Best summer trip for children is with a good book! Click & use coupon code SUMM100 for Rs.100 off on StoryMirror children books.
Best summer trip for children is with a good book! Click & use coupon code SUMM100 for Rs.100 off on StoryMirror children books.

Sheli Bhattacherjee

Horror


3.3  

Sheli Bhattacherjee

Horror


অবয়ব

অবয়ব

12 mins 5.7K 12 mins 5.7K


বেশ কিছুক্ষণ ঘরে এলোমেলো পায়চারি করার পর ভেতরের অস্থিরতাটা যেন একটু লাগাম দিতে পারলো রথীন। অস্থিরতাটা অনুতাপকেন্দ্রিক মোটেই নয়। কারণ, এ বাড়িতে প্রথমবার হলেও এ জীবনে তার এসব নতুন কিছু নয়। কিন্তু এবারের ভীতিটা অন্য কোনো জায়গায়। 

প্রবীর কি সব ঠিকঠাক করে সামলে নিতে পেরেছে ... কে জানে! ওর চিন্তাগুলোকে চটকে দিয়ে একটা কুঁই মারা সরু আওয়াজ ভেসে এলো বাইরে থেকে। রথীন জানলার কাছে গিয়ে দেখলো একটা শুঁটকো কালো কুকুর ঠিক ওর জানলার নিচে বসে গলা উঁচু করে বেসুরো ডাকছে। কুকুরটাকে তাচ্ছিল্যের সাথে তাড়ানোর পর ফোন লাগালো সে প্রবীরকে। বেশ কয়েকবার রিং হওয়ার পর ফোনটা তুললো প্রবীর। রথীনের উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর,

"কি রে সব ঠিক আছে তো? আর কোনো অসুবিধা ..." 

"আরে নো চিন্তা বন্ধু। সঅঅঅব ঠিক করে দিয়েছি।" রথীনের কথার মাঝে জরানো গলায় উত্তর এলো প্রবীরের।

"কাজটা বোধ হয় ঠিক করলাম নারে আমরা।" কিঞ্চিৎ দ্বিধাজনক কণ্ঠ রথীনের।

"কেন বে? আজ তোর চরিত্রের সতীত্বনাশের রাত ছিল নাকি?" বলে ব্যাঙ্গাত্মক হাসি দিল প্রবীর।

কিছুটা বিরক্তিকর গলায় রথীন বলে উঠলো,

"তুই কি ঘরে গিয়েও নেশা করছিস? শালা তোকে বলেও কোনো লাভ নেই এখন। চল ফোন রাখ।"

কিছুক্ষণ চুপ থেকে প্রবীর টেনে টেনে জড়ানো জিহ্বা নেড়ে বলতে থাকলো,

"হুম রাখ। পরে কথা হবে। মনে হচ্ছে কে যেন দরজা ধাক্কাচ্ছে এতো রাতে!"


উত্তর না দিয়ে প্রবীর ফোন রেখে দিয়েছে ততক্ষণে। এমনিতেই ওর জটপাকানো গলা শুনে রথীন বুঝে গেছিল যে, এ আপাতত এ জগতে নেই। তাই রাত বারোটার সময় দরজা ধাক্কানোর আওয়াজ শুনছে। অত:পর এতোদিনের কুকর্মের সঙ্গীর কথায় আশ্বস্ত হয়ে বিছানায় শুতে গেল রথীন। কিন্তু কোনোভাবেই দুচোখের পাতা এক করতে পারছে না সে আজ। কিছুই নতুন নয়, তবুও কি যেন একটা অস্বস্তি খচখচ করে চলেছে ভেতরে। তারপর হঠাৎ মনে হল লতিফকে কল করবে। ফোনটা হাতে নিয়ে রথীনের তৎক্ষণাৎ মনে হল, না এটা উচিৎ হবে না। কমাস আগে লতিফের নিকা হয়েছে। তারপর বেশ কয়েকদিন ভাবিজি ছিলেন না এখানে। আজ আসার কথা ছিল। এতো রাতে ফোন করলে বিব্রত বোধ করতে পারে ওরা। ও না হয় অকৃতদার, কিন্তু বন্ধুদের বিবাহিত জীবনের ঝামেলা ও রসবোধ উভয়ই ও বোঝে। চাকরিসূত্রে প্রবীর আর ও একা ভাড়াবাড়িতে থাকে বলে, যখন তখন কল করা যায়। একজন আর একজনের ঘরে আসা যায়। যা খুশি তাই করা যায়। এসব ভাবতে ভাবতেই জানলার বাইরে থেকে একটা ঝোড়ো হাওয়ার রোল রথীনের ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলো। জানলাটা বন্ধ করার জন্য সেদিকে এগিয়ে যেতেই তার সারা শরীরে অকস্মাৎ কেমন একটা শিহরণ অনুভূত হল। জানলার লোহার গ্রিল পেড়িয়ে তার নজর তখন বাইরের নিকষ কালো অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে কি এক সম্মোহনে দ্রুত এগিয়ে চলেছে। অতঃপর তা আটকালো গিয়ে একটা ছোট্ট অবয়বে। আর কানে পৌঁছালো একটা শৈশব হাসির সাবলীল স্পন্দন। ও অপলক দৃষ্টিতে দেখলো পাশের বড় বাড়িটার উঁচু পাঁচিলের রেলিঙয়ের উপর সেই অবয়বটি দুদিকে হাত প্রশস্ত করে এক অদ্ভুত ভারসাম্য বজায় রেখে দিব্যি হেঁটে বেরাচ্ছে। এতো রাতে এতো উঁচু পাঁচিলের উপর কে হাঁটতে পারে ভেবে রথীনের শিরদাঁড়া বেয়ে একটা বরফগলা অনুভূতির স্রোত বয়ে গেল। সেটা ক্রমশ যেন তার মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলোকে অবশ করে দিতে লাগলো। ঠিক তখনই মেঘ আর আঁধারে মাখামাখি আকাশটাকে এবড়োখেবড়ো করে চিরে একটা বাজের ঝলকানিতে মুহূর্তের জন্য স্পষ্ট হয়ে উঠল সেই অবয়বের মুখটা। কি বিভৎস একটা ক্ষতবিক্ষত চাউনি তার।

তৎক্ষণাৎ প্রচণ্ড একটা চিৎকার করে উঠে বসলো রথীন। বাইরে তাকিয়ে দেখলো আঁধার থাকলেও, ভোরের ঈষৎ আলো ফুটছে। চারদিকে একটা হিমশীতল শান্তভাব রয়েছে। ঘর্মাক্ত দেহে সে ধীরে ধীরে অনুভব করতে লাগলো তার স্বপ্নগত সত্যতা। তারপর বিছানা থেকে ধীরে নেমে ঢকঢক করে দুগ্লাস জল খেয়ে আবার শুতে চলে গেল সে। যদিওবা নিদ্রাদেবীর আবাহন করা আর সেদিন রথীনের দ্বারা সম্ভব হয়ে ওঠে নি। গলার কাছে কি যেন একটা অস্বস্তিজনক দলা পাকিয়ে উঠছে তার। সেই অবাধ্য অস্বস্তি তার মানসিক অস্থিরতাকে ক্রমশ দ্বিগুণ তিনগুণ হারে বাড়িয়েই চলেছে।


কিছুক্ষণ পর উঠে ঘরের কাজ, টুকটাক রান্নাবান্না আর নিজের টিফিন সেরে রথীন রেডি হয়ে বেরিয়ে পরলো ডিউটিতে। নতুন হেড মিস্ট্রেস খুব কড়া। কারো ঢোকার সময়ের একটু এদিকওদিক হলেই বেশ করে কথা শুনিয়ে দেন। আগের ভাড়া বাড়িটা তাও স্কুলের একেবারে গায়ে লাগানো ছিল। কিন্তু এই নতুন ঘরটা থেকে স্কুল প্রায় মিনিট পনেরো কুড়ির হাঁটা পথ। মেয়ে আর মদের নেশায় বাজারে বিস্তর দেনা হয়ে গিয়েছিল বলে কতকটা পাওনাদারদের এড়িয়ে চলতে আর মাসের বাজেট কমাতেই দিন পাঁচেক আগে রথীনের এই নতুন বাড়িতে ভাড়া নেওয়া। বাড়িটার সবচেয়ে বড় সুবিধে হল, বাড়িওয়ালা থাকেন না। উপরের ঘরদুটো খালি। পুরো বাড়িতে শুধু নিচের একটা ঘরে থাকে ও। এ বাড়ির এই জনশূন্যতাই বোধ হয় গতকালের কাজটা ঘটাতে অনুঘটকের মতো আরো সাহস জুগিয়েছিল ওদের।


অত:পর কাজে ঢুকে নিজের স্বভাবজাত অভ্যাসে রোজকার মতো আবার মেতে ওঠে রথীন। স্কুলের পেছনের গেটের দিকটা পরিষ্কার করে প্রায়শই সে বাচ্চাদের টিফিনের সময় বসে থাকে কলপাড়ে রাখা বেঞ্চটার উপর। স্কুলের ফোর্থক্লাস স্টাফেদের জন্য তো আর কোনো আলাদা রুম থাকে না। তাই এই বেঞ্চটাই ওদের অঘোষিত স্টাফ শেলটার। সেখানে বিনুদার সাথে বসে গল্প করে সে। বিনুদার মধ্যে যদিও তার মতো কোনো আদিম প্রবৃত্তি নেই। তাই বিনুদা একটু চোখের আড়াল হলেই ওর পাশবিকক্রিয়া লুব্ধ চোখদুটো আনচান করে ওঠে। টিফিন সেরে হাত ধুয়ে কোনো মেয়েকে টয়লেটের দিকে যেতে দেখলেই ওর সেই চোখ দিয়ে অনিয়ন্ত্রিত দৃষ্টিক্ষুদার লালা ঝড়তে থাকে। তারপর এদিকওদিক তাকিয়ে যতটা সম্ভব নিস্তব্ধতা বজায় রেখে অবাধ্য পায়ে এগিয়ে যায় সে সেদিকে। মিনিট পাঁচেক পর তার ভেতরের পশুটাকে শান্ত করে পরিতৃপ্ত ভদ্র মানুষের মুখোশে আবার ফিরে আসে সে বেঞ্চটার দিকে।


সেদিন রথীনের স্কুলে থাকতেই বেশ নিদ্রাচ্ছন্ন লাগছিল। অত:পর দুপুর গড়ালে ঘরে ফিরেই সে কিছু খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। গতরাতের ঘুমের ঘাটতিতে শরীরটা বড্ড ম্যাচম্যাচ করছিল তার। স্কুল থেকে ফেরার পথে একবার প্রবীরকে কল করেছিল। ফোন বেজে গেছে। গতরাতের নেশাজনিত নিদ্রার ঘোর বোধ হয় তার কাটেনি তখনো। অত:পর ভাতঘুম ভেঙে উঠতে বেশ দেরি হয়ে গেল রথীনের। বাইরে সন্ধ্যা প্রায় ছুঁইছুঁই তখন। হঠাৎ মনে হল গতরাতের অস্থিরতাটা গুটিগুটি পায়ে ভেতর থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে ওকে আবার জাপটে ধরতে চাইছে। বাইরে দিনের আলো কমার সাথে সাথে সেই অস্থিরতার ঘনত্বও ওর সমগ্র অস্তিত্ব জুড়ে সমতা রেখে বাড়তে লাগলো। এমন সময় অজান্তেই জানলা দিয়ে রথীনের চোখ চলে গেল বাইরের সেই পাঁচিলের দিকে। আর সেখানে নজর পড়তেই একছুটে বাইরে বেরিয়ে এলো সে। নিজের চোখের ভুলকে শুধরে নিতে হাত দিয়ে দুচোখ কচলে রথীন তাকিয়ে দেখলো, বাড়িটার প্রায় ৮ ফুট উঁচু ভাঙা কাঁচের টুকরো গাঁথা পাঁচিলের গা বেয়ে শুকনো জমাট রক্তধারার দাগ। প্রায় দেড় দুহাত পরিসর জুড়ে সে দাগের ধারা পাঁচিলের উপর থেকে বিবিধ দৈর্ঘ্যে মাটির দিকে নেমে এসেছে। ঠিক যেখানে সে গতকাল স্বপ্নে অবয়বটিকে হাঁটতে দেখেছিল, সে জায়গা জুড়ে। সারা শরীর বেয়ে তখন এক অদ্ভুতরকম শিহরণ বইতে লাগলো রথীনের। ঠিক তখনই পাশ থেকে একটা ফ্যাসফেসে গলায় একজন বলে উঠলো,


"ওদিকে কি দেখছেন মশাই?"


কথাটায় কেমন একটা চমক লাগলো রথীনের। পাশে তাকিয়ে দেখলো সারা মুখে বসন্তের দাগে ভর্তি একজন অল্প বয়সী লোক দাঁড়িয়ে রয়েছে তার দিকে চেয়ে। রথীনকে চুপ থাকতে দেখে সে বলে চললো,

"এ এলাকায় নতুন নাকি?"

একটু থতমত খেয়ে রথীন উত্তর দিল,

"হ্যাঁ, এই দিন পাঁচেক হল এসেছি। ওই বাড়িটায় ভাড়া থাকি।" বলে ডানহাতের তর্জনী তুলে বাড়িটাকে দেখালো। লোকটা একটা বিকৃত হাসি হেসে কতকটা কৌতুকের স্বরে বললেন তখন "মিত্তিরবাবু তাহলে ভাড়াটে বসাতে পেরেছেন। নিজে তো এ বাড়ির পাশে টিকতে পারলেন না।"

ইতস্তত ভীতিজনক কৌতুহলে রথীন জানতে চাইলো, "কেন?"


"সে বিস্তর কথা, যখন জানতে চাইছেন তখন বলি। এই যে বাড়িটার পাঁচিলের দিকে আপনি চেয়ে রয়েছেন, সেটা ভুবন বাঁড়ুজ্যের বাড়ি ছিল। তিনি একসময় এখানকার জমিদার ছিলেন বলতে পারেন। তার বড় ছেলে ছিল সাদামাটা মাটির মানুষ। তার ছিল ট্রান্সফারের চাকরি। একবার সে পুরুলিয়া থেকে ফেরার পথে এক মহিলা আর তার মেয়েকে নিয়ে এ বাড়িতে উঠিয়েছিল। সে মহিলার নাকি কেউ ছিল না। আর গ্রামের অশিক্ষিত মানুষেরা ওকে ডাইনি অপবাদে পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিল। ও নাকি ওর স্বামীর সাথে এক সাঁওতাল মেয়ের ফষ্টিনষ্টি দেখে কি শাপ দিয়েছিল, তাই স্বামীটা একদিনের মধ্যে বীভৎসভাবে মরে গিয়েছিল। এমনি আরো দুই পুরুষের বদ নজরকেও নাকি ও শাপ শাপান্ত করেছিল বলে তাদেরও তথৈবচ পরিণতি হয়েছিল। তাই সবাই বলতো ওর জিহ্বায় বিষ আছে। যাইহোক গে! তাতেই গ্রামের লোক ওকে ডাইনি বলে মারতে চেয়েছিল। বাঁড়ুজ্যের বড় ছেলেকে দাদাবাবু ডেকে বেশ বশ করে নিয়েছিল সেই মহিলা, এমনটা বাঁড়ুজ্যে গিন্নী বলতেন। তো একদিন সেই মহিলার ছোট্ট নয় বছরের মেয়েটার নিথর রক্তাক্ত দেহ পাওয়া গেল ডোবার পাড়ে, যে মেয়ে সারাদিন এ বাড়ির আনাচকানাচে দৌড়ে খেলে বেড়াতো। তাকে নাকি বাঁড়ুজ্যের ছোটো শালা আর তার ইয়ার বন্ধুরা বাড়ির পেছনে জুয়াখেলার আসরে নিয়ে গিয়েছিল। আর তারাই বন্ধুরা মিলে সেই মেয়ের সাথে ... বুঝতেই পারছেন। তারপর থানা পুলিশ যাতে টের না পায় তার জন্য বাঁড়ুজ্যেরা ওই বাচ্চাটার মাকে, মানে ওই মহিলাকে অন্যকিছু বুঝিয়ে চুপ করানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু শোকে পাগল হয়ে ওই মহিলার ভেতরের ডাইনি তখন আবার সোচ্চার হয়ে উঠেছিল। সে তারস্বরে শাপশাপান্ত করে বলেছিল সেদিন,


"মইরবে, সব মইরবে। আমার বেটির সাথে এত্ত বড় অন্যায়। ধম্মে সইবে না। আমি বলছি এ বাড়ির, এ গাঁয়ের কোনো শকুন ব্যাটাছেলেই বাঁইচবে না আর।"

পরেরদিন সেই মহিলা নাকি বিষ খেয়ে মরেছিল বা হয়তো বাঁড়ুজ্যেরাই মেরে দিয়েছিল তাকে। তারপর দু বছরের মধ্যে এ বাড়ির সব মর্দ এক এক করে বিকৃতভাবে মরে গেল। তারা সবাই নাকি রাতের দিকে দেখতো ওই বাচ্চা মেয়েটাকে। শুনতে পেত ওর হাসির স্পন্দন। ছোট্ট অবয়বে সারা বাড়ি আর পাঁচিল জুড়ে খিলখিলিয়ে হেসে হেঁটে বেড়াতো সে। কথাগুলো শুনে রথীনের সারা শরীর যেন অবশ হয়ে আসতে লাগলো। তার শরীরের প্রতিটা রোমকূপ তখন সোজা ও শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে ঝাঁটার কাঠির মতো। লোকটা বলেই চললো,


"তারপর থেকে এ বাড়িতো দূর আশপাশের পাড়াতেও যদি পুরুষদের কোনো চরিত্রগত দোষ থাকতো, তো ওই মহিলার অভিশাপ লেগে যেতো। আর ওই বাচ্চা মেয়েটার আত্মা জেগে উঠে সেই পুরুষকে বিভৎসভাবে আপন করে নিতো।"

"আ-আ-আপনি বিশ্বাস করেন এসব?" তোতলানো ভয়ার্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো রথীন।

"এ পাড়ার বেশিরভাগ লোকই করে, কিন্তু আমি করতাম না। তবে দিন সাতেক হল আমি বিশ্বাস করতে লেগেছি।"


লোকটার কথা বলার মধ্যেই রথীন টের পেল, ওর কাঁধের কাছে কার যেন একটা ঈষদুষ্ণ শ্বাস পড়ছে। আতঙ্কে ওর ভেতরের নি:শ্বাসটা প্রায় রোধ হতে হতেই শুনতে পেল এক পরিচিত গলা,

"কি করছিস এখানে?"

বিদ্যুৎবেগে রথীন পেছন ফিরে দেখলো প্রবীর দাঁড়িয়ে। বুকের ভেতরের হাতুড়ি পেটানো শব্দটা যেন হঠাৎ স্থিত হল তাতে। ওকে ইতস্ততভাবে বলতে লাগলো,

"এই একটু কথা বলছিলাম ওনার সাথে"।

বলে লোকটাকে দেখাতে গিয়েই অবাক চোখে দেখলো পাঁচিলের পাশ বরাবর অন্ধকার পথটা সম্পূর্ণ জনমানবশূন্য। কেউ নেই। গেল কোথায় লোকটা! এইতো এইমাত্র এখানেই ছিল ... ভেবে একটু অবাক হয়েই রথীন প্রবীরের দিকে ফিরে বললো,

"ঘরে বসবি চল"।

"হুম চল। অনেক কথা আছে তোর সাথে।"

রথীন এগিয়ে ঘরে ঢুকে বাল্বটা জ্বালিয়ে প্রবীরকে ডাকতে গিয়েই হঠাৎ লোডশেডিং হয়ে গেল। তারপর পকেট থেকে দেশলাই বাক্স বের করে একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে পাশে টুলের উপর রেখে দুজনে মুখোমুখি বসলো বিছানার উপর। তারপর প্রবীরকে জিজ্ঞেস করলো "তোকে দুপুরে কতবার কল করেছি। কখন উঠেছিস?"

"অনেক দেরি হয়ে গেছিল রে। কালরাতে তোর ফোন রেখে বললাম না, দরজায় কে ধাক্কাচ্ছে!"

"হুম। সত্যি কি কেউ ধাক্কাচ্ছিলো? আমি তো ভেবেছিলাম তোর নেশার ঘোরে ..."

রথীনকে থামিয়ে প্রবীর বলে চললো,

"সত্যি এসেছিল রে। একটা অপরিচ্ছন্ন ফ্রক পরা বাচ্চা মেয়ে। আমাকে কালকের মেয়েটার কথা জিজ্ঞেস করছিল। আমি প্রথমে মোটেই কোনো সত্যি বলতে চাইনি। বলিইনি যে তুই আর আমি মিলে এ বাড়িতে মেয়েটার সাথে কি করেছিলাম। আর তাছাড়া মেয়েটার শ্বাসটান ছিল বলেই তো কাল টপকে গিয়েছিল। নইলে ..."

"মানে?"

"হ্যাঁ, মেয়েটা সিম্পলি টপকে গিয়েছিল রে, ওকে ছাড়তে যাওয়ার আগে। তাই আমি টের পেয়ে ওকে আর বড় রাস্তায় না নিয়ে গিয়ে এ পাড়াতেই সালটে দিয়েছি। বিশ্বকর্মা পুজার উত্তাল মাইক আর নেশার নাচে এসব কেউ টের পায়নি যখন, তখন অতো ছোটো একটা মেয়েকে কেন বলতে যাবো?"

"কে সেই ছোট্টো মেয়ে? কালকের মেয়েটার বোন টোন নয়তো? আর কাল মেয়েটা মরে গিয়েছিল, বলিস নিতো। ওর শ্বাসটান তো এখানেই হচ্ছিলো। আমি তা টের পেয়েই তো তোকে মানা করছিলাম। তা তুই শুনলে তো ..."

রথীনের কথা থামিয়ে প্রতিবাদী মেজাজি স্বরে বলে উঠলো প্রবীর,

"ওহহো! নিজের ফূর্তিটা তো হয়েই গিয়েছিল। আমি বকরি আনলাম আর আমিই চাখবো না। আর তুই কি ভাবিস সব দোষ আমার? তুই যেন সাধুপুরুষ।"

"যাহ বাবা! আমি কি করেছি কাল? তুই তো নিয়ে এলি ওকে ভুলিয়ে ভালিয়ে। আর তোর ফূর্তির চোটেই তো ও মরে গেল।"

আত্মপক্ষ সমর্থনে বলতে থাকলো রথীন।

"ওহ শালা, তুমি যেন ধোয়া তুলসীপাতা। রোজ স্কুলের বাথরুমে ঝাঁক মারো। সেটা ফূর্তি নয়?"

"দেখ, তাই বলে কাউকে ঘরে এনে, তার শরীর না বুঝে নিজের সুখের জন্য তাকে মেরে ফেলবো ..."

"মেরে ফেলতে কে চেয়েছিল শালা? ওতো মরে গেল। তাইতো ডোবাটায় ফেলতে গিয়ে কত কসরত করতে হল আমায়।"

"ডোবায় মানে, ওই বাড়ির পাশের ডোবাটায়?"

"হ্যাঁ। বাবুর গ্যারেজে রাতেই গাড়িটা ঢুকিয়ে দিয়ে বাড়ি ফিরতে হত। আর সামনে শালা তখন ছেলেছোকরাদের উত্তাল নাচ চলছিল। তাই ডোবাতেই ফেলে দিয়েছি শালীকে। মুখটাও থেবড়ে দিয়েছি। যাতে ভেসে উঠলেও চেনা না যায়। কিন্তু গতকাল রাতে আমার ঘরে আসা বাচ্চা মেয়েটা যে কি করে সব জেনে গিয়েছিল কে জানে! ও নাকি তোর প্রতিবেশী। ও ... ওইতো তোর জানলায় দাঁড়িয়ে ও শুনছে সব কথা। দেখ!"

বলে জানলার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করলো প্রবীর। জানলার দিকে চেয়ে তৎক্ষণাৎ এক লাফে দুতিন হাত পেছনে ছিটকে সরে এলো ভয়ার্ত রথীন। জানলায় তখন উঁকি দিচ্ছে বীভৎস চেনা সেই কচি মুখটা। ওর মনে হল গ্রিলের ফাঁক দিয়ে সেই অবয়বটা যেন গোগ্রাসে গিলতে আসছে ওকে। এমনসময় দরজায় কড়া নাড়ানোর আওয়াজে চমকে কেঁপে উঠলো রথীন। আতঙ্কে ঘরের এককোণে সিটিয়ে বসে রইলো সে। তার চোখে তখন টুলের উপর জ্বালিয়ে রাখা মোমবাতির শিখা থেকে ওঠা ধোঁয়াও যেন এক অদ্ভুত ছায়ামূর্তির আকার নিচ্ছে। তোতলানো স্বরে বলতে লাগলো রথীন,

"প্র-র-র-বীর আ-আ-আমাদের অভিশাপ লেগেছে। আ-আ-আমরা কেউ বাঁচবো না। সরে আয় তুই ওই জানলার পাশ থেকে। ও তোকে শেষ করে দেবে।"

তখন কানে এলো লতিফের উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর,

"দরজা খোল রথীন। কিরে ঘরে আছিস?"

বন্ধুর গলা পেয়ে বেশ কিছুটা সাহস আর শক্তি বলপূর্বক সঞ্চয় করে কোনোরকমে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে এসে দরজা খুললো রথীন।


বাইরে বেরিয়ে এসেই দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে লতিফকে জাপটে ধরে ভয়ে কাঁদতে লাগলো সে। ওর মাথায় বন্ধুসুলভ হাত রেখে লতিফ বললো,

"জেনেছিস তাহলে খবরটা? কি করে যে কি হয়ে গেল, কিছুই বুঝতেই পারছি না। আমি তো এই কিছুক্ষণ আগে কাজ থেকে ফেরার পথে ওর বাড়িতে গিয়েছিলাম। বাইরে থেকে দেখি লোকে লোকারণ্য। ভেতরে গিয়ে দেখি ওকে শুইয়ে রেখেছে। সাদা কাপড়টা তুলতেই আমার সারা শরীরটা কেঁপে ওঠে। কি বীভৎসভাবে প্রবীরের সারা মুখটাকে যে কেউ ক্ষতবিক্ষত করেছে, তা তুই না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবি না"

কথাটা শুনেই চমকে লতিফকে ছেড়ে ছিটকে সরে এলো রথীন। তার কানে লতিফের কথাগুলোকে চাপা দিয়ে ধীরে পৌঁছচ্ছে তখন দুটো গলার ফিসফিসানো হাসির শব্দ। সারা শরীর অবশ লাগছে তার। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে তখন সে ধীরে মাথাটা ঘুরিয়ে তাকালো তার ঘরের আধভাজানো দরজা পেড়িয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন ভেতরের দিকে। সেখানে তখনো খাটের উপর তার দিকে পেছন করে বসে আছে প্রবীর। আর তার উল্টোদিকে বসে আছে সেই ছোট্ট অবয়বটি। আড়াআড়িভাবে প্রবীর মুখটা দরজার দিকে ঘোরাতেই, মোমবাতির আধো আলোতে রথীন দেখলো প্রবীরের চোখদুটো বিচ্ছিরিভাবে বেরিয়ে এসেছে স্প্রিং এর মতো। সেই মৃত চোখে রয়েছে তার প্রতি বন্ধুসুলভ পৈশাচিক আহ্বান। আর তার আড়ালে দেখা যাচ্ছে সামনে বসা অবয়বটার মাংসল পিণ্ডাদি সহ রক্তে মাখামাখি মুখমণ্ডল। দুজনের একনাগাড় পাশবিক হাসির উচ্ছ্বাসের রোলে কেঁপে কেঁপে নিভে গেল টুলের উপরের মোমবাতিটা। তারপর সব মুহূর্তে অন্ধকার, স্তব্ধ। রথীনের আবার কানে আসছে তখন লতিফের কথা,

"জানিস, প্রবীরের চোখদুটো কিভাবে যে উপড়ে ছিল .. উফ! তুই দেখলে সহ্য করতে পারতিস না।"


সারা শরীরের এক একটা অংশ তখন অসাড় হয়ে চলেছে রথীনের। আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না সে। জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়লো মাটিতে। লতিফ ডাক্তার ডাকলে, তিনি রথীনের হার্টফেলে মৃত্যু হয়েছে বলে জানালেন। বন্ধুর নিথর দেহের পাশে বসে থাকা লতিফের কানে পৌঁছালো তখন কিছু প্রতিবেশীর নিচু গলার আলোচনা।


"অভিশাপ লেগেছে, অভিশাপ। ওই মা বেটির আত্মা আবার জেগে উঠেছে। দেখলে না আগের হপ্তায় কেমন বুবাইকে মেরে ফেললো।"


"বুবাই মানে সারামুখে বসন্তের দাগওয়ালা ছেলেটা?"


"হ্যাঁ গো। এ পাড়ার বৌগুলোর উপর বড্ড কুনজর ছিল তার। কদিন আগেতো মহিনের বৌয়ের সাথে বাড়াবাড়ি করে ..."


কথাগুলোকে পেছনে ফেলে ধীরপায়ে উঠে দাঁড়িয়ে বাঁড়ুজ্যে বাড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো লতিফ। ঘুটঘুটে অন্ধকার সারা গায়ে মেখে তিনমহলা বাড়িটা যেন এক দৈত্যাকৃতি নিয়ে গ্রাস করতে চাইছে এবার তাকে। অচেনা মানুষগুলোর মুখ থেকে শোনা অজানা কাহিনীকে তার চোখের সামনের দুই বন্ধুর অলৌকিক মৃত্যু বিশ্বস্তসূত্রে গেঁথে দিতে লাগলো তার ভয়ার্ত অন্তরে। ভেতরে একটা আতঙ্কের শিহরণ লতিফকে মনে করিয়ে দিতে লাগলো, তিনবন্ধুর সাথে কাটানো রঙিন নিশির জলসার পাপবেত্তাগুলোকে। একটা প্রাণ বাঁচানোর মরিয়া তাগিদ তাকে ইঙ্গিত দিতে লাগলো নিজের ঘরের পথের। কিন্তু পথটা যে ওই বাড়ি ঘেঁষেইই ...। অত:পর বন্ধুর মৃতদেহকে পেছনে ফেলে সাহসী মনে কয়েক পা বাড়াতেই পেছন থেকে ভেসে এলো এক পরিচিত সম্মোহিত ডাক। লতিফ পিছনে ফিরতেই, দেখলো রথীন সেই পাঁচিলের উপর বসে ইশারা দিয়ে ডাকছে তাকে। তার পাশে বসে খিলখিলিয়ে হাসছে একটা ছোট্ট অবয়ব। আর তার পাশে আরো আরো অনেক অবয়ব ... ভীষণ তীক্ষ্ণ বন্ধুসুলভ দৃষ্টিতে তারা সবাই চেয়ে আছে ওর দিকে।


(সমাপ্ত)


Rate this content
Log in

More bengali story from Sheli Bhattacherjee

Similar bengali story from Horror