Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

SUBHAM MONDAL

Horror


4.2  

SUBHAM MONDAL

Horror


অভিশপ্ত পেন্টিং

অভিশপ্ত পেন্টিং

6 mins 7.6K 6 mins 7.6K

সিকিমে যাওয়াটা যে এমন স্বপ্নের মতো হবে ভাবতেও পারেনি দেবাশিস। অফিসের চাপ আর একঘেয়েমি কাটাতে দেবাশিস বেড়াতে এসেছে সিকিমে। শিয়ালদা থেকে রাতের দার্জিলিং মেলে সকাল আটটায় নিউ জলপাইগুড়ি আর সেখান থেকে ট্রেকারে সাড়ে পাঁচ ঘন্টায় সিকিমের গ্যাংটক। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে সুন্দর ছবির মতো বাঁকানো রাস্তা,মাঝে মাঝে ব্লু-পাইন আর ফারের গহন অরণ্য, স্থানে স্থানে রডোডেনড্রনে রক্তিম সাজে উঠেছে প্রকৃতিসুন্দরী, এছাড়া মাঝে মাঝে গভীর গিরিখাত আর রঙ বেরঙের ফুলে ভরা মন মাতানো উপত্যকা। কোথাও বা সুদৃশ্য চা বাগিচা,কোথাও আবার চোখ জুড়ানো জলপ্রপাত,আবার কোথাও বা পাইন ফার বার্চের গহন অরণ্য শোনাবে প্রকৃতির স্বর্গীয় সঙ্গীত। দিগন্তরেখায় সবুজ হিমালয় জানান দিচ্ছে পাহাড়ের দেশ চলে এসেছে,তুষারের দেখা পেতেও বেশি দেরি নেই।

ভূগোলে চিরকালই আগ্রহী দেবাশিস। সে জানে সিকিম নামটা এসেছে লিম্বু উপভাষায় 'সু' যার অর্থ নতুন,আর 'খিম' যার অর্থ 'প্রাসাদ'- 'সিকিম' সত্যিই নতুন প্রাসাদ,প্রকৃতির নতুন প্রাসাদ। তিব্বতীরা সিকিমকে বলে 'Drenjong' যার অর্থ 'সবুজ ধানের উপত্যকা'।আবার সিকিমের উল্লেখ রয়েছে প্রাচীন ভারতীয় পুরাণেও। সিকিমকে উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে দেবরাজ ইন্দ্রের মনোরম উদ্যান বা ইন্দ্রকিল হিসাবে।সিকিমের উত্তরেই তো প্রাচীন সভ্যতার পিঠস্থান তিব্বত। তিব্বতকে অনেকে অভিহিত করেন স্বর্গ হিসাবে, সেখানে সিকিমের এরূপ নাম যুক্তিযুক্ত বলেই মনে হয়।

সিকিম মানেই রেড পাণ্ডা, সিকিম মানেই মন মাতানো রডোডেনড্রন আর ব্লাড ফেজান্ট, সিকিম মানেই সুদৃশ্য কাঞ্চনজঙ্ঘার বুক চিরে সূর্যোদয়ের চোখ জুড়ানো অনুপম দৃশ্য,সিকিম মানেই স্বচ্ছ ছাঙ্গু লেক,পাহাড়ের বুকে খেচেওপালরি লেক আর কাঞ্চনজঙ্ঘা ন্যাশনাল পার্ক, সিকিম মানেই নিঝুম শান্তিপূর্ণ বৌদ্ধ মনাস্ট্রি।রুমটেক মনাস্ট্রি তে গিয়ে মন ভরে গিয়েছিল দেবাশিসের। সত্যি যেহেতু সিকিমের উত্তরেই তিব্বত,তাই এই রুমটেক মনাস্ট্রি তে এসে তিব্বতের বজ্রযানী তন্ত্র সম্পর্কে অনেক কিছু জানার সুযোগ রয়েছে। মন মাতানো সংগ্রহশালা, অ্যান্টিক জিনিসে ভরপুর। একদিকে বোধিসত্ত্ব ও তারার মূর্তি,যক্ষীর ভয়ঙ্কর মূর্তি,ধ্যানমগ্ন পদ্মপাণির প্রশান্ত মূর্তি,ভয়ঙ্করী দেবী বজ্রযোগিনী ও একাজটীর মূর্তি ও চিত্র--কি নেই সেখানে! কিন্তু একটা চিত্র দেখে মন ভরে গিয়েছিল দেবাশিসের। অতি বীভৎস এক চিত্র, কিন্তু চিত্রের মধ্যে নাটকীয়তা লক্ষণীয়। এক বীভৎস দানব ধেয়ে আসছে এক সৌম্য বালকের দিকে। কিন্তু বালকের মধ্যে ভয়ের কোনো লক্ষণমাত্র নেই। সে প্রতিরোধ করছে না।

অ্যান্টিক জিনিস নিয়ে দেবাশিসের জ্ঞান প্রচুর। তৈলচিত্র টিকে দেখে মনে হচ্ছে জিনিসটা দু-হাজার বছরের পুরনো হওয়াটাও বিচিত্র নয়, কিন্তু সাধারণ চোখে দেখে তা বোঝা যায় না। ছবিটাতে প্রাচীনতা ও মলিনতার ছাপমাত্র পড়ে নি। কোনো এক অজানা বজ্রযানী মন্ত্রবলে আজও জীবন্ত দেখাচ্ছে ছবিটাকে। যেন ছবিটা থেকে সেই বীভৎস দানব জগতের সমস্ত বিভীষিকা নিয়ে যেকোনো মুহূর্তে বেরিয়ে আসতে পারে। তখন কোনো সাধারণ মানুষের সাধ্যে হয়তো কুলোবেনা সেই দানবকে প্রতিরোধ করার। শরণ নিতে হবে সেই সর্বশক্তিমান পরম করুণাময় ঈশ্বরের। লেপচা গাইডকে ছবিটার কথা বলতেই গাইডের মুখমণ্ডলে খেলে গেল এক অজানা ভয়ের ছায়া। অস্ফুট স্বরে বলে উঠল এক অজানা নাম। শুনে যা বুঝতে পারল দেবাশিস,কথাটা হল "রো-লাঙ"।গাইডের হাবভাব দেখে যা মনে হল অবশ্যই কোনো ভয়ের জিনিসই হবে।


এক লামাকে জিজ্ঞাসা করাতে তিনি যা বললেন ,তাতে দেহে এক শীতল শিহরণ বয়ে গেল দেবাশিসের। তিব্বতী বজ্রযানীদের কাছে এক বিভীষিকা হল 'রোলাঙ'। কোনো মানুষ মারা যাবার পর যদি জীবনকালে কোনো দুষ্কর্ম করে থাকে বা কোনো পার্থিব অভিলাষা অপূর্ণ থাকে,যদি সে পার্থিব মোহ ছেড়ে ভগবান বুদ্ধের চরণে নিজেকে পুরোপুরি সমর্পণ না করতে পারে তখন তার আত্মা মৃত্যুর পরও দেহ ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারে না। মৃত্যুর পরে সেই মৃতদেহে প্রাণ থাকে না,সেই মৃতদেহে অবস্থান করে মৃত ব্যক্তির প্রেতাত্মা। তখন সেই মৃতদেহ অসাধ্য সাধন করতে পারে,আত্মার সাথে সেই দেহও বিকৃত হয়ে যায়,কিছু রোলাঙ আছে যারা বজ্রযানী তান্ত্রিকদের অধীনে থাকে,তাদের আজ্ঞা মেনে চলে,এরা মানুষকে সিদ্ধি বা অভীষ্ট লাভেও সহায়তা করে, আবার কিছু রোলাঙ রয়েছে যারা পুরোপুরি স্বাধীন, জীবদ্দশায় এরা ছিল পথভ্রষ্ট,কেউই বৌদ্ধধর্মের আদর্শকে অনুসরণ করেনি, এদের মধ্যে কেউ কেউ জীবদ্দশায় ছিল শয়তান মারের উপাসক,এরা মানুষের ক্ষতি করতে সক্ষম, এরাই নরমাংসভোজী, অনেকটা রাক্ষসদের মতো, কিন্তু রাক্ষসরা ছিল জীবন্ত, আর এরা মৃতদেহ।মৃতের দেহে অশুদ্ধ আত্মার অবস্থান সৃষ্টি করেছে রোলাঙকে। অতি ভয়ঙ্কর। সবচেয়ে বড়ো কথা,রোলাঙ কাউকে আঁচড়ালে বা কামড়ালে সেও রোলাঙে পরিণত হয়। এ যেন অনেকটা হাইতির জোম্বির মতো!

বলা বাহুল্য,এই ছবিটা রোলাঙের। সবচেয়ে বড়ো কথা,ছবিটা নাকি জীবন্ত। কোনো এক লামা নাকি হাজার বছর আগে তার ওপর আক্রমণকারী এক এই রকমই পিশাচকে নিজের বজ্রযানী মায়াবলে ছবির মধ্যে বন্দি করে রাখেন। যখনই এই ছবি কোনো পবিত্রস্থলে থাকবে,ততক্ষণ সেই নরখাদক পিশাচ ছবিটার থেকে বেরোতে পারবে না।কিন্তু,যখনই সেটা স্থানচ্যুত হবে,পদ্মপাণির থেকে দূরে হবে তখনই সেই পিশাচ আবার শক্তিশালী হয়ে উঠবে। তখন তার মুক্তি স্রেফ সময়ের অপেক্ষা!

এই পর্যন্ত বলে থামলেন বৃদ্ধ লামা। না,এই সব গালগল্পে বিশ্বাস করে না দেবাশিস। তবে বজ্রযানীদের রহস্যের অন্ত নেই।কাছেই নেপালের এক মনাস্ট্রিতে অনন্ত রহস্য নিয়ে সযত্নে রক্ষিত আছে পাহাড়ের আতঙ্ক ইয়েতির মস্তক,আর এখানে এই দুহাজার বছর পুরনো তৈলচিত্র,যাতে একসাথে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে জগতের বিভীষিকা আর পবিত্রতাকে। সত্যিই বাচ্ছাটার মুখমণ্ডলে এতোটুকু ভয় নেই,হাসিটাও কি সুন্দর! যেন জগতের সমস্ত আত্মবিশ্বাস ওর মধ্যে নিহিত রয়েছে।কিন্তু ছেলেটা কে! না এটা তো জিজ্ঞাসা করা হল না। আর সেই অতিবৃদ্ধ লামাই বা কোথায় গেল!

প্রধান লামাকে জিজ্ঞাসা করতে তিনিও একই কথা বললেন। আর সবচেয়ে বড়ো কথা, এই মনাস্ট্রিতে তিনি ছাড়া কেউ আর রহস্যটা জানেই না। তাহলে সেই অতিবৃদ্ধ লামা কে ছিলেন, যিনি হঠাৎই দেবাশিসের সামনে আবির্ভূত হয়ে অদৃশ্য হয়ে গেছিলেন!

যাই হোক, লামা অনেক নিষেধ করেছিলেন ছবিটাকে কোলকাতায় নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে। কিন্তু দেবাশিসের মনে জেদ সাঙ্ঘাতিক। আর এই জেদের বশেই সে কোলকাতায় তার নিজের ফ্ল্যাটে রেখে এনেছে ছবিটাকে। ছবিটা এখন তার বেডরুমেই,অন্যান্য নানা বিরল ও সুদৃশ্য ছবির সাথে শোভা পাচ্ছে। এখনোও অফিসে তিনদিন ছুটি আছে দেবাশিসের।ইচ্ছা আছে এই সপ্তাহেই শনিবার দিন বাড়িতে অফিসের কলিগদের নিয়ে পার্টি দেবে। সেদিনই ছবিটা ড্রয়িংরুমে এনে রাখবে।ওর ড্রয়িংরুমে যেমন সযত্নে রাখা আছে কোভালাম সমুদ্রসৈকতের ছবি,তেমনই সযত্নে রাখা হয়েছে তুষারধবল হিমালয়ের বুকে ইয়েতির পদচিহ্নের ফটোগ্রাফ,লক নেস মনস্টার নেসির কল্পিত ফটোগ্রাফ আর গ্রেট ব্রিটেনের হন্টেড প্লেস টাওয়ার অব লন্ডনের ছবি।


গভীর নিঝুম রাত। ফ্ল্যাটে নিজের বেডরুমে অঘোরে ঘুমিয়ে দেবাশিস। শান্তির নিদ্রা। নীলাভ মৃদু আলোয় চারিদিক মায়াবী বলে মনে হচ্ছে।হঠাৎই ঘুম ভেঙে গেল দেবাশিসের। কিসের যেন এক পচা বোঁটকা গন্ধ চারিদিকে। অনুভব করতে পারছে ঘরে এক অদৃশ্য অজানা আগন্তুকের উষ্ণ শ্বাস।খাটের তলায় কে যেন একটানা চাপা ফোঁসফোস করেই চলেছে।মৃদু নীলাভ আলোকে যেন অপার্থিব বলে মনে হচ্ছে। চারদিকে বিরাজ করছে নরকের এক হিমশীতলতা।অজানা এক আতঙ্কে কুলকুল করে ঘামছে দেবাশিস। 


এই সময়েই দেওয়ালে রাখা পেন্টিংটার দিকে চোখ পড়ল দেবাশিসের।হালকা মৃদু নীলাভ আলোয় পেন্টিংটাকে অপার্থিব বলে মনে হচ্ছে। এক হাড় হিম করা আতঙ্কের শিহরণ বয়ে গেল দেবাশিসের সারা শরীরে। 


তৈলচিত্রতে সবই ঠিক আছে,শুধু বিভীষিকাময় কুৎসিতদর্শন পিশাচ রোলাঙই অনুপস্থিত।আচ্ছা,এই ফ্ল্যাটে তো কোনো ঠাকুর দেবতার ছবি বা মূর্তিও রাখে নি বিজ্ঞানমনস্ক মর্ডার্ন দেবাশিস। তাহলে কি রুমটেক মনাস্ট্রির বৃদ্ধ লামার কথাই সত্যি হতে চলেছে। স্থান -কাল-পাত্রকে নিজের অনুকূলে পেয়ে অভিশপ্ত পেন্টিং থেকে মুক্তি পেয়েছে ভয়াল ভয়ঙ্কর রোলাঙ।চোখের সামনে নিজের মৃত্যুকে দেখতে পারছে দেবাশিস। আর কিছু ভাবতে পারছে না সে,না মাথা আর কাজ করছে না।


মৃত্যুভয় থেকেও দেবাশিসের মনে আরোও এক ভয় গভীর থেকে গভীরতর হয়ে উঠল যখন তার মনে পড়ল,রোলাঙ যদি তাকে আঁচড়ে বা কামড়ে দেয় তাহলে সেও এক রোলাঙ এ পরিণত হবে। এ জীবন যে মৃত্যুর থেকেও অভিশপ্ত। তখন সেও হয়ে যাবে এক জীবন্ত মৃতদেহ। তার আত্মা তখন শয়তানের ক্রীতদাসে পরিণত হবে। না না, এই জীবন বড়োই অভিশপ্ত। এর থেকে যে মৃত্যুও শ্রেয়।


আরে ঐ তো রহস্যময় আলো আঁধারিতে ফুটে উঠেছে রোলাঙ এর অভিশপ্ত চেহারা। যেন পুরাণ ও রূপকথার পাতা থেকে উঠে আসা কোনো ভয়ঙ্কর রাক্ষস। হাতের আঙুলে ধারালো বাঁকালো লম্বা নখর, ভাঁটার মতো জ্বলতে থাকা দুই রক্তবর্ণ চোখে বিশ্বচরাচরের সমস্ত ক্ষুধা ও জিঘাংসা নিহিত আছে। চোয়াল থেকে বেরিয়ে এসেছে দুই ধারালো শ্বদন্ত।পচা কুৎসিত গন্ধ ছড়িয়ে গেছে সারা ঘরে। এটা কি বাস্তব,না কোনো ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন! আতঙ্ক আর উত্তেজনায় হৃদস্পন্দন দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছে। নিজের গায়ে চিমটি কেটে দেখল দেবাশিস, না সে বাস্তবেই আছে। ঐ তো তার দিকে এগিয়ে আসছে ঐ নরকের বিভীষিকা। চলচ্ছক্তিহীন হয়ে পড়েছে দেবাশিস মহা আতঙ্কে।বইছে ঝড়ের মতো হাওয়া,অথচ ঘরের জানলা বন্ধ।


এই সময়ই বিদ্যুৎঝলকের মতো মনে পড়ল কথাটা।এতক্ষণ কেন যে মনে পড়ে নি,নিজের মূর্খতায় নিজের ওপর রাগ হল দেবাশিসের।এই কথাটা আগেই মনে পড়া উচিত ছিল। না,এখন চিনতে পেরেছে দেবাশিস তৈলচিত্রের ছোট্ট ছেলেটাকে। ছেলেটার মুখের উজ্জ্বল আত্মবিশ্বাসপূর্ণ হাসি আর সৌম্য শান্ত চক্ষুযুগল দেখে আর বুঝতে বাকি নেই ছেলেটা কোনো সাধারণ ছেলে নয়, সে অসাধারণ গুণান্বিত। এখন এই বিভীষিকার হাত থেকে একমাত্র সে-ই করতে পারে পরিত্রাণের উপায়।


না,আর তার দিকে ধেয়ে আসা রোলাঙকে ভয় পাচ্ছে না দেবাশিস। চোখ বন্ধ করে হাত জোড় করে গভীর শ্রদ্ধাভরে উচ্চারণ করল,"বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি!"

💐💐💐💐💐💐💐💐💐💐💐💐💐💐💐💐💐


Rate this content
Log in

More bengali story from SUBHAM MONDAL

Similar bengali story from Horror