অদ্ভূতুড়ে
অদ্ভূতুড়ে
ছোট বেলায় ভূতের গল্প শুনতে শুনতে ভাবতাম কবে আমি ভূত দেখবো।একটু বড়ো হতে সেই আগ্রহটা আরো বাড়ল। রাত জেগে গা ছমছমে পরিবেশে জনা কয়েক ভূতে আগ্রহী বন্ধু মিলে প্ল্যানচেট করলাম। আত্মার আগমনও হলো বলেই মনে হলো।
কিন্তু " তবু্ ভরিল না চিত্ত।"
যা চাইছিলাম তা পেলাম না, অর্থাৎ এমন কিছু সমর্থনযোগ্য
প্রমাণ পেলাম না।
কলেজের লেখাপড়ার সঙ্গে সঙ্গে
আত্মা বিষয়ক পড়াশুনো চালিয়ে যেতে লাগলাম। আত্মা সম্পর্কে
নানান তথ্য যোগাড় করার চেষ্টায় থাকলাম।
আমি যখন থার্ড ইয়ারের শেষ দিকে, তখন একটা ভয়ংকর পথ দুর্ঘটনায় আমার বাবাকে হারালাম। ভাবলাম এইবার পূর্ণ
হবে আমার মনোবাঞ্ছা। বাবা
নিশ্চয়ই আমাকে দেখা দেবেন।
কিন্তু না, বাবা হয়ত আমাকে ততটা ভালোবাসেন না, যতটা মাকে বাসেন। তাই মাকে দেখা দেন, মায়ের সঙ্গে কথা বলেন।
হয়ত মায়ের ভুল নয়তো সত্যি।
একদিন মা বললেন যে বাবা আমার জন্য খুব চিন্তিত।কারণ আত্মা সম্পর্কে আমার অতি আগ্রহই আমার বিপদের কারণ হবে। মা বললেন, "প্রতিজ্ঞা কর্
ঋক যে আত্মা নিয়ে আর ভাববি
না। তোর কিছু হলে আমার কী হবে ভেবেছিস কখনো?" মা কেঁদে
ফেলেন। আমিও আবেগের বশে
বলে ফেলি,"ঠিক আছে মা, তুমি
চিন্তা কোরো না।"
অনেক জায়গাতেই গল্পচ্ছলে আত্মার প্রসঙ্গ ওঠে। বন্ধুদের আড্ডায়, কলেজের পিকনিকে।
আমি শুনি কিন্তু মায়ের কাছে
দেওয়া কথা ফেলতে পারি না বলে
বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করি না।
এর মধ্যে হলো কী আমার এক বন্ধুর জন্মদিনে ওর বাড়ীতে গিয়ে আলাপ হলো কুণালের সঙ্গে। কুণাল আমার বন্ধু রজতের পিসিমার ছেলে, ওর ভাই, ফিজিক্স নিয়ে পড়ছে। ও নাকি আত্মা নিয়ে গবেষণা করে।
আত্মা কোন জায়গায় আছে কী নেই বোঝার জন্য একটা যন্ত্রের
সাহায্য নেয় ওরা। ওরা মানে কুণাল আর ওর পাঁচ জন বন্ধু।
ওই পাঁচ জনের মধ্যে আবার দুজন মেয়ে। যন্ত্রটার নাম, 'ই এম এফ ডিটেক্টর বা ইলেক্ট্রো ম্যাগনেটিক ফিল্ড ডিটেক্টর। এই
যন্ত্রে কোন জায়গার চৌম্বক ক্ষেত্রের তীব্রতা মাপা হয়।আমি
ভীষণ ভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়লাম
কুণালের প্রতি। মায়ের সাবধান
বাণী অগ্রাহ্য করে, মায়ের কাছে
দেওয়া কথা ভেঙে কুণালের দলের সদস্য হয়ে গেলাম।
কুণালের দলের সঙ্গে এদিক ওদিক যেতাম।
এরমধ্যে ক্যাম্পাসিং হয়ে গেল। চাকরীও পেলাম নামী কোম্পানীতে। ফাইনাল পরীক্ষা হয়ে গেলে চাকরীতে যোগ দিলাম।
মা খুব খুশি হয়ে আমার বিয়ের কথা ভাবতে লাগলো।
আমি বললাম যে কাউকে যদি পছন্দ হয়, তখন বিয়ের কথা ভাববো।
কুণাল একদিন খবর দিলো ওরা একটা সন্দেহজনক পুরনো জমিদার বাড়িতে যাবে বড়দিনের
ছুটিতে। আমিও সঙ্গী হলাম।
বলাগড় স্টেশনে নেমে টোটৌয় করে গেলাম বারো ভূতের ক্লাবের মোড়ে। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে মাইল তিনেক গিয়ে ফাঁদের হাট।
একটু এগিয়ে একটা পুরোনো জমিদার বাড়ি। ঢুকতেই গা ছমছম করে ওঠে। কথা বললে প্রতিধ্বনি
হয়ে কথা ফিরে আসে। বড় বড় নকশা কাটা থামের ওপর পায়রা
বসে আছে। সিঁড়ি র রেলিং ভেঙে
পড়ছে। দোতলায় উঠতেই 'ই এম এফ ডিটেক্টর'মেশিনের পারা
তিনশো ছাড়িয়ে গেলো। তারপর ভীষণরকম ওঠা পড়া করতে লাগল, মানে এই জায়গায় অস্বাভাবিক কিছু আছে।কুণাল ওর নানা রকম যন্ত্রপাতি বার করে
পরীক্ষা করতে লাগল। কিন্তু কিছু
দেখা গেলো না। কুণাল ঠিক করলো রাতে ওখানে থাকা হবে। স্থানীয় বিধায়কের কাছ থেকে থাকার অনুমতি পত্র নেওয়াই ছিলো। আমরা কিছু টা জায়গা পরিস্কার করে বাসের যোগ্য করে তুললাম। সেদিন সারা রাত আমরা
অদ্ভূত অদ্ভূত আওয়াজ শুনে ছিলাম। কখনো চিঁহিরবে হ্রেষ্বাধ্বনি, কখনো অশ্বখুরের শব্দ। কখনো মনে হয়েছে নারীর ক্রন্দন ধ্বনি। পায়রার ঝটাপটি
আর বাদুড়ের ডানা ঝাপটানি
আমাদের দুচোখের পাতা এক করতে দেয় নি।তিনতলার ছাদে
পায়ের আওয়াজ পেয়েছি, কিন্তু
দরজায় তালা থাকার জন্য যেতে পারিনি। অস্বাভাবিক আবহাওয়া হলেও কিছু দেখিনি। একটা বিষয়ে শুধু খটকা লাগছিল। মাঝরাতে একটি কোচোয়ান গোছের লোক, (মানে ময়দানে র আশেপাশে যেমন ঘোড়ার গাড়ি র
কোচোয়ান দেখা যায় আর কী)
এসে বলেছিলো,"হুজুর, গাড়ী রেডি আপনারা চলুন।"
"কোথায়?"আমাদের প্রশ্ন।
"আলতা বাঈএর বাড়ী।"
লোকটার পোশাক থেকে আতরের গন্ধ বের হচ্ছে ভুরভুর করে।
আমরা বলি ,"না, যাবো না।"
তারপরই কোচোয়ানটা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।
এটা যদি আত্মা হয় তাহলে বলতে হবে হ্যাঁ আমি ভূত দেখেছি।
এছাড়া কুণাল কিছু ছবি তুলেছিল
তাতে অস্পষ্টভাবে কয়েকটা ধোঁয়া
ধোঁয়া ছবির মধ্যে যেন আবছা
অবয়ব দেখা যাচ্ছিল।
কলকাতায় এসে প্রেস কনফারেন্সে সব জানালে 'বিজ্ঞান
মঞ্চ' এক বাক্যে সব তথ্য ভুল প্রমাণ করে দিল। ওরা বললো যে
আওয়াজগুলো নাকি টেপ রেকর্ডারের, কোচোয়ান নাকি
ভয় দেখানোর জন্য সাজানো।আসলে ওই বাড়ীতে কোন অসামাজিক কাজ হয় তাই লোককে ভয় দেখিয়ে দূরে রাখা হয় ইত্যাদি।
আমার মনটা ভেঙে গেলো।তাহলে
কী তারা নেই?
স্বামী অভেদানন্দের লেখা 'মরনের
পারে'বইটা খুঁটিয়ে পড়ি।উনি লিখেছেন,"বেদান্তের মতে আত্মার জন্ম নেই, আত্মা শাশ্বত অমর, এর যেরূপ ইচ্ছে সেরূপ দেহ নিতে পারে।"
অন্য অনেকের লেখা পড়লাম।
অনেক কিছু জানলাম।
জানলাম যারা দুষ্টু আত্মা তাদের
বলে 'পোল্টারজিস্ট'।
ভালো আত্মা, যারা প্রিয়জনদের উপকার করে তাদের বলা হয় 'ইনটার অ্যাকটিভ পারসোনালিটি
জাতীয় আত্মা।
পুণ্যাত্মাদের পুনর্জন্ম হয় না।তাঁরা
ইহলোক থেকে অনেক দূরে স্বর্গীয় পরিবেশে বিরাজ করেন।
জীবদ্দশায় যারা কুকর্ম করে তারাই প্রেতাত্মা হয়।যাঁরা সৎ আর ভালো তাঁরা প্রিয়জনদের দেখা দিতে পারেন, কথা বলতে পারেন।
ভাবি আমার বাবা কী ইনটার অ্যাকটিভ পারসোনালাটির পর্যায়ে পরেন? না হলে মায়ের সঙ্গে কথা বলেন কী করে? কিন্তু আমাকে কেন দেখা দেন না?
এই এত গুলো প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। আমি এক রবিবার পার্কের বেঞ্চে বসে ভাবতে লাগলাম। কোথায় আমি
তাঁদের দেখা পাবো?
বেঞ্চের আর এক পাশে এসে বসেছিল আর একটি মানুষ, আমারি মত চুপ করে বসে ছিল। হঠাৎ বলে উঠলো," আত্মার দেখা পেতে হলে ডাউহিল যেতে হবে।"
আমি মনে মনে বলি," তোমাকে কী আমি জিজ্ঞেস করেছি নাকী বাপু?"
"না, তা করো নি বটে, তবে আমারো তো একটা দায়িত্ব আছে?"
"কিসের দায়িত্ব?"
"এতো ভাবনা চিন্তা থেকে মুক্ত
করার দায়িত্ব।"
"আমি ভাবছি তো তোমার কী হে?"
"তুমি ভেবে অস্থির হচ্ছো, আর আমি উত্তরটা জানি, তাই আর কী।"
"ডাউহিলে গেলে কী হবে?"
"তোমার এতদিনে র সন্ধান সার্থক
হবে।"
হঠাৎ আমার মনে হয় যে আমি এতক্ষণ মনে মনে কথা বলছি। তবুও ও আমার সব কথার উত্তর
দিচ্ছে কী করে? পাশে তাকিয়ে আর দেখতে পেলাম না গায়েপড়া
লোকটাকে। উড়ে গেল না হাওয়ায় মিলিয়ে গেল কে জানে?
যাক গে যেখানে খুশি যাক। কিন্তু
আমার মনে 'ডাউহিল' কথাটা গেঁথে গেল।
এদিকে আমার মায়ের ইচ্ছে হয়েছে ছোটবেলার বান্ধবীর মেয়ে রুমির সঙ্গে আমার বিয়ে দেবে।
ছোটবেলায় দেখেছি। মাঝে অনেকদিন যোগাযোগ ছিল না।
এম এ পড়ছে, আবার সকালে একটা স্কুলেও পড়ায়। মা ওদের
আমাদের বাড়ীতে আসতে বলে।
রুমির সঙ্গে আমার বেশ বন্ধুত্ব
হয়ে যায়। ও আমার মতো আত্মা সম্পর্কে উৎসাহী। মা যেদিন রুমির মায়ের কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিল তার কদিন পরেই আমাকে অফিস থেকে জলপাইগুড়ি বদলী করে দিল।
মা তো প্রচুর কান্নাকাটি করতে শুরু করলো। আমি মাকে সঙ্গে
নিয়ে যেতে চাইলাম। মা বললো বাবাকে একা রেখে যাবে না। আর মা এও বললো যে বাবা চান না আমি জলপাইগুড়িতে যাই।
কিন্তু আমি যাবোই ঠিক করলাম।
অফিসে র ব্যাপার ।মা বললো
চাকরী ছেড়ে দিতে। আমি তাও
গেলাম।
একমাস ভালোই কাটলো। ওখানে কিছু বন্ধু হলো। পরপর তিন দিন
ছুটির পড়ায় আমরা
কার্শিয়াংএ বেড়াতে গেলাম। পরদিন দ্রষ্টব্য স্থান গুলো দেখতে বের হলাম।
ছোট্ট সাদা অর্কিডের দেশ।লেপচা ভাষায় যাকে বলে 'খর্সং'।
এই খর্সং থেকেই কার্শিয়াং নামের উৎপত্তি বলে মনে করা হয়।
এর আর একটি অর্থ নাকি 'ভোরের তারা'। যথার্থই ছোট্ট সাদা অর্কিড গুলো দেখলে তারার কথাই মনে পড়ে।
ঈগল'স ক্রেগ, হাসেন খোলা,রক গার্ডেন, সুভাষ চন্দ্র বোস মিউজিয়াম দেখলাম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুররের বাড়ী, গিদ্দা পাহাড়ে
রাম সীতার মন্দির। ঐখানে নেতাজীকে বন্দি করে রাখা হয়েছিলো, দেখলাম।
সেন্ট পলস চার্চ ও ক্যাথলিক চার্চ
দেখা হলো। অজস্র নামী দামী স্কুল কলেজ দেখে আমরা ডাওহিলে পৌঁছলাম।
পাহাড়ের খাড়াইএর মধ্যে কিছু নীচু জায়গা অর্থাৎ ডাউন হিল
বা নিচু পর্বত। এই ডাউন হিল থেকেই ডাওহিল শব্দের উৎপত্তি।
এখানে ব্রিটিশ আমলের দুটি বিখ্যাত স্কুল আছে, 'ডাওহিল
গার্লস ও ভিক্টোরিয়া বয়েজ।আর আছে ইকো পার্ক, ডিয়ার পার্ক,
ওয়েস্টবেঙ্গল ফরেস্ট স্কুল ও
ফরেস্ট স্কুল মিউজিয়াম।
এই অবধি দেখিয়েই গাইড দুজন
ফিরে যেতে বললো, কারণ বিকেলের পর এই অঞ্চলে নাকি
কেউ থাকে না।
আমার হঠাৎ মনে পড়ে গেলো
কলকাতার পার্কের সেই অদ্ভূতুড়ে
লোকটার কথা। যে বলেছিল
ডাওহিলে গেলেই আমার সব প্রশ্নের জবাব পাবো। তাহলে আমি
আমার গন্তব্যে পৌঁছে গেছি।
ইস, এখন যদি কুণাল থাকত তবে ওর 'ই এম এফ ডিটেক্টর মেশিন
দিয়ে পরীক্ষা করা যেতো যে কোন অস্বাভাবিকত্ব আছে কিনা। অমি
একটু সময় এখানে থাকতে চাইলাম। গাইড প্রবল আপত্তি জানালো। বললো সন্ধ্যে হলে নাকি
এখান থেকে আর ফেরা যায় না।
এখানে এমন এমন কিছু দেখা যায় , যা দেখে অনেকে পাগল হয়ে গেছে। অনেকেই আর ফেরে নি। এখান থেকে ফরেস্ট অফিস পর্যন্ত যে রাস্তাটা গেছে তাকে বলে 'ডেথ রোড' অর্থাৎ মৃত্যু সড়ক।
পাশে গভীর খাদ আর ঘন জঙ্গল।

ব্রিটিশ আমলে কত মানুষ মেরে লাশ গুলো এখানে ফেলে দিত,
তার ঠিক নেই।
ফরেস্ট অফিসের দিক থেকে কিছু
মানুষ ফিরছিল, তারা আমাদের
দেখে অবাক হলো। বললো এখানে থাকা আর ঠিক নয়। একটু পরেই তারা বেরিয়ে যাবে।
বলে তাড়াতাড়ি পা চালাল।
গাইড জোর করে আমার হাত ধরে
টেনে ফিরিয়ে নিয়ে চলল। বলল
হোটেল থেকে নির্দেশ দেওয়া আছে ডাওহিল থেকে বিকেলের মধ্যে ফিরে আসতে। সবাই ফিরে চলল। গাড়ীটা একটু দূরে দাঁড়িয়ে
ছিল। আমি সকলের পেছনে ছিলাম। একটি মেয়ে আমার
পাশে পাশে হাঁটছিল, আমাদের দলের নয়। আমার দিকে তাকিয়ে
হাসল। বলল,"আমি ক্রিস্টিনা, এই দিকেই থাকি। তোমার এখানে
থাকতে খুব ইচ্ছে করছে তাই না ?
কাল তাড়াতাড়ি এসো, ভালো লাগবে।"
গাড়ীর কাছে এসে গিয়েছিলাম।
ক্রিস্টিনা টাটা করলো। আমিও
হাত নাড়লাম।
গাইড বললো, "কাকে হাত নাড়লেন?"
"ওই যে একটা মেয়ে নাম বললো ক্রিস্টিনা" আমি বলি।
"কেউ তো নেই এখানে। খুব সাবধান, এই জায়গা ভালো নয়।"
হোটেলে ফিরে গেলাম। পরদিন
আমাদের ফিরে যাবার কথা। আমি ভোর বেলা বন্ধুরা ওঠার আগেই একটা চিঠি লিখে বেরিয়ে গেলাম। হোটেলের অফিসে বলে গেলাম যে অন্যরা চলে গেলেও আমার ঘরটা আরো দুদিন থাকবে।
সোজা চলে গেলাম ডাওহিল।
পাহাড়ের কোলে , সবুজ ঘাসের জঙ্গলে কুয়াশা মাখা সকাল কী
মায়াবী, ছবির মত সুন্দর। এই
সৌন্দর্য্যের আড়ালে যে মায়াবী রহস্য লুকিয়ে আছে তার খোঁজ
করতেই আমার আগমন।
ডাওহিল থেকে এগিয়েছে
চিমনিগাঁও যাবার ট্রেকিং রুট,জানাল এক কাঠুরে,ও জঙ্গলে
যাবে কাঠ কাটতে।বললো,"ওটা
ফরেস্ট অফিস যাওয়ার রাস্তা,
ডেথ রোড, ওদিকে যেও না।"
ওই রাস্তাটাই তো আমার গন্তব্য।
এগিয়ে গেলাম। আলো আঁধারি
রাস্তা, ঘন কুয়াশায় মোড়া। সেই
কুয়াশার মধ্য থেকে বেরিয়ে এলো
সেই মেয়েটা, ক্রিস্টিনা। আমার
হাত ধরলো। আমার জ্যাকেট পড়া শরীর কেঁপে উঠলো অথচ ক্রিস্টিনার দেহে কোন গরম পোশাক নেই।
পাতলা একটা লাল ফ্রক পড়ে আছে। মাথার চুলে কুয়াশা যেন স্কার্ফের মত জড়িয়ে আছে।

আমাকে টেনে নিয়ে গেলো আরো গভীর জঙ্গলে।বড়ো বড়ো গাছের পাতায় চাঁদোয়া তৈরি করে অন্ধকার করে রেখেছে জায়গাটা।

একটা গাছের নীচে আমাকে বসাল ও। আমি যেন কেমন বিবশ হয়ে গেছি। ক্রিস্টিনা যা বলছে
আমি তাই করছি।
ও কত কথাই বলে যাচ্ছে, আমি
শুনছি কিন্তু মাথায় ঢুকছে না কিছু ই। আমি ভাবছি শুধু তাদের কথা, যাদের খোঁজে আমি এসেছি।
বড়ো বড়ো গাছ গুলোতে যেন যত
আতঙ্ক। একটাও পাখী কেন ডাকছে না।
হঠাৎ ই ক্রিস্টিনা আমার হাত ধরে। মিষ্টি করে বলে,"উইল ইউ
ম্যারি মি ঋক? আমি খুব একা।"
চমকে তাকাই ওর দিকে। একবেলার পরিচয়ে কেউ বিয়ে করতে চায় নাকি?
বলি,"না ক্রিস্টিনা , তুমি আমার বন্ধু। আমি তো রুমিকে বিয়ে করবো।ও আমার বাগদত্তা।"
মুহুর্তে ক্রিস্টিনার মুখটা বদলে যেতে লাগলো।ভেঙে চুরে বিকৃত হয়ে ও এক বৃদ্ধায় পরিণত হতে
লাগলো। তারপর ওর জরাগ্রস্ত
দুই ওষ্ঠ দিয়ে আমার ওষ্ঠ শুষে
নিতে লাগল।

আমি যতই নিজেকে
ছাড়ানোর চেষ্টা করি ততই শক্ত
কঙ্কালের মত আঙুল দিয়ে আমার
গাল দুটো চেপে ধরে। আমার শরীর নিস্তেজ হয়ে গেল , আমি জ্ঞান হারালাম। যখন জ্ঞান এলো
তখন অন্ধকার আরো নিবিড়।
দূর থেকে ভেসে আসছে রক্তজল
করা আর্তনাদ। ঢ়ং ঢং করে বেজে
উঠলো অনেক গুলো ঘন্টা।
অন্ধকারে গাছের ফাঁকে ফাঁকে
লাল বিন্দুর মত কী যেন জ্বলছে।
আমি উঠে আন্দাজে হাঁটতে শুরু করলাম। প্রথমে যেখান থেকে হাঁটা শুরু করেছিলাম সেখানে
এসে পৌঁছলাম। এখানে জঙ্গল কম ঘন। এখনো সন্ধ্যে পুরোপুরি হয় নি অথচ জঙ্গলের ভেতর ঘন অন্ধকার ছিলো। ওই তো দূরে দেখা যাচ্ছে ভিক্টোরিয়া বয়েজ স্কুল। পালাতে হবে। ঠোঁট দুটো এখনও জ্বালা করছে ক্রিস্টিনার
চুম্বনের দৌলতে।
আবার যদি আসে? তার আগেই পালাতে হবে।
দৌড়তে যাবে হঠাৎ এসে কে হাত ধরল। ও মা! এযে রুমি।
"রুমি তুমি কখন এলে? কেন এলে? এই জায়গা ভালো না রুমি,
চল আমরা পালাই। "
আমি আর রুমি হাতধরা ধরি করে
দৌড় লাগালাম, কিন্তু একপাও
এগোতে পারলাম না। আমাদের র যেন অদৃশ্য দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা
হয়েছে। আমাদের পা চারটে ছুটছে, আমরা হাঁপিয়ে যাচ্ছি,কিন্তু
একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ একটা মুন্ডুহীন বাচ্ছা ছেলে
দৌড়াদৌড়ি করতে লাগল। মাথা নেই, মুখ নেই অথচ হিহি করে
হাসছে বাচ্ছাটা। তার সেই বীভৎস
হাসি বুকের রক্ত শীতল করে দিচ্ছে। গাছের সারির ফাঁক দিয়ে
লাল লাল চোখের চাহনি তীব্র ফলার মত বিদ্ধ করছে আমাদের।
আমি ঘামছি কিন্তু রুমি একটুও
ভয় পাচ্ছে না। রুমি আমাকে বললো,"সারা জীবন ধরে যা খুঁজেছো, তার দেখা পেয়েছো তো? জীবন সার্থক হয়েছে তোমার?"
আমি বলি,"চল পালাই।"রুমির হাত ধরে টানি। সামনে এসে দাঁড়ায় এক সাহেব। পুরনো দিনের
সাহেবদের মত পোশাক। সেপাইদের মত কোমর থেকে তলোয়ার বার করে বলে,"এক পা
এগিয়েছো কী মরেছো। এখানে
নিজের ইচ্ছা য় এসেছো, কিন্তু
নিজের ইচ্ছেয় যেতে পারবে না।"
অদৃশ্য হয়ে যায় কথা কটা বলে।
রুমি দূরে একটা পুরোনো বাংলোর দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলে,"চলো
ওখানে আশ্রয় নিই।"

আমরা বাংলোর দরজায় করাঘাত
করি,"কেউ আছেন? ইজ এনিবডি
দেয়ার?"
দরজা খুলে যায়। একটি মেয়ে, অনেকটা ক্রিস্টিনার মত ফ্রক পরে আছে। ফ্যাকাশে গায়ের রঙ।
বিনীত স্বরে বলে,"কাম ইন প্লিজ"।আমরা ভেতরে ঢুকি।
উৎকন্ঠায় ভেঙে পড়েছে আমার দেহ। ধপ করে সোফায় বসে পড়ি।
ক্যাঁচ করে আওয়াজ হয় পুরোনো
সোফায়। "খুব খিদে পেয়েছে"মনে মনে বলি,"একটু জল পেলে ভালো হত।" মনে মনেই বলি কারণ রুগ্ন মেয়েটিকে খাটাতে ইচ্ছে করছিলো না।
মেয়েটি একগ্লাস জল এনে সামনে
রেখে বললো ," কফি আর স্যান্ডুইচ দেবো?"
সেই মুহুর্তে মেয়েটিকে ঈশ্বর প্রেরিত মনে হলো। আমি খেতে
শুরু করলাম, রুমি কিছু ই খেলো না, বলল ওর খিদে নেই।
মেয়েটি চলে গেছে। আমি সোফায় গা এলিয়ে দিলাম। জানলা দিয়ে
দেখি দূরে অন্ধকারে শুভ্র পোশাক পরে এক নারী যেন হাওয়ায় ভেসে
বেড়াচ্ছে। আমার শরীর অস্থির করতে লাগলো। আমি চোখ বুঁজলাম। বয়েজ স্কুলের দিক থেকে হাড় হিম করা আওয়াজ
নিস্তব্ধতাকে খান খান করে ভেঙে দিল। একটু পরে অনুভব করলাম
আমার শরীরের ওপর ভারী কিছুর উপস্থিতি। তাকিয়ে দেখি রুমি
আমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হবার চেষ্টা
করছে। ওর চোখ মুখ লোভীর মত চকচক করছে। আমি বলি,"ছিঃ
রুমি,আমাদের এখনো বিয়ে হয় নি। কদিন সবুর করো। আমার
চোখে ছোট হয়ে যেও না।"
ঠিক তখনই পাশের ঘর থেকে শোনা গেল পুরুষ কন্ঠের তর্জন গর্জন। বেত দিয়ে কাউকে
মারার আওয়াজ। নারী কন্ঠে
কাকুতি মিনতি।
আমার সিভালরি জেগে ওঠে।
ভয় ভুলে আমি পাশের ঘরে গিয়ে উপস্থিত হই। বিকেলে দেখা সেই
সাহেব বেত দিয়ে মেম সাহেব কে
মারছে। বলছে "আমার কফি আর স্যান্ডুইচ কোথায়? এত সাহস তোর ! আজ মেরেই ফেলবো।"
ফ্যাকাশে রুগ্ন মেয়েটি বলছ,"গড
আমাকে ক্ষমা করতেন না, যদি
অভুক্ত অতিথিকে খেতে না দিতাম।"
"চোপ!"
হঠাৎ মেয়েটি মরিয়া হয়ে চেঁচিয়ে
ওঠে,"তুমি চুপ করো,আর কতো
অত্যাচার সহ্য করবো বলতে পারো!"
মেয়েটির কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে সাহেব হাতের ছোরাটা আমূল বিদ্ধ করে দিল মেয়েটির
বুকে। তীক্ষ্ণ আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়ল সেই অভিশপ্ত প্রান্তরে।
খানিক নিস্তব্ধতা। রুমি বলে উঠলো,"পুলিশ পুলিশ।"
সাহেব ঝটিতি ছোরাটা টেনে আমার হাতে দিয়ে জানলা দিয়ে
পালালো।
পুলিশ দরজা ভেঙে ঢুকছে। হঠাৎ সারা বা়ংলো কেঁপে উঠলো থরথর করে। ভূমিকম্প। ফ্যাকাশে
মেয়েটি বললো,"পালাও"তারপর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো।
রুমি আমার হাত ধরে টেনে জানলার কাছে নিয়ে গিয়ে বললো,"লাফ দাও"। আমরা
লাফ দিলাম। বাংলোটা ভেঙে পড়লো তাসের ঘরের মত।
পালকের মত উড়তে উড়তে খাদের নিম্নাভিমুখে পতিত
হতে হতে দেখলাম মেয়েটা রুমি
নয়, ক্রিস্টিনা। সবেগে মাটিতে আছড়ে পড়ার সময় ক্রিস্টিনা
কঙ্কাল হয়ে গেল।
অনেক ক্ষণ পর আমি বসে আছি
ভিক্টোরিয়া বয়েজ স্কুলের সামনে।
ঘন অন্ধকার ভেদ করে লাল চোখ
গুলো উঁকি মারছে। মুন্ডুকাটা
বালক নিজের মুন্ডু নিয়ে লোফালুফি করছে। শ্বেতবসনা নারী ভেসে বেড়াচ্ছে। কিন্তু আমার
একটু ও ভয় করছে না। আমার মনটা ফুরফুরে লাগছে। অনেক দিনের প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছি।
অনেকদিন পেরিয়ে গেছে ওই ঘটনার পর। আমি এখন কলকাতার বাড়ীতেই থাকি। মায়ের সঙ্গে। মা আগে বাবার সঙ্গে
গল্প করতো, এখন আমার সঙ্গে ও
গল্প করে। মানে আমি ও বাবা সব সময় মায়ের সঙ্গে ই থাকি।
আমি এবং আমরা খুব সুখী।
বোকা লোকেরা বলে মায়ের মাথা
নাকি খারাপ হয়ে গেছে, আপনমনে বিড়বিড় করে।
কী বোকা, তাই না?
শুধু দুঃখ একটাই রুমির বিয়ে
অন্যত্র হয়ে গেছে।
....."অজো নিত্য শাশ্বতোহয়ং
পুরাণোন হন্যতে হন্যমানে শরীরে।"
আত্মা শাশ্বত,আত্মা নিত্য, শরীরকে হত্যা করা গেলেও
আত্মাকে হত্যা করা যায় না।।
