Dola Bhattacharyya

Action Classics Crime

5  

Dola Bhattacharyya

Action Classics Crime

দেবীপক্ষ

দেবীপক্ষ

6 mins
884



মেয়েটার নাম পর্ণা। উত্তর কলকাতার এই নিম্ন মধ্যবিত্ত পাড়ায় নতুন এসেছে ওরা। পাড়ার কারো সাথে এখনও আলাপ হয়নি ওদের । ওদের থেকে দূরত্ব রেখেই চলে সবাই। কারণ এখানে ওরা একেবারেই বেমানান। পর্ণা এবং ওর বিধবা মায়ের সম্পর্কে সকলের কৌতুহল আকাশ ছোঁয়া। মহিলা আবার চাকরি করেন। রোজ যখন অল্প প্রসাধন সেরে সকাল নটা নাগাদ বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিজের কর্মক্ষেত্রের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন, আশপাশ থেকে কিছু কথা হাওয়ায় ভেসে আসে, "বাব্বাঃ! দেখে তো বোঝাই যায় না স্বামী নেই।" "বিধবা মানুষ, তার আবার এত সাজ কিসের!" এসব শুনেও না শোনার চেষ্টা করেন সাহানা। উনি একজন স্কুল শিক্ষিকা। যথেষ্ট ব্যস্ত উনি। এসব সহ্য করার ক্ষমতাও ওনার আছে। 

পর্ণার যখন দুবছর বয়স, সেই সময়ে মারা যান প্রবাল। কর্ণেল প্রবাল চৌধুরী, কার্গিল যুদ্ধের শহীদ। প্রবালের যোগ্য স্ত্রী সাহানা। একা হাতে মেয়েটাকে মনের মতো করে মানুষ করছেন। সাহানার ইচ্ছা, পর্ণাও ওর বাবার মতোই তৈরি হোক। পর্ণা পারবে, সে বিশ্বাস ওঁর আছে। দীর্ঘদিন আগে প্রবালের বাবা এই জায়গায় জমি কিনেছিলেন।


সারাজীবন সাত সরিকের এজমালি বাড়িতে কাটিয়ে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এই জমি কিনেছিলেন সূর্য চৌধুরী। বাড়ির প্ল্যান তৈরি হয়েছিল। সেই প্ল্যান স্যাংশন হবার আগেই মারা যান সূর্য চৌধুরী। মারা যাবার আগে ছেলেকে অনুরোধ করেন বাড়িটা সম্পূর্ণ করতে। ততদিনে সাহানা এসেছেন এই বাড়ির বৌ হয়ে। বাবার কথামতো বাড়ির কাজে হাত দিলেন প্রবাল। কিছুদিন পর প্রবালও চলে গেলেন। আত্মীয় স্বজনরা বলাবলি শুরু করল, "অভিশপ্ত বাড়ি এটা। বেচে দাও এই বাড়ি " । প্রবালের মা সুধাময়ী ভেঙে পড়লেন ভীষণ ভাবে। সূর্য চৌধুরীর ভাই কিরণ চৌধুরী সুধাময়ী কে বোঝালেন অনেক করে, "তোমরা তো দুটি মাত্র প্রাণী, আর ওই পুঁচকে মেয়েটা। অতবড় বাড়ি টা করে কি করবে! এখানে তো ভালোই আছো। ওই বাড়ি অভিশপ্ত। বিক্রি করে দাও ওটা। কিন্তু বাড়ি বেচতে রাজি হলেন না সুধাময়ী । একমাত্র অবলম্বন পুত্রবধুকে বললেন, বৌমা, তুমি তো শিক্ষিতা আধুনিক মেয়ে। যে যাই বলে বলুক, তুমি অন্তত এই অভিশাপের গল্প বিশ্বাস কোরো না। এ বাড়ি যে ওনার স্বপ্ন ছিল। এই বাড়ি আমি তোমার নামে লিখে দেব, বেচে দিও না এবাড়ি। এই বাড়ি সম্পূর্ণ করো তুমি। আমি জানি, তুমি পারবে। কোনো ক্ষতি হবে না তোমার বা তোমার সন্তানের। আমি যতদিন আছি, আগলে রাখব তোমাদের। 


বাড়ি তৈরি হল। গৃহপ্রবেশের আগেই অদ্ভুত ভাবে মারা গেলেন সুধাময়ী। দীর্ঘদিন ধরে হার্টের সমস্যায় ভুগছিলেন মানুষ টা। সুগারটাও অনেক বেশি ছিল। চলে গেলেন আচমকা। না, ঠিক আচমকা নয়। বাথরুমের মেঝেতে সাবান জল ছিল। পা স্লিপ করে পড়ে গিয়েছিলেন সুধাময়ী। সাথে সাথেই হার্ট আ্যটাক হয় ওনার। কান্নায় ভেঙে পড়লেন সাহানা। কিন্তু খটকা একটা ছিল। বাড়ি টা এজমালি হলেও বাথরুম টা নয়। এতবড় বাড়িতে পাঁচ ছখানা বাথরুম। সুধাময়ীর বাথরুমে অসময়ে সাবানজল এল কোথা থেকে! জ্ঞাতিরা ছি ছি করতে লাগল। "অভিশপ্ত বাড়ি জেনেও বুড়ির কথায় মেতে বাড়িটা বানিয়ে ফেললে! এবার একা ভোগ করবে তো! বলিহারি লোভ তোমার ।এবার তোমার মেয়েটার যদি কিছু হয়! শিউরে উঠে পর্ণা কে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন সাহানা। প্রবালের ভালবাসা , শ্বশুর শাশুড়ির চোখের মণি, আদরের পুত্রবধু সাহানা, জ্ঞাতিদের কথার চাবুকে আহত হয়ে যন্ত্রণায় বিদ্ধ হতে থাকেন। একমাত্র কন্যা পর্ণা এবার মায়ের অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায়। মাকে বোঝায় পর্ণা, "এসবে কান দিও না মা। ওরা এমন বলবেই। আমরা এই বাড়ির বদনাম ঠিক কাটিয়ে দেব, দেখো।" ওর মুখ চেয়ে আবার মাথা তুলে দাঁড়ান সাহানা। গৃহপ্রবেশের পরে সরিকি বাড়ি ছেড়ে মেয়েকে নিয়ে উঠে আসেন নতুন বাড়িতে । 


    কোচিং সেন্টারটা বাড়ি থেকে একটু দূরেই। সাইকেলে করে যাতায়াত করে পর্ণা। ফিরতে রাত নটা বাজে প্রায়। গলির মুখটায় বসে থাকা ছেলেগুলো ফেরার সময় ইদানিং বড় উৎপাত করছিল। ছজন থাকে ওরা। অশালীন ইঙ্গিত, উল্টাপাল্টা কথা। মা বলেছে, "কুকুরের ডাক লোকে এড়িয়েই চলে। ওদের ডাকের বিরুদ্ধে ডাক তোলে না কেউ "। সেই ভেবেই ওদের এড়িয়ে যাচ্ছিল পর্ণা। 


পুজোর আর মাত্র চারদিন বাকি। আজ ওই ছয় টা ছেলে হঠাৎ ওর রাস্তা আটকে দাঁড়াল । বাধ্য হল পর্ণা সাইকেল থেকে নামতে। চারপাশ থেকে ঘিরে ধরল ওকে ওরা। পর্ণা স্থির হয়ে সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে। সামনের ছেলেটা বলে ওঠে,"আমি লখাই। এ অঞ্চলের সবাই আমাকে চেনে। কি মামণি! ভয় করছে নাকী?" ওরা সকলে হো হো করে হেসে ওঠে। আবার বলে লখাই , "ভয় পেও না, ভয় পেও না, তোমায় আমি মারব না। সত্যি বলছি কুস্তি করে তোমার সঙ্গে পারব না"। হাসির হুল্লোর উঠল ওকে ঘিরে ।আর একজন বলে, সত্যিই পারবো না। আমরা শুধু এএকটু খেলবো তোমার সাথে। কি, খেলবে তো খুকুমণি?" সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরা পর্ণার হাতের ওপর হাত রাখে ছেলেটা। সাইকেল টা রাস্তার পাশে স্ট্যান্ড করে ছেলের দলের দিকে তাকায় পর্ণা, "হ্যাঁ, খেলবো তো। কিন্তু ছড়াটা কে বললি? কমপ্লিট কর আগে। "


লখাই বলে, " এই দেখো, আমরা কি তোমার মতো লেখাপড়া শিখেছি নাকী! ওই দু লাইনই তো মনে আছে। এসো এসো, আর দেরি কোরো না। তোমার মা খুঁজতে চলে এলে পুরো খেলাটাই ভেস্তে যাবে। ছেলেটা এগিয়ে আসে পর্ণার দিকে। দ্রুত পেছনে হঠতে গিয়েও পারে না পর্ণা। পেছনের ছেলেগুলো গরম নিঃশ্বাস ফেলছে ওর পিঠের ওপর। ভয় না পেয়ে পর্ণা বলে ওঠে, আমার মনে আছে, বলছি শোন, 


"মনটা আমার বড্ড নরম, হাড়ে আমার রাগটি নেই, 

তোমায় আমি চিবিয়ে খাব এমন আমার সাধ্যি নেই।"


বলার সাথে সাথেই বাঁ হাত দিয়ে সামনে দাঁড়ানো লখাইএর মুখটা ধরে সজোরে ধাক্কা মারে । অনেকটা পেছনে ছিটকে পড়ে লখাই । বাকিরা হতচকিত হয়ে পড়তে পর্ণা তেড়ে যায় ওদের দিকে, "মাথায় আমার শিং দেখে ভাই ভয় পেয়েছ কতই না —

জানো না মোর মাথার ব্যারাম, কাউকে আমি গুঁতোই না?" 


নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে লখাই। দাঁত কিড়মিড় করে দলের ছেলেদের নির্দেশ দিল, "এ্যাই, ছাড়িস না পাগলীটাকে। পালাতে যেন না পারে শালী।" লখাইএর নির্দেশ পেয়ে বাকি পাঁচজন চেপে ধরে পর্ণা কে। 


ওর সাথে অসভ্যতা করতে চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না। তার আগেই কিভাবে যেন পাঁচ জনে পাঁচ দিকে ছিটকে পড়ে। ভুপতিত অবস্থায় অবাক হয়ে তাকায় ওরা। হিংস্র দৃষ্টিতে পর্ণার দিকে তাকিয়ে আছে লখাই। এবার ও এগিয়ে আসতে থাকে পর্ণার দিকে। রাস্তার পাশ থেকে থানইঁট তুলে নিয়ে লখাইএর দিকে ছুটে যায় পর্ণা। পালাতে চেষ্টা করেও পারেনা লখাই। ওর পা লক্ষ্য করে থান ইঁট ছুঁড়ে মারে পর্ণা। পড়ে যায় লখাই। ওর কোমর থেকে চওড়া বেল্ট টা খুলে নিয়ে ওর ওপরেই ঝাঁপিয়ে পড়ে পর্ণা। তারপর? পাড়ার মোড়ে জমায়েত হওয়া কিছু লোক দেখতে পেল এক অগ্নি কন্যা কে, একটু আগেই যার হাতের চাবুক প্রজ্বলিত অগ্নিশিখা হয়ে ঝলসে দিচ্ছিল ছয়জন উশৃঙ্খল যুবক কে। এই মুহুর্তে দৃপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে সে। ছয় মস্তান লুটিয়ে পড়ে আছে তার পায়ের কাছে। প্রত্যেকেই মারাত্মক ভাবে আহত। ওদের চালে একটু ভুল হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে মার্শাল আর্ট প্র্যাক্টিস করেছে পর্ণা। এটা ওদের জানা ছিল না। দ্রুত ফোন বার করে স্থানীয় থানায় ফোন করে বলে পর্ণা , "স্যার, দেবীপক্ষ পড়ে গেছে। আজ কয়েকটা অসুর মেরেছি আমি । তবে প্রত্যেকেই বেঁচে আছে এখনও। দ্রুত এসে ব্যবস্থা নিন আপনারা। 

এইটুকু একটা মেয়ের সাহস দেখে সকলে অবাক। আরো একটা ব্যাপারে অবাক হয়েছে সকলে, লখাই ছাড়া বাকি ছেলেগুলো বহিরাগত। এরা হঠাৎ পর্ণা কে বেইজ্জত করার চেষ্টা করল কেন? সেটাও জানা গেল। থানায় নিয়ে গিয়ে ছেলেগুলো কে একটু আদর আপ্যায়ন করতেই, গলগল করে সব কথা বেরিয়ে এল। 


পর্ণার বাবা প্রবাল চৌধুরী মারা যাবার পর, সূর্য চৌধুরীর ছোটভাই কিরণ চৌধুরী একটা অদ্ভুত খেলা খেলতে শুরু করেন। সবাইকে বোঝাতে শুরু করেন, ওই বাড়িটা অভিশপ্ত। ওনার উদ্দেশ্য ছিল খুব কম পয়সায় বাড়ি টা হাতিয়ে নেওয়া। কারণ জমি কিনে ওরকম একটা বাড়ি করার ক্ষমতা ওনার নেই। তাই যেভাবেই হোক, বাড়ি টা যে অভিশপ্ত, সেটা প্রমাণ করতে হবে। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও কিছু করতে পারছিলেন না কিরণ চৌধুরী। শেষ পর্যন্ত সুধাময়ী কে মরতে হল। সকলে জানল, বাথরুমে পা স্লিপ করে পড়ে গিয়ে হার্ট ফেল করে মারা গেছেন উনি। বাকি রইলেন সাহানা, বড় শক্ত ঘাঁটি। এবার উনি টার্গেট করলেন পর্ণাকে। এই বাচ্চা মেয়েটাকে দিয়েই সাহানা কাঁটা উপড়ে ফেলার চেষ্টা করলেন। তাই লখাই কে লাগিয়েছিলেন পর্ণার পেছনে। আর বাকি পাঁচজনকে লখাই এনেছিল। তবে কিরণ চৌধুরী ভাবতে পারেন নি, এই বয়সে এসে ওনাকে জেল খাটতে হবে। সবটা বানচাল করে দিল ওই শয়তান মেয়েটা। ওর শরীরে এত ক্ষমতা কে জানতো! 

এপাড়ার লোকজন এখন আর কেউ ওদের অপছন্দ করে না। সাহানা দিদিমণি সবার কাছে একজন আদর্শ মানুষ। আর পর্ণা! ওর মতো ভালো মেয়ে চট করে দেখা যায় না। 


 

গল্পের মধ্যে সুকুমার রায় এর ভয় পেও না কবিতা টির কয়েকটি লাইন ব্যাবহার করা হয়েছে।


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Action