Mausumi Pramanik

Abstract Tragedy


4.0  

Mausumi Pramanik

Abstract Tragedy


খোলা চিঠি

খোলা চিঠি

5 mins 229 5 mins 229


হে বিশ্বকবি, কবিগুরু


তোমাকে প্রণাম। শুভ জন্মদিন। যেখানে আছো, জানি শান্তিতেই আছো। কিন্তু দেখেছো কি? তোমার সোনার বাংলা আজ কেমন অশান্ত? এসো হে হিন্দু, এসো মুসলিম, এসো খ্রীস্টান; আজও বাঙালীরা বলছে বটে, তবে ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থে। বিভেদের মাঝে আর মিলন মহান দেখা যায় না। বরঞ্চ বিভেদের রাজনীতির দ্বারা ক্ষমতা দখল করার ব্যস্ততা লক্ষ্য করা যায়। তুমি এই দেশকে, ভারতবর্ষকে জাতীয় সংগীত উপহার দিয়েছিলে। তা সেই গানকে মনে করানোর জন্যে, জাতীয় সংগীতকে সম্মান জানানোর জন্যে সুপ্রিম কোর্টকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। কি লজ্জা বলতো! পুন্যতীর্থ-বাসীরা নিজের দেশের জাতীয় সংগীত গাইতেও দ্বিধাগ্রস্ত! নিজের দেশকে ভালবেসে আজ শুধু জওয়ানরা অকারণে প্রাণ দেন আর আমরা স্বপ্ন দেখি আমেরিকা, ইউরোপে সেটেল্ড হবার।

“ নাই নাই ভয়, হবে হবেই জয়, খুলে যাবে এই দ্বার” শুধু গান হয়েই রয়ে গেছে। আমরা, আজকের বাঙালীরা এতটাই ভীরু আর কাপুরুষে পরিণত হয়েছি যে অ্যাক্সিডেন্টে মৃত পথচারীকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে পারি। পাছে কোর্ট কিংবা পুলিশি চক্কর কাটতে কাটতে হিমশিম খেতে হয়। আমরা কি বেঁচে আছি? নাকি অর্ধমৃত??


 চতুরঙ্গের খেলায় আজ আমরা কেবল মাছে-ভাতে বাঙালী দর্শক হয়েই রয়ে গেলাম। সরকারী চাকরীর জন্যে লম্বা লাইন দিই, যাতে কম পরিশ্রমে অনেক টাকা ভোগ করতে পারি এবং আমাদের বৌ-বাচ্চাদের জীবন নিরাপদে থাকে; রিটায়ার্মেন্টের পর পায়ের ওপর পা তুলে আয়েশ করব; তা সেই পাশের বাড়ির বুড়ো-বুড়িটা যতই নিরাপত্তা-হীনতায় ভুগুক না কেন? রাস্তার ভিখারীকে পাঁচ টাকার কয়েন ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে চলে আসব, তবুও আমার জন-জাতির জন্যে গঠনমূলক কিছু করার কথা ভাবব না। শিল্প নেই, ব্যবসা নেই বলে স্লোগান তুলব, অথচ কোটি কোটি টাকা নিরাপদ প্রকল্পে রেখে সুদ খেতেই ভালবাসব।

আমার কিইবা আসে যায়? আমি প্রতি সপ্তাহে উইকেন্ডে পার্টি, বছরে একটা ট্যুর, শপিং মলে দেদার কেনাকাটা; সন্তানকে নামী ইংরাজী মাধ্যম স্কুলে পড়িয়ে নিজের স্টেটাস বাড়িয়ে দিব্যি আছি। আর কে কেমন আছে, জেনে কি লাভ? এদের দোষ দিয়ে কোন লাভ নেই। এরা তো সাধারন মানুষ। লাখ লাখ ভোটে জিতে আসা জন-প্রতিনিধিরাই প্রায় লক্ষ্য টাকার ওপর মাইনে পান আজকে, তা তাঁদের সম্পত্তির পরিমাণ কয়েক কোটি হোক না কেন? ভুখা, গরীব দেশবাসী সরকারী হাসপাতালে বেড না পেয়ে মেঝেতে পড়ে থাকুক না কেন?

দেশবাসীকে বি.পি.এল. এ.পি.এল. সিডিউল কাস্ট, সিডিউল ট্রাইব ইত্যাদিতে বিভক্ত করে রেশান, ঘর, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, গ্যাস কানেকশান, বৃদ্ধা ভাতা, ইত্যাদির নামে ভোট লুঠের খেলা চলে সারা দেশে। স্বাধীনতার সত্তর বছর পরেও ১৫০ কোটি ভারতবাসীকে স্বাস্থ্য, খাদ্য, বাসস্থান এর সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ আমাদের রাষ্ট্র। আজও ধনী, দরিদ্র, নীচু জাত, উঁচু জাত, ধার্মিক কুসংস্কার সমাজকে অধঃপতনের দিকে নিয়ে চলেছে। হে কবি, তুমি কি এমন ভারতবর্ষেরই কল্পনা করেছিলে? এমন ভারতবাসীর করুন দশা কি তোমার চোখেও জল এনে দেয়?

তোমার গান, কবিতা যা ছিল বাঙালী সভ্যতার কালচারাল ভিত্তি, সে গান আজকালকার ছেলেমেয়েরা শুনতেই চায় না। তারা হিন্দি সনেমার ছন্দসুলভ ছন্দপতনের গানের সঙ্গে ডিস্কোথেকে পা মেলাতেই ব্যস্ত। সত্যজিৎ রায়, ঋতুপর্ন ঘোষ যাও বা তোমার সাহিত্য নিয়ে কয়েকটা সিনেমা করে গিয়েছেন, বাকী গোটা সমাজ তো দাবাং, দঙ্গল, বাহুবলী জ্বরেই আক্রান্ত।

 “সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী,রেখেছ বাঙালী করে, মানুষ কর নি।” সাত কোটি আজ দশ কোটি ছুঁই ছুঁই। অবশ্য তাদের মধ্যে নেপালী, বিহারী, মাড়য়ারী, গুজরাটি সবই আছে। তারা দিব্যি ব্যবসা করে যাচ্ছে, আর বাঙালী আজও তাদের দাসত্ব করতেই ভালবাসছে। “মরা গাঙে” আজও ঢেউ আসে, কিন্তু পাল তুলবে কে? হাল ধরবে কে? তেমন সাহসী বাঙালী খুঁজে পাওয়াই ভার। কিছু ছোটখাট, অল্প পুঁজির মানুষ চাউমিন, তেলেভাজার ব্যবসা করছে বটে, আর কিছু সুযোগ সন্ধানী ঠাকুরের বলে যাওয়া “টাকা মাটি মাটি টাকা” কথাটিকে সত্য প্রমাণে ব্যস্ত। বাকীরা হয় চাকুরী জীবি নয়তো বুদ্ধিজীবি হয়ে পরজীবি উদ্ভিদের ন্যায় বেঁচেবর্তে আছে।

তবে মহিলারা সঙ্কচের বিহ্বলতা কাটিয়ে উঠেছেন। পুরুষের সঙ্গে পা মিলিয়ে চলতে শিখেছেন। কিন্তু সেখানেও বিপদ। অত্যাচারিত পুরুষের সংখ্যা নাকি দিনেদিনে বাড়ছে। কি করা যাবে বল? তাঁরা না বিশ্বাস করেন “ ভালবাসি ভালবাসি...”তে। না বিশ্বাস করেন.. “ আমার পরান যাহা চায়, তুমি তাই..” তাঁরা “সখী ভালবাসা কারে কয়, সে কি কেবলই যাতনাময়”তে মন মজিয়েছেন। “চোখের বালি..” লিখে তুমিই তো তাদের সে পথ প্রশস্ত করেছো। তাই মুড়ি মুড়কির মত ডিভোর্স করছি আমরা, যতবার ইচ্ছে হয় প্রেম করছি। “আমার প্রানের পরে চলে গেল সে”তে নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখে রূপ, যৌবন নষ্ট করে কি লাভ বল? তার থেকে বরং “ আমার সকল রসের ধারা তোমাতেই” বেশি মজা।

তবুও জান, আকাশে বাতাসে যখন বারুদের গন্ধ ভাসে... “আমার মুক্তি আলোয় আলোয়, ঘাসে ঘাসে, এই আকাশে...”বলতে ভয় হয়। তোমার দেশে ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খলতা আর আমার দেশে স্বাধীনতার স্বেচ্ছাচারীতা। তাই বুঝি আজও আর একটা কবিগুরু, কথা সাহিত্যিক বা কথা শিল্পী তৈরী হল না। প্রতিবাদের ভাষাই আজ ভুলে গিয়েছে বাঙালী! সামাজিক দায়বদ্ধতা আজ কোথায়? তোমাদের মত সহসী, কবি, লেখক, নাট্যকাররা কোথায়? যাও বা কিছু আছে, সাংসারিক যাঁতাকলে পিষতে পিষতে তাদের লেখনী আজ বাকরুদ্ধ। ফিরে এসো কবি... এ সমাজ, এ রাজ্য, এ দেশ তোমাকে চায়।


 কিন্তু তোমাকেও যে ফিরে আসতে বলব...সে মুখও তো আমাদের নেই। সেই যে তোমার নোবেল প্রাইজ চুরি গেল, আজও সেই রহস্যের কিনারা হল না। শুধু কি তাই? বিপ্লবী বীর সুভাষচন্দ্রের মৃত্যু রহস্যও আজ ধোঁয়াশায়। এমনকি কবি নজরুলের চিরশয্যা নিয়েও দলাদলি চলছে। নজরুল, তুমি কার? কেন ওপার বাংলায় থাকবে তার দেহাবশেষ? উঠেছে প্রশ্ন। কিন্তু কে বলবে? কে বোঝাবে? সেটাও তো বাংলা। ওরাও তো বাঙালী। ও বাংলা তো নজরুলেরও, তোমারও। কাঁটাতারের বেড়া কি এতটাই ধারালো যে ভাষা দিবসে তোমার আমার বাংলাকে এক হতে দেবে না?


 শুধু মাত্র তোমাদের জন্মদিন এলে তারস্বরে মাইক বাজিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করি যে আমরা তোমার উত্তরসুরি...তারপর সারা বছর তোমায় ভুলে থাকি। বাঙালী মননে, প্রানে যে তুমিই মিশে আছো, সেটা অস্বীকার করার কি অদম্য প্রচেষ্টা! তাই আজও ঘরের পাশে ঘাসের ডগার ওপর শিশির বিন্দু আমাদের চোখে পড়ে না। এত মিডিয়া, এত সংবাদপত্র, তাও, নীরবে ভালবাসা বিলিয়ে যাওয়া মানুষগুলো অধরাই থেকে যায়। জীবন-যুদ্ধে লড়তে থাকা মানুষগুলো আড়ালেই থেকে যায়। তাই আজও বিচারের বানী নিভৃতে নীরবে কাঁদে, যখন একই অপরাধে দুরকম সাজা হয়। টাকার অঙ্কে সবই বিকিয়ে যায় যে! বিকিয়েছে আমার তোমার বাংলা; বিকিয়েছে আমার দেশ, তোমার দেশ। এই বাংলায় আবার জন্ম নিতে ইচ্ছে হয় কবি? বলতে ইচ্ছে হয়?, “ও আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি।” মহান ভারতের গঙ্গা, যমুনার জল আজ কলুষিত হয়েছে, পঙ্কে পরিণত হয়েছে দেখেও “এই ভারতের মহামানবের সাগঅখ্যাতনামা


রতীরে” জন্ম নিতে ইচ্ছে হয়??? তোমার উত্তরের আশায় রইলাম।।



Rate this content
Log in

More bengali story from Mausumi Pramanik

Similar bengali story from Abstract