ঘনাদার রহস্য উন্মোচন পর্ব এক
ঘনাদার রহস্য উন্মোচন পর্ব এক
নমস্কার আমি বাবলু আজকে চলে এলাম আলাপ করতে । ধ্যাত মশাই বেশি জ্বালাতন করবো না । একটু বলেই চলে যাবো। আমি হলাম বাবলু সমাদ্দার , ভালো নাম কাশীরাম সমাদ্দার ।দাদামশাই মরার আগে আমার এমন ধারা সর্বনাশ ঘটিয়ে গেছেন । মানে আমার নামকরণ উনি করে ছিলেন । মা মুখ বুজে মেনে নিয়েছিলেন , শশুরের মুখের উপর উনি কথা বলতে পারেননি । আর আমার বাবা ত্রৈলোক্যনাথ সমাদ্দারের কাছে এটা খুব স্বাভাবিক বিষয়। আমাদের জ্ঞাতি গুষ্টির এমন ধরনের বোম্বেটে নামই হয় । যাক বাদ দিন প্রথমেই কথা দিয়েছি বেশি জ্বালাতন করবো না ।
তো যা বলছি আমাকে আপনারা বাবলু বলেই ডাকবেন ঠিক আছে?
আমার বয়স মাত্র সতেরো , গোঁফের রেখা এসেছে আর সাথে গলাও ভেঙেছে । পড়ছি আমি কলকাতার সেন্ট মার্টিন স্কুলে একাদশ শ্রেণীতে। আমার দাদা মানে ঘনা দা বলে , বাঙালি এই ইংরেজি মিডিয়াম ইস্কুলে ইংরেজ হতে গিয়ে দরকচা বেগুন হয়ে গেল । যাক সে প্রসঙ্গ এবার রোজ শুনতে পাবেন । ঘনাদা একদম স্বদেশী মার্কা মানুষ । আমার জ্যাঠার ছেলে ঘনার আসল নাম হলো দেবাশীষ সমাদ্দার । দাদা পেশায় একজন ইঞ্জনিয়ার হলেও আজকাল শখের গোয়েন্দা হয়েছে । সে নিয়ে জ্যাঠা মশাইয়ের সাথে বিস্তর ঝামেলা লেগেই আছে দাদার । ঘনাদা খড়গপুর আই আইটি থেকে পাশ দিয়ে গিয়েছিল জার্মান । বেশ ছিল ওখানে । তারপর কি যে হলো একদিন বাক্স প্যাটরা গুছিয়ে সেই যে চলে এলো , আর কিছুতেই গেলো না । কিছুদিন দেখে ছিলাম ঘরে বসে বসে ফস ফস সিগারেট টান দিতো। আর সব সময় মনমরা হয়ে থাকত । তারপর সেই বাগবাজারের লুটের কেসটা ঘণাদা সলভ করার পর লোকে যেন ওকে গোয়েন্দা ভেবে বসলো । একের পর এক কেস এসে হাজির। ঘনাদা ও বেশ মজে গেল । মনমরা ভাবটা কেটে যাবে ভেবে জ্যাঠা পর্যন্ত তখন কিছু বলেনি । তারপর ঘনাদা আজকাল আমাদের এই ব্রিটিশ আমলের বাড়িতে আপিস খুলে বসাতে জ্যাঠা রেগে গেছেন বেজায় । কথায় কথায় বলেন , "ছেলেকে পড়াতে যে খরচ হলো যে সারাটা জীবন কলের শুরু পড়ে কাটিয়ে দিলাম । একটা প্যান্ট জামা কিনে পড়িনি । আর সেই ছেলে এখন বাউন্ডুলে হয়েছেন । "
ঘনাদা আমাকে অবশ্য বলেছিল জ্যাঠা মশাইয়ের নাকি হার্নিয়া আছে তাই ধুতি পড়েন । জানিনা কে ঠিক কে ভুল , তবে এটা ঠিক যে ঘনাদা জার্মান চলে যাবার পর আমি বেশ মনমরা হয়ে ছিলাম । আজকাল সবাই ওকে এক ডাকে চেনে । অফিসে আমি আজকাল থাকি ঘনাদা না থাকলে । ওর এসিস্ট্যান্ট তো আমিই নাকি । ভাবছি আমিও ওর মত গোয়েন্দা হবো ।
আগে শহরের মধ্যেই কেস নিয়ে কাজ করলেও ইদানিং ঘনাদা বাইরেও ডাক পাচ্ছে ।
আর তখন দাদা আমাকে সঙ্গে নিয়ে যায়। মা বাবা মানা করেনা । আমার একমাত্র দাদাটিকে তারা বড় বেশি ভরসা করে । বিশ্বাস করে ঘনাদার সাহচর্য মানে আমিও কিছু শিখবো ।
তো যেটা বলছি আর কি । এই তো গেল এদিক ওদিকের কথা । এখন আসি মূল গল্পে ।
আমাদের ঠনঠনিয়া কালীবাড়ির কাছের এই বিশাল বাড়িতে থাকি আমি , আমার বাবা ত্রৈলোক্যনাথ সমাদ্দার আর আমার মা মনিমালা। আর আছে আমার জ্যাঠামশাই কেদারনাথ সমাদ্দার, জ্যাঠাই মা গত হয়েছেন বহুকাল , তাকে আমি দেখিনি । ঘনাদা এখন প্রায় চল্লিশ বছরের কিন্তু অকৃতদার। দাদু গত হয়েছেন আমার মুখেভাতের পর পর । আছেন আমার ঠাকুমা কালিকা দেবী । তার বড় বেশি বয়স হয়েছে , পটল তুললেই হলো আর কি । বাড়িতে আছে একটি চাকর আর একটি ঝি । এই কয়টা মানুষ আমরা একটি তলাতেই থেকে যাই। আর বাকি দুটি তলা ভাড়া দিয়ে রেখেছে জ্যাঠা। বাবা আর জ্যাঠার তেলের কল আছে । ভালোই চলে ব্যবসা ।
ওরা দুই ভাই এটাই বুঝতে পারে না তাদের সন্তানরা এমন গোয়েন্দা হবার ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা কেন ধরেছে ।
আজ রবিবার তাই সকালে ঘুম থেকে উঠেই ঘণাদার আদেশ অনুযায়ী গুর ছোলা খেয়ে একটুখানি মুগুর ভেঁজে চলে এলাম আপিসে। মানে আমার ঘনাদার ডিটেকটিভ অফিস। যেদিন যেদিন ছুটি থাকে আমি এসে অফিস খুলি , ধুপ দেখিয়ে দি।
তারপর সারাদিন অপেক্ষা কে আসে , কে আসে ।
ক্লায়েন্ট আসে ভালোই তবে ঘনাদা সব কেস নেয়না। ওর মনের মত হলে তবেই নেবে ।
আজকেও আমি আপিস খুলে দিয়ে চাকর নরেন দাদাকে বললাম পরিষ্কার করে রাখতে । তারপর মায়ের কাছে গিয়ে মুড়ি খাচ্ছিলাম। ঘনাদা এমন সময় হঠাৎ এসে বলল , এই বাবলু শিগগির চল ক্লায়েন্ট এসেছে ।
মা বলল , ঘণা বাবা খেয়ে যাও ?
ঘনাদা: কাকিমা কেস খুব জটিল । বাবলুকে ছেড়ে দাও । আমরা পড়ে খেয়ে নেব খন ।
মা আমাকে ছেড়ে দিতেই আমি ঘনাদার সাথে এগিয়ে গেলাম অফিসের দিকে ।
শুনতে পেলাম মা নিজেই নিজেকে বলছে , এই মা মরা ছেলেটাকে ঠাকুর তুমি সংসারী করো ।
ঘনাদা ছয় ফুট চার ইঞ্চি লম্বা , পাতলা ব্যায়াম করা চেহারা । মাথা ভর্তি চুলে আজকাল রূপালী রেখা , চোখে চশমা । ঘনাদা আগে প্যান্ট শার্ট পড়ত বাইরে আর বাড়িতে পাজামা পাঞ্জাবী। তবে সেই জার্মান থেকে আসার পর ওই পাজামা পাঞ্জাবী ওর জাতীয় পোশাক হয়েছে ।
আমাকে অফিস পর্যন্ত যেতে যেতে বলল ," লোকটা এসেছে বর্ধমান বাজেপ্রতাপপুর থেকে । একটা বড় রহস্য উন্মোচন করার সুযোগ মনে হয় পাওয়া যাবে। আমি শুরু করার আগেই তোকে ডাকলাম কারণ নিজের কানেই শুনে নিবি সবটা । নাহলে পড়ে আমাকে বারবার প্রশ্ন করে জ্বালাতন করবি ।"
অফিসে ঢুকে দেখলাম একটা কালো মতন মোটা লোক সোফায় এলিয়ে বসে আছে । মুখটা দেখেই বোঝা যায় বেশ চিন্তায় মগ্ন । আমি ভেবেই অবাক যে বর্ধমান থেকে কেউ এসেছে ঘনাদার কাছে তাও কেস নিয়ে !
একটাই ভুল করে ফেললাম আসার পথে চশমা আনতে ভুলে গেলাম । গোয়েন্দার সহকারীকে একটু কেতা না নিলে মানায় নাকি ?
ঘনাদা চা আনতে বললো বকুল মাসীকে ।
ভদ্রলোককে আমায় দেখিয়ে দাদা বলল , এ আমার তুতভাই বাবলু । আমার সাথেই ছায়া হয়ে থাকে। আর বাবলু ইনি হলেন মিস্টার শ্যামাপদ ব্যানার্জি। ওনাদের বাড়ি বর্ধমান হলেও আসলে ওনারা চিত্রকূটের মানুষ । ওখানেই ওনাদের জমিদার বাড়ি , মন্দির সব কিছু ।
ভদ্রলোক বললেন , মিস্টার দেবাশীষ আপনি কিছু করেন । আমাদের বংসে অভিশাপ নেমে আসবে নাহলে । ওই মন্দিরের ভিতর যে অষ্ট ধাতুর মূর্তি আছে তা দেবী দুর্গার। সেই মূর্তি স্থাপন করে ছিলেন আমার পাঁচ পুরুষ আগের বংশজ। এন্টিক বাজারে সেই সব মূর্তির বিশাল দাম । হয়ত সেই কারনেই চোর নিয়ে গেছে মূর্তি । কিন্তু বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা সেই রাত থেকেই আমাদের পরিবারের উপর নেমে এসেছে সর্বনাশ।
ঘনাদা খস খস করে কিসব লিখে যাচ্ছে। আর উনি একে একে বলে যাচ্ছেন। আমি বুঝতে পারলাম না আপাতত এই কলকাতায় বসে ওনাদের চিত্রকূট রহস্য উন্মোচন কি করে করবে ঘনাদা !
বাবলু আপনাদের গল্প শোনাবে , যা যা ঘটবে লোমহর্ষক ঘটনা তার বয়ান পেতে শুনতে হবে বাবলুর জবানব্দি ।
কেমন লাগছে শুরুটা , জানাতে ভুলবেন না ।
