Madhuri Sahana

Inspirational


3  

Madhuri Sahana

Inspirational


"শিক্ষক"

"শিক্ষক"

3 mins 207 3 mins 207

মেরি স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলকাতার কলেজে ভর্তি হয়েছে , ওদের কলেজে প্রথম সেমিস্টার হয়ে গেছে দিন পনেরো ছুটি তাই বাড়িতে যাওয়ার জন্য গোছগাছ করছে । ওদের হোস্টেলে মেরি নামের আরেকটি মেয়ে আছে । ওকে ওরা আফ্রিকান মেরি বলে আড়ালে । ওর গায়ের রং গাঢ় কালো , হাসলে দাঁত গুলো ততধিক সাদা লাগে । খুব জলি আর নিরাভিমানী মেয়ে । কলেজের ছুটি তাই হোস্টেলের ছাত্রী সংখ্যা কম । মেরি নিজের থেকেই আলাপ করলো অফ্রিকান মেরির সাথে ‌। একটু সিনিয়র তাই এতোদিন কথাবার্তা বেশি হয়নি । কলেজের গেটে একজন নামিবিয়ান ছেলের সাথে কথা বলতে দেখেছে মেরিকে । ওর বয়ফ্রেন্ড সেই নামিবিয়ান ছেলেটিকে হোস্টেলের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মেরি আস্তে আস্তে আফ্রিকান মেরির রুমে গেলো ।


আফ্রিকান মেরি একগাল হেসে ওকে রুমের ভেতর ডাকলো । ইংরেজি মেশানো বাংলা কথাগুলো শুনতে বেশ ভালো লাগছিলো মেরির । মেরির বয়ফ্রেন্ডের কথা বলতে , জানলো ওদের মধ্যে মনোমালিন্য হয়েছে , তাই এখন দেখা করবে না । মেরি প্রশ্ন করলো হোস্টেল এখন ফাকা থাকবে "একা থাকতে তোমার খারাপ লাগবে না ?" আফ্রিকান মেরি জানালো যে ওর অভ্যাস হয়েগেছে । মেরি হেসে বললো " ভালোবাসার মানুষটির সঙ্গে ভাব করে নাও । অনেক সময় ধরেই বাইরে দাঁড়িয়ে আছে " । 


বাঙালি মেরির আফ্রিকান মেরিকে বেশ ভালো লাগলো । মেরিদের নামিবিয়ায় চাকরির সুত্রে অনেক বাঙালি থাকে । তাদের কয়েকজনের সঙ্গে হৃদ্রতার সুত্রে মেরি কলকাতার কলেজে পড়তে এসেছে । নামিবিয়া একসময় জার্মানির উপনিবেশ ছিল । ১৯১৫ সালে জার্মানিদের সরিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা নামিবিয়ার দখল নেয় । দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর ১৯৯০ সালে স্বাধীনতা পায় নামিবিয়া ।


সমগ্র আফ্রিকা জুড়ে পোচার্স আর প্রস্পেকটরস আধিপত্য চালায় । হাতি গন্ডার হত্যা করে পোচিং করে আনা আইভরি কালো বাজারে বিক্রি করে । নামিবিয়ার পূর্ব সীমান্ত জুড়ে আটলান্টিক সমুদ্র সৈকত বরাবর দেড় হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ " নামিব মরুভূমি " । এখানেই পৃথিবীর বিখ্যাত "স্কেলিটন কোষ্ট" ।


মেরি ট্রেনে বসে আফ্রিকান মেরির কথাই ভাবে ছিল । কতদূর দেশের মেয়ে কলকাতার কলেজে পড়তে এসেছে । এই সব ভাবতে ভাবতে রানাঘাট স্টেশন এসে গেল । মেরি ট্রেন থেকে নেমে রিক্সায় চড়ে বাড়িতে পৌঁছলো । ঠাকুমা দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল মেরি ঠাকুমাকে জড়িয়ে ধরে খুব একচোট আদর করে নিল । কতদিন পর দুপুরে একসাথে ভাত খেতে বসবে এই নিয়ে একচোট হৈচৈ হলো মা কাকিমার সাথে । আজকে মেরির পছন্দ মতো কাকিমা মাংস কষা আর ফ্রাইডরাইস বানিয়েছে । আজকে অনেক দিন পর বাড়িতে এসে বেশ আনন্দেই দিন কাটালো মনে মনে ভাবলো পনেরো দিন ছুটি বেশ মজা করা যাবে । 


মেরি পরদিন সকালে ওর প্রিয় সাইকেলটা নিয়ে হিজুলি বনের ভিতর দিয়ে বেরিয়ে পড়লো টোটো করতে , বন্ধু দের জুটিয়ে দেদার মজা হবে ওদের সেই পুরোনো ঠেক চূর্ণী নদীর পাড়ে সিদ্ধেশ্বরীর মন্দিরের ভাঙা পাঁচিলের পাসে । তবে সবচেয়ে আগে অজিতস্যারের সঙ্গে দেখা করে স্যারের খবর নিতে হবে । পৃথিবীতে একমাত্র মানুষ যাকে মেরি জীবন্ত দেবতা মতোই শ্রদ্ধা করে । মেরির পড়াশোনা ও জীবন দর্শনের উপর অজিতস্যারের প্রভাব খুব বেশি । তাই মেরি ফুলিয়া গ্রামের দিকের সাইকেল নিয়ে চললো । বর্তমানে গরিব তাঁতিদের অবস্থা বেশ সঙ্গিন । সুতোর দাম আধুনিক মেশিন এবং বাজারিঅর্থনীতির চাপে ওদের টিকে থাকতে গিয়ে অন্ন সংস্থানের তাঁত মেশিনটাও বিক্রি করে দিতে হয়েছে । অজিতস্যার এই সব গরীব অসহায় তাঁতীদের জড়ো করে একটা সমবায় সমিতি গড়ে তুলেছেন এবং সরকারের সাহায্যের জন্যে অপ্রাণ চেষ্টা করছেন । অজিতস্যার অকৃতদার স্কুল শিক্ষক । নিজের বেতনের অর্থ দিয়ে এই সমবায় সমিতির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন যাতে এই সব গরীব মানুষের মুখে অন্ন জোটে ।


মেরি পৌঁছতেই স্যার স্বস্নেহে মেরিকে সমিতির ভেতরে নিয়ে বসালেন । কলেজের পড়াশোনা কেমন চলছে খবর নিলেন । মেরি যেন লেখাপড়ায় ফাঁকি না দেয় সেই উপদেশ দিলেন । মেরির মতো অজিতস্যারের অসংখ্য ছাত্র ছাত্রী আছে যারা স্যারের কাছে পড়াশোনা করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত । স্যার সকল ছাত্র ছাত্রীদের সন্তানের মতোই স্নেহ করেন । মেরি অজিতস্যারকে প্রণাম করে সেদিনের মত বিদায় নিল । মেরি সাইকেল নিয়ে সিদ্ধেশ্বরীর মন্দিরের দিকে চললো ওর বন্ধুরা অপেক্ষা করছে । 

"শিক্ষক_দিবস"

#থ্যাঙ্কু_টিচার


Rate this content
Log in