arijit bhattacharya

Fantasy


1  

arijit bhattacharya

Fantasy


স্বপ্নপুরী চাঁদিপুর

স্বপ্নপুরী চাঁদিপুর

6 mins 756 6 mins 756

ইলেকট্রনিক ডিসপ্লে বোর্ডে চেন্নাই মেলের নাম ভেসে উঠতেই নড়েচড়ে বসল শুভাশিস l দীর্ঘকাল ধরেই তার স্বপ্ন উড়িষ্যা ভ্রমণের l কিন্তু, তার দেড় বছরের কম্পিউটার কোর্সের চাপ এত বেশি ছিল যে , সময়ই করে উঠতে পারছিল না সে l বহুকাল ধরেই সে শুনেছে উড়িষ্যার প্রকৃতির কথা l উড়িষ্যা মানেই যেমন মহানদীর বুকে হীরাকুঁদ ,উড়িষ্যা মানেই যেমন আর্কিয়ান যুগের সম্বলপুরের পাহাড় - জঙ্গল ,উড়িষ্যা মানেই যেমন পুরীর জগন্নাথ মন্দির ,কোণারকের সূর্য মন্দির ,তেমনই উড়িষ্যা মানেই তো গোপালপুর অন-সি ,চিল্কা হ্রদ আর চাঁদিপুরের মহীসোপান , যেখানে জোয়ার - ভাঁটার দৃশ্য অপরূপ l তাই ,উড়িষ্যা যাবার আকাঙ্ক্ষা বহুদিন থেকেই মনে বাসা বেঁধে বসেছিল শুভাশিসের l কলেজে ওর সাবজেক্ট ছিল ফিজিক্স ,তার সাথে কেমিস্ট্রি আর ম্যাথামেটিক্স l ম্যাথামেটিক্সে এক প্রফেসর সতীন্দ্র পট্টনায়েক ,যিনি ছিলেন ওর খুব প্রিয় ,তিনি রিটায়ার করে এখন বালাসোরেই থাখেন l ফেসবুকে মাঝে মাঝে স্যারের সাথে কথা হয় l কলেজ পার হতেই বাড়ির লোক চাপ দিতে নাও এবার কম্পিউটার কোর্স করতে হবে l যাই হোক ,এত পড়াশুনার চাপে শুভাশিসের পক্ষে কোনোদিনই সম্ভব হয় নি উড়িষ্যা যাবার l কিন্তু ,এবার সুযোগ এসেছে আর বাড়ির লোকও রাজি l শুভাশিস ভট্ট্যাচার্য্যের বাবা শিবনাথ ভট্টাচার্য্য , একজন আইএএস অফিসার এবং তিনিও বেড়াতে খুব ভালোবাসেন ,এছাড়াও , শুভাশিসের আগের স্কুলের কেমিস্ট্রি স্যার অরুণাভ সেনগুপ্ত ,রিটায়ার করে ভুবনেশ্বরে থাকেন l স্যার বার বার বলেন শুভাশিসকে আসবার কথা , কিন্তু সময় হয় না শুভাশিসের l যাই হোক , এবার এসেছে সুযোগ এবং কথায় আছে না 'চান্স পে ডান্স 'l সুতরাং ,চেন্নাই মেলে উঠে বসেছে ,গন্তব্য সোজা বালাসোর l সাথে আছে কলেজের বন্ধু ও সহপাঠী মৃত্যুঞ্জয় দে ,যার ডাকনাম 'এবি'l যাইহোক , ট্রেনে খাবার জন্য আগে থেকেই চিকেন পিজ্জা আর মাটন বিরিয়াণী জোগাড় করে ফেলেছিল শুভাশিস ,মৃত্যুঞ্জয় দে'র আবার কোল্ড ড্রিংস ছাড়া চলে না l হাওড়া থেকে ট্রেনে ওঠার আগেই কিনেছে তিন বোতল পেপসি l শুভাশিস আপত্তি করেছিল প্রথমে, মৃত্যুঞ্জয় হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলল , ''অরে তুই তো জানিস ভাই , আমার বেড়ানো মানেই খাওয়া l উড়িষ্যায় কি পাব না পাব , তার কি কোনো ঠিক আছে l তাই ভাই আগে থেকেই প্রস্তুত থাকা ভালো l '' মৃত্যুঞ্জয়ের মুখে এই কথা শুনে হাসি পেয়েছিল শুভাশিসের , কিন্তু প্রত্যুত্তরে মুখ গম্ভীর করে বলেছিল ,''তাহলে আমাদের প্রকৃতি দর্শনের কি হবে?''উত্তরে মৃত্যুঞ্জয় বলেছিল , '' ছাড় তো তোর প্রকৃতি l আমার কাছে দু ' জন ম্যাটার করে , একজন প্রিয়াঙ্কা , আর হল আমার খাওয়া l আমি উড়িষ্যায় যাচ্ছি শুধু খেতে l '' যাই হোক , ট্রেন চলতে শুরু করেছে l মেচেদা পার হতেই গতি বেড়েছে ট্রেনের l দু'জনেই সিট পেয়েছে জানলার ধারে l সেপ্টেম্বর মাস l জানলা দিয়ে ঢুকছে হু -হু ঠাণ্ডা হাওয়া l শুভাশিস জানে যে , এই ট্রেনের রেক হল আই .সি .এফ রেকের l আই .সি .এফ রেকে যেমন ঝাঁকুনি বেশি হয় ,তেমন আরামও কম পাওয়া যায় l অথচ ,ভারতের অধিকাংশ গাড়ির রেক হিসাবে এই আই .সি .এফ রেক ব্যবহার করা হয় l রেল চাইলে এই লাইনেও দু'একটা গাড়িতে এল.এইচ .বি রেক ব্যবহার করতে পারে ,যেমনটা হয় রাজধানী -তে ,যেমনটা হয় পূর্বা -তে l কতই আর খরচ পড়বে !এমনটা ভাবতে ভাবতেই চলে এল খড়্গপুর ,ভারতের দীর্ঘতম প্ল্যাটফর্ম l এখান থেকে লাইন একদিকে চলে যাচ্ছে ঝাড়খণ্ডের দিকে ,আরেকটা যাচ্ছে মুম্বাই -এর দিকে ও আরেকটা যাচ্ছে চেন্নাই -এর দিকে l খড়্গপুর আসতেই চা চা করে উঠল মৃত্যুঞ্জয় l এখান থেকে গাড়ি বেঁকবে উড়িষ্যার দিকে l প্রকৃতিও বদলাতে শুরু করেছে ,বাংলার সুজলা - শ্যামলা প্রকৃতি আর নেই ,কিন্তু রাতে বিশেষ কিছু বোঝাও যাচ্ছে না l ভোরের দিকেই ট্রেন পৌঁছল বালাসোর l বালাসোর (balasore ),এককালের বালেশ্বর ,বাঘা যতীনের স্মৃতিধন্য বালাসোর বুড়িবালানের তীরের বালাসোর l কিন্তু ,কত বদলে গিয়েছে বালাসোর ! যখন তারা স্টেশনে ট্রেন থেকে নামল তখন 4:30 , উষার ব্রাহ্মমুহূর্ত আসতে কয়েকক্ষণ দেরি l 


শুভাশিস দেখল যে ,সকাল হতে বেশ দেরী আছে l আর , চাঁদিপুর যাবার বাস সকাল 6-00 টায়,উড়িষ্যা ট্যুরিজমের l এই চাঁদিপুরেই প্রখ্যাত লেখক রোহিণী বেহেরার বাড়ি ,শুভাশিসের সতীন্দ্রস্যারের বন্ধু ,মানে স্কুলফ্রেন্ড l শুভাশিসের সাথে পরিচয়ও আছে ভালোই l শুভাশিস তো রোহিণী আঙ্কেল করেই ডাকে l চাঁদিপুর ভ্রমণের সাথে শুভাশিসের ইচ্ছাও আছে ,রোহিণী আঙ্কেলের বাড়ি থেকে একবার ঘুরে আসার l কিন্তু ,মৃত্যুঞ্জয় কি যাবে ,দেখা যাক l আবার ,মৃত্যুঞ্জয়ের তো এক কথার ঠিক নেই ,এই হ্যাঁ তো এই না ;দুই ,ও খাওয়া আর নিজের গার্লফ্রেন্ড ছাড়া আর কিছুই বোঝে না l যাই হোক , অবশেষে এসে গেল ব্রাহ্মমুহূর্ত l পুবের আকাশ রাঙিয়ে উঠলেন সূর্যদেব l সমস্ত প্রকৃতিতে রঙের খেলা l বালাসোর শহরে সতীন্দ্রস্যারের বাড়ি খুজে পেতে দেরি হল না শুভাশিসের l ঝাঁ - চকচকে তিনতলা বাড়ি , সামনে বোগেনভেলিয়ার বাগান নীল শরতের আকাশ l উড়িষ্যার ভোর l সতীন্দ্র পট্টনায়েককে এক নামে সারা মহল্লা চেনে l যেটা শুভাশিস জানত না ,সেটা হল স্যার কলেজের প্রফেসারি থেকে রিটায়ার করার পরই স্থানীয় স্কুলের প্রিন্সিপাল ছিলেন ,বালাসোরের বাচ্ছারা এবং তাদের মা-বাবার কাছে শুধু একজন আদর্শ শিক্ষক নন ,একজন আদর্শ মানুষও l শুভাশিস আর মৃত্যুঞ্জয় মিলে ঠিক করল সকালবেলাটা সতীন্দ্র স্যারের বাড়িতেই কাটাবে ,কিন্তু দুপুরের দিকে চাঁদিপুরের দিকে রওনা হবে l সতীন্দ্র স্যারের বাড়িতে বারাণসী রাইস আর চিকেন রোস্টের রান্না খেয়ে শুভাশিস , মৃত্যুঞ্জয় আর সতীন্দ্র স্যার মিলে ওড়িশা স্টেট ট্রান্সপোর্ট ট্যুরিজ্ম -এর বাসে রওনা দিল চাঁদিপুর l বাস থেকেই শুভাশিস দেখল ডি.আর .ডি. ও -এর সেন্টার l চাঁদিপুরে নেমেই তিনজনে মিলে ছুটল রোহিণীদার বাড়ি l রোহিণী বেহেরা রিটায়ার্ড মানুষ ,লেখালেখি নিয়েই আছেন l এর আগেও শুভাশিস রোহিণী আঙ্কেল-এর লেখা পড়েছে ,ফেসবুকে সে রোহিণীদার কবিতা আর গল্পের মনোযোগী পাঠক l রোহিণীদা এককালে ইংরাজী সাহিত্যের শিক্ষক ছিলেন ,সাহিত্য নিয়ে যেমন রোহিণীদার অসীম জ্ঞান ,তেমন ইতিহাস - ভূগোল নিয়েও অসীম পড়াশুনা l রোহিণীদার কাছ থেকেই শুভাশিস শুনল যে ,ওড়িশার বিশেষ করে চাঁদিপুরেই জোয়ার - ভাঁটা কেন এত বেশি হয় l এই অঞ্চলটি হল মহীসোপান (geosyncline ) l এখানে সমুদ্রের তল ও যেমন খুব একটা গভীর নয় ,তেমন জলও খুব একটা নীলাভ নয় l এসময় হটাৎ করে উঠল ,''আচ্ছা ,এখানে কাঁকড়া পাওয়া যায় না !'' তবে ,শুভাশিস ভালো করেই জানে ,এখানে যে জিনিস টা বিখ্যাত সেটা হল কাছিম l ভারতে মূলত দু'ধরণের কাছিম মেলে -এক ধরণের কাছিম পাওয়া যায় তামিলনাড়ুর উপকূলে এবং অপরধরণের কাছিম পাওয়া যায় উড়িষ্যার এই বেলভূমিতে l রোহিণী আঙ্কেলের স্ত্রী স্বপ্না আন্টিও মাঝে মাঝে কবিতা লেখেন ,সম্প্রতি তার ওড়িয়া ভাষায় সাগর নিয়ে লেখা কবিতা পুরস্কারও পেয়েছে l শুভাশিস ওড়িয়া ভাষা বোঝে , তার মনে পড়ে গেল ঐ কবিতার দু'লাইন ''জুয়াড়ে চাহিছি খালি মু / খালি তু ,তু ,তু !!'' আরেকটা কবিতা মনে পড়ে গেল ,''ঋতু লাগে নুয়া , রাতি লাগে নুয়া / সারা পৃথিবীটা লাগে নুয়া নুয়া l l '' রোহিণী আঙ্কেলের মেয়ে স্মিতা আমেরিকার হিউস্টনে থাকে ,উইপ্রো-তে কাজ করে ,বহুদিন বাদে বাড়িতে এসেছে l খাওয়া খেয়ে মৃত্যুঞ্জয় বলে দিল , না রে তোরা যা ঐসব চাঁদিপুরের বেলাভূমি ,আমি তো একটু ঘুমিয়ে নিতে পারলে বাঁচি ,আমায় ডিস্টার্ব করিস না l বেলা 3 টা বাজতেই , শুভাশিস ,সতীন্দ্রস্যার আর রোহিণীস্যার মিলে বেলাভূমি অভিমুখে রওনা দিল l হাঁটা পথেই যাবে l শুভাশিসের একটা গান মনে পড়ল , ''সাগর সঙ্গ কিনারে হ্যায় /ফুলোঁ সঙ্গ বাহারে হ্যায় l l'' আশে পাশে মৎস্যজীবীদের বাড়ি , মোটামুটি গ্রামই বলা চলে , বইছে শরতের হাওয়া l হঠাৎ করে শুভাশিস দেখতে পেল সামনে ঝাউ - এর জঙ্গল l সেখানে এসে পৌঁছতেই কানে এল সমুদ্রের গর্জন ,কিছুদূর যেতেই স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল শুভাশিস l এখন জোয়ারের সময় l এই বঙ্গোপসাগর সম্পর্কে পাশে কত কথাই না বলে যাচ্ছিলেন রোহিণী আঙ্কেল , চোল বংশের শ্রেষ্ট সম্রাট রাজেন্দ্র চোল , যাকে গঙ্গইকোণ্ড চোল -ও বলা হয় ,তিনি কি'ভাবে তার বিশাল নৌবহরের সাহায্যে এই বঙ্গোপসাগর - কে 'চোলহ্রদে' পরিণত করেছিলেন ইত্যাদি ইত্যাদি l শুভাশিসের কানে তার কিছুই ঢুকল না l সে দেখতে লাগল ''নিকটস্থ বারিরাশি নদীজলবর্ণ ,কিন্তু দূরস্থ বারিরাশি নীলপ্রভ '' বিশাল , অসীম নিলীমা -কে l শনশন করে ঝাউবনের জঙ্গলে হাওয়া বইছে l কাছাকাছি আছে ট্যুরিস্ট হাউস l শুভাশিসের মনে ভেসে উঠল বঙ্কিমচন্দ্রের কথা ,


''দূরাদয়শ্চক্রনিভস্য তন্বী /


তমালতালীবনরাজি নীলা /


আভাতিবেলা লবণাম্বুর্রাশে /


ধারাঃ নিবদ্ধেব কলঙ্করেখা l ''


ছোটবেলায় স্কুলে শতদলস্যার পড়িয়েছিলেন l এই তো স্বর্গ l নির্নিমেষ চক্ষে শুভাশিস দেখতে থাকল সমুদ্র।


Rate this content
Log in