Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

Sheli Bhattacherjee

Horror


3.2  

Sheli Bhattacherjee

Horror


আতর

আতর

26 mins 2.0K 26 mins 2.0K


#পর্ব - ১


(১)

কলিংবেলটা বাজাতে গিয়েও হাতটা সরিয়ে আনলো সোমেন। খেয়াল করলো বারান্দার দরজাটা খোলা। একটু ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই ক্যাঁঁচ করে মৃদু আওয়াজ হল। সোমেন ধিমে গলায় ডাক দিল,

"অরিত্র?"

কোনো সারাশব্দ না পেয়ে বুকের ভেতরটা একটু কেঁপে উঠলো যেন। ছেলেটার কিছু হল না তো? কয়মাস ধরে যেসব আজগুবি কথা বলছিল ... আর বলছিলই বা ভাবছি কি করছিলও তো। হে ভগবান হতাশায় ডুবতে ডুবতে ছেলেটা কিছু আবার করে না বসে। এসব এলোমেলো ভাবনার মধ্যেই সোমেনের চোখদুটো গেল টেবিলের উপর। একটা খোলা খাতার পাতা টেবিলের উপর জানলার সামনে রাখা। জানলা দিয়ে বয়ে আসা মৃদু হাওয়ায় পাতাগুলো হালকা নড়াচড়া করছে। সেদিকে একটু এগিয়ে যেতেই চমকে উঠলো সোমেন। ঠিক যা সন্দেহ করছিল, তাই। খাতার ডানদিকের পৃষ্ঠায় একটা ছবি আঁকা। তাতে পাতাটার মধ্যিখান বরাবর একটা নীলাভ ষড়ভুজ, আর তার মাঝে মানব মস্তিষ্কের পশ্চাদাংশের স্কেচ করা। মস্তিষ্কের স্কেচটি গোলাপি কালার দিয়ে করা। আর বাঁ দিকের পাতাটিতে কিসব লেখা ... তার উপরে লেখা আছে, কয়েক সেকেন্ডে স্বপ্নপূরণ। 

সমস্ত ব্যাপারটা দেখে সোমেনের মনের ভীতিটা আরো তীব্র হল। খাতাটা বন্ধ করে, পাশেই রাখা একটা ক্রিস্টাল পেপার ওয়েট তার উপর চাপা দিতে যেতেই তার কাঁধে একটা হাত ছুঁলো। অদ্ভুত একটা শিহরনে হঠাৎ সোমেনের হাত থেকে পেপার ওয়েটটা পড়ে যেতেই আরেকটা হাত লুফে নিল সেটা। সোমেন চমকে দেখলো পিছনে অরিত্র দাঁড়িয়ে। 

"ঠিক এভাবেই ভাগ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হয় বন্ধু। তার মধ্যে লুকিয়ে রাখা সৌভাগ্যগুলোকে লুফে নিতে হয়। কিন্তু ভেঙে গুঁড়িয়ে যেতে দিতে নেই কোনো বিরূপ পরিস্থিতিতে। বুঝলি?" মৃদু হেসে বলে উঠলো অরিত্র।

সোমেন তাকিয়ে দেখলো অরিত্রের চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। ও বিরক্ত হয়ে বলতে শুরু করলো,

"তার মানে তুই কাল রাতেও ঘুমাস নি। এসব করেছিস! আর এগুলো কি করেছিস তুই খাতায়?"

"আরে শোন, তোকে কিছু কথা বলি।" বলে বলপূর্বক সোমেনকে টেনে নিয়ে বিছানায় বসালো অরিত্র।

"না, আমার এসব শোনার বা জানার কোনো ইচ্ছাই নেই। এতোদিন তো চলছিল এই টোটকা ওই টোটকার প্রয়োগ। কিন্তু এগুলো আবার কি? ছবি এঁকেছিস কেন?"

"আরে বন্ধু একটু শান্ত হ'তো আগে, বলছি সব।"

"কি আর নতুন করে বলবি বলতো? আমার আর ভালো লাগছে না এসব আনসাইন্টিফিক কথাবার্তা শুনতে। তুই বুঝতে পারছিস না, তুই কেমন করে পালটে যাচ্ছিস দিনে দিনে। এতো অন্যমনস্ক হয়ে গেছিস যে, বাইরের গেটটা খুলে রেখেছিস। আর এই এতো বড় বাড়িতে একা একা বসে থেকে, পাগল হয়ে যাচ্ছিস। কতবার তোকে বলেছি, আমাদের বাড়িতে চল। দুজনে মিলে আমাদের চিলেকোঠার ঘরে থাকবো।"

"উঁহু, একেবারেই না" বলে তীব্রভাবে মাথাটা নাড়িয়ে প্রতিবাদ করে উঠলো অরিত্র। আর সোমেনকে চুপ করিয়ে বলতে থাকলো,

"আমি এই বাড়িকে এতোদিন অভিশপ্ত বাড়ি ভাবতাম তো? কিন্তু আদতে তা নয়। এখন এ বাড়ির নির্জনতাই আমাকে একের পর এক সাফল্য এনে দিচ্ছে। যে সাফল্যগুলো আমি আগের বাড়িতে পাইনি, এই বাড়িই আমাকে তা দেবে।"

সোমেন মনে মনে ভাবতে লাগলো, তার বন্ধুটা পাগল হয়ে গেল নাতো? যে কিনা এ বাড়ির শরিকি ঝামেলায় একদিন বিরক্ত ছিল। এ বাড়িতে আসার দুমাসের মধ্যে ওর মা মারা যাওয়াতে এই বাড়িকে অভিশপ্ত বলে মনে করতো। সে কিনা আজ ..?

"কি ভাবছিস অ্যাতো? যেটা বলছি মন দিয়ে শোন।"

অরিত্রের কথায় সোমেনের ভাবনাগুলো ছেঁড়া ঘুড়ির মতো গোঁঁৎ খেয়ে নেমে এলো ঘরের মধ্যে। অরিত্র বলে চলেছে,

"এতোদিন যা যা আর্টিকেল পড়েছি বা প্রয়োগ করেছি, তার মধ্যে এইটা সবচেয়ে বেশি ইন্টারেস্টিং। তুই বলছিলিস না, আনসাইন্টিফিক ব্যাপার। নারে, সবকিছু তা নয়। এই আর্টিকেলটা অনেকটাই বিজ্ঞানভিত্তিক, চিন্তাজগত কেন্দ্রিক। আমি এটা কাল নয়, গত দু সপ্তাহ ধরে অ্যাপ্লাই করছি। আর তা করতে বসে উপলব্ধি করেছি যে, এটা খুব একটা সহজ অভ্যাস নয়।" বলে টেবিলের উপর থেকে পেপারওয়েটটা সরিয়ে খাতাটাকে নিজের কোলের উপর নিয়ে এলো অরিত্র। 

সোমেনের এসবে কোনদিনই তেমন আগ্রহ ছিলোনা। তবুও অগত্যা অরিত্র ওকে চেপে বসিয়ে দিল। তারপর খাতাটা খুলে বলতে শুরু করল, "এতদিন ধরে ইন্টারনেটে অনেক কিছুই পড়ছিলাম,শুনছিলাম,দেখছিলাম। কিন্তু ঠিক এটার মতো নয়। আর এরকম অনেক তথ্যই তো আমি বাস্তব জীবনে হাতে কলমে প্র্যাকটিস করেছি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সত্যিই অভাবনীয় সাফল্যও পেয়েছি। তো সেদিন এরকমই কিছু খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ এই ভিডিওটার লিংক পেলাম। ভিডিওটা মূলত law of attraction এর উপর। কথাটা প্রথমে শুনে বুঝে উঠতেই পারিনি যে, এই মুহূর্তে এটা আমার এতটা কাজে লাগতে পারে। যাই হোক তথ্যটার মূল বক্তব্যটা বলি শোন, এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো স্বপ্ন পূরণ করার চাবিকাঠি হাতের মুঠোয় পাওয়া।" 

কথাটা শুনেই সোমেন একটু বিরক্তি আর বিষ্ময় মিশিয়ে প্রশ্ন করলো "কি? স্বপ্নপূরণের চাবিকাঠি পাওয়া?"


(২)

"ম্যাডাম, শুট রেডি হয়ে গেছে। ডিরেক্টর এসেছেন। একটু ডাকছেন আপনাকে এদিকে।"

বিশুর ডাকে পেছনে ফিরে তাকালো দৃষিতা। তারপর মৃদু হেসে বললো "তুমি যাও, আমি এক্ষুণি আসছি।"

কিন্তু, 'এক্ষুণি আসছি' বলেও যে পাদুটোকে সাগরের স্পর্শ থেকে সরাতে মন চায় না দৃষিতার। সমুদ্র বরাবরই বড্ড প্রিয় তার। সেই ছোটো থেকেই সে বাবার কাছে সমুদ্র দেখার বায়না করতো। কিন্তু বাবার হাত ধরে সমুদ্রসৈকতে হাঁটার স্বপ্নটা তার আর এ জীবনে কোনোদিনই পূরণ হবে না। গত চারবছরে অতনুর হাত ধরে অভিনয় জগতে প্রবেশ করে টুকটাক এদিকওদিক যাওয়া হয়েছে দৃষিতার। তবে সমুদ্র সৈকতে এই প্রথমবার। এমনিতে দৃষিতার বাস্তব চরিত্রের উপর তৈরি স্ক্রিপটই বেশি পছন্দের। টেলিফিল্মও তার খুব পছন্দের একটা কাজের এরিয়া। কিন্তু অলৌকিক বা ভৌতিক চিন্তা ধারায় না আছে তার কোনো বিশ্বাস, না আছে আগ্রহ। একমাত্র এই হরর মুভিটার ৭০% শুটিং সমুদ্রসৈকতে হবে বলেই, সে কাজ করতে রাজি হয়েছে। গতকাল রাতে এই শুটিং পারপাসেই তাদের টিমের মন্দারমনিতে আসা। আর একটা নির্জন সৈকতের বালিয়াড়ি জুড়ে বড় বড় ছাতা সেট করে গণ্ডা কয়েক চেয়ার পেতে কাজে লেগে পড়া। এই কয়েক ঘন্টার মধ্যে বোধ হয় শুটিং বাদে প্রায় চার পাঁচ ঘন্টা মতো সময় দৃষিতা এই সমুদ্রপারেই ঘুরে বেরিয়েছে। সমুদ্রের বিশালতায় আর তার একের পর এক ঢেউতোলা গর্জনের মাদকতায় হারিয়ে ফেলেছে নিজেকে। কখনো একা, কখনো অতনুর সাথে, কখনোওবা টিমের আরো অনেকের সাথে। 

তবে আজ আকাশটা সকাল থেকেই বড় মেঘলা। টুকরো টুকরো মেঘের ছাইরঙা ভেলা উড়ে বেরাচ্ছে সারা আকাশ জুড়ে। যেন একটু ছুঁয়ে দিলেই তাদের অভিমানগুলো বৃষ্টি হয়ে নেমে আসবে এই ধরিত্রীর বুকে। দৃষিতার মনে হয়, সৃষ্টিকর্তার অপরূপ এই সৃষ্টির সম্মুখে দাঁড়িয়ে যেন তার অতীতের সব মলিন মুহূর্তগুলো মুছে যায়। শুধুই অসীমের মধ্যে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে নি:স্ব হয়ে যেতে চায় তখন মন। 

এমন সময় দৃষিতার দ্বিতীয়বার ডাক পড়লো শুটিং সাইট থেকে। এবারের ডাকটা তার খুব প্রিয় কাছের কণ্ঠের। মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়িয়ে সে অতনুকে উদ্দেশ্য করে সবে চিৎকার করে বলতে গেল 'আসছি', ঠিক তখনই তার পায়ে ঠেকলো একটা ভাঙা ছোট্ট কাঁচের শিশি। নিচে ঝুঁকে হাত দিয়ে তুলে নিয়ে দেখলো তার গায়ের চারপাশে লাল রঙের ফেব্রিক কালার দিয়ে ছোটো ছোটো লাভ সাইন আঁকা। কিন্তু শিশিটার মুখের দিকে অনেকটাই ভাঙা। আর একটা মিষ্টি গন্ধ লেগে আছে তাকে ঘিরে। এই সৈকতে হাঁটতে গিয়ে এটাতে লেগে পাছে আবার কারো পা কেটে না যায় ভেবে, দূরের ঝাউবনের দিকে শিশিটা ছুড়ে ফেলে দিল দৃষিতা। তারপর দ্রুত পায়ে হেঁটে গেল শুটিং এর দিকে। অজান্তে যেন মনে হল শিশিটা অনেকটা দূরে গিয়ে একটা বেশ শব্দ সৃষ্টি করলো। যেন সেটা কোনো বড় পাথরের উপর ধাক্কা খেয়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল।


তারপর সূর্যাস্তের মায়াবী আলোতে একটা ছোটো রোমান্টিক সিনের শুটিং হল। সব সেরে ফ্রেশ হয়ে এসে যখন দৃষিতা আবার সমুদ্রের ঢেউয়ে পা রেখেছে, তখন বেশ রাত হয়ে গেছে। তার সাথে রয়েছে অতনু। রাতের সমুদ্র তখন বেশ স্নিদ্ধ। তার জলরাশির স্পন্দন নির্জন বালুকাতটে প্রতিধ্বনিত হয়ে যেন ছুঁয়ে যাচ্ছে অন্তর জগতকে। অতনুর হাত ধরে পা ভিজিয়ে চলতে চলতে গান ধরলো দৃষিতা, "দেখেছো কি তাকে ... ওই নীল নদীর ধারে ... বৃষ্টি পায়ে পায়ে তার কি যেন কি নাম"।

এমনসময়, হঠাৎ দৃষিতার পায়ে কিছু একটা লেগে, চোট খাওয়ায় গানটা থেমে গেল। 

"কি হল?" বলে অতনু নিচু হয়ে বালুচর হতে তুলে নিল একটা ছোট্ট কাঁচের শিশি। আর বলতে লাগলো, "ইস, তোমার পাটা কেটে গেল তো"?

দৃষিতা বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রয়েছে তখন অতনুর হাতে ধরা শিশিটার দিকে। যার গায়ে ঠিক সকালে পাওয়া শিশিটার মতোই একই রকম লাল রঙ দিয়ে লাভ সাইন আঁকা। আর গলার কাছটা ভাঙা।


(৩)

"এই বাবু কিরে ওঠ! কত বেলা হল জানিস? উত্তম এসেছে তোর সাথে দেখা করতে। বাইরের ঘরে বসে আছে।" মায়ের ডাকে কোলবালিশটা সরিয়ে আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলো অভীক। তারপর টেবিলের উপরে রাখা চায়ের কাপটা নিয়ে গিয়ে বাইরের ঘরের দিকে গেল। সেখানে তার সবরকম কুকর্মের সাথী তার প্রাণের বন্ধু উত্তম বসে আছে। আর সামনে রাখা কাগজের পাতাগুলো উল্টেপাল্টে দেখছে। অভীক একটা চার অক্ষরের অশ্রাব্য গালাগালের সাথে বন্ধুকে সকালের সম্বোধনটা সারলো। তারপর বলতে থাকলো,

"তুই আবার কবে থেকে নিউজপেপার পড়িস রে? এতো ভদ্র সাজিস না, এসব আমাদের মানায় না।" বলেই দুজনে বিকৃত হাসি হেসে উঠলো। 

"আরে না না, জেঠু মানে তোর বাবা এখানে ছিলেন, তাই একটু নাটক করা আর কি। নইলে শালা জীবনে যে ঠিক করে পড়ার বই উলটে দেখেনি সে আজ দামড়া ছেলে হয়ে খবরের কাগজ উলটে দেখবে।" 

"যা বলেছিস। তা কিসের জন্য সকাল সকাল দর্শন দিলেন, বলে ফেলুন" অভীকের কৌতুককর প্রশ্ন।

"আরে কাল রাতে বিনুদের ঠেকে বসে কথা হচ্ছিলো যে, অনেকদিন কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয় না। তাই ভাবছিলাম, চলনা সামনের শনি রবিবার মন্দারমনিতে ঘুরে আসি।"

"আবার?" বলে বেশ একটা ব্যাঙ্গাত্মক হাসি দিল অভীক।

"আরে ভাই, মন্দারমনি আমাদের যে সুখ তিন মাস আগে দিয়েছে, সে কি আর ভোলা যায়। আর তুই তো জানিসই আমরা সব বংশগতভাবে ভিখিরির জাত। তুই একমাত্র ভরসা।"

"আরে ঠিক আছে, ঠিক আছে। এতোকিছু বলতে হবে না। নে চল, সব গুছিয়ে নে। শনিবার মানে তো কাল। বেরিয়ে পরবো তিনজনে। বিনুকে বলে দে।"

"তুই বস না থাকলে আমাদের জীবনটা এক্কেবারে বিস্বাদ হয়ে যেতো।" বলে অভীককে একবার জড়িয়ে ধরেই বেরিয়ে পড়লো উত্তম।


#পর্ব - ২


(৪)

সোমেনের প্রশ্নের উত্তরে অরিত্র মৃদু হেসে বলতে থাকলো,

"আগে পুরো ব্যাপারটা মন দিয়ে শোন।"

বলে বেশ সিরিয়াস কণ্ঠে বলা শুরু করলো অরিত্র,

"তো এই স্বপ্ন পূরণ করার পদ্ধতিতে মাত্র সতেরো সেকেন্ড সময় লাগে। তবে ঠিক সতেরো সেকেন্ড বলবো না। কারণ, এটা দ্বিগুন, তিনগুন এমনকি বহুগুণও হতে পারে ব্যক্তি বিশেষে। 

ধর, কোনো একটা ব্যাপারে তুই খুব খাটছিস, কিন্তু সাফল্য আসছে না। অথবা কাউকে তোর খুব ভালো লাগছে, কিন্তু সে তোর কাছে আসছে না। সেক্ষেত্রে তুই কি করবি, একটা নির্জন জায়গায় বসে এক মনে এই ১৭ সেকেন্ড সময় ধরে ওই সাফল্যটাকে বা ওই ব্যক্তিকে চিন্তা করে যাবি। যে সাফল্য পাওয়ার জন্য তুই উদগ্রীব হয়ে রয়েছিস, শুধুই সেটার কথা ভাববি। মাথায় রাখবি, তোর চিন্তাজগতে ওই চিন্তাটা ছাড়া আর কোন চিন্তা যেন সেসময় কোনভাবেই প্রবেশ না করে। বেশ কয়েকদিন ধরে দিনে চার পাঁচবার করে করতে থাকবি এই অভ্যাস। তবে রাতে বসে একনাগাড়ে করতে পারলে তা আরো ভালো হয়। তারপর দেখবি ধীরে ধীরে সেই ব্যক্তি বা ব্যক্তি সংক্রান্ত কিছু ইঙ্গিত আসছে তোর সামনে। তাকে লব্ধ করার কোনো পথ বাতলে দিচ্ছে তোর মাইণ্ড। মানে সাফল্যকে পাওয়ার জন্য আর কি!"

অরিত্রের কথায় এবার সোমেন আন্দাজ করতে পারলো যে, ও কার জন্য এই নতুন খেলায় মেতেছে!

অরিত্র বলতে থাকলো উচ্ছ্বাসিত হয়ে,

"হ্যাঁরে সত্যি কথা বলছি। এটা একটা সাইকোলজিকাল প্র‍্যাকটিস। আমাদের সাবকনসাস মাইন্ডে এভাবে আমাদের ইচ্ছার্থক সিগনাল পাঠানো যায়, যা একটা তীব্র উইলিং ফোর্স সৃষ্টি করে আমাদের ভেতরে এবং বাইরে। বাকিটা না হয় তোকে আমার সম্পূর্ণ সাফল্য প্রাপ্তির পরেই বলব। কিরে, কেমন লাগলো মনের এই মায়াবী জগতের অভিনবত্বটাকে?"


সোমেন আপাতত চুপ থাকাটাকেই শ্রেয় মনে করলো। কারণ, এখন ও যাই বলবে, হয়তো অরিত্রের ঠিক মনের মত হবে না তা। 

অরিত্র আবার আনমনে বলে উঠলো,

"আমার কি মনে হচ্ছে জানিস? আমি এভাবে একটা লিঙ্ক খুঁজে পাব, আমার সেই হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার সাথে আবার দেখা হওয়ার।" 

এবার সোমেনের আর কোন দ্বিধা দ্বন্দ্ব থাকলো না। ও সঠিক আন্দাজই করেছিল। কিছুক্ষণ পর, 'আমাকে একটু বাজারে যেতে হবে' বলে উঠে দাঁড়াল সোমেন। অরিত্র হঠাৎ ওর বাঁ হাতটা ধরে বলে উঠলো, "এই ঘড়িটা তোর প্রথম টিউশনের টাকা দিয়ে কেনা না?"

"হ্যাঁ। কেন বলতো?"

"না, এমনি। সামলে রাখিস এটা। এও এক সাফল্য। হারিয়ে যেতে দিস না।"

অরিত্রের সবকথাই সোমেনের দুর্বোধ্য ঠেকছিল তখন। তাই দেরি না করে ওর বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাজারের পথে বেরিয়ে পড়লো ও। পথে যেতে যেতে আনমনে চিন্তা করতে লাগলো সোমেন, ছোট বেলা থেকে বাবাকে সেরকম চোখে দেখেনি অরিত্র। মায়ের কাছেই ওর বড় হয়ে ওঠা। শরিকি ঝামেলায় এত বছর ওরা অন্যবাড়িতে থাকতো। জেঠু মারা যাওয়ার পর, জেঠুর ছেলেরাই ওদের ডেকে এনে এবাড়িতে তুললো। বাড়ির বাকি সব সদস্য দেশের বাইরে সুপ্রতিষ্ঠিত। তাই বাড়ি পাহারা দেওয়ার জন্যই হয়তো ! কিন্তু এ বাড়ীতে আসার কয়েক মাসের মধ্যেই অরিত্রের মাকে মারণ রোগে ধরল। তার চিকিৎসা করানোর তেমন সুযোগ পেল না ছেলেটা। টাকার জন্য তখন কাকা জেঠাদের কাছে কত আকুতি মিনতি করেছিল, কিন্তু সে রকম সাহায্য কেউ আর করল কই। অবশেষে দু মাসের জীবন যুদ্ধে হেরে গেলেন কাকিমা। আর একেবারে একা হয়ে গেল অরিত্র। এখন যেন মনে হয় এই একাকীত্বকেই ও সঙ্গী করে নিয়েছে। এসব ভাবতে ভাবতেই সোমেনের মনে পড়ে গেল সেই মেয়েটির কথা। নামটাও জানা নেই তার। অরিত্রের মুখেই শুনেছিল যে, যেদিন কাকিমার শেষ কেমোটা দেওয়ার দিন ছিল, সেদিন নাকি এক হাসপাতালের সব কাগজপত্র নিয়ে আরেকটা হাসপাতালে যাওয়ার জন্য যখন ছুটোছুটি করছিল অরিত্র, তখন স্ট্রেসে বৈশাখের গরমে মাথা ঘুরিয়ে সে রাস্তায় পড়ে গিয়েছিল। তারপর জ্ঞান ফিরতেই দেখেছিল সেই মেয়েটার মুখ, যার কোলে মাথা রেখে শুয়েছিল ও। ওকে সেদিন হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছিল মেয়েটি। আর একবার কাকিমাকে দেখতে এসেছিলও নাকি সে বিকালে। যদিও সোমেনের তার সাথে দেখা হয়ে ওঠেনি। আজ ওই মেয়েটাকে পেতেই কি অরিত্র এসব খেলায় মেতেছে? ও কি সত্যিই বুঝতে পারছে না এগুলো পাগলামি ছাড়া আর কিছুই নয়! 

নাম জানেনা .. ঠিকানা জানে না .. পরিচয় জানে না যার, তাকে কি করে নিজের জীবনে পেতে চাইছে অরিত্র? যে কিনা ছোটবেলা থেকে তার রক্তের সম্পর্ক থেকে পদে পদে অবিশ্বাসের শিকার হয়ে এসেছে, সে আজ এক অপরিচিতাকে পাওয়ার বিশ্বাসে মেতেছে?


পরেরদিন সন্ধ্যায় সোমেনের কলেজস্ট্রিট থেকে ফেরার পথে একটা অঘটন ঘটলো। ওর সাড়ে তিন বছরের পুরানো ঘড়িটা হঠাৎ ছিনতাই হয়ে গেল। তখন কেন জানি অরিত্রের আগেরদিনের বলা কথাটা মনে পড়ে গেল ওর। আর মনে মনে চমকে উঠলো। ওর মাথার মধ্যে তখন সমস্ত যুক্তিতর্ক চাপা পড়ে গিয়ে অবিশ্বাস্য এক প্রশ্ন ঘুরছে শুধু ,সত্যিই কি অরিত্র কিছু বুঝতে পারে এখন? ওকি ভূত ভবিষ্যতের কোনো আভাস পায়?

এসব ভেবেই বাড়ি ফেরার পথে সোমেন ঠিক করলো একবার অরিত্রের বাড়িতে যাবে। মোবাইলটা বের করে দেখলো রাত নটা বাজে প্রায়। এতো রাতে ওই বিশাল বড় অন্ধকার বাড়িটাতে ঢুকতে মন চায় না ওর। তাও কি মনে করে পা বাড়ায় সে পথে। পাঁচিল ঘেরা বাগান বাড়িটার বাইরের গেটটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই কেমন একটা গা ছমছম করে ওঠে ওর। একপা দুপা করে সামনে এগিয়ে যেতে খেয়াল হয়, নিচের তলার অরিত্রের ঘরটাও পুরো অন্ধকার। এতো তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ার ছেলে তো সে নয়, মনে মনে ভাবলো সোমেন। তারপর বন্ধুর নাম ধরে দু চারবার ডাক দিয়েও সাড়া না পেয়ে ফোনের আলোটা বারান্দার গেটে ফেললো। তাতেই সোমেন অবাক হয়ে দেখলো গেটের বাইরের দিকে তালা ঝোলানো। মনে একটা অশনিসংকেত দানা বাঁধতে থাকলো ওর ... কোথায় গেল ছেলেটা? এমন সময় হঠাৎ ফোনের রিংটোনটা বেজে ওঠায় হাতটা কেঁপে ফোনটা পড়ে যেতেই নিজেকে সামলে নিল সোমেন। মোবাইল স্ক্রিনে ভেসে উঠছে তখন.... অরিত্র কলিং।


(৫)

"চলো হোটেলে ফিরে যাই। তোমার পায়ে একটা ব্যান্ডেজ করে দি। নইলে অন্যকিছু লেগে ঘা হয়ে যেতে পারে"। বলে অতনু শিশিটাকে নাকের কাছে এনে একটা লম্বা শ্বাস নিল আর বললো, "এতো আতরের শিশি মনে হচ্ছে।"

অতনুর কথাটিকে অনুসরণ করে দৃষিতা বলে উঠলো, "আজ বিকালেও ঠিক এরকমই একটা শিশি আমি পেয়েছিলাম। কিন্তু ওটাতো আমি ওই ঝাউবনের দিকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলাম। আর তারপর সেটা কোনোকিছুতে লেগে ভাঙার একটা শব্দও পেয়েছিলাম তখন। তাহলে আবার এটা এখানে এলো কি করে?"

"আরে, এটা আরেকটা শিশি বোধ হয়"।

"নাগো, এই শিশিই। এরকমই লাল রঙের লাভ সাইন আঁকা ছিল গায়ে। আর এরকমই গলার কাছটা ভাঙা ছিল। আর গন্ধটাও এরকমই..."

"তাহলে বোধ হয় ভূত আছে এখানে। পালাও" বলে হেসে উঠলো অতনু।

"প্লিজ, জোক কোরো না।"

"আরে, তো আর কি বলবো? তোমার কথানুযায়ী তো একটা ভাঙা শিশি এই সৈকতে হেঁটে চলে বেরাচ্ছে। আমার মনে হয় আমাদের এই মুভিতে যে পেত্নীটা তোমায় ধরবে, তার কোনো বান্ধবী এখানে আছে" বলে মুখ চেপে হাসতে লাগলো অতনু।

"দেখো, তুমি খুব ভালোমতোই জানো আমার এসবে কোনো বিশ্বাস নেই। কিন্তু ..."

"আর কোনো কিন্তু নয় ম্যাডাম, এবার সোজা হোটেলে চলো। ব্যাণ্ডেজ করাতে হবে। আমার কাঁধে বাঁহাতটা দিয়ে ভর দাও।" বলে অতনু হাতের শিশিটাকে ঝাউবনের দিকে ছুঁড়ে ফেললো।


দৃষিতার মুখে এসে পড়ছে ভোরের সূর্যোদয়ের আধো আলো। বালিয়াড়ি বরাবর বেশ অনেকটা হেঁটে গিয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে একটা ঝাউ গাছে হেলান দিয়ে। সামনে দিগন্ত বিস্তৃত সমুদ্র। আর ঝাউগাছের ফাঁকফোকর দিয়ে মৃদু আলোর স্পর্শগুলো খেলা করে চলেছে আপন মর্জিমাফিক। ঠিক তখনই পেছন থেকে কি একটা আওয়াজ হওয়ায়, দৃষিতা সেদিকে ফিরে তাকাতেই দেখলো একটা বাদামি রঙের লেডিস ব্যাগ উপুড় হয়ে পড়ে রয়েছে বালুর উপর। আর তার থেকে কেমন একটা আওয়াজ ভেসে আসছে। খুব পরিষ্কার না হলেও কতকটা গোঙানির মতোই লাগছে যেন আওয়াজটা। কি একটা ভেবে ওদিকে হেঁটে চলতে লাগলো দৃষিতা। আর ব্যাগটার যত কাছে এগোতে থাকলো, ততই যেন কালকের সেই আতরের গন্ধটা ওর নাকে এসে ঠেকতে লাগলো। আরো কিছুটা এগোতেই, দৃষিতার ডান পা কিছু একটাতে ধাক্কা খেল। আর মুহূর্তে তার থেকে একটা রক্তের ফিনকি উঠে তার উচ্চতা ছুঁলো ওর কপালটাকে। দৃষিতা বিস্ফোরিত চোখে দেখলো সেই ভাঙা শিশিটাকে। রক্তে কানায় কানায় পূর্ণ তা। প্রাণপণ চিৎকার করে ছুটতে গিয়েই সে নিজেকে আবিষ্কার করলো হোটেলের বিছানায়। এসির মধ্যেও সারাটা গা তার ঘামে ভিজে গেছে। ঘড়িতে দেখলো সাড়ে ছটা বাজে। দৃষিতার আজ শুটিং স্পটে সাতটায় যাওয়ার কথা। ভাবতেই দরজায় নক করলো কেউ। বাইরে থেকে মিতালির গলার আওয়াজ ভেসে এলো 'ম্যাডাম, মেকআপ ম্যান রেডি।"

মিতালি ওর সহকারী হিসাবে আছে এখানে। দৃষিতা চটপট বিছানা থেকে নেমে "২৫ মিনিটেই আসছি" বলে বাথরুমে ফ্রেশ হতে ঢুকে পড়লো।


শট ৭/২

লাইট ক্যামেরা একশন ...


"তুমি এসব কি বলছো?"

"আমি ঠিকই বলছি। কাল রাতের বালুকাময় সৈকতে মেয়েটা আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল। ও বলছিল ওকে কিভাবে ছেলেগুলো মেরেছিল এখানে। আমায় বলবার সময় ওর অশরীরী আত্মাটা প্রতিশোধের নেশায় আর্তনাদ করছিল শুধু।"

"মিলি, তোমার কিছু ভুল হচ্ছে না তো?"

এমন সময় হঠাৎ মিলির চরিত্রে অভিনয় করাকালীন দৃষিতা শুটিং স্পটের মধ্যে চেরা গলায় চিৎকার করে বলে উঠলো "কোনো ভুল নয়। জেনে রাখো, আমি ওদের কিছুতেই ছাড়বো না।"

চারপাশের লোকজন কতকটা ঘাবড়ে গেল সেই চিৎকারে। ডিরেক্টর অবাক হয়ে স্ক্রিপ্টে খুঁজে চলেছেন তখন সেই ডায়ালগটা। 

আর সিনে, দৃষিতার বিপরীতে থাকা অতনু তখন বিষ্ময়ে ভেবে চলেছে, এ কণ্ঠস্বর কি দৃষিতার?


(৬) 

"কিরে কটা এনেছিস?" অভীকের প্রশ্নের উত্তরে হুট খোলা জিপের পেছনে বসে থাকা বিনু উত্তর দিল "ছয়টা। মাথা পিছু দুটো করে।"

"ধুস, আর কটা আনতে পারতি তো! এতোক্ষণ ড্রাইভ করে তোদের নিয়ে যাব, হোটেলে তুলবো। আর শালা, তোরা এই কটা বোতল এনেছিস?"

"রাগ করিস না ভাই। আমরা না হয় তিনটে ভাগ করে খাবো। তোর জন্য বাকি তিনটে থাকবে" পরিস্থিতি সামলে বলে উঠলো উত্তম।

ওরা তিনজনে মিলে সন্ধ্যের পর পৌঁছলো মন্দারমনিতে। হোটেল আগে থেকেই বুক করা ছিল। সেখানে উঠে একটু ফ্রেশ হয়েই ওরা বেরিয়ে পড়লো বিচের দিকে। অভীকের হাতে ছিল ভলিবল। আর বিনুর হাতে ছিল নেশার সামগ্রী। উত্তম একটা শতরঞ্চ আর তিনটে টাওয়াল নিয়ে এগিয়ে চললো ওদের পিছু পিছু।

সমুদ্রসৈকতে বসে উত্তম নিচু গলায় বলেই বসলো অভীককে, "তোর কোনো ভয় করছে না?"

অভীক তখন অলরেডি নেশায় বুঁদ। তাচ্ছিল্য করে উত্তর দিল সে, "কিসের ভয় রে? আজ অব্দি আমায় কোনোকিছুতে ভয় পেতে দেখেছিস?" 

বিনু একটু এগিয়ে গিয়ে পেছন দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বললো, "আমি একটু ওদিক থেকে দৌড়ে আসছি, তোরা বস।"

উত্তম তখন অভীকের সাথে নেশার পেয়ালায় মত্ত, বিনু আচমকা দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলতে লাগলো,

"পালা এখান থেকে শিগগির। পুলিশ এসেছে মেয়েটার খবর নিতে।"

উত্তমের নেশার মাত্রা একটু কম হওয়ায় জিজ্ঞেস করলো, "কোন মেয়েটার?"

---আরে সুগন্ধার!

----তোর মাথা টাথা খারাপ হয়েছে নাকি রে? তিন মাস পর এখন এতো রাতে সেকথা জিজ্ঞেস কর‍তে পুলিশ এসেছে?

----আরে আমাকে একটা অল্পবয়সী ছেলে জিজ্ঞেস করলো যে, 'একটা মেয়েকে এখানে দেখেছি কিনা। যার গায়ে অদ্ভুত আতর মাখার সখ ছিল।'

---আর তাতেই তুই ধরে নিলি যে, সে সুগন্ধার কথা বলছে! আর ছেলে আবার পুলিশ হল কি করে? ইউনিফর্মে ছিল কি?

----না বোধ হয়, ঠিক খেয়াল করিনি। কিন্তু ওই ব্যাগটার কথাও যে বলছিল, যাতে 'A' লেখা ছিল।

এমন সময় অভীক নেশার ঘোরে বলে উঠলো, "উত্তম ওকে মাল দে। ওর মাথা বিগড়ে গেছে" বলে অট্টহাসির রোল তুললো।

সারা সৈকত জুড়ে সে হাসির যেন একটা ব্যাঙ্গাত্মক প্রতিধ্বনির অনুরণন চলছে তখন। শুধু বিনুর কানেই পৌঁছালো তা।


#পর্ব - ৩


(৭) 

সোমেন দ্রুতপায়ে অরিত্রদের বাড়ি থেকে বাইরে বেড়িয়ে এসে গেটটা টেনে দিয়েই অরিত্রের ফোনটা রিসিভ করলো।

"কিরে কোথায় তুই?" সোমেনের উদ্বিগ্ন প্রশ্ন।

"আমি মন্দারমিতে এসেছি আজ দুপুরের বাস ধরে "ওপার থেকে অরিত্রের শান্ত উত্তর।

"মন্দারমনিতে হঠাৎ?"

"আজ ল অফ এট্রাকশন প্র্যাকটিস করতে করতে আমি ওই মেয়েটাকে খুঁজে পাওয়ার ক্লু পেয়েছিরে। পরিষ্কার দেখেছি, ও সি বিচে একটা ব্লু গাউন পরে দাঁড়িয়ে। ওর বাঁ কাঁধে ওই বাদামী রঙের সাইড ব্যাগটা রয়েছে, যেটা সেদিন আমার সাথে দেখা হওয়ার সময়ও ছিল। ওই ব্যাগটার উপর স্ক্রিপ্ট লেটারে 'A' লেখা আছে, আগেও দেখেছিলাম। আরো দেখেছি, একটা হোটেল। তিনটে ছেলে ... হোটেলের নাম স্বপ্নপুরি। তারপর মোবাইল সার্চ করে দেখলাম ওটা মন্দারমনিতে। মনে হল, ও একটা বিপদের মধ্যে আছে!"

"তুই কি পাগল টাগল হয়ে গেছিস পুরো? এসব কি বলছিস? আমিতো তোর কথার কোনো মাথামুণ্ডুই বুঝতে পারছি না।"

"বিশ্বাস কর, আমি এখানে এসে সেই স্বপ্নপুরি নামের হোটেলটা খুঁজে পেয়েছি, ঠিক যেমনটা চোখ বন্ধ করে দেখেছিলাম। আর, আমি মেয়েটার হাতে আতরের শিশিও দেখেছিলাম রে।"

"কি?"

"হ্যাঁ রে, আমার স্পষ্ট মনে আছে, মেয়েটার গা থেকে একটা মিষ্টি গন্ধ পেয়েছিলাম সেদিন। যেটা ঠিক ডিওডেনামের নয়, আতরের। আমার বাবা একসময় এসব ব্যবহার করতেন। বড়লোক বাড়ির ছেলে ছিলেন কিনা। তাই সে গন্ধের ঝাঁজটা আমার চেনা।"

"ভাই, তুই কোনো বিপদে এগিয়ে যাচ্ছিস না তো? আমার যেন কেমন একটা ভয় লাগছে।"

"ভয়ের কি আছে বন্ধু। আমি তো আগেই বলেছি তোকে, জীবনে অনেক কিছুই তো এমনি হারিয়েছি আমি। এবার নাহয় কিছু পাওয়ার চেষ্টায় মাতি। আমার আগে পরে তো কেউ নেই এখন। তাই সব তোকেই জানাই। রাখি বন্ধু। ভালো থাকিস।"

"হ্যালো? হ্যালো?"ফোনের ওপারের বিপ বিপ শব্দে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লো সোমেন। আবার রিংব্যাক করতে গিয়ে দেখলো সুইচড অফ।


(৮)

"দৃষিতা, এই ডায়লগটা স্ক্রিপ্টে নেই তো। আর এখনই এতো রাগ দেখিয়ো না। আরো চারটে সিনের পর না হয় ..." ডিরেক্টর সন্দীপ চ্যাটার্জি বলে উঠলেন। সেদিন আরো কয়েকটা শুটিং চলার সময়, অতনু দৃষিতার মধ্যে কিছু অস্থিরতা লক্ষ্য করলো। শুটিং শেষে অতনু রুমে এসে দেখলো দৃষিতা নেই। তারপর এদিক ওদিক একটু জিজ্ঞেস করে বিশুর কাছ থেকে জানলো ও নাকি সমুদ্রপারের দিকে গেছে। অতনুও এটাই সন্দেহ করছিল। ওর কেন জানি মনে হচ্ছিলো, ওই ভাঙা শিশি নিয়ে দৃষিতার মনে একটা খটকা লেগেছে। গতকাল রাতে বারবার সেটা বলছিল। তবে কি সেটা দেখতেই ... ভেবে সমুদ্রসকৈতের দিকে বেরিয়ে পড়লো অতনু। কিছুটা এগিয়ে যেতেই দেখলো দৃষিতা দাঁড়িয়ে আছে সামনের দিকে তাকিয়ে। এক পরিতৃপ্তির হাসি তার মুখে। অতনু আসতেই, একটু চমকে উঠে বললো সে,

"তুমি?"

"হ্যাঁ, আমি। কেন আসতে পারিনা?"

"তা কেন? হঠাৎ এলে তো তাই বলছি।"

"তোমায় ঘরে না পেয়েই ... একি তোমার হাতে কি এটা?" দৃষিতার হাতে একটা বড় ভোজালি দেখে আঁতকে উঠে জিজ্ঞেস করলো অতনু।

"আরে, এটাতো এখানেই পেলাম। এইমাত্র পেলাম।" তোতলানো উত্তর বেরিয়ে এলো দৃষিতার মুখ থেকে।

তারপর ভোজালিটা ফেলে দিয়ে অতনুকে বললো,

"চলো রুমে ফিরি। পরের শুট হবে তো আবার! স্ক্রিপ্টটা পড়ে একটু প্র‍্যাকটিস করি।"

 "তুমি তো সন্দীপদার স্ক্রিপ্টটা অলরেডি অনেকবার প্র‍্যাকটিস করেছো!"

"একথা কেন মনে হল তোমার?"

"না মানে, তোমাকে আজ শুটিং এর সময় মনে হচ্ছিলো যেন মিলি ক্যারেটকারটার মধ্যে তুমি খুব গভীরভাবে ঢুকে গেছো।"

"সে তো একটু ঢুকতেই হবে। বিশ্বাস করি বা না করি, ডিরেক্টরের তৈরি ভুতুড়ে চরিত্রের মধ্যে না ঢুকলে সঠিক এক্সপ্রেশনটা আনবো কি করে?" মৃদু হেসে বলে উঠলো দৃষিতা।

"তা ঠিক।"

"দেখো মধ্যাহ্নের সমুদ্র কি সুন্দর। সূর্যরশ্মিগুলো ওর উপর সোনালি আলোর রেখা হয়ে খেলে বেরাচ্ছে নিজের নিজের খেয়ালে। দিবারাত্রির প্রতিটি ঘন্টায় এই সমুদ্র ভিন্ন ভিন্ন রূপে মুগ্ধ করে তোলে আমায়।"

দৃষিতার কথায় সায় দিয়ে রুমের দিকে ফিরতেই ওদের সাথে দেখা হল ডিরেক্টরের। অতনু এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

"সমুদ্র তাহলে কাজের প্রেসারের মধ্যেও টানলো?"

"আরে শোনোনি?"

"কি বলুন তো?"

"কিছুক্ষণ আগে একটা ছেলের মার্ডার হয়েছে এখানে। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে সি বিচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। আরো দুটো ছেলের সাথে নাকি এখানে ঘুরতে এসেছিল সে।"

"সেকি?"

"তাই শুনেই তো ছুটে এলাম। আমার তো আবার এসব থেকেই গপ্প তৈরি করতে হয়।" বলে ব্যাঙ্গাত্মক হাসি দিয়ে সামনে এগিয়ে গেলেন সন্দীপ চ্যাটার্জি। অতনু পাশে তাকিয়ে দেখলো দৃষিতা নেই। গেল কোথায় মেয়েটা, এইমাত্র ওর সাথেই তো ছিল ... ভাবতে ভাবতেই অতনু এগিয়ে গেল হোটেলের দিকে।

সেখানে দৃষিতাকে রুমের মধ্যেই পেল। কিছু জিজ্ঞাসার আগেই দৃষিতা জানালো ও খুব ক্লান্ত, একটু বিশ্রাম নিতে চায়। অতনুও আর কোনো কথা না তুলে চলে এলো নিজের রুমে। 

সন্ধ্যার সময়ের শুটিং এর সেটে এসে অতনুর সাথে দেখা হল দৃষিতার। মেকাপের লাস্ট টানগুলো চলছিল তখন। তার মধ্যেই অতনুকে দেখে মৃদু হেসে দৃষিতা বলে উঠলো, "গুড ইভিনিং"। অতনুও হেসে বেরিয়ে এলো। 

শুটিং শুরু হল। মিলির চরিত্রে ভীষণ দক্ষতা ও নিপুণতার সাথে অভিনয় করছিল দৃষিতা। ঠিক তখনই ঘটলো অঘটনটা। হঠাৎই একটা রোমান্টিক সিনে প্রচণ্ড আক্রোশের সাথে দুটো দাঁত বসিয়ে দিল দৃষিতা অতনুর কাঁধে। চারপাশের সবার যেন চমক লেগে উঠলো সে দৃশ্য দেখে। অতনুর চিৎকারে সবাই ছুটে এসে দৃষিতাকে সামলাতে গেলে, সে এক ঝটকা দিয়ে একসাথে ফেলে দিতে লাগলো দু তিনজনকে। অতনু অবাক হয়ে দেখতে লাগলো দৃষিতার সেই ভয়াবহ রূপকে। তার ডানহাতের আঙুলগুলো কাঁধে বোলাতেই টের পেল রক্তের কয়েকটা বিন্দুকে। মুহূর্তে শিউরে উঠলো সে। আতঙ্কে তার হাত পা নাড়াবার ক্ষমতা হারিয়ে গেছে তখন। সন্দীপ চ্যাটার্জি নিজে এসে অতনুকে ধরে টেনে তুললো মেঝের থেকে। কিন্তু দৃষিতার কি মারাত্মক রোষ তখনও অতনুর উপর। চারজনের হাতের বাঁধন থেকেও ছিটকে বেরিয়ে আসতে চাইছে সে। আর মুখে বিকৃত গলায় বলে চলেছে "ছাড়বো না, একটাকেও ছাড়বো না আমি।"। শুটিং এর সবাই তখন হতভম্ভ হয়ে দেখছে সে অতিপ্রাকৃত দৃশ্য। অত:পর সন্দীপ ওদের হোটেলের রিসেপশন থেকে নাম্বার নিয়ে কল করলেন এক নিকটবর্তী ডাক্তারকে। ডাক্তার আসার আগেই দৃষিতাকে সামলাতে তার হাত পা বেঁধে রাখতে হল। তাতেও মুখ দিয়ে রোষাবিষ্ট আওয়াজ বেরোনো বন্ধ হয়নি তার। আর এই নিয়ে শুটিং সেটের মধ্যে বিবিধ অবৈজ্ঞানিক ব্যাখার গুঞ্জন হয়ে চলেছে তখন। তারপর ডাক্তার এসে দৃষিতাকে একটা ইঞ্জেকশন দিলে, সে কিছুক্ষণের মধ্যে ঝিমিয়ে পড়ে। সব শুনে তিনি একজন সাইক্রাটিস্ট এপয়েন্ট করতে বলেন। আর কিছু ওষুধ লিখে দিয়ে যান।

ডাক্তারবাবুকে এগিয়ে দিতে গিয়ে অতনু দেখে সন্দীপ চ্যাটার্জি বাইরে উদ্বিগ্নচিত্তে দাঁড়িয়ে। তার মুখ থেকে সিগারেটের ধোঁয়ার কুণ্ডলি উঠছে ঘনঘন। আর কপালের ভাঁজগুলো বেশ কিছু গভীর চিন্তার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আর সেটা হওয়াটাই স্বাভাবিক। শুটিং এর কাজ পণ্ড হয়ে গিয়ে এ ধরনের একটা ঘটনা হওয়াটা তার কাছে বেশ ক্ষতির বিষয়। অতনুকে দেখে উনি ইশারা দিয়ে কাছে ডেকে বললেন,

"খুব চিন্তা হচ্ছে"।

"বুঝতে পারছি সন্দীপদা, আপনার সাত দিনের শিডিউল ছিল। এতো বড় টিম নিয়ে হোটেলে থেকে এতোগুলো শট সেট করা, আর এরই মধ্যে এমন একটা ঘটনা ..." মাঝপথে অতনুকে থামিয়ে দিয়ে সন্দীপ মুখের থেকে সিগারেটের শেষাংশটা নিচে ফেলে কোলাবতী স্যাণ্ডেল দিয়ে পিষে বলতে লাগলেন,

"আরে, তা নয়। আমি কিছুক্ষণ আগে একটা নিউজে পড়লাম যে, এ ধরনের ভৌতিক সিনেমার শুটিং করতে গেলে নাকি সেটে অদ্ভুদভাবে একটা নেগেটিভ এনার্জি ক্রিয়েট হয়। আসলে তখন সেটের সকলেই তো, বিশেষ করে যারা মূল চরিত্রে থাকে তারা সেই ভৌতিক ব্যাপারগুলোকে খুব গভীরভাবে চিন্তা করে। আর সেই কারনেই হয়তো একটা অশুভ শক্তিকে চুম্বকের মতো টানার জোন তৈরি হয়ে যায় সেখানে। আর সমসাময়িক কোনো অঘটন মানে অতৃপ্ত আত্মার যদি জন্ম হয় সেস্থানের কাছেপিঠে, তবে তাতে আকৃষ্ট হয়ে সে সেখানে উপস্থিত হয়ে যেতেও পারে।"

"এসব কি বলছেন আপনি সন্দীপদা?"

"বিদেশে রিসেন্টলি এরকম একটা ঘটনা ঘটেছে। সেটা আমি আগেও শুনেছিলাম। এখন সেই খবরটাই নেটে ডিটেইলস পড়লাম।"

"সত্যিই আপনি এসবে বিশ্বাস করেন?" অতনুর খানিক দ্বিধাজনক প্রশ্ন।

"এই নিয়ে তিন নম্বর ভৌতিক মুভি করছি আমি। আর তার জন্য আমাকে প্রচুর রিসার্চ করতে হয়েছে। অনেক রিয়েল কেসও দেখেছি। তাই অবিশ্বাসের কোনো জায়গাই নেই।"

"আপনার কি দৃষিতার আচরণে তেমন কিছু মনে হচ্ছে?"

সন্দীপ চ্যাটার্জির উত্তরটা দেওয়ার আগেই তার পকেটে ফোনটা বেজে উঠলো। 

"একটু পরে কথা বলছি, ঘরের কল আছে" বলে একটু এগিয়ে গেলেন উনি।


(৯)

"তুই থাকলে থাক ভাই, আমি আজই পালাচ্ছি এখান থেকে" নিজের ব্যাগটা গোছাতে গোছাতে ভয়ার্ত কণ্ঠে বলে উঠলো উত্তম।

"আরে তোর মাথা টাথা খারাপ হয়েছে নাকি? এখন অলরেডি রাত আটটা বাজে। আর কিসব ভুলভাল দেখে একথা বলছিস তুই। দেখ, আমারও খুবই খারাপ লাগছে বিনুর এভাবে চলে যাওয়ায়। কিন্তু ওদের বাড়ির লোক কাল আসবে, বডি কাল ছাড়বে। অন্তত কাল অব্দি তো ..."

অভীকের কথাকে থামিয়ে উত্তম বলতে থাকলো,

"তা তুই থাক না, আমি নেই আর! দুপুরে আমি নিজে দেখেছি, বিনুর পেটে একটা নিল গাউন পরা মেয়ে ভোজালি চালাচ্ছে। তবে হোটেল ব্যালকনি থেকে সেই দৃশ্যটা দূরে ছিল, নিজেকে সান্ত্বনা দিতে সেটাকে চোখের ভুল মনে করেছি তখন। কিন্তু আজ বিকালে যখন আমি বাথরুমে ঢুকেছিলাম, তখন ঘরে স্পষ্ট পায়ের আওয়াজ পেয়েছি। আর সেই আতরের গন্ধটাও পেয়েছি। নারে, আমাদের এখানে আসাটা মোটেই ঠিক হয়নি।"

"তুই কি বলতে চাইছিস বলতো, সুগন্ধা দুপুরে বিনুকে মেরেছে? আর বিকালে তোর ঘরে ঢুকেছিল? আরে তাহলে তো সবার আগে ও আমাকে ..."

অভীককে থামিয়ে উত্তম বলে ওঠে,

"ভাই, তুই সাহসী হতে পারিস। আমি নই। তাই বেরোলাম আমি।"

"আচ্ছা চল, তোকে একটু এগিয়ে দিয়ে আসি আমি।"

বলে দুজনে বেরোলো হোটেল রুম থেকে। সমুদ্রের পারটা অর্ধচন্দ্রের আলো আধারিতে বেশ রহস্যময় লাগছিল যেন উত্তমের। কিছুটা এগোতেই ওদের নাকে এসে ঠেকলো সেই আতরের গন্ধটা। উত্তমের পা স্তব্ধ হয়ে গেল। ভয়ে ওর কাঁধ থেকে ব্যাগটা পড়ে গেল বালিতে। গন্ধটা এবার অভীকের নাকেও এলো। অভীক নির্ভয়ে বলে উঠলো,

"শালা, আজ এর শেষ দেখেই ছাড়বো।"

উত্তম বলতে থাকলো,

"অভীক তুই নেশার ঘোরে আছিস। থেমে যা, এগোস না।"

কিন্তু অভীক থামবার পাত্র নয়। অগত্যা নির্জন সৈকতে একা না দাঁড়িয়ে উত্তমও তাকে অনুসরণ করলো।


#শেষ পর্ব


(১০)

হোটেল রুমে ফিরে এসে হঠাৎ অতনুর নজরে এলো টেবিলের উপর রাখা টিম ব্যাগটার চেন অর্ধেক খোলা। তাতে বিভিন্ন সিনের শুটিয়ের জিনিষপত্র ভর্তি ছিল। কি ভেবে সেটাতে হাতড়ে অতনুর খেয়াল হল ভোজালিটা নেই। যেটা একটা সিনের জন্য আনা হয়েছিল। মনের মধ্যে একটা আতঙ্ক চেপে বসলো তখন অতনুর। দুপুরে দৃষিতার হাতে সেই ভোজালিটাই ছিল কি? কিন্তু ও এ ঘরে কখন এসেছিল, তা তো টের পায়নি অতনু! মনের মধ্যে হাজাররকম অবৈজ্ঞানিক প্রশ্নের দানাগুলো কঠিন হয়ে জমাট বাঁধতে থাকলো অতনুর। মনে পড়তে থাকলো সন্দীপদার কাছে শোনা কথাগুলোও। ভাবলো একবার রিসেপশনে গিয়ে জিজ্ঞেস করবে, সমসাময়িক সময়ে তেমন কিছু এখানে ঘটেছিল কিনা। কিন্তু রিসেপশনে কথা বলে তেমন কিছুর ইঙ্গিত না পেয়ে ও বাইরের হাওয়ায় একটু নিজেকে শান্ত করতে বেরিয়ে পড়লো। ফোনে মিতালির কাছে জেনে নিল দৃষিতার শারীরিক অবস্থার কথা। সে এখনো ঘুমোচ্ছে শুনে আশ্বস্ত হল অতনু। মিতালি রাতে দৃষিতার সাথেই থাকবে। রাতে একবার নাহয় অতনু ডিনার সেরে দেখে আসবে ওকে।

সমুদ্রসৈকতে বেরিয়ে একটু ঘুরতেই অতনুর খেয়াল হল একজন সেই নির্জন বালিয়াড়িতে একটা খবরের কাগজ পেতে বসে আছে। অতনুকে দেখে জিজ্ঞেস করলো সে,

"রাতে সমুদ্রশোভা উপভোগ করতে নাকি?"

"এই আর কি। আর আপনি? ঘুরতে এসেছেন? "

"ঠিক ঘুরতে এসেছি বলবো না। একটা কাজে এসেছি। বসুন না, সময় হলে। দুদণ্ড কথা বলি।"

অতনু ভাবলো হোক না অপরিচিত, তাও একটু কথা বলে যদি মাথার জটগুলো একটু হাল্কা হয়। তাই বসেই পড়লো তার পাশে। আড়চোখে অপরিচিতের দিকে তাকিয়ে যেন পঁচিশের কাছাকাছিই বয়স মনে হল। অপরিচিত তখন বলে চলেছে,

"চাঁদের আলোয় সমুদ্রের তরঙ্গের মাথাগুলো কেমন রুপোলী লাগছে না!" অত:পর একটা গভীর শ্বাস নিতেই একটা গন্ধ পেল অতনু। অপরিচিত হঠাৎ করে বলে উঠলো,

"একটা আকর্ষক গন্ধ পাচ্ছেন তো?" 

অতনু বিষ্ময়ে জিজ্ঞেস করলো,

"আপনিও পাচ্ছেন কি?"

"আমি তো অনেকক্ষণ ধরেই পাচ্ছিলাম। ওই ঝাউবন থেকে ভেসে আসছে সেই গন্ধটা।"

অতনু মুহূর্তে উঠে দাঁড়িয়ে এদিকওদিক তন্নতন্ন করে কি যেন এক অজানা বা চেনা বস্তু খুঁজে চললো। 

"নাম কি আপনার?"

অপরিচিতের প্রশ্নে অন্যমনস্ক হয়েই উত্তর দিল অতনু,

"অতনু সেন"।

"আপনি যাকে খুঁচ্ছেন, যার গন্ধের রহস্য জানতে চাইছেন, সে ওই ঝাউবনে আছে। যাবেন নাকি ওখানে?"

কেমন যেন সব রহস্যময় লাগতে থাকলো অতনুর। সে তোতলানো ভাষায় প্রশ্ন করলো,

"আপনি চেনেন তাকে?"

"আমিতো খুব অল্প সময়ের জন্য চিনি। কিন্তু আপনি হয়তো আরেকটু বেশি সময়ের জন্য চিনতে পারতেন তাকে।"

"মানে? কি বলছেন?"

"চলুন, ওদিকে যেতে যেতেই না হয় বলছি সেই মেয়েটার গল্প।"

অতনু কেমন একটা মোহাবিষ্ট হয়ে অনুসরণ করতে থাকলো সেই অপরিচিতকে। এক নিয়ন্ত্রণহীন কৌতুহল যেন ওকে চুম্বকের মতো টেনে নিয়ে যেতে লাগলো সেই ঝাউবনের দিকে। 

অপরিচিত বলতে থাকলো,

"মেয়েটির আতর মাখার খুব সখ ছিল জানেন। ওর বাবা আতর তৈরির কারখানায় কাজ করতো। যেদিন মেয়েটির জন্ম হয়েছিল, সেদিনই ওর বাবার কাজটা হয়েছিল বলে মেয়ের নাম রেখেছিলেন সুগন্ধা। অভাবের ঘরে বাপ আর মেয়ের সংসার ছেড়ে মা খুব ছোটোবেলাতেই চলে গিয়েছিল তার। তারপর ধীরে ধীরে বাবাও অসুস্থ হল। মেয়েটি তার সুমিষ্ট গানের গলাকে ভর করে এপাড়ায় ওপাড়ায় ফাংশন করতো। বাবার চরম অসুস্থতার সময় সেই কণ্ঠকে ভরসা করেই আপনাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে বিভিন্ন অডিশন দিয়েছিল। কয়েকবার আপনার সাথে দেখাও করেছিল ওর এক পাড়াতুতো দাদার সোর্স ধরে। নামটা মনে করতে পারছেন? ... সুগন্ধা আইচ নাম ছিল তার। অবশ্য, মনে না থাকাটাই স্বাভাবিক। আপনাদের ব্যস্ত শিডিউল। তাই সময় হয়ে ওঠেনি ওর কণ্ঠকে একবারের জন্য পরখ করার। বা হয়তো গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেন নি। যাই হোক, সেই ভাগ্যহীনার বাবার অন্তিম দিনে একদিন তার সাথে আমার দেখা হয়েছিল আচমকাই। আমারও তখন আপনজনের যমে মানুষে টানাটানির দিন চলছিল। অত:পর মৃত্যু হয় ওর বাবার। আর খুব আপনজনের মৃতদেহের উপরের আতরের গন্ধ নিয়ে সে চিরদিনের মতো নিজ গায়ে আতর দেওয়া বন্ধ করে দেয়। পাছে বাবার স্মৃতি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে তাকে। শুধু বাবার হাত থেকে বহু বছর আগে পাওয়া একটা আতরের শিশিকে সে সযত্নে তার ব্যাগে রেখে দিত। তার গায়ে লাল রঙ দিয়ে এঁকে রেখেছিল লাভ সাইন।"

এবার যেন কেমন একটা চমক লাগলো অতনুর। ঘোরের জাল কাটিয়ে ভয়ে ভয়ে সে বলে উঠলো,

"কে আপনি? এসব কি করে জানলেন?"

"আমি অরিত্র মুখার্জি। আপনি আমায় চিনবেন না। হয়তো সুগন্ধাও তেমন চিনতো না আমায়। কিন্তু আমি এখানে এসে ওর সাথে দেখা করেছি। ওর কাছ থেকেই ওর জীবনের সবকিছু জেনেছি। আর এটাও জানি যে, ওর শেষ ইচ্ছা এখনো অপূর্ণ আছে।"

অতনুর শুকনো গলা দিয়ে আলতোভাবে উঠে এলো এক ভয়ার্ত প্রশ্ন,

"শেষ ইচ্ছা মানে?"

ডানহাতের তর্জনীটা মুখে ঠেকিয়ে "চুপপপ ..." বলে ফিসফিসিয়ে উঠলো অরিত্র। আর ঝাউবনের গভীরে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বললো "ওই দেখুন"।

অতনু সামনে তাকাতেই আঁতকে উঠলো। ব্লু কালারের গাউন পরা একটা মেয়ে উন্মত্তের মতো এগিয়ে চলেছে দুটো ছেলের পিছনে। ছেলেদুটোর মধ্যে একজন তারস্বরে চিৎকার করছে,

'পালা অভীক, পালা'।

অতনু বাকরুদ্ধ হয়ে দেখতে লাগলো ছেলেদুটোর মধ্যের আতঙ্ককে। মেয়েটা যেন ঝড়ের চেয়েও দ্রুতগতিতে তাদের পিছু নিয়েছে। আর একটা মৃদু হিসহিসানির শব্দ ভেসে আসছে তার মুখ থেকে। অতনুর সারা শরীরের রোমগুলো খাঁড়া হয়ে গিয়ে একটা শীত অনুভব হতে লাগলো যেন। অত:পর একটা ছেলেকে ধরেই ফেললো মেয়েটা। তারপর তাকে বালিতে ফেলে ওর মুখ হাঁ করিয়ে কি যেন একটা গিলিয়ে দিতে থাকলো। তাতে ছেলেটা ছটপট করতে করতে একসময় স্থির হয়ে গেল বালুর উপর। 

পাশে অরিত্র ফিসফিসিয়ে বলে চলেছে,

"এরা তিনমাস আগে এখানে মেয়েটাকে কাজ দেওয়ার নাম করে নিয়ে এসেছিল। বলেছিল একটা মুভির শুটিং চলছে এখানে। সেখানে সুগন্ধা নাকি গান গাইতে পারবে। অনেক আশা ভরসা নিয়ে মেয়েটা এসেছিল তাই। কিন্তু, ও একবারের জন্যও ভাবেনি যে, ওর প্রেমিক অভীক ওকে কি উদ্দেশ্যে এই মন্দারমনির সমুদ্রসৈকতে নিয়ে এসেছে। সুগন্ধার সাথে প্রেমের অভিনয় করতে গিয়ে নিজের নামের আদ্যক্ষর লেখা একটা বাদামি রঙের ব্যাগও গিফট করেছিল অভীক। 

সেদিন এখানে অভীক আর সুগন্ধা ছাড়াও অভীকের দুই বন্ধু উত্তম আর বিনু এসেছিল ওদের সাথে। আর তারপর একরাতে ভরপুর নেশা করে, অভীকেরা তিনজন মিলে মেয়েটাকে ভোগ করে মেরে ফেলেছিল। কিভাবে জানেন?"

অতনুর চোখের সামনের দৃশ্য আর কানের মধ্যে আসা কথাগুলো ওকে বোবা করে দিয়েছিল ততক্ষণে। আর পালটা প্রশ্ন করার ক্ষমতা তার তখন নেই। 

অরিত্র বলে চললো,

"ওই আতরের শিশিটাকে পাথরে ঠুকে ভেঙে তার গুঁড়ো মিশিয়ে দিয়েছিল জলের মধ্যে। তারপর তিনজন মিলে জোর করে পান করিয়েছিল সেটা তাকে। মেয়েটার সুকণ্ঠের রক্তারক্তি ঘটে তড়পে তড়পে মরেছিল এই বালিয়াড়িতে, ঠিক ওই ছেলেটার মতো। আর তারপর ওরা আমার সুগন্ধাকে পুঁতে দিয়েছিল ওই ঝাউবনের মাটিতে।"

বলে আর্তনাদ করে উঠলো অরিত্র। অতনু কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে নিজের উপস্থিতিকে উপলব্ধি করে উঠতে পারছিল না তখন। শুধু সামনে দেখলো একটা ছেলেকে মেরে সামনে এগিয়ে আসছে মেয়েটা। আর পেছনে আরেকটা ছেলে আতঙ্কে 'অভীক, অভীক' বলে চিৎকার করতে করতে নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে ডুবে যাচ্ছে সমুদ্রের অতলে। মেয়েটা আরো কাছে আসতেই অতনুর জ্ঞান হারাবার উপক্রম হল, এ যে দৃষিতা। মুখে এক অদ্ভুত তৃপ্তির হাসি। পেছন পায়ে সরতে সরতে জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়লো অতনু বালির উপর।


(১১)

জ্ঞান ফিরতে অতনুর চোখে ঠেকলো ভোরের আলোর আভা। সারাটা মাথা তখনও ভার হয়ে আছে তার। উঠে বসার ক্ষমতাটুকুও যেন নেই আর। রাতের সমস্ত ঘটনার সাথে হঠাৎ মনে পড়ে গেল দৃষিতার কথা। মুহূর্তে উঠে সে হাঁটা লাগালো হোটেলের দিকে। সেখানে গিয়ে মিতালির কাছে জানতে পারলো যে, রাতের দিকে একবার মিতালি উঠে দৃষিতাকে নাকি ঘরে পায়নি। তারপর হোটেলের রিসেপশন ঘুরে এদিক ওদিক ফোন করে সবাইকে জানিয়ে ঘন্টা খানেক পরে রুমে এসে দেখে যে, দৃষিতা সেখানেই অঘোরে ঘুমাচ্ছে। সারা সেটের লোক জুড়ে এসব যুক্তিতর্কের বাইরের ঘটনা নিয়ে বেশ কানাকানি হচ্ছে ততক্ষণে।

ইতিমধ্যে অতনু সন্দীপ চ্যাটার্জির সাথে কথা বলতে গিয়ে দেখে, উনি সোমেন নামে একজনের সাথে কথা বলছে। সে জানাচ্ছে যে, গত পরশু রাত আটটার দিকে নাকি মন্দারমনিতে আসার একটা বাসের এক্সিডেন্ট হয়েছিল। আর তার বন্ধুর সেসময় এখানে আসার কথা ছিল, যাকে সে গত ২৪ ঘন্টায় ফোন করে একবারও পায়নি। তাই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে সে আজ সকালে এখানে তার বন্ধুর খবর নিতে এসেছে। সন্দীপ চ্যাটার্জির সাথে লোকাল একজন পুলিশও ছিলেন। তিনি তার বন্ধুর নাম জিজ্ঞাসা করলে সোমেন উত্তর দিল, "অরিত্র"।

নামটা শুনে মুহূর্তে শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শিহরণ নেমে এলো অতনুর। সে নিজেও বুঝে উঠতে পারছিল না, কি করে বলবে সোমেনকে অরিত্রের কথা। আদৌ কি সেসব কথা কাউকে বিশ্বাস করানো যায়? তাও সবাই চলে গেলে অতনু তাকে ডেকে বলেই ফেললো গত রাতের সব অভিজ্ঞতার কথা। আর তার কাছ থেকেও জানলো অরিত্রের এখানে আসার কারণটা কি ছিল! দুজনেই বুঝতে পারলো অরিত্রের এখানে আসার আকর্ষণটা মিথ্যা ছিল না। তাই হয়তো মৃত্যুর পরপারে গিয়েই সে সুগন্ধার সব বৃত্তান্ত জেনেছে বা সুগন্ধা জানিয়েছে তাকে। সোমেনের হঠাৎ কি খেয়াল হলে, ও ওর ফোনের কলার লিস্টটা চেক করতেই দেখলো, অরিত্রের যে ফোনটা গত পরশু রাত নটার সময় এসেছিল, সেটার আদৌ কোনো অস্তিত্বই নেই সেখানে। সোমেনের যেন নিজের চোখকেও নিজের বিশ্বাস হচ্ছিলো না তখন।


এদিকে দৃষিতাও ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠতে লাগলো। সব শুটিং শেষে ফেরার দিন ব্যাগ গুছাতে গিয়ে হঠাৎ দৃষিতার চোখে পড়লো একটা ব্লু গাউন। অতনু সামনেই বসেছিল তখন। গাউনটা দেখামাত্র আঁতকে উঠলো সে। দৃষিতা অবাক হয়ে আনমনে বলতে লাগলো "এটা আবার কবে কিনেছিলাম আমি? মনে পড়ছে না তো ..."!

অতনুর শান্ত উত্তর এলো,

"মনে না পড়লে ছেড়ে দাও। ওটা আর প্যাক কোরো না।"


(সমাপ্ত)


Rate this content
Log in

More bengali story from Sheli Bhattacherjee

Similar bengali story from Horror