Independence Day Book Fair - 75% flat discount all physical books and all E-books for free! Use coupon code "FREE75". Click here
Independence Day Book Fair - 75% flat discount all physical books and all E-books for free! Use coupon code "FREE75". Click here

Aritra Das

Horror Tragedy Thriller


4.0  

Aritra Das

Horror Tragedy Thriller


সময়রেখার এপারে

সময়রেখার এপারে

16 mins 141 16 mins 141


-"এদিক দিয়ে আসুন স্যার!"


দুপাশে গরাদ লাগানো সারিবদ্ধ সেল-এর ভিতর বিভিন্ন প্রজাতির পাগল; কেউ শান্তভাবে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে, কেউ কেউ ভীষণ রাগে ইতস্তত পায়চারি করে বেরাচ্ছে নিজের সেল-এর চৌহুদ্দিতে। কেউ উচ্চগলায় কাঁদছে, কেউ গান গাইছে...কেউ বা তারস্বরে অদৃশ্য কোন শত্রুকে উচ্চগ্রামে গাল পাড়তে ব্যস্ত। দুপাশের এই সারিবদ্ধ, লোহার গরাদ লাগানো ছোট ছোট খুপড়ি ঘরগুলির মাঝখান দিয়ে একটি লম্বা প্যাসেজ; এই প্যাসেজ ধরে এগিয়ে আসতে দেখা গেল এক সৌম্যকান্তি, প্রৌঢ় ভদ্রলোককে - তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসছেন এই অ্যাসাইলামের ইন-চার্জ, সঙ্গে আরও দুজন গার্ড, কোনরকম গণ্ডগোল হলে-


যেতে যেতে হঠাৎ থমকে দাঁড়াতে হল দলটিকে; গরাদের ফাঁক দিয়ে একদম প্যাসেজের ওপর একমনে প্রস্রাব করে চলেছেন অ্যাসাইলামটির একজন আবাসিক। এতক্ষণ মুখ নীচু করে এই কাজটি করে চলেছিলেন তিনি, এখন মুখ তুলে সামনে দাঁড়ানো দলটিকে দেখতে পেয়ে অপ্রস্তুতের হাসি হেসে তিনি বললেন-


-"সরি টু বদার ইউ! আশা করি আমার শিবাম্বু আপনাদের কারোর গায়ে পড়ে নি?"


দাঁত কিড়মিড় করে ইন-চার্জ তাকিয়ে ছিলেন তার দিকে; এখন প্রৌঢ়টি তার দিকে ফিরে তাকাতেই তিনি বললেন-


-"ইয়ে, কিছু মনে করবেন না...এটি অত্যন্ত উচ্চমানের পাগল স্যার! কথাবার্তায় একদম স্বাভাবিক, কিন্তু যখন-তখন এরকম অসংলগ্ন আচরণ করে। প্রথমবার এখানে আসবার পর এর যখন ফিজিক্যাল টেস্ট হচ্ছিল ল্যাবে, তখন ওয়েইয়িং মেশিনের ওপর বসে 'ইয়ে' করে বলে কি- 'কমোডের বসার জায়গাটা এত নীচু কেন!' বুঝুন বখেড়া! লক-ডাউনে কাজ চলে গিয়ে মাথাটা পুরো-"


অফিসারটি চোখ ঘুরিয়ে গার্ডদের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ইশারা করতে দুজনে হাতের ব্যাটন উঁচিয়ে এগিয়ে যান আবাসিকটির দিকে, কিন্তু তাদের বাধা দেন প্রৌঢ়।


-"অন্যের সুকৃতিতে যদি কারোর কোন ক্ষতি হয় তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা, ক্ষমতাশীলদের নিজের স্বার্থে তৈরি করা অচলাবস্থার অজস্র বলির একটি! ওকে কিছু বলবার দরকার নেই অফিসার, অন্তত আমার সামনে ওকে কিছু করবেন না। আসুন, বরং আমরা আমাদের কাজটা করে নিই-"


প্যাসেজটি ধরে সোজা এগিয়ে একদম শেষপ্রান্তে একটি সেল; সেল না বলে একে 'ঘর' বলাই বোধহয় ভালো। এই ঘরটিতে কিন্তু কোন গরাদ নেই, বরং মোটা স্টিলের একটি দরজা, অনেকটা ব্যাঙ্কের ভল্টে যেমনটি দেখা যায়। পুরোটা নীরেট এই দরজায় একটিই ফাঁক, তাতেও মোটা গ্রীল বসানো, একটি স্লাইডারের অন্তরালে ঢাকা ঘরের ভিতরের দৃশ্য। ইন-চার্জ সামান্য একটু ইতস্তত করে স্লাইডারটি টেনে একদিকে সরিয়ে দিতে ভিতরে খাটের ওপর একজন প্রৌঢ় আবাসিককে শান্তভাবে বসে থাকতে দেখা গেল। এই আবাসিকটির চুল উষ্কোখুষ্কো, মুখে দীর্ঘদিনের খোঁচা-খোঁচা দাড়ি, চোখে-মুখে দীর্ঘদিনের অযত্নের ছাপ একেবারে স্পষ্ট! শান্ত হয়ে তিনি সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে বসে, নির্বাক চোখে সামনের দিকে তাকিয়ে। পুরো পাঁচমিনিট স্থিরভাবে সকলে তাকিয়ে রইলেন আবাসিকটির দিকে, কিন্তু সেখানে কোন পাগলামির লক্ষণ দেখতে পেলেন না কেউ।


-"ঠিক আছে, আমি ভিতরে যাচ্ছি। আপনি দরজাটি খুলুন অফিসার।"


এই কথায় একটু উশখুশ করতে লাগলেন অফিসার, তার সঙ্গে থাকা গার্ডরাও একটু দোনামোনা করতে লাগলেন কথাটি শুনে। সকলের দিকে তাকিয়ে একটু অবাক হলেন প্রৌঢ়; তারপর পুনরায় অফিসারের দিকে তাকিয়ে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন-


-"কি হল...কোন সমস্যা?"


এই প্রশ্নে একটু থতমত খেয়ে মাথা চুলকে অফিসারটি বললেন-


-"আপনার কাছে ক্লিয়ারেন্স আছে স্যার, তাই আইনত আমি আপনাকে এই ব্যাপারে আটকাতে পারি না...কিন্তু আমার মনে হয় এই রোগীর মধ্যে কিছু একটি অতি-মানবীয় শক্তি রয়েছে; আমরা সকলেই আঁচ করেছি ব্যাপারটি-"


বাকি দুজন গার্ডকেও দেখা গেল এই কথায় ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাতে। তিনজনের দিকে পর্যায়ক্রমে একবার তাকালেন প্রৌঢ়, তারপর অফিসারের দিকে তাকিয়ে তিনি প্রশ্ন করলেন-


-"কিরকম 'অতি-মানবীয়' শক্তি বলুন তো?"


-"আমাদের একজন গার্ড দুদিন আগে এনার রুম পরিষ্কার করতে যায়, বুঝতেই পারছেন, এঁনার রুমে আমরা সেরকম ভাবে কেউই ঢুকি না; যাই হোক, কাজ সেরে যখন গার্ডটি বাইরে বেরিয়ে আসে, তখন তার মুখ দেখে আমাদের অন্য একজন গার্ডের সন্দেহ হয়। কিরকম যেন উদ্ভ্রান্ত, বিহ্বল সেই মুখ! এতটাই আনমনা ছিল সে যে দরজাটা লক পর্যন্ত করে নি ও, সোজা হেঁটে বেরিয়ে যায় সে বাইরে। দরজাটা তাড়াতাড়ি লক করে দ্বিতীয় গার্ড তাকে অনুসরণ করে বাথরুমে গিয়ে দেখে...মানে...ওর সামনেই ঐ গার্ডটি পুরো এক বোতল অ্যাসিড ঢকঢক করে খেয়ে ফেলে!"


আসবার আগেই এই অ্যাসাইলামটিতে একজন গার্ডের রহস্যমৃত্যুর বিষয়টি কানে গিয়েছিল প্রৌঢ়ের, তাই বোধহয় তিনি অতটা চমকালেন না। শান্তস্বরে তিনি জিজ্ঞেস করলেন-


-"আপনি একজন সরকারি অফিসার হয়ে এই ধরণের 'অতি-মানবীয়' তত্ত্বে বিশ্বাস করেন?"


-"চঞ্চল খুব হাসি-খুশি লোক ছিল, ও এরকম আমকা সুইসাইড করতেই পারে না! এর আগের পাগলখানা থেকেও আমরা কিছু রিপোর্ট পেয়েছি স্যার...ওর কাছে সকলেই যেতে অস্বস্তি পেত। কিরকম যেন একটা চাপা ভয়...যেন একটা আলগা আতঙ্ক চেপে বসত সবার গলায়- ঐ জন্যই ও এখানে আসবার পর আমি আর কোন ঝুঁকি নিই নি, ওকে একদম আলাদা এই সেলটিতে রেখেছি...সকলের থেকে আলাদা।"


-"আমি ঢুকে যাওয়ার পর আপনারা দরজাটি চেপে লক করে দেবেন। দরজার বাইরে আপনাদের দুজন গার্ডকে রাখুন, দরকার পড়লেই আমি ওদের ডেকে নেব। ভয় নেই-"


একটি স্মিত হাসি হেসে দরজা সামান্য ফাঁক করে ভিতরে ঢুকে গেলেন প্রৌঢ় ভদ্রলোকটি। বাইরে থেকে দরজাটি বন্ধ করে উপস্থিত গার্ডদের সেখানে দাঁড়াতে বলে নিজের অফিসের দিকে হাঁটা লাগালেন অফিসারটি।


==================================================================================================


-"নমষ্কার, প্রফেসর সোম! আমি পূর্ণেন্দু সমাদ্দার, ভারত সরকারের মনস্তত্ব দপ্তরে 'রিসার্চ' বিভাগে কাজ করি। আপনার কেসটিকে স্টাডি করার জন্য আমাকে পাঠানো হয়েছে আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্য।"


নিষ্পৃহ মুখে তার দিকে স্থিরভাবে তাকিয়ে রইলেন 'প্রফেসর সোম' নামক বৃদ্ধ আবাসিকটি। সপ্রতিভ হাসি হেসে তার দিকে তাকিয়ে পরের কথাটি বললেন পূর্ণেন্দু-


-"আমি আপনার কাছে এসেছি আপনার শেষ প্রোজেক্টটি নিয়ে কথা বলবার জন্য; পুরো বিষয়টি নিয়ে এত রহস্য তৈরি হয়েছে-"


-"আমি আপনাকে কিছু বলতে যাব কেন বিষয়টি নিয়ে?"


একটু জেদী, একগুঁয়ে ভঙ্গীতে কথাগুলি বললেন সোম নামক বৃদ্ধ আবাসিকটি। তার কথার মধ্যে একটু ঔদ্ধত্যও ছিল। কিছুটা আহত হলেন পূর্ণেন্দুবাবু, ভদ্রলোকের কথায়। তা চেপে রেখে আবার সপ্রতিভভাবে তিনি প্রোফেসর সোমকে নিষ্পৃহ গলায় বললেন-


-"আপনি উত্তর দিতে না চাইলে দেবেন না, কিন্তু এটাও জেনে রাখুন- আপনার এই কেসটিকে কেন্দ্রীয় সরকার বন্ধ করে দিয়েছে; ভবিষ্যতে আপনার কাছে এরকম প্রশ্ন নিয়ে আর কেউ আসবে না; বাকি জীবনটি আপনার কাটবে সরকারের নজরদারীর মধ্যে, হয়তো এরকমই কোন 'সেল'-এ বসে!"


কৌতুকমিশ্রিত মুখে প্রফেসর সোম খানিকক্ষণ চেয়ে থাকলেন পূর্ণেন্দুবাবুর মুখের দিকে; একটি আলগা হাসি লেগেছিল তার ঠোঁটের গোড়ায়। কথা শেষ হতে তিনি বললেন-


-"যদি ভারত সরকার আমার বিষয়ে নীরবই থাকতে চান, তবে তারা আপনাকে আমার কাছে পাঠালেন কেন?"


-"ধরে নিন, এটাই আপনাকে দেওয়া শেষ সুযোগ।"


এ কথায় দুই-এক সেকেণ্ড মাথা নামিয়ে কিছু একটা ভেবে নিলেন বৃদ্ধ; এই সুযোগে তাকে একটু ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে নিলেন পূর্ণেন্দুবাবু। একটি ব্যাপারে একটু সন্দেহ হয়েছিল তার মনে- এই বৃদ্ধের বয়সের তুলনায় এর চামড়া যেন অনেক টান টান, এরকমটা হল কি করে? যাই হোক, বিষয়টা নিয়ে আর বেশি ভাবলেন না তিনি। এবারে প্রোফেসর সোম মুখ তুলে বললেন-


-"বেশ। আপনি যখন আগ বাড়িয়ে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন, তখন না হয় আপনার কথা থাক! বলুন, আপনার কি জিজ্ঞাস্য।"


-"আপনাদের শেষ প্রোজেক্টটি...ওটা কি নিয়ে ছিল?"


-"সংক্ষেপে বলা যেতে পারে- রামায়ণে বর্ণিত মহারাজ রাবণের মাথার মুকুট উদ্ধার-"


-"বুঝলাম না। 'রামায়ণ' তো একটি পুরাণ, অলৌকিক কাহিনি; সেখানে বর্ণিত মহারাজ রাবণও তো কাল্পনিকই হবে। তাহলে সেই কাল্পনিক রাজার মুকুট উদ্ধার করতে আপনারা আসরে নামলেন কি ভাবে-"


-" 'পুরাণ' তো আমাদের, অর্থাৎ মানুষদের কাছে; যেহেতু এই গল্পগুলিতে কোন সাল-তামামি নেই তাই এই ঘটনাগুলিকে আমরা পুরাণ বলি। কিন্তু এটা যদি এমন কোন সময়ের বর্ণনা হয়, যে সময় আমরা 'সময়' শব্দটিকেই জানতাম না, তবে?"


-"বেশ তো!"- মনে মনে একটু বিরক্ত হলেন পূর্ণেন্দুবাবু এই অহেতুক সময় নষ্টে - "ধরে নিচ্ছি এটি বাস্তবিক সত্য, কিন্তু তাও, হঠাৎ এরকম বেয়াড়া খোঁজ কেন? কি রয়েছে এই মুকুটে?"


-"এই মহাকাব্যটিকে আপনি কতটা চেনেন?"


-"এক্সকিউজ মি?"


প্রফেসর সোমের এই হঠাৎ-প্রশ্নে দৃশ্যতই একটু বিরক্ত মনে হল পূর্ণেন্দুবাবুকে; এরকম বেয়াড়া প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে এরকমটা ভাবতে পারেন নি তিনি। এই বিরক্তিটাই প্রতি-প্রশ্নের আকারে বেরিয়ে এল তার মুখ দিয়ে। বৃদ্ধ প্রফেসরও যেন বুঝতে পারলেন তার এই প্রশ্নে একটু বিরক্ত হয়েছেন পূর্ণেন্দুবাবু, এর পরের নরম গলায় বলা কথাগুলি শুনে অন্তত তাই মনে হল-


-"সরি...আসলে ভারতীয় হিসেবে আমরা মনে করি যে মহাকাব্যগুলি আমরা পুরোটা বুঝি, কিন্তু বাস্তবে তা অসম্পূর্ণ সত্য! শুধু ভারতেই 'রামায়ণ'-এর অসংখ্য উপাখ্যান ছড়িয়ে রয়েছে; তার বয়ান ভিন্ন, গল্পের মূল বিষয়টি বাদ দিলে উপস্থাপনা ভিন্ন। কিন্তু একটি বিষয় এক- তর্কাতীতভাবে নিঃসন্দেহে বলা যায় যে ঘটনাগুলি এখানে বিবৃত হয়েছে, তা মানবসভ্যতার আগের কোন উন্নত প্রাণীদের উপাখ্যান যারা আমাদের আগে পৃথিবীতে এসেছিল-"


-"সহমত হলাম না। 'রাক্ষস' ও 'দানব' বলতে তো এখানে অনার্যদের বোঝানো হয়েছে, তাহলে এর মধ্যে পূর্বতন অপর কোন সভ্যতা...মাফ করবেন প্রফেসর, আমার মনে হয় আমরা মূল বিষয়টি থেকে ক্রমশঃ দূরে সরে যাচ্ছি; এত কিছু থাকতে হঠাৎ করে রাজমুকুটের প্রসঙ্গ কেন?"


এ কথায় একটু স্থির হয়ে বসলেন প্রফেসর সোম; তারপর তিনি বললেন-


-"রাম-রাবণের যুদ্ধের শেষে রাবণ মারা যাওয়ার পর ভগবন্ রাম তাঁর দেহটিকে প্রত্যার্পণ করেন বিভীষণের হাতে, তাঁর অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়ার জন্য। কিন্তু অপর একটি উপাখ্যান থেকে জানা যায় যে বিভীষণ তাঁর অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া করেন নি! নাগলোক থেকে নাগেরা এসে রাবণের মরদেহ নিজেদের দেশ পাতাললোকে নিয়ে যান। তাদের মধ্যে একটি বিশ্বাস কাজ করত যে রাবণ মারা যান নি, তাঁর পবিত্র আত্মা তাঁর নশ্বর দেহ কিছুদিনের জন্য ছেড়ে চলে গিয়েছে বটে, কিন্তু তা আবার ফিরে আসবে সেখানে। নাগেরা বেশ কয়েকবার চেষ্টা করে তাঁকে পুনরুজ্জীবিত করবার, কিন্তু বিফল মনোরথ হয়ে অবশেষে তাঁর দেহটিকে ভালো করে মমিকৃত করে সমাধিস্থ করে কোন একটি ক্ষেত্রে-"


-"দয়া করে শ্রীলঙ্কার কথা বলবেন না-"


-"ওটি একটি আইওয়াশ! মূল বিষয় থেকে নজর ঘুরিয়ে দেওয়ার একটি ধোঁকার টাঁটি! রাবণের দেহকে সমাধিস্থ করা হয় পাতাললোকে, নাগেদের নিজেদের দেশে-"


-"হ্যাঁ, কিন্তু তার অর্থটা কি দাঁড়ায়? তাহলে কি এবার মাটি খুঁড়ে-"


হঠাৎ একটি বিকল্প সম্ভাবনা খেলে গেল পূর্ণেন্দুবাবুর মাথায়, সেইজন্যই চুপ করে গেলেন তিনি। তার কাছে আসা রেকর্ড অনুসারে, প্রোফেসর সোম ও তার টিম একত্রে শেষ গিয়েছিলেন ইকুয়েডর; সেখানেই পুরো দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটি ঘটে। তবে কি 'পাতাললোক' বলতে এখানে-


-"আপনি ঠিকই অনুমান করেছেন পূর্ণেন্দুবাবু!" - প্রফেসর সোমের গলার আওয়াজে চিন্তাসূত্র ছিঁড়ে যায় পূর্ণেন্দুবাবুর - "আমার বন্ধু, প্রয়াত ডঃ বিনায়ক রেড্ডি তাঁর জীবনের একটা মূল্যবান সময় ব্যয় করে রামায়ণের সবকটি তথ্যপ্রমাণকে খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করে পুরো ঘটনাটির একটি বিশ্বাসযোগ্য সময়কাল নির্ণয় করতে সমর্থ হয়েছিলেন। এই আবিষ্কার তিনি পণ্ডিতমহলে জানান, কিন্তু তারা এই মূল্যবান খোঁজটিকে 'অর্থহীন' বলে উড়িয়ে দিয়ে তাকে পাগল প্রতিপন্ন করে গরাদের পিছনে ঢুকিয়ে দেন-"


-"সে কি...কিন্তু কেন?"


-"ভয়! এ নিয়ে আর না হয় কথা নাই বাড়ালেন! 'যে দেশে আপনার ফলন, সে দেশেই আমার চলন'-"


একটি স্মিত হাস্য হেসে বুঝিয়ে দিলেন প্রফেসর, এ নিয়ে মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন!


-"সে তো বুঝলাম; কিন্তু হঠাৎ আপনারা ইকুয়েডরই বা গেলেন কেন? ওখানে কি ছিল?"


-"রেড্ডি আমার সুবিশেষ বন্ধু ছিলেন; আমি ওনার সঙ্গে দেখা করতে যাই মানসিক হাসপাতালে। সেখানে উনি আমাকে বিশদে বুঝিয়ে বলেন কেন ইকুয়েডরের চিরহরিৎ অরণ্যের দূর্গম অঞ্চলের অজ্ঞাত কোন গুহায় তা থাকা উচিৎ। পূর্ণেন্দুবাবু, রাবণকে নাগেরা যখন মমিকৃত করে সমাধিস্থ করে, তাঁর অস্ত্রশস্ত্র, তাঁর বসন ও রক্ষাকবচ, তাঁর অলংকারের সঙ্গে তাঁর মাথার মুকুটটিও ঐ একই আধারে রাখা হয়! আর তার সঙ্গে রাখা হয় একটি লিপি, যাতে ঐ মুকুটের গুরুত্ব ও কর্মপ্রণালী লিখে রাখা হয়েছিল। আর ইকুয়েডর কেন? রেড্ডি নিজে বিভিন্ন উপাখ্যানকে বিশ্লেষণ করে 'পাতাললোক'-এর সঠিক ভৌগোলিক অবস্থান নির্ণয় করে ঐ অঞ্চলের বিভিন্ন গুহায় খোঁজ চালান; তিনি সঠিক গুহাটি চিহ্নিত করতে পারেন নি বটে, কিন্তু ঐ অঞ্চলে প্রাপ্ত কয়েকটি তাম্রফলক ও শিলালিপি থেকে ভারত ও ল্যাটিন আমেরিকার যোগসূত্রগুলি তিনি পরিষ্কার ধরতে পারেন! পূর্ণেন্দুবাবু, ঐ ফলক বা শিলালিপিগুলি সবই খরোষ্ঠী ভাষায় লেখা ছিল; বিভিন্ন ভারতীয় মন্ত্র-তন্ত্রের স্তোত্র, ঘটনা, কোন রাজার প্রশস্তি; এর থেকে বোঝা যায় যে আমাদের পুরাণে 'পাতাললোক'-এর যে উল্লেখ রয়েছে, তা এইসব দেশগুলিরই উল্লেখ! রেড্ডী সঠিক জায়গাটি খুঁজে পায় নি বটে, কিন্তু আমি ভাগ্যবান- ওর রিসার্চের ওপর ভিত্তি করে আমি বেশ কয়েকবার ভুল দিকে চালিত হয়েও শেষমেষ সেটি চিহ্নিত করতে সমর্থ হই।"


-"এর অর্থ- মুকুটটি আপনারা খুঁজে পেয়েছেন?"


-"হ্যাঁ! কিন্তু তারপরই সেই দুঃখজনক ঘটনাটি ঘটে!"


-"জানি! আপনাদের অ্যানালিস্ট শঙ্কর হঠাৎ খেপে ওঠে এবং আপনাদের দলের সকলকে মেরে দেয়; আপনাকে বাদে! তারপর সে নিজেই নিজের গলায় ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যা করে! ও যে ছুরি নিয়ে আপনাকেও তাড়া করেছিল তা আপনাদের দলের গাইডরা সকলেই স্বচক্ষে দেখেছে এবং প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আলাদা আলাদাভাবে সেই সাক্ষ্যপ্রমাণই দিয়েছে। অন্যান্য মৃতদেহগুলিতেও শঙ্করেরই হাতের ছাপ পাওয়া গিয়েছে। তাই ঐ যে খুনগুলি করেছে এ বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশই নেই!"


-"শঙ্কর অত্যন্ত ভালো লোক ছিল, ও যে হঠাৎ করে এই কাজ করল কেন তা ঠিক বোঝা গেল না; কিন্তু আমার অবস্থা দেখুন, এই ভয়ংকর ও নারকীয় হত্যা দেখবার পর স্বদেশে ফিরেই আমাকেও কিনা 'পাগল' বলে আপনারা গরাদের পিছনে ঠেলে দিলেন-"


-"আমি এখানে কতগুলি ফাঁক পূরণ করতে এসেছিলাম, প্রোফেসর; সত্য-মিথ্যা নির্ণয়ের বিষয়টি না হয় কোর্টের জন্য তোলা থাক? আপনাকে কয়েকটি প্রশ্ন করব, আশা করি সঠিক উত্তর দেবেন-"


-"করুন!"


-"আপনাদের গাইডদলের প্রধান পুয়ের্তো তার জবানবন্দীতে একটু ভিন্ন কথা বলেছেন; তিনি কিছুসময়ের জন্য ভিতরে আপনাদের সঙ্গে ছিলেন, পরে অবশ্য তিনি বেরিয়ে আসেন...উনি বলেছেন যে একটি বিরাট সারকোফেগাস আপনারা উদ্ধার করেন, সেটিকে খোলা হয়, এবং সেখান থেকে অন্যান্য জিনিষের সঙ্গে একটি মুকুট উদ্ধারও হয়। এই মুকুটটি আপনি সকলের অলক্ষ্যে কিছুসময়ের জন্য নাকি মাথায় দেন, পুয়ের্তো আপনাকে দেখছেন এ কথা বুঝতে পেরে আপনিই নাকি ওকে নির্দেশ দেন বাইরে অপেক্ষা করতে- এ কথা কি সত্যি?"


-"পুয়ের্তোর চোখে সারকোফ্যাগাস খোলবার পরে যে চাউনিটা ছিল তাতে লোভ দেখেছিলাম; বিদেশ-বিভুঁইয়ে এসে ঘন জঙ্গলের একেবারে মধ্যিখানে সোনা-দানার লোভে যদি এবার রক্ষকই ভক্ষক হয়ে যায়- এই আশংকায় ওকে আমি চলে যেতে বলি।"


-"অথচ আপনার জবানবন্দীতে আপনি একথার উল্লেখ করেন নি-"


-"আমি এই সামান্য ঘটনা উল্লেখের কোন প্রয়োজন দেখতে পাই নি।"


-"বেশ! আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন- আপনারা এই নারকীয় ঘটনা ঘটবার পর সকলেই জঙ্গল ছেড়ে বেরিয়ে লোকালয়ে আসেন, স্থানীয় থানায় যান, কেস ফাইল করেন, জবানবন্দী দেন। কিন্তু যেটা করলে উপকার হত সেটাই করেন না- স্থানীয় পুলিসকে সাইটে নিয়ে যাওয়া- কারণ আপনারা সকলেই ঐ গুহার রাস্তাটি ভুলে গিয়েছেন! আপনার সহকর্ম্মীরা যে মৃত তা আমাদের মেনে নিতে হয়েছে মূলতঃ আপনাদের জবানবন্দীর ওপর ভিত্তি করে। এরকমটা ঘটল কেন?"


-"ইকুয়েডর ট্রপিক্যাল রেইনফরেস্ট একটা ছোট জায়গা নয়, পূর্ণেন্দুবাবু! ঐ পুরো অঞ্চলে এরকম অজস্র গুহা আছে! আমরা ভেবেছিলাম কাজ শেষে ল্যাণ্ডমার্ক করে রাখব, কিন্তু সময় পাই নি।"


-"বেশ! এবারে শেষ প্রশ্ন- ডঃ রেড্ডির সমালোচক যারা ছিলেন, আপনি দেশে ফেরবার পর সকলেই একে একে রহস্যময়ভাবে মারা যেতে থাকেন! তাদের প্রত্যেকের শরীরে যে ছাপ পাওয়া যায়, তা কার জানেন? ইকুয়েডরে মৃত আপনার প্রাক্তন অ্যানালিস্ট- শঙ্করের!! এ অসম্ভব সম্ভব হল কি করে? আপনি কিছু বলতে পারেন?"


প্রফেসর সোমের চোখদুটিতে এতক্ষণে একটি কৌতুকের আভাষ খেলে গেল; স্থিরভাবে কিছুক্ষণ তিনি তাকিয়ে রইলেন পূর্ণেন্দুবাবুর দিকে, তারপর ধীরে ধীরে রহস্যঘন কন্ঠে তিনি বলে ওঠেন-


-"আপনি জানতে চান, কেমনভাবে তা সম্ভব? আপনি দেখতে চান?"


মন চঞ্চল হয়ে উঠল পূর্ণেন্দু সমাদ্দারের; তবে কি এবার আসল রহস্য থেকে পর্দা উঠতে চলেছে? এবারে কি তবে জানা যাবে রহস্যটা কি? উত্তেজিত হয়ে আলগোছে একবার ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বললেন তিনি, তাতে উত্তরে প্রফেসর সোম বললেন-


-"বেশ। আমার দিকে একবার সোজা তাকিয়ে দেখুন তো!"


প্রফেসর সোমের চোখের দিকে সোজা তাকাতেই যেন একবার বিদ্যুৎ খেলে গেল পূর্ণেন্দুবাবুর সারা শরীরে; একবার চমকে উঠেই স্থির হয়ে গেলেন তিনি! আস্তে আস্তে ঘোলাটে হয়ে যেতে লাগল তার চোখমুখ, বিশ্বচরাচর ক্রমশঃ ঝাপসা হয়ে মিলিয়ে যেতে লাগল তার চোখের সামনে থেকে; একটা সময় পরে তার মনে হল তাকে ঘিরে একরাশ অন্ধকার, আর সেই অন্ধকারের মধ্যে সামনে শুধু দেখতে পেলেন তিনি- সামনেই দাঁড়িয়ে প্রফেসর সোম!


-"পূর্ণেন্দুবাবু, আপনি আমাকে দেখতে পাচ্ছেন?"


-"হ্যাঁ! আমরা এখন কোথায়?"


-"স্বপ্নলোকে। আপনি আমি দুজনেই। এটিই আমাদের মধ্যে শেষ কথোপকথন, এর পরে আমাদের মধ্যে আর কোন কথা হবে না। আপনার সব প্রশ্নের উত্তর আপনি পাবেন, তাই...মন দিয়ে শুনুন।


রাবণের মুকুটটি নিছক একটা 'ঐতিহাসিক নিদর্শন' ছিল না, বরং সেটি ছিল এক বিলুপ্ত, উন্নত প্রজাতির বৈজ্ঞানিক কারিকুরির শেষ নিদর্শন। নাগেদের রেখে যাওয়া লিপিটি অত্যন্ত প্রাচীন কোন এক ভাষায় লেখা ছিল, যার সঙ্গে কিছুটা সাদৃশ্য ছিল একেবারে প্রথম যুগের 'দেবনাগরী' ভাষার। আমিও সিংহভাগ পাঠোদ্ধার করতে পারি নি, কিন্তু এইটুকুনি বুঝেছিলাম- 'যে ব্যক্তি ঐ মুকুট পরিধান করবে, তার মধ্যে রাবণ পুনরুজ্জীবিত হবেন'।


প্রথমবার আমি বিষয়টি বুঝতে পারি নি, অবাক হয়ে ঐ মুকুটটি নাড়াচাড়া করছিলাম, মাথার ওপরে তুলে মুকুটের ভিতরটা দেখছিলাম; সেই সময়তেই পুয়ের্তো আমায় দেখে ফেলে! আমার মনে হয়েছিল ওর উদ্দেশ্য ভালো নয়, যে কারণে ওকে তৎক্ষণাৎ বাইরে অপেক্ষা করতে বলি। এই অবধি বিষয়টি ঠিক ছিল, আমি কাজ করছিলাম 'আমি' হিসেবেই, অর্থাৎ তখনও আমি প্রফেসর অনির্বাণ সোম, ভারত সরকারের পুরাতত্ত্ব বিভাগের অভিযাত্রী দলের প্রধান এবং প্রাচীন ভাষার বিষয়ে বিশেষজ্ঞ!


গণ্ডগোল বাঁধল কিছুক্ষণ পরেই। রাবণের স্মৃতিবিজড়িত এই মুকুটটি কৌতুহলবশতঃ একবার মাথায় দিতেই যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল সারাটা শরীরে; আমার ঘাড়ের কাছে একটি তীব্র ব্যথা অনুভব করলাম, ধীরে ধীরে সেই ব্যথা ছড়িয়ে পড়তে লাগল সারাটা মাথা জুড়ে! চেষ্টা করলাম মুকুটটা খুলে ফেলতে, কিন্তু পারলাম না! অত চওড়া, বড় মুকুটটা আমার মাথায় এরকম শক্ত হয়ে এঁটে বসে রইল কেমনভাবে কে জানে! গলা দিয়েও সাহায্যের জন্য কোন চিৎকারও তখন আমার বেরোতে পারে নি, এত অসহ্য ছিল সেই যন্ত্রণা! তারপর...অনেকগুলি দৃশ্য যেন সিনেমার স্লাইড শো-এর মত পরপর চলে গেল আমার চোখের সামনে দিয়ে! বিচিত্র সব লোকজন, বিচিত্র পোশাক, বিচিত্র সব আওয়াজ, অদ্ভুত সব ঘটনা!!


বেশ কিছুক্ষণ এভাবে চলতে চলতে ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে এল; তারপর মাথার মুকুটটি আলগা হয়ে আসতেই আমি একটানে সেটিকে খুলে ফেলে দিলাম মাটিতে। তারপর সামনে তাকিয়ে দেখি- অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে- শঙ্কর, আর তার পিছনে আমার অভিযাত্রী দলের বাকি সদস্যরা! বুঝলাম, ভিতরে গণ্ডগোল দেখে ঐ ডেকে এনেছে বাকিদের। গাইডের গোটা দলটি অবশ্য গুহার বাইরেই ছিল।


রাবণের এই মুকুটটিতে অতি-মানবীয় শক্তি আছে। খুব সম্ভবত আমাদের থেকে উন্নত মস্তিষ্কের প্রাণী হওয়াতে ওরা ওদের মস্তিষ্কের একটি বৃহত্তর অংশকে কাজে লাগাতে পারত। পরে যা বুঝেছি- ওরা একটি ছোট চিপ-এর মধ্যে রাবণের স্মৃতিগুলি এবং কিছু ডি.এন.এ বা আরও কিছু অতি-আবশ্যকীয় দেহ-উপাদান ভরে রাখে, যা অন্য কোন উন্নততর প্রাণী পরিধান করলে তার শরীরে এই গুরুত্বপূর্ণ দেহকোষগুলি মিশে যায়, ফলে সেই প্রাণী তখন নিজেই 'রাবণ' হয়ে ওঠে! আমার ঘাড়ের কাছে এই ছোট ফুটোটি দেখেছেন?"


আঙুল দিয়ে নিজের ঘাড়ের কাছে একটি ছোট গর্ত দেখালেন প্রফেসর সোম- পাঁচ টাকার কয়েনের মত ছোট সেই গর্ত। আবার পূর্ণেন্দুবাবুর দিকে ফিরে তিনি বললেন-


-"শঙ্কর এই ধরণের অভিযানে একটি ছুরি নিত ওর সঙ্গে এ কথা আমি জানতাম। আমার মস্তিষ্ক তখন অন্যকে সম্মোহনে সক্ষম একথাও আমি বুঝতে পেরেছিলাম, তাই প্রথমেই ওকে সম্মোহন করি। ঐ অবস্থায় ও আমারই নির্দেশে ওখানে উপস্থিত বাকি সকলকে হত্যা করে! চিৎকার শুনে বাইরে থেকে গাইডরা ভিতরে আসে, কিন্তু রক্তাক্ত ছুরি নিয়ে শঙ্কর ওদের তাড়া করলে ওরা পালিয়ে যায়। পরে যখন ওরা ফিরে আসে...ততক্ষণে শঙ্কর নিজের গলায় ছুরি চালিয়ে দিয়েছে...আমারই নির্দেশে-"


-"কিন্তু...নিজের নিরীহ সহকর্ম্মীদের এভাবে আপনি..."- স্বপ্নের মধ্যেই হতবিহ্বল হয়ে পূর্ণেন্দুবাবু জিজ্ঞেস করে ওঠেন; এর উত্তরে ঝাঁঝালো গলায় প্রফেসর সোম বলে ওঠেন-


-"'নিরীহ'? কে নিরীহ, পূর্ণেন্দুবাবু? আমার ঐ 'পণ্ডিত' সহকর্ম্মীরা ডঃ রেড্ডির যে আবিষ্কারটিকে নিয়ে প্রকাশ্যে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করল, ঠাট্টা করল, পাগল ঠাউরে পাগলা-গারদে ঢুকিয়ে দিল, অতবড় সম্মানের চাকরিটা থেকে বের পর্যন্ত করে দিল- সেই আবিষ্কারে যখন সাফল্য এল তো ওমনিতে নিজেদের কৃতিত্ব বলে সেটাকে প্রচার করতে চাইল? ওরা ঐ দিনকে ঐ গুহায় পাশের ঘরে ঢুকে একজোট হয়ে কি করছিল জানেন? 'কালনেমির লঙ্কাভাগ' চলছিল তখন- কে কত শতাংশ কৃতিত্বের দাবীদার! ডঃ রেড্ডি পাগলখানার বন্দী জীবন কিন্তু বেশিদিন মানতে পারেন নি, শোচনীয়ভাবে উনি আত্মহত্যা করেন, পূর্ণেন্দুবাবু! আপনি দেখেছেন সেই দেহ? গলার নলি আধখানা- ছুরিটা যে ও কোথা থেকে জোগাড় করেছিল কে জানে? ঐ শঙ্করও গিয়ে জুটেছিল ওদের দলে-"


-"যে লোকগুলিকে আপনি খুন করেন...ডঃ রেড্ডির সমালোচকদের কথা বলছি...শঙ্করের হাতের ছাপ সেই শরীরগুলির মধ্যে চলে আসে কি করে? সে তো তার অনেক আগেই-"


-"রাবণের মুকুটের প্রবল সম্মোহনশক্তি ছাড়াও একটি বড় গুণ- অন্য কোন দেহ থেকে নিজের পোষক দেহটির প্রয়োজনীয় দেহকোষ ট্রান্সপ্ল্যান্ট করে নেওয়া, আর প্রক্রিয়াটিও সহজ! আপনাকে শুধু দুহাত দিয়ে অপর দেহটির দুটি হাত ধরতে হবে! প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু গাইডরা ফেরৎ চলে আসায়-"


-"সকলে জঙ্গলের রাস্তা ভুলে গিয়েছিল কি করে? মাস-হিপ্নোটিজম্?"


ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালেন প্রফেসর সোম। একটি মৃদু হাসি লেগেছিল তার মুখে।


-"একটি শেষ প্রশ্ন- আপনার কথা শুনে বুঝতে পারছি যে কেবলমাত্র দোষ যারা করেছে, আপনি ধরে ধরে কেবল তাদেরই শাস্তি দিয়েছেন; তাহলে ঐ গার্ডটি কি দোষ করল যাকে আপনি আত্মহত্যা করতে বাধ্য করলেন?"- জিজ্ঞেস করলেন পূর্ণেন্দুবাবু।


-"আপনাদের 'মন' ও 'স্মৃতি' বিষয়টি আমার কাছে খোলা বইয়ের মত, যার প্রতিটি পাতা আমি দেখতে পাই। ছাগলগুলো আমার কাছে আসতে ভয় পায়; আমি যদি নৃশংস খুনী হতাম তবে প্রথমদিনই আমি সবাইকে মেরে ফেলতে পারতাম...যাই হোক, চঞ্চলের কিন্তু একটি কলঙ্কময় অতীত ছিল। এক অল্পবয়ষ্কা পাগল মেয়েকে কয়েকদিনের জন্য আমার এই সেলটিতে রাখা হয়েছিল...প্রায় দুবছর আগের ঘটনা। এই চঞ্চল ঐ মেয়েটিকে প্রতিদিন রাতে খাবার দিতে এসে নির্বিচারে ধর্ষণ করত...শেষে একদিন মেয়েটি আত্মহত্যা করে, বাথরুমে রাখা অ্যাসিডের বোতল নিষ্কৃতি দিয়েছিল অবলা মেয়েটিকে! এই ইউনিফর্মগুলো! এরা ভাবে এদের ইউনিফর্ম শেষ বিচার থেকে এদের অনাক্রম রাখে, কিন্তু... চঞ্চলকে বিশেষ কিছু বলতে হয় নি, আমার ঘরের কাজ শেষ হওয়ার পর ওকে শুধু ওর অতীতটা একবার দেখাতেই- তবে আপনার বেলায় আমাকে একটু নিয়ম ভাঙতে হবে, পূর্ণেন্দুবাবু! ভয় নেই, আপনার কোন অন্ধকার অতীত নেই বলে আপনাকে প্রাণে মারব না-"


-"ম-মানে?"- ভয়ে তুতলিয়ে উঠে জিজ্ঞাসা করলেন পূর্ণেন্দুবাবু। উত্তরে আশ্চর্যজনকভাবে শান্ত স্বরে প্রফেসর সোম বললেন...মনে হল যেন অন্য কেউ কথা বলছেন তার ভিতর থেকে-


-"এই পাগলা-গারদে বন্দী অবস্থায় আমি আমার আরাধ্য কাজ করতে পারব না, এখান থেকে আমায় বেরোতে হবে। কিন্তু...কিভাবে? আপনিই হবেন আমার পাসপোর্ট! যে মহাজাগতিক চক্রান্ত চলছে বর্তমান বিশ্ব জুড়ে, সময় হয়েছে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের। আপনার দেহটিই হোক সেই প্রতিবাদের চাবিকাঠি-"


"'মহাজাগতিক চক্রান্ত'? 'প্রতিবাদ'! এ সব কি বলছেন প্রফেসর সোম? ভয় পেয়ে গেল পূর্ণেন্দুবাবুর 'চেতনা', আকুল গলায় জিজ্ঞাসা করলেন তিনি-


-"আপনার উদ্দেশ্যটা কি?"


কোন কথা না বলে একবার স্মিতহাস্য হাসলেন প্রফেসর সোম; তারপর ধীরে অন্ধকারে মিলিয়ে যেতে লাগল তার দেহ...


===========================================================================================


আবার চেতনা ফিরে এল পূর্ণেন্দুবাবুর। বিছানায় শোওয়া ছিলেন তিনি, এবার ধীরে ধীরে উঠে বসতে গিয়ে নিজের হাতের দিকে চোখ গেল তার। এ কি? তার হাতদুটির এরকম অবস্থা হল কি করে, এরকম চামড়া-কুঁচকোনো ছিল না তো তার হাত? আর তার পরণের পোশাক? তিনি পাগলা-গারদের আবাসিকদের জামাকাপড় পড়ে রয়েছেন কেন? এবার সামনে চোখ গেল তার, চোখ গোলগোল করে বিষ্ময়ে সামনের দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি।


এ কে?


সামনেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যে ব্যক্তিটি নিজেকে দেখছিলেন...এ তো পূর্ণেন্দুবাবু স্বয়ং! এই পোশাকটাই তো তিনি পড়েছিলেন, আর এই হাতে সেই লাল ব্রীফকেস! সবই ঠিক আছে, শুধু যেন শরীরটা বদলে গিয়েছে!


প্রফেসর সোম এখন পূর্ণেন্দুবাবু, আর পূর্ণেন্দুবাবু এখন-


তার দিকে একবার তাকিয়ে মৃদু হেসে দরজার দিকে এগোলেন পূর্ণেন্দু সমাদ্দাররূপী প্রফেসর সোম; আর তাকে পালাতে দেখে গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি- কিন্তু...কোন লাভ হল না! দেখা গেল, তার ঘাড়ের পিছনে একটি পাঁচটাকার কয়েনের সাইজের গর্ত্ত!


দরজায় আওয়াজ করতেই দরজাটা খুলে গেল; খাটে শোয়া পূর্ণেন্দুবাবু শুনতে পেলেন দরজার বাইরে তার নিজের মৃদু গলার আওয়াজ-


-"সরি একটু লেট হয়ে গেল; পেশেন্ট কিন্তু ঠিক আছে, কোন অসুবিধা নেই। আপনারা মিছেই ভয় পাচ্ছিলেন..."


গলার আওয়াজ ক্রমশঃ মিলিয়ে যেতে লাগল দূরে। এতক্ষণে চরম একটি আতঙ্ক চেপে বসল পূর্ণেন্দুবাবুর গলায়; দৌড়ে দরজার কাছে পৌঁছলেন তিনি, স্লাইডারটা খোলাই ছিল, সেই ফাঁক দিয়ে কোনমতে মুখ বাড়িয়ে তিনি জোরে গলা ফাটিয়ে চেঁচালেন-


-"উনি পূর্ণেন্দু সমাদ্দার নন, আমি সেই...উনি প্রফেসর সোম!!!"


কিন্তু আধো অন্ধকারে ঢাকা লম্বা প্যাসেজটি ততক্ষণে ফাঁকা হয়ে গিয়েছে; তার চিৎকার শুনে কেউ এগিয়ে এলেন না সাহায্য করতে। দরজাটা ধরে হতাশ হয়ে আশেপাশে তাকাচ্ছিলেন তিনি, এমন সময় কানে এল বাঁদিকের গরাদ দেওয়া সেলটি থেকে লক-ডাউনে মাথা খারাপ হয়ে যাওয়া সেই পাগলটির শান্ত কন্ঠস্বর-


-"আমি কি আপনাকে কোন সাহায্য করতে পারি?"


লম্বা প্যাসেজের মাথায় ঝুলতে থাকা ভুতুড়ে হলুদ আলোর বাল্বগুলি তখন মৃদু দুলতে আরম্ভ করেছে হাওয়ায়....

=============================================================================



Rate this content
Log in

More bengali story from Aritra Das

Similar bengali story from Horror