সংসার সীমান্তে পর্ব এক
সংসার সীমান্তে পর্ব এক
- সিগারেট আর পত্নী খারাপ হতেই পারে না ; যতক্ষণ না তা'তে অগ্নিসংযোগ করা হচ্ছে।
- কি বলতে চাইছেন , খুলে বলুন তো !
পটকা ভীষণ বিরক্তি প্রকাশ করে। কাকাবাবুর কাছে এসেছে স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে। দেখা হলেই খিটিমিটি লেগে যাচ্ছে। ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে অভয়ঙ্কর বাবুর কাছে নালিশ করতে এসেছিল । বাবার অবর্তমানে তিনিই তো তাদের গার্জেন । মা রুক্মিণীদেবী সাফ বলে দিয়েছেন - স্বামী-স্ত্রীর মনোমালিন্য তাদের নিজেদের মিটিয়ে নিতে হবে। এ বিষয়ে তিনি কোন হেল্প করতে পারবেন না।
সেইজন্য অথেনটিক গার্জেনের নিকট এসেছে এর বিহিত করতে । আর তিনিই কি না এখন ধর্মকথা শোনাচ্ছেন ! ক্ষুব্ধ পটকা বিস্ময়ের সঙ্গে প্রশ্নটা করে বসে।
অভয়ঙ্করবাবু নি:সন্তান । পটকাকে তিনি পুত্রস্নেহে মানুষ করেছেন । পরিচিত জনের মেয়ের সাথে আদরের পটকার বিয়ে দিয়েছেন । তাঁর কাছে ঐশী মানে পটকার বউ বড় আপনার । মা সম্বোধন ছাড়া কখনও বউমা বলে ডাকেন না । অবশ্য পটকাকে তিনি কোন অংশে কম ভালবাসেন না।
আগেকার দিনের শিক্ষিত মানুষ। এখনকার মত প্রতিযোগীতার বাজারে লেখাপড়া শিখেননি। দস্তুরমত নিজের জ্ঞান বুদ্ধির দৌড়ে রিসার্চ করে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেছেন। রীতিমত প্রতিযোগীতায় নেমে বন দপ্তরের রেঞ্জার পদে চাকরি করে সদ্য অবসর নিয়েছেন । পটকাও অবশ্য ছেলে হিসেবে খুবই ভালো। লেখাপড়াও মন্দ নয়। মাস্টার্স করে শহরের একটা স্কুলে প্রধান শিক্ষকের পদ অলংকৃত করে আছে।
পটকার আসল নাম বৈদূর্য্য সরকার। ছেলেবেলা থেকে মাছ খেতে খুব পছন্দ করত। মাছের চেয়েও মাছের পটকা খেতে খুব ভালবাসত। বাড়িতে বাঁধা কপির তরকারি হলে মাছের চর্বি, পটকাসমেত গোটা মুণ্ডুটা তাকেই দিতে হত। সেজন্য অভয়ঙ্করবাবু ওকে পটকা বলে ডাকতেন । ওনার অগ্রজ স্বর্গীয় কিঙ্কর সরকার এ নিয়ে কত মস্করা করতেন। আবার পটকারও নামটা ভীষণ পছন্দ হয়ে গেছল। পটকা বলে ডাকলেই দিব্যি সাড়া দিত । যাই হোক, বৈদূর্য্য সেই থেকে পটকাই হয়ে গেল । ডাকনামটা এখন এমন ভাবে প্রচলিত হয়ে গেছে যে ওর মা রুক্মিণী দেবীও পটকা নামে ডাকতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন ।
এ হেন পটকা ওরফে বৈদূর্য্য কাকাবাবুর মুখে এমন কথা শুনে একটু অবাকই হয়ে গেল । এই কি তাঁর স্নেহের নমুনা !
বলল - কি বলতে চাইছেন আপনি ? খুলে বলুন তো !
কাকাবাবু একটু হাসলেন । বললেন - যা না মাকে গিয়ে বল ! উনি কি বলেন দেখি !
পটকা বলল - গিয়েছিলাম। মা বলে দিয়েছে স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়াতে উনি নাক গলাবেন না ।
- ও তাই এসেছিস আমাকে বলতে। তা' উনি যখন দায়িত্ব নিলেন না; আমি কি করতে পারি বল !
- বুঝে গেছি । আপনারা আর আমার কোন উপকার করবেন না । ঠিক আছে, বউ যা বলবে সব শুনব; সব করব। তখন যেন আমাকে স্ত্রৈন বলবেন না !
গজগজ করতে করতে পটকা চলে গেল । অভয়ঙ্করবাবু ঐশীকে ডেকে ' কি হয়েছে মা ' জিজ্ঞেস করতেই ঐশীর চোখমুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল । বলল -
- কাকাবাবু, কিছু তো হয়নি !
- তা'হলে পটকা নালিশ করতে এসেছিল কেন ?
মুখ নীচু করে ঐশী বলল - কাকাবাবু ! সব বিষয়ে মাথা ঘামাতে নেই।
- উপদেশ দিচ্ছিস ?
এক ছুটে ঐশী পালিয়ে গেল । ছোট মুখে বড় কথা বলে দিয়েছে ; এবার না বাড়িতে কিছু গণ্ডগোল বাধে !
অভয়ঙ্করবাবু শুধু হাসলেন আর ঐশীর এভাবে পালিয়ে যাওয়াকে প্রচ্ছন্নভাবে মদত দিলেন ।
পটকা ঐশীকে বলল - তুমি হঠাৎ এভাবে রেগে গেলে কেন ? আমি কি এমন অন্যায় কথা বলেছি ?
- ও তুমি বুঝবে না । আর তুমি কেন - ছেলেরা ও সব বুঝতে চায় না। আমি ঠিক রেগে যাইনি ; শুধু তোমার কথার প্রতিবাদ করেছি মাত্র ।
- এ ভাবে কেউ প্রতিক্রিয়া দেয় ! তুমি তো জানো, স্কুলের কাজে চাপ থাকে আর তাই সবসময় সবদিকে নজর দিতে পারি না। বিশেষত বাড়ির কাজে । সবার আগে স্কুলে পৌঁছতে হয়; তবেই না অন্যের বিলম্বকে কটাক্ষ করতে পারি । তেমনিই সবার শেষে স্কুল ছেড়ে বাড়ি আসি । আমার একটা দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে তো ! নিয়মানুবর্তিতায় আমি কোন আপোষ করি না।
- ওরে বাবা রে ! আর জ্ঞান নিতে পারছি না । এবার একটু থামবে ? আমারও তো কিছু বলার থাকতে পারে - না কি ?
পটকা চুপ করে যায় । বলে - বল, শুনি ।
- মা বলছিলেন --
থামিয়ে দিয়ে পটকা বলে - কার মা ? আমার না তোমার ?
- উফ্ ! তোমার মা ! আমার মা তোমাদের নিয়ে অযথা মাথা ঘামান না।
- মাথা ঘামান না ? এই তো গতকালই ফোনে বললেন - একটি বার তো আসতে পার! কতদিন দেখিনা।
- তো এতে অন্যায়টা কি ?
- অন্যায় নয় ? জানেন এখন স্কুলে ক্লাস-টেস্ট চলছে তবু বলেন কি না-----
- আচ্ছা, ঠিক আছে। আমার কথাটা কি শুনবে ?
- সময় নেই। দশটা বেজে গেছে। এখন চলি , নইলে দেরী হয়ে যাব। ফিরে এসে সব শুনব।
পটকা চলে গেল । ঐশী শুধু একরাশ শুন্যতা নিয়ে গমনপথের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। কিন্তু একি ! কাকাবাবু আবার তার রুমের দিকেই আসছেন কেন ?
স্কুল থেকে ফিরতে ছ'টা বেজে যায় পটকার। সেদিনও মোটামুটি ছ'টা নাগাদ বাড়ি এসে হাত পা ধুয়ে ঐশীকে এক কাপ কফি করে দিতে বলে । কফি পান হলে ঐশী বলে - আজ দিনটা খুব সুন্দর ভাবে কেটেছে।
ক্লান্ত শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দিয়ে পটকা বলল - কার ? তোমার না আমার ?
- তোমার কথা বলতে যাব কোন দুঃখে ? আমি আমার কথা বললাম।
- ও: তাই বুঝি !
দুজনে আর কোন কথা হয় না। বেশ কিছু সময় পেরিয়ে গেলে ঐশী বলে - তোমার শরীর ঠিক আছে তো ?
- হুঁ ।
ছোট্ট একটা উত্তর দিয়ে পটকা প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে বলে - একটা কথা সকাল থেকে আমায় ভাবাচ্ছে জানো তো !
- কি কথা ?
- সকালে কাকাবাবু কেন বললেন সিগারেট আর পত্নী কখনও খারাপ হয় না ; যদি না তা'তে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
- ও: এই ব্যাপার ! তা' কাকাবাবু আমাকেও এই কথাটা বলেছেন । আমি কিন্তু মানেটা পরিস্কার বুঝতে পেরেছি !
- তাই নাকি ? কোথা' থেকে কি বলে দিলেন ; মাথামুণ্ডু কিছু বুঝিনি । বেশ কড়া উত্তর দিয়ে চলে গেলাম।
ঐশী হাসতে লাগল ।
- এই তোমার শিক্ষকতার নমুনা ? নিজেই বোঝো না; ছাত্রছাত্রীদের কি বোঝাও বল তো ?
- এই জন্যই তোমার সাথে আমার বনিবনা হয় না। কথায় কথায় শুধু টিপ্পনি কেটে যাও।
ঐশী হা হা করে হেসে উঠল ।
- এর মানে বুঝলে পতিদেব ? একেই বলে ঝি মেরে বৌকে বোঝানো !
- হেঁয়ালি কোরো না !
পটকা ঝাঁঝিয়ে উঠল ।
ঐশী বলল - কাকাবাবু বলতে চেয়েছেন সিগারেটে আগুন না দিলে ধোঁয়া টানতে পারবে না। ততক্ষণ ওটা তোমার কোন ক্ষতি করে না ; যেই আগুন সহযোগে সুখটান দিলে - ওর ভেতরের তামাক থেকে সব নিকোটন তোমার ফুসফুসে চলে গেল এবং সেখানে জমা হতে থাকল । ক্রমে ওই জমানো নিকোটন রক্ত সঞ্চালনে
প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে আর ধূমপায়ীদের সমূহ ক্ষতি করে।
- সে তোমাকে বোঝাতে হবে না । সায়েন্স নিয়ে পড়েছি। ও কথা আমিও জানি। শুধু বুঝলাম না সিগারেটের সঙ্গে পত্নীর কি সম্পর্ক ? এটা কেন বললেন ?
ঐশী হাসতে লাগল । বেশ বিদ্রুপ সহকারে স্বামীকে বলল - সম্পর্ক আছে। সিগারেটে আগুন ধরানো আর বউকে রাগিয়ে দেওয়া মানে উত্তাপ বাড়ানো ছাড়া অন্য কিছু নয় ।
- ওওওও ! কাকাবাবুরতো দেখছি তোমার উপর বেশ দরদ !
- হবে না ? আমি যে ওঁর মেয়ের মত ।
- মেয়ের মতো !
পটকা বলল - মেয়ে তো নও ! মা আর মাসী কি এক হল ?
- অতশত জানি না বাপু । সাদা মনে যা বুঝেছি তাই বললাম । যাক । এবার তো ঠাণ্ডা হও। খামোখা মাথা গরম করবে না।
পটকা আর কোন কথা বলল না । শুধু কাকাবাবুর প্রতি একটা প্রচ্ছন্ন ক্ষোভ যেন তার ভেতরে ঘুণপোকার মত কুরে কুরে খাচ্ছে ।
( চলবে )
