Manasi Ganguli

Abstract Inspirational Children

3  

Manasi Ganguli

Abstract Inspirational Children

তেরঙ্গার রেপ্লিকা

তেরঙ্গার রেপ্লিকা

6 mins
173



     আজ ১৫ই আগস্ট, স্বাধীনতা দিবস। গতকাল থেকেই বাড়িতে হইচই পড়ে গেছে। দীপকবাবু অফিস যাওয়ার সময় স্ত্রী রূপাকে বলে গেছেন, "রূপা, ফ্ল্যাগটা বার করে রেখো, সকালে যেন আবার 'কোথায় রেখেছি খুঁজে পাচ্ছি না' বোলো না। আর লাঠিটাও হাতের সামনে রেখো। কাল আবার খেলা আছে, রাতে আজ একটু তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ব, শরীরটাকে চাঙ্গা রাখতে হবে তো, কী বল!" রূপা হাসে, "ঠিক আছে, সব গুছিয়ে রাখব। ছেলেগুলোকে সব এখানেই কাল খেতে বলেছি, তাই আজ একটু রান্নার জোগাড়ও আমায় করে রাখতে হবে"। কিন্তু প্রতিদিনের মতোই অফিস থেকে ফিরতে দীপকবাবুর দেরীই হয়ে গেল, খেয়েদেয়ে তাড়াতাড়ি শোওয়া আর হল না। আবার ছুটিরদিন বলে সকালে গড়াগড়ি খাওয়াও হল না, উঠতে হল সকাল সকাল। সেই ছোট থেকে বাবার সঙ্গে স্বাধীনতার দিন ছাদে পতাকা তোলা অভ্যাস দীপকবাবুর। বাবা আজ নেই কিন্তু এবাড়ির ঐতিহ্য তিনি বজায় রেখেছেন। বাড়ির সবাইকে নিয়ে ছাদে গিয়ে পতাকা তুলে কপালে হাত ঠেকিয়ে স্যালুট করেন। তারপর বন্দেমাতরম গান গায় সকলে মিলে। এই বন্দেমাতরম মন্ত্রে যে কি আছে তার ব্যাখ্যা করতে পারবেন না তিনি কিন্তু সারাশরীরে শিহরণ জাগে এই মন্ত্র উচ্চারণে, চোখে জল এসে যায়।


স্কুল পেরিয়ে তন্ময় এবার কলেজ। বাড়িতে ফ্ল্যাগ হয়েস্টিং হয়ে গেলে বাবা-কাকার সঙ্গে পাড়ার ক্লাবে যায়। সেখানে পতাকা তোলা হয়। বাবা ক্লাবের প্রেসিডেন্ট হওয়ায় বক্তব্য রাখেন পতাকার নীচে দাঁড়িয়ে। স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর দাদুর ভূমিকা উল্লেখ করেন তিনি। দাদুর কাছে শোনা স্বাধীনতা সংগ্রামের কিছু অজানা রোমহর্ষক গল্পও শোনান। গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে সবার সেই বক্তব্য শুনে। তারপর প্রভাতফেরী হয় দেশাত্মবোধক গান গেয়ে। একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয় তন্ময়ের। আগস্টের এই ১৫ তারিখের গায়ে লেগে আছে কত রক্তের দাগ। কত ছোট প্রাণ, হয়েছে বলিদান। সেইসব বীর শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমাদের এই স্বধীনতা। ক্ষণিকের তরে তাদের জন্য চোখ ভিজে ওঠে। এরপর যে যার বাড়ি ফিরে যায়। সকাল ন'টায় যুদ্ধ শুরু। না, স্বাধীনতার যুদ্ধ নয়, সে তো করে গেছেন আমাদের বীরসৈনিকেরা, স্বাধীন ভারত তুলে দিয়েছেন ভবিষ্যতের হাতে। এ যুদ্ধ হল মাঠে। পায়ে বল নিয়ে, দু'পক্ষের ২২ জনের মধ্যে। প্রতিবছর স্বাধীনতাদিবসে ক্লাবের মাঠে থাকে ফুটবল খেলা। প্রবীণ বনাম নবীন। তন্ময় এবারে প্রথম খেলার সুযোগ পেয়েছে নবীন দলে।


দলের ১১জনের সাতজন ওরা খুব বন্ধু। খেলার জন্য গত কয়েকদিন ধরেই খুব উত্তেজিত, টগবগ করে ফুটছে সব। নিজেদের মধ্যে কত আলাপ-আলোচনা চলছে জেতার জন্য। রেফারির বাঁশি বাজতেই ছুটোছুটি শুরু হল মাঠ জুড়ে। দু'দিন আগের বৃষ্টিতে মাঠ বেশ ভিজে রয়েছে তখনও, তাইতে আছাড় খেয়ে পড়ছে কেউ কেউ। মাঠের চারপাশ ঘিরে দর্শক। পাড়ার সব ছেলে, মেয়ে, বুড়ো, বউ সবাই বেরিয়ে এসেছে খেলা দেখতে। গোল হলে সেই দলের সমর্থকরা চিৎকার করে উঠছে মাঠের বাইরে থেকে, "গোওওওওল"। উত্তেজনা মাঠের ভেতর, উত্তেজনা বাইরে। ছোটদের উদ্যম বেশি, দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মাঠ জুড়ে। প্রথম গোলটা বড়রা খেলো। ছোট ছোট ছেলেপুলেদের সঙ্গে তাদের মায়েদের হাততালিতে ফেটে পড়ল চারিদিক। খুব খুশি ছোটরা, বড়রাও ছিল তক্কেতক্কে। ছোটরা খুশির দাপটে একটু ঢিলে দিয়েছে কি পটাপট দুই গোল। আর গোল শোধ করতে পারেনি ওরা। উদ্যম বেশি থাকলে কী হবে, বড়দের অভিজ্ঞতার কাছে হার মানতে হল শেষমেশ। খুব মুষড়ে পড়ল ওরা। এরমধ্যে মাঠ ছাড়ার আগে কাকার টিপ্পনী "হেরো, হেরো"। তারপর বলেন, "আজকে খবরের শিরোনাম, প্রবীণদের কাছে নবীনদের শোচনীয় পরাজয়"। ছেলেরা মুখ কালো করে যে যার ঘরে ফেরে।


আজ তন্ময়দের বাড়ি ওর বাকি ছয়বন্ধুর নিমন্ত্রণ। তন্ময়ের মা রূপাকাকীমা খুব ভালো রান্না করেন, নিত্যনতুন আইটেম। তাই ওর বন্ধুরা রূপাকাকীমা ডাকলে খুব খুশি হয়। কিন্তু আজ এই পরাজিত সৈনিকের মতো মুখ নিয়ে কাকীমার সামনে দাঁড়াতে ওদের খুব কুন্ঠাবোধ হচ্ছে। যদি জিততে পারত খুব আনন্দ করে যেত নিমন্ত্রণ খেতে। একা একা যেতে দ্বিধা বোধ হচ্ছে ওদের, তাই সবাই মিলে একসঙ্গেই গেল তন্ময়দের বাড়ি। সবার মুখ চুণ। গিয়েই পড়বি তো পড় কাকার সামনে। মুচকি হেসে বললেন, "আরে হেরোরা আজ দলবেঁধে যে"। তন্ময় এসে বাঁচাল, বলল, "চল সবাই আগে ছাদে চল"। সবাই ছাদে চলল তন্ময়ের পিছন পিছন, বুঝতে পারছে না কেন। ছাদে গিয়ে দেখে শেডের নিচে মুনিয়াপাখির খাঁচাটা রয়েছে, রঙবেরঙের মুনিয়াপাখি সেখানে। তন্ময়ের বায়নায় কিনে দিয়েছিলেন বাবা ওর ছোটবেলায়। এখন ও বড় হয়েছে। বলে, "আজ স্বাধীনতাদিবসে ওদের আমরা সবাই মিলে স্বাধীনতা দিই আয়"। খাঁচার দরজা খুলে হাত ঢুকিয়ে একটাকে বার করে বলল, "যা, এই আকাশে তোদের মুক্তি দিলাম আজ"। সবাইকে বলল, "একটা করে ধরে ছেড়ে দে অসীম আকাশে। বাইরে গিয়ে মনের খুশিতে উড়ে বেড়াক ওরা গাছ থেকে গাছে স্বাধীনভাবে"। ওর দু'চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে তখন। কতবছর ধরে রয়েছে ওদের বাড়ি, বড় মায়া। একটা আবার উড়ে এসে ওর কাঁধে বসল, কেউ ছাদের কার্নিশে। ওকে ছেড়ে যেতে তাদেরও মন কাঁদছে তখন। কিছুক্ষণ পর ওরা উড়ে গিয়ে বাগানের আমগাছে, জামরুলগাছে বসল। তন্ময় সবাইকে নিয়ে নিচে এল।


এরপর তো ছেলেদের জন্য চমক অপেক্ষা করছিল। ট্রেতে করে রূপা মকটেল নিয়ে এল সবার জন্য। প্রতিটি গ্লাসের নিচের একভাগ সবুজ, মাঝে সাদা, ওপরের একভাগ গেরুয়া। কুচিকুচি ন্যাসপাতি দিয়ে নিচে ম্যাঙ্গো পান্না দেবার পর মাঝে আপেলের টুকরো দিয়ে সেখানে লেমন স্কোয়াশ আর ওপরে পাকা আমের কুচি দিয়ে রাইপম্যাঙ্গো স্কোয়াশ ঢেলে বানিয়েছে। সবকটা স্কোয়াশই রূপার নিজের হাতে তৈরি গাছের আম আর লেবু দিয়ে। ছেলেদের মুখে কথা সরে না। রূপা সন্তর্পণে একটা করে গ্লাস ওদের হাতে ধরিয়ে দিল সঙ্গে সরু লম্বা লম্বা ফর্ক, ফলগুলো তুলে খাবার জন্য। স্বাধীনতাদিবসে জাতীয় পতাকা সবার হাতে, এখন সবাই বিজয়ী। পরাজয়ের গ্লানি আর নেই কারো চোখে-মুখে। একটু আগেই ছাদে পাখিদের মুক্তি দিয়ে এসেছে আর এখন সবার হাতে জাতীয় পতাকা। সবার মুখ উজ্জ্বল, চোখে-মুখে হাসির ঝিলিক। চুমুক দেবে কী, সবাই গ্লাস হাতে ছবি তুলতে ব্যস্ত। সবাইকে দেখাতে হবে তো। এরপর মুখের সামনে ধরে একটা চুমুক দিয়েই আরামে চোখ বুজে গেল ওদের। "হাউ রিফ্রেশিং, কাকীমা"। রূপার মুখে হাসি। এইটুকুর জন্যই তো এত পরিশ্রম। সবাই খেয়ে খুশি হবে, তারিফ করবে ওর রান্নার, তাইতো খেটে মরে রাতদিন। ছেলেরা কাকীমার তারিফ করতে লেগে গেল। কবে কী খেয়েছিল কাকীমার হাতের রান্না, সেইসব। ছেলেদের কলকাকলিতে ঘর মুখর হয়ে উঠল।


    উদ্যমে ঝলমলে ছেলেগুলো এলে রূপার মনটা খুব ভাল হয়ে যায়। রান্না করতে ও খুব ভালবাসে আর খাওয়াতেও। আর এই নিত্যনতুন রান্না করাটা ওর নেশা। খাবার সময় ওদের সাতবন্ধু আর ছোটকাকাকে একসঙ্গে টেবিলে বসায় রূপা। কাকা তো বসেই, "এই যে হেরোর দল, বসে পড়েছ?" বলে মিটমিট করে হাসতে থাকেন। রূপা তেড়ে আসে, "মাঠের খেলা, মাঠেই শেষ হয়ে গেছে ছোটন, খাবার টেবিলে মোটেই ওদের পিছনে লাগা চলবে না। আঠারো বছরের তরুণ তুর্কী ওরা, ওদের সবার ভোটাধিকার হয়ে গেছে। ওরাই দেশের ভবিষ্যৎ। ছেলেরা হাততালি দিয়ে ওঠে, "ঠিক হয়েছে, কাকা বকুনি খেয়েছে"। রূপা এবার খাবার পরিবেশন করার জন্য কুকারটা টেবিলে বসায়। আগেই বাটিতে বাটিতে সবার আলাদা করে এসে গেছে চিংড়ির মালাইকারি, আর চিকেন চাঁপ। ছেলেরা সবাই এবার কুকারের দিকে তাকিয়ে, নতুন কী বেরোয় সেখান থেকে। পোলাও, বিরিয়ানি, ফ্রায়েড রাইস নাকি ইনোভেটিভ অন্য কিছু! জিজ্ঞেস করতে রূপা বলে, "সারপ্রাইজ"। এরপর সাদা বোনচায়নার প্লেটে রূপা এক এক করে পোলাও তুলে দিতে লাগল চামচ দিয়ে কেটে। "ওয়াও কাকীমা, হাউ নাইস, হাউ বিউটিফুল", বিস্ফারিত নেত্রে প্লেটের দিকে তাকিয়ে আছে ওরা সব। রূপা অতি সন্তর্পণে চামচ কুকারের ওপর থেকে নিচ অবধি চালিয়ে প্রত্যেকের পাতে যখন তা পরিবেশন করল সবাই দেখল তাদের সাদা থালায় শোভা পাচ্ছে একটুকরো জাতীয় পতাকা। চালের মধ্যে ফুড কালার মাখিয়ে সেভাবেই লেয়ার করে রান্না করেছে রূপা আজ। আজই প্রথম এই তেরঙ্গা পোলাও রান্না তার। আর এই ইনোভেটিভ রান্নায় আজ সে সাকশেসফুল। ছেলেরা সমস্বরে, "থ্রি চিয়ার্স ফর কাকীমা, হিপ হিপ হুররে" বলে হই হই করে উঠল। তাদের মুখের কালো কাকীমার কাছে এসে কখন যেন উধাও হয়ে গেছে। বলে, "কাকীমা খেতে ইচ্ছা করছে না, এরকমই সাজানো থাক"। "পাগল ছেলে", বলে হাসে রূপা। ছবি উঠল আবার, প্লেট হাতে কাকীমারও। "নাও আজ তোমরা কেউ পরাজিত নও, স্বাধীন ভারতের স্বাধীন নাগরিক। জয়ী তোমরা সবাই। আমাদের দেশের কত ছোট ছোট ছেলের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া আমাদের এই স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা দিবসে কেউ আমরা মুখ কালো করে থাকব না, তাতে তাদের অসম্মান করা হয়। তাদের মৃত আত্মা কষ্ট পাবে"। এরপর তিনি বলে ওঠেন, "বন্দেএএমাতরম্"। ছেলেরা সবাই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে রূপার কন্ঠের প্রতিধ্বনির মতো বলে ওঠে "বন্দেএএমাতরম্"।


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Abstract