Mitali Chakraborty

Abstract Tragedy

3.2  

Mitali Chakraborty

Abstract Tragedy

ভাগীদার:-

ভাগীদার:-

4 mins
622


বিদিপ্তা বৌদির সঙ্গে যখন ফোনে কথা হচ্ছিল তখুনি বুকের বামপাশে যন্ত্রণা অনুভব করছিলো কুহেলি। যদিও বিদিপ্তা বৌদি তাকে বলেছিলেন যে দুশ্চিন্তা করার কারণ নেই। কিন্তু তবুও কুহেলি স্থির থাকতে পারছিলো কই? বৌদির সঙ্গে কথা বলেই অস্থির মনটা নিয়ে ঠাকুরঘরে ঢুকলো সে।

বিদিপ্তা যতোই বলুক দুশ্চিন্তার কিছু নেই, তবুও কুহেলির অবুঝ মনটা যে অশান্ত হয়ে আছে। থেকে থেকে কু গাইছে কেবল। করজোড়ে এটাই প্রার্থনা করছে কুহেলি এবার দুর্গাপূজায় যখন মায়ের কাছে যাবে, মাকে যেন সে সুস্থ সবল দেখতে পায়।

বিয়ে হবার পর বাড়ি থেকে হাজার মাইল দূরে নতুন এক শহরে নিজের আর তিমিরের একটা ছোট্ট সংসার গড়ে তুলেছে কুহেলি। কর্মসূত্রে তিমির এখানকারই বাসিন্দা হয়ে গেছে এখন, তার সঙ্গে কুহেলিও।

দূরত্বের কারণে অহরহ বাপের বাড়ি না যেতে পারলেও প্রত্যেক দুর্গাপুজোতে কুহেলি বাবামায়ের কাছে যায়। ইদানিং তার মা কণিকাদেবীর শরীরটা তেমন ভালো নেই। যদিও কুহেলির বাবা এবং দাদা মায়ের চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি রাখেননি।

কিন্তু যখন অচিনপুরে যাওয়ার সময় উদ্যত হয়, তখন কোনো কিছু দিয়েই কি আর কাউকে ধরে রাখা যায়?


ছোট থেকেই কুহেলি খুব মা ন্যাওটা। যত ভাব -ভালোবাসা, রাগ-অভিমান সব মায়ের সঙ্গেই। ক্রমে ক্রমে কুহেলি যত বড় হতে লাগলো কণিকাদেবী তখন আর শুধু মা নন, হয়ে উঠলেন তার প্রাণের বন্ধুও। মায়ের কাছেই তো শাড়ি পরার প্রথম তালিম লাভ কুহেলির। কাঠের আলমিরার এক তাকে বাবার শার্ট-পেন্ট থাকতো। আর দুটি তাকে দাদার আর কুহিলির জামা কাপড়। নিজের রং বেরঙের শাড়ীগুলি হ্যাঙ্গারে করে আলমারির একপাশে ঝুলিয়ে রাখতেন কণিকাদেবী। সরস্বতী পুজোর আগে থেকেই শুরু হয়ে যেত কোন শাড়িটা পড়লে কুহেলিকে বেশি ভালো দেখতে লাগবে সেটা নিয়ে মায়ের সঙ্গে বাক্ বিতন্ডা। কণিকাদেবী ছোট্ট কুহেলির জন্য যতোই হালকা পাতলা শাড়ী চয়ন করুন না কেন অবশেষে একটা ভারী আর মোটাপাড় দেওয়া শাড়ি নির্বাচিত করতো সে।

দেখতে দেখতে কুহেলির বড় হওয়া।

তার দাদার এক প্রাইভেট ফার্মে চাকরী পাওয়া। তার কিছু বছর পরে বাবার চাকরি থকে অবসর নেওয়া। তারপর কুহেলির বিয়ে, এরপর তার দাদার বিয়ে। নতুন বৌমাকে নিয়ে কণিকাদেবীর এখন সুখের সংসার। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার দরুন কপালে আর সুখ সইলো না। ঠাকুরঘরে বসে পুরনো দিন গুলোর স্মৃতিতে হারিয়ে যাচ্ছিল কুহেলি। চেতনা হলো কলিংবেলের আওয়াজে।


- কি হলো দরজা খুলছিলে না যে এতক্ষন ধরে?


দরজা খুলতে খুলতেই তিমিরের গলায় সংশয়ের প্রশ্ন। কুহেলি নিজেকে একটু সামলে নিয়ে জবাবে বলে,


- সরি তিমির। আসলে আমি.....


কুহেলির কথা শেষ হবার আগেই তিমিরের জিজ্ঞাস্য,


- তুমি ঠিক আছো? কেমন শুকনো লাগছে তোমার চোখ মুখ।


নাহ্, আর নিজের চোখের জল ধরে রাখতে পারেনা কুহেলি। অবস্থা বেগতিক দেখে তরিঘরি তাকে নিয়ে বেডরুমে আসে তিমির। কাঁদো কাঁদো গলায় কুহেলির কথা শুনে বুঝতে পারে কণিকাদেবীর জন্য উতলা হয়ে রয়েছে সে।


কুহেলিকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে তিমির বলে,


- তুমি কদিনের জন্য ঘুরে এসো না। মা তোমাকে কাছে পেলে খুশি হবেন।


কিছু বলে না কুহেলি। চুপ করে আছে। চোখ দিয়ে তখনও গড়িয়ে পরছে নোনাজল। তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে তিমির আবার বলে,


- কেঁদো না কুহু। আমি তোমার জন্য টিকিট কেটে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। কিছুদিনের জন্য ঘুরে এসো, চিন্তা করো না। তোমাকে চোখের সামনে দেখলেই মা দেখবে অনেকটা সুস্থ হয়ে গেছেন।


কুহু কিছু বলে না। শুধু মাথা নেড়ে মৌন সম্মতি জানায়।


********************


সকাল থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে। কুহেলি আর বাকি সকলের মতন বিস্তৃত নীলাকাশটাও আজ ভেঙে পড়েছে বারিধারায়। সবেমাত্র পাঁচদিন তো হয়েছে কুহেলি এসেছে মায়ের কাছে। আর এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই সংসারের মোহমায়া ত্যাগ করে অচিনপুরের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিনেল কণিকাদেবী। বাড়িময় কান্নার রোল। কুহেলি, দাদা আর তার বৃদ্ধ বাবা শোকস্তব্ধ অবস্থায় বসে আছেন। মনে হচ্ছে এক নিমেষে বাড়ির আনন্দ গুলোতে কারোর কুদৃষ্টি পতিত হয়েছে। ঐদিকে কুহেলি আর বিদিপ্তা বৌদি রাঙাবউয়ের সাজে সাজিয়ে চিরো বিদায় জানায় কণিকাদেবীকে।


কণিকাদেবী আপনজনদের ছেড়ে চলে গেছেন হয়ে গেলো দিন পনেরোর মত। স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে আসার আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন বাড়ির সকলে। কিন্তু কুহেলি এখনও মায়ের স্মৃতি আঁকড়ে পড়ে আছে। এক রবিবারের সকালে ওই পুরনো কাঠের আলমারিটা খুলে মায়ের শাড়ি গুলোয় হাত বুলাচ্ছিল কুহেলি। শাড়ি গুলোতে মায়ের স্পর্শ পায় সে। হঠাৎ তার নজর গেল কয়েকটি পুরোনো, মলিন সুতির শাড়ির দিকে। মনে পড়ে গেলো কণিকাদেবী একদা বলেছিলেন কুহেলি আর বিদিপ্তার বাচ্চা হলে এই সুতির শাড়িগুলো দিয়ে বাচ্চার জন্য কাথা সেলাই করবেন। মলিন শাড়ি গুলো রাখা ছিল আলমারির এক কোণে।

কথাটা মনে হতেই দলা পাকানো কান্নাটা গলার কাছে এসে যেনো ধাক্কা দিচ্ছে তার। আলমারির কপাট ধরে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কুহেলি। কতক্ষন দাঁড়িয়ে ছিলো খেয়াল নেই। চেতনা হয় তার বাবার ডাকে,


- কুহু মা। তোর দাদা বৌদিকে একটু ডেকে দে তো মা এই ঘরে।


কুহু একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তাদের কে ডাকতে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই সকলে এই ঘরে উপস্থিত হলো। কুহেলির বাবা কাঠের আলমারির বড়ো ড্রয়ার থেকে কয়েকটি বাক্স বের করেন। বাক্স গুলো তুলে ধরেন কুহেলি ও তার বৌদির সামনে। একটা বাক্সে দুইগাছা চুরি, একটাতে একটি আংটি আর গলার হার। আর দুটি বাক্সে মানতাশা আর গলার নেকলেস।


কুহেলির বাবা সকলের দিকে চেয়ে বলেন,


- যে এইসবের অধিকারিণী ছিলো সে তো বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে আমার আগেই মায়া কাটিয়ে চলে গেলো। কুশল আর কুহেলির বিয়ের পর কণিকার কাছে এই যৎসামান্য কিছু ছিলো। আমি চাই কুহু আর বৌমা তোমরা নিজেরা নিজেরা ভাগ বাটোয়ারা করে নাও কার কোন গয়না পছন্দ।


ধীর পায়ে বাবার কাছে গিয়ে সবগুলো বাক্সের ডালা বন্ধ করে কুহেলি। একমুহুর্ত স্থির থেকে বাক্সগুলো একে একে সে তুলে দিল তার বৌদির হাতে আর এগিয়ে গেলো আলমারির কাছে। আলমারি ভর্তি শাড়ি গুলোতে একবার হাত বুলিয়ে সেই মলিন, পুরনো সুতির শাড়িগুলোর মধ্যে থেকে একটা শাড়ি হাতে নিয়ে বলল, "বৌদি মায়ের সব শাড়ি-গয়না তুমি রাখো। একটা শাড়ি শুধু আমায় দাও.....আমি এই শাড়িটার স্পর্শেই মাকে খুঁজে পাবো। আমার আর কিছু চাই না, কিচ্ছু না। শুধু এই শাড়িটার ভাগীদার আমি হতে চাই বৌদি..."

আর স্থির থাকতে পারেনা সে। মলিন শাড়িখানা বুকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পরে কুহেলি...


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Abstract