STORYMIRROR

Sharmistha Mukherjee

Abstract Drama Others

4  

Sharmistha Mukherjee

Abstract Drama Others

শ্যামাঙ্গিণীর আখ্যান পর্ব ১৮

শ্যামাঙ্গিণীর আখ্যান পর্ব ১৮

6 mins
6



এরপরে বিভিন্ন টানাপোড়েন আর ঝড় - ঝাপটার মধ্যে দিয়ে কেটে যায় আরও একটা বছর । সাইক্রিয়াটিস্ট মৌসুমী দাশগুপ্তার কাছে কাউন্সিলিংয়ের বেশ কয়েক দফা সিটিং দিতে দিতে অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে ভাবিকা । অ্যাপেনফোজমফোবিয়া ( স্পর্শভীতি )  আর অ্যান্ড্রোফোবিয়া ( পুরুষভীতি ) এগুলো সবই আস্তে আস্তে কেটে গেছে ভাবিকার শরীর - মন থেকে কিন্তু নেক্টোফোবিয়ার ( অন্ধকারভীতি ) সমস্যাটা কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারেনি । ঘর অন্ধকার হলেই প্রচন্ড রেগে যায় সে , রাতে আলো জ্বালিয়ে ঘুমোয় । সাইক্রিয়াটিস্ট মৌসুমী বলেছেন এই সমস্যাও কেটে যাবে সময়ের সাথে সাথে ।

শারীরিক ও মানসিকভাবে এখন যথেষ্ট শক্ত এখনকার ভাবিকা । তার জীবনে আরও একটা পরিবর্তন ঘটেছে কারণ তার এখন একটা নতুন পরিচয় হয়েছে, ' ভাবিকা ম্যাম ' নামে । একটি বেসরকারী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ক্লাস ফাইভ থেকে ক্লাস টুয়েলভ পর্যন্ত ইংলিশ সাবজেক্টটা পড়ায় সে মাস চারেক ধরে । আর এই মাস চারেকের মধ্যেই ক্লাস ফাইভ থেকে টুয়েলভ পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ভাবিকা । সকল ছাত্রছাত্রীদের সাথে দিনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়ে মনটা অনেক হালকা হয়ে যায় তার তারপর সন্ধ্যাবেলায় ফ্ল্যাটে বসে সোনালীসহ  আরও তিনটে ক্লাস ইলেভেনের ছাত্রছাত্রীকে ইংলিশ পড়ায় ফলে তার সারাটি দিন কাটে কর্মব্যস্ততার মধ্যে দিয়ে ।

এবার একটু সব থেকে ছোটো সদস্যা সোনালীর কথা বলা যাক । রমাদির মেয়ে সোনালী মাধ্যামিকে ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করে বর্তমানে ক্লাস ইলেভেনের ছাত্রী । খুব ভালো রেজাল্ট করায় শ্যামা সোনালীকে একটি নামকরা স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয় এবং যথারীতি বিভিন্ন সাবজেক্টের জন্য রেখে দেয়  প্রাইভেট টিউটর । শ্যামার হাত মাথার উপর থাকায় প্রায় পড়াশোনা বন্ধ হতে বসা মেয়েটার এখন স্বপ্ন ভাবিকার মতো স্কুলের শিক্ষিকা হওয়া এবং মাসীমণি শ্যামার মতো পরোপকারী ভালো মানুষ হয়ে ওঠা । রোজ একটু একটু করে শ্যামা , রমাদি আর ভাবিকার আদরে - যত্নে বেড়ে উঠতে থাকে সোনালী । 

অন্যদিকে শ্যামা আর রমাদির হাতেও অফুরন্ত সময় থাকায় সেই সময়কে দুজনেই বেশ কাজে লাগিয়ে নিয়েছে । দুজনেই মিলে বিভিন্ন নিত্য নতুন রেসিপি নিয়ে ভ্লগ তৈরি করে দর্শকদের জন্য । পুরানো দিনের রান্না , নতুন দিনের রান্না , কন্টিনেন্টাল , চাইনিজ, ফ্রেঞ্চ আরও অনেক দেশের বিভিন্ন সব সুস্বাদু রেসিপির সম্ভার নিয়ে রোজ দুপুরে দর্শকদের কাছে হাজির হয় " ভুরিভোজের আস্তানা " নামক শ্যামা আর রমাদির রান্নার ভ্লগ । মাঝেমধ্যে রান্নার রেসিপি নিয়ে ফোনে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেয় ছোটোবেলার প্রিয় সিতারা মাসীমণি , নিশি মাসীমণি এছাড়া কান্তা দাদির বেশ্যালয়ের অন্যান্য মাসিমণিরা যারা ছোটোবেলায় তার প্রাণ বাঁচায়েছিল । এছাড়াও মুম্বাইতে মা-তো আছেই । 

শ্যামা ,রমাদি , ভাবিকা আর সোনালী বাড়ির এই চার মহিলা সদস্যা যে যার মতো ব্যস্ত থাকে সারাদিন । তারপর ঠিক রাত নয়টার সময় চারমূর্তিতে মিলে চলে আড্ডা , গান - বাজনা , টিভি দেখা , লুডো খেলা এরকম আরও অনেক কিছু । রাত সাড়ে দশটায় চারজনে একসাথে রাতের খাওয়া সেরে যে যার মতো চলে যায় নিজেদের বিছানায় কারণ খুব ভোরে উঠতে হয় ওদের চারজনকেই । একমাত্র কোনোরকম অসুস্থতা ছাড়া শ্যামার হাত থেকে ওদের তিনজনের কোনো মুক্তি নেই । ভোর পাঁচটার সময় ওদের টেনে তুলে নিয়ে সোজা চলে যায় ব্যালকনিতে , তারপর শুরু হয় যোগাসন । এটা নিত্যকার ঘটনা শুধুমাত্র কিছু কিছু বিশেষ দিন ব্যাতীত নিয়মের অন্যথা করার সাহস কারও নেই । 


প্রায় দুবছরেরও বেশি এক ছাদের তলায় এক সাথে থাকতে থাকতে ওরা চারজন হয়ে উঠেছিল একে অপরের আত্মার পরম আত্মীয় । অন্যদিকে শ্যামার ছেলে 
নব্যাংশও ধীরে ধীরে বড়ো হয়ে উঠতে থাকে দিদান পামেলা বোসের স্নেহে - যত্নে । স্কুলের ছুটি শুরু হলেই শ্যামা , রমাদি , সোনালী আর ভাবিকাকে নিয়ে পাড়ি দেয় মুম্বাইয়ে মায়ের বাড়িতে । সেখানে ছেলের সাথে সবাই মিলে হৈচৈ করে ছুটি কাটিয়ে আবার ফিরে আসে কোলকাতায় । 

শ্যামার নিজের অতীত জীবনের কোনো কথাই নিজের মাকে জানায় নি কারণ মা জানলে খুব ভেঙে পড়বে নিজের ছোট্ট মেয়ের করুণ পরিণতির কথা শুনে । সেই ছোট্ট মেয়ে শ্যামা যাকে কিনা দশবছর বয়সে ধর্ষিতা অবস্থায় উদ্ধার করেছিল কান্তা মৌসির পতিতালয়ের কিছু কর্মী । সেখানেই প্রথম ডঃ পামেলা বোস তার চিকিৎসা করে তাকে মৃত্যুর মুখ থেকে ছিনিয়ে এনেছিল । পরে অবশ্য সেখানকার দুই যৌনকর্মী শ্যামার প্রিয় সিতারা ও নিশি মাসীমণি শ্যামাকে তুলে দেয় ডাঃ পামেলা বোসের হাতে এবং সেই থেকেই কাগজে কলমে শ্যামা গায়নোকলজিস্ট ডাঃ পামেলা বোসের একমাত্র সন্তান । ছোটোবেলায় তিনি যাকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনে সন্তানস্নেহে বড়ো করেছেন, সুশিক্ষিত করেছেন, সুপাত্রের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন সেই মেয়েরই জীবনে আবারও ঘটে যাওয়া চরম পরিণতি সম্পূর্ণরূপে অজানা । শ্যামা শুধু মাকে জানিয়েছিল নিত্যদিন নির্মম নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতেই স্বামী সম্রাটকে ডিভোর্স দিতে বাধ্য হয় সে । বর্তমানে সে ভালো জায়গায় চাকরি করে যথেষ্ট সাবলম্বী । মিঃ জোতানিয়া যে শুধুমাত্র তার বস নয় সেটাও শ্যামা জানায়নি মাকে ।
তাই শ্যামার পরামর্শ অনুযায়ী রমাদি , সোনালী বা ভাবিকাও কোনোদিন ভুল করেও শ্যামার মায়ের সামনে বেফাঁস কিছু বলে না । এটাই বোধহয় অনেক ভালো , কিছু চরম ঘৃণ্য সত্য যদি মাটি চাপা দিয়ে রাখা যায় তাহলে হয়তো সেখানে মিথ্যার মাটিতেও ফুল ফোটে । 


এভাবেই চলতে থাকে শ্যামাদের চার নারীর জীবন সংগ্রামের দিনরাত্রি । এরই মধ্যে হঠাৎ একদিন মিঃ জোতানিয়া শ্যামাকে ফোন করে জানান, " তুমহারি পূর্ব পতি সম্রাটকা লাশ দিল্লীকে এক হোটেলকে কামরেসে বরাম্মদ কিয়া গ্যায়া হ্যায় । এক তেজ চাকু উসকে হার্টমে গহরাই তক ধঁসা হুয়া থা । লাশকে পাস ব্যায়ঠি থী সম্রাটকা দুসরী পত্নী নূপুর , উসনে পুলিশকে সামনে কবুল কিয়া কে ইয়ে মার্ডার উসনে আপনে হাঁথোসে কিয়া হ্যায় । উসনে পুলিশকো ইয়েভী বাতায়া কে সম্রাটনে জো ঘৃণোনা কাম আপনি পূর্ব পত্নীকে সাথ কিয়া থা , ওঁহী উসকে সাথভী দোহরায়া গয়া । লম্বে সময় তক যাতনা সহনে কে বাদ , উসনে আপনে হাঁথোসে নরভক্ষ্সী লালচী কামিনাকো মারনে কে লিয়ে মজবুর হো গ্যায়া ।


মিঃ জোতানিয়ার মুখে সম্রাটের মৃত্যুর খবর শুনে প্রথমে একটু টাল খেয়ে যায় শ্যামা । নিজের অজান্তেই দুচোখ বেয়ে নেমে আসে জলের ধারা , মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানেই আবার অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে সে । শ্যামার ঐরকম পাগলের মতো হাসি শুনে রান্নাঘর থেকে রমাদি ছুটে আসে । বাড়িতে তখন ভাবিকা আর সোনালী কেউই ছিল না । রমাদি শ্যামার কান্ডকলাপ দেখে খুব ভয় পেয়ে যায় । শ্যামা কখনো অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে আবার পলক পড়তে না পড়তেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছে , একেবারে অদ্ভুত একটা পরিস্থিতি । শ্যামার এইরূপ এতো বছরে কোনোদিনও দ্যাখে নি রমাদি তাই ভীষণরকম ভয় পেয়ে তাড়াতাড়ি ভাবিকাকে ফোন করে সব জানায় । এদিকে শ্যামার পরিস্থিতি বেসামাল হতে পারে আঁচ করতে পেরেই হয়তো মিঃ জোতানিয়াও ছুটে আসেন শ্যামার ফ্ল্যাটে । তিনি অনেকক্ষণ ধরে শ্যামাকে বুঝিয়ে শান্ত করার বহু চেষ্টা করেও যখন ক্লান্ত হয়ে পড়েন তখন রমাদিকে ডেকে বলেন , " শুনিয়ে রমাদি , আপ ভাবিকাকো অভী একবার ফোন করকে দেখিয়ে ওহ্ অব কাঁহা হ্যায় ? কবতক্ ওয়াপস্ আয়েগী ? "


মিঃ জোতানিয়ার কথা মতো রমাদি ভাবিকাকে ফোন করতেই ভাবিকা জানায় , 
" রমাদি , আমি অ্যাপার্টমেন্টের মেইন গেট দিয়ে ঢুকছি । তুমি চিন্তা কোরো না আমি এক্ষুনি আসছি । " 


রমাদির মুখে ভাবিকা আসছে শুনেই মিঃ জোতানিয়া তাড়াতাড়ি করে ফিরে যান নিজের ফ্ল্যাটে । মিনিট তিনেকের মধ্যেই ভাবিকাও এসে পড়ে । 


ভাবিকা ফ্ল্যাটে ঢুকেই সোফার উপর ব্যাগটা ছুড়ে ফেলে দিয়েই দৌড়ে যায় শ্যামার ঘরে । সেখানে গিয়ে শ্যামাকে জড়িয়ে ধরে বলে ,
" তোমার কি হয়েছে মামমাম ? আমাকে বলো please , তোমার কি হয়েছে ? লক্ষী মামমাম , please বলো তোমার কি কষ্ট হচ্ছে ? " 




   ******To Be Continued *******


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Abstract