গুপ্তঘাতকের হত্যা

গুপ্তঘাতকের হত্যা

8 mins 2.5K 8 mins 2.5K

দিনটা রবিবার! সময় - সকাল ৬.১৫ l


নীল আকাশ, পেঁজা তুলোর মতন মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে,ভোরের হালকা রোদ্দুর - এই সব পরিবেশ মনটাকে আনন্দিত করে দেয l


কিন্তু রবিনের মন ভারাক্রান্ত! গত কয়েক ঘন্টার ঘটনাওকে চিন্তিত করে রেখেছে l


প্রায় ভোর চারটে থেকে সে একটা ছোট বাড়ির অপ্রশস্ত,নিচু ও ন্যাড়া ছাতে উপর বসে l সে নিজেকে আড়াল করে রাখছে! তবে তৈরি পাশে, মাটির তে, টেলিস্কোপ লাগানো HK416 রাইফেল রাখা , হাতে Tactical শুটিং গ্লাভস পরা এবং চোখে উপর ESS crossbow supressor চশমা লাগানো l হালকা রঙের শার্ট ও blue জিন্স পরে ওকে সুপুরুষ দেখাচ্ছে l


সে কিন্তু উপযুক্ত সময়ের জন্য অপেক্ষা করছl


যে কারণের রবিন ভোর রাত থেকে এখানে উপস্থিত, সেটা তার জীবিকা! এতে ও বিরক্ত হয় ন,কিংবা ওর হতাশ হবার কোন কারণ নেই l


একটা পেশাদার হত্যাকারীর বা গুপ্তঘাতকের এটা মামুলি কাজ l


যদিও রবিন যখন assignment এ থাকে তখন মনে চিন্তা রাখে না, তবুও আজকে ওর মনটা উদ্দেশহীন ভাবে ঘুরছে l

-----------------------------------------


কাল রাতে যখন শিল্পপতি রুদ্রণ গুপ্ত র ফোন পেলো তখন ওর শরীর ভালো ছিল না l মনের মধ্যে যেন একটা অদ্ভুত চাপের সৃষ্টি হচ্ছিলো l


প্রায় দশ বছর নিজের প্রোফেশনে এ থাকবার পর ওর কোন কারণ ছিল না যে এই ব্যাপার নিয়ে পূর্ণবিবেচনা করl তবে সেটা করছিলো l হয়তো মানুষের প্রাণ নিয়ে খেলাএই ঘাতক কাজ তার বিবেকে লাগছিলো l আর কতোদিন এই কাজ করবে ? আর এই জঘন্য পেশায় থাকবে নাl


সেইসময়ে কিন্তু,রুদ্রণ গুপ্ত আরেকটা কাজ দিয়েছিলোl


" মনে আছে, রবিন, আমার নির্দেশে তুমি শিল্পপতি রাকেশ সিংহ কে তিন মাস আগে হত্যা করেছিলে এবং পুলিশ তার কিনারা এখনো করতে পারেনি l আমি বলি এটা তোমার পুরো কৃতিত্ব l তুমি সর্বশ্রেষ্ট ! এবার তোমার কাজ হবে রাকেশের দাদা,সংগ্রাম সিংহ কে সরানো- এই দুনিয়া থেকে - বুঝতেই পারছো ! কখন এটা করতে পারবে?তোমার পারিশ্রমিক দ্বিগুন করে দিচ্ছি l "


এইরকম খোলাখুলি মৃত্যুর আদেশ শুনে রবিনের শরীর শিরশির করেছিল l আগে কখনো এরকম হয়নি ! তবে এটাই শেষ কাজ ! এরপর আর কেউ ওকে দিয়ে খুন করাতে পারবে নাl


একটু গলা ঝেড়ে রবিন উত্তর দিয়েছিলোঠিক আছে, পরশু হবে, তবে সব details আমাকে দেবেন...যেভাবে রাকেশ সিংহ এর বিবরণ দিয়েছিলে l "


রুদ্রণ গুপ্ত উত্তর, "কোনো তফাৎ নেই l সংগ্রাম সিংহ ওই রাকেশ সিংহের বাড়িতে থাক,দুই ভায়ের স্বভাব, অভ্যাস, চালচলন, প্রায় সমান ! দুজনেই খুব - punctual একমাত্র তফাৎ হচ্ছে সংগ্রাম প্রাতঃভ্রমণে প্রতিদিন যায, রাকেশ সেটা করতো না l বাকি খুঁটিনাটি কাল দেখা হলে বলবো! অ্যাডভান্স পেমেন্ট ও দিয়ে দেবl"

-----------------------------------------


আজ ভোরে এইসব ভাবতে ভাবতে রবিন বেশ অন্যমস্ক আছেl একাগ্রতা হারালে, ভীষণ বিপদ,ও এটা বোঝে l


নিজেকে সামলে নিয়ে ও ছাদের পাশ থেকে নিচের দিকে উঁকি মারলোl উপরে বসে সামনে একটি অট্টালিকা দেখতে পাচ্ছে ; সুন্দর বাগান, প্রশস্ত লন ও ফুল গাছের সারি l এছাড়া পুরো ভবন ছোট সুদৃশ্য পাঁচিল দিয়ে ঘেরা সদর দরজা দেখা যাচ্ছে, যেখান থেকে একটি পাথুরে পথ বেরিয়ে এসে ফটক এ শেষ হয়েছে! কেউ যদি বাড়ি থেকে বেরোতে চায় তাহলে এই পথ দিয়ে আসতে সেটা ছাদ থেকে পরিষ্কার দেখা যাবে l


তখন রবিন তৈরি থাকবে l


সে নিজের কব্জির ঘড়ি দেখলোএকটু সময় আছেl এটা জানে, সংগ্রাম সিংহ সকাল ৭.00 টার সময় মর্নিং ভ্রমণে বেরোব,সেটা তে ভুলচুক হয়ে নাl আর ঠিক ওই সময় রবিন নিজের কাজ করবে! ওর টেলিস্কোপিক রাইফেল কখনো ধোঁকা দেয়নি এছাড়া ওর নিজের নিশানার উপর অটুট বিশ্বাস আছে lএখন সময়ে কাটাতে হবেl ধৈয হারালে চলবে না l


কিন্তু আবার রবিনের মন কাল রাতের ঘটনার দিকে চলে গেলো l

-----------------------------------------


রুদ্রণ গুপ্তর সাথে টেলিফোনে আলোচনা হবার পর রবিনের বহুদিনের বান্ধবী ও প্রেমিকা, অন্য ঘর থেকে এসে গিয়েছিল! দুজনে একসাথে থাক;যদিও ওদের বিবাহ হয়নি, শ্রীলা কিন্তু ওর জীবনসঙ্গিনী l


শ্রীলার চোখের জল, " রবিন, আবার তুমি এই ভয়ানক কাজ নিয়েছো ! কতবার তোমাকে মানা করেছি ...আর যদি করো তাহলে তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক শেষ ! আমি এখান থেকে চলে যাবো... !" চোখের জল সবসময় রবিন কে অপ্রস্তুত করে দেয় l ওর কাজ অপরাধমুলক, বেআইনি ও প্রচন্ড বিপজ্জনক; যে কোনো মুহূর্তে ও পুলিশের হাতে পড়তে পারে অথবা প্রাণহানি হতে পার, কিন্তু ওটা জীবিকা l ওটাকে প্রত্যাখ্যান করা যায় না এই অবস্থায় কি করে ওর বিমর্ষ প্রেমিকাকে সামলাব?


শেষে তাকে সে জড়িয়ে ধরলো, "তোমার চিন্তা বুঝতে পারি, এবারের মতো আমাকে কাজটা নিতে দাও...এটাই শেষ কাজ !"


" কিন্তু , তুমি সব ছেড়ে দেবার পরেও, তোমার এতগুলো পাপ তো মিটে যাবে না ... তোমার হত্যা গুলো চলে যাবে না ... আমার মন বারংবার খারাপ হবে ... আমি কি করে নিজেকে সামলাবো... মনে একটু শান্তি কি করে চাইবো ?"


রবিন, শ্রীলার ঠোঁটে গভীর চুম্বন দিয়ে বলেছিল, "তুমি তো শুরু থেকে আমার সব খবর জানতে, তাহলে আমাকে নিজের মন কেন দিয়েছিলে? কেন এমন ভাবে এতদিন ভালোবেসে ছিলে? আমি তো নষ্ট মানুষ ...নয় কি? "


"এটাই তো প্রেম ...কোনো অগ্রপশ্চাৎ বোঝে না !" শ্রীলা বলেছিলো!


তারপর বিছানায় বসে, রবিন এর মাথা নিজের কোলে রেখে, ধীরে ধীরে ওর চুলে আঙ্গুল চালিয়ে, শ্রীলাও চুমু খেয়েছিল l হালকা ভাবে l


"ভালোবাসার সত্ত্বেও তোমার কাজের সমর্থন আমি কোনো দিন করি নি এবং করবোও না! কিন্তু তুমি অতি ভালো লোক...তোমার উপকারী স্বভাব ...তোমার মেয়েদের প্রতি সম্মান ... তোমার শান্ত ও বুদ্ধিমান প্রকৃতিআমাকে সবসময়ে মুগ্ধ করেছে! আমি বুঝতে পারি তুমি অতি দরিদ্র ঘর থেকে ছিল, নিরুপায়ে হয়ে ঘটনাচক্রে, এই কাজ শুরু করতে বাধ্য হয়েছিল, কিন্তু মানুষ তো তুমি খারাপ হতে পারো না l "


"তা হলে?" রবিনের স্বর খুব ধীরে, " আমি কি করবো? নিজেকে আইনের হাতে সমর্পন করবো? তাহলে আমার ফাঁসি হবে কিংবা life imprisonment হবে !"


শ্রীলা আর কিছু বলতে পারছিলো না l


অনেক্ষণ পর, চোখের জল মুছে বলেছিলো, "তোমার ফাঁসি হলে আমি এই জীবন রাখবো না ! জেলে গেলে আমি তোমার কথা ভেবে হয়তো কোনোমতে বেঁচে থাকবো ! জানি না,আমার মন বড় অশান্ত ! তোমাকে সবসমই পেতে চাই কিন্তু এটাও চাই যে তুমি সৎপথে চলো! এতো দিন সেটা সম্ভব হয়নি কিন্তু এখন ভীষণ ভাবে চাইছি! কি ভাবে হবে ? ভগবানের কি ইচ্ছা? "


কিছূক্ষণ দুজনে চুপ থাকার পর শ্রীলা বলেছিলো, " যাইহোক, তুমি রুদ্রণ গুপ্ত কে নিজের কথা দিয়েছো আমি জানি তুমি কথার খেলাপ কখনো করো না l ঠিক আছে- কাল ভোরে নিজের কাজ করতে যাও l আমি তোমাকে ছেড়ে , ওখানেই থাকবো l তুমি যে বিল্ডিং এর ছাদে থাকবে তার পেছন দিকের রাস্তায় আমি গাড়ি তে থাকবো, তোমার কাজ মিটে গেলে, আমরা শহরের বাইরে গিয়ে ফয়সালা করবো কি করা যেতে পারে l "


-----------------------------------------


আজ রবিবারের সকালে, রবিন বুঝতে পারছে zero hour প্রায় এসে গেছে ! পাঁচ মিনিটের মধ্যে সংগ্রাম সিংহ বেরিয়ে আসবে ওই ফটক থেকে! তারপর, রবিন ওর কপালের মাঝে একটি উচ্চ চালিত গুলি ঢুকিয়ে দিয়ে অবিলম্বে ছাদ থেকে নেবে শ্রীলার গাড়িতে l  


ও দেখে নিয়েছে শ্রীলা পেছনদিকের রাস্তায় পার্ক করেছে l ওকে পরিষ্কার দেখতে পারছে - একটি কালো গগলস পরে স্টিয়ারিং এর পেছনে বসে আছে, চুল শক্ত করে পেছনে দিকে টেনে বাঁধা, কোনো মেকআপ নেই l



এই দূর থেকে , চাপা tension এর মাঝেও, ওর সুন্দৰ মুখখানা রবিন কে কিন্তু অন্যমনস্ক করছে!


একটু মাথা ঝাঁকিয়ে ও নিজেকে সামলালোl


কিন্তু একটা ব্যাপারে ওর চিন্তা , মনে হচ্ছে, যে ভাবে ছাদে position নিয়েছে তাতে সামনের দিকে সংগ্রাম সিংহ কে ফটকের কাছে টার্গেট তো করবেই ...তবে পেছনদিকে রাস্তায় রাইফেল এর উল্টো গতিপথের শ্রীলা ও থাকবে এটা কি বিপজ্জনক হচ্ছে ? তবে সমস্যা তো কিছু নেই ? ও তো আর উল্টোদিকে গুলি চালাবে না l


এই নিয়ে আর ভেবে লাভ নেইl


দু মিনিট বাকি ! সংগ্রাম সিংহ খুবই punctual ! রবিন ও পুরোপুরি তৈরি! ও হাঁটু গেড়ে বসে আছ, রাইফেল কাঁধে নিয়েচোখ টেলিস্কোপ এর উপর, ডান হাতের আঙ্গুল ট্রিগার এ ঠেকানো... ব্যাস, শুধু সংগ্রাম এর বেরোবার অপেক্ষা!


ঠিক সেই সময়ে অকল্পনীয় ব্যাপারটা ঘটলো!একটা হালকা অথচ অদ্ভুত আওয়াজ পেছন দিকে শুনতে পেলো! পেশাদার হত্যাকারী হিসেবে ওর মন প্রচন্ড ভাবে সচেতন ... ইন্দ্রিয় জানাচ্ছে ...বিপদ ...! ও ধীরে মাথাটা একটু ঘোরা, ডান চোখ টেলিস্কোপ থেকে না সরিয়ে বাঁ চোখ খুললো ... এবং সেই দৃশ্য দেখে তার সাহসী হৃদয়েও কেঁপে গেলো ..!


কি দেখছে ?


ভৌতিক ও বিচিত্র ব্যাপার!


শিল্পপতি রাকেশ সিংহ, যাকে সে তিন মাস আগে হত্যা করেছিলে, পিছনে দাঁড়িয়ে আছে! কপালের মাঝে ফুলের মতো রক্তের ছাপ- যেখান দিয়ে রবিন গুলি চালিয়ে ওর প্রাণ নিয়ে..., কিন্তু এটা কি করে সম্ভব?


সেই মুহূর্তে রবিনের সমস্ত শরীর ও মন কেঁপে গেলো... স্থান, কাল, ভুলে তড়িৎগতিতে রাইফেল ঘোরালো পেছন দিকে এবং রাকেশ কে লক্ষ্য করে গুলি চালালো ! অটোমেটিক weapon , ..আরেকটা ...তারপর আরেকটা ... গুলি চালায় ...!


অনেকগুলো গুলি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে - একেই বলে spraying of bullets !


সেই সময়ে রবিন এও বুঝতে পারল, ওর জ্ঞান হারাচ্ছে ...তারপর যেন শূন্য দিয়ে ওর শরীর ভেসে যাচ্ছে ... কানে এলো একটি চিৎকার ... একটি মেয়ের আওয়াজ ... এটা কি শ্রীলা?


তারপর অন্ধকার ...শুধু কালো পর্দা ... আওয়াজ সব বন্ধ হয়ে গেলো!


-----------------------------------------


কয়েক মিনিট পরে নিচে রাস্তা র উপর প্রচন্ড হৈ হৈ ! লোকে ছুটে আসছে ! একটা পুরুষের দেহ সামনের বিল্ডিং এর ছাত থেকে মাটিতে পড়েছে, পাশে একটি আধুনিক রাইফেল পড়ে আছে ... চারিদিকে রক্ত ! সে মৃত!


পেছনের রাস্তার উপর গাড়ির ভেতরে একটি মেয়ে স্টিয়ারিং এর উপর মাথা রেখে মরে গেছে ... তার ডান দিকের কানের উপর একটি গোল ছোট্ট ক্ষত...প্রচুর রক্ত বেরোচ্ছে ... এটা মনে হচ্ছে বুলেট এর ক্ষত! আর সেই বুলেট ওই রাইফেল থেকে বেরিয়েছে, এসব পুলিশ অবশ্য পরে জানতে পারে l


সংগ্রাম সিংহ এই ব্যাপারে খুব সাহায্য করছে ! পুরো ঘটনা ওর অট্টালিকা সামনেই হয়েছে l


-----------------------------------------



সেদিন রাত্রির টিভি তে Breaking news :বিখ্যাত শিল্পপতি, রুদ্রণ গুপ্ত মারা গেছেন নিজের বাড়িত, সন্ধ্যা বেলায়! চোখে মুখে প্রচন্ড আতঙ্কের চিহ্ন ! শরীরে কোনো আঘাত কিন্তু পাওয়া যায় নি ! তাহলে মৃত্যুর কারণ কিতাঁরই প্রতিদ্বন্দ্বী সংগ্রাম সিংহের অট্টালিকার সামনে অচেনা নারী ও পুরুষের মৃত্যু ; এই দুটো ঘটনার সাথে কোনো যোগাযোগ আছে কি এই প্রশ্ন এই কারণে - সংগ্রাম সিংহ ও রুদ্রণ গুপ্তর ভয়ানক ও প্রাণঘাতী রেষারেষি কারোর অজানা নয় l এও সবাই জানে, রাকেশ সিংহের মৃত্যুর এখনো মীমাংসা হয়নিl


মনে হয়ে রাইফেল ধারী মৃতকে identify করলে কিছু clue পাওয়া যাবে, নিষ্প্রাণ মেয়েটাকে ও সনাক্ত করা দরকার l ওর সাথে কি মৃতকের কোনো সম্পর্ক ছিল


পুলিশ তদন্ত চালাচ্ছেন l


জনগণ চান, এই রহস্যের উদ্ধার l






-------------------------




Rate this content
Log in

More bengali story from Amitav Ganguly

Similar bengali story from Action