শ্যামাঙ্গিণীর আখ্যান পর্ব ১৯
শ্যামাঙ্গিণীর আখ্যান পর্ব ১৯
রমাদি আর মিঃ জোতানিয়ার শত চেষ্টাতেও শ্যামা মুখ খোলেনি কিন্তু ভাবিকার স্পর্শ , তার গলার স্বরে যেন কোন যাদু কাঠির ছোঁয়ায় মুখ খোলে শ্যামা ।
শ্যামা কাঁদতে কাঁদতে বলে , " আমার প্রাক্তন স্বামী সম্রাট গতকাল রাতে খুন হয়েছে দিল্লীতে । আমার মনের মধ্যে একই সাথে উঠেছে সামান্য কষ্ট আর অনেকখানি শান্তি ও আনন্দের তুফান । আজকে আমি ভীষন খুশী , ভীষন ভীষন খুশী । তোর হয়তো আমার কথা শুনে খুব অবাক লাগছে তাই না ? আসলে তোরা তো জানিস না আমার জীবনের সমস্ত অভিশপ্ত কাহিনী তাই আমার মনের অবস্থাটাও বুঝতে পারছিস না । আজকে তোদের আমি সব বলবো । "
এই বলে ভাবিকার চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে আবারও বলতে শুরু করে শ্যামা । কলেজে পড়াকালীন আমার আলাপ হয় সম্রাটের সাথে , ভীষন ভালো বন্ধুও হয়ে গেলাম তাড়াতাড়ি , এই বন্ধুত্ব থেকে প্রেম তারপর বিয়ে। পাঁচ বছর প্রেম করার পর বিয়ে হয়েছিল আমাদের । বেশ ভালোই কাটছিল আমাদের ভালোবাসার সংসার , কোনো কিছুর অভাব ছিল না । বিয়ের বছর দুয়েক পর আমার ছেলে । ছেলে যখন প্রায় বছর খানেকের তখন থেকেই কেমন যেন বদলে যেতে শুরু করে সম্রাট । অতিরিক্ত টাকা , ক্ষমতা আর প্রমোশনের নেশায় বুঁদ হয়ে ভুলে যায় স্বামী এবং বাবা হিসেবে তার নিজের দায়িত্ব - কর্তব্য । প্রমোশনের জন্য ওর অফিসের একটি পার্টিতে আমার সরবতের গ্লাসে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে আমাকে খাইয়েছিল যা বিন্দুমাত্র টের পাইনি আমি ।
তারপর যখন আমার হুঁস ফেরে তখন আমি নিজেকে বিবস্ত্র অবস্থায় পাই এক পর পুরুষের শয্যায় । সেই থেকে শুরু হয় সম্রাটের নিত্যদিনের অত্যাচার । প্রতিদিন হাই প্রোফাইলের নিত্যনতুন লোকের সাথে শুতে আমাকে বাধ্য করতো আর আমি রাজি না হলে প্রথমে আমাকে মারধর করতো, তাতেও আমাকে বাগে আনতে না পারলে তখন ছেলেকে মেরে ফেলার হুমকি দিতো । এভাবেই দিনের পর দিন চলতে থাকে অবশেষে তোর বাবার দারস্থ হতে বাধ্য হয়েছিলাম আমি । উনি আমাকে বলেছিলেন, আমাকে শুধু ওনার হয়েই থাকতে হবে সারাজীবন তবেই উনি আমাকে সাহায্য করবেন । আমি ভেবে দেখলাম নিত্যদিন নিত্যনতুন পুরুষের শয্যাসঙ্গিনী
হওয়ার চেয়ে সারাজীবন একজনের শয্যাসঙ্গিনী হওয়াই ভালো তাই রাজি হয়ে গেলাম । তোর বাবার সাহায্যে আমি সম্রাটের কাছ থেকে ডিভোর্স নিয়েছি । জানিস , সেই প্রথম দিন রাতে কে আমার শরীরটাকে নষ্ট করেছিল ? সেইদিন রাতে আমাকে বিবস্ত্র করে আমার শরীরটাকে ছিঁড়ে - খুড়ে খেয়েছিল যেই ব্যক্তি তার জন্যেই আমি আজও বেঁচে আছি , বলতে পারিস ভালোই আছি তবে জানিনা কেন যেন মানসিক পরিতৃপ্তি নেই বললেই চলে । "
ভাবিকা আর রমাদির দুচোখ বেয়ে ক্রমাগত গড়িয়ে পড়ছে জলের ধারা । তখনই হঠাৎ করেই ভাবিকা বলে ওঠে, " তোমার সর্বনাশের প্রথম রাতের সেই ব্যক্তি বোধহয় আমার বাবা , তাই না মামমাম ? "
ভাবিকার কথা শুনে মাথা নিচু করে চুপ করে থাকে শ্যামা । তখন ভাবিকা শ্যামাকে জড়িয়ে ধরে বলে , " জানোতো মামমাম , আমার বাবার এই পাপের শাস্তি ভগবান বাবাকে না দিয়ে আমাকে দিয়েছে । আমি একরাতে যন্ত্রনার শিকার হয়েছি দশজন পিশাচের হাতে আর তুমি দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যেকটি রাতে বিভিন্ন পিশাচের হাতে নির্যাতিত হয়েছো । তুমি সেই দশবছর বয়সেও একবার এসব সহ্য করেছো মামমাম তাই তোমার কষ্টের কাছে আমার কষ্টটা অনেকটাই ফিকে মনে হচ্ছে । তবে তোমার এই অবস্থার জন্য আমার বাবাও দায়ী সেটা আমি কোনোদিন ভুলতে পারবো না আর বাবাকে ক্ষমাও করতে পারবো না মন
থেকে । "
ভাবিকার কথা শুনে শ্যামা শশব্যস্ত হয়ে বলে , " হ্যাঁ , তোর বাবাই প্রথম সেদিন আমার সর্বনাশ করেছে ঠিকই তবে সেই রাতে তোর বাবা যদি নাও থাকতো তবে হয়তো অন্য কোনো পুরুষ ভোগ করতো আমাকে । আসলে, আমার মহান স্বামী সেইরাতে প্রমোশনের নেশায় আমাকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করার জন্যেই পার্টিতে নিয়ে গিয়েছিল যা আমি আগে থাকতে ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি । তবে তোর বাবা , কেন জানি না আমাকে খুব ভালোবাসে তাই অনেক মোটা অঙ্ক এবং জমির বিনিময়ে সম্রাটের হাত থেকে আমার ডিভোর্স করিয়ে এনে এইখানে রেখেছেন , এমনকি এই ফ্ল্যাটটাও আমার নামে কিনেছিলেন যাতে আমার পরিবর্তে এই ফ্ল্যাট কেউ দাবি করতে না পারে । তুই ভেবে দ্যাখ, আমার উপর ওনার এতোটাই ভরসা যে তোকেও আমার কাছে রেখে উনি ভীষণভাবে নিশ্চিন্ত । তাই তোর বাবার উপর রাগ করে থাকিস না । আসল অপরাধী ছিল আমার স্বামী যে গতকাল রাতে তার উচিত শিক্ষা পেয়েছে । আমার মতোই প্রতিদিন একই নির্যাতনের শিকার হতে হতে বাধ্য হয়ে ওর দ্বিতীয় স্ত্রী নূপুর নিজের হাতে ওকে খুন করেছে গতকাল রাতে । আমি আজ সত্যিই খুব খুশি , ভীষন খুশী। কেন জানিস ? যে কাজটা আমি করতে পারি নি সেটা করতে পেরেছে নূপুর , দূর্গা হয়ে নিজের হাতে শাস্তি দিয়েছে অসুরটাকে । "
শ্যামার কথা শুনে ভাবিকা খুব শক্ত শ্যামাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে , " জানোতো মামমাম , আমি জন্মের পর থেকে মাকে কোনোদিন দেখিনি তাই মায়ের ভালোবাসা কি আমি জানি না । তবে তোমাকে দেখে জেনেছি মা কিরকম হয় , মায়ের ভালোবাসা কিরকম হয় তাই আজ থেকে তুমিই আমার মা । " এই বলে শ্যামাকে বুকের মধ্যে জাপটে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে ভাবিকা , একই সাথে সুপ্ত মাতৃহৃদয়ও প্রচন্ড আবেগে আপ্লুত হয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে ভাবিকার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে । অপরদিকে ওদের দুজনকে কাঁদতে দেখে দুজনকেই একসাথে জড়িয়ে ধরে ওদের প্রিয় রমাদি ।
সেদিনের পর থেকে ভাবিকার জীবনেও যেন মিরাকেল ঘটে গিয়েছিল কোনো এক অজ্ঞাত যাদুবলে । সেদিনের পর থেকেই ভাবিকার নেক্টোফোবিয়া অর্থাৎ অন্ধকারভীতিও সম্পূর্ণরূপে কেটে যায় । পুরুষভীতি এবং স্পর্শভীতি তো অনেকদিন আগেই কাটিয়ে উঠেছিল ভাবিকা শুধু বাকী ছিল অন্ধকারভীতি, সেটাও অবশেষে একেবারেই কেটে যায় ভাবিকার মন থেকে । ভাবিকা মানসিকভাবে এখন সম্পূর্ণরূপে সুস্থ ও স্বাভাবিক , হয়তো শ্যামার জীবনের নির্মম ট্রাজেডিই ভাবিকার মনের সবরকম ভীতি নাশ করতে সক্ষম হয়েছে । সাইক্রিয়াটিস্ট ডাঃ মৌসুমীও ভাবিকাকে পুরোপুরি সুস্থ ঘোষণা করেছেন ঠিকই কিন্তু শারীরিক অক্ষমতাটা সারাজীবন বয়ে বেড়াচ্ছি হবে ভাবিকাকে , ভবিষ্যতে সে বিয়ে করে সংসারতো করতে পারবে কিন্তু কোনোদিনও গর্ভধারণ করতে পারবে না । যাইহোক এসব নিয়ে শ্যামা - ভাবিকা - রমাদি বা মিঃ জোতানিয়া কারোরই কোনো মাথাব্যথা
নেই । সন্তান জন্ম দিতে পারাতো অনেক পরের বিষয় আগে তো বিয়ে , কিন্তু কোনোদিনও বিয়েই করবে না বলে সবাইকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে ভাবিকা । তার মতে সারাজীবন সে মামমামের কাছেই থাকতে চায় , ছোট্ট ভাই নব্যাংশকে আগলে রাখতে চায় , রমাদি আর সোনালীর পাশে থাকতে চায় ।
এভাবেই দেখতে দেখতে আরও দেড়টা
বছর । সোনালীও উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে কলেজে পড়ছে । শ্যামা আর রমাদিও চুটিয়ে রান্নার ভ্লগ বানাচ্ছে তার সাথে সাথেই চালাচ্ছে ঘরোয়া রান্না হোম ডেলিভারির মতো ছোটোখাটো ব্যবসা , নাঃ ছোটো বললে ভুল হবে কারণ শ্যামা আর রমাদির হয়ে রান্নাঘরের কাজ করে আরও চারজন অসহায় মহিলা । অন্যদিকে ভাবিকাও আছে বহাল তবিয়তে , মন দিয়ে স্কুলের শিক্ষকতা আর বাড়িতে রীতিমতো কোচিং ক্লাস চালিয়ে যাচ্ছে । তার পাশাপাশি চালিয়ে যাচ্ছে স্কুলেরই অঙ্কের শিক্ষক ঋতুরাজ যোশীর সাথে প্রেমপর্ব । হয়তো একেই বলে ভাগ্যের লিখন , কোনোদিনও বিয়েই করবো না বলা মেয়েটার জীবনেও প্রেম এসেছে । বাড়িতে সবাই জানে ভাবিকা আর ঋতুরাজের প্রেমের বিষয়টা এবার শুধুমাত্র ওদের চারহাত এক হওয়ার অপেক্ষা ।
ঋতুরাজ যোশী , একটি ত্রিশ বছর বয়সের গাম্ভীর্যপূর্ণ - শান্ত স্বভাবের সুদর্শন পুরুষ । ভাবিকার থেকে সে ছয় বছরের বড়ো । বছর দুয়েক আগে এক পথ দূর্ঘটনায় মাত্র এক বছরের দুধের শিশুকন্যাকে মাতৃহারা করে গত হয়েছিলেন ওনার স্ত্রী । তারপর থেকে ঋতুরাজ আর বিয়ে করার সাহস পায় নি এই ভেবে যদি , সৎমা এসে তার আদরের ছোট্ট রাজকন্যা পলককে না দ্যাখে । কিন্তু ভাবিকার সাথে মেলামেশা করার পর থেকেই সেই আশঙ্কা একেবারেই কেটে যায় ঋতুরাজের মন থেকে ।
পাঁচ মাস আগে হঠাৎ করেই একদিন ভাবিকাকে নিজের মনের কথা জানায় ঋতুরাজ যদিও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল তার আগে থেকেই । ঋতুরাজ তাকে ভালোবাসবে তা কোনোদিনও ভাবতেই পারে নি ভাবিকা তাই সে নতুন সম্পর্কে জড়ানোর আগে নিজের ব্যাপারে সমস্ত ঘটনাবলি বিস্তারিত জানিয়েছিল ঋতুরাজকে । ভাবিকার সব কথা শোনার পরেও ভাবিকার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় নি সে বরং আরও আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে ভালোবাসার বাঁধনে । এমনকি ঋতুরাজের ছোট্ট মেয়ে পলকও ভাবিকাকে " মাম্মি " বলেই ডাকে । ঋতুরাজের বাবা - মাও পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নিয়েছেন ভাবিকাকে । এবার শুধু দুই বাড়ির তরফ থেকে বিয়ের দিনক্ষণ পাঁকা করে ওদের দুজনকে এক সুতোয় গাঁথার পরিকল্পনা করছে ।
ভাবিকার নিজের বিয়ের কথা বলার আগে বাবা মিঃ জোতানিয়ার কাছে শেষবারের মতো একটা জোরালো আবদার রাখে । যেই আবদারটা শুনে মিঃ জোতানিয়া, শ্যামা, রমাদি আর শ্যামার মা ডাঃ পামেলা বোস প্রত্যেকেই রীতিমতো অবাক হয়ে যায় ।যদিও ভাবিকা আবদারটা করেছিল শুধুমাত্র নিজের বাবার কাছে তবে সেই আবদার মেটানোর জন্য নিজের জীবনের নির্মম ইতিহাস যা দীর্ঘদিন ধরে নিজের মায়ের কাছে লুকিয়ে রেখেছিল শ্যামা তা বিস্তারিত বাধ্য হয় । শ্যামার সব ঘটনা শুনে শ্যামার মা অনেক গালমন্দ করেন শ্যামার প্রাক্তন স্বামী সম্রাটকে , শাপ - শাপান্তর করেন মিঃ জোতানিয়াকে আর এতোদিন ধরে সব কথা লুকিয়ে রাখার জন্য চড় - থাপড় মারেন শ্যামাকে । তারপর নিজে একটা ঘরে ঢুকে দুদিন ধরে ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে রেখেছিলেন এমনকি খাওয়া - দাওয়াও করেননি । শ্যামা , ভাবিকা , রমাদি আর সোনালীর বহু চেষ্টার পর দরজা খুলে বেরিয়েই শ্যামাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে বুক ভাসান তিনি । যদিও অনেক আগেই নাতি নব্যাংশের পাশাপাশি ভাবিকাকেও নাতনি হিসেবেই তিনি ভালোবাসতেন তবুও আবারও নতুন করে ভাবিকাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে ভাবিকার আবদারের জন্য অনুমতি দিয়ে দেন ।
পাঠকরা নিশ্চয়ই ভাবছেন, ভাবিকা তার বাবা মিঃ জোতানিয়ার কাছে কি এমন আবদার করেছিল ? কি ভাবছেন তো ?
******* To Be Continued
