Manasi Ganguli

Abstract


5.0  

Manasi Ganguli

Abstract


বন্দিনী কমলা

বন্দিনী কমলা

6 mins 689 6 mins 689

 বন্দিনী কমলা


    বাবার বড় আদরের ছোট মেয়ে কাজলের বিয়ে হলো এক অভিজাত, বনেদি পরিবারে। দোল, দুর্গোৎসব সেখানে লেগেই থাকে। ধর্মপরায়ণ বাবা খুব খুশি এমন একটি পরিবারে মেয়ের বিয়ে দিতে পেরে। বিয়ের পর মেয়ে চলে যাবে অন্য রাজ্যে স্বামীর কর্মস্থলে। বৌভাত মিটে গেছে দুদিন আগে, বাড়িতে নারায়ণ পুজো হবে, স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে বসবে ঠাকুরঘরে পুজোর সময়, ওদের উপলক্ষেই পুজো যে। কাজল বিয়ের বেনারসি পর়ে ঠাকুর ঘরে গিয়ে বসে জোড়টা কোলে নিয়ে। পাশের আসনে অভ্র বসবে।ঘরে শ্বশুর শাশুড়ি জায়েরা সবাই উপস্থিত। অভ্র আর আসে না। অনেক ডাকাডাকিতে এসে বসল শেষে। উসখুস করতে থাকে কখন পুজো শেষ হবে বলে। পুজো শেষ হলেই লাফ দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। কাজলের খুব বিসদৃশ লাগে, ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারে না। ভক্তিমতী মেয়ে সে, বাড়িতে পুজোপাঠ লেগেই থাকে, অভ্রর এমন আচরণ ভালো লাগলো না তার। সব মিটে গেলে ঠাকুর ঘরে প্রণাম করে বেরিয়ে যখন অভ্রকে দেখতে পেল জিজ্ঞেস করল কাজল, "তুমি অত দেরী করে ঠাকুর ঘরে গেলে,ঠাকুর প্রণাম না করেই বেরিয়ে এলে যে? পুজোটা তো আজ আমাদের দুজনের জন্যই হল,তবে?" শ্বশুরমশাই সামনেই ছিলেন শুনে বললেন, "আমার এই নাস্তিক ছেলেটাকে একটু আস্তিক করার চেষ্টা করো তো মা"। এবার কাজল সবটুকু বুঝতে পারলো। অভ্রকে বললো, "আমাদের বাড়িতেও কাল যেতে হবে,পরশু পুজো,সেখানে পুজোর সময় যেন এরকম কোরো না, বাবা খুব দুঃখ পাবেন তাহলে।" অভ্র বলে, "বাবাকে বলে দেবে তোমার জামাই নাস্তিক, ঠাকুর দেবতা মানে না"।কাজলকে আর কিছু বলতে হলো না,শ্বশুরমশাই ছেলেকে ধমক দিলেন, "কাজল যা বলছে তাই শুনবে। নতুন জামাই গিয়েই নাস্তিক না আস্তিক করার কোন দরকার নেই। আমাদের আর সেখানে গিয়ে ছোট কোরো না। তাঁরা ভাববেন ছেলেকে আমরা কোন শিক্ষা দিতে পারি নি।" অভ্র থামে না, "বলে কি মুশকিল, সত্যি কথাটা বলা যাবে না?" বাবা আবার ধমক দেন তাকে, "তোমায় আর সত্যবাদী যুধিষ্ঠির হতে হবে না,ওসব নিজের মধ্যেই রাখো"। অভ্র হেসে সেখান থেকে চলে গেল।

    এরপর সব মিটে গেলে দুই বাড়ির পুজো সেরে ওরা চলল অভ্রর কর্মস্থলে। এতদিন একা ছিল অভ্র, কাজলকে সেখানে গিয়ে সংসার সাজাতে হবে। আলাদা করে কোথাও হানিমুন আর যায়নি ওরা, অত ছুটি নেই অভ্রর,কাজলের কাছে নতুন জায়গা,ভালো লাগছে খুব ওর। দিনের বেলা সংসার গোছায়,সন্ধ্যেবেলায় ঘুরতে বেরোয়। অন্তর্বর্তী জায়গায় তেমন ঘোরার কিছু নেই যদিও তবু চেনা পরিচিতদের বাড়ি অথবা শপিং কমপ্লেক্স এই হলো ওদের গন্তব্য। এখানে এসে কাজলের তখনও ঠাকুর পাতা হয়নি,একদিন মার্কেটে গিয়ে দুটো ঠাকুরের ছবি ছোট ছোট ডিস, গ্লাস,ধূপদানি এসব কিনতে গেলে অভ্র জানায় ঘরে কিন্তু ঠাকুর পাতা চলবে না,আমি ওসব পছন্দ করি না,ঈশ্বরে বিশ্বাসও করি না।" এমন একটা ধাক্কায় কাজলের চোখে জল এসে যায়,চুপচাপ ফিরে আসে দোকান থেকে,কোনো কথা বলে না। অভ্র বুঝতে পারে ব্যাপারটা খুব একটা ভালো হলো না। তাই দুজনে হাঁটতে হাঁটতে ফেরার পথে সে বলে, "আচ্ছা তোমরা যে ঠাকুর পুজো করো,সত্যি করে কি ঠাকুরের অস্তিত্ব আছে? তিনি নাকি জীবজগৎ সৃষ্টি করেছেন, তাহলে তাঁকে সৃষ্টি করলো কে? এর জবাব কেউ যদি যুক্তি দিয়ে বোঝায় তবে আমি আস্তিক হতে রাজি আছি। আজ পর্যন্ত কোনো বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে এই জগত,এই সৃষ্টি কোনো সর্বশক্তিমান সত্তা বানিয়েছেন। সুতরাং ভগবান বলে কেউ নেই।" কাজল কোনো উত্তর দেয় না,চুপ করেই থাকে। চলতে থাকে সংসার, ঘর গোছানো। কদিন পর,অভ্র অফিস গেলে কাজল তার সুটকেস খালি করে জামা কাপড় আলমারিতে রাখার সময় হঠাৎ চোখে পড়ে যায় মায়ের দেওয়া দুটো ক্যালেন্ডার রোল করা যাতে ঠাকুরের ছবি রয়েছে, একটায় মহাদেবের ছবি আরেকটায় লক্ষ্মীদেবীর ছবি। কদিন কোনো ঠাকুর প্রণাম করতে না পেরে ওর ভালো লাগছিল না,যদিও চান করে রোজই মনে মনে ঠাকুর প্রণাম করে ও। কিন্তু ঠাকুরের ছবি দুটো কোথায় রাখা যায়,অভ্র যে একদম পছন্দ করে না। হঠাৎ মনে হল ওদের বাসাবাড়ির একটা ঘর বিশেষ ব্যবহার হয় না,সেখানে একটা দেওয়াল আলমারি রয়েছে কাঠের পাল্লা দেওয়া। সেটা খুলতে দেখল পাল্লার ভেতরে হুক লাগানো রয়েছে,তাতে একটা টুপি আটকানো। কাজল টুপিটা বার করে একটা হুকেই দুটো ছবি লাগিয়ে রাখলো। মনে মনে ভাবলো,"যদি একটা ছোট পেরেক পাই, আরেকদিকের পাল্লায় লাগিয়ে নিলে দুটো ছবি ভালোভাবে লাগানো যাবে।" আপাতত একটা পাল্লায় একটা ছবির উপর আরেকটা ছবি টাঙিয়ে প্রণাম করে আলমারির পাল্লা বন্ধ করলো ও। "থাকো মা লক্ষ্মী তুমি 'বন্দিনী কমলা' হয়ে, মনে মনে বলল ও। তবে খুশি হলো ভগবানকে তার ঘরে জায়গা দিতে পেরে। রোজ চান করে ঠাকুর প্রণাম করে ও আলমারি খোলে আর একটা নতুন ডিসে একটু চিনি দিয়ে ঠাকুরকে দেয়। সন্ধ্যেবেলায় একটু ধূপ দিতে পারে না বলে মনটা খারাপ লাগে।

     এভাবেই চলছিল বিয়ের পর পাঁচ মাস কেটে গেছে,পুজোয় ওরা বাড়ি আসছে। খুব আনন্দ কাজলের,কতদিন সবাইকে দেখেনি। শ্বশুরবাড়িতে পুজো,খুব আনন্দে পুজো কাটলো,মায়ের কাছে যাওয়া হয়নি। বিজয়ার পর মায়ের কাছে গেল ওরা,মা নতুন সংসারের কথা সব জানতে চাইলেন, ঠাকুর পেতেছে কিনা,পুজো করে কিনা,সন্ধ্যে দেয় কিনা সব। কাজল আর অত কথা মাকে জানালো না, বলল, "ওখানে আমি সব চিনি না, ঠাকুরের বাসন ধূপদানি কিছু কিনতে পারি নি"। মা নিজের ঠাকুরের বাসন থেকে মেয়েকে গুছিয়ে দিয়ে দিলেন,দুটো ঠাকুরের ছবি, অনেকগুলো ধূপের প্যাকেট কিনিয়ে আনালেন। সেসব দিয়ে দিলে কাজল স্যুটকেসে গুছিয়ে নিল। ফিরে গিয়ে ও সেই দেওয়াল আলমারি একটা তাক খালি করে ঠাকুর পাতে,মিষ্টি জল দেয়,ধূপ দেয়,অভ্র জানতেও পারে না। ওর অনুপস্থিতিতেই হয় এসব। সন্ধ্যায় ধূপ জ্বালায় অভ্রর আসার আগে ধূপের গন্ধ চলে যায়। একদিন অভ্র হঠাৎ করে কাজল সন্ধ্যে দেবার পরপরই বাড়ি ফিরে আসে,সারাবাড়ি ধূপের গন্ধে ম ম করছে তখন। খুব ভালো লাগে অভ্রর কিন্তু ধূপের গন্ধ কোথা থেকে আসছে তা অনুসন্ধান করতে যায়। কাজলের মুখ শুকিয়ে যায়,ভাবে খুব রাগ করবে হয়তো অভ্র। একে তার অপছন্দ,তার ওপর তাকে না জানিয়ে কাজল এসব করেছে। অভ্রর পেছন পেছন কাজল ওই ঘরে ঢোকে। আলমারির পাল্লা তখন খোলা,ভেতরে ধূপ জ্বলছে। অভ্র কাজলের দিকে ঘুরে দাঁড়ায়,বলে, "আমার অন্যায় হয়েছে,আমি নাস্তিক, ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করি না কিন্তু তাই বলে আমার মতামত তোমার ওপর আমি চাপাতে পারি না। তুমি সম্পূর্ণ আলাদা একটা মানুষ, তোমার বিশ্বাসকে আঘাত করা আমার উচিত হয় নি। তুমি তোমার ইচ্ছামত যেখানে খুশি তোমার ঠাকুর রাখতে পারো, আমার তাতে কোন আপত্তি নেই।"কাজলের তখন মুখে হাসি,চোখে জল। এতদিনে তার 'বন্দিনী কমলা' মুক্তি পেল। নাস্তিক আর আস্তিকের এক ছাদের তলায় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চলতে লাগলো।

    বছর দুই বাদে ওদের একটা ফুটফুটে ছেলে হল। আদর করে নাম রাখল তার দিব্যরূপ। ছেলের মঙ্গল কামনায় কাজল ব্রত করে,মন্দিরে পুজো দিতে যায়। ছোট বাচ্চা নিয়ে একা যাওয়া অসুবিধে,অভ্র সঙ্গে যায়। সে তখন আর কট্টর নাস্তিক নয়। ওসব নিয়ে আর কোন প্রসঙ্গ কখনো ওঠেনি ওদের মধ্যে। সন্তানের মঙ্গলের জন্য তারা একসঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় পুজো দিতে যায়। কাজলের মনে পরে বিয়ের পর বাড়িতে পুজোর দিনে শ্বশুরমশাইকে সে বলেছিল, "আমি কেমন করে তোমার ছেলেকে আস্তিক করব? কেউ যদি নিজে কিছু বিশ্বাস করে থাকে এতদিন ধরে, তা পাল্টানো কি আমার পক্ষে সম্ভব? যদি সে নিজে বুঝে নিজেকে পরিবর্তন করে তবেই একমাত্র সম্ভব"। ভাবে মনে, "অভ্রর বুঝি একটু পরিবর্তন হয়েছে। এটুকুই যথেষ্ট বেশি আমার প্রয়োজন নেই"।

    বাবা-মাকে খুব ভালোবাসে অভ্র। একবার অভ্রর বাবা খুব অসুস্থ হলে কাজল মন্দিরে মানত করে তাঁর সুস্থতা কামনায়। বাবা সুস্থ হলে সেই পুজো দেবার সময় অভ্র কাজলকে পুজোর সব উপাচার এনে দেয়। কাজল মনে ভাবে,"বিপদে পড়লে যখন নিজের হাতের মধ্যে কোনো কিছু থাকে না,তখন নাস্তিকও ঈশ্বরের শরণাপন্ন হয়",কিন্তু এ নিয়ে মুখে সে কিছু বলে না। কেটে গেছে মাঝে বেশ কয়েকটা বছর,ছেলে বেশ বড় হয়েছে। কাজল আবার গান-বাজনা শুরু করেছে। বিয়ের পর এই কবছর সেসব বন্ধ ছিল। রবিবার ওর ক্লাস। ছেলে বাবা বাড়ি থাকবে,ও যাবে গানের ক্লাসে। বিকালে ক্লাস,প্রথম দিন গানের ক্লাস শেষ করে আসতে বেশ অন্ধকার হয়ে গেল। "বাড়ি ফিরে ছেলেটাকে খেতে দিতে হবে,অভ্রকে চা। প্রথমে গিয়ে হাত পা ধুয়ে চেঞ্জ করে সন্ধ্যেটা দিয়ে নিতে হবে",এইসব ভাবতে ভাবতে কাজল ফিরছে। বাড়িতে পৌঁছে ডোরবেলটা বাজাতেই "মা এসে গেছে" করে ছুট্টে গিয়ে দরজা খোলে দিব্যরূপ। কাজল নাক টেনে টেনে শোঁকে,"কি ব্যাপার ধূপের গন্ধ!" গন্ধটা ঠাকুরঘর থেকে আসছে দেখে পায়ে পায়ে সেদিকে এগোয় সে। গিয়ে দেখে ঠাকুরের আসনে প্রদীপ জ্বলছে,ধূপ জ্বলছে। ছেলেকে জিজ্ঞেস করে, "তুই জ্বেলেছিস দিব্য?" ছেলে বলে,"না বাবানি জ্বেলেছে"। কাজলের মুখ হাসিতে উদ্ভাসিত। অভ্রর কাছে গিয়ে দাঁড়ায় হাসতে হাসতে,বলে, "তুমি আস্তিক না নাস্তিক?" অভ্র হেসে ফেলে, বলে,"তুমি আমায় দুর্বল করে দিয়েছো"।


Rate this content
Log in