Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

Sutanu Sinha

Action Drama Horror


0.8  

Sutanu Sinha

Action Drama Horror


জঙ্গলে অমঙ্গল

জঙ্গলে অমঙ্গল

16 mins 2.3K 16 mins 2.3K

অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছিলো বুবাই এর । এই প্রথম বাবা মা এর সাথে সে জঙ্গল বেড়াতে এসেছে । ছোটবেলা থেকে অনেক জঙ্গল এর গল্প পড়লেও কখনো জঙ্গল দেখার সুযোগ হয়নি বুবাই এর । তাই পরীক্ষা শেষ হবার মাত্র ১০ দিনের মধ্যে এরকম একটা ঘোরার উপহার যে সে বাবা মা এর কাছ থেকে পাবে তা ভাবতেই পারিনি । প্রতি বছর ই ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হলে ঘুরতে যাই বুবাইরা । কখনো মামা , মাসি দের দল এর সাথে , কখনো জেঠু, পিসিদের সাথে , আবার কখনো বাবা বা মা এর কোনো বন্ধু দের সাথে । যাদের সাথেই যাক বুবাই এর সমবয়সী কাউকে না কাউকে পেয়ে যাই । তাই খুব এনজয় করে সে ।

কিন্ত এতো ঘোরার মধ্যে ও জঙ্গল ঘোরা কখনো হয়ে ওঠেনি বুবাই এর । তাই এই প্রথম বার জঙ্গল ভ্রমণ এ বেরিয়ে বুবাই এর সঙ্গী দুই মাসীমণি আর দুই মামাদের পরিবার, সঙ্গে বাবা মা । আর এই দলে বুবাই এর অন্তরঙ্গ সঙ্গী 'তোরা' বড় মাসির মেয়ে ।এখানে আসার আগেই বুবাই আর তোরা র ফোন অনেক বার কথা হয়ে গেছিলো । কি করবে , কি খাবে , আর সব থেকে বড় ব্যাপার কোন গুলো বাবা মা দের জানানো যাবে আর কোন গুলো নয় । তাই ট্রেন এ উঠে সবাই যখন নিজেদের মধ্যে গল্প করতে ব্যস্ত , বুবাই আর তোরা নিজেদের কে একটু আলাদা করে নিলো , আর নিজেদের পরিকল্পনা গুলো কে সাজাতে থাকলো । দু জন এই বাংলা আর ইংলিশ গল্পের পোকা , আর কেমন যেন সব গল্পেই তারা জঙ্গল, পশুপাখির সাথে কোনো এক অশরীরীর অস্তিত্ব সব সময় পেয়েছে ।যদিও দু জন এর এ এসব এ এক দম বিশ্বাস ছিল না । তাই তাদের পরিকল্পনা তেই ছিল , জঙ্গল মানেই অশরীরী নয় সেটা অনুভব করা । তাই গল্পের কথা মতো জঙ্গল এর যে সব জায়গায় অশরীরীর উপস্থিতি প্রত্যাশিত সেই জায়গাগুলো তে যে ভাবেই হোক তারা দু জন এক বার করে যাবে এবং দেখে আসবে এরকম ই ঠিক করলো দুজন এ ।

খাওয়া দাওয়া সম্পূর্ণ হলে, আর দু জন এর গল্পের বহর একটু কমে এলে , যে যার সিট এ ফিরে গেলো । কিন্ত মনের মধ্যে থেকে গেলো গভীর জঙ্গল, পশু পাখি আর অশরীরী । ট্রেন এর অদ্ভুত দুলুনি , বাবা মার ছোট খাটো বকুনি , আর জঙ্গল ঘুরতে যাবার অনুভূতি নিয়ে, কখন যে চোখের পাতায় ঘুম এসে গেলো বুঝতেই পারলো না দু জন এ । বুবাই দেখতে পেলো , দু জন এ কোনো এক গভীর জঙ্গল এ হাঁটছে , বলতে গেলে এক রকম হারিয়ে ই গেছে তারা , কারণ তাদের সাথে কারোকেই দেখতে পাচ্ছে না বুবাই । সত্যি একটু ভয় লাগতে শুরু করলো বুবাই আর তোরার । হঠাৎ একটা বিশ্রী শব্দে চমকে উঠলো তারা , পিছন ফিরে দেখলো কোনো একটা বড় আকারের পশু যেন এগিয়ে আসছে তাদের দিকে , প্রাণ প্রনে চিল্লানোর চেষ্টা করতে থাকলো দু জন এ । কিন্ত কিছুতেই পারছে না । অনেক কষ্টে মা বলে যখন ডেকে উঠলো , আর দু জন এ চোখ চেয়ে তাকালো , দেখলো সবাই ব্যাগ গোচাচ্ছে নামার জন্য , আর মা তাদেরকে ডাকতে এসেছে । দু জন এ খুব লজ্জা পেলেও চ্যাঁচিয়ে ওঠার কারণ কাউকে জানালো না ।সবাই ট্রেন থেকে নামার ব্যাপার এ এতটাই ব্যস্ত ছিল , কারোর জিজ্ঞেস করার সময়ও ছিল না । বুবাই আর তোরা এক হতেই দু জন এ দু জন এর স্বপ্নের গল্প বলতে শুরু করলো । দু জন এর স্বপ্ন শুনে দু জন এই অবাক হলো । কারণ এক দম এক ই স্বপ্ন দু জন এ কি করে দেখলো সেটা বুঝতে পারছিলো না । বুবাই এক বার ভাবলো বাবাকে বলবে , কিন্ত বললে যদি স্বপ্ন টা সত্যি না হয় তাই চুপ করে রইলো । কারণ দু জন এই চাইছিলো স্বপ্ন টা সত্যি হোক ।

গেস্ট হাউস এ পৌঁছনোর পর যখন সবাই খাওয়া দাওয়া আর ঘর নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো,তখন দুই ভাই বোন মিলে নিজেদের আগে থেকে ভেবে রাখা কিছু জিনিস আলাদা করা শুরু করলো । জিনিস গুলো বাকিদের কাছে মামুলি হলে ও , তাদের কাছে সেগুলোর মূল্য অনেক বেশি । দু জন এর ব্যাগ থেকেই বেরিয়ে এলো টর্চ , নারকেল দড়ি ,বাবার কাছে বায়না করে কেনা জঙ্গল জুতো , আর আগুন বেরোনো বন্দুক। বুবাই শুধু অতিরিক্ত হিসাবে নিয়েছিল একটা বাঁশি , যা বিপদ এ পড়লে সবাই কে নিজের অবস্থান বোঝাতে সাহায্য করবে । দুই ভাই বোন এর রাতের ঘুম এলোই না বললেই চলে অপেক্ষা করতে থাকলো জঙ্গল এর সেই শান্ত পরিবেশ এর জন্য ।

পরের দিন সকালে নিজেদের জিনিস গুলো একটা ব্যাগ এ ঢুকিয়ে সবার আগে গাড়িতে গিয়ে উঠলো । দু জন এর মধ্যে চুপি চুপি অনেক কথা হয়ে গেলো, যা শুধু মাত্র তারাই বুঝতে পারলো । গাড়ি যত বেশি জঙ্গল এ প্রবেশ করতে লাগলো ততই মনের মধ্যে উৎসাহ আরো বাড়তে লাগলো আর খুঁজতে লাগলো সেই অজানা আতঙ্ক কে । গাড়ি তাদের সবাই কে বেশ অনেক টা দূরেই নামিয়ে দিলো । এর পর চললো সেই দুর্গম হাঁটার রাস্তা । বুবাই আর তোরা সবার আগে চলতে থাকলো । সবাই মিলে পৌঁছলো এক ঝর্ণার কাছে । যা দেখে সবার কথা হারিয়ে যাবার দশা হল। জঙ্গল এর অদ্ভুত নীরবতাকে ভঙ্গ করে সবাই মেতে উঠলো ঝর্ণাই স্নান করার খেলায় ।ঝর্ণা তে স্নান করতে করতে দুই ভাই বোন ও সুযোগ পেয়ে গেলো এর উপরে যাবার । নিচ থেকে মা দের আওয়াজ ভেসে আসছিলো নিচে আই , কিন্ত তখন যেন ২ জন এ সব বাঁধা পেরিয়ে গেছে, পাথর এর এক অদ্ভুত অবস্থান বুঝতে না পেরে হালকা স্লিপ খেলো বুবাই , তাতে উল্টো দিকের জঙ্গল এ উল্টে গেলো সে , কিন্ত পরে যাবার আগেই জঙ্গল গাছ টাকে আঁকড়ে ধরলো, তোরা বুবাই হাত ধরেই ছিল , তাই এক ই দিকে তোরা ও ওল্টালো , আর দু জন এ এক সাথে ঝর্ণার পাহাড় এর ঠিক উল্টো দিকে চলে এলো । ওপাশ থেকে বাবা মা দের আওয়াজ এখন খুব হালকা শোনা যাচ্ছে । দু জন এ একটু ভয় পেয়ে গেলো বটে । হারিয়ে যাবো এরকম ভাবনা আর সত্যি কারের হারিয়ে যাবার মধ্যে যে বিস্তর পার্থক্য তা অনুভব করতে পারলো । তোরা বললো চল বুবাই ফিরে যাই , বুবাই বললো সে তো যাবো কিন্ত এই পাথর টপকানো তো সম্ভব নয় ,আমাদের উপায় বার করতে হবে ফেরার অন্য কোনো ভাবে । তখন এ দু জন এ অনুভব করলো , একটা জোর কম্পন । অনেক টা কোনো ভারী কিছু লাফিয়ে পড়লে এরকম শব্দ হয় ।বেশ ভয় পেয়ে গেলো দু জন এ । কিন্ত দু জন যথেষ্ট সাহসী বাচ্ছা , এতো সহজে হেরে যাই না । দু জন এ মিলে ঠিক করলো জলের শব্দ ধরে ফিরবে , কারণ এই ঝর্ণার জল কে ধরেই তারা কোনো কোনো না কোনো জায়গায় ঠিক পৌঁছবে । দু জন এ জলের আওয়াজ ধরে এগোতে চাইলো । একটু এগোতেই বুঝতে পারলো একটা খুব জোরে ধুপ করে শব্দ হলো একদম পাশের একটি জঙ্গল থেকে । দু জন এই জঙ্গল এর দিকে তাকালো । ভীষণ জোরে পাতা গুলো নড়ছে ,কিন্ত কিছু দেখতে পেলো না । বুবাই বুঝে নিলো কোনো এক জানোয়ার তাদের পিছু নিয়েছে ,নিজের আগুন জ্বালানো বন্দুক টা উঁচিয়ে ধরলো বুবাই, এক বার ট্রিগার টিপলো , কিছুক্ষন এর জন্য শব্দ টা বন্ধ থাকলো । কিন্ত যেই তারা কিছুটা এগোলো , আবার ঝুপ শব্দ , জঙ্গলে পাতা গুলো ভীষণ ভাবে নড়ছে কিন্ত কাউকে তারা দেখতে পাচ্ছে না । এই সময় তোরা বুবাই এর হাত থেকে বাঁশি টা নিয়ে খুব জোরে বাজাতে লাগলো , তাতে মনে হয় কিছুটা কাজ হলো , তারা কিছুটা রাস্তায় হাঁটলে ও সেই প্রাণীটির কোনো অস্তিত্ব অনুভব হলো না । তোরা প্রানপনে বাঁশি বাজিয়ে যাচ্ছিলো, এমন সময় তোরা যেন অনুভব করলো , কেউ তার কানের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বললো, এতো জোরে বাঁশি বাজাচ্ছো কেন তোরা ? ভয় ছিটকে বুবাই এর ঘাড়ের উপর পড়লো তোরা, বুবাই যাহোক করে নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো কি হলো ? তোরা কি হয়েছে জানালো বুবাই কে । বুবাই আর তোরা বেশ করে বুঝতে পারলো এটা কোনো পশুর কান্ড নয় ,কোনো এক অজানা অশরীরী তাদের পিছু নিয়েছে ।কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে পড়লো বুবাই, চ্যাঁচিয়ে উঠলো কে আপনি সামনে আসুন । কারোর কোনো উত্তর পাওয়া গেলো না, জঙ্গল এ সাধারণত অন্ধকার খুব দ্রুত চলে আসে , তাই যে ভাবে হোক অন্ধকার হবার আগে তাদের কে ঝর্ণার ওপারে পৌঁছতেই হবে । না হলে যে কোনো রকম বিপদ হতে পারে বেশ বুঝতে পারছিলো বুবাই । নারকেল দড়িটা বার করলো বুবাই , দড়িটার মাথায় মোটা একটা ইঁট বেঁধে খুব জোরে ছুঁড়ে দিলো বুবাই , যদি কোনো ভাবে ঝর্ণা টপকে ওদিকে গিয়ে পড়ে , ২বার এর চেষ্টাই সফল হলো সে , দড়িটা ভালো করে তোরার কোমরে বেঁধে দিলো বুবাই , তারপর আসতে আসতে দড়ি ধরে ওঠার চেষ্টা করতে যাবে , এমন সময় অদ্ভুত ভাবে দড়িটা ফিরে এলো মাঝখান থেকে কাটা অবস্থায় ।বুবাই আর তোরা বেশ বুঝতে পারছিলো তাদের কে কেউ এখানেই আটকে রাখতে চাইছে , তাই আর কিছু না ভেবে জলের শব্দ ধরে এগোতে শুরু করলো । বেশ অনেক টা এগোতে কি রকম যেন একটা ভীষণ চেনা জায়গা খুঁজে পেলো তারা , মনে হচ্ছিলো এই জায়গাটা ধরে তারা আগে ও গিয়েছে । বুবাই বললো তোরা বাঁশি টা ফের বাজা । একটু ইতস্তত করে আবার জোরে বাঁশি বাজাতে লাগলো তোরা । তখন এ যেন হঠাৎ দেখতে পেলো সামনে বাবা , মা , মাসি মেসো দের । আনন্দে লাফিয়ে উঠলো বুবাই আর তোরা । সবে দৌড় লাগাতে যাবে, পিছন থেকে একটা হেঁচকা টান অনুভব করলো , প্রথমের আসতে টানকে উপেক্ষা করে গেলো তারা , কিন্ত তারপর খুব জোরে টানতে শুরু করলো কেউ পিছন থেকে , জঙ্গলের রাস্তায় এবড়ো খেবড়ো মাটি, পাথর আর গাছে ঢক্কর খেতে খেতে পিছিয়ে গেলো তারা । বুবাই এক বার ক্ষীণ স্বরে বাবা মা কে ডাকতে গেলো , দেখলো বাবা মা দূরে দাঁড়িয়ে আছে, আগে যেখানে ছিল সেখানেই । তারা কোনো ভাবেই তাদের কে বাঁচাতে এগিয়ে আসছে না । পিছন দিকে অত জোরে যেতে যেতে মাথা ঘুরতে লাগলো বুবাই আর তোরা দু জন এর ই । মাথায় যেন কিছু এক টার সাথে জোরে আঘাত লাগলো মনে হলো । কিরকম যেন চোখ বুজিয়ে জ্ঞান হারালো দুই ভাই বোন ।

বুবাই এর জ্ঞান যখন ফিরলো চারিদিকে ভীষণ অন্ধকার , কিছুই দেখতে পাচ্ছিলো না সে । আধা অন্ধকার এ কিছুক্ষন চোখ টা ঠিক ঠাক হলে , বুঝতে পারলো সে কোনো এক গভীর জঙ্গলে আছে , হঠাৎ তোরা র কথা মনে হতে , চার দিকে তাকিয়ে একটু দূরে তোরা কে দেখতে পেলো সে । আধা অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে তোরার কাছে পৌঁছলো বুবাই । আসতে আসতে গালে টোকা দিতে দিতে তোরা কে ডাকতে লাগলো সে । কিছুক্ষন ডাকার পর জ্ঞান ফিরলো তোরার । জ্ঞান ফেরার পর রীতিমতো ভয় পেয়ে গেলো তারা । অন্ধকার আর গভীর জঙ্গল , আর পেটে খিদে সব মিলিয়ে ভীষণ কাঁদতে ইচ্ছা করছিলো দু জন এর । অন্ধকারে কিছু একটা শব্দ শুনতে পেলো বুবাই । নিজের ব্যাগ হাতড়ে হঠাৎ ই টর্চ টা পেয়ে গেলো সে । টর্চ জ্বালাতেই সামনে এক জন লোক কে স্পষ্ট দেখতে পেলো বসে থাকতে । চমকে গেলো দু জনে । দুই ভাই বোন এর কাছাকাছি এসে বসলো । আবার টর্চ টা জ্বালাতেই সামনে বসা লোক টাকে খুব ভালো করে চিনতে পারলো ।

লোক টি আর কেউ নয় ,এতো আমাদের গাইড , যে আমাদের কে এই জঙ্গল এ নিয়ে এসেছিলো । লোকটিকে দেখে এই অবস্থার মধ্যে ও বাবা মার কাছে ফিরে যাবার যেন একটা রাস্তা খুঁজে পেলো দুই ভাই বোন । হঠাৎ লোকটি বলে উঠলো উফফ টর্চ টা নেভাও । লোকটির গলা পেয়ে একটু সাহস পেলো বুবাই । বললো আপনি এখানে ? লোকটি বললো এতো কথার এখন সময় নেই, বাইরে বৃষ্টি আসবে মনে হচ্ছে । আর এটা বাঘ ভাল্লুক দের গুহা , যেকোনো সময় তেনারা এসে যেতে পারেন । তখন তোমাদের কে কোনো ভাবেই বাঁচাতে পারবো না । দু জন এ এই ফল দুটো খেয়ে নাও । এটা জঙ্গল এর একরকম চিরঞ্জীবী ফল , যা শরীর এ প্রচুর শক্তি জোগায় ।তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও, বৃষ্টি হবার আগে আমাদের কে অন্য সুরক্ষিত জায়গায় চলে যেতে হবে । খুব খিদা পেয়েছিলো বুবাই আর তোরার । তাই ফল দুটো কে একটু মুছে নিয়ে খেতে শুরু করে দিলো দু জন এ । ঘরের আর বাবা মা এর কথা মনে করে খুব মন খারাপ লাগছিলো । কিন্ত দু জনেই যথেষ্ট সাহসী , আর এতো সহজে ভেঙে পরে না । বুবাই জিজ্ঞেস করলো আমাদের কোথায় যেতে হবে ? উত্তর এলো , কাছাকাছি একটা ওয়াচ টাওয়ার আছে , সেই ইংরেজ আমলে বানানো । একটু ভেঙে গেছে , কিন্ত পশুদের হাত থেকে বাঁচার ওটাই একমাত্র উপায় ।ফল খেয়ে শেষ করার আগে হঠাৎ বুবাই এর মনে হলো , লোক টা তো কিছু খেলো না । জিজ্ঞেস করলো , আপনি খাবেন না ? উত্তর এলো , আমার আর খাবার দরকার পরে না । বুবাই বুঝতে না পেরেই বললো , আমাদের খাওয়া হয়ে গেছে । তোরা বলে উঠলো আমরা কি টর্চ লাইট টা জ্বালাবো তাতে দেখতে সুবিধা হয় ।লোকটা বলে উঠলো একদম নয় ,আমার পিছন পিছন এসো , জঙ্গল এর অন্ধকারের মধ্যেই সব দেখতে পাবে । বাইরে বেরোতেই বুঝলাম বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে । আবছায়া লোক টাকে যা দেখা যাচ্ছে, সেই মতোই এগোতে শুরু করলো দু জন এ ।বৃষ্টির জল গায়ে লাগতেই বেশ শীত করতে লাগলো । কিন্ত এসব ভাবতে গেলে এখন চলবে না , তাই পাথর এর উপর হোঁচট খেতে খেতে , বিভিন্ন গাছের মায়াজালে পা জড়াতে জড়াতে হাত ধরাধরি করে দুই ভাই বোন এ এগিয়ে চললো । হঠাৎ একটা অদ্ভুত গর্জন শুনতে পেলো , কোনো ভয়ঙ্কর পশুর ই হবে বোধহয় । ভয়এ আরো কুঁকড়ে গেলো দু জন এ । যে গুহা থেকে তারা বেরিয়ে এলো, সেই গুহাতে একটা চিতা বাঘ কে ঢুকতে দেখে আঁতকে চিল্লিয়ে উঠলো দু জন এ । সামনের লোক টা হঠাৎ বকে উঠলো তোমাদের বললাম না চুপ চাপ থাকতে । চিতা টা হঠাৎ ই বুবাই আর তোরা র দিকে ঘুরে গেলো । সামনে এগিয়ে আসতে লাগলো । সবে চোখ বুজিয়ে নিজেদের মৃত্যুকে প্রতক্ষ করতে যাবে , এমন সময় দেখলো লোক টা পিছন থেকে তাদের একেবারে সামনে চলে এলো । আর চিতা বাঘ যেটা গর্বের সাথে এগিয়ে আসছিলো বুবাই আর তোরার দিকে হঠাৎ ই লেজ গুটিয়ে পালিয়ে গেলো । বাঘ টা গুহার মধ্যে চলে গেলে , লোকটি বললো আর আপনাদের সামনে আমি যেতে পারবো না , পিছনেই যেতে হবে , কারণ চিতা টা আপনাদের দেখে ফেলেছে । আর একবার যদি ওরা নিজেদের খাবারের সন্ধান পেয়ে যাই, কখনোই ছাড়েনা । বলে লোক টি ডান দিক , বাম দিক এসব বলে আমাদের কে এগিয়ে নিয়ে যেতে লাগলো । এরকম পাথরে রাস্তায় জঙ্গল এর মধ্যে হাঁটার অভ্যেস কোনোদিন এ ছিল না ভাই বোন এর । তাই বেশ হাফিয়ে পড়লো ।কিন্ত লোক টা পিছন থেকে বলেই চললো এগিয়ে চলুন । এই সময় হঠাৎ ই সামনে একটা বড়কালো জন্ত কে দেখলাম এগিয়ে আসতে, সব ভুলে দু জন এ দৌড়োতে লাগলাম, কিন্ত অদ্ভুত ভাবে লোক টা ও আমাদের পিছন পিছন আসতে লাগলো আর পথ নির্দেশ করতে লাগলো ।এর পর লোক টা যে জায়গায় এনে তাদের কে দাঁড় করালো, সামনে সত্যি এ একটা ওয়াচ টাওয়ার দাঁড়িয়ে। লোকটি কিছু গাছ দেখিয়ে বললো , এর পাতা নিয়ে সারা গায়ে মেখে নিতে , তাতে মশা আর সাপ দুটো থেকেই সকাল অব্দি মুক্তি পাওয়া যাবে । লোকটির কথা মতো সারা গায়ে পাতা গুলো মেখে নিলো দুজন এ । দু জন এ সবে উঠতে যাবে ওয়াচ টাওয়ার ,পিছন এ ফিরে লোকটিকে হঠাৎ দেখতে পেলো না । কোথায় গেলো দেখার জন্য টর্চ তা জ্বালিয়েছে ,একটা চোখ জ্বল জ্বল করে উঠলো , সেই ভাল্লুক টা , ভয় দৌড়োতে শুরু করতে সামনেই গিয়ে কিছু মোষের গায়ের উপর গিয়ে পড়লো ।এতগুলো মোষের পাল দেখে ভাল্লুক টা বোধহয় হাওয়া হয়ে গেছে । বিশাল বড়বড় মোষ একটার সিং এ পড়লে নিশ্চিৎ মৃত্যু । কিছু ভালো করে বোঝার আগেই হঠাৎ মনে হলো উপর থেকে কিছু একটা ঝাঁপিয়ে পড়লো মোষগুলোর উপরে , এক ঝলক দেখেই বুঝে গেলো বুবাই আর তোরা যে সেই চিতা টা , হঠাৎ এ পুরো মোষের দঙ্গল অশান্ত হয়ে উঠলো, যাহোক করে একটা গাছের আড়ালে দু জন এ যেতে পারলো , কিন্ত এতো কিছুর পরে ও সামনে একটা মোষ বিশাল বড় সিং নিয়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে, এদিক ওদিক না ভেবে বাঁচার শেষ উপায়হিসাবে টর্চ লাইট টা জ্বালিয়ে দিলো মোষ টির চোখের উপর , মোষ টা গুলিয়ে ফেললো নিজের পথ , কিন্ত খুব অদ্ভুত ভাবে হারিয়ে গেলো মোষ টা জঙ্গল এর জল এর মধ্যে , অনেকটা চোরাবালিতে হারিয়ে যাবার মতো । এমন সময় চিতা টাকে দেখতে পেলাম , সেই অদ্ভুত ভাবে লেজ গুটিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে । তোরা চুপি চুপি বলে উঠলো , টর্চ লাইট টা জ্বালা বুবাই । টর্চ লাইট জ্বালতেই , আওয়াজ এলো আঃ বন্ধ করো । দু জন এই দেখতে পেলো লোকটিকে । বললো অরে আপনি কোথায় চলে গেছিলেন ? আরে এই ওয়াচ টাওয়ারএ যাতে তোমাদের কোনো ক্ষতি না হয় সেটা নিশ্চিত করতে গেছিলাম । এস আমার সাথে । ওয়াচ টাওয়ার এর লোহার সিঁড়ির কাছে নিয়ে এসে উঠতে বললো লোকটি । তোরা কে আগে উঠতে বলে , তার পিছন পিছন উঠতে থাকলো বুবাই । কি ভয়ানকএই লোহার সিঁড়ি ভীষণ ভাবে নড়ছিলো সেটি । বেশ অনেক টা উঠে পড়ার পর যখন প্রায় পৌঁছে গেছে বুবাই এর হঠাৎ মনে হলো লোকটি এলো না তো । বুবাই বলে উঠলো আপনি ও উঠে আসুন , লোকটি বললো আমার আর উপরে গিয়েকোনো লাভ নেই বুবাই তোরা , তোমরা উপরে গিয়ে পরে থাকা কিছু শুকনো কাঠ জোগাড় করে আগুন জ্বালিয়ে নিও ।

আগুন কোথা থেকে পাবে প্রশ্ন টা করার আগেই উত্তর এলো দুটো পাথর ঢুকলেই আগুন পাবে । হঠাৎ স্পষ্ট দেখতে পেলো বুবাই আর তোরা চিতা টা সামনে থেকে ঝাঁপিয়ে পড়লো লোকটির উপর , চেঁচিয়ে উঠলো দু জন এ, কিন্ত অদ্ভুত ভাবে লোকটার কিছু হলো না । বরং চিতা টা লোকটার শরীর এর মধ্যে দিয়ে গলে গিয়ে ওয়াচ টাওয়ার এর দেওয়ালে খুব জোরে ধাক্কা খেলো , আর ভয়এ লেজ গুটিয়ে পালিয়ে গেলো । হঠাৎ এ দুই ভাই বোন এর মনে হতে লাগলো এই লোকটি মানুষ হতে পারে না । নিচ থেকে উত্তর এলো ঠিক এ ভাবছো তোমরা, আমি আর বেঁচে নেই , আমার কর্তব্য ছিল তোমাদের কে বাঁচানোর , সেই কাজ টা আমি করে দিয়ে গেলাম, তোমরা এখন সুরক্ষিত । আমি চললাম , তোমাদের বাবা মা কে আমার প্রণাম জানিয়ো ।এই বলে হঠাৎ ই অদৃশ্য হয়ে গেলো লোকটা । দুই ভাইবোন এর চোখে জল চলে এলো , খুব জোরে মা বাবা বলে কাঁদতে ইচ্ছা করছিলো । সব দুঃখ সামলে শুকনো কাঠ জোগাড় করাই ব্যস্ত হয়ে পড়লো তারা, কারণ ভীষণ শীত লাগছিলো তাদের , শুকনো কাঠ জোগাড় করে আগুন জ্বালাতে গিয়ে পড়লো এক বিপদে । অনভ্যস্ত হাতে পাথর ঢুকে আগুন জ্বালাতে কিছুতেই পারলো না তারা , অনেকবার চেষ্টা করার পর যখন তারা হাল ছেড়ে দিচ্ছিলো , তখন তোরা বললো আগুন জ্বালানো বন্দুক টা বার কর । আগুন জ্বালানো বন্দুক টাতে অনেক্ষন ধরে ট্রিগার টিপে রাখলে আগুন টা জ্বলতে থাকে । সেটা দিয়ে যাহোক করে আগুন জ্বালানো গেলো শুকনো পাতা আর কাঠে । বৃষ্টি টা তখন থেমে গেছে , দু জন এ ভাবতে লাগলো জঙ্গল এ পশু, পাহাড় ,ঝর্ণা , আর অশরীরী সবার এ দেখা মিললো । এবার দু জন এই ভীষণ ভাবে বাবা মা এর দেখা পাবার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়লো ।কি করছে বাবা মা , এতক্ষন ধরে তারা দু জন হারিয়ে গেছে , কোথায় তারা, তখন তাদের কে দেখতে পাওয়া সত্বেও কেন বাবা মা তাদের পিছন নিলো না । কোনো প্রশ্নের এ উত্তর নেই । এমনকি কাল সকাল অব্দি কাটালে ও তারা বাঁচবে কিনা , সেটা ও জানা নেই । খুব জোরে মা , বাবা বলে চিল্লে উঠলো বুবাই আর তোরা । বেশ এটুকুই এক মাত্র উপায় মন টাকে কিছুটা শান্ত রাখার । হঠাৎ এ দু জন এ কিছু শব্দ শুনতে পেলো , কোনো গাড়ি আসার শব্দ । কেউ আসছে নাকি জঙ্গল এ ? আগুন টা যাতে নিভে না যাই , আরো কিছু শুকনো পাতা ছড়িয়ে দিলো বুবাই , হঠাৎ এ বাবার গলা শুনতে পেলো সে , বুবাই তোরা । লাফিয়ে উঠলো দু জন এ । দেখতে পেলো তারা ৩ টি গাড়ি ওয়াচ টাওয়ার এর সামনে এসে দাঁড়ালো ।সেখান থেকে আগুন হাতে কিছু সৈন্য নেমে এলো , আর তারপর নামলো বুবাই আর তোরার বাবা মা । চেঁচিয়ে নিজেদের অবস্থান জানালো বুবাই আর তোরা । সৈন্য রা আমাদের দু জন কে ওয়াচ টাওয়ার থেকে নামালো । দু জন এই গিয়ে মা, বাবাকে জড়িয়ে ধরলো । বাবা , মা কে জড়িয়ে ধরা যে কত বড় শান্তি খুব ভালো করে অনুভূতি করতে পারলো তারা । গাড়িতে আসতে আসতে বাবা মা র কোলে শুয়ে দু জন এ কখন যে ঘুমিয়ে পড়লো টের ই পেলো না ।

সকাল এ ঘুম থেকে উঠে বাবা মা এর কাছে বাকি গল্পটা শোনার পর পুরো ব্যাপার টা পরিষ্কার হলো বুবাই আর তোরার কাছে , গল্প টা সাজালে দাঁড়ায়, বুবাই আর তোরা হারিয়ে যাবার পর হঠাৎ ই এক বুনো হায়না আক্রমণ করে বাবাদের কে । গাইড লোক টি সামনে চলে আসে সবাই কে বাঁচাতে , এতে লোকটি সেই হায়নার হাতে মারা পরে, এমন কি তার মৃতদেহ টিকে ও বাবারা নিয়ে আসতে পারিনি জঙ্গল থেকে । আর জঙ্গল এ কখনোই বাবা মা দের সাথে আমাদের দেখা হয়নি ।ওখান কার স্থানীয় লোক গুলো জানালো ওটা জঙ্গল এর মায়াজাল ,অনেকটা মরুভূমির মরীচিকার মতো । হঠাৎ এ নিজের কাছের লোক গুলো কে দেখতে পাওয়া যাই, এটাকেই স্থানীয়রা জঙ্গল এর অশরীরী বলে । মানে মুহূর্তে আমাদের গাইড দাদা যদি আমাদের কে ওই ভাবে নিয়েনা যেত , তাহলে ওই অশরীরীর মায়াজালে ওখানেই শেষ হয়ে যেতাম আমরা । বাবারা এর পর সেনাদের সাথে দেখা করে সব কিছু বলে । ওদের সাহায্যে রাতেই আমাদের কে উদ্ধার করতে যাই , সেনারা বলে দিয়েছিলো ,যদি জঙ্গল এর সামনের দিকে থাকে , তাহলে রাতেই হবে আর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা আছে , আর যদি অনেক গভীর জঙ্গল এ ঢুকে যাই তাহলে সকাল এর আগে কিছু করা যাবে না , আর বাঁচার সম্ভাবনা খুব ই কম । ওই গাইড অশরীরী দাদার দয়ায় আমরা জঙ্গল এর খুব সামনেই ছিলাম , তাই উদ্ধার পায় ।

বাড়ি ফেরার রাস্তায় বুবাই আর তোরা শুধু একটাই প্রতিজ্ঞা করলো, জঙ্গল এ বেড়াতে হয়তো পরে ও তারা আসবে , কিন্ত এক ই সাথে জঙ্গল , পাহাড় ,পশু আর অশরীরী কে দেখার দুর্ভাগ্য আর যেন কোনো দিন না হয় ।


Rate this content
Log in

More bengali story from Sutanu Sinha

Similar bengali story from Action