রায় পালিয়ে যাচ্ছিলেন; আপনাকে ধরে ফেলে ওরা একটি আলাদা কেবিনে আপনার ব্যবস্থা করেন। ঘুমের ইঞ্জেকশন পুশ করতে হয় আপনার শরীরে, আপনাকে শান্ত করার জন্য! জানেন, কতটা ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়েছিল আপনাকে? প্রায় সওয়া চার গ্রেণ- বদ্ধ পাগলদের এর থেকে সামান্য কম মাপের ওষুধ দেওয়া হয়, তাদের একটু ঘুম পাড়াবার জন্য! তিনজন হাসপাতালের কর্ম্মী ভালোরকম ইনজিওর্ড আপনাকে ধরতে গিয়ে- আপনার এই ঘটনা মনে নেই, না?”

মুখ নীচু অবস্থাতেই দুবার মাথা নাড়লাম। এই গোটা ঘটনাটি যেন আমার স্মৃতি থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে! এরকমটা কি করে হল? ভেবেই চললাম আমি।

-“এই বিষয়টা থাক। এবারে বরং প্রসঙ্গান্তরে যাওয়া যাক। ‘লাচুং পাস’ অভিযান সম্পর্কে বরং একটু বলুন। কি হয়েছিল ওখানে?”

মুখ তুলে সামনের আলোকিত কাঁচের দেওয়ালের দিকে সোজা তাকালাম একদৃষ্টে। এই অভিযান আমার কাছে বিশেষ অর্থবহ একটিই কারণে…


====================================================================

১৫ই অগাস্ট, ২০০৬


-“প্রথমেই আপনাকে স্বাগত জানাই লেফটেন্যান্ট অবিনাশ, এই ‘সার্চ অ্যাণ্ড ডেস্ট্রয়’ অভিযানে দ্রুত সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসবার জন্য। আপনার ও আপনার ইউনিটের সহযোগিতা না পেলে আমার একার পক্ষে অসম্ভব ছিল অগ্রসর হওয়া-”

-“স্বাধীনতার দিনে পূণ্যভূমির সেবায় আমাকে ডাক দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, ক্যাপ্টেন অরোরা! আমার অভিবাদন গ্রহণ করুন। কি হয়েছে এখানে?”

-“তিনদিন আগে আমাদের কাছে একটি বড়সড় আক্রমণের ইন্টেল আসে; আমরা দেরি করি নি, কাজে নেমে পড়ি সাথে সাথে। খবরটি মিথ্যে নয়! দুদিন আগে আক্রমণকারীদের একটি বড় দলের সঙ্গে আমাদের মুখোমুখি সংঘাত হয় ‘দোরাব’ নদীর কাছে; আগেভাগে খবর পেয়ে মুখোমুখি আক্রমণে ওদের কচুকাটা করে ফেলি আমরা। ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় হানাদারদের দলটি। এরপর আমরা ছোট কয়েকটি পকেট ট্রূপে বিভক্ত হয়ে যাই অবশিষ্ট দলটিকে খুঁজে ধ্বংস করবার জন্য। এখন আমাদের কাছে খবর আছে- সামনের ঐ যে গ্রামটি, ওখানেই আত্মগোপন করে আছে হানাদারদের একটি দল। ওদের মারতে হবে।”

-“বেশ। এবারে বলুন, সমস্যাগুলি কি কি?”

-“গ্রামটির একদিকে সুগভীর খাত; কেউ জীবিত অবস্থায় এদিক দিয়ে পালাতে পারবে না। পিছনদিকে বর্ডার; ওটা ওদের পালানোর জায়গা। আর বাকি দুদিক দিয়ে আক্রমণ করব আমরা। ওদের বাধ্য করব- হয় ওরা আত্মসমর্পণ করবে, নয়তো ওরা পালাবে-”

-“একটি কথা ক্যাপ্টেন; ওরা পালানোর পর্যাপ্ত সুযোগ পেয়েছিল, কিন্তু ওরা পালালো না কেন? দুদিন ধরে একটা গ্রামে ওরা লুকিয়ে বসে রইল, অথচ ঠিক পিছনেই ওদের ‘এসকেপ রুট’- ব্যাপারটা একটু গোলমেলে মনে হচ্ছে না?”

জবাবে কাঁধ শ্রাগ করলেন ক্যাপ্টেন অরোরা। এই ‘কেন’-র উত্তর তার কাছে নেই। অথবা- হয়তো তিনি জানেন, কিন্তু বলতে চান না। সংক্ষেপে গ্রামটির ভ্যান্টেজ পয়েন্টগুলি জেনে নিলাম; তাছাড়া, এখানে আমি বহুদিন পোস্টেড, ফলে এখানকার গ্রামগুলির ছকবাঁধা গঠনরীতিগুলির সঙ্গে আমি ভালোমতই পরিচিত। দূরবীন দিয়ে জায়গাটির একটা মোটামুটি জরীপ করে নিয়ে এবারে তৈরি হয়ে অভিবাদন জানিয়ে বেরোতে যাব- হঠাৎ আমাকে ডেকে দাঁড় করালেন ক্যাপ্টেন অরোরা।

-“ইয়ে…একটা কথা বলবার ছিল অবি-”

আমি আর ক্যাপ্টেন অরোরা দীর্ঘদিনের সাথী; সীমান্তের এই অঞ্চলগুলিতে প্রায়ই ছোটখাটো বা মাঝারি সংঘর্ষ লেগেই থাকে; এরকম বহু যুদ্ধে আমাদের নেতৃত্ব দিয়েছেন উনি। অসাধারণ নায়ক; সুদর্শন, বুদ্ধিদীপ্ত, উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। উনি আমাকে ভাইয়ের মতই স্নেহ করতেন। এখন ওনাকে বিব্রত হয়ে যেতে দেখে থমকে দাঁড়ালাম আমি।

-“হানাদারদের দলপতির নামটা আমি জানি; গ্রামবাসীদের মধ্য থেকে কেউ গোপনে যোগাযোগ করেছিল আমাদের সঙ্গে, সেই জানিয়েছে…ডোন্ট বি টু পার্সোনাল-”

-“কি নাম?”- জিজ্ঞেস করলাম আমি।

-“দিলওয়ার হোসেন!”

একমুহুর্ত্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে স্থির চোখে একবার তাকালাম ক্যাপ্টেন অরোরার দিকে, তারপর হাতের ‘এ.কে. ১০৫’-এর সেফটি লক খুলে এগিয়ে চললাম আমার নির্দিষ্ট যাত্রাপথের দিকে। পিছন থেকে উঁচু গলায় একটি কথা ভেসে এল-

-“ওর কাছে কিন্তু ইন্টেল আছে অবি, ওকে আমাদের জীবন্ত চাই-”

--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

গ্রামে ঢোকবার মুখে আমরা যে পথটা দিয়ে এগোচ্ছিলাম, সেটি একটি সংকীর্ণ পায়ে চলা পথ। এই পথটির দুপাশে দুটি উঁচু ঢাল মতন হয়ে পথটা নীচে রয়ে গিয়েছে; এই সংকীর্ণ পথটির সামনে এসে থমকে দাঁড়ালাম আমরা।

-“এগোবেন না, সাব?”

হাবিলদার নাথুলালের প্রশ্ন শুনে নেতিবাচক ভঙ্গীতে মাথা নাড়লাম। দিলওয়ার হোসেনের সাথে সাক্ষাৎকারের পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে জানি- সহজ যাতায়াতের পথ এতটা সহজ রাখবে না ও। নিশ্চই কিছু প্যাঁচ কষে রাখা আছে কোথাও! ইশারায় ‘আল্ট্রা-সোনার ভিশন’ গ্লাসটি চেয়ে নিয়ে ওটি পরে সামনের দিকে চোখ রাখতেই-

যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই; জায়গায় জায়গায় ঘাস-পাতার আড়ালে বোমা রাখা আছে! অসাধারণ মস্তিষ্কপ্রসূত বুবি-ট্র্যাপ সিস্টেম! শুধু তাই নয়, মাটির নীচ থেকেও মাঝে মধ্যে কিছু ‘সোনার সিগনেচার’ এর ঝিলিক চোখে পড়ছিল, যাতে বোঝা যাচ্ছে যে মাটির নীচেও মাইন পুঁতে রাখা আছে। বোকার মতন এগিয়ে এসে এতে পা দিলেই-

হাবিলদার নাথুলাল আমার পাশেই দাঁড়িয়েছিল; ওকে আমাদের ইউনিটের সঙ্গে পাঠানো হয়েছিল পথ-প্রদর্শক হিসেবে। ওর হাতে ‘আল্ট্রা-সোনার ভিশন’-টি ফেরৎ দিয়ে বেতারে ক্যাপ্টেন অরোরাকে আগে সতর্ক করলাম পরিস্থিতি সম্পর্কে। তারপর বললাম-

-“ঐ ঢালগুলির ওপরে কি আছে?”

-“কিছু না সাব!”- বলতে লাগলেন নাথুলাল- “একদম ন্যাড়া, মাঝে-মাঝে একটা কি দুটো পাথরের লাইন আছে; তারপর বেশ কিছুটা ফাঁকা অংশ পেরিয়ে সামনে পরপর কয়েকটি গাছের সারি। ওর পাশ দিয়ে গিয়ে ডানদিকে মোড় নিয়ে একটু এগোলেই আমরা একেবারে গ্রামের বাড়িগুলির পিছনদিকে ঠেলে উঠব।”

-“ওপরে ঐদিকে…ওটা একটা পাথর না? দাঁড়াও…মুরলী!”

উঁচু জায়গায় চড়বার ব্যাপার হলেই মুরলীকে আমরা সবার আগে ডেকে নিতাম; ও একজন দূর্দান্ত অ্যাথলেট আর খুব ভালো রক-ক্লাইমবার। মোটা একটা কাছির একটা প্রান্ত ওর কোমরের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হল; তারপর নির্দেশ পেতেই ও ঢালটা বেয়ে ওপরে চড়া শুরু করল। শিখরে পৌঁছে পাথরটা জড়িয়ে কাছির দড়িটা বেঁধে দিলেই নিশ্চিন্তি; আমরা বাকিরা সবাই ওপরে উঠে আসতে পারব- এই ছিল মোটের ওপর প্ল্যান। তবে একটিই সমস্যা- ওপরে আমাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে আমরা কেউ জানি না! যাই হোক, ও চড়ছিল ওপরে, এইসময় হঠাৎ করে একটা কথা বলল নাথুলাল-

-“কিছু একটা ব্যাপার ঠিক মনে হচ্ছে না সাব!”

-“কি?”

-“আপনি তখন যে কথাটা বলছিলেন- ওদের এই গ্রামে দুদিন ধরে বসে থাকার ব্যাপারটা-”

-“ও! তা সে তো ক্যাপ্টেনসাব বলেই দিলেন যে বিষয়টি কি সেটা বোঝা যাচ্ছে না-”

একটু ইতস্তত করে আমার মুখের দিকে মুখ তুলে তাকালেন নাথুলাল; মধ্যবয়ষ্ক, প্রবীণ একজন আর্মি পার্সোনেল। আমি তখনও তার মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছি দেখে দ্বিধার সঙ্গে বললেন-

-“গতকাল রাত্রে সাবজীর সঙ্গে ফোনে কথা হচ্ছিল ওপরওয়ালাদের, আমি তখন সেখানেই ছিলাম। পুরো কথাটা বুঝতে পারি নি, কিন্তু যা মনে হল- এখান থেকে মাত্র দেড়শ কিলোমিটার দায়রার মধ্যে লাচুং উপত্যকায় আমাদের যে বেসক্যাম্পটি রয়েছে সেটিকে নিয়ে কিছু একটা বলছিলেন ওঁনারা-”

মনটা একটু চঞ্চল হয়ে উঠল কথাটি শুনে। এ তো বিরাট খবর! লাচুং উপত্যকায় আমাদের বেসক্যাম্পটির গুরুত্ব ও এই অঞ্চলে শান্তির প্রশ্নে ভূমিকা অসীম; পুরো অঞ্চলটির শান্তিরক্ষার দায়িত্ব বৃহদাকার এই ক্যাম্পটির। আর আজকের এই স্বাধীনতার দিনে ওখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের বেশ কিছু প্রথম সারির নেতার আসবার কথা বলে শুনেছি। তাহলে কি এই মধুর মোহেই এখানে আটকে রয়েছে দিলওয়ার? কিন্তু…খটকা একটা রয়েই গেল। বাঁটকুলদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার জন্য এবং তাদের নির্দেশ মেনে কাজ করবার জন্য যাকে মনোনয়ন করা হয়, তাকে এরকম একটি সাধারণ মিশনে সাধারণ সন্ত্রাসবাদীদের মত নাশকতামূলক কাজ করবার জন্য কি পাঠানো যেতে পারে? খটকা কিন্তু রয়েই যাচ্ছে!

শেষ পর্যন্ত নির্বিঘ্নে ওপরে উঠে গেল মূরলী; পাথরটিকে ভালো করে পাকে পাকে জড়িয়ে ওপর থেকে দড়িটা নীচে ফেলে দিতেই এবারে শুরু হল একে একে ওপরে ওঠবার পালা। প্রথমে আমি, তারপর নাথুলাল- এরপর এক এক করে সকলে উঠতে লাগলেন ওপরে।

ওপরে পৌঁছে আমি আর নাথুলাল দড়িটাকে একটু তুলে ধরেছিলাম যাতে ঢালের প্রান্তসীমায় দড়িটা বেশি ঘষা না খায়। মূরলী টেনে ধরেছিল গিঁটের কাছে দড়ির মুখটা যাতে টান লেগে কোনভাবে গিঁট আলগা না হয়ে যায়। আমরা তিনজনই ছিলাম পাথরের আড়ালে। এবার নীচ থেকে দুইজন উঠে এসে বাকিদের জায়গা করে দেওয়ার জন্য পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে যেতেই-

হঠাৎ পরপর দুবার ফায়ারিং-য়ের শব্দ; চমকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম- আমাদের চোখের সামনে গুলি লেগে মাটিতে পড়ে গেলেন দুই জওয়ান! এদের মধ্যে একজন দাঁড়িয়ে ছিলেন ঢালের একেবারে প্রান্ত ঘেঁষে; গুলি তার কন্ঠনালীতে লাগতেই কোন শব্দ না করে উঁচু ঢালটি থেকে নীচে পড়ে গেল তার দেহ! আর একজন ওপরেই মরে পড়ে রইলেন মাথায় গভীর ক্ষত ও ফেটে চৌচির হয়ে যাওয়া খুলি নিয়ে আপন রক্তে স্নান করে- সে এক ভয়ংকর দৃশ্য! নীচের লোকদের চেঁচিয়ে সাবধান করে নীচেই থাকবার নির্দেশ দিয়ে এবার তিনজন মিলে কভার নিলাম পাথরটির আড়ালে। নিঃশব্দ থাকবার আর কোন কারণ নেই- ওদের বন্দুকগুলি কথা বলতে শুরু করে দিয়েছে!

-“স্নাইপার, ল্যাণ্ডমাইন…এরা কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিকল্পনা নিয়ে এসেছে?”- শত্রুদের অনর্গল ফায়ারিং-য়ের মধ্যে দাঁত খিঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন মূরলী- “হতচ্ছাড়াগুলো স্নাইপ করছে কোন চুলো থেকে স্যার?”

উপরে উঠেই গ্রামের বাড়িগুলির লাইনে একটা উঁচু, শষ্যাগার জাতীয় কিছু চোখে পড়েছিল; এখন গুলির গতিপথ বিচার করে বুঝলাম- স্নাইপার বাবাজী আমাদের তাগ করছে ওখান থেকেই। সেটা বলেই নাথুলালের উদ্দেশ্যে জিজ্ঞাসা করলাম-

-“কতজন থাকতে পারে এই দলে?”

-“ওদের মূল দলটি নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে আগেই; তারপরও বাকি যা ছিল, তারা আবার ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে যায়। ঐ একই সোর্স থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী- দশ থেকে পনেরোজন আছে এই দলে-”

-“আপনারা কি সোর্সের আইডেনটিটি চেক্ করেছিলেন?”

-“না!”

-“বেশ। মূরলী…”

মূরলীকে সংক্ষেপে বুঝিয়ে দিলাম কি করতে হবে; বিষয়টি ভালো করে বুঝে নিয়ে দড়ি বেয়ে ও তরতর করে চলে গেল নীচে। এবারে নাথুলালকে বললাম-

-“আমার পিছনেই থাকবে। ওরা অনেকটা দূর থেকে এক জায়গায় বসে গুলি চালাচ্ছে, প্রবল বেগে এঁকেবেঁকে দৌড়ে ওদের গুলি ডজ্ করা সম্ভব। থেমে পড়বে না, ঠিক যেমনভাবে আমি দৌড়ব, তেমনভাবে তুমিও দৌড়বে। পারবে তো?”

-“জি সাব!”

নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ করে পাথরের গায়ে সেঁটে অপেক্ষা করতে লাগলাম- ওদের ফায়ারিং কখন বন্ধ হয়; আর তা হতেই-

পাথরের বাঁদিক দিয়ে বিদ্যুৎগতিতে একসাথে দুজনে বেরিয়েই পড়ি-কি-মরি করে দৌড়লাম সামনের দিকে; আর পাথরের বোল্ডারলাইনগুলি পেরিয়ে খোলা অংশে পড়তেই এবারে এঁকেবেঁকে দৌড়তে লাগলাম দুজনে। আড়াআড়ি ভাবে জায়গা ঘন ঘন বদল করে দৌড়চ্ছিলাম আমরা, সোজাসুজি নয়, কারণ ঐভাবে দৌড়লে স্নাইপারের লক্ষ্যভেদে সুবিধা হবে। শত্রুরা কিন্তু হাল ছাড়ে নি, লাগাতার তারা গুলিবর্ষণ করে গিয়েছে আমাদের ওপর; একবার তো পরিষ্কার বুঝতে পারলাম একটি গুলি আমার ডানহাতের কনুই ছুঁয়ে প্রায় বেরিয়ে গেল! কিন্তু…দাঁড়িয়ে পড়া বারণ!

এইভাবে আমরা একটা সময় পৌঁছে গেলাম গাছের সারির কাছে; আর এখানে একদম অরক্ষিত অবস্থায় অপ্রস্তুত দুজন শত্রুসৈন্যকে হাতের সামনে পেয়ে ঐ চলন্ত অবস্থাতেই নিকেশ করলাম ওদের। জায়গায় পৌঁছে চারদিকটা দেখে নিয়ে দাঁড়িয়ে বেশ কিছুক্ষণ দম নিলাম আগে। তারপর নাথুলালকে উদ্দেশ্য করে বললাম-

-“শোন নাথুলাল, ভয় পেও না! শত্রু সংখ্যায় বেশি হতে পারে, কিন্তু লোন উল্ফ্ অ্যাটাক সবসময়তেই বিপজ্জনক! তোমার কাছে কি কোন সাপ্রেসর আছে?”

-“না সাব!”

কোমর থেকে আমার .৪৫ ক্যালিবারের হ্যাণ্ডগানটি বের করে জ্যাকেটের পকেট থেকে সাপ্রেসর বের করে সেটি যথাস্থানে লাগাতে লাগাতে ফিসফিস করে বললাম-

-“তাহলে তুমি পিছনে থেকে প্রয়োজনে আমায় কভার করবে। আমি যতটা সম্ভব খুঁজে খুঁজে ওদের নিকেশ করতে থাকব নিঃশব্দে। কোন গণ্ডগোল হলে, বা শত্রু সংখ্যায় বেশি থাকলে তুমি গুলি করবে, কিন্তু প্রয়োজন না পড়লে একটুও শব্দ করবে না; বুঝেছ?”

গাছের সারির পিছন দিক দিয়ে সাবধানে চলতে চলতে অবশেষে আমরা ঘুরে গেলা ডানদিকে। এই পথ ধরে চলে আমাদের গ্রামের বাড়িগুলির পিছন দিকে পড়বার কথা। সতর্ক ভাবে এগোচ্ছিলাম আমরা, দৃষ্টি যতখানি সম্ভব খোলা রেখে। কিন্তু এখানেই ঘটল একটি অভাবনীয় ঘটনা, যা আমার প্রত্যাশার অতীত ছিল!

বাড়িগুলির লাইনে ঢুকতে প্রথমেই ডানহাতে একটি বাড়ি পড়ল। ছুটবার সময় মনে হয়েছিল এই বাড়ির ভিতরে যেন আলোর ঝলকানি দেখেছিলাম; অনুমান করলাম যে এর ভিতরে শত্রু থাকতে পারে। অদূরে একটা ঝোপের দিকে হাত দেখিয়ে ইশারা করতে নাথুলাল চলে গেল ঝোপের পিছনে কভার নিতে, আর আমিও সাবধানে পাইপ বেয়ে চড়া শুরু করে দিলাম ওপরের একটি খোলা জানলা লক্ষ্য করে। সবদিক দেখে ঘরের ভিতর ঢুকলাম, তারপর পা টিপে টিপে এগোতে লাগলাম শত্রুর খোঁজে। একবার খুঁজে পেলেই কাজ সেরে নেব নিঃশব্দে, কিন্তু-

অদ্ভুত ব্যাপার, গোটা বাড়িটা তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কাউকে পেলাম না! কিন্তু আমি তো ঠিকই দেখেছিলাম; ঐ ধরণের আলোর ঝলকানি একমাত্র ফায়ার-আর্মস থেকে গুলি ছুঁড়লে তবেই বেরোন সম্ভব, তার মানে লোক ছিল এখানে, তবে?

একটা বদ্ধ করিডরের একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বিষয়টা বোঝবার চেষ্টা করছিলাম, হঠাৎ পিছনে একটি অস্পষ্ট ‘খুট’ আওয়াজ পাওয়ার সাথে সাথে বিদ্যুৎগতিতে পিছনে ঘুরে বন্দুক হাতে একজন মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিজের পিস্তলটি তার দিকে তাগ করলাম; কিন্তু গুলি চালাবার আগেই আরও অবাক করা কাণ্ড-

আমার পিছন দিক থেকে একটি ছুরি সোজা সামনের দিকে ধেয়ে গিয়ে আমূল গিঁথে ফেলল শত্রুর গলা; গলায় ছুরিবিদ্ধ অবস্থাতেই তার নিষ্প্রাণ দেহ পড়ে গেল মাটিতে! চমকে বন্দুকের নল পিছনে ঘুরিয়ে দেখি-

আমার সামনে দুইহাতের ব্যবধানে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে সাত বছর আগে আমার কোলে মাথা রেখে মারা যাওয়া আমার প্রিয়তম বন্ধু- শ্রীমান নওসাদ ইকবাল!!

হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম ওর মুখের দিকে, স্থান-কাল-পাত্র সব ভুলে গিয়ে…


==================================================================

১৫ই ডিসেম্বর, ২০১৯

-“১৫ই অগাস্টের ঐ অভিযানে কি আপনারা দিলওয়ার হোসেনকে ধরতে পেরেছিলেন শেষ পর্যন্ত?”

কাঁচের দেওয়ালের অপর প্রান্ত থেকে ভারী, গমগমে, যান্ত্রিক গলায় ভেসে এল প্রশ্নটা। সাময়িক কালের জন্য একটু চুপ করে গিয়েছিলাম নওসাদের, আমার আদরের নসুর কথা বলতে গিয়ে, এখন প্রশ্নটা ভেসে আসতে আবার বাস্তবে ফিরে এলাম এক লহমায়। হালকা হালকা মাথা-ধরা ব্যাপারটা আবার ফিরে আসছে, কিন্তু আমল না দিয়ে কাঁচের দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ালাম দুবার।

-“দিলওয়ার অত্যন্ত ক্রূর বুদ্ধির ব্যক্তি; আমরা পরে রেকর্ড চেক করেছিলাম - ও পাকিস্তান আর্মির নিয়মিত অফিসার ছিল; যার অর্থ- প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈনিক, কোন সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের মাথামোটা দলপতি নয়। ও বুঝেছিল, সংখ্যার বিরুদ্ধে যুদ্ধে জেতবার একটি মূল অস্ত্র- গেরিলা আক্রমণ! তাই করেছিল ও। কিন্তু আমরা ওর চালাকিটা বুঝে গিয়ে প্রতি-প্রহার শুরু করলে সীমিত সৈন্যবল নিয়ে আর বেশি প্রতিরোধ করতে পারে নি দিলওয়ার, শেষ পর্যন্ত পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় সীমান্তের ওপারে-”

-“প্রতি-প্রহার? আপনারা তো সংখ্যায় মাত্র দুজন ছিলেন!”

-“দুজন নই; নওসাদকে ধরে আমরা তিনজন ছিলাম। আমরা শত্রুর দৃষ্টি নিজেদের দিকে ঘুরিয়ে নিতে সক্ষম হই; এই সুযোগে আমাদের ইউনিটের মাইন-সুইপাররা সরু পথটির মাইন-ফিল্ডটিকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। সরু পথটি নিয়ে সমস্যা ছিল না; ওখান দিয়ে উঠে এলে আমাদের সৈন্যরা কভারের মধ্য দিয়ে আসতে পারবে। একটু সময় লেগেছে বটে, কিন্তু শেষমেষ আমার ইউনিট সক্ষম হয় এই কঠিন কাজটি করতে। এছাড়া ক্যাপ্টেন অরোরার নেতৃত্বাধীন দ্বিতীয় দলটিও ঢুকে পড়ে আরেকদিক দিয়ে। তিনটি আলাদা গ্রুপের মিলিত আক্রমণের সামনে ওরা টিঁকতে পারে নি, অবশিষ্ট দু-একজনকে নিয়ে সীমান্তের দিকে সরে যায় ও-”

-“ওদের উদ্দেশ্যটা কি ছিল? তদন্তে কিছু জানতে পারলেন?”

একটু মাথা নীচু করে মনে করলাম বিষয়টা, তারপর মুখ তুলে বললাম-

-“দূর্ভাগ্যের বিষয়। ঐ গ্রামটিতে সাকুল্যে কুড়িটি পরিবার ছিল; সন্ত্রাসবাদীরা ওদের সকলকে ধরে একটি ঘরের মধ্যে বন্দী করে রাখে। নিজেরা গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার আগে ঐ ঘরটিতে ওরা আগুন ধরিয়ে দেয়; প্রত্যেক গ্রামবাসী বিনা কারণে মারা যায় সেই আগুনে; কাউকে জীবিত বের করা যায় নি। ফলে সন্ত্রাসবাদীদের বিষয়ে বিশদে কিছু জানা যায় নি। তবে…আমি একটি অনুমান করেছিলাম, সে বিষয়ে ক্যাপ্টেন অরোরাকে আমি জানিয়ে ছিলাম-”

-“কি অনুমান?”

মাথা নীচু করে ভেবে নিলাম কি বলব; তারপর বললাম-

-“সন্ত্রাসবাদীদের পোজিশন ও ঘুঁটি সাজানো দেখে আমার অনুমান- আমরা প্রত্যাশিত ছিলাম ওদের কাছে! ওরা জানত আমরা আসছি, ওরা সতর্ক ছিল সেইমতন। কিন্তু তাও ওরা পালানোর চেষ্টা করে নি! এর একটাই অর্থ হয়- আমাদের মেরে আমাদের আইডিগুলি ব্যবহার করে ওরা কোন নাশকতার ছক কষছিল। এই সন্দেহ আরও জোরালো হয় যখন নাথুলালের কাছ থেকে ক্যাপ্টেন অরোরা আর হেডকোয়ার্টার্স-এর মধ্যে আলাপচারীতায় লাচুং উপত্যকার বিষয়টি শুনি। হয়তো ওরা চেয়েছিল নকল আইডি দেখিয়ে ছদ্মবেশে ওখানে ঢুকে পড়তে, তারপর… তবে, এটি আমার অনুমান, এর কোন পাকাপোক্ত প্রমাণ আমার কাছে নেই।”

-“আপনি কি বলতে চান আমাদের আর্মির কেউ জড়িয়ে এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে?”

ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালাম কাঁচের দেওয়ালের অপরপ্রান্তে অদৃশ্য বক্তার সঙ্গে। এ ছাড়া দ্বিতীয় কোন মানেই হয় না এই কথার! খানিকক্ষণের একটু বিরতি নিলেন তারা, তারপর বেশ কিছুক্ষণ পর আবার প্রশ্নবাণ ধেয়ে এল তাদের দিক থেকে।

-“এইবার আপনাকে আমরা কিছু প্রশ্ন করব, আশা করি আপনি এর সঠিক উত্তর দেবেন-”

-“আমি এতক্ষণ ধরে যা বলেছি, সব সঠিক বলেছি। এতে কোন ভেজাল নেই।”

-“জানি। আপনার রেকর্ড-এ সব আছে। এবারে বলুন- লেফটেনান্ট নওসাদকে জীবন্ত দেখেছিলেন আপনি? মানে…ওর মতন দেখতে কাউকে দেখেন নি তো?”

একটু উষ্মা হল হঠাৎ করে, আর সেই সঙ্গে মাথা-ব্যথাটা হঠাৎ বেড়ে উঠল দপ্ করে! কি বলতে চাইছেনটা কি এরা, হাত বন্ধ থাকার সুবাদে আমার বাল্যবন্ধুকে নিয়ে যা খুশি তাই বলে যাবেন? ওকে আমি চিনতে পারব না? মনের রাগ মনে চেপে মাথার যন্ত্রণাটাকে উপেক্ষা করে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক গলায় বললাম-

-“নওসাদ আমার ছোটবেলার বন্ধু, আমরা এক স্কুল থেকে পাশ করি। ফলে ওর স্বভাবগত খুঁটিনাটি আমার মুখস্থ। প্রগাঢ় বন্ধুত্ব না থাকলে নিজের জীবন আর হাঁটু দাঁওতে লাগিয়ে কেউ উড়ন্ত চপার থেকে লাফ মারবে না! তাছাড়া- আপনারা জানেন কি না জানি না, ওরা নবাব ওয়াজেদ আলী শাহের বংশধর, বংশ কৌলিন্য, আভিজাত্য ওর রক্তে। এই আভিজাত্য নেমে আসে বংশধারা মেনে, একে কেউ কপি করতে পারবে না। আজ্ঞে হ্যাঁ, ও যে আসল নওসাদ এ বিষয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই!”

-“অথচ আপনি বলেছেন- ২০শে জুলাই ১৯৯৯ সালে আপনার বন্ধু আপনার সামনে মারা যান শত্রুপক্ষের গুলিবর্ষণে-”

গুম হয়ে গেলাম এই প্রতি-প্রশ্নে। এও তো সত্য!

-“ঠিক আছে। আপনার কথা আমরা খানিকক্ষণের জন্য বিশ্বাস করে নিলাম। এবারে বলুন- নওসাদকে আর কোথায় কোথায় দেখেছেন আপনি?”

-“সেরকম আর কোথাও নয়; সেবারে নওগাঁ সীমান্তে পেট্রোলিংয়ের সময় আমাদের ওপরে অ্যাটাক হয়, তখন ও এগিয়ে এসেছিল আমাদের বাঁচাতে-”

-“কারা করেছিল এই হামলা?”

-“দিলওয়ার হোসেনের লোকরা! যদিও এ হতভাগা খোদ সেখানে ছিল না-”

-“আর?”

-“অক্টোবর মাসে বেঁটেরা আমাদের ক্যাম্পের ওপর আক্রমণ করে; ওরা সেইসময় আমাদের পনেরোজনকে তুলে নিয়ে যায়। আমাকেও অপহরণ করবার চেষ্টা করেছিল ওরা কয়েকজন; কিন্তু মোক্ষম মুহুর্ত্তে নওসাদ ওখানে চলে আসে, তারপর ওরা অবশ্য আর পালাবার পথ পায় নি; সবকটা প্রাণ দিয়েছিল ওর ছুরির ঘায়ে!”

-“আচ্ছা, এইমাত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে পড়ল; একটা কথা বলুন তো- যেবার আপনি প্রথমবার নওসাদকে দেখেছিলেন ওর ‘মৃত্যু’র পর, আপনি বলছিলেন ও একটা ছুরি ছুঁড়ে মেরেছিল, যা শত্রুর গলা ভেদ করে আমূল গিঁথে যায় সেখানে, তাই তো? বেশ। এবারে ঐ ছুরিটি সম্পর্কে বলুন তো? মানে- কিরকম ছুরি ছিল ওটা?”

মাথাব্যথা ক্রমশঃ আবার বাড়ছে; তা উপেক্ষা করে বললাম-

-“আমাদের আর্মির রেগুলার, স্ট্যাণ্ডার্ড ইস্যু, ‘স্টিলেটো’ ছুরি যা আমরা প্রত্যেকেই ব্যবহার করি। এটি হাতেও চালানো যায়, আবার দরকারে ছুঁড়েও মারা যায়-”

-“বেশ। এর অর্থ নওসাদ কাজ হয়ে যাওয়ার পর মৃতদেহ থেকে ছুরি খুলে নিয়ে নিজের কাছেই রেখে দিয়েছিল, তাই নয় কি?”

-“আজ্ঞে না। মৃতদেহ থেকে ছুরিটা খুলে নিয়ে ও ছুরিটা আমায় দিয়ে দেয়; কারণ… আমার কাছে বোধ হয় ছুরি ছিল না!”

-“ছিল না! এ কি করে সম্ভব? প্রত্যেক সৈনিককে যুদ্ধের সমস্ত অস্ত্র নিয়ে তবে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়- আপনার চেকিং হয় নি মিশনে যাওয়ার আগে?”

চুপ করে গেলাম। আর কিছু ভাবতে পারছি না; মাথাটা যন্ত্রণায় দপ্ দপ্ করছে। এই বিরক্তিকর সাক্ষাৎকারটা কখন থামবে?

-“ঐসব প্রসঙ্গ থাক, এবারে বরং মূল প্রসঙ্গে আসি। গত ১২ই ডিসেম্বর ছাম্বলা পাসের ঘটনাটা কি হয়েছিল বলুন তো…এ কি, কি হয়েছে আপনার? অর্ডারলি…গার্ডস!”

মাথা যন্ত্রণা ব্যাপারটা কখন যে বাড়তে বাড়তে আমাকে সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন করে ফেলেছে তা আগের মুহুর্ত্ত অবধি আমিও বুঝতে পারি নি; হঠাৎ যেন চোখের সামনের জগৎ টলে উঠল! চেয়ারে বসা অবস্থাতেই মাথা ঝুলে গেল সামনের দিকে; অজ্ঞান হওয়ার আগের মুহুর্ত্তে কানে এল গমগমে গলায় একটি পরিষ্কার নির্দেশ-

-“পুট হিম ব্যাক টু হিস্ সেন্সেস; আই নিড হিম টকিং ড্যামমিট!!”

চেতনা বিলুপ্ত হয়ে গেল আমার!


==================================================================


একরাশ অন্ধকারের মধ্যে হঠাৎ যেন ঘুম ভেঙে ধড়মড় করে উঠে বসলাম। অবাক হয়ে তাকালাম চারদিকে। এ কি, এখানে এত অন্ধকার কেন?

অন্ধকার? কই, না তো! অন্ধকারটা একটু পাতলা হয়ে এল বলে মনে হচ্ছে যেন! হ্যাঁ, একটা ঘর বলে মনে হচ্ছে যেন; আরে, এটা ঘরই তো! সামনে একটা গেট মতন, তাতে মোটা মোটা গরাদ…ঘরের ভিতরটা স্যাঁতসেঁতে, একটিই মাত্র কম পাওয়ারের আলো জ্বলছে মাথার ওপর…ঐজন্যই কি ঘরটা এত অন্ধকার লাগছিল? আলো এত কম যে তা ঘরের অন্ধকার যেন আরও গাঢ়তর করে তুলেছে। কিন্তু এখানে আমি এলাম কখন? আর মাথায় এত যন্ত্রণা কেন?

টলতে টলতে কোনমতে উঠে দাঁড়ালাম দুপায়ের ওপর কোনমতে ভর দিয়ে। সামনে আলোর ঠিক নীচে একটি চেয়ার রাখা ছিল; বসলাম সেই চেয়ারে। আর বসতে না বসতেই-

-“থ্রী-টু ডট থ্রী-সেভেন-ওয়ান-সিক্স এন, সেভেন-সেভেন ডট টু-ফোর-সেভেন-সিক্স ই…রিট্রিভ…রিট্রিভ…”

মাথার ভিতর আবার ফিরে এল সেই কন্ঠস্বর। সেই এক যান্ত্রিক মহিলাকন্ঠে ঘোষণা করা বিরক্তিকর কিছু সংখ্যা ও অক্ষর; দুহাতে কান চেপে ধরলাম আমি, কিন্তু আওয়াজটা বন্ধ হল না। এই কন্ঠের উৎস আমাদের শরীরের বাইরে নয়, এ যেন আসছে আমার মাথার ভিতর থেকেই! হেরে গেলাম আমি এর প্রাবল্যের কাছে, কোনমতে মাথা চেপে ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বললাম-

-“স্টপ ইট, প্লীজ…স্টপ!!”

-“ইট ওয়ন্ট!”

হঠাৎ পাশ থেকে পরিষ্কার মানুষের গলার আওয়াজ পেয়ে চমকে ফিরে তাকালাম সেদিকে…আলোর সীমানার ঠিক বাইরে অন্ধকারে পরিষ্কার দেখা গেল দাঁড়িয়ে এক আবছা মনুষ্যমূর্তি। আমি ফিরে তাকাতেই সেই আবছায়া শরীরটি দু পা এগিয়ে আলোর বৃত্তে এসে দাঁড়াতেই সবিষ্ময়ে দেখলাম- শ্যাঙ! অপার্থিব অনুভূতিহীন চোখে সে তাকিয়ে আমার দিকে।

প্রচণ্ড ঘৃণায় কুঁচকে গেল আমার মুখ; সজোরে চেঁচিয়ে উঠে আমি বললাম-

-“শ্যাঙ! তুমি আমার সাথে কি করেছ?”

খুব ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে এসে মুখটা আমার কানের কাছে নামিয়ে এনে শ্যাঙ বললেন-

-“উই টার্নড ইউ…ইনটু আওয়ার পেট মনস্টার!”

বিষ্ময়ে বিহ্বল হয়ে গেলাম আমি! ‘পেট মনস্টার’…পোষা রাক্ষস…মানে?

এই কথাটা বলেই দ্রুত পেছিয়ে গেলেন শ্যাঙ। আবার দ্রুত অন্ধকার হয়ে আসতে লাগল ঘর। বেশ খানিকক্ষণ গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে ডুবে রইলাম আমি; বুঝে উঠতে পারছিলাম না আমাকে ঘিরে এই দ্রুত পট-পরিবর্তনের রহস্য! আর তারপরই- উজ্জ্বল দিনের আলোয় ভরে উঠল চারদিক। কিন্তু…এটা কোন জায়গা?

আমি দাঁড়িয়ে রয়েছি একটি প্রশস্ত খাঁড়ির মুখে একটি জেটির মাঝ-বরাবর! কিন্তু এখানে আবার এলাম কখন? সামনে খাঁড়ির মুখটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে; নীচে একটা মালবাহী স্টীমার ছাড়ব ছাড়ব করছে…কিন্তু-

এবারে মনে পড়েছে আমায় কি করতে হবে; আস্তে আস্তে জেটির রেলিঙ-এর ওপর উঠে দাঁড়ালাম। পাশে ক্ষণিকের জন্য মুখ ঘুরল…আরে! শ্যাঙ আর দিলওয়ার হোসেন একসাথে না? ওরা এতক্ষণ দাঁড়িয়েই ছিল এখানে? তাহলে আমাকে ওরা দেখতে পাচ্ছে না কেন, এত কাছে দাঁড়িয়ে থেকেও? তাহলে কি আমি ওদের…নাহ, থাক! আগে নিজের মুক্তি, তারপর ওদের এক এক করে-

নীচের স্টীমারটি থেকে প্রথম ভোঁ পড়ল; আমি জানি এই স্টীমারের গন্তব্যস্থল- মাল নিয়ে এই স্টীমার এখন সিধে যাবে আমাদের বন্দরে, তারপর ওখান থেকে রসদ নিয়ে ফিরতিপথ ধরে রওনা দেবে ওখান থেকে। এটাই আমার শেষ সুযোগ, আর অপেক্ষা করলাম না; ওপর থেকে দিলাম এক লাফ, নীচের স্টীমারের ডেকের ওপর একজায়গায় স্তুপাকৃতি কয়েকটি কাপড়ের গাঁটরি রাখা ছিল- সেগুলোকে উদ্দেশ্য করে। কয়েক সেকেণ্ড শূণ্যে ভাসমান থেকে আমার দেহটি সঠিক জায়গায় পড়ল অব্যর্থ লক্ষ্যে! তারপর…

এবারে আমি আস্তে আস্তে উঠে বসলাম কাপড়ের গাঁটরির ওপর। স্টীমারটি তখন খাঁড়ির মুখটি সদ্য সদ্য অতিক্রম করছে মাত্র…মুখ ঘোরালাম বাঁদিকে। ওদিকে ওটা কি? ও তো বিশাল বড় এক জাহাজ, আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে! কিন্তু…জাহাজের রেলিঙ-এ দুই হাতে ভর দিয়ে এ কে দাঁড়িয়ে- আরে! ও তো নওসাদ! কি দেখাচ্ছে ও, আমায় হাত নেড়ে? জাহাজের নাম? কি যেন লেখা রয়েছে না, বড় বড় করে, জাহাজের গায়ে? ঐ তো…কি যেন? দূর থেকে ভালো করে বোঝাও যাচ্ছে না…

হঠাৎ চারদিক আবার আবছা হয়ে এল প্রথমে, তারপর আবার অন্ধকার হয়ে গেল দিগ্বিদিক। আমাকে ঘিরে অন্ধকারে কিছু শব্দ কানে এল আমার…তারপর আস্তে আস্তে আমার চেতনা যেন স্বাভাবিক হতে লাগল। দুচোখ বুঁজে ফেলেছিলাম আমি স্বপ্নের আবেশে, এবার ধীরে ধীরে আবার জাগ্রত হয়ে উঠতে লাগল আমার চেতনা। আস্তে আস্তে দুচোখ মেলে সম্পূর্ণ সজাগ হয়ে তাকালাম আমি; দেখলাম- আমি ফেরৎ এসেছি আগের সেই ঘরটাতেই!


===================================================================


-“আপনার বর্তমান শারীরিক অবস্থায় এই প্রশ্নোত্তরপর্ব চালাবার জন্য দুঃখিত, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির বিচারে আমরা এটি চালিয়ে যেতে বাধ্য। আমাদের ডাক্তাররা অবশ্য কনফার্ম করেছেন- একবার ট্রান্স দশা কেটে গেলে আপনি আবার স্বাভাবিক মানুষ হয়ে ওঠেন…”

‘ট্রান্স দশা?’ ‘স্বাভাবিক মানুষ’? এসবের মানে কি, আর তাছাড়া, এরা কারা? অজ্ঞান দশা থেকে ফেরৎ এসে আমার চেতনা আবার জাগ্রত হয়ে উঠেছে। কিন্তু কিছুতেই আমার মনে পড়ছে না- এরা আমাকে ধরল কখন? প্রচণ্ড জোর চেঁচিয়ে উঠলাম অন্ধ আক্রোশে-

-“ওসব কথা ছাড়ুন; কে আপনারা? আমাকে ধরে রেখেছেন কেন? কি অন্যায় করেছি আমি? আপনারা কি টেররিস্ট? আপনাদের উদ্দেশ্যটা কি খোলসা করে বলুন তো-”

একটানা কথাগুলি বলে হাঁফাতে লাগলাম। ভিতরে ভিতরে এখনও যে দূর্বল তা আমি বিলক্ষণ বুঝতে পারছি।

-“আমরা কোন সন্ত্রাসবাদী সংগঠন নই, আমাদের কাজ সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই। একটি নির্দিষ্ট অভিযোগ এবং তার স্বপক্ষে যথেষ্ট যুক্তিগ্রাহ্য প্রমাণের ভিত্তিতে আমরা আপনাকে আটক করেছি-”

-“কিসের অভিযোগ?”

-“গত ১২ই ডিসেম্বর রাত্রে বর্ডারলাইন সংলগ্ন ছাম্বলা পাসে জঙ্গীদের একটি শিবির থেকে আপনাকে বমালসমেত গ্রেপ্তার করেছি আমরা। আপনার কাছ থেকে উদ্ধার করা গিয়েছে ৯ই ডিসেম্বর রাত্রে রোহতাং পাস অঞ্চলে আমাদের প্রতিরক্ষা কেন্দ্র থেকে চুরি হওয়া ‘ট্রিগার’, যা হাতে পেলে জঙ্গীরা-”

-“মিথ্যে কথা! আমি বিশ্বাস করি না!! আমার নামে যা খুশি তাই বলছেন আপনারা…তাছাড়া কিসের ‘ট্রিগার’? রোহতাং পাস থেকে আমি তো কিছুই নিই নি! নওসাদ অবশ্য কিছু একটা নিয়েছিল ওর ব্যাগে-”

-“ড্যাম নওসাদ! নওসাদ ওখানে থাকতে পারে না…ক্যাপ্টেন অবিনাশ মিশ্র, আপনি বিভ্রান্ত করছেন আমাদের! আপনি বলতে চান যে আপনি স্বহস্তে ট্রিগার চুরি করেন নি রোহতাং থেকে?”

সৈন্যবাহিনীতে দীর্ঘদিনের কাজের সুবাদে পদোন্নতি হয়েছিল আমার; এবারে মাথা নীচু করে ভেবে নিলাম ঘটনাক্রম। আমার কাছে নওসাদ এল, এসে বলল রোহতাং পাসে একটি জিনিষ আছে যা মিশনের কাজে লাগবে, সেটি চুপিসাড়ে তুলে আনবে ও, তারপর সেটা নিয়ে আমাদের সরতে হবে ‘ছাম্বলা’-য়। সেখানে একটি জঙ্গী ক্যাম্প আছে, ওখানে এই ‘জিনিষ’টা কাজে লাগবে ওখানকার জঙ্গীদের বিভ্রান্ত করে ভিতরে প্রবেশ করতে। একবার ভিতরে ঢুকলে আমরা তারপর ওখানকার পুরো জঙ্গীগোষ্ঠীকে একসাথে খতম করতে পারব- এই ছিল মোটের ওপর নওসাদের প্ল্যান!

মুখ তুলে এবারে অদৃশ্য প্রশ্নকারীদের জানালাম সে কথা, আর তা জানাতেই প্রচণ্ড রাগে ফেটে পড়লেন বক্তা-

-“আপনি কি রসিকতা করছেন আমাদের সাথে? রসিকতা করবার সময় নেই; আগামিকাল ১৬ই ডিসেম্বর, আর আমাদের কাছে পাকা খবর আছে দিল্লী লক্ষ্য করে পরমানু বোমা প্রয়োগ করতে পারে জঙ্গীরা! ট্রিগারটা আমরা উদ্ধার করতে পেরেছি বলে, নাহলে আপনার মুখ থেকে স্বদেশী কায়দায় কথা বের করতে আমাদের-”

হঠাৎ থেমে গেলেন বক্তা, তারপর একটি লম্বা বিরতি। কিছু বুঝতে পারছি না ঘটনার কার্যক্রম- এরা বারংবার কোন একটি ট্রিগারের উল্লেখ করছেন; কিন্তু কি সেই ট্রিগার? আর আমার কাছ থেকে সেটি উদ্ধারই বা হল কখন? মাথার রগ টিপে ভাববার চেষ্টা করলাম কিছুক্ষণ, তারপর হাল ছেড়ে দিয়ে উদ্ভ্রান্তের মত বসে রইলাম চেয়ারে। সাত-পাঁচ ভাবছি, এমন সময়-

এতক্ষণ লক্ষ্য করি নি অন্ধকারে- কাঁচের দেওয়ালের শেষপ্রান্তে একটি ছোট দরজা ছিল; এবারে সেই দরজা খুলে আচমকা একতাড়া কাগজ হাতে ভিতরে প্রবেশ করলেন- আমার দীর্ঘদিনের পরিচিত ও একান্ত সুহৃদ- ক্যাপ্টেন অরোরা! উনি ছিলেন এতক্ষণ সাক্ষাৎকার-ঘরের উল্টোদিকে!

ঘর থেকে বেরিয়ে উনি চেঁচিয়ে ঘরের দিকে মুখ করে কাকে কি একটা যেন বললেন; বোঝা গেল কেউ এখনও বসে আছেন ঘরের ভিতর। তারপর সিধে আমার কাছে এগিয়ে এসে আমাকে একপলক দেখে নিয়ে হাতের কাগজ আর চোখের চশমাটা নামিয়ে রাখলেন সামনের টেবিলে। তারপর এগিয়ে এসে আমার হাতের স্ট্র্যাপ খুলে আমাকে বন্ধনমুক্ত করে বললেন-

-“অবি, অত্যন্ত বাজে পরিস্থিতি, প্রতিটি সেকেণ্ড এখন মূল্যবান! ওরা চাইছে তোমাকে সরাসরি ফায়ারিং স্কোয়াডের হাতে তুলে দিতে; প্রতিটি প্রমাণ তোমার বিরুদ্ধে, একমাত্র ডাক্তারি রিপোর্ট ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ বাদে অন্য কিছুই আর তোমার পক্ষে নেই! এবার মুখ খোল তাড়াতাড়ি। তুমি ছাম্বলা পাসে কি করতে গিয়েছিলে ট্রিগার নিয়ে?”

একরাশ উৎকন্ঠা ঝরে পড়ল তার কথা থেকে।

-“ক্যাপ্টেন অরোরা…সরি, মেজর, আমি সত্যিই বুঝতে পারছি না, আপনারা কোন জিনিষটাকে ট্রিগার বলছেন; একটু বলবেন?”

-“তোমার বন্ধু নওসাদ যে জিনিষটিকে নিয়ে ব্যাগে পুরল…ভাই আমার, তুমি কি সত্যিই কিছু জান না? কোন পরমানু বোমা নিজে থেকে ফাটতে পারে না, চেইন রিঅ্যাকশন শুরু করবার জন্য দরকার হয় একটি ছোট বোমার, আর তাকে ট্রিগার করবার জন্য দরকার হয় একটি ট্রিগারের। গত ১লা ডিসেম্বর হিমাচল প্রদেশে আমাদের সদর-দপ্তর থেকে চুরি যায় ওখানে রাখা দেশের তৃতীয় কমিশনড্ পরমানু বোমাটি; এরকম পরিস্থিতিতে সন্ত্রাসবাদীরা যাতে ঐ বোমা কাজে লাগাতে না পারে সে কারণে ওর ট্রিগারটি খুলে তা রেখে দেওয়া হয় অন্যত্র… এই বোমার ট্রিগারটি যেমন রাখা হয়েছিল রোহতাং পাসে, আমাদের অপর একটি কেন্দ্রে, ওখানে কাছাকাছি কোন বহিরাগত ঢুকতেই পারবে না…তুমি ওটা নিয়ে যাওয়ার আগের মুহুর্ত্ত অবধি ওটা ওখানেই রাখা ছিল…আমি পরে বলব, আগে তুমি বল- ছাম্বলা পাসে কি হয়েছিল?”

একদৃষ্টে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম ক্যাপ্টেন, থুড়ি, মেজর অরোরার দিকে। মনটা একলাফে পেছিয়ে গেল ১২ তারিখ রাত্রিবেলায়…


====================================================================


১২ই ডিসেম্বর, ২০১৯- রাত্রি ৯:৩০


-“হ্যাঁ রে নসু, এটা ‘শিবির’ কোথায়? এ তো রীতিমতন শক্তপোক্ত একটা বাঙ্কার! কতদিন ধরে এটা ওরা বানিয়েছে বল তো? এদিকটায় পেট্রোলিং হয় না?”

উত্তরে সেই পেটেন্ট মাড়ি-বের করা হাসি হেসে নসু বললে-

-“বস, ডিউটিতে পান খাওয়ার বদঅভ্যাসটা শুধু আমাদের সিভিলিয়ানদেরই একার অধিকার নয়- বুয়েচ’ বাওয়া?”

ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালাম এই বক্তব্যের সঙ্গে; সত্যিই তাই। মাথায় হাত না থাকলে কোন অবস্থাতেই এতটা বোলবোলাও সম্ভব নয়। খানিকক্ষণ তীক্ষ্ন নজরে বুঝে নিলাম আশেপাশের পরিস্থিতি।

লোকেশনটা কিন্তু এরা বেশ ভালো বেছেছে। পাহাড়ের পদপ্রান্তে এই অঞ্চলটি ভূপ্রাকৃতিকভাবে উঁচু-নীচু, জায়গায় জায়গায় উঁচু ঢিবি। এরকমই একটি ঢিবির মাথায় ওদের ‘শিবির’। রীতিমতন কংক্রীটের ঢালাই দেওয়া পরপর ঘর, এদের সবকটাকে বেড় দিয়ে দু-মানুষ উঁচু পাথরের দেওয়াল, তাতে আবার জায়গায় খোপ করা, ওখান থেকে বসে শত্রুদের ওপর গুলি চালাবার দারুণ ব্যবস্থা! এতদূর থেকে ছাদে কি ব্যবস্থা করে রাখা আছে তা অবশ্য বোঝা যাচ্ছে না, যেমন জানা নেই যে মাটির নীচেও এদের কোন সুড়ঙ্গ খুঁড়ে রাখা আছে কি না। এরকম একটা বাঙ্কারে বসে পঞ্চাশজন লড়িয়ে বন্দুকবাজ দিয়ে পুরো এক ব্যাটেলিয়ন সৈন্যের মহড়া নেওয়া সম্ভব, বুদ্ধিমানের কাজ হবে যদি মিসাইল দেগে আগে এটাকে ভেঙে ফেলা হয়।

-“এই নে, এটা ধর!”

নিজের পিঠ থেকে রুকস্যাকটা খুলে আমার হাতে ধরিয়ে দিল নওসাদ; তারপর বলল-

-“আর শোন-”

এবারে ও পকেট থেকে বের করল ওর বহু আদরের সেই ক্ষুদে ছুরিখানা; বরাবর দেখতাম কোন মিশনে যাওয়ার সময় নিজের সঙ্গে এই ছুরিখানা রাখত ও। এখন সেটা বের করে আমার ডানহাতটা ধরে আস্তিনের নীচে স্ট্র্যাপ দিয়ে ছুরিটা বিশেষ কায়দায় বাঁধল ও।

-“ঝাঁকা দেখি একবার-”

ব্যাপারটা ওকে দেখেই শেখা; এবার ওর কায়দাতেই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে একবার সজোরে ঝাঁকাতেই হাতের ওপর দিক দিয়ে সজোরে বেরিয়ে এল ছুরির ফলাটি! এর সামনে যদি কোন শত্রুর গলা পড়ে-

-“সবদিক দিয়ে তৈরি থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। পিস্তলে সাইলেন্সার লাগিয়ে নিয়েছিস তো?”

-“তা আর বলতে!”- হাসিমুখে উত্তর দিলাম আমি।

-“হয়েছে, হয়েছে! আর ভসেভলোদ নেস্তাইকো ঝাড়তে হবে না! যা বলেছি সব মনে আছে তো?”

ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বললাম। এটি আমাদের বাঁধা লবজ্ ছিল স্কুল আর কলেজ-জীবনে; এখন বহুদিন পর ওর মুখে সেই বাঁধা বুলি ফেরৎ আসাতে একটু আশ্বস্ত হলাম আমি; মানসিকভাবে একটু চাঙ্গাও। তারপর জিজ্ঞাসা করলাম-

-“নসু…এটাই ঠিক জায়গা? তুই শিওর তো?”

-“তোর মাথায় যে নাম্বারগুলো বাজে সেটা তুই ঠিক বলেছিস তো?”

-“হ্যাঁ…কিন্তু ঐ নাম্বারগুলির মানে কি রে?”

খানিকক্ষণ আমার দিকে স্নেহার্দ্রচোখে তাকিয়ে রইল নওসাদ, তারপর আমার কবজির ওপরে বেরিয়ে থাকা ছুরির ফলাটি আবার আঙুল দিয়ে ঠেলে পূর্বেকার জায়গায় সরিয়ে দিতে দিতে বলল-

-“ও নিয়ে তোকে আর মাথা ঘামাতে হবে না; তুই কিন্তু প্ল্যানমাফিক আগাস। কেভলার স্যুটটা চাপিয়ে নিয়েছিস, আর আপাতত ভয়ের কোন কারণ নেই। আমি সর্বদা পাশে পাশে থাকব-”

পিঠে রুকস্যাকটা নিয়ে বন্ধুকে বিদায় জানিয়ে এগিয়ে গেলাম শত্রু শিবিরটিকে লক্ষ্য করে। কেভলার স্যুটটিও অবশ্য রোহতাং পাস থেকে আনা; খুব উন্নত ধরণের বডি-আর্মর এগুলো, এটা ‘ঘ্যালিল’ বা ‘এ কে’ সিরিজের তিনটি ক্লোজ-রেঞ্জ গুলি আটকে দিতে পারে, অথচ পড়তেও হালকা!

একটু ভয় ভয় করছিল, এরা প্রথমেই গুলি চালিয়ে দেবে না তো? অস্বস্তি কাটিয়ে এগিয়ে গেলাম সামনাসামনি, শত্রু শিবিরের প্রায় কাছাকাছি চলে এলাম একসময় হাঁটতে হাঁটতে। কিন্তু এখনও অবধি কাউকেই দেখা যাচ্ছে না কেন? কোথাও কিছু ভুল হয় নি তো?

ইতস্তত করে দু পা এগিয়ে যেতেই একটি আওয়াজের সাথে সাথে এবার ছুটে এল একটি গুলি; আমার সামনে মাটিতে পড়ে থাকা একটি ছোট পাথরের খণ্ডকে নড়িয়ে দিয়ে গেল সেটি। বুঝলাম এটা একটি ওয়ার্নিং ফায়ার; সাথে সাথে দাঁড়িয়ে গেলাম দুহাত তুলে। কিছুক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবার পর সামনের অন্ধকার ভেদ করে এগিয়ে এল দুজন, বন্দুক হাতে। আমি অবশ্য জায়গা থেকে নড়ি নি এক পাও। একজন এগিয়ে এসে মুখে আলো ফেলল। এর পরের কথা শুনে মনে হল, আমার আসাটা ওদের কাছে প্রত্যাশিত ছিল-

-“মনে হয় ঐ ছোঁড়া এসে গিয়েছে!”

স্থানীয় পুশতু ভাষায় পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা দ্বিতীয়জনকে কথাটা বলে আবার আমার দিকে ফিরে তাকাল লোকটি। এবার হিন্দী ভাষায় রুঢ়ভাবে একটা প্রশ্ন ভেসে এল আমার দিকে-

-“প্যাকেজ এনেছিস?”

ইশারায় আমার পিঠের ব্যাগের দিকে দেখালাম একবার।

-“দেখা!”

ব্যাগটা খুলে ওদের ভিতরের জিনিষটা দেখাতে এবারে ওরা খুশি হল বলে মনে হল। তারপর পুনরায় ব্যাগের চেন আটকাতে নির্দেশ দিয়ে এবারে বন্দুক দিয়ে ইশারা করে আমায় বলল ওদের সঙ্গে আমায় যেতে। কথা না বাড়িয়ে এগিয়ে চললাম ওদের সঙ্গে।

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------


-“তুই এখনও বেঁচে আছিস কি করে?”

বাঙ্কারের ভিতরে কোন একটি কেবিনে এখন মুখোমুখি আমি আর দিলওয়ার। এই কয়বছরে অনেকটা বুড়িয়ে গিয়েছে ও, যদিও শরীরটা এখনও সেই আগের মতই দৃঢ়, ঋজু আর টানটান। ওর কেবিনে নিয়ে যাওয়ার আগে আমায় অবশ্য ভালো করে সার্চ করে নেওয়া হয়েছিল, আমার পিস্তল এখন ওদের হাতে। মুখোমুখি হতে এটাই ছিল ওর প্রথম প্রশ্ন, তারপর ভালো করে আগাপাশতলা আমায় মেপে আবার প্রশ্ন করল ও-

-“এত জটিল অপারেশানের পরেও তুই এতদিন বাঁচলি কিভাবে?”

নির্ঘাৎ ভড়কি দিচ্ছে ব্যাটা; সময়ে সময়ে একটু মাথাধরা বাদে যেখানে আমার অন্য কোন সমস্যা নেই সেখানে আমি ওর কথা বিশ্বাস করব কেন? একটা চোরা হাসি ফুটে উঠল আমার মুখে।

-“বস্!”

ওদের একজন এগিয়ে এসে স্যালুট ঠুকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল পাশে; এবারে দিলওয়ার ওর দিকে তাকাতেই ওর হাতে আমার সাইলেন্সার লাগানো পিস্তলটা তুলে দিল লোকটি। তারপর তেমনি স্যালুট ঠুকে বেরিয়ে গেল। ঘরে এখন ও নিজে আর দুজন অস্ত্রধারী গার্ড ছাড়া আর কেউ নেই। একমনে পিস্তলটা পরীক্ষা করল দিলওয়ার, উল্টেপাল্টে ওর মেকটা দেখে নিল; তারপর আমার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল-

-“বন্দুক এনেছিলি কেন?”

ওর চোখের দিকে চোখ রেখে কঠিন গলায় উত্তর দিলাম-

-“পাহাড়ি রাস্তা ধরে আসব, তোর মতন বুড়ো শিয়াল কোথায় ঘাপটি মেরে বসে থাকবে তা তো আর জানি না; তাই নিজেকে বাঁচাতে বন্দুকটা সাথে করে নিয়ে এলাম, যদি কাজে লেগে যায়-”

-“হুমম…”

বন্দুকটা নেড়েচেড়ে আরও কিছুক্ষণ দেখল ও, তারপর হঠাৎ বাঁ হাতে আমায় কষে লাগাল এক থাপ্পড়! বেশ জোরেই মেরেছিল দিলওয়ার; আমার মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে গেল সাথে সাথে। হঠাৎ প্রহারে মেঝের ওপর শুয়ে পড়লাম প্রায়! আমার জামার কলার ধরে মাথাটা একটু তুলে ধরে সে বলল-

-“শ্যাঙ চায় তুই বেঁচে থাক, কিন্তু আরশোলা পায়ের নীচে পুষে রাখাটা আমার পছন্দ ছিল না! যাই হোক, আমাদের দরকারি কাজটা মিটিয়ে দিয়েছিস তুই, এর জন্য একটা ধন্যবাদ তোকে আমি দিতেই পারি! এবারে বল- তাড়াতাড়ি মরবি, না আস্তে আস্তে?”

বন্দুকের নলটা তখন আমার রগে ঠেকানো, আমি ঝুলছি দিলওয়ারের বাঁ হাতের মুঠোয়; এই অবস্থায় হঠাৎ আমার চোখ গেল ওর পিছনদিকে। ঘরের মধ্যে একটা ফায়ার-প্লেস গোছের কিছু করা ছিল, যা শীত পড়ে এই অঞ্চলে। ওটা অবশ্য এখন নেভানো; এখন পরিষ্কার দেখতে পেলাম- ফায়ার-প্লেসের লোহার গেট পা দিয়ে ঠেলছে নওসাদ! ব্যাটাচ্ছেলে করছেটা কি; ঐ আওয়াজে তো পুরো ক্যাম্প সতর্ক হয়ে যাওয়ার কথা এতক্ষণে! আর সবাই তো দেখতে পেয়ে যাবে ওকে! বিষ্ময়ের একটা রেখা পরিষ্কার ফুটে উঠল আমার চোখে-মুখে!

আমার দৃষ্টিপথ অনুসরণ করেই বোধহয় দিলওয়ার পিছন দিকে তাকাল; কিন্তু সৌভাগ্যবশতঃ ওকে দেখতে পেল না বোধহয়, তারপর বিদ্যুৎগতিতে আমার দিকে ফিরে তাকাতেই-

আস্তিনের নীচে থাকা বন্ধুবর নওসাদের ছুরির ফলাটা ওরা সার্চের সময় তাড়াহুড়োয় খুঁজে পায় নি; এখন হাতের এক ঝটকায় সামনে সেটি চলে আসতেই আর কালবিলম্ব করি নি আমি- আমূল সেটি গিঁথে দিলাম সামনে ঝুঁকে থাকা দিলওয়ার হুসেনের গলার রগে! একটা ‘ক্যাঁক’ চিৎকারের সাথে সাথে আহত হয়ে মাটিতে পড়ে গেল ও; ছটফট করতে লাগল ওর দেহটা! পরক্ষণেই মাটিতে পড়ে যাওয়া পিস্তলটা কুড়িয়ে নিয়েই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুজনকে পর পর দুটি গুলি। টার্গেটগুলি মাটিতে পড়ে যেতে আর সময় নষ্ট না করে এগিয়ে ফায়ার-প্লেসের লোহার গেট খুলে আগে নওসাদকে ভিতরে আসতে দিলাম; তারপর ওর হাতে নিজের সাইলেন্সার লাগানো পিস্তলটা তুলে দিয়ে ফিরে তাকালাম মেঝেতে শায়িত দিলওয়ার হুসেন-এর দেহটার দিকে; ক্ষীণকন্ঠে ধীর গলায় নিজের মুক্তির জন্য সে তখন কাকুতি-মিনতি শুরু করেছে। সাপ্রেসড্ পিস্তল হাতে তার দিকে এগিয়ে গেল নওসাদ।

-“দিলওয়ার হুসেন! সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশের জন্য, সীমান্ত অঞ্চলে বারংবার উত্তেজনা ছড়ানোর জন্য, নির্দোষ ভারতীয়দের নির্বিচারে হত্যা, এবং ভারতীয় উপমহাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকবার অভিযোগে আমি, ভারতীয় আর্মির পক্ষ থেকে ক্যাপ্টেন নওসাদ ইকবাল, তোমার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করলাম- এফেক্টিভ ইমিডিয়েটলি!”

বিষ্ময়ভরা চোখদুটি নিয়ে তাকিয়ে রইল দিলওয়ার হুসেন, যেন ভুত দেখেছে! কিন্তু বেশিক্ষণ আর তাকিয়ে থাকতে হল না ওকে; নওসাদের পিস্তল থেকে পর পর দুটি গুলি বেরিয়ে ওর মাথায় আঘাত করতেই সাথে সাথে মারা গেল ও- আর দ্বিতীয় কোন শব্দ না করে।

-“ওদের বন্দুকগুলি নিয়ে নে, এবার পালাতে হবে! সামনের দরজাই ভরসা, পিছন দিক দিয়ে পালাবার কোন রাস্তা- ও কি?”

রাত্রির নিস্তব্ধতা চিরে হঠাৎ পর পর ভেসে এল রকেট-লঞ্চারের বিস্ফোরণের শব্দ; চমকে উঠলাম আমরা দুজনেই! এ কি অদ্ভুত ব্যাপার! পায়ের নীচের মাটি পর্যন্ত থরথর করে কেঁপে উঠছে যেন! কি ভয়ংকর দুলুনি!

-“হারি বস্! মনে হয় আমাদের আর্মির লোকেরা আক্রমণ শানাচ্ছে…কুইক! আমাদের পালাতেই হবে, এক্ষুণি!”

রুকস্যাকটা পড়েছিল দিলওয়ারের মৃতদেহের পাশেই; সেটিকে পিঠে ঝুলিয়ে বন্দুকটা বাগিয়ে দরজা খুলে বাইরে বেরোলাম দুই বন্ধু একসাথে; কিন্তু বেশিদূর যেতে পারলাম না! অকষ্মাৎ একটা প্রবল বিস্ফোরণের সাথে সাথে মেঝেতে পড়ে গেলাম দুজনই; তারপর…আমি আবার অজ্ঞান হয়ে গেলাম!!


====================================================================


১৫ই ডিসেম্বর, ২০১৯


-“তার মানে তোমার বক্তব্য- ট্রিগারটা একটি ‘বেইট’ ছিল মাত্র; শত্রু-শিবিরে ঢোকবার জন্য, তাই তো? তুমি ট্রিগার ওদের হাতে তুলে দিতে চাও নি- ঠিক কি না?”- আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন মেজর অরোরা।

-“নওসাদ বলেছিল যে এটার কাজ মিটে গেলে আবার একে রেখে দিয়ে আসা হবে ওর জায়গায়…কিন্তু আমরা সময় পাই নি। অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার পর আমি নিজেকে আবিষ্কার করি আপনাদের এখানে, বন্দী অবস্থায়।”- একটু একটু করে সব আবার মনে পড়ে যাচ্ছিল আমার।

-“সরাসরি তোমাকে এখানে আনা হয় নি ক্যাপ্টেন! প্রথমে তোমায় রাখা হয়েছিল হাসপাতালে; তুমি পুরো একটা দিন অজ্ঞান ছিলে…যাই হোক, এবারে একটা শেষ প্রশ্ন- ‘নার্গিস’ জায়গাটি কোথায়?”

-“‘নার্গিস’?”

-“অজ্ঞান অবস্থায় তোমার মুখ দিয়ে অনেকবার নামটা শোনা গেছে, তাছাড়া জবানবন্দীর শুরুতেই তুমি নামটা একবার উল্লেখ করেছিলে; আমার দৃঢ় বিশ্বাস, শ্যাঙকে খুঁজে পাওয়া যাবে এখানেই, এই গোটা ষড়যন্ত্রের মূল যন্ত্রী ওই; ওকে না ধরা অবধি আমাদের স্বদেশ নিরাপদ না। তুমি নিশ্চই জানবে জায়গাটা কোথায়-”

-“কিন্তু আমি…সত্যিই…আমি জানব কি করে?”

-“ক্যাপ্টেন, বর্ডারের ওপারে শত্রুসেনাদের লাইনের ওপার থেকে কোন অবস্থাতেই জীবন্ত বেরিয়ে আসা এত সহজ কাজ নয়; তোমার পূর্বসূরীরা যারা এই চেষ্টা করেছে তাদের বেশিরভাগই হয় মারা পড়েছে, নয় তো নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছে! তুমি বুঝতে পার নি, ওরা তোমাকে প্রকৃতপক্ষে পালাতে দিয়েছে- এই ‘গরিমাময় পলায়ন’ আসলে ওদের নারকীয় পরিকল্পনার একটা অংশ মাত্র!”

-“পরিকল্পনা? কিন্তু কি পরিকল্পনা? ক্ষমা করবেন মেজর, কিন্তু আমি ঠিক-”

হাত দেখিয়ে আমাকে থামালেন মেজর অরোরা, তারপর চেয়ারটা টেনে নিয়ে আমার কাছে বসে ফিসফিসিয়ে একঘেঁয়ে সুরে বলতে আরম্ভ করলেন-

-“১৯৯৫ সাল থেকে চাইনিজরা একটি নতুন বিষয়ের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে আসছে। ওদের এই নতুন প্রোজেক্টের মূল লক্ষ্য- মানুষের যে জৈব স্মৃতিকোষ, তাকে সম্পূর্ণ চেপে রেখে একটি কৃত্রিম মেধার সাহায্যে তাকে চালনা করা- এককথায়, একটি মানুষকে ধীরে ধীরে রোবটে পরিণত করা যাকে নিয়ন্ত্রণ করবে অপর একজন ব্যক্ত, বহু দূর থেকে বসে। এই প্রোজেক্টের বিষয়ে বিশদে আমরা কিছু জানি না, কিন্তু যেটুকু জানি, সেটাই বরং খোলসা করি।

প্রোজেক্টের একেবারে গোড়ার দিকে ওরা বাঁদর ও অন্যান্য কিছু প্রাণীদেহে এই পরীক্ষাগুলি করে, কিন্তু ১৯৯৯ সালের মধ্যে ওরা তিনজন মানুষের শরীরে এই পরীক্ষাটি চালায়। তার মধ্যে প্রথম দুজন মারা যায়, অথবা তাদের সরিয়ে ফেলা হয় অন্যত্র- মোদ্দা কথা, মূল সমাজে তাদের আর কোন অস্তিত্বই আর খুঁজে পাওয়া যায় নি।

দূর্ভাগ্যবশতঃ, তুমিই হলে সেই তৃতীয় ব্যক্তি ক্যাপ্টেন অবি! ১৯৯৯ সালে যখন তুমি আর নওসাদ ধরা পড়, শ্যাঙ চেয়েছিল তোমাদের দুজনকেই একটি টেস্ট-সাবজেক্ট হিসেবে ব্যবহার করতে; কিন্তু দিলওয়ার হুসেনের আপত্তিতে দুজন নয়, শ্যাঙ বেছে নিয়েছিল একজনকেই, তোমাকে। শ্যাঙ পাক-চীন দুটি দেশের মধ্যে নিছক কোলাবরেটরই ছিল না, ওর চরিত্রের স্বভাব-হিংস্রতার জন্য ওকে বেছে নেওয়া হয়েছিল এই গোপন প্রজেক্টের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবেও! আমাদের ইন্টেলসূত্রে জানা গিয়েছে- সীমান্ত থেকে ভারতীয়দের চীনের হাতে ল্যাব-টেস্টের জন্য তুলে দেওয়ার সাপ্লায়ার হিসেবে স্বেচ্ছায় এগিয়ে এসেছিলেন এই হুসেনসাহেব, যার ভারত-বিদ্বেষ অত্যন্ত সুবিদিত। এই প্রক্রিয়ার প্রথম বলি তুমি।

আমাদের মস্তিষ্কের সেন্ট্রাল কোর সিস্টেম, যা মস্তিষ্কের বিভিন্ন সিগনালগুলিকে ধরে এবং সেই অনুযায়ী দেহকে চালনা করে, সেখানে ওরা বসিয়ে দিচ্ছে একটি ন্যানো-টেকনোলজিক্যাল যন্ত্র। ভয়ের বিষয়টি এখানেই যে- এই যন্ত্রটির ‘কেসিং’ কিন্তু জড় পদার্থ দিয়ে তৈরি কোন বস্তু নয়, বরং নিউক্লিয়াস, সাইটোপ্লাজম ও অন্যান্য জৈববস্তুসমৃদ্ধ সজীব একটি কোষের মত, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আয়তনে বাড়তে থাকে! এর আচরণ একটি সজীব কোষের মতই স্বাভাবিক, দেহ থেকে পুষ্টিরস ধারণ করে এর বহির্ত্বক বাড়তে থাকে। এইভাবে ধীরে ধীরে আয়তনে বেড়ে পোষকদেহের মস্তিষ্কের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে এরা সম্পূর্ণ দেহটির ওপর কবজা করে নেয়, সেই ব্যক্তির চেতনা, আত্মা সমেত পুরোটা!”

কাগজের তাড়া হাতড়ে দুটি এক্স-রে প্লেট বের করে আনেন মেজর। তারপর আমার দিকে সে দুটি বাড়িয়ে ধরে বললেন-

-“পাঁচবছর আগে লাদাখ সীমান্তের কোন একটি অজ্ঞাত স্থান থেকে এক অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিকে উদ্ধার করে আমাদের সেনাবাহিনী। ঐ অঞ্চলে এরকম পর পর দেহ মিলেছিল, ফলে সেবারে সন্দেহের বশবর্ত্তী হয়ে ওরা দেহটিকে উদ্ধার করেই খোদ রাজধানীতে পাঠিয়ে দেয়। ভাগ্যিস পাঠিয়েছিল!”

প্লেটটা মন দিয়ে দেখছিলাম। এবার জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে তাকালাম মেজর অরোরার দিকে।

-“তোমার বাঁহাতে যে প্লেটটি ধরা তা ঐ ব্যক্তির মস্তিষ্কের এম. আর. আই. রিপোর্ট। অবস্থাটা দেখেছ? মধ্যিখানের ঐ ফ্যাকাশে সাদা অংশটা কতটা ছড়িয়েছে দেখেছ? ওটা ঐ কৃত্রিম মেধা, যা ছড়িয়েছে পোষক দেহের মস্তিষ্কে! ভালো করে দেখ!”

ভালো করে তাকালাম প্লেটটির দিকে। মাথার ভিতর অনেকটা অঞ্চল জুড়ে ফ্যাকাশে সাদা অংশটি ছড়িয়ে আছে।

-“কিন্তু কি করে বুঝছেন এটি কৃত্রিম কিছু? টিউমারের কারণে সেরিব্রাল স্ট্রোক হলেও তো রিপোর্ট এরকম দেখাতে পারে!”

-“তার কারণ আমাদের ডাক্তাররা মৃত ব্যক্তির মাথার ভিতরটা খুলে দেখেছেন। এবার ডান হাতেরটা দেখ। স্বাভাবিক লাগছে না?”

ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালাম। সত্যিই এই রিপোর্টে অস্বাভাবিক কিছু নেই।

-“তোমাকে উদ্ধার করা হয়েছিল দেশের পশ্চিমের বন্দর এলাকায় একটি মাছ-ভর্ত্তি কন্টেনারের মধ্যে! নিয়ম অনুযায়ী তোমার সম্পূর্ণ শারীরিক পরীক্ষা করা হয়েছিল, ঐ সময় তোমার মাথার রিপোর্ট এটা। অস্বাভাবিক কিছু দেখা যাচ্ছে না তো? এবারে এটা দেখ!”

মাছ-ভর্ত্তি কন্টেনারের ব্যাপারটা আমায় দমিয়ে দিয়েছিল। তার মানে সত্যিই ওরা আমাকে যেতে দিয়েছিল মাত্র! ওরা জানত, আমি পালাচ্ছি! মাথাটা কিরকম গুলিয়ে গিয়েছিল এত বছর বাদে বিষয়টা জানতে পেরে।

মেজর অরোরা আমার হাতে আরও একটি এক্স-রে প্লেট ধরিয়ে দিয়েছিলেন; সেটা হাতে পাওয়ার পর দেখলাম- এই রিপোর্টে ফ্যাকাশে সাদা অংশটির আয়তন একটি মার্বেলের মত। ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে হাঁ হয়ে তাকালাম মেজরের দিকে।

-“গত ২৮শে নভেম্বর তীব্র মাথাব্যথা ও বমির উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্ত্তি হওয়ার পর তোমার ব্রেনস্ক্যান করে এই বস্তুটির উপস্থিতি সম্পর্কে ডাক্তাররা নিশ্চিত হন। তোমার মাথাতেও এই অজ্ঞাতপরিচয় বস্তুটি রয়েছে, যার অর্থ, ওরা তোমার ওপরেও অপারেশন চালিয়েছিল-”

হাঁ হয়ে তাকিয়ে রইলাম দুটি রিপোর্ট প্লেটের দিকে। হঠাৎ মনে একটি খটকা লাগল; জিজ্ঞেস করলাম-

-“এখানে দেখুন মেজর- এই অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির রিপোর্টে বস্তুটা কতদূর ছড়িয়েছে, অথচ আমার মাথায় এইটুকুনি আয়তন মাত্র-এরকম হল কেন?”

-“কতদিন আগে এই ব্যক্তির দেহে অপারেশান হয়েছে তা আমরা জানি না; তবে তুমি যে প্রশ্নটা করলে, সেই একই প্রশ্ন আমিও করেছিলাম ডাক্তারদের। ওরাও যথেষ্ট কনফিউসড…মানব-মস্তিষ্ক এমন একটি জটিল বিষয় যা যেকোন সাধারণ নিয়মের বাইরে। অনেক অনুরোধের পর ঐ দলের সর্বাপেক্ষা প্রবীন ডাক্তার দুটি সম্ভাবনার কথা বললেন, যা একান্ত যুক্তিগ্রাহ্য-”

-“কি?”

-“প্রথমত, তোমার দেহের প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত বেশি। এই নকল ‘কোষ’ তোমার মস্তিষ্কে যে সিগনাল পাঠাচ্ছে অবিরত, সেটিও কিন্তু কৃত্রিমভাবে উৎপাদন করা, যার রাসায়নিক ধর্ম তোমার-আমার দেহের স্বাভাবিক সিগনালের রাসায়নিক ধর্মের থেকে একদমই আলাদা। এই নকল সিগনাল ও তার উৎপাদক কোষকে শনাক্ত করছে তোমার দেহ, আর সেই অনুযায়ী একে ছাঁকছে। এছাড়া, কোষটির স্বাভাবিক বৃদ্ধিতেও বাধা দিচ্ছে দেহ, ফলে তা আয়তনে সেভাবে বাড়তে পারছে না। তবে এই সম্ভাবনা লক্ষে একভাগ; ধরে নেওয়া যেতেই পারে- তোমার ক্ষেত্রে তা ঘটে নি।”

-“তাহলে?”- পুরো বিষয়টা না বুঝলেও সারসংক্ষেপটা বুঝতে আমার কোন অসুবিধা হয় নি।

-“সেক্ষেত্রে রয়ে যাচ্ছে দ্বিতীয় সম্ভাবনা; তোমার নিজস্ব স্মৃতি। তোমার বন্ধু নওসাদ তোমার স্মৃতি জুড়ে এতটাই উজ্জ্বল হয়েছিল-”

মাথাটা আবার হঠাৎ করে গরম হয়ে গেল। ‘নওসাদ আমার স্মৃতিতে’- মানে? মেজর অরোরাও আমাকে অবিশ্বাস করছেন? এ কি কথাবার্তা? গোটা সময়টা জুড়ে নওসাদ আমার সঙ্গে কাটাল, একসাথে যুদ্ধ করল, দুজনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এত লড়াই করলাম, আর ইনি বলেন কি না-

মনটা খিঁচড়ে গিয়েছিল; কিছুটা রুক্ষভাবে বললাম-

-“নওসাদ বেঁচে আছে।”

বিন্দুমাত্র অপ্রতিভ না হয়ে মেজর অরোরা জিজ্ঞাসা করলেন-

-“তাই যদি হবে ক্যাপ্টেন, তাহলে এখন তিনি কোথায় আছেন?”

-“’৯৯সালের পর ওর পোস্টিং অন্যত্র হয়ে যায়, আমাদের গুপ্ত প্রতিরক্ষা বাহিনীতে রাখা হয় ওকে- এ কথা নওসাদ নিজমুখে আমার কাছে স্বীকার করেছে। এই কারণে ও সবসময় প্রকাশ্যে আসতে-”

-“ক্যাপ্টেন, ক্যাপ্টেন…নওসাদ আমাদের মধ্যে নেই, উনি মারা গিয়েছেন আজ কুড়ি বছর হল; ’৯৯ সালের সেই রেসকিউ টিমে আমি ছিলাম, ওনার দেহকে বডি-ব্যাগে ভরে আমিই স্বয়ং নিয়ে এসেছি-”

-“মিথ্যে কথা! আপনি এরকম করছেন কেন, মেজর? ও মরে নি, অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল মাত্র! পরে জ্ঞান ফেরৎ আসতে ও নিজেই নীচে চলে আসে; ২০০৬ সালে আমরা আবার একসাথে মিলিত হই-”

-“শরীরে পঁয়ত্রিশটা বুলেট নিয়ে পাহাড় বেয়ে নেমে আসেন নওসাদ? তুমি ওকে জিজ্ঞেস কর নি, জ্ঞান ফেরৎ আসবার পর ও কোথায় গিয়েছিল, কার সঙ্গে দেখা করেছিল, ওর চিকিৎসা কোথায় হয়েছিল? মাঝের সাতটা বছর ও কি করছিল? আর ২০০৬সালের কথা বলছ? এই দেখ-”

কাগজের তাড়া হাতড়ে একটি ফাইল বের করলেন মেজর অরোরা; আমার হাতে দিলেন। এ তো দেখছি হেড কন্টস্টেবল নাথুলাল তেওয়ারীর জবানবন্দী; এটা আমার হাতে উনি দিলেন কেন?

-“এখানটা পড়ে দেখ-” – বিশেষ একটি অংশে আঙুল রেখে বললেন মেজর অরোরা; তার নির্দেশে জায়গাটি পড়লাম, আর পড়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম!

-“…বাড়িটার থেকে বেরিয়ে আসবার পর থেকেই সাবজি কিরকম যেন অদ্ভুত আচরণ করতে লাগলেন, যেন ওনাকে দানোয় ধরেছে। আমি যে ঝোপটায় বসেছিলাম, সেটায় বসে উনি কার সঙ্গে যেন আমার পরিচয় করালেন, তারপর ফিসফিস করে কিসব যেন শলা-পরামর্শ করতে লাগলেন…কিন্তু ওখানে আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ ছিল না! ওনার কাণ্ড দেখে একসময় আমার ভয় ধরে গিয়েছিল, ক্যাপ্টেনসাব যদি ঐ সময় ডায়না দিক থেকে আক্রমণ না করতেন আমি হয়তো উঠে পালিয়ে যেতাম…”

-“মিথ্যে কথা!”- রিপোর্ট পড়া হয়ে গেলে আমি সজোরে চেঁচিয়ে উঠলাম- “নাথুলাল আপনার লোক ছিল; এমনও তো হতে পারে, আপনি ওকে শিখিয়ে-”

-“এনাফ, ক্যাপ্টেন! এখানে মিথ্যে কথা বলিয়ে আমার কোন স্বার্থ নেই। তাছাড়া একা নাথুলাল না, পরবর্ত্তী ক্ষেত্রে অনেকেই তোমার মস্তিষ্কের সুস্থতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। কখনও ছায়ার সঙ্গে, কখনও বা নিজে নিজে বকবক করার এই প্রবণতা লক্ষ্য করেছেন অনেকেই; অভিযোগও এসেছে বিস্তর! এই দেখ!”

আরও একতাড়া কাগজ বাড়িয়ে ধরলেন মেজর অরোরা; ঘাড় বাড়িয়ে দেখলাম- বেশ কয়েকজন সহকর্ম্মীর বক্তব্য সেগুলি। আলগোছে সবকটিতে চোখ বুলিয়ে চেয়ারে গা এলিয়ে দিলাম। আর ভাবতে পারছি না। এরা সবাই মিথ্যা কথা বলছেন কেন?

-“তাহলে…রোহতাং সীমান্তে আমার সঙ্গে কে ছিল? আর ছাম্বলা-য়? দিলওয়ার হুসেনকে তাহলে কে মারল?”

আমার দিকে সহানুভূতির দৃষ্টিতে একবার তাকিয়ে চেয়ার থেকে উঠে কাঁচের দেওয়ালের দিকে ফিরে থার্ড আম্পায়ারের ভঙ্গীতে একটি ঈঙ্গিত করলেন মেজর অরোরা; তারপর আমার দিকে ফিরে বললেন-

-“দিলওয়ার হোসেনের ঐ বাঙ্কারটিতে যেদিন ‘তোমরা’ যাও, সেই একইদিনে আমরাও রেইড করি ওখানে; আমি ছিলাম না অবশ্য ঐ দলে। ঐ অঞ্চলে সন্দেহভাজন জঙ্গীদের গতিবিধির খবর পেয়ে অন্য একটি ইউনিট আক্রমণ করে ঐ জঙ্গীঘাঁটিকে। যে ঘরে ‘তোমাদের’ বন্দী করা হয়, সৌভাগ্যবশতঃ সেখানে একটি ক্যামেরা রাখা ছিল, যা পরে উদ্ধার করা সম্ভব হয়…বাকিটা তুমিই নিজেই দেখ-”

বাঁদিকের দেওয়ালে আবার ফুটে উঠল কিছু সবাক চিত্র; সেদিকে দৃষ্টি ফেরাতেই…হে ভগবান!...

-“দিলওয়ার হুসেন! সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশের জন্য, সীমান্ত অঞ্চলে বারংবার উত্তেজনা ছড়ানোর জন্য, নির্দোষ ভারতীয়দের নির্বিচারে হত্যা, এবং ভারতীয় উপমহাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকবার অভিযোগে আমি, ভারতীয় আর্মির পক্ষ থেকে ক্যাপ্টেন নওসাদ ইকবাল, তোমার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করলাম- এফেক্টিভ ইমিডিয়েটলি!”

এই কথাগুলি তো নওসাদ বলেছিল, শায়িত দিলওয়ার হুসেনকে গুলি করবার ঠিক আগের মুহুর্ত্তে! তারপরই তো পরপর গুলি- সেই ঘটনার বিন্যাস তো ঠিকই আছে, কিন্তু যে কথাগুলি বলে গুলি চালাল সে তো নওসাদ নয়! এ তো স্বয়ং আমি! আর নওসাদ গোটা ঘরের কোথাও তো নেই, তাহলে?

আর দেখতে পারলাম না কিছু; চোখ দিয়ে অবিশ্রান্ত জলের ধারা বেরিয়ে এসে ঢেকে দিল আশেপাশের সবকিছু। এতক্ষণে বিষয়টা পরিষ্কার হয়েছে আমার কাছে! দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ কাঁদলাম; কান্নার বেগ থামতে পিছন থেকে আমার কাঁধে একটা হাত আলতো করে রাখলেন মেজর অরোরা।

-“নওসাদের মৃত্যু তোমায় নাড়িয়ে দিয়ে যায়, এতটাই যে তার উপস্থিতি তোমার চেতনাকে সর্বতোভাবে গ্রাস করতে থাকে। বিপদের সময় ওর সাহচর্য্যের অভাব তুমি বোধ করতে থাক; বিশেষ করে সেখানে তার খুনীরা কোনভাবে যদি জড়িয়ে যায়! এই কারণেই ২০০৬সালের আগে তুমি নওসাদের দেখা পাও নি; কারণ মাঝের সাতটা বছরে দিলওয়ার হুসেন বা কর্ণেল শ্যাঙ- এরা কেউ প্রত্যক্ষভাবে এগিয়ে আসে নি সীমান্ত টপকে। যেদিনকে ওরা আবার রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ করল, সেদিন নওসাদও ছায়াময় হয়ে এগিয়ে এল তোমার চেতনায়; এত প্রকটভাবে যে তুমি তা সত্যি বলে ভাবতে শুরু করলে। মানুষের মস্তিষ্কে ছায়ার কায়া হয়ে যাওয়ার এই ঘটনাটিকে ‘হ্যালুসিনেশন’ বলে ক্যাপ্টেন অবি। তুমি হ্যালুসিনেশনে ভুগছিলে!

তবে মুদ্রার একটি অপর দিকও আছে। এই জটিল মনস্তাত্ত্বিক রোগ তোমার মাথার ভিতরে থাকা ঐ ‘চাউমিন’টিকে খুব বেশি বাড়তে দেয় নি! নাহলে তাইওয়ানের কোন একটি ব্রডকাস্টিং সেন্টার থেকে যা রিলে করত ওরা, তাই করে যেতে তুমি! সন্ত্রাসবাদীদের স্লিপার সেল-এর একটি শাখা ওরা খুলতে চেয়েছিল এ দেশে- এই ব্যাপারটি এখন জলের মত পরিষ্কার। তোমার বন্ধু নওসাদ না থেকেও বিরাট এক বন্ধুকৃত্য করে গেল, তোমাকে অবশ্যম্ভাবী বিপদের হাত থেকে বাঁচিয়ে-”

আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলাম না আমি, ধপ্ করে বসে পড়লাম নিজের চেয়ারে। কি নারকীয় পরিকল্পনা খাটিয়ে ছিল বেঁটেরা! জীবন্ত মানুষদের শরীরে একটি ‘বাগ্’ ঢুকিয়ে তার চেতনা অধিকার কর, তারপর রিলে সেন্টার থেকে ক্রমাণ্বয়ে বার্তা পাঠিয়ে তাকে দিয়ে যা খুশি তা করাও! এভাবে একটি দেশের ওপর কব্জা কর, তার নিজের অধিবাসীদের দিয়েই একটি গুপ্ত সেল তৈরি করে! বাহ্!

ওরা সফলও হত, যদি নওসাদের স্মৃতি বাধা না হয়ে দাঁড়াত! ধন্য আমার বন্ধু, ধন্য তার অশরীরি উপস্থিতি! একটি নমষ্কার ঠুকলাম তার বিদেহী আত্মাকে উদ্দেশ্য করে।

মেজর অরোরা ততক্ষণে আবার উঠে দাঁড়িয়েছেন; এইবার একটু অধৈর্য্য মনে হল তাকে। আমার কাছে এসে তিনি বললেন-

-“যুদ্ধ এখনও শেষ হয় নি, ক্যাপ্টেন! শ্যাঙ এখনও বেঁচে। আগামিকাল ১৬ই ডিসেম্বর, ’৭১ সালে এই দিনে ভারত সম্মুখযুদ্ধে পাকিস্তানকে পরাস্ত করে, সন্ধিচূক্তি হয়। আমাদের কাছে খবর আছে যে আগামিকাল ওরা কিছু একটা করবে, এই কারণে শ্যাঙকে ধরা একান্ত প্রয়োজনীয়। আমার ধারণা, ‘নার্গিস’ ওদের রিলে সেন্টার, যেখান থেকে নির্দেশ ট্রান্সমিশন হবে! এটা কি আর কোথায়, তা একমাত্র তুমিই জান! বল, কোথায় এই ‘নার্গিস’?”

একমনে চিন্তা করছিলাম; হঠাৎ মনে পড়ে গেল- সেই অজ্ঞাত খাঁড়ি অঞ্চল…সেই স্টীমার যাতে আমি পালাচ্ছিলাম…খাঁড়ির মুখ পেরিয়েই বার-দরিয়ায় সেই বিরাট জাহাজ…দূর থেকে দেখার চেষ্টা করলাম ওর নাম…নার্…নার্সিসাস…নার্সিসাস…নার্গিস! জলের প্রতিবিম্বে নিজের রূপে বিমুগ্ধ সেই সুন্দরী? মুখ তুলে তাকালাম মেজর অরোরার দিকে।

-“মনে পড়েছে?”

ঘাড় নাড়লাম দুবার; তারপর বললাম-

-“‘নার্গিস’ কোন জায়গা নয়, মেজর।”

-“তাহলে?”

-“ওটি একটি যুদ্ধজাহাজ!”

-“আর ইউ শিওর?”

-“অ্যাফারমেটিভ!”

টেবিলের ওপর চশমাটা খোলা অবস্থায় পড়েছিল; এবার সেটিকে তুলে একহাতে সেটিকে পড়ে নিলেন মেজর অরোরা। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন-

-“চল, একটা মাছ ধরে আসি!”


====================================================================


১৬ই ডিসেম্বর, ২০১৯, ভোর ০৪:১১


এর পরের ঘটনাবলী অত্যন্ত দ্রুত!

কোস্ট গার্ডদের সহায়তায় অবশেষে খুঁজে পাওয়া গেল হারানিধিকে; উপসাগর অঞ্চল থেকে বেশ খানিকটা তফাতে ইয়েমেনের ধার ঘেঁষে অবশেষে সন্ধান পাওয়া গেল ভাসমান দূর্বৃত্ত জাহাজটিকে; ওর অভিমুখ কিন্তু ঘোরানো ছিল আমাদের দিকেই।

বিষয়টি এত সহজ ছিল না। একদিকে আমাদের জঙ্গীবিমানগুলি যখন কচুকাটা করে দিচ্ছে ‘নার্গিস’-এর নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অপরদিকে আমাদের কূটনৈতিক বিভাগ তখন অক্লান্তভাবে যোগাযোগ করছে ইয়েমেনসহ বিশ্বের তাবড় দেশগুলিকে। বোঝানোর চেষ্টা চলছে আপ্রাণ যে এই আঘাত কোন রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে নয়, বরং সন্ত্রাসবাদের ওপর সজোরে কুঠারাঘাত করবার জন্য একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা। স্বয়ং পি.এম.ও. অফিস এগিয়ে এসেছিল এই অভিযানের গুরুত্বে সাড়া দিয়ে!

প্রথমে আমাদের বিমানগুলি কচুকাটা করে ওদের জাহাজের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে, থামতে বাধ্য করে ওদের একজায়গায়। তারপর আমাদের ছত্রীবাহিনী নেমে আসে জাহাজের বুকে; একের পর এক ভাঙতে থাকে ওদের প্রতিরোধ; আমিও ছিলাম সেই দলে। সবশেষে যখন শ্যাঙ মারা যান, তখন আর কোন কথা না বলে আত্মসমর্পণ করে শত্রুসৈন্য। এদের বেশিরভাগই ছিল চাইনিজ!

জাহাজের রেলিঙে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম সদ্য ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলিকে। বুড়ো শালিখের সে কি প্রতাপ! মারা যাওয়ার আগে অবধি আত্মসমর্পণ করতে চান নি! সবচেয়ে বড় ব্যাপার, একবার দেখেই চিনতে পেরেছেন আমাকে। আমি বেঁচে আছি দেখে গালাগালি দিয়ে হাতের বন্দুক তাক করতে গিয়েছিলেন শ্যাঙ আমার দিকে, কিন্তু পরপর গুলি খেয়ে মাটিতে পড়ে যান বুড়ো। মারা যাওয়ার আগে অত্যন্ত রহস্যময়ভাবে হাসতে হাসতে বলে যান-

-“দিস্ ওয়ে অর আদার- সুন মাই ল্যাণ্ড শ্যাল্ কনসিউম ইয়রস্!”

এই কথাটাই ভাবিয়ে তুলেছে আমাকে। মারা যাওয়ার আগে ঠিক কি বোঝাতে চাইলেন শ্যাঙ? পরমানু বোমা ফাটানোর পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে, দেশের ভিতরের স্লিপার সেলকে জাগিয়ে তোলা যায় নি- তাহলে আর কোন পরিকল্পনা রয়েছে যা আমাদের বিপর্যস্ত করে তুলবে? মেজর অরোরা আমার কাছে এসেছিলেন, দুজনেই ভাবছিলাম রহস্যটা নিয়ে।

-“‘স্যানটাজার’, সাব!”

একজন কন্টস্টেবল হাতে করে এক বোতল স্যানিটাইজার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের সামনে। নতুন অর্ডার এসেছে- জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার আগে স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধোওয়া বাধ্যতামূলক; দেশে ফিরে আগে কিসব পরীক্ষা হবে, তারপর অনুমতি মিলবে দেশে ঢোকবার! কি যেন একটা অজানা রোগ এসেছে চীনের কোন লাইভস্টক মার্কেট থেকে; গোটা বিশ্বকে নাকি নাজেহাল করে দিচ্ছে এই রোগ! মনটা বিরক্তিতে ভরে গেল। যতসব উটকো ঝামেলা! মুখ ব্যাজার করে হাত পাতলাম; তা দেখে মেজর অরোরা বললেন-

-“এই রোগটিকে এত হালকা নিও না ক্যাপ্টেন! বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় থাবা বসিয়েছে এই ভাইরাস। ভয়ের বিষয় দুটি; প্রথমত, এই ভাইরাস সমগ্র বিশ্বের কাছে সম্পূর্ণ নতুন, আর দ্বিতীয়ত, এরও কিন্তু উৎপত্তি প্রাণী শরীর। আশির দশকে এডস রোগ ছড়ানোর ইতিহাস মনে আছে তো? একশ বছর সময় লেগেছিল ঐ ভাইরাসের বিবর্তন হতে, আর সেটাও কিন্তু বিশ্বের কাছে একটা নতুন থ্রেট-”

বলতে বলতে হঠাৎ থেমে গেলেন মেজর, ভুঁরু কুঁচকে তাকালেন আমার দিকে। আমি বুঝতে পেরেছি উনি কি ভাবছেন, কারণ আমারও মাথায় এসেছে এই নতুন সম্ভাবনা! ফিসফিস করে বলতে থাকলেন উনি-

-“আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সাংঘাতিক ডামাডোল, অর্থনৈতিক মন্দাভাব, দিকে দিকে যুদ্ধ পরিস্থিতি…তারই মধ্যে দূর্ঘটনা ঘটে একটি ভাইরাসের বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া- এই বিষয়গুলি পরষ্পর সংযুক্ত নয় তো? একদিকে আমাদের ব্যতিব্যস্ত রেখে আরেকদিকে সাম্রাজ্য বাড়াবার একটি চেষ্টা নয় তো? তুমি কি বল, ক্যাপ্টেন?”

পূর্বদিকে সূর্যের উদয় হয়েছে ততক্ষণে। উজ্জ্বল সেই আদিপিতার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম আমরা দুজনই, তারপর বললাম-

-“আমি আর নওসাদ- আমরা দুজনই তৈরি থাকব এই নতুন যুদ্ধ জেতবার জন্য, মেজর! এটাই ভবিষ্যৎ, ভবিষ্যতের যুদ্ধ- ‘জৈব-রাসায়নিক’ যুদ্ধ! আর আমরা তৈরি, এই যুদ্ধ জেতবার জন্যে। আপনি?”


(Cover image: Pixabay images)


Rate this content
Log in

More bengali story from Aritra Das

Similar bengali story from Drama