২১২তে লাশ
২১২তে লাশ
সাদার স্ট্রিটের হোটেল
অমিতাভ চৌধুরী রিসেপশনের কাছে পৌঁছে কাউকে দেখতে না পেয়ে গলা খাকড়িয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘কেউ আছেন?’ প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ভিতর থেকে একটি লোক বেরিয়ে এসে বলে, ‘হ্যাঁ বলুন।’
‘আমি একটা রুম বুক করেছিলাম। আমার নাম অমিতাভ চৌধুরী’। অমিতাভ জানায়।
‘ও আচ্ছা। রাঁচি থেকে তো? হ্যাঁ, আপনার জন্য ঘর রেডি করে রেখেছি।’ এই বলে রিসেপশনের লোকটি একটু বেশ জোরের সাথেই বলে ওঠেন, ‘এই পটল। কোথায় আছিস? ২১২ নম্বর খুলে দে’। বলা মাত্রই একটি ১৭-১৮ বছরের পটল নামের একটি ছেলে ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে। রিসেপশনের লোকটি অর্থাৎ হরিপদ সান্যাল পটলের হাতে একটা চাবি দিয়ে দেয়।
‘ঘর পরিস্কার আছে তো?’ অমিতাভ জানতে চায়।
‘হ্যাঁ স্যার। সে নিয়ে কিছু ভাবতে হবে না’।
‘আর একটা কথা। কিছুক্ষন বাদে আমি বেরব। আমি যদি ঘুমিয়ে পড়ি তাহলে আমায় একবার ডেকে দেবেন’।
‘হ্যাঁ ঠিক আছে আপনাকে ডেকে দেব। কিন্তু আপনি কতদিন থাকবেন?’ হরিপদ জানতে চায়।
‘আমি ১৫ দিনের মতন থাকব।’
‘ঠিক আছে স্যার। প্রতিদিনের ভাড়া ২০০০ টাকা। কোনও আই ডি প্রুফ এনেছেন?’
‘হ্যাঁ। ভোটার আই ডি আছে’। এই বলে অমিতাভ চৌধুরী নিজের বুক পকেট থেকে তাঁর ভোটার কার্ডটা বের করে হরিপদ সান্যালকে দেন।
‘ঠিক আছে স্যার এটার জেরক্স করে আপনাকে ফেরত দিচ্ছি। আপনি রুমে যান। বিশ্রাম করুন।’
পটল দাড়িয়ে ছিল। সে এবার অমিতাভ চৌধুরীর হাত থেকে ট্রলি নিয়ে নেয় এবং অমিতাভ চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলে ‘আসুন’। অমিতাভ চৌধুরী পটলকে অনুসরণ করে সিঁড়ি বেঁয়ে দোতালায় উঠে ২১২ নম্বর রুমে প্রবেশ করে।
অমিতাভ চৌধুরী পেশায় একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। রাঁচির একটি অডিট ফার্মের মালিক। কলকাতায় এসেছেন একটি কাজে। কিন্তু কী কাজে এসেছেন তা বাড়ির লোক বা ফার্মের লোক কাউকে বলে আসেননি। সাদার স্ট্রিটের এই প্যারাডাইস হোটেলটি অমিতাভ চৌধুরী নিজেই ঠিক করেছেন যেহেতু কলকাতায় তার কাজের জায়গাটি হবে চাঁদনী চক। তাই তার মনে হয়েছে সাদার স্ট্রিটে থাকাই ঠিক হবে । হোটেল থেকে বেরিয়ে একটা ট্যাক্সি নিয়েই সে গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যেতে পারবে। তাছাড়া বেশিরভাগ কাজ সে রুমে বসেই করবে। কিছু কাগজপত্র চাঁদনী চকের অফিস থেকে নেবেন এবং হোটেলে বসেই তা দেখবেন। তাই অন্য কোনও বড় হোটেল নির্বাচন করেননি।
তাছাড়া অমিতাভ শুনেছিলেন সাদার স্ট্রিট জায়গাটা বেশ কসমোপলিটন। তাই সে রাঁচিতে বসেই ঠিক করে সে এখানের কোনও একটা হোটেলেই থাকবে। তাই ট্যাক্সি থেকে সাদার স্ট্রিটে নেমেই অমিতাভ বুজতে পারেন জায়গাটা সত্যিই অন্যরকম। যেরকম ভেবেছিলেন আরকি। সারি সারি হোটেল। খাবারের দোকানও রয়েছে কয়েকটা। বেশ একটা বিদেশ-বিদেশ ব্যাপার। তাছাড়া বিদেশি-দিশি সব লোক গিজগিজ করছে। রুমে ঢুকে প্রথম যে কাজটি করেন তা হল বাথরুমটা দেখে নেন, জানলাটা বন্ধ করে দেন এবং এসিটা চালিয়ে দেন। এসি ছাড়া অমিতাভ চৌধুরীর ঘরের ভিতর দম বন্ধ হয়ে আসে। তারপর বউকে ফোনকে জানিয়ে দেন তিনি পৌঁছে গেছেন এবং একটা হোটেলও নিয়ে নিয়েছেন।
ক্লান্ত ছিলেন তাই বিছানায় শুয়েই ঘুমিয়ে পড়ে অমিতাভ চৌধুরী। কিছুক্ষন পরেই ফোনের আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায়। ইন্টারকমে একজন ফোন করেছে। হরিপদ সান্যাল নিজে ফোন করেছে। ফোনে কথা বলা হয়ে গেলে বুঝতে পারেন অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছেন। এবার কিছু একটা খেতে হবে এবং তারপর বেরুতে হবে।
টানা ৫ দিন ২১২ নম্বর রুমে
প্রথমদিন চাঁদনী চকের অফিসে পৌঁছে হোটেলে ফেরেন একগাদা ফাইল নিয়ে। তারপর টানা ৫ দিন রুমে বসে নিবিষ্ট মনে কাজ করেন। সামনের খাবারের হোটেলে বলা ছিল। সেখান থেকেই রুমে খাবার পাঠিয়ে দিত। ষষ্ঠ দিন সকালে ব্রেকফাস্ট করেই চাঁদনী চকের অফিসের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েন। তারপর বেশ রাত করে হোটেলে ফিরেই ঘুমিয়ে পড়েন।
পরের দিনটা অমিতাভর বেশ ফুরফুরে লাগে। কারণ গতকাল সে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে। টানা কাজ করে ক্লান্ত ছিলেন। তাই ভাবেন একটা দিন গ্যাপ দিতে। হরিপদকে জিজ্ঞেস করেন আশেপাশে দেখার জায়গা কী কী রয়েছে। হরিপদর কথা মতন ভিক্টোরিয়া, যাদুঘর, নন্দন এই সব সারাদিন ধরে ঘুরে দেখেন। বাড়ির জন্য নিউমার্কেট থেকে কেনাকাটাও করেন। এমনকি হোটেলে ফেরার পথে এক বোতল হুইস্কিও কেনেন। সঙ্গে ড্রাই চিলি চিকেন। তারপর হোটেলে ঢুকে এসি চালিয়ে, নরম আলো জ্বালিয়ে ল্যাপটপ অন করে মদ খেতে খেতে একটি সিনেমা দেখতে থাকেন। তারপর নেশার চোটে একসময় ঘুমিয়েও পড়েন।
কিন্তু মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়। অনুভব করেন তার সারা শরীর ঘামছে। কী হল? ঘামছেন কেন? ঠিক মনে আছে এসি চালিয়েই ঘুমিয়েছিলেন। বিছানা ছেড়ে উঠে দেখেন এসি কাজ করছে না। একটা ঘ্যার ঘ্যার আওয়াজ হচ্ছে আর গরম হাওয়া বেরুচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে রিসেপশনে ফোন করেন। কিন্তু রাত বেশি বলে কেউ ফোন ধরেনা। কারণ তখন সবাই ঘুমাচ্ছে। অমিতাভের সারারাত আর ঘুম হয়না। একবার জানলাটা খুলে দেওয়ার কথা ভেবেছিল কিন্তু জানলা খুলে সে ঘুমাতে পারেনা। ঠিক করেন পরের দিন সকালের মধ্যে এসি ঠিক না হলে সে রুম ছেড়ে দেবে। কারণ তাকে আরও কিছুদিন কলকাতায় থাকতে হবে এবং তার পক্ষে এসি ছাড়া থাকা সম্ভব নয়।
‘জানলাটা খুলে দেব স্যার’
পরের দিন সকালে অমিতাভ রিসেপশনে গিয়ে জানান যে এসি থেকে গরম হাওয়া বেরুচ্ছে। হরিপদ সান্যাল ২১২ নম্বর রুমে আসে এবং এসি দেখে বলে সে একজন এসি সারাইওয়ালাকে ডাকবে। অমিতাভ বুঝতে পারেন সারাদিন লেগে যেতে পারে। পকেট থেকে স্মার্টফোনটি বের করে একটি নম্বরে ফোন করেন। একজন লোক ফোন ধরে।
‘কি? ব্যস্ত?’ অমিতাভ জানতে চায়।
‘না। বলুন।’
‘আজ আপনার অফিসে দিনটা কাটানো যায়? হোটেলের এসিটা খারাপ হয়ে গেছে। সারাদিন লেগে যাবে। তাছাড়া আপনার সাথে কিছু কথাও আছে।’
‘হ্যাঁ চলে আসুন’।
অমিতাভ ফোন কেটে দেয়। তারপর রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়েন।
সন্ধেবেলায় হোটেলে ফিরে আসেন। তবে ফিরে এসি ঠিক হয়নি দেখে তাঁর মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। হরিপদবাবুকে রুমে ডেকে পাঠান।
‘এসি ঠিক হয়নি কেন?’ রাগত স্বরে জানতে চায় অমিতাভ।
‘স্যার যে ছেলেটি আমাদের কাজ করে সে দেশে গেছে। নতুন লোক খুঁজছি। তাড়াতাড়িই পেয়ে যাবো। কয়েকজনকে বলেছি।’ হরিপদ বলে।
‘নতুন লোক কবে আসবে?’
‘এক-দু’দিন তো লাগবেই স্যার’।
‘আপনাকে তো বলেছি আমি এসি ছাড়া থাকতে পারিনা’।
‘হ্যাঁ জানি স্যার’।
‘তাহলে আমায় অন্য রুম দিন’। অমিতাভ বলে।
‘সব রুম বুকড স্যার। পরের সপ্তাহে ভোট। এখন রুম সব বুকড থাকে।’
‘তাহলে আমি অন্য হোটেলে শিফট করে যাচ্ছি’। অমিতাভ বলে।
‘সেখানেও ঘর খালি পাবেন না। ভোট শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও হোটেলে রুম খালি পাবেন না। সব হোটেল বুকড। আপনি খোঁজ নিতে পারেন’। লোকটি হাসতে হাসতে বলে।
কিন্তু অমিতাভ কিছুতেই বুঝবেন না। গতকাল রাত ওই মান্ধাতা আমলের ফ্যান চালিয়ে কাটিয়েছেন। আজ সে কিছুতেই এসি ছাড়া থাকতে পারবে না। পকেট থেকে ফোন বের করে অমিতাভ একজনকে ফোন করে।
‘হ্যালো। একটা হেল্প দরকার।’
‘হ্যাঁ কি বলুন’।
‘একজন এসি সারাইয়ের লোক দরকার’।
‘এখন?’
‘হ্যাঁ।’
‘আচ্ছা আমি দেখছি’। এই বলে লোকটি ফোন কেটে দেয়।
এর কিছুক্ষনের মধ্যেই অমিতাভের কাছে একটি ফোন আসে।
‘হ্যালো। আপনার নম্বরটা পেলাম। আপনি এসি সারাই করাবেন ?’
‘হ্যাঁ। আপনি করেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘আপনি প্যারাডাইস হোটেল চেনেন?’ অমিতাভ জিজ্ঞাসা করে।
‘হ্যাঁ চিনি। সাদার স্ট্রিটে তো?’
‘হ্যাঁ। চলে আসুন।’
‘আসছি আধ ঘণ্টার মধ্যে’।
আধ ঘণ্টা পর অমিতাভর রুমের বেলটি বেজে ওঠে। দরজা খুলে দেখে একটি ২২-২৩ বছরের ছেলে হাতে একটা ব্যাগ নিয়ে দাড়িয়ে আছে।
‘স্যার কল করেছিলাম।’ ছেলেটি বলে।
‘এসি সারাই তো?’ অমিতাভ জিজ্ঞাসা করে।
‘হ্যাঁ’।
‘চলে এসো’।
ছেলেটি ২১২ নম্বর রুমে প্রবেশ করে। রুমে দুটো চেয়ার ছিল। একটাতে অমিতাভ বসে ছিল। আর একটা টিভির পাশে ছিল। ছেলেটি টিভির নিচে রাখা খালি চেয়ারটি টেনে এনে এসির নিচে রাখে। সঙ্গের ব্যাগটা চেয়ারের পাশে রাখে। চেয়ারের ওপর উঠতে যাবে এমন সময়ে সে বলে, ‘ঘরটা ভীষণ গরম। জানলাটা খুলে দেব স্যার?’ অমিতাভের প্রস্তাবটি পছন্দ হয়না। সে বলে, ‘না খুলে কাজ করতে পারবে না। ফ্যান চলছে তো।’ কিশোরটি কিছু বলে না। তারপর বুঝতে পেরে যে ঘরটা সত্যিই গরম হয়ে আছে, অমিতাভ নিজে উঠে জানলাটা খুলে দেয়। তারপর নিজের চেয়ারে এসে বসে পড়ে। কিছুক্ষন ছেলেটির কাজ দেখে তারপর ল্যাপটপ খুলে মাইক্রোসফট ওয়ার্ড খুলে কী একটা লিখতে শুরু করে।
প্রায় একঘণ্টা পর ছেলেটি জানায় তার কাজ হয়ে গেছে। এসি ঠিক হয়ে গেছে। অমিতাভ খুশি হয়। কাছে গিয়ে বুজতে পারে ঠাণ্ডা হাওয়া বেরুচ্ছে। ছেলেটিকে তার পারিশ্রমিকের টাকা দেয়।
‘তোর নাম কী?’
‘শঙ্কর’।
‘কতদিন এই কাজ করছিস?’
‘এই বছর তিনেক’।
‘বাড়িতে কে কে আছে?’
‘মা বাবা আর একটা ভাই।’
‘আচ্ছা যা। ভালো থাকিস।’
শঙ্কর টাকা নিয়ে চলে যায়। শঙ্করকে দরজা অবধি ছেড়ে এসে দরজা বন্ধ করে অমিতাভ আবার ল্যাপটপে কাজে নিমগ্ন হয়।
কিন্তু তা সত্ত্বেও ঘর ঠাণ্ডা হচ্ছে না দেখে একবার এসির দিকে তাকায়। এবার একটু বিরক্ত হয়। এরকম তো হওয়ার কথা নয়। ঘর কেন ঠাণ্ডা হচ্ছে না বুঝতে পারেনা। তারপর জানলার দিকে চোখ যায়। ‘আরে ঘর গরম হবে কী করে? জানলাটা খোলা তো।’
‘২১২ দরজা খুলছে না’
রাত ১০ টা নাগাদ নিচের খাবারের হোটেলের ছেলে আব্দুল খাবার ২১২ নম্বরে আসে। প্রথমে বেশ কয়েকবার বেল বাজায়। তাও খুলছে না দেখে দরজায় ধাক্কা দেয়। তারপর ব্যর্থ হয়ে রিসেপশনে এসে জানায়, ‘২১২ দরজা খুলছে না’। হরিপদ বলে, ‘এই জন্যই বুড়ো মালদের রাখতে চাই না।’ তারপর রুমে ফোন করে। অমিতাভ ফোন রিসিভ করে না। এবার হরিপদ পটলকে ডাকে। ড্রয়ার থেকে একটা ডুপ্লিকেট চাবি বার করে। তারপর নিজে, পটল এবং আব্দুলকে নিয়ে দোতালায় আসে ২১২ নম্বর রুমের বাইরে। প্রথমে বেল বাজায়। তারপর মিস্টার চৌধুরী বলে ডেকে কয়েকবার দরজাও ধাক্কায়। কিন্তু কেউ দরজা খোলে না। তারপর দুজনের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তোরা এখানে দাড়া। কোথাও যাবি না। আমি দরজা খুলছি।’
দরজা খুলে দেখে বিছানার ওপর ল্যাপটপ রাখা। ঘরে এসি চলছে। জানলাটা খোলা। কিন্তু অমিতাভ চৌধুরী মেঝেতে পড়ে রয়েছে। হরিপদ কাছে যায়। গিয়ে দেখে অমিতাভর চোখ দুটো খোলা। কাত হয়ে শুয়ে আছে। লোকটি বুজতে পারে ২১২ নম্বরের গেস্ট অমিতাভ চৌধুরী মৃত। বাইরে দাড়িয়ে থাকা দুজনও ততক্ষণে দেখতে পেয়ে গেছে যে অমিতাভ চৌধুরী মেঝেতে শুয়ে রয়েছে। আব্দুল খাবার ওখানে ফেলে দিয়েই পালায়। রিসেপশনে যে দুজন অন্য গেস্ট বসেছিল তাদের দিকে তাকিয়ে বলে ‘২১২ নম্বরে লাশ’। এই বলে বেরিয়ে চলে যায়।
কে করেছে খুনটা
কিছুক্ষন পর পুলিশ আসে। বডি অটোপসি করতে পাঠায়। তারপর ইনস্পেক্টর জয়ন্ত সেনগুপ্ত প্রথমে হোটেলের কর্মচারীদের এবং আব্দুলকে কয়েকটি সাধারন প্রশ্ন করে। তারপর ২১১ এবং ২১৩ নম্বর রুমের গেস্টদের ডিটেলস নিয়ে চলে যায়। পরেরদিন ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসে। মৃত্যুর কারণ একটি ধারালো অস্ত্র দিয়ে বুকে আঘাত। তারফলে বুক ফুটো হয় এবং তাতে হার্ট আঘাতপ্রাপ্ত হয়। তার ফলে মৃত্যু। অর্থাৎ হোমিসাইড।
ইনস্পেক্টর জয়ন্ত সেনগুপ্ত একজন কনস্টেবলকে নিয়ে প্যারাডাইস হোটেলে চলে আসেন। তিনি প্রথমেই যে কাজটা করেন তা হল অমিতাভ বাবুর স্ত্রী শিখা চৌধুরীকে ফোন করেন এবং তাকে কলকাতায় আসতে বলেন। অমিতাভের স্ত্রী তার ছেলেকে নিয়ে পরেরদিনই কলকাতায় চলে আসেন। সঙ্গে অমিতাভের ফার্মের একজন কর্মচারীও আসেন।
জিজ্ঞাসাবাদ পর্ব শুরু হয়। প্রথমে হরিপদ সান্যালকে প্রশ্ন করেন। হরিপদ যা যা দেখেছিল তা বলেন। তারপর আব্দুলকে প্রশ্ন করা হয়। সেও আশাব্যঞ্জক কোনও উত্তর দিতে পারেনা। হোটেলের বাকি কর্মচারীদেরও ডাকা হয়। তারাও কেউ তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় কোনও উত্তর দিতে পারেন না। সব শেষে যে সব ২১১ এবং ২১৩ নম্বর রুমের গেস্টদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিন্তু তারা বলেন তারা অস্বাভাবিক কিছু শোনেনি।
ফোনের লক খোলার পর এসি সারাইয়ের শঙ্করকে ডাকা হয়। শঙ্কর জানায় সে যখন কাজ শেষ করে বেরিয়েছে তখন অমিতাভ জীবিত ছিল। জয়ন্ত বুঝতে পারে খুনটা হয়েছে শঙ্কর বেরিয়ে যাওয়ার পর এবং আব্দুলের খাবার নিয়ে আসার মাঝখানের সময়টাতে। তবে দুজনের মধ্যে যদি কেউ একজন মিথ্যে বলে তাহলে বিষয়টি অন্য হবে। কিন্তু খুনি ঢুকল কীভাবে রুমে? সি সি টি ভি ফুটেজে তো শঙ্কর বাদে কাউকেই ঢুকতে দেখা যায়নি। অস্ত্রটাই বা কী?
এদিকে ফার্মের কর্মচারীর সাথে কথা বলে জয়ন্ত জানতে পারে অমিতাভের ফার্মের অবস্থা ভালো নয়। সে কাউকে না জানিয়েই কলকাতায় এসেছিল। ফোনের কল রেকর্ডস ঘেঁটে একটা নম্বর পায়। তবে নম্বরটা সেভ ছিল না। কিন্তু কলকাতায় আসার পর দিনে অনেকবার কল করেছিল সেই নম্বরে। সেই নম্বরে কল করা হয়। কিন্তু কেউ ফোন তোলেনা। ল্যাপটপ খুলে জয়ন্ত বুঝতে পারে অমিতাভ একটা রিপোর্ট লিখছিলেন। কিন্তু রিপোর্টটি পুরো লেখা হয়নি। তারপর যে ফাইল গুলো অমিতাভ দেখছিল সেগুলো নিয়ে বসেন জয়ন্ত সেনগুপ্ত। ফাইলে গোল্ডেন বেঙ্গল এগ্রো প্রোডাকটস প্রাইভেট লিমিটেড নামক একটি কোম্পানির কাগজপত্র। অফিস চাঁদনী চক। জয়ন্ত সেনগুপ্ত সোজা সেই অফিসে গিয়ে হাজির হয়। কিন্তু গিয়ে দেখে অফিসের দরজায় তালা ঝোলানো। পাশের অফিসের দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করলে সে বলে এই অফিসে সে কাউকে কোনওদিন আসতে দেখেনি। জয়ন্ত বুজতে পারে যে এটি একটি শেল কোম্পানি। অর্থাৎ নকল কোম্পানি। কলকাতায় এরকম হাজার হাজার শেল কোম্পানি রয়েছে। এই কোম্পানিতে কারা কারা কাজ করে তা খুঁজে বার করা সহজ হবে না জয়ন্ত বুঝতে পারে।
এর সঙ্গে এও জানতে পারেন কলকাতায় আসার পর অমিতাভ যে নম্বরটিতে কল করত সেটি নেপালের নম্বর। সিম অনিতা ধানভি নামের একজন মহিলার। তাহলে কি কেউ নেপাল থেকে এখানে এসে খুন করে গেল? কিন্তু কেন? আর যদি খুনি নেপালে চলে যায় তাহলে তাকে খুঁজে বের করা মোটেই সহজ হবে না। নাকি অনিতা ধানভি কোনও যৌনকর্মী? যার সাথে অমিতাভ দেখা করতে যেত। তাহলে এই ফাইলগুলো কীসের? গোল্ডেন বেঙ্গল এগ্রো প্রোডাকটস প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিটির আসল মালিক কে? এইসব প্রশ্ন জয়ন্তকে ভাবিয়ে তোলে।
জয়ন্তর স্ত্রী শিখা চৌধুরীকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারে অমিতাভ চৌধুরীর অন্য কোনো মহিলার কাছে যেত না। তবে ফার্মের অর্থনৈতিক অবস্থা একেবারেই ভালো ছিল না। তাহলে কি ফার্মেরই কোনও গোলমালের কারনে খুন হলেন অমিতাভ? কিন্তু খুনি কে? তার মোটিভই বা কী? তবে একটি ব্যাপারে সে নিশ্চিত যে গোল্ডেন বেঙ্গল এগ্রো প্রোডাকটস প্রাইভেট লিমিটেডকে ছেড়ে দিলে চলবে না। আরও একবার ফোন করে নম্বরটাতে। এবার একজন মেয়ে ফোন ধরে। মহিলাটির নাম অনিতা ধানভি। সে তার স্বামী এবং ছেলেকে নিয়ে নেপালের পোখরাতে থাকে। তার স্বামী একজন ট্র্যাভেল এজেন্ট। অনিতা ধানভির থেকে জয়ন্ত তার স্বামী মাধব ধানবির নম্বর নেয়। মাধব জানায় সে কলকাতায় গেলেও গোল্ডেন বেঙ্গল এগ্রো প্রোডাকটস প্রাইভেট লিমিটেড এই নামের কোনও কোম্পানি বা তার সাথে যুক্ত কোনও লোককে চেনে না। তাছাড়া সে কলকাতায় এসেছিল এক বছর আগে। তার স্ত্রীয়ের নম্বর কীভাবে অমিতাভ চৌধুরী পেলো তাও সে জানে না। কারণ অনিতা ধানভি কোনওদিন কলকাতায় যায় নি। অথচ মোবাইলের টাওয়ারের লোকেশন ডেটা বলছে নম্বরটা কয়েকদিন আগেও কলকাতায় ছিল। যদি মাধব ধানভি মিথ্যেও বলে থাকে তাহলে তার খুন করার মোটিভ কী? জয়ন্ত এবার গোল্ডেন বেঙ্গল এগ্রো প্রোডাকটস প্রাইভেট লিমিটেডের মালিককে খুঁজে বের করতে উদ্যোগী হয়। খোঁজ নিয়ে জানতে পারে লোকটি দুবাইতে থাকে। এই কোম্পানিটা দিয়ে সে কালো টাকা সাদা করে। লোকটির নাম রাজেশ ঝুনঝুনওয়ালা। সে ১০ বছর আগে কলকাতা ছেড়েছে। জয়ন্ত সেনগুপ্তর সব গুলিয়ে যেতে থাকে। নেপাল, দুবাই, রাঁচি। কোথা থেকেই সে কোনো সুত্র পায়না।
সি আই ডি
অমিতাভ চৌধুরীর সাথে ঝাড়খণ্ডের একজন মন্ত্রীর সাথে চেনাজানা ছিল। ঘটনার প্রায় ৬ মাস অতিক্রান্ত হয়েছে কিন্তু এখনও খুনের কিনারা হয়নি দেখে শিখা চৌধুরী এবং তার ছেলে ঝাড়খণ্ডের অমিতাভের চেনা সেই মন্ত্রীর সাথে দেখা করেন এবং অনুরোধ করেন ব্যাপারটা যেন একটু গুরুত্ব সহকারে দেখা হয়। সেই মন্ত্রী পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ মন্ত্রীকে বিষয়টা জানান। পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ মন্ত্রী সব শুনে তদন্তের ভার সি আই ডির হাতে দেন।
অনিলাভ সেন একজন তুখোড় গোয়েন্দা। সি আই ডি তে আছেন ১০ বছর। যতটা স্মার্ট ততটাই ক্ষিপ্র। জয়ন্ত সেনগুপ্তের কাছ থেকে সব শুনে নিয়ে প্রথমেই যে কাজটা করেন তা হল ময়নাতদন্তের রিপোর্ট দেখতে চান। তবে অনিলাভ সেন একটি জিনিস করেন তা হল জয়ন্ত সেনগুপ্তকে তদন্ত থেকে বাদ দেন না। তাকেও যুক্ত রাখেন। কিন্তু ময়না তদন্তের রিপোর্ট দেখে অনিলাভ খুশি হন না। সে যে ডাক্তার ময়নাতদন্ত করেছে তার সাথে দেখা করেন এবং পোস্টমর্টেমের ভিডিও দেখতে চায়। পোস্টমর্টেমের ভিডিও দেখে অনিলাভ সেনের মাথা হাত উঠে যায়।
‘এ তো গুলি করা হয়েছিল’, অনিলাভ সেন বলেন।
‘কী বলছেন আপনি?’ ডাক্তারবাবু একটু রেগে গিয়েই কথাটি বলেন।
‘ভালো করে দেখুন। গুলি ঢুকে হার্ট ফুটো করেছে’।
‘আমার ২০ বছরের অভিজ্ঞতা। আমি এই ভুল করতেই পারিনা’
‘আপনি আরও একবার দেখুন’।
তারপর ১০ মিনিট ধরে ডাক্তারটি ভালো করে ভিডিওটি আবার দেখে।
‘আমাকে মিডিয়া শেষ করে দেবে। এরকম ভুল আমার কোনওদিন হয়নি।’ ডাক্তারটি বলেন।
জয়ন্ত সেনগুপ্ত পাশে দাড়িয়ে ছিল। সেও অবাক হয়ে যায়। সে অনিলাভকে বলে, ‘স্যার আমি ভালো করে রুম চেক করেছি। কোনও গুলি বা ওই জাতীয় জিনিস পাইনি’।
‘পাবে কী করে? গুলিটা বডিতে আটকে ছিল। তারপর বডি পোড়ানো হয়ে গেছে। সেই গুলি এখন ভগবান এসেও খুঁজে বের করতে পারবে না’ অনিলাভ এক নিশ্বাসে কথাগুলি বলে।
অনিলাভ তখন এক উত্তেজনা অনুভব করছে। সে বুজতে পেরেছে সে কেসটা শীঘ্রই সমাধান করে দিতে পারবে। জয়ন্ত ভুল পথে এগোচ্ছিল। আসলে জয়ন্তর কোনও দোষ ছিলনা। ময়নাতদন্তের রিপোর্টেই ভুল ছিল।
কাঁটাপুকুর থেকে তারা দুজনে সোজা প্যারাডাইস হোটেলে চলে যায়। হরিপদ স্যানালকে জিজ্ঞেস করে সে রুমে ঢুকে কী দেখে যা তার কাছে অস্বাভাবিক লেগেছিল। সে জানায় সেরকম কিছু অস্বাভাবিক সে কিছু দেখেনি। তবে একটা ব্যাপার অদ্ভুত লেগেছিল তা হল এসি চলছিল অথচ জানলা খোলা ছিল। হরিপদ এও বলেন অমিতাভ সব সময় জানলা বন্ধ রাখত। এমনকি যখন এসি কাজ করছিলনা তখনও অমিতাভ জানলা বন্ধ রাখত। রুম গরম হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও। এদিকে শিখা চৌধুরীকে জিজ্ঞেস করে অনিলাভ জানতে পারে অমিতাভ জানলা একদমই খুলে রাখতে চাইত না। বাড়িতে এই নিয়ে ঝামেলাও হয়েছিল অনেক বার। অনিলাভ বুঝতে পারে গুলিটা ওই জানলা দিয়েই ঢুকেছিল।
কিন্তু জানলা কেন খুলেছিল অমিতাভ? সে কি নিজে খুলেছিল? নাকি অন্য কেউ খুলেছিল? জীবিত থাকা অবস্থায় অমিতাভের রুমে ঢুকে ছিল একমাত্র শঙ্কর - এসি সারাইয়ের ছেলেটা। হরিপদর সাথে কথা বলে অনিলাভ জানতে পারে শঙ্করকে অমিতাভ নিজে ডেকে ছিল।
শঙ্করকে অনিলাভ ডেকে পাঠায়। সে অনিলাভকে জানায় একটি অচেনা নম্বর থেকে তার কাছে কল আসে যে প্যারাডাইস হোটেলে একটি কাজ আছে। সেই লোকটিই অমিতাভর নম্বর তাকে দেয়। অনিলাভ শঙ্করকে জিজ্ঞেস করে সে ঘরে ঢুকে অস্বাভাবিক কিছু দেখেছিল কিনা? সে উত্তরে জানায় না। তারপর অনিলাভ এমন একটি প্রশ্ন করে যা শুনে শঙ্কর ভয় পেয়ে যায়।
‘তুই যখন ঘরে ঢুকেছিলিস তখন জানলাটা খোলা না বন্ধ ছিল?’
‘বন্ধ ছিল’। আমতা আমতা করে বলে শঙ্কর।
‘তুই খুলেছিলিস?’
‘না স্যার’।
এই শুনে অনিলাভ একটা চড় মারে শঙ্করের গালে।
‘সত্যি কথা বল’, জয়ন্ত বলে।
কিছুক্ষন সবাই চুপ। তারপর শঙ্কর কাঁদতে শুরু করে।
‘স্যার আমি কিছু করিনি। আমি যখন কাজ করতে প্যারাডাইস হোটেলে ঢুকছি তখন একটা লোক এসে আমায় বলল ২১২ নম্বর কা খিরকি খোল দেনা। এই বলে আমার হাতে ২০০০ টাকা গুঁজে দিল।’ ছেলেটি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কথাগুলি বলে।
‘আর তুই জানলাটা খুলে দিলি?’ জয়ন্ত রেগে গিয়ে বলে।
‘না। জানলা আমি খুলিনি। স্যার নিজে খুলেছিল’। শঙ্কর জানায়।
‘তারপর কী হল?’ অনিলাভ প্রশ্ন করে।
‘লোকটা টাকা দিয়েই চলে গেল। আর আমি ২১২ নম্বরে কাজ করতে চলে আসি’, শঙ্কর বলে।
‘লোকটাকে দেখতে কেমন ছিল?’, অনিলাভ জানতে চায়।
‘মুখ দেখতে পাইনি। মাস্ক পড়া ছিল।’ শঙ্কর চোখ মুছতে মুছতে বলে।
গডস নেসট
২১২ নম্বর রুমে আরও একবার প্রবেশ করে অনিলাভ এবং জয়ন্ত দুজনেই একটা ব্যাপারে একমত হয় গুলি জানলা দিয়েই ঢুকেছিল। জানলার সামনে দাড়িয়ে অনিলাভ পাশের বাড়িটির দিকে একবার তাকালেন। জানলা দিয়ে উল্টো দিকের বাড়ির তিনটে ঘর দেখা যাচ্ছে। প্রতিটি ঘরেই লোক রয়েছে। অনিলাভ বুঝলেন ওটাও একটি হোটেল। প্যারাডাইস হোটেল থেকে বেরিয়ে অনিলাভ এবং জয়ন্ত পাশের হোটেলে যায়। হোটেলটির নাম গডস নেসট। হোটেলেটি প্যারাডাইস হোটেলের থেকে কলেবরে একটু বড়। জয়ন্ত হোটেলের ম্যানেজারকে ডাকেন। পুরো ব্যাপারটা বলেন এবং তাকে সঙ্গে নিয়ে হোটেলটির দোতালায় ওঠেন। ৫০৬ নম্বর রুম অর্থাৎ যে ঘরটি ২১২ নম্বর ঘরের ঠিক বিপরীতে সেই ঘরে তিনজনে ঢোকেন। সেই ঘরের গেস্টদের কিছুক্ষনের জন্য ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়। তারপর অনিলাভ জানলার সামনে গিয়ে দাড়িয়ে উল্টোদিকের প্যারাডাইস হোটেলটির দিকে তাকান। ৫০৬ নম্বর ঘর থেকে ২১২ নম্বর ঘরটি পরিস্কার দেখা যাচ্ছে। খাট, টেবিল, টেবিলে রাখা ফুলদানি এবং একটি চেয়ার। ২১২ নম্বর রুম সিল করা ছিল তাই ভিতরের জিনিস পত্রের অবস্থানের কোনও পরিবর্তন হয়নি। খুনের রাতে যেমন ছিল তেমনি আছে। অনিলাভের চোখের সামনে খুনের রাতের ঘটনাটি ভেসে ওঠে। খুনি ঘর অন্ধকার করে, জানলায় বন্ধুক বসায় এবং ২১২ নম্বর রুমে জানলার দিকে মুখ করে চেয়ারে বসে থাকা অমিতাভ চৌধুরীকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। একটা গুলিতেই কাজ সাবার হয়ে যায়। তারপর হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে যায়।
গডস নেসটের গেস্ট রেজিস্টার চেক করে দেখা যায় যে খুনের দিন সকালে দুটি ছেলে ওই রুমটি নেয়। রেজিস্টারে ঠিকানা লেখে মুঙ্গের, বিহার। নাম বিকাশ সিং এবং লোকেশ সিং। হোটেলের সি সি টি ভি তে তাদের চেহারা দেখে নিয়ে অনিলাভ, জয়ন্ত এবং একটি ছোট টিম মুঙ্গেরে চলে যায়। মুঙ্গের গিয়ে বেশি খুঁজতে হয়না দুজনকে। দুজনে আসলে আর্মস ডিলার। কলকাতায় কয়েকজনকে বন্ধুক বিক্রি করতে গেছিল। ভোটের আগে ছিল বলে কিছু মস্তান বন্ধুকের অর্ডার দিয়েছিল। একজন ক্লায়েন্ট চলে যাওয়ার পর তারা মদ খেতে খেতে বন্ধুক নিয়ে একে অপরের দিকে তাক করে মজা করছিল। এমন সময় বিকাশ সিং-এর ইচ্ছে হয় ২১২ নম্বরের ভিতরের টিভিটিকে তাক করে সে গুলি ছুড়বে। তাই সে একটা গুলিও চালায়। কিন্তু গুলি টিভিতে লাগেনা। কোথায় লাগে তাও বুঝতে পারেনা। তারপর পরের দিন সকালে তারা শোনে পাশের হোটেলে একজন খুন হয়েছে। কিন্তু তাদের মনে হয়নি বিকাশ সিং এর গুলিতেই লোকটা মারা গেছে। কারণ খবরে তারা দেখে যে লোকটিকে রুমের ভিতর কেউ পিটিয়ে মেরেছে। সেদিনই তারা কলকাতা ছেড়ে দেয় এবং বিহারে চলে আসে।
জয়ন্ত বিকাশের কাছে জানতে চায় সে ২১২ নম্বরের দরজা কেন খুলতে বলেছিল শঙ্করকে। বিকাশ বলে তারা দুজনেই মদ্যপ ছিল। রাস্তায় বেরিয়েছিল। মদ খাওয়া অবস্থায় অনেক লোককেই অনেক কথা বলেছিল। হয়ত নেশার ঘোরেই বলে থাকবে যে জানলা খুলে দিতে।
এই শুনে অনিলাভ এবং জয়ন্ত দুজনেই থ হয়ে যায়। তাহলে সেই অর্থে খুনি কেউ না। অসাবধনতা বশত মৃত্যুটা হয়েছে। বিকাশ সিং এবং লোকেশ সিং কে নিয়ে দুজনে কলকাতায় চলে আসে। কারণ বিকাশ এবং লোকেশ দুজনকেই কোর্টে পেশ করতে হবে। তবে জয়ন্তর একটা বিষয় কিছুতেই মাথায় ঢোকেনা বিকাশ সিং বা লোকেশ সিং শঙ্করকে জানলাটা কেন খুলে দিতে বলেছিল। অনিলাভকে বিষয়টি সে জানায়। কিন্তু অনিলাভ গুরুত্ব দেয় না। অনিলাভ বলে হয়ত আগের কয়েকদিন ২১২ নম্বরের জানলাটা বন্ধ ছিল বলেই তাদের মনে হয় ২১২ নম্বরে কী আছে তা দেখার জন্য শঙ্করকে জানলাটা খুলে দিতে বলে। তাছাড়া তারা তো বলেছে যে তারা মদ্যপ ছিল এবং রাস্তায় বেরিয়ে নানা লোককে নানা কথা বলেছিল। তখনই হয়ত নেশার ঘোড়ে শঙ্করকে কিছু টাকাও দিয়ে দেয়। তাছাড়া কেস তো সল্ভড। দুজনেই তো স্বীকার করেছে তারা গুলি চালিয়ে ছিল।
দেয়ালে ওটা কী লেগে আছে?
জয়ন্ত সেনগুপ্ত পুলিশ স্টেশন থেকে বেরিয়ে ঠিক করেন নিউ মার্কেটে যাবেন। ছেলের জন্য একটা জুতো কিনতে হবে। নিউমার্কেটে গেলেন এবং ছেলের জন্য জুতোও কেনেন। জুতো কেনা হয়ে গেলে ঠিক করেন পার্কস্ট্রিটের একটি রেস্তোরা থেকে কিছু খাবার বাড়ির জন্য কিনে নিয়ে যাবেন। ঠিক করেন ভিতর দিয়ে হেঁটেই যাবেন। মেট্রো ধরবেন না। যাদুঘরের সামনে যে মুহূর্তে পৌঁছন তখনই একটা ফোন আসে মোবাইলে।
‘স্যার প্যারাডাইস হোটেল থেকে বলছি। কেস তো সল্ভ হয়ে গেল। এবার তো সিলটা খুলে দিন’, হরিপদ কথাগুলো বলে।
জয়ন্ত একটু লজ্জা পায়। সত্যি সে ব্যাপারটা ভুলে গিয়েছিল। অনেক দিন আগেই কেস সল্ভ হয়ে গেছে। এখনও রুম সিল করা রয়েছে। তাদের ব্যবসারও ক্ষতি হচ্ছে। সাদার স্ট্রিটের কাছেই ছিল। তাই ঠিক করে একবার হোটেলটা ঘুরে যাবে পার্ক স্ট্রিট যাওয়ার আগে।
যেমন ভাবা তেমন কাজ। প্যারাডাইস হোটেলে গিয়ে হাজির হয় জয়ন্ত। হরিপদ তাকে আবার দেখে খুশি হয় না। জয়ন্ত তা বুঝতে পারে। গলার স্বর একটু নামিয়েই বলে, ‘একদমই খেয়াল ছিল না। একজনকে আসতে বলেছি। কিছুক্ষনের মধ্যেই আসবে এবং সিল খুলে নিয়ে যাবে’। এই কথা যে মুহূর্তে শেষ হয়েছে তখনই একজন কনস্টেবল এসে হাজির হয়। পকেট থেকে চাবির গোছা বের করেন এবং রিসেপশনে বসে থাকা লোকটিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘চলুন। কোন তালা খুলতে হবে বলুন’। তারপর হরিপদ, কনস্টেবল এবং জয়ন্ত সেনগুপ্তকে সঙ্গে নিয়ে ২১২ নম্বর রুমের সামনে গিয়ে হাজির হয়। প্রথম চাবিটিতেই তালা খুলে যায়। জয়ন্ত বলে, ‘এই তো একেবারে প্রথম চাবিতেই দরজা খুলে গেছে।’ তারপর হরিপদকে জিজ্ঞেস করে, ‘একটু বাথরুমটা ইউজ করা যাবে?’
‘হ্যাঁ নিশ্চয়ই। কেন করা যাবে না।’
জয়ন্ত একটু মুচকি হাসে। তারপর ২১২ নম্বর রুমের ভিতর ঢুকে যায়। জুতোর প্যাকেটটি চেয়ারে রাখে এবং তারপর বাথরুমের লাইট জ্বেলে বাথরুমের ভিতর ঢুকে যায়। ৫ মিনিট পর কাজ সেরে রুম থেকে বেরিয়ে আসে।
তারপর কনস্টেবলকে জিজ্ঞেস করে, ‘বাইক এনেছিস?’
কনস্টেবলটি জানায়, ‘হ্যাঁ’।
‘আমাকে একটু পার্কস্ট্রিটে ছেড়ে দিবি?’
‘হ্যাঁ চলুন।’
এই বলে জয়ন্ত এবং কনস্টেবলটি প্যারাডাইস হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। জয়ন্ত বাইকে উঠে পড়েন এবং সঙ্গে সঙ্গে বাইকও ছেড়ে দেয়। বাইক ফ্রি স্কুল স্ট্রিট যে মুহূর্তে পৌঁছেছে তখনই জয়ন্তর খেয়াল হয় জুতোর প্যাকেটটা হোটেলে ফেলে এসেছেন। বাইক ঘোরাতে বলেন এবং আবার প্যারাডাইস হোটেলে এসে উপস্থিত হন। রিসেপশনের লোকটির কাছে ক্ষমা চেয়ে নেন আবার বিরক্ত করার জন্য। কিন্তু ফিরে আসার কারণ শুনে লোকটি রেগে যায়না। বলে, ‘যান প্যাকেটটা নিয়ে আসুন। দরজা খোলা আছে।’
দোতালায় গিয়ে ফের একবার ২১২ নম্বর রুমে ঢোকে জয়ন্ত। প্যাকেটটা চেয়ারে রাখা ছিল। প্যাকেটটা তুলে যে মুহূর্তে বেরুবেন সেই মুহূর্তে দরজার পাশের দেয়ালে নিচের দিকে একটি ছোট ছিদ্র দেখতে পান। জয়ন্ত মনে মনে বলে, ‘ আরে এই ছিদ্রটাতো আগে দেখিনি।’ একবার ভাবে হয়ত আগে ছিল, কোনও কারণ মিস হয়ে গেছে। তারপর ভাবে একবার মনের শান্তির জন্য কাছ থেকে দেখেই নিই। কাছে গিয়ে যা দেখেন ছিদ্রটিতে একটা গুলি লেগে আছে। ধপ করে বসে পড়েন জয়ন্ত। সব ওলটপালট হয়ে যায়। বিকাশ সিং এবং লোকেশ সিং বলেছিল তাদের বন্ধুক থেকে মাত্র একটি গুলিই বেরিয়েছিল। তাহলে এই গুলিটি কোথা কে আসলো?
দ্বিতীয় গুলি কে চালালো?
জয়ন্ত অনিলাভকে ফোন করে। গোটা বিষয়টা জানায়। অনিলাভ সোজা প্যারাডাইস হোটেলে চলে আসে। দেয়ালে গুলি আটকে লাগা দেখতে পেয়ে সেও অবাক হয়ে যায়। তাছাড়া বিকাশ সিং এবং লোকেশ সিং এর বন্ধুক থেকে যে একটি গুলি বেরিয়েছিল তা ব্যালিস্টিক পরীক্ষাতেই ধরা পড়ে ছিল। তাহলে এই দ্বিতীয় গুলিটি কে চালাল। ভাবতে থাকে দুজনেই। বুঝতে পারেন রহস্য অনেক গভীর। তবে একটি ব্যাপারে তারা নিশ্চিত ছিল যে গডস নেসটেই রহস্য লুকিয়ে রয়েছে। তারা আবার গডস নেসটেই ফিরে যায়। তাদের ফিরে আসতে দেখে হোটেলের লোকেরা মোটেই খুশি হয়নি। কিন্তু জয়ন্ত তাদের বোঝাতে সফল হয় যে কাজটা তারা করছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ।
পুনরায় ৫০৬ নম্বর রুমে যাওয়া হয়। কিন্তু অনেকক্ষন খোঁজার পরও কিছু না পেয়ে অনিলাভ এবং জয়ন্ত বুঝতে পারে রহস্য অন্য কোথাও রয়েছে। এবার তারা ৫০৫ এবং ৫০৭ নম্বর রুমে যায়। আশ্চর্যভাবে এই ঘরের জানলা থেকেও ২১২ নম্বর রুমের ভিতরটি পরিষ্কার দেখা যায়। তারা অবাক হয় এটা ভেবে যে এই বিষয়টি আগেরবার কেন তাদের মাথায় আসেনি। পুনরায় গেস্ট রেজিস্টার খোলা হয়। খুনের রাতে ৫০৫ এবং ৫০৭ নম্বর রুমে কারা ছিল তা দেখা হয়। ৫০৫ নম্বর রুমে একটি কাপল ছিল। এবং ৫০৭ নম্বর রুমে ছিল একজন মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক। তারা সবাই পশ্চিমবঙ্গের বাইরের লোক।
জয়ন্ত ঠিক করে হোটেলের স্টাফদের জিজ্ঞাসাবাদ করবে। একজনকে ডাকা হয়। ২৫-২৬ বছরের একটি ছেলে। সে ঘর পরিস্কার করে। তাকে জিজ্ঞেস করা হয় ৫০৫ নম্বরের ছেলে-মেয়ে দুজন কেমন লোক ছিল। উত্তরে সে জানায় তারা খুব ভালো ছিল। মেয়েটি সব সময়েই হেসে হেসে তার সাথে কথা বলত। ছেলেটিও ভালো কারণ সে তাকে এক প্যাকেট সিগারেটও দিয়েছিল। আর ৫০৭ নম্বরের গেস্ট? ছেলেটি জানায় লোকটি খুনের দুই দিন আগে চেক-ইন করেছিল। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই বাইরেই থাকত। একটা ব্রিফকেস থাকত হাতে সব সময়। ছেলেটি এও জানায় যে লোকটি খুনের দিন বিকেলে ফিরে আসে। তারপর রিসেপশনে কল করে জানায় তার ঘর যেন কেউ এসে পরিস্কার করে যায়।
‘কিছু অস্বাভাবিক কিছু দেখেছিলে ঘরের ভিতর?’ জিজ্ঞেস করে জয়ন্ত।
‘অস্বাভাবিক কিছু দেখিনি। তবে একটা জিনিস বেক্ষাপা লেগেছিল’। ছেলেটি জানায়।
‘কী?’
‘লোকটির ব্রিফকেসটা খোলা ছিল। তাতে অনেক টাকা ছিল’।
‘আর কিছু?’
‘না আর কিছু না’।
তারপর কিছুক্ষন থেমে বলে, ‘ও আর একটা ব্যাপার’।
কী?’
‘লোকটা মাস্ক পড়া ছিল’।
‘মাস্ক?’ জয়ন্ত জিজ্ঞেস করে।
‘আমি জিজ্ঞেস করি এখন তো করোনা চলে গেছে তাও মাস্ক পড়ে আছেন কেন?’ ছেলেটি কথাগুলি বলে এক নিশ্বাসে।
‘লোকটা কী বলে?’ জয়ন্ত একটু উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করে।
‘লোকটা বলে লোককে বোকা বানানোর জন্য পড়ি। এই বলে সে হাসতে থাকে। তারপর আমি ঘর পরিস্কার করে চলে আসি।’ ছেলেটি জানায়।
তখনই একটা কথা জয়ন্তের খেয়ালে আসে। শঙ্কর বলেছিল যে একটি মাস্ক পড়া লোক তাকে ২১২ নম্বরের জানলা খুলে দিতে বলেছিল। জয়ন্ত এবং অনিলাভ ভেবেছিল তা হয়ত বিকাশ সিং বা লোকেশ সিং এর মধ্যে কেউ একজন। সঙ্গে সঙ্গে রিসেপশনে গিয়ে গেস্ট রেজিস্টার চেক করে। নাম লেখা অনিল দেওয়ান। স্থান লেখা ইন্ডিয়া। কিন্তু একটা জায়গায় গিয়ে জয়ন্তর চোখ আটকে যায়। যে মোবাইল নম্বরটি দেওয়া রয়েছে সেটি হল যে নম্বরে অমিতাভ চৌধুরী কলকাতায় আসার পর যোগাযোগ করত। জয়ন্ত দুয়ে দুয়ে চার করে ফেলে। জয়ন্ত বুঝতে পারে সে প্রথমে ঠিক পথেই এগোচ্ছিল। অনিলাভের সাথে শলাপরামর্শ করে ঠিক করে যে তারা টিম নিয়ে নেপালে যাবে। এই রহস্যের বীজ যে নেপালে লুকিয়ে রয়েছে সে ব্যাপারে জয়ন্ত নিশ্চিত।
নেপালি চমক
নেপালে পৌঁছে নেপাল পুলিশকে সাহায্য নিয়ে মাধব ধানভির বাড়িতে পৌঁছায়। সেখানে পৌঁছে জানতে পারে মাধবের স্ত্রী তরন ভাণ্ডারী নামের একজন সাথে পালিয়েছে। তরনের সাথে মাধবের স্ত্রীর আগে থেকেই একটা সম্পর্ক ছিল। কিন্তু মাধব তা জানত না। জয়ন্ত কলকাতা থেকে মাধবকে ফোন করার কিছুদিনের মধ্যেই অনিতা তরনের সাথে পালায়। তরন মাধবদেরই প্রতিবেশি ছিল। পেশায় একজন হিসাবরক্ষক এবং একজন অ্যামেচার শুটার। তরন প্রায়ই ভারতে যেত। সব থেকে বেশি যেত কলকাতায়। মাধবের কাছ থেকেই তরনের ছবি পায় নেপাল পুলিশ। নেপাল পুলিশ জানায় তরন অনিতাকে সঙ্গে নিয়ে ভারতে পালিয়েছে এবং গা ঢাকা দিয়ে রয়েছে শিলিগুড়িতে। জয়ন্ত এবং অনিলাভ বুঝতে পারেন জাল তারা গুটিয়ে এনেছেন। শিলিগুড়িতে খবর যায় এবং একদিনের মধ্যেই তরন ভাণ্ডারী এবং অনিতা ধানভি ধরা পড়ে। জয়ন্ত এবং অনিলাভ নেপাল থেকে শিলিগুড়ি পৌঁছে গিয়েছিল। তারা দুজনকে অর্থাৎ অনিতা ধানভি এবং তরন ভাণ্ডারীকে কলকাতায় নিয়ে আসে। পুলিশ চাপ দিতে সে সব কথা স্বীকারও করে।
মোটিভ
তরন ভাণ্ডারী একজন হিসাবরক্ষক হলেও তার আসল স্বপ্ন ছিল অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করা। কিন্তু ভালো শুটার না হওয়ায় দেশ তাকে অলিম্পিকে পাঠায়নি। তাই তাকে বিভিন্ন রকমের কাজ করতে হয়। নেপালের একটি কোম্পানিতে কাজ করার সময়েই সে একজনের কাছে হিসাবরক্ষণ শেখে। কিন্তু কোনও ডিগ্রী না থাকায় কোথাও কোনো পূর্ণ সময়ের কাজ সে পায় না।
তার জীবনে পরিবর্তন আসে যখন গোল্ডেন বেঙ্গল এগ্রো প্রোডাকটস প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির মালিক ঝুনঝুনওয়ালা দুবাই থেকে নেপালে বেড়াতে আসে। সেই তাকে গোল্ডেন বেঙ্গল এগ্রো প্রোডাকটস প্রাইভেট লিমিটেড জয়েন করার পরামর্শ দেয়।
কিন্তু জয়েন করার কিছুদিন পর তরন ভাণ্ডারী বুঝতে পারে কোম্পানিটি আসলে একটি জাল কোম্পানি। কালো টাকা সাদা করে। মালিক দুবাইতে থাকাতে সে টাকা চুরি করতে শুরু করে। তাছাড়া তরনের একটা সুবিধা ছিল সে নেপালে বসেই ফোনে ফোনে সব কাজ করতে পারত। তাই ধরা পড়ার ভয় ছিলনা। তবে তাকে মাঝে মধ্যে কলকাতায় আসতে হত। টাকা সরানোর কাজটা তখনই হত। গোল্ডেন বেঙ্গল এগ্রো প্রোডাকটস প্রাইভেট লিমিটেডে কাজ পাওয়ার পর সে মাধব ধানভির বাড়ির পাশে একটি বাড়ি তৈরি করে। তাঁর পর পরই তার সাথে অনিতার আলাপ হয় এবং পরে তা বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কে পরিনত হয়।
কিন্তু ঝুনঝুনওয়ালার সন্দেহ হয় যে তরন তার কোম্পানি থেকে টাকা সরাচ্ছে। তাই সে অমিতাভ চৌধুরীকে নিয়োগ করে তার ব্যবসার কাগজপত্র একবার ঘেঁটে দেখার। কাগজপত্র ঘেঁটে অমিতাভ চৌধুরী ঝুনঝুনওয়ালাকে জানান যে তরন ভাণ্ডারী টাকা সরাচ্ছে। কিন্তু ঝুনঝুনওয়ালা তরনকে কিছু জানায় না যে সে তাঁর চুরি ধরে ফেলেছে। ঝুনঝুনওয়ালা বলে অমিতাভ চৌধুরী একজন ক্লায়েন্ট। তরন যেন তাকে সব রকমের সাহায্য করে। কিন্তু অমিতাভ চৌধুরীর প্রশ্ন এবং কার্যপ্রণালী দেখে তরন বুঝতে পেরে যায় অমিতাভ তাঁর সব কুকীর্তি ধরে ফেলেছে। খবর যাতে ঝুনঝুনওয়ালার কাছে না যায় তাই সে অমিতাভ চৌধুরীকে খুন করে।
খুনের রাতে কী হয়েছিল
ঝুনঝুনওয়ালার কাছ থেকে তরন যখন জানতে পারে একজন লোক রাঁচি থেকে কলকাতায় আসছেন ব্যবসার কাগজপত্র ঘেঁটে দেখার জন্য, তখন তাকেও নেপাল থেকে কলকাতায় চলে আসতে হয়। তারপর অমিতাভ কাগজপত্র নিয়ে হোটেলে চলে গেলে সেও নেপালে ফিরে যায়। তারপর খুনের দুইদিন আগে নেপাল থেকে কলকাতায় ফিরে আসে। সঙ্গে আনে অনিতার সিম এবং একটি বন্ধুক। অনিতা তরনকে ভালবেসে ফেলেছিল। মাধবকে অনিতা ছাড়তে চাইছিল। তাই সে কিছু না ভেবেই তরনকে নিজের সিমটা দিয়ে দেয়। অনিতার সিম নিয়ে কলকাতায় আসে। প্ল্যান আসলে অমিতাভকে খুন করা এবং সেই খুনের দায় অনিতার ঘারে চাপানো। কলকাতায় ওঠে গডস নেসট হোটেলে। আসলে তরন আগে থেকেই জানত যে অমিতাভ প্যারাডাইস হোটেলে আছেন। তাই গডস নেসটে রুম নেওয়াটাই তার কাজের জন্য উপযুক্ত হবে বুজতে পারে। কলকাতায় ফিরে অনিতার নম্বর দিয়ে ফোন করে অমিতাভকে জিজ্ঞেস করে সব ঠিক আছে কিনা। অমিতাভ তখনই তরনকে জানায় সে তাঁর সব জালিয়াতি ধরে ফেলেছেন। তরনের রাগ আরও তীব্র হয়।
কিন্তু কলকাতায় এসে তরন অমিতাভের কাজে সাহায্য করতে শুরু করে। অমিতাভকে বুঝতে দেয় না যে সে তাকে খুন করতে চলেছে। অমিতাভ ভাবে তরন হয়ত ভয় পেয়ে গেছে। তরনের ব্যবহারের পরিবর্তন দেখেই অমিতাভ তাঁর কাছ থেকে এসি সারাইয়ের লোকের খোঁজ করেন। তরন এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। নিজে উঠেছিল গডস নেস্টের ৫০৭ রম্বর রুমে। প্রথমে রেকি করে নিয়েছিল কোন ঘর থেকে খুন করা সহজ হবে। ৫০৬ নম্বরে লোক থাকায় ৫০৭ নম্বর রুম তাকে নিতে হয়েছিল। কিন্তু মুশকিল বাদে যখন সে দেখে অমিতাভ জানলা খোলে না। তাই যখন এসি সারাইয়ের প্রসঙ্গটি আসে তখন সে ঠিক করে সে শঙ্করকে বলবে জানলাটা খুলে দিতে। তরন শঙ্করকে চিনত না। গুগুলে নম্বর পেয়েছিল। সে অনিতার নম্বর থেকেই শঙ্করকে বলে প্যারাডাইস হোটেলে যেতে। হোটেলে ঢোকার মুখে শঙ্করকে আটকায় এবং তাঁর হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে বলে জানলাটা খুলে দিতে। তারপর দ্রুত হোটেলে ফিরে যায় এবং দেখে ২১২ নম্বরের জানলা খোলা। বন্ধুক তার কাছে ছিলই। তাছাড়া একসময় সে অনেক শুটিং কম্পিটিশনে অংশগ্রহনও করেছিল নেপালে। তাই হাতের টিপ তাঁর ভালোই। তারপর আলো বন্ধ করে, জানলায় বন্ধুক বসিয়ে অমিতাভ চৌধুরীকে সে খুন করে।
অনিলাভ সেন ভেবেছিল বিকাশ সিং এবং লোকেশ সিং খেলার ছলেই খুনটা করে ফেলেছিল। কিন্তু জয়ন্ত যখন দ্বিতীয়বার গিয়ে দ্বিতীয়গুলি দেখতে পান তখন সে এবং অনিলাভ বুঝতে পারেন যে বিকাশ সিং এর বন্ধুক থেকে বেরনো গুলি দেয়ালে আটকে ছিল। যেটি জয়ন্ত সেনগুপ্ত পরে খুঁজে পান। কিন্তু তরন ভাণ্ডারীর গুলি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছেছিল। অর্থাৎ অমিতাভ চৌধুরীর হৃদয়। যে গুলি আর কেউ কোনওদিন খুঁজে পাবেনা।
