Apurba Kr Chakrabarty

Horror Tragedy

4.8  

Apurba Kr Chakrabarty

Horror Tragedy

অশরীরীর কান্না

অশরীরীর কান্না

18 mins
5.3K




 সুদীপ্ত কিছুদিন যাবৎ শারীরিক ভাবে বেশ অসুস্থবোধ করছে,  কিন্ত আর্থিক কারনে চিকিৎসার কথা তার চিন্তাতেই আসে না।আত্মীয়স্বজন থাকলেও সে বড় একা নিঃসঙ্গ অবাঞ্ছিত। সে বর্ধমানের ইছলাবাদে এক বস্তির ছোট ঘরে নামমাত্র ভাড়ায় একা থাকে। মাত্র দুইশত টাকা মাসিক ভাড়া বিদ্যুতসহ ,তাও দুমাস বাকী । দুবছর বেশী এ ঘরেই আছে,বাড়ি মালিকের সব্জির ছোট দোকান আছে, সচ্ছল না হোক ছোট মনের মানুষ নয়, ভাড়া নিয়ে কোনদিন তাগাদা দেয় না। আর সুদীপ্ত ঘর ছাড়লে নতুন ভাড়া কেউ নেবে কীনা সন্দেহ। দরমার ঘর টালীর ছাউনি সেঁতসেতে ছায়াঘন অস্বাস্থ্যকর , নেহাত অভাগা ভিখারী মানুষ এ ঘরে থাকে।

সুদীপ্ত ভিখারী নয়, শিক্ষিত সায়েন্স গ্রাজুয়েট। গৃহ শিক্ষক, তবে পসার নেই।গোটা দশেক বস্তির ছেলে মেয়েদের পড়াত, দেড় দুহাজার উপার্জন ছিল। নিয়মিত টাকা আসত না, নিজের খাওয়া পরা সঙ্গে সরকারী চাকরীর পরীক্ষার জন্য দরখাস্তের ফি , বই ম্যাগাজিন এসব খরচ চালিয়ে সঞ্চয় বিশেষ কিছু থাকত না ।

মাস দুই আগে থেকেই সে শারীরিক অসুস্থতা আর দুর্বলতার জন্য মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পরেছে ।পড়ানোতেও তার মনসংযোগ আসছিল না। তাই গৃহশিক্ষতা উপার্জনও গেছে। যৎসামান্য সঞ্চয়ে খাবে ! না বাড়ি ভাড়া দেবে ! না চিকিৎসা করাবে ! পেটের বড় জ্বালা, সামান্য সঞ্চয়ে যতদিন চলে! আর তার পর অনশনেই হয়ত মরতে হবে । দান ভিক্ষা করে বাঁচার চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়,অন্তত সুদীপ্তর কাছে।

পুলিশ লাইন বাজারে পটলদার হোটেল,এ হোটেলে দীর্ঘদিনের সে খদ্দের। এখন সে বাজেট কমিয়ে নিরামিষ খায়, রাতে তিনটে রুটি আলু ভাজা ,পাঁচ টাকায় ।পটল দার সাথে তার দীর্ঘদিনের পরিচিতি। তার অভাব সমস্যাও পটল দা জানে, তাই দরদী মনে একটু রাতে আসতে বলে।পাঁচ টাকায় বাড়তি মাছ বা ডিম কোন কোন দিন ভাগ্য ভালো হলে চিকেন দুপিস খেতে দেয়। অতিরিক্ত দাম নেয় না। 

সুদীপ্ত সমীহ লজ্জা করলে বলে "মাষ্টার বাবু , আপনার কাছে অনেক লাভ আগে করেছি,তার সুদ থেকেই আপনাকে আমি বিনা পয়সায় খাওয়াতে পারি,  আপনি অসুস্থ, একটু ভালো খাওয়া দরকার, আর এ সব তো আমার বেড়ে যাওয়া খাবার !" কথাগুলো সব সত্যি না, সুদীপ্তকে বোঝানোর জন্য বলে , কারণ দরিদ্র হলেও সে আত্মসম্মানী পটল দা জানে।

এদিন ছিল বেশ মেঘলা আকাশ, শীতের দিনে এমন নিন্মচাপ দুর্যোগ সচরাচর হয় না, সন্ধ্যা নামতে না নামতেই আকাশ ঘন কালো মেঘে ঢেকেছিল ,সঙ্গে ঝোড়ো দমকা হাওয়া। বৃষ্টি তখনও শুরু হয়নি। সুদীপ্তর গায়ে বেশ জ্বর ,সন্ধ্যে হতে সে পটলদার হোটেলে এসে বলল,  " দাদা আজ আবহাওয়া ভালো নয়, আমায় তিন টে রুটি আর আলু ভাজা দিন, বাড়িতে নিয়ে গিয়ে খাবো।"

পটল বলল "একটু অপেক্ষা করতে হবে,এখনও আটা মাখা হয়নি। এখনই করে আপনাকে দিচ্ছি, বড় দুর্যোগের দিন, খদ্দেরও আজ বেশী হবে কিনা সন্দেহ।"

সুদীপ্ত হোটেল বসার বেঞ্চে অপেক্ষা করছিল।তার মধ্যেই টিপ টিপ বৃষ্টি শুরু হল,অন্ধকার গাড়ো হয়ে আসছে, সঙ্গে দমকা হাওয়া । সুদীপ্ত বলল "পটল দা ছাতা নিয়ে আসিনি, আজ থাক , আমি চলি, আজ রাতে মুড়ি খেয়েই চালিয়ে নেবো।"

পটল বলল "তাহলে আলুভাজা নিয়ে যান,দাম লাগবে না।" পলিথিন প্যাকে আলুভাজা নিয়ে সুদীপ্ত ছুট লাগাল, বৃষ্টিটা হঠাৎই বাড়ল সঙ্গে পাল্লাদিয়ে দমকা হাওয়া। নিশুতি রাতের মত নির্জন, রাস্তায় কোন মানুষ কেন কুকুরের দেখা নেই।তার বাড়ি নাহলেও বাজারের মোড় থেকেই তিন চারশো মিটার দুর । অসুস্থ দুর্বল ক্লান্ত শরীর, গায়ে জ্বর , ঠান্ডায় হাত পা অবশ হয়ে আসছিল। বাড়ি গিয়ে পোষাক বদল করে লেপের তলায় ঢুকে যদি রক্ষা পায়।

দৌড়াতে দৌড়াতে চাঁদমারীর মাঠের কাছে হঠাৎই হোঁচট খেয়ে এমন পড়ল আর ওঠার সাধ্য হল না। দুর্বল অসুস্থ শরীরে জলের ঝাপট, দমকা হাওয়া, শীতের নির্জন অন্ধকার সাঁঝরাতে সুদীপ্ত পড়ে পড়ে  কাতরাচ্ছিল কিছুক্ষণ। ক্রমে সে অসার অচেতন হয়ে পড়ল।

যখন জ্ঞান ফিরে এল। তার সারা শরীরে কেমন আবদ্ধভাব। নাকে অক্সিজেন, হাতে সেলাইন, আলো আধাঁর এক ঘরে কেমন একটা টুং টাং শব্দ হচ্ছে ।এমন আগে কখনও শোনেনি।মাথার কাছে টিভির মত কিছু মেশিন, ক্লান্তিতে আবার ঘোর ঘোর লাগছে চোখ বুজে আসছে।একজন মহিলা যেন কিছু বলছে , বোঝা যাচ্ছিল না। একজন পুরুষ কন্ঠে জিজ্ঞেস করল "আর বিপদ নেই তো!"

"না স্যার, ডাক্তার বাবু আর একদিন আই সি ইউ তে রাখতে বলেছেন, তার পর নরম্যাল বেড দেওয়া যাবে।"

পুরুষটি বললেন "যাক ঈশ্বর কে অনেক ধন্যবাদ, মেয়েটির শত চেষ্টা, কাতর কান্না ঈশ্বর শুনেছেন।"

সুদীপ্ত মাথায় ভালো কাজ করছে না,আবার এসব হেঁয়ালী শুনে মনে হচ্ছিল এ সে কোথায়! নতুন জগত নতুন জীবন নয় তো ! কিছুক্ষণ সে চুপ চাপ দিশাহীন আজব সব চিন্তা করছিল। এক নার্স পোষাক পরিহিতা মেয়ে তার কাছে এসে দাঁড়াল । সুদীপ্ত আবছা আলোয় দেখতে পারছে, নার্স পোষাক পরিহিতা মেয়েটি অনেকক্ষন নীরবে তার দিকে অপলকে উৎকন্ঠা মুখে দাঁড়িয়ে থেকে বিদায় নিলো।

কিছুক্ষণ পর এক ডাক্তার সঙ্গে এক অন্য মহিলা নার্স। তার শরীরের অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করে ডাক্তার বাবু বললেন, "ওর বাড়ির লোকজন এসেছিলেন?"

নার্স বলল "হাঁ স্যার, ভদ্র মহিলা তো যেতেই চায় না, টাইম ওভারের পরও থাকতে চায়। কী বলে জানেন! উনি তো সরকারী হাসপাতালের নার্স, জীবনের আর ঝুঁকি যখন নেই,ওর বাড়িতে নিয়ে গিয়ে সেবা করবেন। দরকারে ছুটি নেবেন!"

ডাক্তার বাবু হাসলেন,বললেন, "বেচারা খুব ভেঙ্গে পড়েছিল। ভদ্রলোককে ভীষণ ভালোবাসেন।মনে হয় নিজের জীবন চেয়েও বেশী," খুব একচোট হেসে বললেন "এমন ভাগ্য করে আমি বৌ পেলাম না! খুব কম মানুষই পায়।"

নার্স অনুযোগ সুরে বলে, "এক তরফা কি হয় স্যার! ভদ্রলোকও নিশ্চয়ই ঐ মহিলাকে খুব ভালোবাসেন । কিন্তু তাই যদি হয় এমন খারাপ হাল ভদ্রলোকের হল কী করে?"

ডাক্তার বাবু বললেন "সে গোয়েন্দাগিরি তুমি না হয় পরে কোরো। তবে আমার যা অনুমান,কোন ভুল বুঝাবুঝি দীর্ঘদিনের বিচ্ছেদ, অভিসার, প্রেমিককে প্রায় মৃত অবস্থায় উদ্ধার, সেই পাঁচ ছয়ের দশকের বাংলা সিনেমার ট্রেডিশনের এক জীবন্ত বাস্তব সংকলনের আমরা সাক্ষী থাকছি।"

সুদীপ্তকে ঘুমের ইঞ্জেকশন সেলাইন মাধ্যমেই দেওয়ায় সে ঘুমিয়ে গেছিল, সব কথা তার কানে যায়নি।

পরদিন বিকালে সুদীপ্ত বেশ সুস্থ বোধ করছিল। মানুষ চিনতে পারছিল ।তার যে এটেনডেন্ট বয়টি ছিল, তার কাছে সে জানল । এক ভদ্রলোক ও তার এক আত্মীয়া ছয়দিন আগে তাকে বর্ধমানের এই সেরা প্রাইভেট নার্সিংহোমে ভর্তি করে। সে নাকি ঐ ঝড় জলের রাতে প্রায় মৃত অচেতন অবস্থায় পুলিশ লাইনে কাছে চাঁদমারীর রাস্তায় পড়েছিল।

 তার আত্মীয়া নির্জন অন্ধকারে সাহায্যের জন্য ব্যাকুল আবেদন করে।এক ভদ্রলোকের গাড়ী আটকে তাকে এই নার্সিংহোমে ঐ গাড়ী করে এনে ভর্তি করেন ।তার ঐ আত্মীয়া বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নার্স হলেও,  তাদের এই প্রাইভেট নার্সিংহোমে ভরসা বিশ্বাস বেশী ।

সুদীপ্তর মাথায় কিছুই আসছে না ।মনে হচ্ছিল পাগল হয়ে যাবে! কে এই মহিলা! কেন তার জন্য এত ত্যাগ, এত দরদ! সত্যিই কী সে তার পূর্ব পরিচিতা ! কিন্ত প্রেম সে জীবনে করেনি, আর তার পরিচিত আত্মীয়া বর্ধমানে পুলিশ লাইন ইছলাবাদ এলাকায় থাকে এমন তার জানা নেই, আবার নার্স আত্মীয়া ! আর এত নির্জন ঝড় বৃষ্টির রাতে এমন এঁদো রাস্তায় ঐ মহিলা এলোই বা কেন ! তাকে জলে ভেজা অচেতন পরে থাকা অবস্থাতে চিনতে পারলো কেমন করে ? হাজার প্রশ্নের কোন সদুত্তর পেলো না। তবে এই নতুন জীবন ফিরে পাবার জন্য ঐ মহিলা যে সাক্ষাত দেবতার দুত, এবিষয়ে তার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।

তার জীবনে বাঁচার কোন আশা ছিল না ,মোহও ছিল না। স্বার্থপর বৈষম্যময় আত্মকেন্দ্রিক এই সমাজের প্রতি তীব্র ঘৃণা আর অনীহা তাকে প্রতি মুহূর্ত দগ্ধ করে মারত।না ছিল ভবিষ্যত,না সুরক্ষা, না ছিল কোন স্বপ্ন, ভালোবাসা মায়া মমতা স্নেহ সে তো কবে জীবন থেকেই অদৃশ্য হয়েছিল। তাই এই দেবতার দুত যেই হোক জীবনে তার একটা ক্ষীণ ভবিষ্যত স্বপ্ন দেখার ইচ্ছা হল।

স্থির করল ঐ মহিলা রূপী দেবদুত যা বলবে, কোন যুক্তি চিন্তা ভাবনা ছাড়াই সম্মতি দেবে ,মেনে নেবে, সমর্থন করবে,কোন গড়মিল হলে,সে নিজে ভুল বা মিথ্যা বলেছে বা ভুলে গেছে স্বীকার করে নেবে।বাকী জীবন সে ওকে নিয়েই বাঁচবে, যতদিন সে আমাকে চাইবে।

      যে ভদ্রলোক তাকে গাড়িতে এই নার্সিংহোম এনেছিলেন, তিনি ইসলাবাদ এলাকার এক ধনী ব্যবসায়ী। এদিন বিকালে ভিজিট আওয়ারে স্বস্ত্রীক সুদীপ্ত কে দেখতে এলে পরিচয় দিয়ে বললেন,

"ভায়া তোমার ঐ আত্মীয়া বা যাইহোক, সেদিন এত নার্ভাস ছিল, শুধু কেঁদে ভাঁসাচ্ছিল ,হাত পা টলমল করছিল, ঝড়বৃষ্টিতে কাকভেজা। ছাতাটা তো তোমারই উপর ঢেকে রেখেছিল !ঐ দুর্যোগ রাতে গাড়িতে বাড়ি ফিরছিলাম। ঘন অন্ধকার জনশুন্য রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে,শীতের রাতে আলুথালু ভিজে সপসপে পোষাকে,মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে গাড়ি থামাল।ধাক্কা লাগার বা চাপা পরার কোন ভয় নেই। এতটাই সে মরিয়া বেপরোয়া ছিল। আমি আর আমার ড্রাইভার যখন তোমার অচেতন শরীরটা গাড়ির পিছনের সিটে তুলে ওকে ধরে বসতে বললাম ও কাঁদতে লাগল।বলল "ওর এই দশা দেখতে দেখতে গেলে মরে যাব কাকু"

একটা আটো আসছিল বলল "আপনি ধন্তত্বরী নার্সিংহোমে ওকে নিয়ে আসুন, আমি অটোয় যাচ্ছি" 

"আমাদের সঙ্গে তুমি অচেতন হয়ে ছিলে ,আস্তে সাবধানে যেতে দেরি হল, তার আগেই ওর পরিচয়ে তোমার নাম পরিচিতি, এডমিশন বন্ড, লামসাম পেমেন্ট রেডি । তোমায় যাওয়া মাত্র ইমারজেন্সি ওয়ার্ডের চেকআপ করিয়ে আই সি ইউ। আর একটু দেরী হলে জীবন সংশয় হত ।যা ডাক্তার বাবু বক্তব্য ।

 কখনও এ ঋণ ভুলো না। জীবনে ওকে দুঃখ দিও না।ও ভীষণ ভালো মেয়ে যতটুকু আলাপ করেছি।এত বিনয়ী দুর থেকেই মাথা হেঁট করে নমস্কার করে। বড় লজ্জা লাগে "

      কোন ফাঁকে সুদীপ্তের ভাষায় দেবতার দুত, ভদ্রলোকের পাশে হাজির। হাসতে হাসতে বলল "আমার হয়ে সুপারিশ করছেন বুঝি ! কিন্তু কাকু ভালোবাসা তো এক মুখী ! অন্যের উপর নির্ভর করে কী?ও আমাকে তাই ভালোবাসুক, না বাসুক আমি বাসব, বুক দিয়ে আগলে রাখব।"

সুদীপ্তের চোখে জল ,তার স্বপ্নের দেবদুতের নাম জানে না, জানার দরকারও নেই। কৃতজ্ঞতা আর অকৃত্রিম অনুরাগে তার দিকে অপলক চেয়ে ছিল।

বুদ্ধিমতী মেয়েটি বলল," কাকু ওর কষ্ট হতে পারে , এসব আলোচনা থাক," হেসে বললো "চন্দ্রমল্লিকা একটা ফুলের নাম, এত বড় নামে আমায় না ডেকে ও বলত ফুল, এত চালাক আর ধূর্ত ! তাই ওকে আমি সবার চেয়ে একটু বেশী ভালো চিনি, কী খোকা! ঠিক তো! "

সুদীপ্ত মাথা কাজ করছে না , এ কী বলে এসব ! আমার নাম জানল কী করে ! আর খোকা এ তো মা ছাড়া কেউ বলত না! যাই হোক ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল। ভদ্রলোক বললেন "ওকে আজ সাধারণ কেবিনে  দিয়েছে মানে সুস্থর দিকে । এ আমার গিন্নি।"

চন্দ্রমল্লিকা দুর থেকেই নত মস্তকে প্রনাম জানল, বলল "আপনাদের ঋণ ভুলব না"

কাকীমা বললেন " তোমার মত সোনার মেয়ের সাথে আজীবন সম্পর্ক থাকবে । কিন্ত বাছা তোমার কাকু সমীহ করছেন, আমরা সাতদিন হরিদ্বার বেড়াতে যাচ্ছি , আগে থেকেই টিকিট, হোটেল সব বুক আছে, সুদীপ্ত তো ভালোর দিকে ,আমরা কাল রওনা দিলে তোমার খুব কী সমস্যা হবে?"

চন্দ্রমল্লিকা বলল "আমি পেশাদার নার্স, আর আমার এই মুহূর্তে কোন পিছুটান নেই, দরকারে দুদিন ছুটি নেবো,আমি ওকে কালই রিলিজের জন্যে বলেছি। আমার বাড়ি ফাঁকা, দরকারে একজন আয়া রেখে দেব। আপনাদের কোন দ্বিধা দরকার নেই, ঘুরে আসুন, পরে আপনার বাড়ি যাব।"

  "কাকীমা যখন বলেছ একটা আবদার কিছু টাকা রাখো, নার্সিংহোমের অনেক তো লাগবে।"

" ক্ষমা করবেন কাকীমা , ওর চিৎকার খরচা আমি নিতে পারব না, বড় নিজেকে ছোট মনে হবে । তবে যে সাহায্য কাকু সেদিন করেছিলেন, কোন টাকায় সে ঋণ শোধ করা যাবে না।"

কাকা বললেন," ওকে!এক কথা এত বার বার বলে লজ্জা দিও না। ঠিক আছে তোমারা ভালো থেকো, আজ আমরা আসি" চন্দ্রমল্লিকা তাদের নমস্কার করল।

সুদীপ্তর সব স্বপ্ন মনে হচ্ছিল । এমনটাই কী স্বর্গ সুখ ! এটা তার ভাগ্যে সহ্য হবে তো ! একা পেয়ে চন্দ্রমল্লিকা মিষ্টি হেসে সুদীপ্তকে জিজ্ঞেস করল "কী হে মশাই আমাকে কেমন লাগছে!"

চন্দ্রমল্লিকা অতি সাধারণ দেখতে। মাঝারি গঠন, মাঝারি উচ্চতা, মাঝারি রং, মুখচোখ অতি সাধারণ কিন্ত সমগ্র মুখ জুরে এক মায়া মিষ্টতা মাখা, যেন সে কখনও রাগতে পারে না, আঘাত করতে পারে না, আর ওর উপর রাগ করাও যায় না, আঘাত তো দুরের কথা ! অন্তত সুদীপ্তর তাই মনে হল। অপার বিস্ময় অপলক দৃষ্টিতে সে চেয়েছিল কতক্ষণ কে জানে।

চন্দ্রমল্লিকা বলল খুব সহজ ভাবে, "আমার উপর বিশ্বাস আছে তো!"

সুদীপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "আমি কে, আমি তা জানি না! তবে তুমি যে দেবতার দুত ,এটা আমি নিশ্চিত। তোমার উপমা শুধু তুমিই। তুমি অন্যনা"

পরদিন নার্সিংহোম থেকে রিলিজ করিয়ে সব পেমেন্ট মিটিয়ে চন্দ্রমল্লিকা মুখ গম্ভীর। সুদীপ্তকে বলল "আমাকে সুপার জরুরী তলব করেছেন, এক মাস নাইট ডিউটি থেকে তোমার জন্য ছাড় চেয়ে আবেদন করেছি, না গেলে সমস্যা।মানুষ ভালো, কিন্ত মেজাজী , না গেলে আবেদন বাতিল করে দেবেন। "

"তাহলে আমি নার্সিংহোমের নিচে ওয়েটিং রুমে তোমার অপেক্ষা করব?"

চন্দ্রমল্লিকা রেগে মেগে বলল "পাগল হয়েছ! আমি না যাই আমার বাড়ি তুমি যাবে। এখনই!"

"কিন্ত আমি চিনি না! চাবি তালা!"

"সে ব্যবস্থা আমি করছি, রাত ডিউটির সময় যে অটোচালক আমায় নিয়ে যায় খুব বিশ্বাসী ।ওকে ডেকেছি ,ওই নিয়ে যেতো ।ঐ তোমাকে নিয়ে যাবে। আমি স্যারের সাথে দেখা করে মা সর্বমঙ্গলার পূজো দিয়ে প্রসাদ নিয়ে যাব।

একটু পরেই এক অটো এল, চন্দ্রমল্লিকা চালককে সব বুঝিয়ে তালা চাবি দিয়ে তার সাথে সুদীপ্তকে পাঠালো। খুব সাবধান অসুস্থ মানুষ যাচ্ছে বলে বারং বার সতর্ক করল।

চন্দ্রমল্লিকার বাড়ি শহরের এক প্রান্তে ,নতুন নতুন ছোট বাড়ি।কিছু সম্পূর্ণ বসত বাড়ি।কিছু অসম্পূর্ণ তৈরির পথে।চন্দ্রমল্লিকার বাড়ির পুবে সরু আট ফুটের রাস্তা।সামনের বাড়ী গুলো বসতি কম।নতুন তৈরি হচ্ছে। অটো চালক সুদীপ্ত কে ঘর অবধি এসে  দরজার চাবি খুলে পৌঁছে দিল। বেলা প্রায় দুটো নির্জন দুপুর পাশাপাশি লোকজনের দেখা নেই ।

অটোর চালক বলল ,"বাবু মেনগেটে চাবি দিয়ে যাচ্ছি ,দিদিমনি এসে খুলবেন। ভিতরে দরজা লাগিয়ে রেষ্ট নিন।"

বক্স প্যাটার্ন ঘর বাইরে থেকে কিছুই দেখা যায় না। জানালা দরজা বন্ধ করলে নিরিবিলি যেন জগত থেকেই বিচ্ছিন্ন। দুটি পাশাপাশি ঘর,আর ডাইনিং কিচেন, দুই ঘরেই পৃথক বার্থ টয়লেট।ঢুকেই যে ঘরটি ভারী সুন্দর খাটের উপর গদি বিছানা।আনলায় তার আসার আগেই তার জন্য পাজামা পাঞ্জাবী আন্ডারওয়ার গামছা রাখা, ডাইনিং টেবিল উপর নানা ফল রাখা, জলের বোতল সব কিছু পরিপাটি।

সুদীপ্ত হাসপাতালের পোষাক ছেড়ে বাথরুমে গেল সুগন্ধি সাবান, স্যাম্পু ,ট্যাপ সাওয়ার।পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে পাজামা পঞ্জাবী পরে খাটে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিল। কিন্ত একটা উৎকন্ঠা ছিলই।যার বাড়ী তার অপেক্ষায়। জল ছাড়া কিছুই খেলো না।

একটু বেলায় চন্দ্রমল্লিকা এল উদ্বিগ্ন স্বরে বলল "তোমার কোন অসুবিধা হয়নি তো! "

সুদীপ্ত বলল "না ঠিক আছি।"

"ওষুধ ট্যাবলেট সব তোমার খাটে রাখছি ,দেখে নাও প্লিজ সব টাইম টেবিল করে দিয়েছি। "আমি টপ করে বাইরের ড্রেস পাল্টে আসি।"

পাশের ঘরে বাথরুমে স্নান সেড়ে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে শাড়ি ব্রাউজ পরে বের হল। হাসতে হাসতে বলল "তোমাকে তো রাজপুত্র মনে হচ্ছে, এই বুড়িকে পছন্দ হবে তো ! "

"কী যে বলো! তোমায় ভীষণ ভালো লাগছে!আগে এই ড্রেসে তো দেখিনি, সত্যিই তুমি অন্যনা!" চন্দ্রমল্লিকা হাসল, বলল "অনেক ধন্যবাদ, তা তুমি কিছু খেয়েছ!"

"মালকিন ছাড়া কিছু খাই কী করে ! "

চন্দ্রমল্লিকা রাগতস্বরে বলল,  " কে মালকিন! এ বাড়ি তোমারও ! এত পর পর ভাবলে হয় !অসুস্থ শরীর সময় মত খাবে তো! "

কিছুক্ষণ পর চন্দ্রমল্লিকা কাটাফল মিষ্টি একটি পাত্রে তার খাটে রেখে এখনই যেন খেয়ে নেয় নির্দেশ দিল। এমন নির্দেশ কার না পছন্দ!

একটু পর দু কাপ কফি ও বিস্কুট একটি ট্রেতে এনে টেবিলে রাখল। তার ও চন্দ্রমল্লিকার, কফি খেতে খেতে চন্দ্রমল্লিকা বলল, " ডাক্তার বাবু বললেন নিয়মিত ওষুধ ট্যাবলেট আর পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে, সঙ্গে হালকা যোগ, এর বেশী আর কিছু করা এক মাস কিন্ত কঠোর ভাবে নিষেধ" বলে মুখটিপে খুব  হাসতে লাগল। রসিকতা ভরা চোখে কিছু যেন ইংগিত করল।

সুদীপ্তর মুখ লজ্জায় লাল কিছুটা ক্ষোভের সুরে বলে "তুমি কী ভাবো আমি অসভ্য বর্বর কামুক!"

চন্দ্রমল্লিকা এবার আরও হাসতে লাগলো, যেন হেসে দমবন্ধ হবার উপক্রম চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। সুদীপ্ত কোন উত্তর দেয় না মুখ নামিয়ে গুম হয়ে বসে।

"কি হল কফি খাও ! কে তোমায় বদনাম দিল ! আরে তোমায় বিশ্বাস করি বলেই তো এক ঘরে তোমায় এনেছি! তুমি কোন দিন আমার সম্মতি ছাড়া দুষ্টমী দুরে থাক ,গায়ে হাতও কী দেবে ! " বলে চন্দ্রমল্লিকা তাকে শ্বান্তনা দিল।

অভিমানী সুদীপ্ত বলে "জীবন থাকতে তোমার বিশ্বাসে আঘাত করব না।"

চন্দ্রমল্লিকা বলল "এই জন্যই  তো তোমায় এত  ভালোবাসী, খাঁটি সোনা।" সুদীপ্ত রাগ ভাঙ্গলো, কফি খেলো।

চন্দ্রমল্লিকা বলল "তুমি একটু রেষ্ট নাও আমি রাতে খাবার বানিয়ে নি।" রাতে দুই ঘরে দুজন শয়ন করলেও, চন্দ্রমল্লিকা বলল "তুমি অসুস্থ কোন সমস্যা হলেই আমায় হালকা ডাকবে, আমার ঘুম খুব পাতলা, অল্প শব্দে জেগে যাব।"

মাঝে দরজা ভেজিয়ে চন্দ্রমল্লিকা ওর ঘরে গেল।সুদীপ্ত ভাবল, তুমি সারাদিন পরিশ্রম করে রাতে একটু বিশ্রাম নেবে, আর আমি এত স্বার্থপর অধম তোমার ঘুম নষ্ট করব ! মরে গেলেও ডাকব না।

পরদিন চন্দ্রমল্লিকা অফিস যায়নি। এক সময়ে সুদীপ্তর আগের বাড়ির ঠিকানা ও মালিকের নাম জানল কেন সুদীপ্ত জানে না।,দুপুরে সুদীপ্তর একটু ঘুম ধরেছিল, তার ফাঁকেই ওর পূর্বতন কুঁড়ে ঘরে চন্দ্রমল্লিকা গেছিল, সুদীপ্ত ঘুম থেকে উঠলে বলল "তোমার সব সম্পদ আজ এনে দিয়েছি।"

সুদীপ্ত জিজ্ঞেস করল "কী ! কী সম্পদ!"

"আরে তোমার সার্টিফিকেট গুলো ,আর বাক্সে ছিল চারশো একাত্তর টাকা ! বাড়ি ভাড়া মিটিয়ে তোমার ধার শোধ করে দিয়েছি!"

সুদীপ্ত বলে "আর কিছু বই ম্যাগাজিন ছিল।"

"সব এনেছি মশাই। পারলে মিলিয়ে নাও, গড়মিল হলে আমার নামে না হয় একটা সিবিআইএ নালিশ ঠুকবে!" বলেই মুখ টিপে খুব হাসতে শুরু করল, হাসি আর থামে না।

সুদীপ্তের চোখে জল মুখ টিপে আপ্রাণ যেন কান্না আটকানোর চেষ্টা করছে।চন্দ্রমল্লিকার চোখে পড়তে হাসি থামাল, বিচলিত হয়ে বলল "তুমি কাঁদছো!" সুদীপ্ত ঘাড় নেড়ে না বোঝাতে চাইলেও তার গলা দুঃখে যেন ধরে গেছে, কথা বের হচ্ছে না।

চন্দ্রমল্লিকা অপরাধীর মত বলল "তোমায় যদি আঘাত দি ক্ষমা চাইছি।"

সুদীপ্ত ধরা গলায় বলল"তুমি আঘাত করবে কেন! তুমি দেখে এলে কী ঘরে করুণ ভাবে চরম দারিদ্রে থাকতাম! মনে পরে গেল তাই মনটা কেমন করছে। আমি খুব গরীব !"

চন্দ্রমল্লিকা বললো "ও কথা যেন তোমার মুখে আর না শুনি! আমি ইয়ার্কী ফাজলামি একটু ভালোবাসী । তার মানে তুমি আমাকে দুরে সরাতে পারো না ! এ বাড়ি তোমারও। ঠিক আছে আমি আর ইয়ার্কী করব না। হাসবো না।"

সুদীপ্ত বলল, "আমি ক্ষমা চাইছি, তোমাকে আঘাত করিনি।মেনে নিচ্ছি আজ আমি গরীব নয় ,এক সময় ছিলাম, খেতে পাবো কি না চিন্তা হতো।"

চন্দ্রমল্লিকার চোখে জল বলে ,"পাস্ট ইজ পাস্ট, এসব মনে ভেবে মন খারাপ করে কী লাভ বলো! "

সুদীপ্ত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল" তুমি আমার ভবিষ্যত বর্তমান সব, আমি তোমার জন্য সব করতে রাজী।" চন্দ্রমল্লিকা আবার মুখটিপে খুব হাসছে।এবার সুদীপ্তও হাসছে। সে চন্দ্রমল্লিকার হাসিখুশি স্বভাব বুঝেছে ।

এই ভাবেই এদিন কাটলেও পরের দিন এক সমস্যা হল। চন্দ্রমল্লিকার পরদিন ডিউটি ছিল । এক আয়া রেখেছিল সুদীপ্তর দেখভালের জন্য। বেশ চলছিল সুদীপ্ত আয়ার ব্যবহার যত্ন ভালো লেগেছিল। কিন্ত দুপুরে ভাত ঘুম থেকে সহসা আবছা ঘুম ঘুম চোখে যা দেখল পিলে চমকে গেল।ভয়ে ঘুমের ভানে রইল ততক্ষণ না চন্দ্রমল্লিকা আসে।

আয়া যাওয়ার কিছুক্ষণ পর চন্দ্রমল্লিকা এল।সুদীপ্ত তখন কিছুই বলল না।ড্রেস বদল করে মুখ গা হাত পা ধুয়ে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন বেশে এদিন চা পাঁপড় নিয়ে এল ।দুজন খেতে খেতে হঠাৎই সুদীপ্ত বলল "এই আয়াকে রেখো না। আমার যত্নের জন্য কোন আয়া দরকার নেই।আমি বেশ সুস্থ, তুমি ডিউটি গেলে একাই থাকব। "

চন্দ্রমল্লিকা অবাক হয়ে বলল "কি হল বলবে তো!" সুদীপ্ত বলল "না না !সে শুনে লাভ নেই।"

চন্দ্রমল্লিকা এবার জেদ করে বলল "সমস্যা না বললে ওকে জবাব দেবো কি ভাবে!"

সুদীপ্ত বলল,"বলবে ওর হাবভাব আচরণ ভালো নয়।" 

চন্দ্রমল্লিকা উদ্বিগ্ন বলে ,"বলো না! তোমার সাথে কী কোন খারাপ ব্যবহার করেছে!"

সুদীপ্ত, চুপ থাকে।

চন্দ্রমল্লিকা বলে " কী বলো! আমার দিব্যি বলো। "

সুদীপ্ত ভয়ে কাঁপছে, ভয়ার্ত্ত স্বরে বলল "তুমি বিশ্বাস করবে কিনা জানি না। তবে শুনলে ভয় পাবে। "

চন্দ্রমল্লিকা শ্বান্তনার সুরে বলে ,"আরে বলোই না!আমি অনেক ভয়ের গল্প জানি, বলোই না !"

  সুদীপ্ত একেবারে ভেঙ্গে পরেছে থমথমে মুখে বলে, "আমি ভাত ঘুম থেকে জেগে হঠাৎই দেখি ঐ আয়া ডাইনিং টেবিলে খাচ্ছে, হাত কেমন লম্বা করে রান্না ঘর থেকে খাবার আনছে, হেঁটে যাবার দরকার হচ্ছে না। আমি ভয়ে তুমি না আসা অবধি ঘুমের ভান করে ছিলাম। খুব ভয় করছিল,ও কাল এলে মরেই যাবো।"

চন্দ্রমল্লিকা বলল "হয়ত তোমার ভ্রম !শরীর অসুস্থ ভুল দেখেছ। তবে ভয় যখন পেয়েছ ।ওকে আর বাড়ীতে ঢুকতে দেবো না,কাল সকালে এলেই গেট থেকেই বিদায়।"

সুদীপ্ত ভয়ার্ত্ত কন্ঠে বলল তুমি থাকবে না,তাই আমার জন্য জবাব শুনলে আবার যদি ও সত্যি অশরীরী হয় ! এ ঘরে চলে আসবে না তো!

চন্দ্রমল্লিকা আশ্বাস দেয় আমি তোমার কথাই বলব না।ও জানবেই না তুমি ওকে সন্দেহ ভয় করছ। ঠিক আছে! কোন চিন্তা করো না,তবে তোমার চোখের ভুল আমার এখনও মনে হচ্ছে। ভুত বলে কিছু আছে, আমার বিশ্বাস হয় না।

সুদীপ্ত কিছুটা সাহস পেলো ,নিজের চোখকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতে পারছে না।

পরদিন সুদীপ্ত একা ছিল, রান্না করা ছিল। নিজে বেড়ে খেলো।কেমন যেন আজ গা বাজছে,ছম ছম করছে গোটা ঘর,কেউ যেন ঘরে আছে! বদ্ধ ঘরের উত্তরদিকে বসত বাড়ি জানালা,শীতের সময় বেশ টাইটকরে কাগজ দিয়ে চেপে ছিটকানী লাগানো, সুদীপ্ত উত্তরের জানালা  টেনে খুলে একটু সাহস পেলো ,পাশেই বসতি বাড়ির মানুষজন দেখছিল।কিন্ত একী কান্ড ! পাশের বাড়ির লোকজন কেমন বিভ্রান্তের মত ঘরে ঢুকে তাদের দরজা জানালা সব বন্ধ করে দিচ্ছে!

বিরক্ত সুদীপ্ত নিজেই এবার জানালা বন্ধ করল।শীতের উত্তরের জানালা দিয়ে সমানে ঠান্ডা কনকনে হাওয়া ঢুকছে অসহ্য, সঙ্গে পাশের বাড়ির মানুষদের অসভ্য আচরণ।

আজ একটু বিকালে চন্দ্রমল্লিকা ফিরেছে। "কেমন আছো! "এসেই জিজ্ঞেস করল,কেমন যেন উদ্বিগ্ন।

সুদীপ্ত বলল , "ভালো কিন্ত কী জানো ! আজ আমি উত্তরদিকের জানালা খুলতেই পাশের বাড়ি মানুষ সব ঘরে ঢুকে দরজা জানালা বন্ধ করে দিল ! কী ধরনের মানুষ ওরা!"

চন্দ্রমল্লিকা রাগতস্বরে বলল "অসুস্থ শরীরে শীতের দিনে  উত্তরের ঠান্ডা হাওয়া খাওয়ার  খুব সখ তোমার ! আর কোন দিন খুলবে না। ওরা সমাজ বিরোধী নানা মাদক নেশার কারবার করে ,হয়ত তাই তোমায় দেখে এসব করেছে কিছু লুকিয়ে রাখতে। "

ঘন্টা খানেক বেশ গেল। কিন্ত চন্দ্রমল্লিকা আজ বেশ গম্ভীর চুপচাপ,একা একা।রসিক হাসুকে স্বভাবটাই পাল্টে গেছে।

সন্ধ্যার পর আসল রহস্য ফুটে উঠল। বাড়ির চারপাশে বেশ কিছু মানুষের গোলমাল হৈহুল্লোল।দুচারটে ইট পাথর বন্ধ দরজা জানালায় এসে পড়ছে।

সুদীপ্ত ভয়ে জিজ্ঞেস করল" কী গো এসব কী! "

চন্দ্রমল্লিকা হাউ হাউ করে কাঁদছে,"আর হল না !" বিলাপ সুরে হতাশায় বলল, "আমি অশরীরী । তোমার কোন ক্ষতি করব না । ভয় পেও না। এই ঘর আমার,এখানে আমার স্বামীর সাথে দুবছর ঘর করে ছিলাম, স্বামী ভালোবাসত খুব।প্রসব করতে গিয়ে বাচ্চাসহ মরে যাই। স্বামী বেকার ছিল, তাই সে ডাই ইন হারনেসে সরকারি নিময়ে একটা কাজও পেলো, হাসপাতালে।

 আবার বিয়ে করল, এ ঘরেরই বাস করছিল !আমার আর সহ্য হল না।আমি উৎপীড়ন শুরু করলাম। ওকে ভয় দেখালাম ,বললাম এ বাড়ি ছেড়ে যাও ,এবাড়ি আমার নামে ।চাকরী করে সংসার করো, ক্ষমা করছি, তোমার প্রেম ভুয়ো,     এ বাড়ি ছাড়ো ।

ওরা বাড়ি ছেড়ে পালাল। এ পাড়ার লোক যারা এসব জানে এটা ভুতুরে বাড়ি বলে,এবাড়ি কেনার মানুষ নেই, আমি ছাড়ব না,অনেক লোন, অনেক কষ্টের বাড়ি।"

বাইরের হৈহুল্লোর বেড়েছে , তবে ঢিল মারা বন্ধ হয়েছে।

পুলিশ খবর পেয়ে এসেছে । এই ভাবে কোন অভিযোগ প্রমাণ ছাড়া সন্দেহ বশে মানুষের বাড়ি ঢিল ছোড়া অপরাধ, পুলিশের হুমকীতে কাজ হয়েছে। পুলিশ জানায় এত রাতে ওয়ারেন্ট ছাড়া পুলিশ বাড়ী তল্লাশি করতে পারে না। পাড়ার মানুষ এফ আই আর করলে মেজিস্ট্রেটের অর্ডার পেলে বাড়ির তল্লাশি হবে। তবু ভুত বলে অভিযোগ হবে না । সন্দেহজনক মানুষ বাড়িতে আছে যারা বিপদজনক  এমন অভিযোগ চাই।তাই ঘর তল্লাশি সময় সাপেক্ষ আগামীদিন হয়ে যাবে।

সুদীপ্ত চন্দ্রমল্লিকা এসব জানে না। হতাশায় দুঃখে ভেঙ্গে চন্দ্রমল্লিকা বলে  " আমি তোমার নিষ্পাপ নিষ্মাম ভালোভাসা চেয়েছিলাম, তোমাকে আমি বহু দিন নজর করেছি, আত্মীয়স্বজন বন্ধু সমাজ সংসার সরকার সবাই তোমায় বঞ্চনা করেছে। তুমি দুঃখে হতাশায় গুমড়ে গুমরে কাঁদতে। শেষে ভগবান তোমার আয়ু কেড়ে নিতে কঠিন রোগে আক্রান্ত করল।তুমি নিমোনিয়া জন্ডিস সঙ্গে জ্বর একসাথে ভুগছিলে।

সেদিন সন্ধ্যায় কৃষ্ণ প্রতিপদে আমি খুব সক্রিয় ছিলাম। তুমি যখন পড়ে গেলে মরমর ,আমি ঐ অটো চালককে ডাকলাম, ও জানে আমি অশরীরী, তাই কথার অবাধ্য হতে সাহস পায় না। জীবন দশায় আমার খুব প্রিয়ছিল, রাত ডিউটিতে ওর অটোয় বাড়ি ফিরতাম। আমাকে ভয় করে, কিন্ত ওর ক্ষতি করব না জানে।"

একটু থেমে ভাবুক হয়ে যায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল

"সেদিন ঐ প্রাইভেট কার আসতে দেখে তোমার আত্মীয়ার অভিনয় করে থামাই।অটো আসতে দেরি করছিল। তোমার সঙ্গে পিছনের সিটে যাইনি। কোন মানুষ আমার ছোঁয়া লাগলে তার মৃত্যু ।তাই দুর থেকেই আমায় ভালোবাসা সম্মান জানাতে হয়।

আয়া আমার এক রূপ, তুমি সত্যিই দেখেছিলে, ভেবেছিলাম তুমি গভীর ঘুমে আছো,তাই আলস্য লাগছিল, না হেটে হাত লম্বা করে আচারটা রান্নাঘর থেকে টেনে নিয়েছিলাম, বুঝলাম ঐ আয়া রাখলে তুমি ভয়ে মরেই যাবে। "

একটু অনুতাপ আর আফসোসে বলে" তোমার উপর নজর রাখার জন্য আমি আজ অন্য আয়া রূপে কেন নিজেকে রাখি নেই !এটাই আমার ভুল।এবাড়ীতে মানুষ থাকে কেউ জানে না। আমি অদৃশ্য হয়ে আসি।তোমাকে অটো চালক আমার ইচ্ছামত নির্জন সময় তোমাকে সেদিন নার্সিংহোম থেকে এঘরে দিয়ে যায়। এঘর যা দেখছ মায়া। শুধু ধুলোর স্তুপ, বাইরের বাগান বন জঙ্গলে ভর্তি। "

"সেদিন সুপার ডাকেনি তোমার সঙ্গে এলে আমার স্পর্শে তোমার মৃত্যু হত, তাই অটোরচালকের সঙ্গে একা পাঠাই, দুঃখ উদ্বেগ হচ্ছিল ,তুমি কী ভাবলে! তবে অদৃশ্য রূপে সঙ্গেই ছিলাম ,আমি সব সময়ই তোমার সঙ্গে দৃশ্য অদৃশ্য ভাবে থাকি। তোমাকে আমি সত্যি ভীষণ ভালোবাসি। তুমি বাইরে যাও সব সত্য বললে হয়ত তোমায় ছাড়বে! "

এবার চন্দ্রমল্লিকা আশ্বাস ও স্নেহের সুরে বলে, "আমি তোমার সঙ্গে অদৃশ্য হয়ে থাকব, তুমি দেখতে পাবেনা । আমায় যে অশরীরী জানে, দেখতে পায় না।অটোচালক আমার নির্দেশ শোনে দেখতে পায় না।তোমার সব সমস্যা বিপদে আমি তোমার পাশে আছি জানবে ,সুখে রাখব কথা দিলাম।"

সুদীপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল , " আজও তুমি আমার দেবতার দুত। তুমি ছাড়া,এই স্বার্থপর বিশ্বাসঘাতক নিষ্ঠুর লৌকিক জগত বৃথা। তুমি অশরীরী,তবে আমাকে কেন বাঁচালে!সেই রাতেই তো আমায় আপন করে নিতে পারতে!"

চন্দ্রমল্লিকা বলল "না গো,আমি তোমায় লৌকিক স্বত্বায় চেয়েছিলাম, আমায় ভালোবাসবে নিষ্কাম নিষ্পাপ প্রেমে।আমার শরীরের উষ্ণতা নেই, তীব্র শীতল,দেহজ প্রেম যৌনতায় আমি অক্ষম। আমার পূর্ব অভিজ্ঞতেও আমি বিরক্ত আহত। তোমাকে কৌশলে তাই আমাকে না ছোঁয়া, আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সপথ করাই। তুমি খুব সৎ আমি জানি, কামুক বেহায়া নও। তোমার সাথে দীর্ঘদিন আমি এভাবেই থাকতে চেয়েছিলাম, "

একটু চুপ থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে দুখী মনে বলে, 

"ঐ নার্সিংহোমে আমার মৃত্যু ।সময়ে ডাক্তার এলে বাচ্চা আমি দুজনেই বাঁচতাম। এই নার্সিংহোমেই বিনা খরচে ভুতুরে ম্যাজিকে তোমার সুচিকিৎসা করিয়ে আমার কিছু শোধ উঠল। " একটু থেমে হতাশাসুরে বলে " সে সময় যদি বাঁচতাম, স্বামীর অভিনয় স্বার্থপরতা হয়ত দেখতে হতো না। যাক আমার দুঃখ ছিল না, তোমাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্ত সেই মত নিরাপদ অজানা স্থানে ঘর সন্ধান না করে এই বাড়ির মোহতেই , তোমাকেও আজ হারাতে হচ্ছে। এ বাড়ী কাউকে ভোগ করতে দেবো না!"

ক্ষোভে রাগে চন্দ্রমল্লিকার মুখ যেন বীভৎস ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছিল।বিকট চিৎকারে বলছিল ,"পাশের বাড়ির মানুষদের ছাড়ব না।"এতটাই জোর সে চিৎকার বাইরে টহলরত পুলিশ ও কিছু কৌতুহলী প্রতিবেশীরা ভয়ে থর থর কাঁপছিল।

সুদীপ্ত নির্বিকার কোন ভয় নেই, চন্দ্রমল্লিকাকে সে চায় এই লৌকিক জগতের বিনিময়ে ,তাই কাতর ভাবে বলে "চন্দ্রমল্লিকা তোমায় ছাড়া থাকতে পারব না,তুমি কী আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে !"

চন্দ্রমল্লিকার উগ্র রূপ শান্ত হয়ে আসে পূর্বের সেই মায়াভরা মিষ্টি মুখ, দুচোখ অশ্রুজলে চক চক করছে, ফুঁপিয়ে কাঁদছে !

এক অদৃশ্য টান সুদীপ্ত অনুভব করছে এগিয়ে যায় চন্দ্রমল্লিকার দিকে, জড়িয়ে ধরে ঘনিষ্ঠ ভাবে এক পরম তৃপ্তি ।

চন্দ্রমল্লিকা আরও আরও কাছে পেতে চায় সুদীপ্তকে। দুইবাহুর আগলে ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িয়ে ধরে ,সুদীপ্তের মুখ চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দেয় ।

সুদীপ্তের শরীর কেমন ঠান্ডা হয়ে আসছিল।অসার হয়ে পরছিল।

চন্দ্রমল্লিকা কাতর আর্তনাদে ডুকড়ে কেঁদে ওঠে।বলে "তোমাকে আমি স্বার্থপরের মত লৌকিক জগত থেকে ছিনিয়ে নিচ্ছি।"

,সুদীপ্তের মুখে তৃপ্তির হাসি,বলে "লৌকিক জগত চেয়েও আমি তোমার ভালোবাসায় অলৌকিক জগতে অনেক অনেক ভালো থাকব। "

পরদিন পুলিশ যথাযথ অনুমোদন নিয়ে ঘর তল্লাশি অভিযান করে। রাতে আলো দেখেছিল বিকট চিৎকার শুনেছিল। ঘরে আজ দেখল ধুলোর স্তুপ, মেঝেতে শুধু সুদীপ্তের বরফশীতল শব ,মুখে তৃপ্তির হাসি। ।

                         নমস্কার 


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Horror