খোলা আকাশে বদ্ধ মন
খোলা আকাশে বদ্ধ মন
শহরের যান্ত্রিক জীবনের মাঝে ছোট এই ছাদবাগানটি ইলোরার বরাবরই খুব পছন্দের। চারিপাশে উঁচু উঁচু ফ্ল্যাটবাড়িগুলোর মাঝেও ওদের এই একতলা বাড়িটার ছাদ থেকে একটুকরো নীলাকাশ দেখতে ইলোরা যে কতটা ভালোবাসে, তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। বছর দুই আগেও এই ছাদবাগানে কেবল হরেক রকম রঙিন ফুলগাছের সমাহার ছিল। তবে বর্তমানে চিত্রটা একটু পাল্টেছে। প্রায় বেশিরভাগ ফুলের গাছ সরিয়ে দিয়ে সে ইদানিং সবজির বাগান নিয়ে মেতেছে। ইলোরা তার এই মিনি ছাদবাগানে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব সবজিই চাষ করে। সারাবছরই সে বাগান থেকে টাটকা সবজি পায়। সেই সবজি সে কিছুটা নিজেদের জন্য রেখে বাকিটা নিজের হাতে রান্না করে সেই সব মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দেয়, যাদের নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা নেই।
সারাসপ্তাহ সেভাবে সময় না পেলেও ছুটির দিনগুলো ইলোরার সারাদিন ছাদবাগানেই কাটে। আজকেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। গাছগুলোতে জৈব সার দিতে দিতে ছাদের অন্যপ্রান্তে থাকা ফুলগাছগুলোর দিকে এগিয়ে গেল সে। প্রতিটি গাছের সবুজ পাতার মাঝে খুব সুন্দর করে রঙবেরঙের ফুলগুলো মাথা উঁচু করে চেয়ে আছে ইলোরার দিকে। ইলোরা তাড়াতাড়ি ফুলের ঝুড়িটা এনে ফুলগুলো তুলতে লাগল। যদিও ইলোরার বাবার গাছ থেকে ফুল তোলা একদম পছন্দ নয়। বাবা বলেন, "গাছ থেকে তুলে নিলে ফুলগুলো দ্রুত শুকিয়ে যাবে।" কিন্তু ইলোরার বক্তব্য—"ফুলগুলোকে এভাবে রেখে দিলেও একসময় শুকিয়ে যাবে। তোমার সাজানো বা তৈরি করা জিনিস তুমি না নিলেও অন্য কেউ তা নিয়ে চলে যাবে। তাই তোমার যা কিছু, সময় থাকতে সেগুলো নিজের করে রেখে দাও।"
এসব ভাবনার ভিড়ে ইলোরার হঠাৎ চোখ গেল ছাদের একদম কোণায় রাখা নাগচম্পা গাছটার দিকে। গাছটা দেখেই ইলোরার চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠল। ইলোরা নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিতে গিয়েও সরালো না। খেয়াল করল, ছাদের সব ফুলগাছ ঠিক থাকলেও শুধু এই গাছটাই শুকিয়ে গেছে।
বাবা তো সব ফুলগাছের খুব যত্ন করেন, তাহলে এই গাছটা এমন শুকিয়ে গেল কেন! কথাটা ভাবতে ভাবতেই গাছটার সাথে জড়িয়ে থাকা অতীতের সেই বিষাদময় স্মৃতির অধ্যায়টা মনে পড়ে গেল। বহু চেষ্টা করেও এখন পর্যন্ত ইলোরা এই গাছের আসল ঠিকানার স্মৃতি মুছতে পারেনি। ইলোরা গাছটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে মনে মনে বলে উঠল, "ঠিক আমার অনুভূতিগুলোর মতোই এই গাছটাও এখন শুকিয়ে যাচ্ছে। হয়তো এবার মুক্তির পালা।"
