Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

Debdutta Banerjee

Crime Thriller


4  

Debdutta Banerjee

Crime Thriller


ডায়াবালিক

ডায়াবালিক

13 mins 985 13 mins 985

-''মহামান‍্য আদালতের কাছে আমার নিবেদন আমার মক্কেল মাধুর্য দেবী সম্পূর্ণ নির্দোষ এবং এই ঘটনার ফলে ওনার মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। যা ডঃ রায় ওনার রিপোর্টে বলেছেন। ছোট থেকেই এক মৃত্যুর মিছিলের মধ্যে দিয়ে হেঁটে আসতে হয়েছে ওনাকে যা এত অল্প বয়সে ওনার মনের উপর চাপ সৃষ্টি করেছে। আশা করি এগুলো বিচার করেই জুরি গন রায় দেবেন। ''

নিজের বক্তব্য শেষ করেই রুমাল দিয়ে স্বেদ বিন্দু গুলোকে মুছে নেয় ব্যারিস্টার অরিজিৎ চ‍্যাটার্জী। ও ধারে পুলিশই ঘেরাটোপের ভেতর একবার তাকিয়ে দেখে। মাধুর্যের চোখে নেই কোনও চমক। আপন মনে ওড়নার শেষ প্রান্ত হাতের আঙ্গুলে জড়াচ্ছে মেয়েটা। কয়েকটা অবাধ্য চুল মুখের সামনে ঝুলে রয়েছে। প্রসাধন ও কোনোদিন করত না, তবু এক লাবণ্য ওকে ছুঁয়ে থাকে সর্বদা। ঐ নিষ্পাপ মুখটার টানে অরিজিৎ ছুটে এসেছে বাড়ে বাড়ে। পাঁচ বছর আগে যে ভুল করেছিল আর করবে না কখনো।

বিচারকের রায় যা আশা করেছিল সকলে তাই হল। আপাতত চিকিৎসার জন্য মাধুর্যকে ডঃ রায়ের তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে কিছুদিন। তবে ও যে নির্দোষ তা মেনে নিয়েছে শীর্ষ আদালত। আপিল করার মত কেউ নেই আর। কোর্টের বাইরে তখন রিপোর্টারদের দৌড়াদৌড়ি আর ফ্ল্যাশ বাল্বের ঝলকানি। বড্ড ক্লান্ত লাগছিল অরিজিতের। তবুও কিছু কথা বলতেই হয়।

হঠাৎ একটা প্রশ্ন উড়ে এসেছিল -''মাধুর্য দেবী তো সম্পর্কে আপনার শ্যালিকা,আপনি তো ওনার নিকট আত্মীয়।''

রীতিমতো পোড় খাওয়া ব‍্যারিষ্টার অরিজিৎ জানে এ সব প্রশ্ন কি করে এড়িয়ে যেতে হয়। ডঃ রায়ের সঙ্গে দরকারি কথা কটা বলেই ও নিজের দামী গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

আপাতত ওর আ্যসিষ্টেন রিয়া মাধুর্যর ভার নিয়েছে। আর অল্প কিছু দিনের অপেক্ষা। তারপর সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে আবার। গলার টাইয়ের নাটটা আলগা করে ড্রাইভার যদু দাকে এসিটা ফুল করে দিতে বলে পেছনের সিটে দেহটা ছেড়ে দেয় জিৎ। মৃদু যন্ত্র সঙ্গীতের আওয়াজ ওকে আস্তে আস্তে নিয়ে যায় এক অন্য দুনিয়ায়।

****

''জিৎদা, আম পারতে যাবে না?'' ছোট্ট মেয়েটার ডাকে পড়া ছেড়ে উঠে আসে জিৎ।

''ও কে রে তোর সঙ্গে মাধু?''সঙ্গের ছোট মেয়েটিকে দেখিয়ে প্রশ্ন করে অরিজিৎ।

''আমার মামাতো বোন মুন্নি। ওরা এখন থেকে এখানেই থাকবে। '' কথা বলতে বলতে তিনজনে এগিয়ে যায় চৌবেদের বাগানে। ওদের কাঁচামিঠা আমের স্বাদই আলাদা।

বেশ সুন্দর ছিল দিন গুলো। অরিজিৎ ক্লাস এইট, মাধুর্য ফাইব আর মুন্নি ফোর। সকাল বিকেল পড়া আর খেলার ফাঁকে বড় হচ্ছিল তিনজন। হঠাৎ করে এক দুর্ঘটনায় চলে গেছিল মাধুর্যর বাবা মা। আর তারপরেই এক অচেনা খোলসের ভেতর গুটিয়ে গেছিল মেয়েটা।

আজ অরিজিৎ বোঝে হয়ত ঐ ছোট্ট মেয়েটা সেদিন বুঝেছিল ওর মা বাবার মৃত্যু সাধারণ নয়। সম্পত্তি আর অর্থর লোভ যে আপনজনকে পর করে দেয় তা ব‍্যরিষ্টার অরিজিৎ চ‍্যাটার্জী বুঝেছে এত সব আইনের বই পড়ে। কিন্তু ঐ দশ বছরের মেয়েটা এক ধাক্কায় এসব বুঝতে শিখেছিল সেদিন । তাই বদলে গেছিল।

এরপর মামা মামির অত্যাচারে মেয়েটা আরও গুটিয়ে গেছিল। মুন্নিও বদলে গেছিল কেমন যেন। আসলে বৈভব আর ক্ষমতা বদলে দেয় সবাইকে। এর সঙ্গে জুটেছিল মাধব, ওর মামির দূর সম্পর্কের ভাইপো।

অরিজিৎ তখন সবে ল কলেজে ভর্তি হয়েছে। মাধবকে ওর পছন্দ হত না কখনই। মুন্নির ডাকাডাকিতে ও বাড়িতে যখনি যেত দেখত মাধু কেমন গুটিয়ে রয়েছে। আর মাধব অরিজিৎকে দেখিয়ে অধিকার ফলাতে চাইত। দুটো করুণ চোখের আর্তি পড়তে পারলেও করার কিছুই ছিল না সেদিন।

সত্যিই কি ছিল না!!

একটা বড় বাম্পারে লেগে বিদেশি গাড়িটা লাফিয়ে উঠতেই জিতের চিন্তা জাল ছিন্ন হয়েছিল। মাথাটা একটু ঠুকে গেছিল দরজায়। মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে মনে পড়েছিল সেই দিনটার কথা।ছোট থেকেই জিতের গুলতির টিপ ছিল অব্যর্থ। একসঙ্গে এক থোকা আম নামিয়ে আনত এক টিপে। ওর পড়ার ঘরের জানালা দিয়ে দেখা যেত মাধুদের দোতলার বারান্দা। সেদিন মুন্নিরা সবাই পাড়ায় এক বিয়ে বাড়ি গেছিল। আর বাড়িতে ছিল মাধু আর ঐ মাধব। পড়তে পড়তেই মাধুর চিৎকার শুনতে পেয়েছিল জিৎ। ওর বাবা মাও গেছিল বিয়ে বাড়ি। সামনেই পরীক্ষা বলে জিৎ যায়নি। মাধবকে দেখে মাথা ঠিক রাখতে পারেনি আর। গুলতিটাই হাতে তুলে নিয়েছিল।

কিন্তু তারপর যা হয়েছিল মনে পড়তেই এই এসি গাড়ির মধ্যে বসে ঘেমে উঠেছিল জিৎ। বারান্দার নড়বড়ে রেলিং ভেঙ্গে নিচে পড়ে মাথা থেঁতলে গেছিল বলে গুলতির আঘাত কারো চোখেও পড়েনি। ঐ মৃত্যু যে স্বাভাবিক ছিল না তা বুঝতে পেরেছিল শুধু একজন,মুন্নি। তার দাম ভালোই দিতে হয়েছিল জিতকে এরপর। তবুও দুটো কৃতজ্ঞ চোখের দৃষ্টি ঐ ঘটনার পর সেদিন ছুঁয়ে গেছিল ওকে।

মুন্নি ভীষণ হিংসা করত দিদি কে। মায়ের স্বভাব পেয়েছিল পুরো। সর্বদা জিতকে আগলে রাখতে চাইত। কখনো মাধুর সঙ্গে একটা কথাও বলতে দিত না। মাধুটাও দিন দিন মুখ চোরা হয়ে উঠছিল। বিদেশে পড়তে যাওয়ার খবরটা যেদিন ঐ বাড়ি দিতে গেছিল ঐ নির্বাক চোখ দিয়েই কত কি বলেছিল সেদিন মেয়েটা। মুন্নির বকবক ছাপিয়ে ওর না বলা কথা গুলোই বেশি শুনতে পেয়েছিল জিৎ।

এরপর কয়েক বছর যোগাযোগ ছিল না তেমন। মুন্নি তবু মেইল করত। ওর মেইলেই জেনেছিল ওর মা আর নেই। মাধুর বিয়ের কথা চলছে।

ব্যারিস্টার হয়ে যেদিন ফিরে এসেছিল মুন্নির সব উচ্ছ্বাসকে ছাপিয়ে ওর দৃষ্টি খুঁজছিল সেই চোখ দুটোকে। মুন্নি বলেছিল -''দিদি শপিং এ গেছে জিজুর সঙ্গে, এ মাসেই বিয়ে ওদের। ''

না বলা কথা গুলো বুকে নিয়েই ফিরেছিল জিৎ। বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে !! অবশেষে মায়ের ইচ্ছায় মুন্নিকে বিয়ে করতে ও রাজি হয়েছিল । আজ মনে হয় ঐ ভুলটা না করলেই বোধহয় ভালো ছিল। একবার যদি মাধুকে মনের কথাটা সেদিন বলতে পারত হয়তো ওর জীবনটা আজ এমন হত না। মেয়েটার জীবনে সুখ দিতে বোধহয় বিধাতা ভুলেই গেছিল। শান্ত ঘরোয়া মুখচোরা মেয়েটার বিয়ে হয়েছিল ভালো ঘরেই। জিৎ ভেবেছিল এবার বোধহয় ওর জীবনে সুখের খাতা খুলল। অনিকেত বড় ব‍্যবসায়ী। মাধুকে ওরা যত্নে রাখবে।

ভুল ভেঙ্গেছিল মুন্নিকে বিয়ে করার পর। অনিকেতের মা আর বোন চেয়েছিল মাধুর মত শান্ত মেয়েকে বৌ করতে যে কোনও অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে না। অনিকেতের ব‍্যবসার কাজে ব্যস্ততা,সেক্রেটারিকে নিয়ে ট্যুর, ওর ডিভোর্সি বোনের উদ্দাম জীবন যাপন, মদ্যপ ভাইয়ের উ শৃঙ্খলতা এসবের প্রতিবাদ করবে না এমন বৌ ওরা খুঁজে পেয়েছিল। মুন্নির বিয়েতে এসেছিল মাধুর্য। নতুন বিবাহিত মাধুর করুণ মুখ আর ঐ ব্যথাতুর চোখ দেখেই কিছুটা বুঝেছিল জিৎ। কিন্তু তখন কিছুই করার ছিল না। বিয়ের পর মাত্র একবার মুন্নিকে নিয়ে মাধুর বাড়ি গেছিল জিৎ। ওর রাশভারী শাশুড়ি আর ঐ ননদের রূপ দেখে আর কখনোই ওমুখো হয়নি জিৎ।

তবে ওর শাশুড়ি মারা গেছিল। মৃত্যুটা স্বাভাবিক ছিল না। রান্নাঘরে গ্যাস লিক করে পুড়ে মরেছিল। সবাই বলেছিল ওর ননদের হাত রয়েছে ঐ ঘটনায়। মা মেয়ের অশান্তি লেগেই থাকত নিত্য। আর বৌকে তো কেউ পছন্দ করত না। হয়তো মাধুর জন্যই ব্যবস্থা করেছিল ওরা, ভুল করে.... রীতিমত পুলিশকে টাকা দিয়ে কেস বন্ধ করতে হয়েছিল ওদের।

এর কিছুদিন পর ওর মদ্যপ ননদ মারা যায় সিঁড়ি থেকে পড়ে। ওটা যে দুর্ঘটনা সব কাজের লোকেরা সাক্ষী দিয়েছিল। মাধু সে সময় একটু বোধহয় হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল।

কিন্তু এরপর জিতের জীবনে নেমে এসেছিল এক অন্য বিপর্যয়। মুন্নির সেই দুর্ঘটনা..…। সেই দুঃখে ওর বাবাও চলে গেছিল এক মাসের মধ্যে। জিৎ আবার বাইরে চলে গেছিল কিছুদিনের জন্য। পুরানো সব কিছু ভুলে নতুন করে জীবনটা শুরু করতে চেয়েছিল একবার।

ততদিনে মাধুর জীবনেও কিছু বদল এসেছিল। মেয়েটা একটু একটু করে বাঁচতে শিখছিল। কিন্তু বছর ঘুরতেই প্রথমে চলে গেছিল অনিকেত। না এই মৃত্যুও স্বাভাবিক ছিল না। ডিপ্রেশন থেকে আত্মহত‍্যা। ঘুমের ওষুধ খেয়েছিল অনিকেত। ততদিনে সম্পত্তি নিয়ে ভাইয়ে ভাইয়ে ঝগড়া লেগেছিল। তাই ওর মৃত্যুতে ওর ভাই অপরেশ কে নিয়েও টানাটানি হয়েছিল। এসব অবশ্য পড়ে জেনেছিল জিৎ।

অনিকেতের মৃত্যুতে মাধুর জীবনে নতুন করে আবার এক ধাক্কা লেগেছিল। ঘরোয়া শান্ত মেয়েটা সংসারটাও করতে পারলো না গুছিয়ে। অর্থ থেকেও ওর জীবনটা অর্থহীন হয়ে গেছিল ধীরে ধীরে। এক বন্ধুর থেকে খবরটা পেয়েছিল জিৎ। এরপর ও ফিরে আসে একবার শুধু মাধুকে দেখবে বলেই।

সেদিন যদি মাধু ওকে ফিরিয়ে না দিত হয়তো আজ এমন হত না।

ড্রাইভারের কথায় সম্বিত ভাঙ্গে জিতের। বাড়ি চলে এসেছে।

*****

দীর্ঘ সময় পর অবশেষে মাধু ফিরেছিল নিজের বাড়ি। এই বাড়িটা যে ওর নিজের ছিল ভুলতেই বসেছিল একদিন। আজ এত বছর পর এই বাড়িতে ঢুকে টুকরো টুকরো ছোটবেলার স্মৃতি গুলো ওকে ঘিরে ধরেছিল।

মা বাবা আর ও , কি সুন্দর ছিল দিন গুলো। রাজকন্যার মত এত বড় বাড়িটায় আদরে যত্নে বড় হচ্ছিল ছোট্ট পরীর মত মেয়েটা। আর ছিল ওর স্বপ্নের রাজপুত্র জিৎদা। ফল পেড়ে দেওয়া, পাখীর বাসা বানিয়ে দেওয়া, ঘুড়ি ওড়ানো মাছ ধরা, লুকোচুরি খেলা বা সাইকেল চালানো , সবেতেই ঐ অরিজিৎ। কিন্তু হঠাৎ করে কোন এক দুষ্টু ডাইনি বুড়ির নজর লেগেছিল ওর এই ছবির মতো পৃথিবীর উপর।

মামা মামিকে আশ্রয় দিয়েছিল বাবা। অথচ বাবা মাকেই চলে যেতে হল ওকে ছেড়ে। লুকিয়ে একদিন মামা মামির কথায় ও বুঝেছিল ঐ দুর্ঘটনা স্বাভাবিক ছিল না।

আস্তে আস্তে বদলে গেছিল বাচ্চা মেয়েটা। প্রতিবাদ করতে পারেনি কোনোদিন। ভয়ে গুটিয়ে নিয়েছিল নিজেকে। মুন্নি ওর চোখের সামনে ধীরে ধীরে জিৎদাকে দখন করে নিচ্ছিল একটু একটু করে। প্রতিবাদ করতে পারেনি ও। করুণ দুটো চোখ শুধু দেখেই গেছে।

এরপর এ বাড়ি থেকে ওকে শিকড় উপরে চলে যেতে হয়েছিল অনিকেতের সঙ্গে। নতুন স্বপ্ন নিয়ে ও বাড়ি গিয়ে ও দেখেছিল ওরা কেউ স্বাভাবিক নয়। ওর প্রতি অনিকেতের মোহ কেটে গেছিল কয়েক দিনের ভেতর। শাশুড়ি আর ননদের অত্যাচার ওকে কোন ঠাঁসা করে রেখেছিল। প্রতিবাদ করতে যে ও শেখেইনি কখনো!!

ছোটবেলায় তবু জিৎদা ছিল ওর পাশে। এ বাড়িতে ও বড্ড একা। কিন্তু আস্তে আস্তে পরিস্থিতি বদলেছিল।

অপরেশের মৃত্যুর পর সন্দেহর তীর ওর দিকে উঠলেও ওর জিৎদা ওকে বার করে আনতে পেরেছিল। অপরেশ তো এক মদ্যপ লম্পট, সম্পত্তির জন্য বৌদিকে খুন করতে যার হাত কাঁপত না। সেই অপরেশের মৃত্যু হয়েছিল বিষাক্ত মদে। পুলিশ প্রথমে বলেছিল স্বাভাবিক নয় ঐ মৃত্যু। কিন্তু ব‍্যরিষ্টার অরিজিৎ চ‍্যাটার্জী ওকে নির্দোষ প্রমাণ করেছিল সে দিন। তবে চরম ডিপ্রেশনের শিকার বলে ওঁর চিকিৎসা চলেছিল কিছুদিন।

তবে ঐ বাড়িটায় আর ফিরতে পারেনি মাধুর্য। অত বড় বাড়িটা অনিকেতের মৃত্যুর পর কেমন গিলে খেতে আসত ওকে। ভয় করত সব সময়। এক অজানা ভয়। ঠিক যে ভয়টা মা বাবা চলে যাওয়ার পর ওকে গ্ৰাস করেছিল সেই ভয়টা। সারাক্ষণ মনে হত ওর চারপাশে অনেকে রয়েছে। হাওয়ায় ফিসফিস শব্দ, ওদের গন্ধ ওকে পাগল করে দিচ্ছিল। তার ওপর ছিল অপরেশের ভয়। বৌদিকে মেরে সব সম্পদের মালিক হতে চাইত অপরেশ। সুযোগ খুঁজছিল শুধু।

দুঃস্বপ্নর পর যেমন নতুন ভোর হয় আজ মাধুর্যর জীবনে সেই নতুন দিন। সাতাশ বছরেই অনেককিছু হারিয়েছে ও । আর হারাবার কিছু নেই। দু বাড়ির অগাধ সম্পত্তির মালকিন আজ ও। এবার জীবনটা নতুন করে শুরু করবে আবার। মানুষকে বিশ্বাস করতে শিখতে হবে নতুন করে। দোতলার জানালা দিয়ে দেখেছিল জিৎদা আসছে এই বাড়িতে। বহুদিন পর আজ জিৎদাকে দেখে ভীষণ আনন্দ হচ্ছিল। ভয়টাকে জয় করতেই হবে।

*******

-''মাধু, একবার কি সব নতুন করে শুরু করা যায় না ? চল চলে যাই এখান থেকে। এসব স্মৃতি ভুলে দূরে কোথাও জীবনটা সাজিয়ে নেই আমরা।'' জিৎ মাধুর্যকে নিজের কাছে টেনে নেয়।

-''বিশ্বাস কর আমায় তুমি?আমি কি স্বাভাবিক?'' দুটো জল ভরা চোখে মুখ তুলে তাকায় জিতের দিকে ওর মাধু।

-''ডঃ রায় বলেছে তুই স্বাভাবিক, আমি বলছি তুই স্বাভাবিক। দীর্ঘদিন মানসিক চাপের ভেতর থেকে তুই ....''

-''মুন্নির মৃত্যুটা কি স্বাভাবিক ?''

চমকে ওঠে জিৎ। এ কোন মাধু?

-''বিশ্বাস কর, তোমায় ভালবাসি বলেই জানতে চাইছি জিতদা। ''

না, ঐ চোখে কি রয়েছে পড়তে পারে জিৎ। বিশ্বাসের ভিত শক্ত করতে চাইছে মেয়েটা। আজ জিতকে বলতেই হবে। নিজেকে গুছিয়ে নেয় জিৎ। বলে -''মাধবকে সরানোর মূল্য দিতে হয়েছিল মুন্নিকে বিয়ে করে। ও আমায় ব্ল্যাক মেল করত সর্বদা। তোর সঙ্গে কথাই বলতে দিত না। আর পারছিলাম না। দুটো ভুল বিয়ে দুটো পরিবারকে শেষ করে দিয়েছিল জানিস। ''

-'' তাই সেদিন ছুটে এসেছিলে আমার কাছে?'' হেসে ওঠে মাধু।

জিত কেমন কেঁপে ওঠে। তবে যে ডঃ রায় বললেন ও স্বাভাবিক, সুস্থ। রিয়া যে বলেছিল ও একদম ঠিক আছে।

দু হাতে মাধুকে বুকে টেনে নিয়ে বলে জিৎ -''সব ভুলে যা আজ। চল নতুন করে শুরু করি আবার। ''

বাইরে বিদ্যুৎ চমকায়, লাইট চলে যায় হঠাৎ। উথাল পাথাল হাওয়ায় কালবৈশাখীর গন্ধ বয়ে আনে। কেঁপে ওঠে জিত।

মাধু বলে -''ভয় পাচ্ছ জিৎ দা?মনে পড়ে এমন দিনে আম কুড়াতে ছুটতাম আমরা। কি সুন্দর ছিল দিন গুলো। ঐ দিন তো আর ফিরে পাবো না। নতুন করে কত কি ভুলবো বল তো?অপরেশকে আমি মারি নি তুমি সবাইকে বুঝিয়ে বলতে পেরেছ। কিন্তু তুমিও জানো না আমার এ হাতে কত রক্ত লেগেছে। ''

জিৎ ধপ করে একটা সোফায় বসে পড়ে। এ সব কি বলছে ঐ মুখ চোরা মেয়েটা। জানালা দিয়ে বয়ে আসা উথালপাথাল হাওয়ায় ওর চুল উড়ছে। বিদ্যুতের চমকে কখনো ঘরটা আলোকিত হচ্ছে কখনো অন্ধকার। মাধুর কথা গুলো যেন বহু দূর থেকে ভেসে আসছে।

-''মা বাবাকে ওরা মেরে ফেলেছিল। আমি কিছুই করতে পারি নি। ওদের অত্যাচার মেনে নিয়ে মুখ বুজে থেকেছি। কিন্তু মাধব যখন আমার দিকে হাত বাড়াল তখন আর সহ্য হয় নি। সেদিন ইচ্ছা করেই ওকে বারান্দায় ডেকে এনেছিলাম জানো। খালি বাড়ি। মামি তো কাজের লোক আগেই ছাড়িয়ে দিয়েছিল। রেলিংটা নড়বড়ে আমি জানতাম। গুলতির ঢিলটা ওর কপালে লেগে বেরিয়ে গেছিল। দু হাতে কপাল চেপে ও যখন রেলিংয়ের উপর ভর দিয়ে ব্যালেন্স করছিল ধাক্কাটা আমিই মেরেছিলাম। তারপর দৌড়ে চলে যাই তোমাদের বাড়ি। বাকিটা তুমি জানো। ''

-''আর আমি এতদিন ভেবেছি আমার জন্য ও পড়ে গেছিল !!''

-''যখন কলেজে পড়ি মামির সুগার ধরা পড়ল। ইনসুলিনটা আমি আর মুন্নি দুজনেই দিতাম। অনেক সময় মামির সুগার ফল করত। মিষ্টি খাওয়াতে হত। সেদিন মুন্নি কলেজে গেছিল। আমি ইচ্ছা করেই বেশি ইনসুলিন দিয়েছিলাম। তারপর মামির সুগার ফল করলেও মিষ্টি খেতে দেই নি। কয়েক ঘণ্টা জানো !! সব কি সুন্দর শেষ হয়ে গেল। মুন্নিও বুঝতে পারেনি ওর মায়ের মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না।

বিয়ে হয়ে ও বাড়ি গেলাম,রোজ ওদের ঝগড়া আর অশান্তি দেখে দেখে বিরক্ত আমি। সেদিন গ্যাসটা ইচ্ছা করেই খুলে এসেছিলাম। বিকেলের চা টা শাশুড়ি নিজেই করত। সে দিন মা মেয়ের তুমুল ঝগড়া হয়েছিল। তাই সবাই আমার ননদের দিকে আঙ্গুল তুলেছিল।

আর মদ্যপ ননদকে ঝেরে ফেলার জন্য মার্বেলের সিঁড়িতে অল্প সাবান জল ফেলেছিলাম। কাজের মাসি তার আগেই ঘর মুছেছিল। ওরা বুঝতেই পারেনি। ভেবেছিল জল থেকে গেছিল সিঁড়িতে।

অনিকেতকে আর সহ্য হচ্ছিল না আমার। ঘুমের ওষুধ গুলে খাওয়ানো তো সব চেয়ে সোজা কাজ ছিল।

আর অপরেশের মদের বোতলে নেশার জিনিস মেশানো আরও সহজ। ওরা তো নিজেরাই সুযোগ দিয়েছিল। তবে মামাকে মেরেছিলাম বালিশ চাপা দিয়ে। মুন্নির শোকে লোকটা আধমরা হয়েই ছিল। অসুস্থ লোকটাকে সান্ত্বনা দিতে এসে ভেবেছিলাম ওকে বাঁচিয়ে রেখে কি লাভ? কে দেখবে লোকটাকে !! পরিচিত ডাক্তার ভেবেছিল শ্বাস কষ্টে মারা গেছে। ইন হেলার নিত মামা।''

এক টানা এত গুলো কথা বলে একটা জলের বোতল টেনে নিলো মাধুর্য। কিছুটা জল খেয়ে বোতলটা রেখে বলল -''কি ভাবছ জিৎ দা? আমি স্বাভাবিক কি না? বিশ্বাস কর আমি একদম স্বাভাবিক। ''

পোড় খাওয়া ক্রিমিনাল ল ইয়ার অরিজিৎ তখন কথা বলতেই ভুলে গেছে। এ কাকে দেখছে সে ? এই সেই শান্তশিষ্ট নিরীহ মেয়েটা!!

এখন ঠিক কি করবে অরিজিৎ!!

-''তুমি আমায় ভয় পাচ্ছ জিৎদা? এমন ভাবে কি দেখছ? '' জলের বোতলটা এগিয়ে দেয় ওর দিকে মাধু।

গলাটা বেশ শুকিয়ে গেছিল। কিন্তু জলটা খেতেও ভয় পাচ্ছিল জিৎ। মাধুর মধ্যে এমন বদল এসেছে ও বুঝতেই পারে নি কখনো। ঠাণ্ডা মাথায় একের পর এক খুন করেছে মেয়েটা। কিন্তু এখন !!

-''আজ আমি আবার সব পেয়েছি জিৎদা। আবার বাড়ি,অর্থ তার সঙ্গে তোমায়। এবার সব বদলে যাবে দেখো। সব আবার সুন্দর হয়ে ... ... ও কি? জিৎদা !! এভাবে কি দেখছ?তোমার মুখটা অমন বদলে গেছে কেনো ? তুমি কি আমাকে ভয় পাচ্ছে? আমি তো সত্যি গুলো তোমায় জানিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। কিছু লুকোতে চাই নি। বিশ্বাস কর ....''

জিৎ দ্রুত চিন্তা করে নেয়,ওকে কথার জালে আটকে রাখতে হবে। মুখে বলে -'' না,আসলে আমি ভাবছি তুমি একা এত বড় লড়াইটা করলে কি করে? এত গুলো বছর এভাবে একা একা !!"

-''সত্যি জিৎ দা। আজ ভাবলে নিজেরই অবাক লাগছে। একটা আরশোলা দেখলে ভয় পেতাম আমি !! পিপড়াকে বা মশাকে মারিনি কখনো , সেই আমি ..... জানো, মাধবকে ঠেলে ফেলার পর কেমন যেন একটা শক্তি পেয়েছিলাম আমি। মাধব আমায় ভালবাসতে চেয়েছিল। অধিকার দেখাতে গেছিল।কিন্তু ওর রক্ত দেখে বুঝেছিলাম আমিও পারি।

মামি ভীষণ বকত। সব কাজ করাত আমায় দিয়ে। জোর করে বিয়ে ঠিক করেছিল। কত পা ধরে কেঁদেছি শোনে নি। তাই তো .....''

-''তাই তো মেরে দিলেন। আর আপনার শাশুড়ি, ননদ, দেওর,স্বামী সবাই ? '' ঘরে ঢুকে আসে দু জন পুলিশ সহ একজন লেডি অফিসার। পেছনে রিয়া,জিতের আ্যসিষ্টেন।

মাধুর্যের হাতে হাতকড়া পরাতে পরাতে অফিসার বলে -“ রিয়া দেবী সন্দেহ করেছিল বলেই আজ অরিজিৎ বাবু আপনি প্রাণে বেঁচে গেলেন। রিয়া দেবী দীর্ঘ দিন ধরে ওনাকে লক্ষ্য করে করে বুঝতে পেরেছিলেন উনি স্বাভাবিক নন।''

-''তবে আজ সার ফোনটা ঠিক সময় অন না করলে আমি হয়তো আপনাদের এখনি খবর দিয়ে আনতে পারতাম না। সার আমায় ফোন করেছিলেন বলেই আমি সবটা শুনতে পেয়ে দ্রুত সব ব্যবস্থা করতে পারলাম। '' রিয়া বলে জিতের দিকে তাকিয়ে।

পকেটে ফোনটায় লাস্ট ডায়েল ছিল রিয়া, সেটাই অন করে দিয়েছিল অরিজিৎ বুদ্ধি করে। দুটি অবিশ্বাসী চোখ একদৃষ্টে ওর দিকে তাকিয়েছিল । অরিজিৎ সেদিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে এ দৃষ্টি স্বাভাবিক নয়। বলে -'' মুন্নির মৃত্যুটা আমি ঘটাই নি মাধু। ও আমার স্ত্রী ছিল। একটু হিংসুটে ছিল ঠিক। কিন্তু আমায় ভালো বাসত। ওর দুর্ঘটনা টা কি সত্যি দুর্ঘটনাই ছিল ? ও মেট্রোর লাইনে পড়ে গেছিল কি করে মাধু ?"

পাগলের মত হাসতে থাকে মাধুর্য। বাতাসে উড়তে থাকে ওর চুল। হাসতে হাসতে বলে -''বলব না। আর কিছু বলবো না। একটা কথাও বলব না। ''

রিয়া এসে অরিজিতের সামনে দাঁড়ায়। বলে -''ও স্বাভাবিক নয় অফিসার। ওকে নিয়ে জান। খুব সাবধান। ''

অফিসার মাধুর্যকে নিয়ে বেরিয়ে যায় ওদের সামনে দিয়ে। আস্তে আস্তে ধুলো উড়িয়ে পুলিশের গাড়িটা চলে যায় বহুদূর।

সেদিকে তাকিয়ে রিয়া বলে -''কনগ্ৰেচুলেশন জিৎ। এত বড় সম্পত্তির মালিক এখন শুধুই তুমি। ''

-''আমরা। আর সব তোমারজন্য। '' রিয়াকে বুকে টেনেনিতে নিতে অরিজিৎ চ‍্যাটার্জীবলে ওঠে।

-''শান্ত মেয়েটা ঠিক স্বাভাবিক ছিল না তুমি ঠিক ধরেছিলে।ওঁর ভেতরে লুকিয়েছিল একরাশ ঘৃণার বারুদ। তোমার কথা মত আগুনটা লাগাতে সাহায্য করেছিলাম শুধু,কলেজে থাকতেই ওকে বুঝিয়েছিলাম মামিকে না সরালে ওর মুক্তি নেই।খুব আস্তে আস্তে গুটি সাজাতে হয়েছিল। বিয়ের কয়েক বছরপর ওর সঙ্গে দেখা হয়েছিল একটা মলে। শামুকের ভেতর গুটিয়ে থাকা নিরীহ মেয়েটাকে আরেকবার নাড়িয়ে দিয়েছিলাম। অন্যায় মানতে নেই এটাই মনে করিয়ে দিয়েছিলাম। আমি ওর জায়গায় থাকলে কি করতাম বলেছিলাম।বাকিটা ও নিজেইকরেছে। তবে মুন্নিকে ধাক্কাটা আমিই মেরে ছিলাম। মাধুভিড়ের মধ্যে আমায় দেখেনি।গত কয় মাসে কাউন্সিলিং এরসময় ওকে এটাও বুঝিয়েছিলাম তুমি ছাড়া ওর আর কেউ নেই। তুমিই ওর ভালোবাসা। তাইতো উইলটাও করেছে তোমায় নামে। নাহলে ঐ দিককার সম্পত্তিটা তুমি পেতে না । ''

জিৎ বলে -'' অপূর্ব প্ল্যান।ওয়েল ডান। এত গুলো ঠাণ্ডামাথায় খুন!! ওকে আর কেউবাঁচাতে পারবে না। আমরাওসব ধরা ছোঁওয়ার বাইরে।সব মিটলেই রেজিস্ট্রি টা করবো। একটা বড় ছুটিচাই।''

********

মাস ছয়েক পরের কথা।

বিখ্যাত সংবাদ পত্রেহেডলাইন।

কেরলে বিধ্বংসী বন্যা।নিখোঁজ বাঙালী ব্যারিস্টারআর তার নবপরিণীতা পত্নী।

মেঘ ভাঙা বৃষ্টিতে কেরলেআসা হঠাৎ বন্যায় ভেসেগেলেন বিখ্যাত বাঙালিব্যারিস্টার অরিজিৎ রায় ওতার নবপরিণীতা বধূ রিয়া।তারা হনিমুন করতে গেছিলেন মুন্নারে। হঠাৎ আসা বন্যায়তাদের রিসর্ট ভেসে যায়। শেষখবর পাওয়া অবধি তাদেরকোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।

(অলক্ষ্যে মুচকি হাসলেনবিধাতা।)


Rate this content
Log in

More bengali story from Debdutta Banerjee

Similar bengali story from Crime