Sutanu Sinha

Others


1  

Sutanu Sinha

Others


নগদ চাই

নগদ চাই

5 mins 540 5 mins 540

'নগদ চাই , আছে তো পকেটে ?', পান ব্যাপারীটা বলে উঠলো । শুনতে খুব বিচ্ছিরি লাগলেও ব্যাপারটা মেনে নেয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই, কারণ নগদ টাকার এরকম হাহাকার নিজের ৭০ বছরের জীবনে কখনো দেখেনি রথীন বাবু । পান ব্যাপারীকে নিজের সম্বলে থাকা শেষ ১০০ টাকার নোট নগদ দিয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে চললো ব্যাঙ্কের দিকে । যেমন করেই হোক আজ ব্যাঙ্কে লাইন দিয়ে টাকা তুলতেই হবে । প্রতি মাসেই নিজের চেক বুক দিয়ে মাসের ১০০০০ টাকার সামান্য পেনশনটুকু তুলে নিয়ে আসেন তিনি । এই মাসে রথীন বাবুর একমাত্র নাতির জন্মদিন থাকায় একটু বেশি খরচ হয়ে গেছে । সামলাতে না পেরে দোকানে কিছু ধারও করে বসেছে ।


নিজের পকেটে প্রায় ৬০০০ মতো নগদ টাকা থাকা সত্ত্বেও কাউকে দিতে পারছেন না তিনি , কারণ পুরো টাকাটাই ৫০০ আর ১০০০ টাকার নোট । সরকার নাকি বলেছে সব ৫০০ আর ১০০০ টাকার নোটই জালি , তাই ব্যাঙ্কে ফিরিয়ে দিতে হবে । তাতে নাকি দেশের সব কালো টাকা ফিরে আসবে । অল্প শিক্ষিত রথীন বাবু দীর্ঘদিন কালো টাকার আসল মানেটাই বুঝতে পারতো না । ভাবতো কালো টাকা মানে কালো রং এর টাকা । তারপর বয়স বাড়তে বুঝলো কালো টাকা মানে অনৈতিক ভাবে সরকারকে লুকিয়ে রোজগার করা টাকা ।


যাই হোক কালো টাকা ফিরবে কি ফিরবে না , সরকারের কি সুবিধা হবে কি হবে না এসব তিনি জানেন না , তবে রথীন বাবু যে বেশ অসুবিধাই পড়েছেন সেটা তিনি বেশ বুঝতে পারছেন । ব্যাঙ্ক এ আসার পর আরো অবাক হবার পালা শুরু হলো রথীন বাবুর । ব্যাঙ্ক এখনো খোলেনি , লাইন গিয়ে ওপারে পরেশের চায়ের দোকান পেরিয়ে গেছে । অগত্যা কোনো উপায় না দেখে লাইনের শেষে গিয়ে দাঁড়ালেন রথীন বাবু ।


নিজের এই কষ্টের জন্য নিজেকেই মনে মনে দোষ দিচ্ছিলেন রথীনবাবু । সন্তু বলে পাড়ায় একটা সবজান্তা ধরণের ছেলে আছে । সে কত বার এসে বলেছে রথীন জেঠু আপনি নেট ব্যাঙ্কিং , মোবাইল ব্যাঙ্কিং , বা নিদেন পক্ষে এটিএম

টা ব্যবহার করুন । রথীন বাবুর বরাবরের উত্তর তিন কাল গিয়ে এক কাল এসেছি , এসব নতুন জিনিস পত্ত আমার জেনে কোনো লাভ নেই , তার থেকে আমার ওই চেক বুক দিয়ে টাকা তোলাই বেঁচে থাক । ওসব তোমাদের নতুন প্রজন্মের জন্য , আমাদের জন্য নয় ।হাল ছেড়ে দিয়ে সন্তু আবার অন্য কাউকে জ্ঞান দিতে ব্যস্ত হয়ে যেত । আজ মনে মনে নিজেকে খুব গালাগাল দিতে ইচ্ছা করছে , সন্তুর কথা শুনে কোনো একটা কিছু করে রাখলে তাঁকে হয়তো এতটা অসুবিধাই পড়তে হতো না ।


পরেশের কাছ থেকে একটা চা নিয়ে খেতে খেতেই ব্যাঙ্কের গেট খোলা হতে শুরু হল । রীতিমতো পুলিশের ব্যারিকেড দিয়ে ঘেরা । সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে ভিতরে ঢুকতে চাইছে । অনেকটা যেন বন্যা ত্রানে না খেতে পাওয়া মানুষ গুলোর মতো । শুধু ব্যাপারটা না খেতে পাওয়া নয় ,না 'নগদ পাওয়া ' হয়ে গেছে । এই ভাবে বেশি দিন চললে কি যে অবস্থা হবে ভাবতেই পারছেন না রথীন বাবু ।


এমন সময় দেখলেন ব্যাঙ্কের লোকটা বেরিয়ে এসে কিছু বলছেন । কি বলছেন শোনার জন্য পরেশের টাকা মিটিয়ে দিয়ে একটু এগিয়ে গেলেন রথীন বাবু । এগিয়ে গিয়ে শুনলেন বয়স্কদের আগে ভিতরে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে । সুযোগ পেয়ে এক মুহূর্তও দেরি না করে ভিতরে চলে গেলেন রথীন বাবু । ভিতরে গিয়ে আর এক বিপদ , ৫০০০ টাকার বেশি নগদ দেবে না , তাতে ও আবার অন্ততঃ ২ টো ২০০০ টাকার নোট নিতেই হবে । অনেক অনুনয় বিনয়েও যখন কোনো কাজ হলো না , ব্যাঙ্কের শর্ত মতো ৫০০০ টাকা নিয়ে বেরিয়ে এলেন রথীন বাবু ।


বাজারে একটি দোকানে প্রায় ১২০০ টাকার মতো ধার আছে , ২০০০ টাকার নোটটা ওখানেই খুচরো করিয়ে নেবেন মনে মনে এরকম একটা ভাবনা নিয়ে সবে চলতে শুরু করবেন , দেখলেন ব্যাঙ্ক থেকে ভীষণ মন খারাপ করে বেরিয়ে আসছে সন্তু । সন্তু সবজান্তা ধরণের হলেও সবসময় একটা হাসিমুখ নিয়ে থাকে, যেটা রথীন বাবুর খুবই ভালো লাগে । সেই সন্তুর এরকম বিষণ্ণ মুখ দেখে খারাপই লাগলো রথীন বাবুর । সন্তুর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কি হয়েছে তোর ? সন্তু বলে উঠলো , জেঠু আপনি টাকা তুলতে এসেছিলেন ? রথীন বাবু বললো , টাকা তুলতে এসেছিলাম । সন্তু বলে চললো , একটু উপকার করবেন জেঠু , খুব বিপদে পড়েছি ।আমার বাবার পায়ে ভীষণ লেগেছে, ডাক্তারের কাছেই নিয়ে যাবো, কিন্তু ডাক্তারকেও টাকা নগদই দিতে হবে , সেই সাথে যে গাড়িতে নিয়ে যাবো তাকেও টাকা নগদ দিতে হবে । কখনো নগদ টাকা চেক লিখে তুলিনি । তাই কখনোই চেক বুকের দরখাস্তও করিনি । এখন করতে গেলে ব্যাঙ্ক বলছে সময় লাগবে, আর কোনো এটিএম এ নগদ টাকা নেই । আপনি আমাকে কিছু টাকা ধার দেবেন জেঠু , আমি বিকালেই আপনার একাউন্ট এ টাকা টা ফেলে দেব , আপনি কাল এসে আর একটিবার যদি তুলে নেন । কথা গুলো শুনে রাগ করার কথা ছিল রথীন বাবুর , কিন্তু অদ্ভুত ভাবে রাগ হলো না তার , নিশ্চল চোখে সন্তুর দিকে তাকিয়ে নিজের অতি কষ্টে তোলা ৫০০০ টাকা থেকে ৪০০০ টাকা এগিয়ে দিলেন রথীন বাবু ।


সন্তু ভীষণ খুশি হয়ে টাকাটা নিয়ে রথীনবাবুর চেক বুকটা চাইলো , তারপর একটা ছোট কাগজে রথীনবাবুর একাউন্ট নম্বর আর কি একটা নম্বর লিখে নিয়ে বললো "আজ বিকালেই পাঠিয়েদেব জেঠু । আপনি আমার যা উপকার করলেন কখনোই ভুলবো না । আর একটি কথা জেঠু , আপনাকে আমিই সবসময় বলতাম আগামীকে গ্রহণ করতে আর পুরোনোকে ছাড়তে ,কিন্তু আজ বুঝতে পারছি পুরোনোকে পুরোপুরি ছেড়ে দিলে ভীষণ বিপদ । আপনার চেক বুক আছে বলে আপনি টাকা তুলতে পারলেন , আর আমার ব্যাঙ্কে প্রচুর টাকা সত্ত্বেও একটা পয়সাও তুলতে পারছি না" । অল্প একটু হেঁসে রথীন বাবু বললেন যাও বাবার চিকিৎসা ভালো করে করাও । এরপর বাড়ির দিকে ফিরতে শুরু করলেন রথীন বাবু , আজ আর পাড়ার দোকানে যাবেন না, ধারের টাকা যে আজও মেটাতে পারবে না সে । কিন্তু কেন জানিনা রথীন বাবু মনে মনে খুব শান্তি পেলেন , প্রথমত এরকম একটা অদ্ভুত সময়এ কোনো মানুষকে তিনি সাহায্য করতে পারলেন , আর দ্বিতীয়ত নিজের পুরোনো কে আঁকড়ে থাকার অভ্যাস, যা তাকে সবার থেকে আলাদা করে দিয়েছে ,কেউ যে তার সেই পুরোনোকে ধন্যবাদ দিয়ে গেলো এটাই যেন অনেক বড় পাওনা ।


পরের দিন ব্যাঙ্কের লাইনে বেশিক্ষন দাঁড়াতে হয়নি রথীন বাবুকে , তাঁর এক পরিচিত তাঁকে আগেই টাকা বার করে দিয়েছিলো ,পুরো ১০০০০। সেদিন হাতে পেয়েছিলো রথীন বাবু, আর তাতে একটা ও ২০০০ এর নোট ছিল না । মনে মনে রথীন বাবু সন্তু কেই ধন্যবাদ করলেন , হয়তো তাকে সাহায্য করার জন্যই , ভগবান কিছুক্ষনের জন্য হলেও তার দিকের মুখ তুলে তাকালো ।


Rate this content
Log in