STORYMIRROR

Sayani Saga

Abstract Romance Tragedy

4.5  

Sayani Saga

Abstract Romance Tragedy

Desire- That's Different & Difficult

Desire- That's Different & Difficult

6 mins
8




মা আমার সতেরো বছরের জন্মদিনে আমি তোমার ডায়েরি টা পেয়েছিলাম... যেখানে সব অপ্রয়োজনীয় জিনিস গুলো অবহেলায় উচ্ছিষ্টের মতো জড়ো করে রাখা হয় সেখানে...
এত কী করে বেপরোয়া ছিলে মা... হস্টেল জীবন কি এরকমই হয়.. সবার চোখের আড়ালে একমাত্র মেয়ে হওয়ার সুযোগ নিয়ে উদাসীন ধনী বাবার গোছা গোছা টাকা এভাবে ওড়ানো যায়... নিজেকে নিয়ে যা খুশি তাই করতে গিয়ে এতটা স্বেচ্ছাচারীতা করা যায়... নিজের ইচ্ছে মতো বাঁচতে গিয়ে কোথায় কিভাবে যে আগল ভেঙে অন্ধকারে ঢুকে পড়েছিলে.. তা তুমি লিখেছিলে যে নিজেই জানো না...
আমার এখন চব্বিশ .. কিন্তু আমি তো এই বয়সেও ওরকম ভাবতে পারিনা... আর তুমি কি করে ওরকম একটা জীবন বেছে নিয়েছিলে... যেখানে নেশা আর নিত্য নতুন পুরুষসঙ্গীই ছিলো তোমার আকাঙ্ক্ষার ব্যাপ্তি জুড়ে...
না বাবা কোনোদিন সেইসব বলেনি.. বলার কোথাও না.. ভাগ্যিস পেয়েছিলাম তোমার ডায়েরিটা মা... তার মধ্যেই তোমায় খুঁজে পেয়েছিলাম.. তোমার আসল তুমিকে, ডায়েরি টা পেয়ে আনন্দও হয়েছিলো.. আবার পড়ে অবাকও হয়েছিলাম খুব ...
রাতে লুকিয়ে অনেকবার করে পড়তে পড়তে তোমার প্রতিটা কথার সাথে,তারিখটাও মনে গেঁথে গেছে... 5th জুন... ওইদিনই তো বাবার সাথে তোমার প্রথম দেখা কলেজে... তুমি তো খুব সুন্দরী ছিলে মা.. বাবা নাকি তোমায় যেদিন গোপনে মনের কথা, আবেগ কাগজে লিপিবদ্ধ করে পরিবেশন করেছিলো , লিখেছিল "to, my drunk beauty queen"...তোমার ওই ডায়েরির পাতা থেকেই জেনেছি... আমার পড়ে হাসি পেয়েছিলো.. এরকমও হয়..
বাবা তো একেবারে মার্জিত শান্ত নিরীহ .. আর তুমি দুঃসাহসী, সুন্দরী, বেপরোয়া.... জেদী বাচ্চাদের মতো স্বার্থপর...
বাবার এই শান্ত স্বভাব দেখেই কি তোমার মনে পরিবর্তন এসেছিলো মা ...বাবা তোমার জীবনে আসার মাস ছয়েক পরেই তুমি লিখেছ, তুমি নাকি বুঝতে শিখেছিলে যে জীবনে সঠিক পথে নোঙর ফেলে নিজেকে সময়মতো থামাতে হয়... নাহলে ভেসে গিয়ে হারিয়ে যেতে হয় অজানা কালো জাহান্নামের দেশে...বাবাই নাকি তোমার পাশে থেকে সবটা কিছু না বলেই অক্ষরে অক্ষরে বুঝিয়ে দিয়েছিলো তোমায়.. বাবার সান্নিধ্যে এসে তুমি নতুন করে আবার সাজাতে চেয়েছিলে সবটা, তোমার এলোমেলো বেপরোয়া জীবন থেকে শুরু করে নিজেকে.... তুমি লিখেছিলে.. "he has brought me to my knees...".. আবার কোথাও লিখেছ, "ইচ্ছেডানা তার ঠিকানা বদলেছে.. স্বেচ্ছায়.. আনন্দে.. ভালোবাসায়"...
আমারও তাই ধারণা জানো মা, .. যে ভালোবাসা দিশাহীন মানুষকে দিশা দেখিয়ে অন্ধকার থেকে টেনে বের করে তাকে আলোর দিকে নিয়ে আসে...
কিন্তু কতটা আলো পৌঁছেছিলো মা তোমার ভেতর... আমি হলাম.. তার পরেও কি করে বছরখানেক বাবাকে সামাজিকভাবে গ্রহন না করে থাকতে পেরেছিলে... কেন বিয়ে করতে চাওনি প্রথমটায়..
তুমি লিখেছো.." অবশেষে হার মানতেই হলো, নিজের কাছে, ভালোবাসার কাছে"..
বাবা তোমায় ছেড়ে যায়নি, হাল ছেড়ে দেয়নি... শুধু তাই কি ঠিক একবছর পর বিয়ে করেছিলে মা তোমরা... বাবা তোমাকে সত্যি ভালোবেসেছিল.. নাহলে এতকিছুর পরেও কীরকম অবলীলায় সংসার করে গেছে তোমায় নিয়ে.. আমি বড় হয়েছি তোমাদের মধ্যে.. তোমাদের সামনেই.. কোথায় কিছুই তো বুঝতে দাওনি তোমরা... মা তুমি মানাতে পারবেনা তাই বাবা এককথায় উঠে এসেছিলো এই সুন্দর সাজানো ফ্ল্যাটে... সেখানে বাবার সাথে তোমার আর আমার ছোট্ট নিখুঁত সংসার...
বাবাকে কোনোদিন রাগতে দেখিনি... শুধু মাঝে মাঝে দেখতাম খুব চিন্তা করতে, তুমি কোথাও না বলে গেলে মুখ কালো করে অধীর ভাবে অপেক্ষা করতে.. তখন বুঝিনি, এখন বুঝি তোমায় নিয়ে বাবা বরাবরই possessive ছিলো একটু বেশি...
বছরের সেই ঘুরতে যাওয়া গুলোও খুব মনে পড়ে মা.. আমরা তিন জন একসাথে যেতাম.. বাবা একবার অফিস থেকে ট্যুর প্ল্যান করলো বলে কি মারাত্মক রেগে গিয়েছিলে তুমি .. বাবা তাড়াতাড়ি পরদিন অফিস গিয়েই cancel করে তোমায় ফোন করে জানিয়েছিল... আর তারপরেই তুমি আমাদের সিমলা যাওয়ার প্ল্যান করলে... সব প্ল্যান তো তুমিই করতে মা... আমার এগারো বছরের জন্মদিনে চাইনিজ রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়ার প্ল্যানটাও যেমন তুমিই করেছিলে.. কি সুন্দর সাজিয়েছিলে আমায় সাদা ফ্রক পড়িয়ে...
মনে আছে.. ওখানেই কেক কেটে প্রথমে তোমাকেই খাইয়েছিলাম... তারপর তুমি উঠে গেলে ওয়াশরুমে .. আমি আর বাবা তখন কি মাত্রায় যে খুশি.... কেক খাচ্ছি, আর মেনু দেখে কি অর্ডার করব তাই নিয়ে খুনসুটি করছি... বাবাও অর্ডার টা দিয়ে ওয়াশরুমের দিকে গেলো.. তুমি তো জানতে বাবার চিরকালের অভ্যাস, খাওয়ার আগে ওয়াশরুমে গিয়ে হাত মুখ ধোয়া .. আর তাই এগিয়ে যেতেই সামনে বসে থাকা reception এর সুশ্রী মহিলা বাবা কে ডেকে হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলো চিরকুটটা.. তোমার স্বেচ্ছায় রেখে যাওয়া শেষ চিহ্ন,যা আমার জীবনের প্রথম ক্ষতচিহ্ন হয়ে রয়ে গেছে ....বাবার হাত পা অবশ হয়ে গিয়ে বসে পড়তেই আমি হাতে নিয়ে দেখেছিলাম মা ছোট সেই চৌকো কাগজটা.. তুমি লিখেছিলে,"this isn't the life, I wanted.. "... আমায় সাদা ফ্রকে সাজানোর সাথে সেদিন তুমি আমার জীবন টাকেও সাদা রঙে সাজিয়ে, বেরঙিন করে .. জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে চলে গিয়েছিলে... আজ জানতে ইচ্ছে করে কি করে পেরেছিলে মা....
না রাগ হয়নি তখন.... অনুভবে ছিলো শুধু তোমার অভাব...আমার মতোই বাবারও.. নিপুণ হাতে সব তো তুমিই সামলাতে...তাই তারপর আমাদের নড়বড়ে হাতে দুর্বল ভাঙাচোরা মন নিয়ে আবার সমস্তটা গুছিয়ে নিতে খুব বেগ পেতে হয়েছিলো জানো ...
দেড় বছর পরে আবার বাবা যখন বিয়ে করলো আমি নিরুৎসাহিত নিরুত্তাপ ছিলাম... গ্রহণও করতে পারিনি.. অগ্রাহ্যও করতে পারিনি... বাবা হয়তো আমার কথা ভেবেই বিয়ে টা করেছিলো ..মনে হয়, তোমাকে ভালোবেসেছিলো বলেই বুঝতে পেরেছিল.. তুমি আর ফিরবে না, তাই অপেক্ষা করেনি আর শুধু শুধু.... সত্যিই তো তুমি আর ফিরে এলে না মা...
জানো মা আমার সাথে ওই মহিলা কখনো খারাপ ব্যবহার করেননি... ভাই হলো.. তারপরও না.. বরং আমায় নিয়ে বেশিই চিন্তিত থেকেছেন সবসময় .. মনে আছে যখন ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান করলেন ডিসেম্বরে .. বাবাকে আমার সামনেই ডিনার করার সময় টেবিলে বসে বুঝিয়েছিলেন, আমার পরীক্ষা সামনে.. তাই আমার থেকে যাওয়াটাই উচিত.. বাবা শুনে খুশিই হলো, আমার এত খেয়াল রাখেন দেখে.. বাবার মুখ দেখে সেদিন বুঝেছিলাম... কিন্তু মুখে বলেছিলো, "পারবি তো থাকতে...? অসুবিধে হবে না তো.."...
মুখে কিছু না বলে মাথা নেড়েছিলাম শুধু...
অনেকদিন পড়া থেকে এসে দেখেছি বাড়ির গেটে তালা বন্ধ.. আমি নির্দিষ্ট জায়গা থেকে চাবি বের করে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকেছি.. একা অনেক রাত পর্যন্ত অভুক্ত অবস্থায় থাকার পর যখন সবাই ফিরেছে.. আমায় মহিলা বলেছেন," তোমার পড়া ছিলো.. তাই বলিনি তোমাকে আর.. গেলেই শুধু শুধু কামাই হতো.. আমরা খেয়ে এসেছি.. ফ্রীজে খাবার রাখা আছে.. খেয়ে নিও"..
ফ্রিজের ঠান্ডা বাসি খাবার খেয়ে, সব পরিষ্কার করে ধুয়ে মুছে ঘরে যাওয়ার পর ওই রাতের বেলাটুকু তোমায় পেতাম মা ,ডায়েরির ওই পৃষ্ঠাগুলোতে.. কেন গেলে মা.. বাবার ওপরও আসতে আসতে রাগ হচ্ছিলো, ক্ষোভ জন্মাচ্ছিলো.. কেন তোমায় খুঁজলো না আর , হয়তো আবার তুমি ফিরে আসতে বাবার কাছে আগের মতো ..আর লিখতে --'অবশেষে ফিরতেই হলো.. নিজের কাছে, ভালোবাসার কাছে হার মেনে'.., কেন চলে যেতে দিলো তোমায় বাবা এত সহজে, কেন একবারের জন্যেও খোঁজ করলো না ... আচ্ছা মা, বাবা কি আমাকেও আর খুঁজবে না........
আমিও তো তোমারই মেয়ে মা.. তাই না পারার সাথে শেষ অবধি আর আপোষ করতে পারলাম না.. আজ বাড়িতে আবার জন্মদিন.... ভাইয়ের .. ওরা ভাড়া করা অনুষ্ঠান বাড়িতে চলে গেলো আমার সামনে দিয়েই,বাড়ি একেবারে ফাঁকা রেখে যাবে কি করে, তাই আমার নাকি না গেলেও চলবে....আমিও সবসময়ের মতো মুখে কিছু না বলে চুপ করেই ছিলাম...
দেখলাম হাতে অনেকটা সময়.. বাড়িতে আমি একা.. তাই নিপুণ ভাবে একটা সাদা কাগজ ছোটো চৌকো করে কেটে ডাইনিং টেবিলের ওপর চাপা দিয়ে সাজিয়ে রেখে এসেছি.. তাতে ঠিক তোমার মতো করেই লিখেছি মা ... "this isn't the life, I wanted"...
দূরপাল্লার বাসের জানলার কাঁচের ওপাশে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বাইরের বাহারি দৃশ্য অস্পষ্ট হয়ে আসে.. চোখ ঝাপসা হয়ে উপচে পড়ে ফোটা ফোটা অভিমান, কষ্ট, ক্ষোভ ....


*************সমাপ্ত*************



Rate this content
Log in

Similar bengali story from Abstract