কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা
কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা
বনেদী বংশের বনেদী বাড়ী চৌধূরী ভিলা।আভিজাত্য ও কৌলীন্য নিয়ে একভাবে দাঁড়িয়ে প্রায় এক শতক ধরে। এককালে এ বাড়ী গমগম করতো । এ বাড়ীর.প্রতিষ্ঠাতা তাঁর চার পুত্র, পুত্রবধূ, নাতি নাতনি, পুতি নিয়ে মহাসমারোহে পঁচানব্বই বছরে দেহ রেখেছেন।
বর্তমানে সেই চার পুত্রের বংশধরেরা সবাই দেশ বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। বাড়ী আগলিয়ে পড়ে আছেন ছোট তরফের নাতি মহিম চৌধূরী। সুযোগ পেয়েও তিনি বিদেশে যান নি। যথেষ্ট শিক্ষিত হয়েও তিনি চাকরী করেন নি। পৈত্রিক ব্যবসা কর পৈত্রিক বাড়ী তাঁর প্রাণ।
অভিজাত চেহারার মহিম খুব শৌখীন মানুষ। তা তাঁর বেশবাসে বোঝা যায়। চোখে সোনার ফ্রেমের চশমা, পকেটে সোনার চেনে বাঁধা পকেট ঘড়ি তাঁর আভিজাত্যের সাক্ষী।
প্রতি পূজোয় বিদেশ থেকে আসেন মহিমের জ্যাতুতো দাদা, বৌদিরা। তাঁদের সন্তানরা আগে আসতো, এখন পড়ার চাপে আসতে পারেনা।
গত দুবছর ধরে দাদারা বলছেন বাড়ী বিক্রী করে দিতে, নচেৎ বাড়ীর মূল্যের ন্যায্য অংশ দিতে, কারণ তাঁরা আর আসতে পারবেন না।
এবছর এসে তাঁরা বাড়ী বিক্রীর জন্য বদ্ধপরিকর হলেন।
দালাল কে খবর দিলেন। পূজোর আগেই ফয়সালা হয়ে যাক।
দালাল ক্রেতা পাঠালেও কোন অজ্ঞাত কারণে তারা চৌধূরী ভিলা পৌঁছায় না।
অবশেষে এক অবাঙালী ধনী বাড়ী কিনতে রাজী হয় কয়েক কোটী টাকায়। তিনি মল বানাবেন এইখানে।পূজোর পর ফাইনাল কথা হবে।
পূজোর আগে বড় তরফের নাতি কল্যাণ বললেন এবার পূজো জাঁকজমক সহ হোক, এটাই এ বাড়ীর শেষ পূজো, আমি বেশী টাকা দেবো।
মেজো তরফ, সেজ তরফ আসন্ন টাকার হিসাব করতে ব্যস্ত ।
মহিম ভগ্ন হৃদয়ে চুপ করে থাকেন।
***
ষষ্ঠী সপ্তমী কেটে গেলো, দশমীর.পর পাকা কথা।
অষ্টমীর সকালে ভোগ খাবার পর বড় তরফের নাতি, কল্যাণ চৌধূরীর ঘুম আর ভাঙ্গলো না।
ডাক্তার বললেন ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক।
এই বাড়ীর পুরোনো সদস্য রঘু বললো," আমি বলেছিলাম না, কর্তাবাবা বলেছিলেন বাড়ী বিক্রী করলে অমঙ্গল হবে।
কল্যাণের দেহ পিস হাভেনে রাখা হলো, কারণ তাঁর ছেলেরা বিদেশ থেকে আসবে।
পরদিন নবমীর ভোরে মেজ তরফের আশীষ চৌধূরী নিথর দেহ পাওয়া গেল বাগানে ।
এবারো ডাক্তার বললেন ম্যসিভ অ্যাটাক।
পরপর দুই দাদার মৃত্যুতে ভেঙে পড়লেন মহিম।
আশীষের দেহ ও থাকলো পিস হাভেনে প্রিয়জনদের আসার অপেক্ষায়।
দশমীর সকালে সেজ তরফের অনুরাগ চৌধূরীও যখন একই ভাবে মারা গেলেন, তখন ডাক্তার বললেন দেহ ময়না তদন্তে পাঠানো হোক।
রঘু এদের সবাইকে ছোট থেকে দেখেছে, মহিমকে তো কোলে করেছে। সে বলতে থাকলো, "অমঙ্গল, অমঙ্গল। "
তদন্তে অনুরাগের দেহে পাওয়া গেল খুব সামান্য পরিমাণে মারাত্মক ভেষজ বিষ।
কল্যাণ আর আশীষ বাবুকে পিস হাভেন থেকে যেতে হলো কাঁটা পুকুরে।
ওঁদের দেহেও পাওয়া গেল এক বিষ।
ডাক্তার বললেন ," প্রসাদে ফুল নিবেদন করা হয় তো, ফুলের সঙ্গে কোন বিষাক্ত রেণু ওঁদের প্রসাদে হয়ত মিশেছিলো।"
উৎসবের বাড়ী পরিণত হলো শ্মশানের আঁতুরঘরে। রঘু অসুস্থ হয়ে পড়ল। মহিম ভেঙে পড়লেন।
এস পি .পাকড়াশী এসে একের পর এক কাজের লোককে গ্রেপ্তার করতে লাগলেন।
সারা বাড়ী শোকাচ্ছন্ন, কেউ কাউকে বিশ্বাস করছে না।
পুলিশ ডিপার্টমেন্ট থেকে এবার পুলিশ গোয়েন্দা ধূর্জটি ধরকে তলব করা হলো।
ধূর্জটি প্রাথমিক তদন্তের পর বললেন কাজের লোকদের ছেড়ে দেওয়া হোক।
পাড়াশী ভুঁড়ি নাচিয়ে ছড়া কাটলেন ," হাতি ঘোড়া গেল তল মশা বলে কত জল!"
"জল কত গভীর মশাই,
তা তো বোঝা ভার।
হাতি ডোবে মাঝপথে
মশা হয় পার।" ধূর্জটি বলেন হাসতে হাসতে।
ধূর্জটি আলাদা কক্ষে আলাদা ভাবে সাক্ষ্য নিলেন সবার।
মহিমের ছেলে কলেজ পড়ুয়া প্রতীম বললো," বাবার এই বাড়ী অন্ত প্রাণ। জেঠুরা বাড়ী বিক্রী করতে চাইলে বাবা আসুস্থ হয়ে পড়তেন প্রতিবার।
রঘুদাদু বলে যে এই বাড়ী বিক্রী করলে অমঙ্গল হবে। তাই তো হলো। এখন ভয় হয় চতুর্থ মৃত্যুটা বাবার বা আমার হবে নাতো?"
" ইয়াং ম্যান, বি পজেটিভ। বাবার পাশে দাঁড়াও।"
তাহলে মহিম? বাড়ী বিক্রী ঠেকাতে এই কাজ করেছে?
মহিমের সঙ্গে কথা হলো।মহিম কথা বলার অবস্থায় নেই।
বললেন বাড়ী বিক্রীতে সায় ছিল না, কিন্তু ওঁদের মৃত্যু কী কাম্য ছিল বলুন? এক সঙ্গে বড় হয়েছি।
রঘুকাকার কথাই কী ঠিক?
অমঙ্গল?? "
ধূর্জটীর চোখ পড়ে মহিমের সামনে রাখা পকেট ঘড়ীর দিকে।
ওকথার উত্তর না দিয়ে ধূর্জটি বলেন," মহিম বাবু কটা বাজে আপনার ঘড়ীতে?"
"দশটা দশ।"
"কত সেকেন্ড? "
" স্যার সেকেন্ডের কাঁটাটা কদিন আগে হারিয়ে গেছে।"
" সে কী? কী ভাবে? কাঁটাগুলো তো সোনার মনে হচ্ছে, খোঁজেন নি?"
"হারানোর পরেই তো বড়দা চলে গেলেন, তখন আর মনে থাকে?"
"তা কী করে হারালো?"
"জানিনা। আসলে রঘু কাকাই ওর দেখভাল করে।পুরনো আমলের জিনিস। পূজো উপলক্ষে পরার জন্য বার করা।
দেখি বন্ধ হয়ে আছে।
রঘু কাকা খুলে অয়েলিং করে বছরে দুবার। তখন হারিয়েছে হয়ত! দাদুর আশীর্বাদ ছিল, খারাপ লাগছে।"
এবার ধূর্জটি গেলেন অসুস্থ রঘুকাকাকে দেখতে।
ধবধবে বিছানায় শুয়ে রঘুকাকা। পরিচারকের মত নয়, বাড়ীর সদস্যের মতই আছেন।
পাশের ঘর থেকে ভেসে আসে গান।
হয়ত ক্যাসেট চালিয়েছে কেউ।
" গুমনাম হ্যায় কোহি,
বদনাম হ্যায় কোহি,
কিসনে জানে, কিসকা খবর
আনজান হ্যায় ওহি..."
রঘুকাকা বললেন ," আমার নাতনী পায়েল।মেয়ে জামাই মারা গেল একটা অ্যাকসিডেন্টে, মহিম এখানে নিয়ে এল। হায়ার সেকেন্ডারী দেবে।"
দু চোখ দিয়ে স্নেহ ঝরে পড়ে
বৃদ্ধের।
ধূর্জটি ঘরের চারধারে চোখ বোলান।
তাকে একটা হোমিওপ্যাথি বই।
পাতা উল্টে হারিয়ে যান কোথায়।
হঠাৎ খাটের পাশে এসে বসেন।
" রঘুকাকা মহিমবাবুর ঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটাটা দিন। "
আচমকা প্রশ্ন করায় হতভম্ব রঘু বলে," স্যার , আমি , আমিই খুনী। মহিম নির্দোষ।"
"কেন করলেন? ওঁরা আপনার মনিবের বংশধর।"
" কর্তাবাবুকে কথা দিয়েছিলাম যতদিন বেঁচে থাচবো, ততদিন এই বাড়ী প্রাণ দিয়ে রক্ষা করবো।
তাছাড়া মহিমের কষ্ট চোখে দেখতে পারছিলাম না।এই বাড়ী ওর প্রাণ।
বিক্রী হলে ও বাঁচতো না স্যার।"
"তাই বলে খুন?"
" উপায় কী?"
"তাই ওই সূক্ষ্ম কাঁটার আগায় বিষ মাখিয়ে সুযোগ মত ফুটিয়ে দিলেন?
তা বিষটা কী ছিল? অবশ্য সন্ধ্যার রিপোর্টেই জানা জানা যাবে।"
" ছোট বেলায় গ্রামের কবিরাজের কাছে কাজ করতাম। ওনার ফাই ফরমাস খাটতাম।
উনিই চিনিয়েছিলেন গাছটা।
বলেছিলেন এই গাছ থেকে যেমন জীবনদায়ী ওষুধ তৈরী হয়, তোমনই বিষাক্ত এর শিকড় আর পাতা।এক ফোঁটার সিকি ভাগ শরীরে গেলেই মৃত্যু। মনে হবে হার্ট অ্যাটাক হয়েছে।
তখন আমার বারো বছর বয়স। ছেলেমানুষী কুবুদ্ধি। কবিরাজের গাভী বাসন্তীকে খড় দেবার সময় ওই গাছের শিকড় মিশিয়ে দিলাম।
আধঘন্টার মধ্যো মরে গেল বাসন্তী।
ভয় পেয়ে পালিয়ে শহরে এসে কর্তা বাবুর কাছে কাছ নিলাম। তখনই ওঁকে কথা দিয়েছিলাম এই বাড়ী রক্ষা করবো। কদিন আগে দেশের বাড়ী থেকে এনেছিলাম একটু।"
"কিন্তু পায়েলের কী হবে? যখন ওর সামনে তোমাকে অ্যারেস্ট করবে তখন ও কী করবে ভেবেছো?"
" স্যার আপনি একটা উপকার করবেন ? আমার মৃত্যুর পর বলবেন ময়না তদন্তের দরকার নাই,আপনার সামনেই হার্ট অ্যাটাক হয়েছে আমার।"
এই বলে মুঠো থেকে বার করে ঘড়ির সোনার কাঁটা টা নিজের গায়ে ফোটাতে গেলে অসম্ভব ক্ষিপ্রতায় ধূর্জটি কাঁটা কেড়ে নেন।
আলতো করে ধরে কাগজে মুড়ে ব্যাগে রাখেন।
"কাঁটা দিয়ে পথের কাঁটা সরাতে চেয়েছিলে, এখন নিজেকেই সরাবে ওই কাঁটা দিয়ে?"
রঘুকাকা কাঁদতে থাকেন,
বলেন "প্রতিম আর পায়েলের মধ্যে ভালোবাসা আছে। আমি খুনী জানলে ওদের বিয়ে হবে না। পায়েল হয়ত আত্মহত্যা করবে।"
সত্য অনুসন্ধানী ধূর্জটি ধর্ম সংকটে পড়েন।
"আজীব দাঁস্তা হ্যায় ইয়ে,
কঁহা শুরু কঁহা খতম..."
পায়েলের ঘরে দ্বিতীয় গান বাজে।
ধূর্জটি বলেন " প্রথমবার সত্য জেনেও চুপ করে থাকবো, শুধু পায়েল আর প্রতীমের কথা ভেবে।
আর তুমি আমৃত্যু অনুশোচনার আগুনে পুড়ে মরবে। ওটাই হবে তোমার শাস্তি।"
ধূর্জটি অন্যায় করলো কীনা সত্য গোপন করে তার জবাব কে দেবে?
ধূর্জটি ভাবে, আইনের ওপরেও একটা কিছু আছে সেটা মানবিকতা।
কখনো কখনো আবেগ ছাড়িয়ে যায় আইনকে।
বাইরে তখন ওৎ পেতে আছে এস পি .পাকড়াশী।
" কী হে গোয়েন্দা?"
"মনে হয় আপনারাই ঠিক। প্রসাদের সঙ্গে থাকা কোন ভেষজ
থেকেই মৃত্যু হয়েছে ওঁদের। কেউ দায়ী নয়।"
পাকড়াশী বললেন," এসবের জন্য পাকা মাথার দরকার ,আমার মত।
হেঁ হেঁ।"
রিপোর্টে বিষের নাম পাওয়া গেছিল। মংক'স হুড, যার পরিচিতি হলো অ্যাকোনাইট গণের অন্তর্ভুক্ত একটি বহুবর্ষজীবী বিষাক্ত ভেষজ।

