মহিষমর্দিনী নারী
মহিষমর্দিনী নারী
একান্নবর্তী পরিবারে বড় হয়েছি, কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবটাই পাল্টে গেছে। আজ আমার বয়স১৭ বছর। ছোটবেলা থেকেই অনেক কষ্ট মনের মধ্যে আঁকড়ে রেখেছি। কাউকে বলতে পারিনি, কোনোদিন পারব কিনা জানি না। আমি আমার বাবা, মা, পরিবারকে কতটা ভালোবাসি তা আমি কোনোদিন মুখে বলে বোঝাতে পারব না। যদি কেউ আমার মন পড়ে বুঝে নিতে চায়, বুঝে নিক। আমি জানি এমন একটা দিন আসবে, কেউ না কেউ আমার মন বুঝবে। কিন্তু সেদিন অনেক দেরি হয়ে যাবে। আমার অনেক স্বপ্ন আছে। জানি না কতটা তা পূরণ করতে পারব, স্বপ্নগুলো কি তা অধরাই থাক।অনেকগুলো প্রতিজ্ঞা আছে যে গুলি বলি শোনো। ছোট থেকে শুনে আসছি যে যারা নাকি খুব চুপচাপ থাকে , তারা নাকি পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে। আমি এটা মিথ্যা প্রমাণ করতে চাই। এছাড়াও প্রতিবেশী, বাড়ির লোক অনেক কথা বলেছে এ ব্যাপারে। যদি সত্যি কখনও কোনোদিন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারি, তখন মায়ের ইচ্ছায় যোগ্য জবাব দেব।
প্রশ্ন উঠবে যে এখানে মা কোথা থেকে এল? এ মা সে মা নয়। জন্ম দিলেই মা হওয়া যায় না। যে মায়ের কোলে শুয়ে প্রাণ জুড়ে যায় সে হল আমার দুর্গা মা। আমার শক্তি সে। তাই কোনোদিন বিয়ে করতে আমি পারব না। এ বাড়িতে ঠাঁই না হলে মা দুর্গার কোলটাই আমার বাড়ি হয়ে উঠবে।
বিয়ে তো করব না, এই বাড়িতে এখন কী করে থাকব? কাউকে কী পাশে পাব কোনোদিনও আমার মনের কষ্টগুলো জানানোর জন্য? সত্যি কথা বলতে, দারিদ্রতার জন্য আমি কখনও কোনোদিনও দুঃখ পায়িনি, শুধুমাত্র পরিবারের কাছ থেকে ভালোবাসা পাইনি। মেয়ে বলে সবাই অবহেলা করেছে। মা-এর নাকি ছেলের শখ ছিল। আমাকে বাড়ির কেউ কোনোদিন বুঝতেও পারেনি, কোনোদিন পারবেও না। আমার বয়সি মেয়েরা সারাদিনরাত প্রেমের কথা বলছে, কিন্তু আমি আমার নিজের কষ্টের কথা লিখছি বলে মন খারাপ করো না। অনেকবার জন্মদাত্রী মায়ের অবহেলায় আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলাম কিন্তু মা দূর্গা বাচিয়েছে। কল্পনাটা যদি সত্যি হত! যদি কল্পনার মানুষটা সত্যি হত! এসব ভেবেই নিয়েই বেঁচে থাকা, ভালো থাকা আর তার মধ্যে পড়াশোনা। সেই কল্পনার কিছু মুহূর্তের কথা নিম্নলিখিত রইল :-
মফস্বলের দোতলা বাড়ি। ৮ জন। রান্নার মাসি নেই। সকাল ৭টায় আমার দিন শুরু। আমি অন্তরা, বায়োলজি ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর, NGO ‘আলোর দিশা’ চালাই। দিদিভাই কর্পোরেট জব করে। দুই জা মিলে সংসার, বাচ্চা, শ্বশুর-শাশুড়ির ওষুধ-চা সব সামলাই।
বিকেল ৫টা মানেই আমার ‘মা হওয়ার শিফট’ শুরু। কলেজ, NGO সামলে অ্যাপ্রন পরে রান্নাঘরে ঢুকি। দুটো সহকারী — শ্রী ৪ বছর, দিয়া ৪ বছর। আমার মেয়ে আর মেয়ের মতোই ভাইঝি।
*আটার বাটি দখল*
আজ রুটি বানাচ্ছি। শ্রী আটার তালটা ধরল, "মা, আমি গোল করব।" দিয়া বলল, "কাম্মা, আমি বেলব। আমি বড়।"
হেসে দুজনের গালে আটা মাখিয়ে দিলাম, "শর্ত, যে সবচেয়ে গোল রুটি বানাবে, সে রাতে আমার পাশে ঘুমাবে।"
শ্রী তাড়াহুড়োয় মানচিত্র বানিয়ে ফেলল। দিয়া খিলখিল করে হাসল, "শ্রী, এটা রুটি না আফ্রিকা?"
শ্রী কাঁদো মুখে তাকাল। দিয়াকে চোখ পাকিয়ে বললাম, "ছোট বোনকে হাসতে নেই। নে, এই আফ্রিকাটা তুই খাবি।"
দিয়া জিভ কেটে বলল, "সরি কাম্মা। শ্রী, তুই কাঁদিস না।" দুজনকে বুকে টেনে নিলাম। "আমার দুটো মেয়েই গোল-গাল রুটির মতোই মিষ্টি।"
*হোমওয়ার্কের ঘুষ*
রাত ৬টা। দিয়ার হোমওয়ার্ক বাকি। দিয়া গলা জড়িয়ে ধরল, "কাম্মা, আজ হোমওয়ার্ক না করি? মাথা ধরেছে।"
শ্রী লাফিয়ে উঠল, "মা, আমারও মাথা ধরেছে।"
গম্ভীর মুখে বললাম, "ঠিক আছে। মাথা ধরলে ডাক্তার দেখাতে হয়। ওষুধ হল করলার রস।"
দুজনে চিৎকার, "না না না! আমরা ভালো হয়ে গেছি!"
হাসি চেপে বললাম, "বাহ, মা-কাম্মার ওষুধের নাম শুনলেই রোগ পালায়। নে, ১৫ মিনিট পড়া, তারপর লুডো।"
*ঘুমপাড়ানির ভাগ*
রাত ১০টা। আমার বিছানায় যুদ্ধ। শ্রী: "মা, আজ আমি তোমার ডানদিকে শোব।" দিয়া: "কাম্মা, আমি ডানদিকে।"
মাঝখানে শুয়ে দুজনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। "আমার ডানদিক-বাঁদিক বলে কিছু নেই রে। আমার দুটো দিকই তোদের জন্য।"
দিয়া জড়িয়ে ধরে বলল, "কাম্মা, তুমি শ্রীকে যেমন ভালোবাসো, আমাকেও তেমন ভালোবাসো তো?"
শ্রী ঘুম জড়ানো গলায় বলল, "দিদি, কাম্মা মানে ছোট মা। তুই আমার দিদি, আর মা আমাদের দুজনেরই।"
দুজনের কপালে চুমু খেয়ে বললাম, "একদম ঠিক। দার্জিলিংয়ে মনে আছে? তুই যখন পাহাড় থেকে পড়ে যাচ্ছিলি, কাম্মা সবার আগে ধরেছিল। কারণ মায়ের কোল আর কাম্মার কোল, দুটোর জোর একই।"
দিয়া বলল, "তাহলে কাল থেকে তোমাকে মা-কাম্মা বলে ডাকব।" শ্রী বলল, "আর আমি ডাকব শুধু মা। কারণ মা ভাগ হয় না।" অভ্র দরজায়় দাঁড়িয়ে দেখছিল। বলল, "প্রফেসর ম্যাডাম, তোমার NGO তো বাড়িতেই। দুটো ছোট প্রজেক্টকে মানুষ করছো।"
চাপা গলায় ধমক দিলাম, "চুপ। আমার মেয়েরা ঘুমাচ্ছে। আর হ্যাঁ, কাল সকালে আমার কফিতে ভাগ বসাবে না। আজ আমি তিনজনের মা, আমার এনার্জি লাগবে।" অভ্র হেসে ফিসফিস করল, "ঠিক আছে কাল দুটো কফি বানিও। একটা তোমার, একটা তিনজনের মায়ের।"
*NGO-র গেটে*
১৩ বছরের মলি কাঁদছে। জামা ছেঁড়া, গালে দাগ। মাতাল রতন চিৎকার করছে, "আমার বউ। আমি যা খুশি করব।"
বস্তির লোকজন চুপ। মলির মা মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদছে।
রক্ত মাথায় উঠে গেল। চশমা খুলে ব্যাগে রাখলাম। এখন আমি প্রফেসর নই, শুধু ‘দিদি’।
ভিড় ঠেলে সামনে গেলাম। রতন তেড়ে এল, "মাস্টারনি, তুই মাঝখানে আসিস না।"
ঠান্ডা গলায় বললাম, "মারধরটা বায়োলজি। নার্ভে চাপ পড়লে ব্যথা হয়। আর আইনটা কেমিস্ট্রি। ৩৫৪ ধারায় জেল হয়।"
পুলিশ ডেকে রতনকে ধরিয়ে দিলাম। মলিকে বুকে জড়িয়ে বললাম, "কাঁদিস না। দিদি আছি।"
*কলেজের ল্যাবে*
রিমি কাঁদো মুখে বলল, "ম্যাডাম, আমি পারব না। রক্ত দেখলে আমার মাথা ঘোরে।"
স্ক্যালপেল নামিয়ে রাখলাম। "আজ ডিসেকশন হবে না। আজ আমরা হৃদপিণ্ড বুঝব।"
বোর্ডে হার্টের ডায়াগ্রাম আঁকলাম। "বলো তো, মায়ের ভালোবাসা কোন চেম্বার দিয়ে যায়?"
রিমি ফিসফিস করে বলল, "ম্যাডাম, আমার মা-র হার্টের অপারেশন হয়েছিল। তারপর থেকে আমি এসব দেখতে পারি না।"
ব্যাগ থেকে প্লাস্টিকের হৃদপিণ্ড বের করলাম। "নে, এটা কাট। রক্ত নেই, কিন্তু সব চেম্বার আছে। আজ তুই আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট।"
রিমি কাঁপা হাতে স্ক্যালপেল ধরল। গাইড করলাম, "এটা ডান অলিন্দ... এটা বাম নিলয়... ভাবো এটা তোমার মা-র হৃদপিণ্ড। তুমি সারিয়ে তুলছো।"
ক্লাস শেষে রিমি জড়িয়ে ধরল, "ম্যাডাম, আপনি শুধু প্রফেসর না। আপনি আমার মা-র মতো।"
*বাড়ি ফিরে*
রাতে অদ্র্য দুটো কফি বানিয়ে বসে। "আজ কী হল? আমার ভাগেরটা কাড়লে না?"
হাসলাম, "আজ একটা মেয়ের ভয় কেটেছে। তার হার্টের বিট এখন নরমাল। সেলিব্রেশনে দুটোই খাব। একটা প্রফেসরের, একটা মা-কাম্মার।"
শ্রী দৌড়ে এল, "মা, আমিও হার্ট আঁকব।" দিয়া বলল, "কাম্মা, আমাকে http://M.Sc পড়াবে? আমি সায়েন্টিস্ট হব।"
ঠাকুমা বললেন, "মেয়েটা আমার ঘরেও পড়ায়, বাইরেও পড়ায়। এটাই তো আসল শিক্ষা।"
আমি বুঝেছি, বায়োলজি মানে শুধু কাটাকুটি নয়। বায়োলজি মানে জীবন। ভয় পেলে চলবে? তাহলে রোগ সারাবে কে?
রিমি এখন http://M.Sc করছে। থিসিস টপিক: 'Cardiac Biology'। অ্যাকনলেজমেন্টে লিখেছে: "প্রফেসর অন্তরা ম্যাডামকে, যিনি শিখিয়েছেন হৃদপিণ্ড শুধু পাম্প করে না, সাহসও যোগায়।"
এই হলো আমার মহিষমর্দিনী রূপ। কলেজে প্রফেসর, NGO-তে দিদি, বাড়িতে মা-কাম্মা। কলম, খুন্তি, স্ক্যালপেল আর ভালোবাসা — এই আমার ত্রিশূল। আমার দশটা হাত নেই, কিন্তু আমার পাশে আমার পরিবার আছে। এই ৩৫ জনই আমার শক্তি। বড় বাড়ি ভেঙেছে, কিন্তু মন ভাঙেনি। যেকোনো জায়গা, যেকোনো ছাতার তলা — সবাই থাকলে সেটাই বাড়ি। সেটাই আমার বিজয়।
মা অন্তরার চোখে লেখা। বাচ্চা দিয়া বা শ্রী হিরো না
**Tricky moments into kind choices and happy endings** গল্পে কোনো "Tricky moment" বা ইমোশনাল কনফ্লিক্ট নেই। সব ঠিকঠাক চলছে
**বাচ্চার পয়েন্ট অফ ভিউ লাগবে** তোমার গল্প সংসারের রুটিন, দার্জিলিং ট্রিপ। বাচ্চার ফিলিংস নেই
*জাজরা কী করবে:* থিম না মিললে সরাসরি রিজেক্ট করে দেয়। নম্বরই পাবে না।
---
*চিলড্রেন কনটেস্টে দিতে চাইলে গল্পটা এভাবে বদলাও:*
*নতুন টাইটেল*: শ্রী-র সুপারপাওয়ার
*পয়েন্ট অফ ভিউ*: ৪ বছরের শ্রী বলছে
*নমুনা:*
> "আমার নাম শ্রী। আমার মা প্রফেসর। সারাদিন বকবক করে। একদিন দিদি দিয়া কাঁদছিল। মা অফিসে। আমি দিদির কাছে গিয়ে ওর হাত ধরলাম। আর বললাম, 'দিদি, কাঁদে না। আমি আছি।' দিদি হেসে দিল। বাবাই বলল, 'শ্রী, তুই তো ম্যাজিক জানিস।' সেদিন বুঝলাম, কারও কষ্ট বুঝে হাত ধরাটাই আমার সুপারপাওয়ার। ৩৫ জন মিলে যখন দার্জিলিং গেলাম, ট্রেনে একটা বাচ্চা কাঁদছিল। আমি গিয়ে আবার হাত ধরলাম।
