Riya Roy

Fantasy


0  

Riya Roy

Fantasy


স্নেহের বাঁধন

স্নেহের বাঁধন

8 mins 996 8 mins 996

বিহারের এক প্রত্যন্ত গ্রামে রাকেশ সাউ তার পরিবার নিয়ে থাকে । রাকেশ বাবু ক্ষেত জমি তে চাষ করে সংসার চালান। তার স্ত্রী সরলাদেবী এবং দুই ছেলে দেববীর আর তনবীর। দেববীর পড়াশোনায় তেমন ভালো ছিলো না তাই একটু বড় হওয়ার পর জমি ক্ষেত এসব নিয়ে তার বাবার সাথে কাজে লেগে পড়ে। ওদিকে তনবীর শিক্ষিত হয়ে চাকরি করতে শুরু করে। কয়েক বছর পর দুজন এর বিয়ে হয়। দেববীর এর স্ত্রী নয়না । নয়না ভীষণ মুখরা আর পরিবারের সবার সাথে নানান কিছু নিয়ে অশান্তি তার লেগেই থাকতো। জমি, সম্পত্তি এসব নিয়ে দেববীর আর তার স্ত্রী নয়না দিন রাত আলোচনা করত আর পরিবারে সমস্যার সৃষ্টি করতেই থাকত। এদিকে তনবীর এর স্ত্রী সুরভী তার সম্পত্তির ব্যপারে কোনো লোভ নেই এবং সে সবসময়ই চাইতো সবাইকে নিয়ে একসাথে ভালো থাকতে। তবুও নয়না জোর করেই তার সাথে প্রায়ই ঝগড়া শুরু করে দিত। নয়না সুরভীকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলতো, "ঘরকা সারা কাম ম্যায় কারুঙ্গি ওর ত আয়ি পাটরানী"। সরলাদেবী এসব শুনে ভীষনই রেগে যেতো আর বলতো," বড়ি বহুউ ক্যায়া বলরেহি হো। সুরভী তো সব কাম তুমারা সাথহি করতি হ্যায় ফিরভি তুম উসকে সাথ এয়সা বরতাভ কিউ করতি হো"। সুরভী খুবই নম্র স্বভাবের তাই সে কোনো ঝগড়া করতে চাইতো না যা বলতো চুপচাপ শুনে যেতো।


কেটে গেলো কিছু বছর......


নয়না এখন দুই ছেলের মা আর এদিকে সুরভীর কোনো সন্তানই হলো না। পাড়া প্রতিবেশী নানান বাজে মন্তব্য করতে শুরু করলো। সরলাদেবী যদিও সুরভীর সাথে ভালো ব্যবহার করতো এবং সবসময় তার পাশে থাকত। তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলতো নিশ্চয়ই সে একদিন মা হতে পারবে। ওদিকে নয়না র দুই ছেলে কে সুরভী খুবই ভালোবাসে তাদের পড়াশোনা , তাদের জন্য নিজে হাতে খাবার বানিয়ে খাওয়ানো সব কিছুই সুরভী করতো আর বাচ্চা দুটোও সুরভীকে ভীষণ ভালোবাসতো । সবসময় চাচী চাচী বলে সুরভী র কাছাকাছি থাকতো। নয়না এটা একদমই পছন্দ করত না । খালি ছেলে দুটোকে বলতো, "হার বকত্ চাচী চাচী কিউ রে তেরি মা ক্যায়া মর চুকি হ্যায় "।নয়না সুরভীকে শুনিয়ে আরও বলতো , "ভগবান তেরি গোধ নেহি ভরি কিউকি তু পাপী হ্যায়, তু ম্যরে বেটে কো হাত মত লাগানা , তু কভি মা নেহি বন পায়েগি"। সুরভী এসব শুনে কষ্ট পেতো আর নিজের ঘরে বসে কাঁদতো। তনবীর সুরভীর এই কষ্ট সহ্য করতে না পেরে একদিন ঠিক করলো সে বিহার ছেড়ে কলকাতায় গিয়ে থাকবে। সুরভীকে সেটা জানালো । সুরভী বললো," তুম ম্যরে লিয়ে তুমারে ঘর ছোড় কর যাওগে। ওর কলকাত্তা ম্যায় তো কোই জানি প্যায়চানি নেহি হ্যায় উহা যাকে হাম রেহ্যাঙ্গে কাহা"। তনবীর বলে উঠলো, "ইহা প্যায় কোন আপনে হ্যায় ? ভাইয়া ভাবী দিন রাত হামলোগোকে সাথ ঝগড়া করতে হ্যায় ওর ভাবী তুমারে সাথ বহোত বুরি হরকত করত্যে হ্যায় । হামারা কই বাচ্চা নেহি হ্যায় ইসলিয়া বহত বাতে শুনাতে হ্যায়। তুম মা নেহি বন পায়ি তো ইসমে তুমারা ক্যায়া কসুর হ্যায়"। কলকাতা যাবার কথা টা যখন তনবীর তার বাবা মা কে বললো তখন রাকেশ বাবু বলে উঠলো , "তুম বহুউকো লেকার জানা চাতিহো ঠিক হ্যায়, যো আচ্ছা সামঝো করো"। সরলাদেবী বলে উঠলো, "বেটা ম্যায় জানতি হু তু কিউ যানা চাহতি হ্যায় মুঝে সব মালুম হ্যায়"।

কিছু দিনের মধ্যেই তনবীর সুরভীকে নিয়ে চলে গেলো কলকাতায়। যাবার সময় দেববীরের দুই ছেলে সুরভী কে জড়িয়ে কাঁদতে থাকলো। আর বললো চাচী তুম কিউ যা রেহে হো হামকো ভি সাথ ল্যকে যাও। সুরভীর ও মনখারাপ হয়ে গেলো ওদের জন্য।


কোলকাতায় গিয়ে তনবীর তার বন্ধুর চেনা একটি জায়গায় কাজ করতে শুরু করলো এবং সুরভীকে নিয়ে ভাড়া বাড়িতে থাকতে শুরু করলো। সুরভী ও ঠিক করলো বাড়িতে ছোট ছোট ছেলে মেয়ে দের পড়াবে । সে টিউশনি পড়ানো শুরু করলো। এভাবে বেশ কিছু বছর ওদের কাটলো। টাকা জমিয়ে এবার তনবীর নিজের ব্যবসা শুরু করলো । রোজগার বাড়তে লাগলো পরে জায়গা কিনে নিজেদের বাড়ি তৈরি করলো সে।


সুরভী আর তানবীর এখন নিজস্ব বাড়িতে থাকে। সন্তানহীনতার যন্ত্রণা ভুলে থাকে ওই ছোটদের পড়িয়ে ওরা যখন আসে পুরো ঘরটা ভরে থাকে। এভাবেই দিন গুলো কাটছিল সুরভীর। একদিন সুরভীর পাশের বাড়ির এক ভদ্রমহিলা ডেকে বললেন, " একটি কলেজ পড়ুয়া ছেলে আছে পেনগেস্ট থাকতে চাইছে, আমাদের তো সব ঘরে ভাড়াটে আছে তাই তোমাকে বলছি তুমি যদি ওকে জায়গা দিতে। ছেলেটার খুবই দরকার। কলেজের সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে , গ্রামে বাড়ি , এখানে পড়তে এসছে। এখন যেখানে থাকে ওরা নাকি ভালো না তাই নতুন ঘর খুঁজছে"।

সুরভী তনভীর এর সাথে আলোচনা করে ছেলেটি কে থাকতে দিতে রাজি হলো‌ । ছেলেটির নাম সৌরিন । সৌরন আগে যে বাড়িতে থাকত সেখানের অভিজ্ঞতা তেমন ভালো নয় তাই ও বেশ আরষ্ঠ। কিন্তু সুরভীর স্নেহময়ী আচরন সৌরিনকে অবাক করলো। সৌরিনকে নিজে হাতের হরেক রকম রান্না করে খায়াতো সুরভী। তার কখন কোনটা লাগবে সেটাও ভীষণ খেয়াল রাখতো। কলেজ থেকে ফিরলে তার খোঁজ নেওয়া , অন্য কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা সব বিষয়ে । সৌরিন ও কিছু দিনের মধ্যেই সহজ হয়ে ওঠে । সুরভীর মধ্যে তার মা কে খুঁজে পেলো। গ্রাম এর বাড়িতে তার মা বাবা এবং বোন থাকে। আর এখানে সুরভীর মতো একজন মানুষ কে পেয়ে তার এক অন্য অভিজ্ঞতা হলো। সৌরিন সুরভীকে আন্টি বলে ডাকতো। আর ধীরে ধীরে ওদের পরিবারের একজন হয়ে উঠলো । এখন তো সৌরিন সুরভীদের সব দরকারি কাজে সাহায্য করে দেয়। সৌরিন একদিন বলে, "আন্টি আমি গ্রামের বাড়িতে যাবো আমার মা বোন কলকাতা থেকে কিছু জিনিসপত্র কিনতে বলছিলো তুমি সাহায্য করবে"? সুরভী বললো, "হা হা কিউ নেহি চলো একদিন সপিং করনে"। এমনি ভাবে কেটে গেলো বছর গুলো সৌরিনের কলেজও শেষ ও বাড়ি ফিরে যাবে। সুরভীর মন খুব খারাপ হলো । সৌরিনও বললো, "আন্টি আমি তোমাকে খুব মিস করবো। তোমার হাতে রান্না... জানিনা আবার কবে দেখা হবে"। সুরভী বললো," ম্যারা আগার কোই বেটা হোতা তো তুমারে তারাহি হোতা, সায়েদ ইতনা বড়া। কলকাত্তা ম্যায় মেরা লিয়া ফিরসে আওগে না সৌরিন বেটা"? সৌরিন বললো," হ্যায় আন্টি আমি আবার আসবো, আর ফোনে আমি তোমার সাথে যোগাযোগ রাখবো। তুমি আর আঙ্কেল একদিন আমাদের গ্রামের বাড়ীতে ঘুরতে এসো"। সৌরিন তারপরে চলে গেলো। সুরভীর মন খারাপ দেখে তনবীর তাকে সান্ত্বনা দিলো। বললো "দিল ছোটা মত করো সুরভী"।


বেশ কিছু বছর পরে .....


হঠাৎ একদিন একটি পরিবার ভাড়া চাইলো ওদের কাছে। সুরভীরা ভাড়া দিলো। ওরা থাকতে শুরু করলো। এই পরিবারে একটি ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে আছে। সুরভী তাকে দেখেই জড়িয়ে কোলে নিয়ে বললো, "ক্যায়া নাম হ্যায় তুমারা "? বাচ্চাটি মা বললো ," নাম বলে দাও তো সোনা আন্টিকে... " বাচ্চা টিও মিষ্টি গলা বললো, "আমার নাম অদ্রিজা দাশ"। সুরভী বাচ্চা টি আদর করে বললো," ম্যায় তো তুমকো গুড়িয়া কেহেকে পুকারুঙ্গি"। দেখতে দেখতে এই বাচ্চাটার প্রতিও সুরভীর স্নেহ বাড়তে থাকে। তার জন্য নানান খেলনা, সাজের জিনিস পএ দিতে শুরু করে । রোজ হরেকরকম খাবার বানিয়ে বাচ্চা টিকে ডেকে খাওয়ানোও শুরু করে। আর বাচ্চাটিও আন্টি আন্টি বলে ছুটে আসে রোজ সুরভীর ঘরে। বাচ্চাটির মা এই বিষয়টাকে ভালো চোখে দেখতো না আর সে চাইতো না তার মেয়ে সুরভীর কাছে যাক। বাচ্চাটির মা ভুল সন্দেহে ভুগতো তার ধারনা হয় সুরভীর কোনো সন্তান নেই তাই সুরভী তার মেয়েকে কেড়ে নিতে চাইছে , নিজের করে পেতে চাইছে আর এই ভুল ধারনার জন্য সুরভীর মতো একজন মানুষের ভালো দিকগুলো সে কিছুই খুঁজে পেতো না। মা না হতে পেরেও সুরভীর এই স্নেহের অসাধারণ বাঁধন অদ্রিজার মা অনুভব করতে পারেনি। একদিন সুরভী বাচ্চাটি কে ডাকলো, "গুড়িয়া বেটি আয়ো আজ তুমারে লিয়ে দেখো ক্যায়া বানায়া হ্যায় , একবার খাকে বাতাও তো বিটিয়া ইসকা টেস্ট ক্যায়সা হ্যায়"। অদ্রিজাও ছুটে চলে এলো আন্টি বলে... সুরভীর রান্না করা খাবার খেয়ে পরে ঘরে চলে গেলো। সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত হলো হঠাৎ অদ্রিজা র শরীর অসুস্থ হতে শুরু করলো, সে বমি করতে শুরু করলো। আর অদ্রিজা মা এসবের জন্য সুরভীকে দায়ী করলো। সুরভীর রান্না করা খাবার খেয়ে তার মেয়ে অসুস্থ এই নিয়ে ঝগড়া শুরু করলো। সুরভী বললো, "তুম মুঝে গলাত সমাঝ রেহি হো। বাচ্চিকো জলদিসে দাবাখানা লেকে যানা পাড়েগে, দের কিউ কর রেহিহো এসব বাতে ক্যায়কে"। সুরভী যখন অদ্রিজা কে নিয়ে ডাক্তার এর কাছে যেতে চাইলো তখন অদ্রিজার মা তার সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করলো আর বললো কোনো দিন আমার মেয়েকে ছোঁবে না। সুরভী কাঁদতে কাঁদতে ঘরে চলে এলো। তনবীর তখন বাড়িতে ছিলো না । পরে তনবীর বাড়ি ফিরে সবটা জানতে পারে এবং ঠিক করে এই ভাড়াটিয়াদের সে আর রাখবে না । যদিও সুরভী বলে উঠে, "ও গুড়িয়া বেটি কি তাবিয়েৎ ঠিক নেহি হ্যায় আর আব তুম উনকো ঘর ছোড়নে কি বাত বলো গি তো ও সব পরেশান হো যায়েগা"। তনবীর বলে , অদ্রিজা কে মাম্মি তুমারে সাথে ইতনা বুরা হরকত কি ওর তুম উন লোগোকে হুয়ে বাতে কর রেহি হো। তুম উস বাচ্চিকো ইতনা প্যায়ার করতে হো ওর ও তুমকোহি গলত সমজ বেঠে"। কিছু সময় পর বাচ্চাটির মা এবং বাবা আবার ঝগড়া শুরু করে আর বলে এই অসুস্থ তার জন্য সুরভীই দায়ী। তনবীর জানায় তারা এরকম মানুষ দের আর ভাড়া দিতে চায় না । যারা তাদের অবিশ্বাস করে। তাছাড়া অদ্রিজা তো এখন ভালো আছে , ডাক্তার বলেছেন আর কোনো ভয় নেই, তাহলে কেনো এভাবে তারা কথা বলছে।


হঠাৎ বাড়ির কলিং বেল বেজে উঠল। সুরভী দরজা খুলে দেখলো সৌরিন । সুরভী খুব অবাক হলো এত বছর পর তাকে দেখে। সৌরিন বললো, আন্টি কেমন আছো তুমি? আঙ্কেল কোথায়? জানো আন্টি আমি চাকরি পেয়েছি আর কোলকাতাতেই থাকতে হবে তাই এখানে এলাম তুমি থাকতে দেবেতো আন্টি? সুরভী খুশি হয়ে বলে উঠলো, "আরে এতো বহত খুসখবরি হ্যায় যো তুমে নকরি মিলা । হা হা তুম ইহা রাহো ,মুঝে বহত খুশি হো রেহিহে"। ওদিকে চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ শুনে সৌরিন জানতে চাইলে সুরভী সবটা বললো। তখন ও তনবীরের পাশে দাড়ায় এবং অদ্রিজার মা বাবা কে বলে, "আপনারা সুরভী আন্টির মতো একজন মানুষের সঙ্গে এমন ব্যবহার করছেন । শুধু মাত্র উনি নিঃসন্তান বলে। আমি ওনাকে আমার মা ই ভাবি। আর শুধু জন্ম দিলেই মা হওয়া যায় না। সুরভী আন্টির নিজের সন্তান না থাকলেও উনার স্নেহময় ব্যবহার একজন মায়ের থেকে কোনো অংশে কম নয়"। তনবীর ও বলে উঠে ," দেখো না সৌরিন তুমারে আন্টিকে সাথ ক্যায়সা বরতাভ কর রেহে হ্যায় , খামকা উসকো দোষ দে রেহি হ্যায়"।।

পরের দিন সকালে অদ্রিজারা চলে গেলো ঘর ছেড়ে। অদ্রিজা চাইলে ও তার মা সুরভীর সাথে দেখা করতে দিলো না। এদিকে সৌরিন আবার থাকতে শুরু করলো আর সৌরিন কে আবার পেয়ে সুরভীর সব কষ্ট দূর হলো।তনবীর বললো, দেখো সুরভী ভগবান হামরে ঘর সৌরিন কো ভেজ দিয়া বেটা করকে"।


সেদিন তখন সন্ধ্যে বাইরে মৃদু হাওয়া বইছে। সৌরিন প্রথম মাসের মাইনে পেয়েছে আজ । সুরভীর জন্য শাড়ি কিনলো আর যখন সুরভীকে সেটা উপহার দিয়ে প্রনাম করে বললো, "আন্টি তুমি ও আমার আরেকটা মা"। সুরভীর তখন আনন্দে দু চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে....।


Rate this content
Log in