Madhuri Sahana

Abstract Crime Others

3  

Madhuri Sahana

Abstract Crime Others

শেকড়

শেকড়

4 mins
403



আতা গাছের দিকে তাকিয়ে বুচি দেখছিল আতাগুলো খাওয়ায় মত হয়েছে কিনা , আতা গাছে তেমন কিছু নেই , তাছাড়া আতা পাকার সময় এখনো হয়নি । বুচি খানিকক্ষণ আগে কিছুটা কলমি শাক তুলেছে পুকুর পাড় থেকে আর কটা কুচো মাছ তুলেছে ওর ছোট ছাকনা জাল দিয়ে , সেগুলো বাড়িতে নিয়ে যেতে যেতে বাগানে ঢুকে দেখল কিছু ফল পাকুর পাওয়া যায় নাকি ক্ষীদে লেগেছে । তেমন কিছু নেই তাই ঘরের পানে চললো রাস্তায় যেতে দেখে একটা কলার মোচা বেরিয়েছে , এখন এই মোচাটা কাটার ব্যবস্থা করতে হবে বুচি পা চালিয়ে ঘরে ঢুকলো , তারপর কলমি শাক আর কুচোমাছ নামিয়ে রেখে কাটারি নিয়ে গিয়ে মোচা শুদ্ধ কলাগাছটা কেটে টানতে টানতে নিয়ে এলো । বুচির ঠাকুমার তাড়াতাড়ি গাছটাকে কেটে টুকরো টুকরো করে থোড় আর মোচা আলাদা করে ঝুড়িতে ভরে রাখলো । বুচি ঠাকুমার কাছে খেতে চাইলে পান্তা ভাত আর আলু ভাতে এগিয়ে দিয়ে ‌কুচোমাছ গুলো ধুয়ে ভাজতে বসলো । সামান্য তেলে মাছ গুলো ভেজে তেঁতুলের টক বানিয়ে রাখলো , বুচি জলভাত দিয়ে মাছের টক খেতে ভালো বাসে । বেলা পড়লে হাটে গিয়ে কলমি শাক আর মোচা, থোড় বিক্রি করে কটা টাকা পাওয়া যাবে । স্টেশনের কাছে একটা ঝুপড়ি ঘরে বুচি ঠাকুমার সঙ্গে থাকে ‌। বাজারে পুজোর ফুল বিক্রি করে ঠাকুমা ,সামান্য আয় হয় কোনো রকমে ওদের খাওয়া চলে । ওদের আশে পাশে কয়েকটি ঝুপড়িতে দিন আনা দিন খাওয়া লোকের বাস ।


কেউ ট্রেনে হকারি করে , কারো পান বিড়ির দোকান আবার কেউ সবজি বিক্রেতা । এদের বাচ্চারা কেউই স্কুল যায় না সারাদিন মাঠে ঘাটে ঘুরে ঘুরে দিন কেটে ।‌ প্রতিবছর এই সময় স্টেশনের সামনে যে মাঠটা আছে সেখানে যাত্রার আসর বসে । কলকাতার বড়বড় যাত্রা কোম্পানি আসে তাদের যাত্রা পালা নিয়ে । প্রায় সাতদিন ধরে চলে যাত্রা পালা । অনেক দামে টিকিট কেটে লোকজন আসে যাত্রা দেখতে । ঠাকুমা এসময় তেলে ভাজার দোকান দেয় , মাঠের পাশে টুলের উপর বসে লোহার কড়ায় গরম তেলে বেগুনী , ফুলুরী ভেজে বিক্রি করে । এই সময়ে ওরা কিছু টাকা বেশি রোজগার করে তাই দিয়ে ঘর সারায় , মুদির দোকানের টাকা মেটায় । এবার ঠাকুমা বুচিকে একটা গরম উলের সোয়েটার কিনে দেবে বলেছে । প্রতিবার ঠান্ডা পড়লে একজন ভুটানী শীতের ‌গরম সোয়েটারের দোকান করে স্টেশনের কাছে । লাল নীল হলুদ সবুজ অনেক রকম সোয়েটার পাওয়া যায় ভুটানী লোকটার কাছে । ঠাকুমা গতবছর একটা উলের তৈরি চাদর কিনেছিল ভুটানী লোকটার থেকে বেশ গরম হয় আর দেখতেও সুন্দর । ওরা মাটির আর বাঁশের বেড়া দেওয়া ঘরে থাকে কিছু টালি আর টিন দিয়ে ছাউনী দেওয়া ঘরে একটা খাটিয়া পাতা শীতকালে কম্বল মুড়ি দিয়ে বুচি আর ঠাকুমা ঘুমায় ।


গরম কালে মাটিতে মাদুর বিছিয়ে ঘুমায় । বুচির মা ছিল , যদিও বুচির মায়ের কথা মনে নেই ঠাকুমার কাছে শুনেছে । বুচির বাবা খুব শক্ত পোক্ত মানুষ ছিল রেলের লাইন সারাবার কাজ করত ঠিকাদারের কাছে । মাঝে মাঝে লাইনের কাজে অনেক দুরে দুরে চলে যেত , রেলের জমিতে এই ঝুপড়িটা বুচির বাবা বানিয়ে ছিল । একদিন এক আদিবাসী মেয়েকে ঘরে এনে তুলেছিল । বুচি সেই আদিবাসী মেয়ের সন্তান । বুচির বাবা রেলে কাটা পড়ে তখন বুচির জন্ম হয়নি , বুচির জন্মের দু'বছর পর ওর মা অন্য লোকের সঙ্গে চলে গেছে তারপর থেকেই বুচি ঠাকুমার কাছে আছে । ঠাকুমা বাজারে ফুল বিক্রি করে এখন বুচিও ঠাকুমার পাশে বসে ফুল বিক্রি করে । বুচিকে বাজারের সকলেই প্রায় চেনে । ছোট থেকেই বুচি বাজারের সকল দোকানিদের খুব আদর পেয়েছে , লজেন্স বিস্কুট ও কাকুদের কাছ থেকে হামেশাই ফ্রিতে খায় । স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় বাগানের গাছ থেকে ফল পেড়ে খায় এক দঙ্গল ছোট ছোট ছেলে মেয়ে ওর সঙ্গি সাথি , সারাদিন হৈচৈ করে ওর দিন কেটে যায় । ছোট বুচি আস্তে আস্তে বড় হয়ে উঠেছে কিন্তু ওর দুষ্টুমি কমেনি । এবার ঠান্ডা বেশ পড়েছে তাই খেজুর গাছের ‌রস খুব মিষ্টি হয়েছে এই রস বুচির খুব প্রিয় । খুব ভোরে উঠে ও খেজুরের রস পেড়ে খায়, এ অঞ্চলে অনেক খেজুরের গাছ আছে তাই খেজুর রস থেকে গুড় তৈরি করে হাঁটে বিক্রি হয় ।ঠাকুমা পাটালি গুড়ের খুব ভক্ত । একটুখানি দুধের সঙ্গে পাটালি গুড় থাকলে খুব খুশি । বুচির গড়নে ওর মায়ের আদোল আছে , গায়ের রং বেশ চাপা একমাথা রুক্ষ চুল কিন্তু স্বাস্থ্য পেটানো । ঠাকুমা গতবছর ভালো জামা কিনে দিয়েছিল পুজোর সময় এবার সেটা বেশ ছোটো হয়ে গেছে । আজকে ভোর বেলায় ও খেজুর গাছের দিকে যাচ্ছিল রস পাড়বে বলে তখনো ভালোকরে আলো ফোটেনি হঠাৎ পেছন থেকে একটা লোক ওকে জাপটে ধরে টেনে নিয়ে গেল খানিকটা বুচি প্রচন্ড জোরে লোকটাকে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে এসেছে । ভয়ে থরথর করে কাপছে বুচি ওর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে ঘরে ঢুকে খানিকটা জল খেল । লোকটাকে চিনতে পারেনি আস্তে আস্তে সকালের আলো ফুটছে , ঠাকুমা একটু পরে ঘুম থেকে উঠে পড়লো, বুচি শুয়ে আছে দেখে গায়ে চাদর দিয়ে ঢেকে দিল । বুচি আজকে সারাদিন ঘরের বাইরে বের হলোনা । ঠাকুমা জিগ্গেস করলো কি হয়েছে বুচি চুপ করে শুয়ে রইল । বাজারে থেকে চারটে ডিম কিনে এনে বুচিকে ঝাল ঝাল ডিমের তরকারি রান্না করতে বলে ঠাকুমা পুকুরে গেল । ফিরে এসে বুচিকে শুয়ে থাকতে দেখে চিন্তায় পড়ে গেল , বুচির অসুখ বিসুখ বেশি হয় না তবে আজকে ওর কিছু একটা সমস্যা হয়েছে গায়ে জ্বর নেই তবে কি হলো ?


ঠাকুমার একট হরি নাম সংকীর্তনের আখড়া আছে সেখানে গুরুমা‌ নানাভাবে মানুষের উপকার করেন , বুচিকে গুরুমায়ের কাছে নিয়ে গেলে হয়তো উনি কোন উপায় বলে দেবেন । বুচিকে সঙ্গে করে ঠাকুমা আখড়ায় গেলে গুরুমা বুচিকে জলপোড়া খাইয়ে দিল আর একটা শেকড় হাতে বেঁধে দিয়ে সাবধান করে দিলো বেশি বনে বাদাড়ে না যেতে কোন অশুভ শক্তির ছায়া পড়েছে বুচির উপর ।।


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Abstract