হাতছানি
হাতছানি
অমিত একজন গিগ ওয়ার্কার। সে বাড়ি বাড়ি জিনিসপত্র ডেলিভারি করে। কাজের সময় দুপুর দুটো থেকে রাত সাড়ে এগারোটা। তাঁর বাড়ি শহরের কিছুটা বাইরে। কিন্তু তাঁর সব ডেলিভারি শহরের ভিতর থাকে। তাই কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় একটা বেজে যায়। বাড়িতে বউ খাবার ঢাকা দিয়ে রেখে দেয়, অমিত ফিরে খেয়ে শুয়ে পড়ে। এই ভাবে অমিতের দিন কেটে যায়। তাতে অমিতের কোনও রাগ বা দুঃখ নেই। তবে টাকাটা একটু বেশি পেলে ভালো হত। কারণ সে সবে বিয়ে করেছে। নতুন বউয়ের শখ-আহ্লাদ তাকেই পূরণ করতে হয়। তাই তাঁর অনেক টাকার দরকার।
তবে তাঁর একটা জিনিস এই কাজের ভালো লাগেনা - দেরিতে কাজ শেষ হওয়া। বাড়ি ফিরতে ফিরতে অনেক দেরি হয়ে যায়। সাইকেল চালিয়ে সে বাড়ি ফেরে। বাড়ি ফিরে বউয়ের সাথে বিশেষ কথা বলা হয় না। কারণ বউ ঘুমিয়ে থাকে। অমিতও খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। তাছাড়া ওঁর বাড়ি ফেরার পথটা একদম ভালো লাগেনা। বড় রাস্তা থেকে যে সরু রাস্তাটি তাঁর বাড়ির গলিতে ঢোকে সেখানে একটা পুরনো বাড়ি রয়েছে। বহু পুরনো বাড়ি। এক জমিদারের বাড়ি ছিল কোনও এক সময়ে। এখন তাঁরা কেউ থাকে না এখানে। পরিবারের সকলে বিদেশে থাকে। বাড়িটার একটা দুর্নাম রয়েছে। ঐ বাড়িতে ভুত আছে। তাই বাড়িটার পাশ দিয়ে যেতে দিনের বেলাও অমিতের ভয় করে। তাই সে যখনই বাড়িটার কাছে আসে তখন সাইকেল জোরে চালাতে থাকে।
সেদিন দুপুরবেলায় সে খেয়ে দেয়ে কাজের জন্য বেড়িয়েছে দেখে একটা ভিখিরি ঐ পুরনো জমিদার বাড়িটার সামনে বসে খাবার খাচ্ছে। লোকটাকে দেখে অমিত অবাক হয়ে যায়। কারণ পারতপক্ষে ঐ বাড়ির সামনে কেউ যায়না। খাওয়ার কথা তো ভাবাই যায় না। লোকটির পরনে একটি সাদা গেঞ্জি এবং হাফ প্যান্ট। লোকটির সামনে গিয়ে অমিত সাইকেলটা থামায়। লোকটিকে ভালো করে দেখে। একবার বাড়িটার দিকে তাকায়। তারপর অস্বাভাবিক কিছু না খুঁজে পেয়ে চলে যায়।
রাতে অমিতের কাজ শেষ করতে করতে অনেকটাই দেরি হয়ে যায়। কাজের খুব চাপ ছিল। যখন কাজ শেষ করে বেরয় তখনই সোয়া বারোটা বাজে। শহর ছেড়ে পাড়ায় যখন ঢোকে তখন ঘড়ির কাঁটা একটা ছাড়িয়েছে। কিন্তু গলির মুখে ঢুকেই সে থমকে যায়। সাইকেলটা থামিয়ে দেয়। দূর থেকে দেখতে পায় দুপুরের ভিখিরিটা এখনও ঐ বাড়িটার সামনে বসে রয়েছে এবং খাবার খাচ্ছে। যেন অবিকল সকালের চিত্র। অমিত ঠিক করে এবার আর সে বাড়িটার সামনে গিয়ে দাঁড়াবে না। সে জোরে সাইকেল চালাতে শুরু করে।
তাঁর সাইকেল ধীরে ধীরে এগোতে থাকে। যখন তাঁর সাইকেল কিছুটা কাছে চলে এসেছে তখন লক্ষ্য করে ভিখিরিটি উঠে গিয়ে বাড়িটির ভিতরের দিকে চলে যাচ্ছে। কিন্তু যে মুহূর্তে অমিতের সাইকেল বাড়িটির সামনে পৌঁছেছে তখনই সাইকেলের চেইন পড়ে যায়। স্বাভাবিকভাবেই সাইকেল থেমে যায়। অমিত সাইকেল থেকে নেমে পড়ে এবং সাইকেলের চেইন লাগানোর চেষ্টা করতে থাকে। তখনই আড়চোখে দেখতে দেখতে পায় একটা লোক, ভিখিরিটা বোধহয়, কারণ সে ছাড়া আর কে থাকবে ভিতরে, তাঁকে দূর থেকে হাত নেড়ে ডাকছে। অমিত কিছুক্ষন সেইদিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর আবার চেইন লাগানোতে মনোনিবেশ করে। কিন্তু বার বার চেষ্টা করার পরও চেইন লাগতে চায় না। অমিত ভাবতে থাকে এরকম তো কখনও হয় না। ওদিকে বাড়িটার ভিতর থেকে সেই হাত তাঁকে বাড়ির ভিতরে যাওয়ার জন্য ডেকেই চলেছে।
ঠিক তখনই এমন একটি ঘটনা ঘটে যার ফলে অমিতের গা-হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যায়। চেইনটা আপনাআপনি পুরো খুলে মাটিতে পড়ে যায়। এটি কীভাবে ঘটে তা বুঝেই উঠতে পারে না অমিত। সে চেইন লাগানোতে সিদ্ধহস্ত। সে ঠিক করে সাইকেল ফেলে বাড়ি চলে যাবে। যা হওয়ার পরের দিন সকালে দেখা যাবে। কিন্তু যে মুহূর্তে সে বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করে, তখনই বুঝতে পারে সে বাড়ির দিকে হাঁটছে না। উল্টে সেই ভুতুড়ে পুরনো বাড়িটার দিকে হাঁটছে। কিছুক্ষনের মধ্যেই সে ভাঙ্গা গেট পেরিয়ে ভিতরে ঢুকে যায় এবং হাঁটতে থাকে।
এদিকে হাতছানি তখন তীব্র হয়েছে। যেন আরও জোরে ডাকছে। সে যেন কিছু দেখাতে বা বলতে চায়। তাঁর যেন তাড়া আছে। অমিত এক অমোঘ আকর্ষণে এগিয়ে যেতে থাকে সেই হাতছানির দিকে। কিছুটা এগিয়ে গিয়ে বুজতে পারে ওটা কোনও হাত নয়। আসলে একটা গেঞ্জির হাত। হাওয়ায় দোলা লাগার ফলে দূর থেকে মনে হচ্ছিলো যেন কেউ হাত নেড়ে ডাকছে।
বুঝতে পেরে অমিতের ভয় কিছুটা দূর হয়। সে পাশের একটা উঁচু জায়গায় বসে পড়ে এবং কিছুটা ধাতস্ত হয়। ঠিক তখনই তাঁর মনে পড়ে তাহলে ভিখিরিটা কোথায় গেল? অমিত আবার কিছুটা ভয় পেয়ে যায়। তখন তাঁর মনে পড়ে যে গেঞ্জিটাকে দূর থেকে দেখে ভয় পেয়েছিল সেটা তো ঐ ভিখিরিটা পড়ে ছিল। কিছুক্ষন আগেও সে লোকটিকে এই গেঞ্জিটা গায়ে দেখেছিল। কী হলো ব্যাপারটা। তারপর অমিত ভাবে এইসব ভেবে তাঁর লাভ কী? আছে কোথাও ভিতরে ভিখিরিটা। সে উঠে পড়ে এবং বাড়ি যাওয়ার জন্য এগোতে থাকে।
ঠিক তখনই তাঁর একটা কথা মনে পড়ে। সে ওখানে এলো কীভাবে? তাঁর তো বাড়ি যাওয়ার কথা। এই কথা যখন সে ভাবতে থাকে তখন তাঁর মনে হয় কেউ যেন তাঁর পিছনে দাড়িয়ে রয়েছে। ভয়ে কাঁটা হয়ে যায় তাঁর সারা শরীর। ঘুরে তাকানোরই সাহস হয় না । অমিত চোখ বন্ধ করে ফেলে। চোখ বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গেই সামনে অনেকগুলো দৃশ্য ভেসে উঠতে থাকে। দেখতে পায় ভিখিরি লোকটি একটি পুরনো বাড়ির তলায় বসে আছে এবং খাবার খাচ্ছে। ঠিক তখনই বাড়ির ওপর তোলার কিছুটা অংশ তাঁর ওপর ভেঙে পড়ে এবং লোকটি মারা যায়। তারপর থেকে সে ভুত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে কাউকে ক্ষতি করে না। তাঁর একটাই দাবী- কেউ যেন তাঁর কাহিনীটা জানে।
তাই সে অনেকদিন ধরে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছে একজন মনের মতন লোকের খোঁজে যাকে সে তাঁর গল্পটা বলতে পারবে। কিন্তু কারোর ওপর সে ভর করতে পারে না। তাই সকালে যখন অমিত দাড়িয়ে তাঁকে একবার দেখে তখন সে বুঝতে পারে যে অমিত বাকিদের মতন নয়। তখনই ঠিক করে আজ রাতে সে চেষ্টা করবে অমিতকে নিজের গল্প বলার। তাই যখন অমিত রাতের বেলায় ফিরছিল সে অমিতকে বশ করে।
ঠিক তখনই অমিতের চোখ খুলে যায়। চোখ মেলে দেখে সে নিজের বাড়ির বিছানায় শুয়ে আছে। বউ সামনে দাড়িয়ে আছে। উঠে বসে জিজ্ঞেস করে, ‘কী হয়েছে?’ বউ উত্তর দেয়, ‘মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলে ঐ পুরনো বাড়িটার বারান্দায়’। অমিতের সব কথা মনে পড়ে ধীরে ধীরে। বউ তখন জিজ্ঞেস করে, ‘কিন্তু তুমি ওখানে গিয়েছিলে কী করতে?’ অমিত কোনও উত্তর দিতে পারে না। উল্টে জল খেতে চায় বউয়ের কাছ থেকে। জল খেতে খেতে বলে অমিত বউকে জানায় ‘আমি ভুল করে ওখানে চলে গেছিলাম। কিন্তু আমাকে ওখানে কে খুঁজে পেল।’
কিন্তু এরপর যা বউ বলল, তা শুনে অমিত ফের একবার অবাক হয়ে যায়। বউ জানায়, ‘একটা ভিখিরি এসে আমায় বলে যে তুমি ওখানে পড়ে আছো। আমি শুনে পাড়ার ছেলেদের জানাই। ওরাই গিয়ে তোমাকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে আসে’। অমিত জিজ্ঞেস করে, ‘ভিখিরিটাকে কেমন দেখতে?’
বউ উত্তর দেয়, ‘কেমন দেখতে বলতে পারব না। একটা সাদা গেঞ্জি আর একটা হাফ প্যান্ট পড়ে ছিল’।

