SUBHAM MONDAL

Horror Others


4.6  

SUBHAM MONDAL

Horror Others


অভিশপ্ত ঘড়ি💀🕰️

অভিশপ্ত ঘড়ি💀🕰️

11 mins 4.1K 11 mins 4.1K

  টুং-টাং করে নটা বাজল। জলতরঙ্গের মত ভারি মিষ্টি সুরেলা আওয়াজ। মানবেন্দ্র মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিল গোলাকৃতি দেয়াল ঘড়িটার দিকে। বলল, "তোমার ঘড়িটা বেশ তো। এত মিষ্টি আওয়াজ বড় একটা শুনিনি! আর পেন্ডুলামটাও অদ্ভুত।"... মৃদু হাসলাম। সত্যিই অদ্ভুত। গােল ঘড়িটার তলায় খানিকটা কাটা, সেই ফাক দিয়ে একটা লম্বা স্টিলের চেন বেরিয়ে এসেছে, তার গোড়ায় ঝুলছে একটা রক্তচক্ষু ড্রাগনের মুণ্ড। প্রতি সেকেন্ডে সেকেন্ডে আন্দোলন হচ্ছে ড্রাগন পেন্ডুলাম। মুণ্ডটা ধাতব নয়, হাড়ের তৈরি। মানব জিজ্ঞাসা করল, "ঘড়ি সংগ্রহ করলে কোথা থেকে? যেন একটা কিউরিও!"

বললাম, "তাই বটে। ঘড়িটা এদেশীয় নয়, চীনদেশীয়। 

বয়সও হয়েছে, পঞ্চাশ হল। পঞ্চাশ বছর আগে আর্মেনিয়ান স্ট্রিটে পুরনো আসবাবের একটা দোকান ছিল। দোকানটা চালাত এক বুড়ি চীনে মহিলা। আমার ঠাকুরদা গিয়েছিলেন সস্তায় একখানা ইজিচেয়ার কিনতে, এই চীনে ঘড়ি তার নজরে লেগে গেল। বুড়ি কিন্তু বেচতে চায় না, বলে, ঘড়িটা ভূতে-পাওয়া, ওটা নিয়ো না বাবু।"

"ভূতে-পাওয়া ঘড়ি! সেটা কীরকম?"

মানব কৌতুহল বােধ করলে। বললাম, আমার ঠাকুরদাও ঠিক এই প্রশ্ন করেছিলেন। উত্তরে বুড়ি একটু চুপ করে থেকে একটা ছোট্ট গল্প বলেছিল।

আমাদের কাছে সেটা গল্প, কিন্তু বুড়ির কাছে সত্য ঘটনা। ঘটনাটা বলি শােনাে।" মানব বললো, "তার আগে আর একটা সিগারেট দাও হে বুবাই। চীনে বুড়ি? ড্রাগন-মার্কা ঘড়ি ?!বেশ একটা ব্রোমাঞ্চের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।"

"আর এক পেয়ালা কফিও চলবে তাে?"

পৌষের শেষ। শীত যেমন পড়ার তেমনই পড়েছে। তবু কুয়াশা যেন এবার অত্যধিক। সন্ধ্যা হতে না হতেই শহরতলির মনােরম ছবি চাপ চাপ কুয়াশায় লেপে মুছে একাকার হয়ে যায়। শীতের সন্ধ্যা এরই মধ্যে নিশুতি রাত হয়ে উঠেছে। পথেঘাটে লােক-চলাচলের শব্দ নেই, তার বদলে শোনা যাচ্ছে থেকে থেকে একটা গুমরে-ওঠা চাপা কাতরানি। কী জানি, কেন, আজ সূর্যাস্তের পর থেকেই শীতের হাওয়া পথে পথে কেঁদে বেড়াচ্ছে। পরিবেশটা ছমছমে বেশ তাতে সন্দেহ নেই। এমন পরিবেশে মনটা প্রতিদিনের ব্যস্ত জীবনের ভিড় থেকে পালিয়ে ভিন্নতর স্বাদ পেতে চায়, নিরিবিলি গৃহকোণে দু-চারটি বন্ধুর সঙ্গে ঘন হয়ে বসতে চায়, লৌকিক জগৎ থেকে অলৌকিক জগতে বিচরণ করতে চায়। বোধ হয় এই কারণেই মানবেন্দ্র আমার শহরতলির বাড়ির বৈঠকখানা এসে এই পৌষ-সন্ধ্যায় জমায়েত হয়েছে। আমার দেয়াল ঘড়ি সে আগে কখনাে দেখেনি তা নয়, কিন্তু ঘড়িটা সম্পর্কে তার মুখ থেকে কোনাে কৌতূহল প্রকাশ পায়নি। হয়তাে এই পৌষ-সন্ধ্যায় ছমছমে পরিবেশ তার কৌতুহলকে আজ জাগিয়েছে।

কফি এল। সিগারেট জ্বলল। মানবেন্দ্র সােফার উপরে পা তুলে, আলােয়ান মুড়ি দিয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে বললে, "নাও, এবার বলাে সেই চীনে বুড়ির গল্প।"

বললাম, "গল্পটা চীনে বুড়িকে নিয়ে নয়, তার বলা এক কাহিনি। হাে চি জাতে চাষী হলেও সে ছিল ঘড়ি তৈরির ওস্তাদ কারিগর। গাঁয়ে বসে বসে সে নানারকম ঘড়ি তৈরি করত, আর মাসে একবার করে শহরে যেত বেচতে। সংসারে ছিল। তার স্ত্রী তান, আর একটি মেয়ে। তার বউ তান ছিল সুন্দরী স্বাস্থ্যবতী, চাষীর ঘরে অমন রূপবতী বড় একটা দেখা যায় না। হাে চি-র সৌভাগ্যে অনেকের চোখ টাটালেও বউ নিয়ে তার সংসার ভারি সুখের। হো চি শুধু ঘড়িই করত, আর চাষের কাজ থেকে গৃহস্থালির সবরকম কাজ সারত একা তান। সেবা যত্নে ভালোবাসায় তান আলোর মতাে, হাওয়ার মতাে ঘিরে রেখেছিল হাে চি-র জীবনকে।একবার শহর থেকে ঘুরে এসে হাে চি ঘরে তানকে দেখতে পেল না। শুধু ঘরে নয়, সারা গায়ে খুজে পেল না। পাগলের মতাে হয়ে গেল হাে চি। অনেক চেষ্টায় খবর পাওয়া গেল, গায়ের জমিদার তানকে হরণ করে অনেক দূরে নিয়ে গেছে। আশ্চর্যরকম চুপচাপ হয়ে গেল। দেখা গেল, অনেকদিন বাদে আবার সে একটা দেয়াল ঘড়ি তৈরি করতে হাত লাগিয়েছে। এমন কিছু অসাধারণ ঘড়ি নয়, কোনাে বাহারি নকশা নেই, তবু এত মন দিয়ে সে আর কখনাে ঘড়ি বানায়নি।দিনে সে ঘড়ির কাজ করে, আর রাতে করে অন্য কাজ ভূতপ্রেতের পুজো। হাে চি তন্ত্র মন্ত্র জানত। সারারাত ধরে সে ঘড়িটার সামনে ধূপধুনাে জ্বালায় আর বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ে। একনাগাড়ে সাত রাত ধরে চলল। তারপর হো চি একটা মরা শকুনের হাড় থেকে খােদাই করলে। একটা ড্রাগনের মুণ্ড, চোখ দুটো লাল রং দিয়ে আগুনের মতাে জ্বলজ্বলে করে দিলে, তারপর মুন্ডুটা আটকে দিলে স্টিলের চেনের গোড়ায়।দুলতে লাগল ড্রাগনের মুণ্ড। আর মুহূর্তে মুহূর্তে রক্তবর্ণ চোখ দুটো নিষ্ঠুর রক্ততৃষ্ণায় ঝলসে উঠতে লাগল।"


মানবেন্দ্রর দু-আঙুলে ধরা জুলন্ত সিগারেটের মুখে লম্বা ছাই জমেছে। চুপ করে বসে শুনছে। জানলার কাচের শার্সি দিয়ে দেখা যাচ্ছে ধোঁয়া ধোঁয়া কুয়াশার রহস্যজগত। শোনা যাচ্ছে শীতের হাওয়ার ফুপিয়ে ওঠা কার যেন করুন বিলাপ। বলতে লাগলাম, "এরপর হাে চিকে দেখা গেল নানজিং শহরে। জমিজমা বেচে শহরে এসে আস্তানা পেতেছে। খুঁজে বেড়াচ্ছে জমিদারের ডোরা। যত বড় শহরই হােক, খুজতে খুজতে জমিদারের ঠিকানা পাওয়া গেল শেষ পর্যন্ত। হাে চি কিন্তু জমিদারকে খুন করার চেষ্টা করলে না, তার বিরুদ্ধে নারী-হরণের নালিশও করলে না। একদিন সে শুধু তিব্বতী লামা সেজে সেই ঘড়িটা জমিদারকে উপহার দিয়ে এল। বললে, বড় পয়মন্ত এই ঘড়ি। যার ঘরে থাকে, তার সকল বিষয় শুভ হয়, সে দীর্ঘায়ু হয়। জমিদার খুশি হয়ে ঘড়িটা নিজের ঘরে টাঙিয়ে রাখলো।এক বছর বাদে হঠাৎ ঘড়িটা একদিন বন্ধ হয়ে গেল। আশ্চর্যের বিষয়, ঘড়িটা পুরো দম দেওয়া ছিল, তবু বন্ধ হয়ে গেল। আর, পরদিনই হঠাৎ দম বন্ধ হয়ে মারা গেল জমিদার। বয়স ছিল চল্লিশের সামান্য কিছু উপরে, নীরােগ, সবল স্বাস্থ্য, তবু মারা গেল হঠাৎ।

খবরর পেয়ে অনেকদিন বাদে হো চি-র মুখে হাসি দেখা দিল।" মানবেন্দ্র নিশ্চুপ দেহটা একবার নড়ে উঠল। বললে, "ভারি আশ্চর্য তাে।"

বললাম, "হ্যা, আশ্চর্য হবার কথাই বটে। জমিদারের আত্মীয়রা বলাবলি করলো যে, ঘড়িটা অলক্ষুণে। ভয় পেয়ে তারা ঘড়িটাকে নামমাত্র দামে বেচে দিলে শহরের এক নীলামওয়ালার দোকানে। হাে চি একদিন সন্ধান পেয়ে সেটা কিনে এনে নিজের ঘরে রাখল। পরের বছর হঠাৎ একদিন ঘড়িটা বন্ধ হয়ে গেল। পুরো দম থাকা সত্ত্বেও।

পরদিন মারা গেল হাে চি নিজেই! জল খেতে গিয়ে হঠাৎ দম আটকে। হো চি মেয়ে সান অপয়া ঘড়ি কে বিদায় করে দিল। একজন প্রতিবেশীকে সেটা দিয়ে সে চলে গেল নানজিং শহর ছেড়ে।"

চীনে বুড়ি বলেছিল, "তারপর ঘড়িটা কত হাতে ঘুরেছে কে জানে। বছর তিনেক আগে একদিন এক ইংরেজ ভদ্রলোক একটা পুরনাে ঘড়ি নিয়ে এল আমার দোকানে বেচতে। দেখেই চমকে উঠলাম। এ সেই ঘড়িওয়ালা হাে চি-র ভূতুড়ে ঘড়ি! আমিও কিনব না, সাহেবও ছাড়বে না। দারুণ ভয় পেলে যেমন চোখ মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায়, সাহেবের অবস্থা তেমনি। শেষ অবধি এক পয়সাও না নিয়ে সাহেব ঘড়িটা এমনিই রেখে গেল। সেই থেকে দোকানে পড়ে আছে, বাড়িতে 

কখনাে নিয়ে যাইনি এই ভূতুড়ে ঘড়ি। বাবু, আমি মানা করছি, তুমিও নিয়ে না।"


"তোমার ঠাকুরদা কি বললেন?" মানব প্রশ্ন করল।

"ঠাকুরদা প্রথমে একচোট হাসলেন। তারপর বললেন, শােনাে বুড়িমা, আষাঢ়ে গল্পটা ফেঁদেছো মন্দ নয়। কিন্তু জেনে রাখাে, আমি শঙ্করনাথ চক্কোত্তি, অল ইন্ডিয়া কুস্তি চ্যাম্পিয়ান ছিলাম। এখন বয়স পয়ষট্টি, দশ বছর আগেও নিয়মিত কুস্তি লড়তাম। ভূতটুত আমি মানিনে।"

বুড়ি বললো, 'তুমি ভূত মানো না?"

ঠাকুরদা বললেন, "না।"

-"কিন্তু বিশ্বাস করো ভূত আছে।" 

-"থাক। আমার কিছু আসে-যায় না। আমার নাম শঙ্কর, মানে ভূতনাথ আমি ভূতের প্রভু।😂 আমার শখ হয়েছে, আমি কিনবই। বেশি দর না বাজিয়ে সােজাসুজি বলাে কত দিতে হবে। বুড়ির মুখ অত্যন্ত ম্রিয়মাণ হয়ে গেল। বললো, "তুমি যখন ভূতুড়ে ঘড়ি টা কিনবে, তখন যা তোমার ইচ্ছা দাও। তবে তোমার ঠিকানাটা লিখে দিয়ে খেয়ে। ভগবান বুদ্ধ তােমায় রক্ষা করুক।"

মাত্র পাঁচ টাকায় ঠাকুরদা ঘড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরলেন।...

মানবেন্দ্র বললে, "তারপর?"

আমার সিগারেট নিভে গিয়েছিল, আবার ধরিয়ে বললাম, "তারপর ঘড়িটার কথা বাড়ির সবাই প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। বৈঠকখানায় টাঙানাে আছে, নির্ভুল সময় দেয়, মিষ্টি আওয়াজ করে প্রহর ঘোষণা করে। হঠাৎ এক শীতের সকালবেলা কম্বলে মােড়া এক মূর্তি এসে হাজির। চুলগুলাে উসকো, সারা মুখের চামড়া ঝুলে পড়েছে, চোখ দুটো নেই বললেই চলে। বলল, "চক্রবর্তী সাহেব আছেন ?"

ঠাকুরদা এসে চীনে বুড়িকে দেখে অবাক। বললেন, "কি ব্যাপার বুড়িমা!! তুমি হঠাৎ?"

বুড়ি আস্তে আস্তে বললো, "ঘড়িটা তুমি যেদিন কিনেছিলে, সেদিন থেকে আজ ঠিক এক বছর পূর্ণ হল। তােমার কোনাে বিপদ-আপদ হয়নি তো?"

হেসে উঠলেন ঠাকুরদা। বললেন, "ও, সেই খবরের জন্যে খুঁজে খুঁজে আমার শহরতলির বাড়িতে এসেছ। না বুড়িমা, আমার কোনো বিপদ হয়নি।আমাকে দেখেই বুঝতে পারছ। বলেছি তো আমি ভূতের প্রভু । তবে ঘড়িটা চমৎকার, ঠিক টাইম দিচ্ছে।"

বুড়ি যেন হেরে গেল। তবু লক্ষ করলাম, আস্তে আস্তে তার আঁকিবুকি কাটা মুখ প্রসন্ন হয়ে উঠেছে।

বুড়ি চলে যাবার সময় ঠাকুরদা প্রশ্ন করলেন, "আচ্ছা, ঘড়িটার বিষয়ে অমন আজগুবি গল্প তুমি শুনলে কোখেকে?

বুড়ি গলায় বিশ্বাসের জোর এনে বললো, "আজগুবি নয়, সত্য ঘটনা!"

-"বটে। আচ্ছা, সত্য ঘটনাই সই। তুমি কোথেকে জানলে?"

চলে যেতে যেতে আস্তে আস্তে বুড়ি বলল, "আমিই ঘড়িওয়ালা হো চি-র মেয়ে সান।"

আলােয়ানখানা ভালাে করে জড়িয়ে মানবেন্দ্র বললে, "যাক, কোনাে দুর্ঘটনা তাহলে আর হয়নি?"

একটু চুপ করে থেকে বললাম, "হয়েছে"।

মানবেন্দ্র দুই চোখে প্রশ্ন নিয়ে চেয়ে রইল। জানলার বাইরে পৌষের রাত কান পেতে শুনছে হাওয়ার ফুলে ফুলে কান্না। হাওয়ার হাহাকার আরও বেড়েছে। ঝাপসা কাচের শাসি বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে হিমের ফোটা। আমি আবার শুরু করলাম, "চীনে বুড়ি যেদিন এসেছিল, সেদিন ঘড়ি কেনার পর এক বছর পূর্ণ হয়। এক বছরের মধ্যে ঘড়িটা একবারও বন্ধ হয়নি। কিন্তু সেইদিন সন্ধেবেলা বন্ধ হয় গেল। দম দিতে গিয়ে দেখা গেল পুরাে দম রয়েছে। তবু ঠাকুরদা বললেন, কাল ঘড়িটা ভালাে দোকানে অয়েলিং করাতে দিয়াে, মানিক। মানিক আমার বাবার নাম। বাবা বললেন, আয়েলিং তাে মাস তিনেক হল করানাে হয়েছে। ঠাকুরদা বললেন, তবু একবার দেখিয়াে। হাজার হলেও ঘড়ি টার বয়স হয়েছে। অনেক নেড়েচেড়েও ঘড়িটাকে চালানাে গেল না। পরদিন ভােরবেলা থেকে ঠাকুরদা বুকে একটা ব্যথা অনুভব করতে লাগলেন। 

যত বেলা হতে লাগল, ব্যথাটা বেড়েই চলল। ঘড়ির ইতিহাস আমার ঠাকুমা ও শুনেছিলেন। তার মুখ শুকিয়ে গেল, বারবার বলতে লাগলেন," এত জেদ ভালাে নয়। এ নিশ্চয় এই অলক্ষুণে ভূতুড়ে ঘড়ি ঘরে রাখার ফল।"

ডাক্তার এল। ঠাকুরদাকে পরীক্ষা করে বললেন, করােনারি অ্যাটাক। শুনে সবাই আশা ছেড়ে দিল। বাড়িময় নেমে এল শােকের ছায়া। শুধু ঠাকুরদার মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। যেন জিতে গিয়েছেন! হাঁপাতে হাঁপাতে বলে উঠলেন, "শুনলে তােমরা সব! আমি মরছি স্বাভাবিক রোগে, ভূতুড়ে ঘড়ির প্রভাবে নয়। ভূত বলে কিছু নেই। বােগাস।"

বিকেল নাগাদ ঠাকুরদার হার্টের ঘড়িও বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু অন্তিমকাল পর্যন্ত তিনি জোর গলায় ঘােষণা করে গেলেন, ভুত নেই।

মানবেন্দ্র বললে, "তোমার কী মনে হয় বুবাই? সত্যিই ভূত নেই ?"

বললাম, "ও বিষয় নিয়ে কখনাে মাথা ঘামাইনি। 

কেননা মাথা ঘামাবার কোনো কারণ ঘটেনি। আমি ফাঁকা বাড়িতে রাত কাটিয়েছি, শ্মশানে গিয়েছি,

Bloody marry , blue baby ইভেন Midnight man এর মত রিচুয়াল ও ট্রাই করেছি কিন্তু কখনও ভূতের ছায়া ও দেখিনি।"

-"তাহলে তােমার বিশ্বাস, তোমার ঠাকুরদার হঠাৎ মৃত্যুর কারণ হাে চি-র ভূতুড়ে ঘড়ি নয় "?

-"না, ঘড়িটা কারণ নয়। চীনে বুড়ির চেয়ে ডাক্তারের ওপর আমার বিশ্বাস বেশি।"

একটু থেমে মানবেন্দ্র বলল, "কিন্তু ঠাকুরদার করোনারি অ্যাটাক ঘড়িটা বন্ধ হবার ঠিক পরদিনই হল কেন? দু-পাঁচ দিন আগে বা পরেও তাে হতে পারত।"

বললাম, "পারত বইকি। কিন্তু ঘড়ি বন্ধ হবার পরদিনই ঠাকুরদার মৃত্যু নেহাত অ্যাকসিডেন্টাল, মানে কাকতালীয় ঘটনাও তা হতে পারে। ঘড়ি বন্ধ হলেও হয়তাে ঠাকুরদার বাঁচার মেয়াদ ওইদিনই ফুরােত।"

-"কিন্তু পুরাে দম থাকা সত্ত্বেও ঘড়িটা হঠাৎ বন্ধ হল কেন?"

আমার হাসি পেয়ে গেল। বললাম, " জানি না। বহু পুরনাে কলকবজা কখন কী কারণে বিগড়ে যায় ধরা মুশকিল। কিন্তু তা নিয়ে তােমার মাথায় দুশ্চিন্তা ঢুকল কেন হে? বিজ্ঞান যুগের লােক হয়ে তুমি ভূতে বিশ্বাস করাে নাকি?"

মানবেন্দ্র একটু অপ্রস্তুত হল এবং বলল, "বিশ্বাস যে করি, তা বলতে পারি না। আবার বিশ্বাস করি না, তাও জোর করে বলা চলে না। তবে এই লৌকিক বস্তুজগতের বাইরে একটা অদ্ভুত অলৌকিক জগত আছে, সেটা বিশ্বাস করি।'

-"তাই নাকি। সেই অলৌকিক জগতে আছে কী শুনি। ছায়া ছায়া চেহারা, নাকি সুরে কান্না আর বিকট অট্টহাসি?" মানবেন্দ্র, বয়স তােমার চল্লিশ পার হল, পেশায় ফিজিকসের প্রফেসর, এখনও গ্রাম্য সংস্কার গেল না?"

মানবেন্দ্র চুপ করে আমার বিদ্রুপ হজম করল। 

তারপর আরও গম্ভীর হয়ে বললে, "একে সংস্কার বলে বিদ্রুপ কোরাে না বুবাই, এটা অনুভূতির ব্যাপার। অনেক সময় অনুভূতি দিয়েও বােঝা যায়, কিন্তু বােঝানাে যায় না। একদিন হয়তাে সত্যটা তুমি নিজেই বুঝবে।"

হেসে উঠে বললাম, "বেশ, তেমন দিন যদি কখনাে আসে, আমার বিদ্রুপ সেদিন ফিরিয়ে নেব। কিন্তু আমি আবার বলছি, ভৌতিক গাঁজায় আমার নেশা হয় না"।

তর্ক আর বাড়াল না মানবেন্দ্র। খানিক চুপ থেকে প্রশ্ন করলে, "তােমার ঠাকুরদা কতদিন হল গত হয়েছেন?"

-"বছর পাঁচেক হল।"

-"এর মধ্যে তােমাদের পরিবারে আর কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে? কোনাে মৃত্যু?"

-বললাম, "দীর্ঘ পাঁচ বছরে কোনাে দুর্ঘটনা বা মৃত্যু ঘটেনি, এমন কোনাে পরিবার দেখাতে পার"?

মানবেন্দ্র বললে, "আমি জানতে চাইছি, শুধু তোমাদের পরিবারের কথা।'

-"আমরাও আর পাঁচটা পরিবারের মতাে। ঠাকুৱদা মারা যাবার বছর দুই বাদে আর একটা মৃত্যু ঘটে আমাদের পরিবারে। তবে সে মৃত্যুও ভৌতিক নয়, তার একটা স্পষ্ট কারণ ছিল।"

-"কে মারা যান?"

-"আমার বাবা।" 

এক মিনিট আমার মুখের পানে তাকিয়ে রইল মানবেন্দ্র। তারপর জিজ্ঞেস করলে, "কীভাবে?"

বলতে লাগলাম, "আমার বাবা ছিলেন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। একটা বিলিতি কোম্পানিতে চাকরি করতেন। তাদের বিশাল ফ্যাক্টরি, সেইখানেই ছিল বাবার কাজ। বছর তিনেক আগে আমার এক পিসতুতাে বােনের বিয়ে লাগল। বিয়েটা হবে আমাদের এই বাড়িতেই। দিনটা মাঘ মাসের মাঝামাঝি। সেদিন সকাল থেকেই বিয়ে বাড়িতে সাড়া পড়ে গেল। 

সাজানােগােছানাে, কম্পাউন্ডে প্যান্ডেল বাঁধা বেলা বারােটা নাগাদ বাবার কাছে টেলিফোন এল কী যেন চলছে না, কোথায় কী বিগড়েছে ধরা যাচ্ছে না! এখুনি একবার যেতে হবে, নইলে বিরাট ক্ষতি হয়ে যাবে। ঠাকুরদা নেই, বিয়েবাড়ির আসল কর্মকর্তা বাবা; বিয়ের জন্যে তার ছুটি নেওয়া আছে। অথচ এ কী বিভ্রাট! বাবা বললেন, "আমি যাব আর আসব। বড়জোর ঘণ্টা দুই-তিন। বর আসার আগেই ফিরব।"

"চলে গেলেন। আর সেই যে গেলেন, ফেরবার লক্ষণ নেই। কাজ পাগল মানুষ, হয়তো অ্যাসিস্ট্যান্টকে কাজ বোঝাচ্ছেন। এদিকে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হল। সন্ধ্যালগ্নেই বিয়ে, বর এসে পড়লে এখুনি, বাবার দেখা নেই।

বাড়িসুদ্ধ লোক ভাবনায় অস্থির। শীতের সন্ধা একটু তাড়াতাড়িই নামে, অন্ধকার হয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে কারখানা থেকে আবার টেলিফোন এল বাবা হসপিটালে। অন্যমনস্ক হয়ে একটা হাই ভোল্টেজ তার ছুঁয়ে ফেলেছেন। হসপিটাল থেকে বাবা আর বাড়িতে আসেনি।"

মানবেন্দ্র চেঁচিয়ে বলে উঠল, "ঘড়িটা তখন চলছিল কি?????"

বললাম, "না। একদিন আগে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।"

কিছুক্ষণ আর কথা হল না।... বাইরে শীতের হাওয়া হু হু করে কেঁদে কেঁদে উঠছে। ঘরের মধ্যেকার স্তব্ধতা ক্রমেই যেন ভারী লাগছে। মানবেন্দ্র উঠে পায়চারি করতে লাগল। তার পর হঠাৎ থেমে বললে, "ঘড়িটাকে আর রেখাে না বুবাই, ফেলে দাও।

বললাম, "কেন? ঘড়ির কী দোষ?''

-"এখনও বুঝতে পারছ না? বেশ, তুমি না পার, কাছেই গঙ্গা, আমি ঘড়িটাকে ফেলে দিয়ে আসছি।"

মানবেন্দ্র উত্তেজিত হয়েছে। বললাম, "পাগলামি কোরাে না। ঘড়িটা আমার ঠাকুরদার স্মৃতি, ফেলে দিলে তাকে অপমান করা হয়।'

মানবেন্দ্র পাগলের মতাে আমায় বােঝাতে লাগল, "এখনও সময় আছে। বুবাই, ঘড়িটাকে এখুনি বাড়ি থেকে বিদায় করাে। নইলে তােমার আরও বিপদ হবে! ভূতপ্রেত দুষ্ট আত্মা এদের নিয়ে ছেলেখেলা করতে নেই। এরা আছে— এরা আছে।'' 

মনটা কঠিন হয়ে উঠল। গলার আওয়াজও। বললাম, "থামাে! তােমার পচা পুরনাে সংস্কার নিয়ে তুমি থাকো। ভূত সম্পর্কে আমরা নাস্তিকের বংশ, ভূত আমি মানি না মানি না মানি না!" শান্ত হয়ে গেল মানবেন্দ্র। 

আলােয়ানখানা ভালাে করে মুড়ি দিয়ে হাতের রিস্টওয়াচের দিকে একবার তাকালে। তারপর ক্ষুব্ধ গলায় বলল, "বেশ, তুমি তােমার জেদ নিয়েই থাকো। রাত দশটা বাজল, আমি চলি।"

চলে গেল মানবেন্দ্র। কিন্তু আমি আমার দেয়াল-ঘড়ির দিকে তাকিয়ে পাথর হয়ে গেলাম। মানবেন্দ্র হাত-ঘড়িতে এখন দশটা, আমার দেয়াল-ঘড়িতে নটা কুড়ি। আবার তাকালাম। ভালাে করে তাকিয়ে দেখলাম, পেন্ডুলামের চেন নড়ছে , দুলছে না মরা শকুনের হাড়ের তৈরি রক্তচক্ষু ড্রাগনের মুণ্ড।

বাবা মারা যাবার তিন বছর পরে ঘড়িটা আবার বন্ধ হল। অথচ আজই সকালে আমি নিজে দম দিয়েছি।। ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার কেমন যেন শীত করতে লাগল। ভূত সম্পর্কে নাস্তিক বংশের ছেলে আমি। আমার মনের জোর কি কমে আসছে। চোখ সরিয়ে জানলার দিকে তাকালাম। মনে হল সেই চীনে বুড়ি সানের মতাে এই পৌষের রাত চাপ চাপ কুয়াশার কম্বল মুড়ি দিয়ে আমার কাচের জানলার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। উঁকি দিয়ে দেখছে আমাকে। তার পিছনে কুয়াশায় ঝাপসা আরও কত যেন অশরীরী ছায়া!!!

শীতটা ক্রমশ বাড়ছে। একা একা ঘরে বসে শুনছি শীতের হাওয়ার ডুকরে ওঠা মরা কান্না। ঘড়িটা আবার বন্ধ হল!

ঠাকুরদা গেছেন, বাবা গেছেন, এবার কার পালা?......🤔☠️💀



Rate this content
Log in

More bengali story from SUBHAM MONDAL

Similar bengali story from Horror