Hurry up! before its gone. Grab the BESTSELLERS now.
Hurry up! before its gone. Grab the BESTSELLERS now.

Ajobdeep Bromho

Horror Classics Crime


4  

Ajobdeep Bromho

Horror Classics Crime


রোগী দেখা

রোগী দেখা

35 mins 390 35 mins 390

গল্প ফাদার ক্ষেত্রে অথবা আড্ডার আসরে ভূত, প্রেত, আত্মা - এই সমস্ত কিছুই এক বিশেষ ধরনের রোচক হিসাবে কাজ করে। তবে সকলেই যে এই রোচক বিষয়টির আস্বাদন গ্রহণ করতে আগ্রহী তা কিন্তু একেবারেই নয়। পৃথিবীতে এমনও কিছু মানুষ আছেন যারা ভূত প্রেতের প্রসঙ্গ উঠলেই তা নিয়ে কটাক্ষ করতে পিছপা হন না, আর আমি হলাম তাদেরই একজন। যাকে বলে ঘোরতর অবিশ্বাসী। আর এই অবিশ্বাসের জের টেনে আনার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো আমার পাঠককুল কে অবগত করা যে, এটি কোনো ভূতের গল্প নয়। এটা ঠিক কিসের গল্প, তাও আমি জানি না। তবে এটা একটি সত্যিকারের ঘটনা। আমি নিজে এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। আমার নিজের কাছে এই ঘটনার কোনো ব্যাখ্যা না থাকলেও এটাকে হেসে উড়িয়ে দেওয়ারও সাহস হয়না। আর সেইজন্যই হয়তো এতগুলো বছর পরেও সেই ঘটনার ভয়াবহ স্মৃতিগুলি এখনও অসংলগ্ন ভাবে আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। চলুন তাহলে আসল ঘটনার শুরু থেকেই শুরু করি।


জুলাই মাসের এক সন্ধ্যেবেলায় আমি আমার চেম্বারে প্রায় ফাঁকাই বসেছিলাম। রোগী দেখারও বিশেষ চাপ ছিলো না। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছিলো বলেই হয়তো এদিন আমার চেম্বারে রোগীর আনাগোনা কম ছিলো। তবে তাতেও যে আমি খুব একটা অখুশী ছিলাম তাও নয়। বেশ কয়েক বছর হলো আমি বারুইপুর মহাকুমা হাসপাতালে চাকরী করছি। তার পাশাপাশি আমি এই প্রাইভেট চেম্বারটিও করি। এই কয় বছরের মধ্যে আমার পসারও দিব্যি বেড়ে গিয়েছে - তা সে রোগীদের তাড়াতাড়ি আরোগ্য লাভের জন্যই হোক অথবা আমার দর্শনীর অংকটা একটু কম বলেই হোক। তো এইভাবেই বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকবার পর হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম রাত প্রায় সাড়ে ন'টা বেজে গেছে। হয়তো আর কোনো রোগী আসবে না ভেবেই আমার ব্রিফকেসটা গোছাতে শুরু করলাম। আমার বাড়ি পাশেই। কাজেই এই বৃষ্টির রাতে বাড়িতে ফিরতে আমার বিশেষ অসুবিধা হবে না। ব্রিফকেসটা গুছিয়ে নিয়ে সবেমাত্র উঠতে যাবো এমন সময় আমার চেম্বারের সামনেই একটি গাড়ি থামবার আওয়াজ পেলাম। ভাবলাম হয়তো কোনো রোগী এসেছে। তাই আমি আবার চেয়ারটাতে বসে পড়লাম। কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ। তারপরেই চেম্বারের দরজায় ঝুলানো সবুজ পর্দার ওপাশ থেকে একটা চেনা মোটা গলার স্বর ভেসে এলো। " ডাক্তার বাবু আছেন নাকি!"


আমি হেসে জবাব দিলাম," হুম আসুন।" আমার কথা শেষ হওয়া মাত্রই দরজার পর্দা ঠেলে ঘরে ঢুকলেন বারুইপুর থানার দারোগা গোপাল চন্দ্র দাস। পুলিশের অন্যান্য বড় কর্তাদের মতনই তাঁর চেহারা - মোটা-সোটা, সুপ্রশস্ত ভূড়ি, মাঝারি উচ্চতা, নাকের নীচে বেশ সমান করে ছাটা একটি চওড়া গোঁফ এবং মাথার মধ্যবর্তী স্থানে চকচকে একটি টাক। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। গোপাল বাবুর সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ মহাকুমা হাসপাতালেই। কি একটা তদন্তের ব্যাপারে তাঁকে সেখানে বেশ কয়েকবার যেতে হয়েছিলো। সেখান থেকেই পরিচয় তাঁর সাথে। চেহারায় একটা গাম্ভীর্য ভাব বজায় থাকলেও লোকটি কিন্তু বেশ মিশুকে। আমার সাথে আলাপ হওয়ার পর থেকেই কিন্তু তিনি প্রায়শই আমার চেম্বারে এসে নানান রকমের গল্প করেন। ভীষন খোলা মনের মানুষ গোপাল বাবু। তাঁর জীবনের বিভিন্ন সমস্যা, হাতে পাওয়া নিত্য নতুন মামলার কথা, এমনকি তিনি তাঁর স্ত্রীর মানসিক অসুস্থতার কথাও আমাকে বলেছেন। সত্যি কথা বলতে আমারও বেশ ভালো লাগে গোপাল বাবুর সাথে আড্ডা দিতে। বরাবরের মতন তিনি আজও এসেছেন দেখে আমি বেশ প্রসন্নই হলাম। এতক্ষণ ধরে চুপচাপ বসে থেকে যে বিরক্তি বোধটা মনের মধ্যে দানা বেঁধেছিলো তা আস্তে আস্তে জট খুলতে শুরু করলো। আমি একগাল হেসে বললাম," বসুন।" গোপাল বাবু পকেট থেকে রুমাল বের করে মাথা মুছতে মুছতে একটা চেয়ার টেনে আমার উল্টো দিকে বসলেন। আমি বললাম," দুঃখিত! আজ আর চা খাওয়াতে পারছি না। কারণ বৃষ্টির জন্য বোধহয় পাশের চায়ের দোকানটা খোলেনি।" গোপাল বাবু একটু হেসে বললেন," না না ঠিকাছে।" লক্ষ্য করলাম আজ তাঁর মুখটা ভীষণ শুকনো দেখাচ্ছে। বোধহয় কিছু নিয়ে চিন্তিত। কারণ এর আগে তিনি যতবার এসেছেন ততবারই তাঁর ওই গম্ভীর মুখটাতে সর্বদা একটা হাসি লেগেই থাকতো। কিন্তু আজ সেটার ছিটে ফোঁটাও চোখে পড়ছে না।


আমি সিগারেটের প্যাকেটের মুখটা খুলে তাঁর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললাম," আজ না হয় সিগারেট খেয়েই মনকে নিবৃত করুন।" তিনি একটি ব্যর্থ হাসি দিয়ে প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট নিলেন। তারপর আমারই দেওয়া লাইটার দিয়ে সিগারেটটা জ্বালিয়ে অন্যমনস্ক ভাবেই ধোঁয়া নিঃসরণ করতে লাগলেন। তাঁর এই অন্যমনস্কতা দেখে আমি এটা স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম যে, তাঁর আজ গল্প করবার একটুও ইচ্ছে নেই। ততক্ষণে আমিও একটা সিগারেট ধরিয়ে মুখ দিয়ে একরাশ ধূসর ধোঁয়া নিক্ষেপ করে বললাম," কি ব্যাপার বলুন তো! কিছু হয়েছে নাকি?" আমার কথা শুনে গোপাল বাবু একটু নড়েচড়ে বসলেন। তারপর ছাইদানে সিগারেটটা ঝেড়ে বললেন," একটা গভীর সমস্যার মধ্যে পড়েছি, বুঝলেন!" আমি একটু সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে টেবিলের উপর হাত দুটো রেখে বললাম," কি রকম?" এবার তিনি একটু জোর গলায় বললেন," সমস্যায় পড়াটা আমার কাছে নতুন কিছু নয়। এর আগে বহুবার পড়েছি এবং তা থেকে উতরেও গিয়েছি।" এবার গলার সুরটা একটু নরম করলেন। " কিন্তু এবারের সমস্যাটা সত্যিই জটিল। যার কোনো সমাধান খুঁজে পাচ্ছি না।" তারপর সিগারেটটাতে শেষ একটা টান দিয়ে সেটাকে ছাইদানের ভেতর গুজে দিয়ে বললেন," বড্ড মানসিক অবসাদে ভুগছি, জানেন! আচ্ছা আপনি তো ডাক্তার মানুষ। এই মানসিক অবসাদ থেকে রক্ষা পাওয়ার একটা কিছু পথ্য বাতলে দিন না।"


আমি সিগারেটে আরেকটি টান দিয়ে বললাম," সে না হয় বাতলে দেবো। কিন্তু তার আগে তো আপনার এই মানসিক অবসাদের কারণটি জানা প্রয়োজন। একটু বিস্তারিত বলুন তো ঠিক কি হয়েছে!"

গোপাল বাবু একটু জোরে শ্বাস টেনে বললেন," ব্যাপারটা হচ্ছে এই যে, বেশ কয়েকদিন ধরেই এই তল্লাটে যে বাচ্চা চুরির ঘটনাটা ঘটছে, সেটা নিশ্চয়ই আপনি শুনেছেন!

এবার আমি আমার সিগারেটটাতে একটা লম্বা টান দিয়ে ছাইদানে ফেলে বললাম," হ্যাঁ সে তো শুনেছি বৈকি। রোজই তো পেপারগুলোতে এই নিয়ে বেশ লেখালেখি চলছে।"


" তো এই ঘটনার তদন্তের ভার বেশ কিছুদিন যাবৎ আমার ঘাড়ের উপর এসে পড়েছে।" গোপাল বাবু বলতে লাগলেন। " তদন্ত চালাচ্ছি। খানা তল্লাশি করছি। যতরকম উপায় প্রয়োগ করা যায়, করছি। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। আগের দিন বড় সাহেব আমায় ডেকে পাঠালেন। তিনি তো রীতিমতো আমাকে কড়া ভাবে জানিয়ে দিলেন যে, যেভাবেই হোক, যতো শীঘ্রই হোক এই বাচ্চা চুরির দলটিকে পাকড়াও করতে হবে।" এবার তিনি টাকে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন," কি করি বলুন তো দেখি! আমি তো আমার দিক থেকে কোনো ত্রুটি রাখছি না। অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এবার ওই বজ্জাত চোরগুলো তো আর কোনো সজ্জন ব্যক্তি নয় যে, নিজের থেকে এসে আমার কাছে আত্মসমর্পণ করবে।"


দেখলাম গোপাল বাবুর মুখে একটা ক্ষীণ হাসির রেখা দেখা দিয়েছে। তাঁর মুখ থেকে ওই কথাগুলো শুনে আমারও বড্ড হাসি পেয়ে গেলো। হাসতে হাসতে বললাম," তো এই হচ্ছে আপনার মানসিক অবসাদের কারণ!" দেখলাম সেই ক্ষীণ হাসিটুকু অদৃশ্য হয়ে গিয়ে তিনি আবার গম্ভীর হয়ে পড়েছেন। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে একটা চাপা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন," শুধু এইটুকু হলেও এতটা চিন্তিত হতাম না!" আমি একটু ভ্রু কুঁচকে বললাম," আরেকটি কারণ! সেটা কি?"

" আ... মানে...!"

গোপাল বাবু বেশ কিছুক্ষণ ধরে ইতস্তত করছে দেখে আমি বললাম," দেখুন কারণটি যদি ব্যক্তিগত হয় তাহলে থাক।"

গোপাল বাবু এবার একটু মাথা নীচু করে হাত কচলাতে কচলাতে বললেন," না... মানে... ব্যক্তিগত তো বটেই। তবে... আপনি আমার বন্ধুর মতোই, আর... তাছাড়া আমি তো আপনাকে মোটামুটি সব কথাই বলি! কাজেই... আপনাকে বলতে... আ... আমার বিশেষ দ্বিধা নেই।"

" বেশ তবে বলুন।"

" সমস্যাটি হচ্ছে আমার স্ত্রীকে নিয়ে।"

" কিরকম সমস্যা?"

" আমার স্ত্রী যে মানসিক দিক থেকে সুস্থ নয় সে কথা তো আমি আপনাকে আগেই বলেছি!"

আমি ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালাম।

" বেশ কিছুদিন যাবৎ রমার মানে আমার স্ত্রীর মানসিক ব্যারামটা মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গিয়েছে।"

" উল্টো পাল্টা বকছে নাকি!"

" তাহলে তো নিজের মনকে অন্তত সান্ত্বনা দিতে পারতাম! কিন্তু ওর অবস্থাটা আমি ঠিক আপনাকে বলে বোঝাতে পারবো না। তবে এটুকু বলতে পারি রমা ইদানিং কেমন জানি পাশবিক আচরণ করতে শুরু করেছে। সব সময়ই ওর চোখে মুখে একটা হিংস্র ভাব লেগেই থাকে। সত্যি বলতে কি, আমিও আজকাল ওর কাছে যেতে ভয় পাই। পাছে আমার না কোনো অনিষ্ট করে বসে।"

" পাশবিক আচরণ বলতে কিরকম! তেড়ে ঠেড়ে এসে আক্রমণ করছে নাকি!"

" ইয়ে... মানে... অ্যা...!"

কয়েকবার ইতস্তত করে তিনি চুপ করে গেলেন। লক্ষ্য করলাম তাঁর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের উদ্ভব হয়েছে। বেশ কাঁপা কাঁপা হাতেই নিজের প্যান্টের পকেট থেকে রুমালটা বের করে কপালের ঘামগুলি মুছতে মুছতে বললেন," এই দেখেছেন কথায় কথায় আপনার কতো দেরী করিয়ে দিলাম! আজ বরং উঠি বুঝলেন! অন্য আরেকদিন আসবো।"


এই বলে তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন। সঙ্গে আমিও। গোপাল বাবুর এহেন আচরণে আমি বেশ বিস্মিত হলাম। কারণ আমি তাঁকে যতদূর চিনি, তাতে তিনি এত তাড়াতাড়ি উঠে পরবার লোক নন। তার উপর তাঁর স্ত্রীর আচরণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করাতে তাঁর এমন অস্থিরতা, এইসব কিছুই যেন আমার মনের কোথাও একটা গিয়ে খোঁচা দিতে লাগলো। তিনি আমাকে নমস্কার করে আমার প্রতি-নমস্কারের জন্য অপেক্ষা না করেই হনহন করে বেড়িয়ে যাচ্ছিলেন। আমি পেছন থেকে ডেকে উঠলাম " দারোগা বাবু!" তিনি সঙ্গে সঙ্গেই পেছন ফিরে তাকালেন। তবে তাঁর মুখের ফ্যাকাশে ভাব দেখে এটা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিলো যে, আমার এই অপ্রত্যাশিত ডাকের জন্য তিনি মোটেই প্রস্তুত ছিলেন না। আমি একটু হেসে বললাম," মাফ করবেন! আপনাকে পেছন থেকে ডাকলাম আবার!"

" না না ঠিকাছে", বললেন গোপাল বাবু। মুখে অপ্রস্তুতের হাসি।

" যদি কিছু মনে না করেন একটা অনুরোধ করতে চাই আপনার কাছে।"

যতটা সম্ভব স্বাভাবিক ভাবে হেসে গোপাল বাবু বললেন," হ্যাঁ... হ্যাঁ... বলুন না।"

" আপনার স্ত্রীকে কি একবার দেখতে পারি?"

কথাটা শুনে তিনি যেন প্রায় ভূত দেখার মতোই চমকে উঠলেন। খানিক ইতস্তত করতে লাগলেন।" "আপনি... মানে..."

" যদি আপনার কোনো অসুবিধা থাকে তাহলে থাক। না আসলে ভাবছিলাম যে, আমি তো নিজে একজন ডাক্তার... হ্যাঁ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নই ঠিকই, তবে যদি আপনার স্ত্রীর উপসর্গগুলি দেখে কোনো রকম সাহায্য করতে পারি!"

আমার কথাগুলি শুনবার পর গোপাল বাবু খানিক চুপ করে রইলেন। তারপর মনে মনে কিছু একটা ভেবে নিয়ে বললেন," আচ্ছা ঠিকাছে। দেখুন... যদি আপনি কিছু করতে পারেন! এখনও অবধি তো কেউই কোনো সুরাহা করতে পারলো না। আপনি না হয়..."

আমি সহাস্যে বললাম," অনেক ধন্যবাদ।"

গোপাল বাবু আবার একটু ভেবে বললেন," আগামী পরশু বিকেলে তৈরী থাকবেন। আপনাকে আমি নিতে আসবো।" এই বলে তিনি আমাকে আবার নমস্কার করে বেরিয়ে গেলেন। আমিও প্রতি নমস্কার করে তাঁকে গাড়ি অবধি ছেড়ে দিয়ে এলাম। ততক্ষণে বৃষ্টিটা একটু ধরেছে।



পরশুদিন বিকেলে চারটে নাগাদ একটি সাদা রঙের স্করপিও গাড়িতে চেপে গোপাল বাবুর সঙ্গে তাঁর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। গাড়িতে আমরা মোট তিনজন - গাড়ির চালক, গোপাল বাবু আর আমি। গোপাল বাবু একদম সামনে চালকের পাশের আসনটিতে বসে আছেন আর আমি ঠিক তাদের পেছনে বসে। এমনভাবে চুপচাপ বসে থাকতে আমার বড্ড অস্বস্তি লাগছিলো। কিন্তু গোপাল বাবুর থমথমে মুখখানি দেখে কথা বলবার সাহস হচ্ছিলো না। যদিও তিনি গাড়িতে ওঠবার আগেই আমাকে বেশ কড়া ভাবেই বলে দিয়েছিলেন যেন এইসব প্রসঙ্গ নিয়ে গাড়ির ভেতরে আলোচনা না করি। অগত্যা গাড়ির জানালার বাইরের দিকেই তাকিয়ে রইলাম। দেখতে দেখতে ব্যস্ত কোলাহল মুখর শহরটা ক্রমে কমে আসতে লাগলো। তার জায়গায় এখন সবুজ বনানী, ক্ষেত আর দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ। দেখলাম আকাশে ইষৎ কালো মেঘও জমেছে। আমাদের গাড়ি পিচের এবড়ো খেবড়ো রাস্তার উপর দিয়ে নিরলসভাবে ধেয়ে চলেছে। মাঝে মাঝে আমাদের পাশ কাটিয়ে নানাধরনের ছোট বড় গাড়ি হুঁশ হুঁশ করে আসা যাওয়া করছে। সব ঠিকই চলছে তবুও সেই গাড়িতে ওঠার পর থেকেই একটা চাপা উত্তেজনা আমাকে বারবার বিচলিত করে তুলছে। কি হবে, কি দেখবো - এইসব প্রশ্নগুলোই আমার মগজের মধ্যে বারংবার ঘুরপাক খেয়ে যাচ্ছে। গোপাল বাবুর মুখ নিঃসৃত বিবরণ অনুযায়ী আমি এক একটা করে অনুমান খাড়া করছি, আবার সেই সকল অনুমানকে অনর্থক বলে হত্যাও করছি। এমনই সব জল্পনা কল্পনা করতে করতে দেখলাম আমাদের গাড়িটা মূল রাস্তাটি ছেড়ে বাঁদিকে বাঁক নিয়ে একটা ভাঙ্গাচোরা রাস্তার উপর গিয়ে পড়েছে। দুপাশে সারি সারি লম্বা লম্বা গাছ এবং বিস্তর ঝোঁপ ঝাড়ে মোড়া রাস্তা। তারই একটা প্রান্তে এসে গাড়িটি থামলো। গাড়ি থেকেই মাঝারি উচ্চতার পাঁচিল দিয়ে ঘেরা একটি হলুদ রঙের দোতলা বাড়ি নজরে পড়লো। এতক্ষণ বাদে এই প্রথমবার গোপাল বাবু কথা বললেন।


" চলুন, আমরা এসে পড়েছি।" বলেই তিনি গাড়ির দরজা খুলে নেমে পড়লেন। তারপর তিনি গাড়ির চালককে আস্তে আস্তে কি যেন বলে আমার দিকে তাকিয়ে ঈষৎ হেসে বললেন," আসুন।" তিনি হাসলেন বটে তবে তাঁর মুখের থমথমে ভাবটা কিন্তু এখনও কাটেনি দেখলাম। একবার হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময়টা দেখে নিয়ে তাঁর পিছু পিছু চলতে আরম্ভ করলাম। তখন সবে পাঁচটা পনেরো। অথচ আকাশের ঘন কালো মেঘ এবং চারিপাশের নিশ্ছিদ্র নিস্তব্ধতা যেন নিশুতি রাতের একটা ভ্রম তৈরী করছিলো। এতক্ষণ মনের মধ্যে একটি চাপা উত্তেজনা তো ছিলো বটেই এবার তার সাথে আরেকটি অনুভূতি যুক্ত হলো, ভয়। খুব মৃদু ছন্দে হলেও বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছিলো। গোপাল বাবুকে অনুসরণ করে সামনের লোহার গেটটা ছাড়িয়ে অযত্ন করে গুছিয়ে রাখা বাগানটির মাঝ বরাবর সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো পথটা ধরে তাঁর বাড়ির দিকে এগিয়ে চললাম। আমি হাঁটতে হাঁটতে একটু গলা খাকরানি দিয়ে বললাম," এইরকম একটা নির্জন জায়গায় থাকেন, ভয় করেনা আপনার!" গোপাল বাবু আমার তুলনায় একটু দ্রুতপদেই হাঁটছিলেন। তিনি সেইভাবেই হাঁটতে হাঁটতে বললেন," ভয়!"। এরপরই একটি মৃদু অথচ গম্ভীর হাসির শব্দ পেলাম। " ঠিক কিসের ভয়ের কথা বলছেন ডাক্তার বাবু?"

" না... মানে..."

আমাকে থামিয়ে দিয়ে তিনি হেসে বললেন," চিন্তা নেই। এখানে চোর বা ভূত কোনোটারই উপদ্রব নেই। আপনি নিশ্চিন্তে আসতে পারেন।"

তারপর তিনি সিঁড়ি দিয়ে ছোট্ট বারান্দায় উঠে তাঁর পকেট থেকে একটি চাবির গোছা বের করে তার মধ্যে থেকে একটা চাবি দিয়ে প্রথমে কালো রঙের কোল্যাপসিবেল গেটের তালাটি খুলে জোরে টান মারলেন। তারপর আরও দুটি চাবি দিয়ে মূল ফটকের গায়ে ঝোলানো দুটি বৃহৎ আকারের তালাকে খুলে ফেললেন। আমি একটু কৌতুক করে বললাম," এই যে বললেন চোরের নাকি একদমই উপদ্রব নেই। তাহলে এতগুলো তালা লাগিয়েছেন যে!" গোপাল বাবু দরজার ছিটকিনিটা সশব্দে খুলে বললেন," তবুও... একটু সতর্ক থাকি। বলা যায়না কখন কি হয়ে যায়! আসুন।" বলে দরজাটা খুলে আমাকে ভেতরে আসতে বললেন। ঘরের ভেতরটাতে জমাট অন্ধকার। কোথাও কিছু দেখতে পাচ্ছি না। আমি জিজ্ঞেস করলাম," আপনার স্ত্রী কি বাড়িতে নেই?"


" হুম আছে।" তারপরেই কতকগুলো খট্ খট্ শব্দ করে গোপাল বাবু ঘরের সমস্ত আলোগুলি জ্বেলে দিলেন। দেখলাম আমি এখন যে ঘরটিতে দাঁড়িয়ে আছি সেটি একটি বসবার ঘর। দরজার সোজাসুজিই একটি সুবিশাল সোফা সেট এবং ঘরের চারিপাশে আরও অনেক আসবাব ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। সবকিছুতেই একটা অগোছালো ভাব। গোপাল বাবু আমাকে আঙ্গুলি নির্দেশ করে সামনের ধূসর সোফাটিতে বসতে বলে ভেতরের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন। আমি অত্যন্ত বিনম্রতার সহিত সোফার একপাশে গিয়ে বসে পড়লাম। সোফাটা দেখতে পুরাতন হলেও এর আরাম প্রদান ক্ষমতা কিন্তু এখনও বর্তমান। বেশ কিছুক্ষণ এইভাবে চুপচাপ বসে থাকবার পর গোপাল বাবু তাঁর ইউনিফর্ম ছেড়ে একটি গাঢ় নীল রঙের নাইট রোব পরে চায়ের ট্রে নিয়ে বসবার ঘরে প্রবেশ করলেন। আমি তাঁকে দেখে ব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে চায়ের ট্রেটা ধরতে যাচ্ছিলাম কিন্তু তিনি আপত্তি জানালেন। " আরে বসুন, বসুন। করছেন টা কি!" আমি সলজ্জিত ভাবে আবার আগের স্থানেই বসে পড়লাম। গোপাল বাবু ট্রেটিকে সামনের কাঁচের টেবিলটির উপর রেখে আমারই পাশে থাকা ছোট সোফাটিতে বসলেন। তারপর এক পেয়ালা দুধ চা আমার হাতে তুলে দিয়ে এবং অন্য পেয়ালাটি নিজে তুলে নিয়ে বললেন," কিছু মনে করবেন না! এইসব আতিথেয়তা এখন আমাকেই করতে হয়। আমার স্ত্রী তার অসুস্থতার জন্য এখন আর এইসব কিছুই করতে পারে না।" আমি হেসে বললাম," দারোগা বাবু আতিথেয়তা তো অতিথিদের সাথে করতে হয়! আর আমি তো আপনার নিজের লোক। আমার সঙ্গে আবার আতিথেয়তা কিসের!" বলে আমি গরম চায়ের পেয়ালাতে একটা চুমুক দিলাম। দেখলাম আমার কথাটা শুনে তিনি একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। " আর অতিথি! সেইসব পাঠ কবেই চুকিয়ে দিয়েছি। রমার অসুস্থতার পর থেকে তেমন ভাবে কেউ যোগাযোগও রাখেনা আমাদের সাথে। সত্যি বলতে আমিও তাতে খুব একটা অসন্তুষ্ট নই। কারণ রমার এমন অবস্থায় কাউকে আমন্ত্রণ করে বাড়িতে ডাকবো - এতে ঠিক আমার মন সায় দেয়না।" কথাটা শেষ করে গোপাল বাবু বিষন্ন মুখে চায়ে একটা চুমুক দিলেন। তাঁর মনের ভাব সহজেই অনুমান করা যায়। যতই তিনি মুখে বলুক তবুও আপনজনদের থেকে দূরে থাকার যে কষ্ট তা কোনো কিছু দিয়েই নিবৃত হয়না। আমি চায়ে আরেকটি চুমুক দিয়ে বললাম," তা হঠাৎ করে এরকম একটি পান্ডব বর্জিত জায়গায় বাড়ি করতে গেলেন কেন?"


এবার তিনি তাঁর চায়ের পেয়ালাটা টেবিলের উপর নামিয়ে রেখে বললেন," সবই আমার ভাগ্য দোষ বুঝলেন ডাক্তার বাবু! সবই আমার ভাগ্য দোষ! শুধুমাত্র রমার জন্য বাধ্য হয়ে আমাকে বারুইপুরের বাড়িটা ছেড়ে দিতে হয়েছে। রমার অসুস্থতাকে ঘিরে পাড়ার লোকজনের সমালোচনা ও ফিসফিসানি যেন আমাদের বেঁচে থাকবার পক্ষে অসহনীয় হয়ে পড়ছিলো।" আরেকটি চুমুক দিয়ে আমিও আমার পেয়ালাটা টেবিলের উপর রেখে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করতে করতে জিজ্ঞেস করলাম," আপনার স্ত্রী কি শুরু থেকেই এমন?"

গোপাল বাবু যথেষ্ট উত্তেজিত হয়ে বললেন," না না ডাক্তার বাবু একদমই নয়! কারণ রমার সাথে আমার যখন বিয়ে হয় তখন ও কিন্তু সম্পূর্ণ সুস্থ। গ্রামের মেয়ে। ভীষন সরল ও সাধাসিধে। সারাটা দিন বাড়ি আর সংসার নিয়েই মেতে থাকতো। নিজের শখ আহ্লাদ বলে কিছুই ছিলো না। আর যদি থেকেও থাকে মুখ ফুটে তা কোনোদিনও প্রকাশ করেনি। এমন ভাবে বছর দুয়েক যাওয়ার পর আমাদের একটি ছেলে হলো। তখন আর রমাকে কে পায়! বেজায় খুশী সে। বলতে গেলে আমাদের ছোট সংসারটি কিন্তু বেশ হাসি খুশিই ছিলো।" এটুকু বলার পর তিনি আমার থেকে একটা সিগারেট নিয়ে ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে হতাশ ভাবে বললেন," তারপর না জানি কার নজর লাগলো আমাদের সংসারের উপর!" আমিও একটা সিগারেট ধরিয়ে বললাম," রমা দেবীর এই অসুস্থতার কথা কবে থেকে জানতে পারলেন?"

" ছেলে হওয়ার আট বছর পর।"

" কোনো শক-টক পেয়েছিলো নাকি?"

" না ডাক্তার বাবু তেমন কিছু ঘটেনি যার থেকে ও শক পেতে পারে! অন্তত আমার তো এটাই ধারণা। কারণ রমা তখনও দিব্যি ছিলো। এমনকি আমরা স্বপরিবারে গোয়াতেও ঘুরতে গিয়েছিলাম। তবে..."

গোপাল বাবু এবার একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়লেন। আমি কৌতুহলী হয়ে বললাম," তবে কি!"

গোপাল বাবু সিগারেটটাতে একটা মৃদু টান দিয়ে বললেন," তবে সেখানে একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছিলো।"

" কি রকম?" আমি শিরদাঁড়া টান করে বসলাম। ভেতরের চাপা উত্তেজনাটা যেন আরেকটু বেড়ে গেলো। তিনি বললেন," যেদিন গিয়েছি তার ঠিক পরের দিন রাত্তিরে আমরা একটা রেস্টুরেন্টে বসে রাতের খাবার খাচ্ছিলাম। হঠাৎ রমা বললো," আমি একটু বাথরুম থেকে আসছি।" আমি বললাম," যাও।" তারপর প্রায় কুড়ি মিনিট হয়ে গেলো দেখছি রমা ফিরছে না। এবার আমার চিন্তা হতে শুরু হলো। আমি বারবার এদিক ওদিক তাকাচ্ছি। এমন সময় হঠাৎ সমস্ত রেস্টুরেন্টের মধ্যে একটি মৃদু চাঞ্চল্য শুরু হলো। রেস্টুরেন্টের কিছু ওয়েটার, সিকিউরিটি গার্ড এমনকি কিছু পর্যটককেও বেশ উদ্বিগ্ন ভাবেই বাথরুমের দিকে যেতে দেখলাম। আমার মনের মধ্যে কেমন একটা অস্বস্তি হতে শুরু করলো। সবশেষে যখন কালো ব্লেজার পরিহিত রেস্টুরেন্টের ম্যানেজারকেও উদ্বিগ্ন ভাবে ছুটতে দেখলাম আমি আর বসে থাকতে পারলাম না। বাবান কে মানে আমার ছেলেকে চেয়ারে বসিয়ে রেখে আমিও ছুটলাম সেইদিকে। দেখলাম লেডিস টয়লেটের সামনে বেশ ভীড়। আমি আস্তে আস্তে সবাইকে পাশ কাটিয়ে বাথরুমের দরজার সামনে যেতেই চমকে উঠলাম। দেখি রমা নিশ্চল ভাবে নীচে পড়ে আছে। আমি হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে সামনের দুজন সিকিউরিটি গার্ডকে একপ্রকার ধাক্কা মেরে সরিয়ে রমার কাছে গিয়ে বসে পড়লাম। রমার এমন অবস্থা দেখে আমার চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এলো। আমি রমার মাথাটাকে নিজের কোলের উপর তুলে ওর গালের উপর হালকা হালকা ধাক্কা দিতে লাগলাম। " রমা, এই রমা কি হয়েছে তোমার! চোখ খোলা রমা। রমা..." বারবার করে ডেকে চলেছি তবুও রমা সেই একই রকম ভাবে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে।

" এরপর!"

" এরপর রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার একজন ডাক্তারকে ডাকলেন। ডাক্তার এসে দেখে শুনে বললেন, অত্যাধিক মানসিক চাপের ফলে জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়েছেন। কিছু ওষুধও লিখে দিয়ে গেলেন। এমন অবস্থায় আমার নিজের মানসিক পরিস্থিতি কি হতে পারে! তাই পরের দিনই তৎকালীন টিকিট নিয়ে ফ্লাইটে করে ফিরে আসি। তারপর থেকেই রমার আচরণের মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করতে শুরু করি। খাওয়া দাওয়া প্রায় বন্ধই করে দিলো। একবেলা খেতো তো আরেক বেলা খেতো না। সারাদিন ঘরের মধ্যে একা একা বসে থাকতো আর মুখ দিয়ে এক এক সময় বিকট বিকট আওয়াজ করতো। ওর কাছে গেলেই কেমন একটা লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো আমার দিকে। একদিন তো প্রায় তেড়েই আসলো। এরপর থেকেই রমার প্রতি একটা ভীতি যেন বদ্ধমূল হয়ে গেলো মনে।ছেলেকে দেশের বাড়িতে পাঠিয়ে দিলাম। আর আমি নিজেও রমার থেকে দূরে দূরে থাকতে আরম্ভ করলাম। এরকম ভাবে আরও বেশ কয়েকদিন চলার পর আমি ওকে আমার এক পরিচিত ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। রমার অবস্থা দেখে তিনি আমাকে একজন ভালো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দেখানোর পরামর্শ দিলেন। তার কথা মতো রমাকে কলকাতার এক খ্যাতনামা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে গেলাম। তিনি রমাকে ভালো করে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে যা বললেন তা শুনে আমার পায়ের তলার মাটি সরে গেলো। তিনি বললেন," দেখুন মিস্টার দাস, আপনার স্ত্রীর কোনো মানসিক রোগ নেই।" আমি অবাক হয়ে বললাম," তাহলে আমার স্ত্রী ওইরকম পাগলের মতন আচরণ করছে কেন?" ডাক্তার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন," কিছু মনে করবেন না একটা কথা জিজ্ঞেস করছি আপনাকে! আপনার স্ত্রী কি ড্রাগ অ্যাডিক্টেড?" প্রশ্নটা শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। " ড্রাগ অ্যাডিক্টেড! ড্রাগ অ্যাডিক্টেড কেন হবে! রমা তো..."

" সরি টু সে", ডাক্তার আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন," সমস্ত পরীক্ষার ভিত্তিতে এটা স্পষ্ট যে, আপনার স্ত্রী ফ্লাকা নামক একপ্রকার ড্রাগের নেশায় আসক্ত।" আমি একটু উত্তেজিত হয়ে বললাম," এসব আপনি কি বলছেন!"

" আমি আপনার মনের অবস্থা বুঝতে পারছি মিস্টার দাস। কিন্তু সত্যিটাতো আপনাকে মানতেই হবে। আপনার স্ত্রীর রক্তে ফ্লাকা ড্রাগের নমুনা পাওয়া গেছে।" আমি অস্ফুট স্বরে বললাম," ফ্লা... কা..."

" হ্যাঁ ফ্লাকা। এটি একটি সাংঘাতিক মারণ ড্রাগ। কোনো মানুষ যখন এই ড্রাগ সেবন করে তখন তার মানসিক ভারসাম্য সম্পূর্ণ রূপে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। সেই সময় ভিকটিম এমন কিছু করে বসে যা কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে করা সম্ভব নয়।"

" এমন কিছু বলতে!" বিস্ময়ে আমার গলা দিয়ে আওয়াজ বের হচ্ছিলো না।

ডাক্তার একটু ভেবে বললেন," যেমন ধরুন কোনো চলন্ত গাড়ির সামনে হঠাৎ করে দাঁড়িয়ে পড়া, অথবা নিজের শরীরের মাংস ছিঁড়ে খাওয়া বা ধরুন নিজের চোখের মধ্যেই ধারালো কোনো অস্ত্র নিক্ষেপ করা - এইসব। আসলে এই ড্রাগ সর্বপ্রথম ভিকটিমের মস্তিষ্ককে অকেজো করে দেয়। যার ফলে এদের চিন্তা ভাবনা করার ক্ষমতাটাই লোপ পায়।"

আমি ডাক্তারের সমস্ত কথা নির্বাক ভাবে শুনছিলাম। বুকের ভেতরটা যেন জোরে জোরে কেঁপে উঠছিলো। ডাক্তার আরও বললেন," তবে কি মিস্টার দাস আপনার স্ত্রী কিন্তু এক্ষেত্রে একবারে ব্যতিক্রম।"

" ব্যতিক্রম বলতে!" আমি করুন ভাবে জানতে চাইলাম।

" সাধারণত এই ড্রাগ একবার শরীরে প্রবেশ করলে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা অবধি এর প্রভাব থাকে। আবার কখনো কখনো ড্রাগের পরিমাণ একটু বেশি মাত্রায় পড়লে এর স্থায়িত্ব নয় থেকে দশ ঘণ্টাও হতে দেখা গেছে। কিন্তু আপনার স্ত্রীর ক্ষেত্রে কিন্তু সেটা হচ্ছে না!"

" মানে!"

" মানে এই যে, ড্রাগটি যেকোনো উপায়ে আপনার স্ত্রীর শরীরে প্রবেশ করেছে বটে। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে সেই ড্রাগের মলিকিউলগুলো কোনো এক অজ্ঞাত কারণে আপনার স্ত্রীর মস্তিষ্ক তথা গোটা স্নায়ু তন্ত্রের উপর ধীরে ধীরে প্রভাব ফেলছে। ফলে সেই মুহূর্তে কোনো রকম কোনো রিঅ্যাকশন না দেখালেও ধীরে ধীরে তিনি আর বাকি ভিকটিমদের মতোই রিঅ্যাক্ট করতে শুরু করছেন। আমার ধারণা হয়তো তার এই বিকার সুদূর ভবিষ্যতে আরও বড় আকার নিলেও নিতে পারে।"

" তাহলে কি এর কোনো চিকিৎসা নেই!"

খানিকক্ষণ ভেবে নিয়ে ডাক্তার বললেন," দেখুন কোনো রকম মিথ্যে আশ্বাস আপনাকে দেবো না। তবে যদি চান তাহলে কোনো একটা রিহ্যাবে পাঠিয়ে দেখতে পারেন। যদি বলেন তো আমার চেনা শোনা একটা রিহ্যাব আছে। সেখানে আপনাকে যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারি। তবে হ্যাঁ, বেশী আশাবাদী কিন্তু হবেন না। কারণ আমিও নিশ্চিত করে বলতে পারছি না যে, আপনার স্ত্রী আদৌ কতটা সুস্থ হবে! কারণ এই ধরনের ঘটনা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে খুবই বিরল অথবা প্রথম বললেও খুব একটা ভুল হবেনা।"

আমি সেদিনকার মতো রমাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসি। তারপর অনেক ভাবনা চিন্তা করে রমাকে রিহ্যাবে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিই। বিশ্বাস করুন ডাক্তার বাবু আমি রমাকে ভীষণ ভালোবাসি..."


লক্ষ্য করলাম গোপাল বাবুর গলা কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে। "...কাজেই ওকে ওখানে পাঠাতে আমার এতটুকু মন চাইছিলো না। তবুও বুকের উপর পাথর রেখে আমাকে এই কাজটা করতে হয়েছিলো। ডাক্তারের হাজার বারণ সত্তেও আমি যথেষ্ট আশাবাদী ছিলাম যে, রমা নিশ্চয়ই আবার আগের মতোন সুস্থ হয়ে উঠবে। কিন্তু আমার সেই আশার মেয়াদ ছিলো মাত্র সাতদিন। কারণ সাতদিন বাদে হঠাৎ রিহ্যাব থেকে একটা ফোন এলো। সেখান থেকে জানানো হলো যে, রমার পাগলামি নাকি আগের তুলনায় আরও বেড়ে গিয়েছে। এমনকি ওখানকার একজন কর্মীকেও নাকি সে কামড়ে ঘারের থেকে অনেকখানি মাংস তুলে নিয়েছে। ফলে তারা আর রমাকে রাখতে চায়না। আমি যেন এক্ষুনি এসে তাকে নিয়ে যাই। আমি সেখানকার কর্মকর্তাদের কাছে অনেক কাকুতি মিনতিও করেছি। কিন্তু তারা কিছুতেই রমাকে রাখতে রাজি হলো না। এমনকি তারা সেই ঘায়েল হওয়া কর্মীর কাছেও নিয়ে গেলো। সত্যি তার কাঁধের একটা অংশে সাদা ব্যান্ডেজ লাগানো। আমি কিছুতেই নিজের চোখকে বিশ্বাস করাতে পারছিলাম না যে, রমা, সেই গ্রাম থেকে আসা সরল সাধাসিধে মেয়েটা, যার মুখে সর্বদাই একটা লাবন্যের হাঁসি ফুটে থাকতো, সেই রমাই নাকি এই কাজটা করেছে। নিজের অজান্তেই চোখের কোন থেকে একবিন্দু জল নির্দ্বিধায় গড়িয়ে পড়লো। সেদিন ওদেরই গাড়ি আমাকে আর রমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেলো। আমি শক্ত করে দু'হাত দিয়ে রমাকে ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। রমার দু'হাত ও মুখ কাপড় দিয়ে বাঁধা। তবুও রমা প্রাণপনে ছটপট করছিলো আর মুখ দিয়ে বীভৎস গোঙানির শব্দ বের করছিলো। বাড়ির আশপাশের সকল প্রতিবেশী আমাদের দিকে দৃষ্টি চালাচালি করছিলো। কিন্তু আমার সাহস হচ্ছিলো না তাদের দিকে তাকানোর। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে তার যথার্থ উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা আমার ছিলো না তখন। চুপচাপ রমাকে টানতে টানতে বাড়ির ভেতরে চলে গেলাম। তবে রিহ্যাব থেকে ফেরবার পর আমি একটা জিনিস স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলাম যে, রমা এখন আর সাধারণ মানুষের মতো নেই। ও এখন এক হিংস্র প্রানীতে পরিণত হয়েছে। কাজেই তাকে আর এই লোকালয়ে রাখা নিরাপদ নয়। এই লোক সমাজের থেকে অনেক দূরে নিয়ে যেতে হবে তাকে।


আপাতত রমাকে গৃহবন্দি করে আমি ডিউটিতে যোগ দিই এবং অন্যত্র ঘর খুঁজতে আরম্ভ করে দিই। অনেক খোঁজাখুঁজির পর আমি এই বাড়িটির সন্ধান পাই। মানব সমাজের নাগালের বাইরে অবস্থিত এই বাড়িখানি কেনার জন্য আমি মরিয়া হয়ে উঠি এবং অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই বাড়ির মালিকের নাম ঠিকানা জোগাড় করে খুব স্বল্প মূল্যেই বাড়িটাকে কিনে ফেলি। তারপর খুব তাড়াতাড়ি বাড়িটির মেরামত করিয়ে বারুইপুর থেকে একেবারে তল্পিতল্পা গুটিয়ে চিরকালের মতো এখানে চলে আসি। বলাই বাহুল্য, ততদিনে রমা আরও ভয়ঙ্কর, আরও হিংস্র হয়ে উঠেছে। কাজে বুঝতেই পারছেন রমাকে এখানে আনাটা যথেষ্ট পরিশ্রমসাধ্য কাজ ছিলো। অনেক বেশী মাত্রায় ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে ওকে এখানে আনতে হয়েছিলো। তারপর দেখতে দেখতে দশটা বছর পেরিয়ে গেলো। এইভাবেই আমরা এই নির্জনতায় মানব সভ্যতার থেকে বিমূখ হয়ে আমাদের এই অর্থহীন সংসারটাকে চালিয়ে যাচ্ছি।"


এই বলে গোপাল বাবু একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আমি বললাম," সেদিন রেস্টুরেন্টে যে আপনার স্ত্রী হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়লেন, কারণ কি জানতে পেরেছিলেন?"

" না ডাক্তার বাবু। ওটাই তো বড় রহস্য আমার কাছে। পরে জ্ঞান ফেরবার পর আমি রমাকে অনেকবার এই ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি কিন্তু ও কিছুই বলতে পারেনি।"

গোপাল বাবুর কথাগুলি শুনে আমি গভীর ভাবে চিন্তা করতে লাগলাম। গোয়ার রেস্টুরেন্টে হঠাৎ করে রমা দেবীর অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, তার কয়েকদিন পরেই তাঁর শরীর থেকে ফ্লাকা ড্রাগের নমুনা আবিষ্কার হওয়া - এই সবই যেন গাঢ় ধোঁয়াশার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছিলো আমাকে। কিন্তু হঠাৎ আমার চিন্তায় বাঁধা পড়লো।কোথা থেকে যেন একটা হাঁড় হিম করা গর্জনের শব্দ ভেসে এসে আমার সমস্ত অস্থি মজ্জাগুলিকে যেন নাড়িয়ে দিয়ে গেলো। আমি চকিতে দাঁড়িয়ে পড়লাম। গর্জনটা চাপা কিন্তু তার বারংবার পুনরাবৃত্তি যেন তার অসীম ক্রূরতার পরিচয় বহন করছে। আমার মুখে গভীর আতঙ্কের ছাপ দেখেই হয়তো গোপাল বাবু গম্ভীর ভাবে হেসে বললেন," বসে পড়ুন ডাক্তার বাবু। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ওটি আমার স্ত্রীর গলা। ওর যখন ক্ষিদে পায় তখন ও ওইরকম ভাবেই আওয়াজ করতে থাকে।"


গোপাল বাবুর কথা শুনে আবার সোফার উপর বসে পড়লাম ঠিকই কিন্তু সেই বিভীষিকাময় শব্দের জের তখনও যেন আমার শ্রবণ যন্ত্রে রয়ে গিয়েছিলো। চরম ভয় পাওয়ার মূহুর্তেও মানুষ যেমন কৌতুহল বশত সেই ভয়ের উৎসের দিকে ধাবিত হয়ে তা নিকট থেকে উপভোগ করবার চেষ্টা করে, ঠিক তেমন ভাবেই আমার মনেও সেই গর্জনের উৎস স্থলে পৌঁছাবার জন্য তীব্র তৃষ্ণার সঞ্চার হচ্ছিলো। গোপাল বাবু বললেন," বসুন একটুখানি। আমি রমাকে খাবারটা দিয়ে আসছি।" এই বলে গোপাল বাবু উঠে দাঁড়াতেই আমি প্রায় শিশুদের বায়না করার মতোই বলে উঠলাম," আমিও যাবো আপনার সঙ্গে।" আমার এই শিশু সুলভ আবদারে তিনি আমার দিকে কড়া ভাবে তাকালেন। চোখের দৃষ্টি যেন লেলিহান অগ্নি শিখা। তারপর চোখের দৃষ্টি একটু নরম করে মৃদু হেসে বললেন," আসলে আমার স্ত্রী খাওয়ার সময় অন্য কোনো ব্যক্তির পাশে থাকাটা মোটেই পছন্দ করেনা। তাই একটু আপত্তি করছি। কিছু মনে করবেন না।" আমি হেসে মাথা নাড়লাম।


" আপনি এখানে বসেই একটু অপেক্ষা করুন।"


অগত্যা গোপাল বাবু ভেতরে চলে যাওয়ার পর আমি সুবোধ বালকের মতোই চুপ করে সোফার উপর বসে রইলাম। এরপর আরও বেশ কয়েকবার সেই গর্জনটা কানে ভেসে এলো। তারপর সব চুপচাপ। স্বভাবতই আমি আবার একটি সিগারেট ধরাবার উপক্রম করছি ঠিক সেই সময়ই আরেকটি শব্দ যেন আমার শ্রবণ যন্ত্রে ঝনঝন করে বেজে উঠলো। মূহুর্তে আমার সারা শরীরে শিহরণ খেলে গেলো। এ শব্দ পূর্বে শোনা সেই গর্জনের শব্দ নয়! এটি একটি বাচ্চা মেয়ের গলা চিরে বেরিয়ে আসা আর্তনাদ! আমি আর বসে থাকতে পারলাম না। গোপাল বাবুর দেওয়া নির্দেশকে অমান্য করেই সেই আর্তনাদের উৎস পথে ধাবিত হলাম।


ভেতরের ঘরে ঢুকতেই সোজাসুজি একটা দরজা চোখে পড়লো। আর্তনাদটা সেইদিক থেকেই আসছে। আমি দ্রুতপদে এগিয়ে গেলাম সেদিকে। দরজা পেরোতেই একটা লম্বা প্যাসেজে এসে পড়লাম। প্যাসেজটি অন্ধকার। সেই প্যাসেজেরই একদম শেষ প্রান্তে আমার চোখ আটকে গেলো। দেখলাম একটা প্রায় ভেজানো দরজার ফাঁক দিয়ে ক্ষীণ লাল আলোক রশ্মি নির্গত হয়ে তার উল্টোদিকের দেওয়াল, মেঝে ও ছাদের কিছু অংশকে সরু নিখুঁত সরলরেখায় প্লাবিত করেছে। আমার বুঝতে বাকি রইলো না এই দরজার আড়াল থেকেই মেয়েটির আর্তনাদ ভেসে আসছে। শুধু আর্তনাদ নয়! তার পাশাপাশি আরেকটি চাপা গোঙানির শব্দও শুনতে পাচ্ছিলাম। বুকের ভেতরটায় তখন যেন রীতিমতো বিষ্ফোরণ হচ্ছিলো। আমি ধীরে ধীরে সেই আলোর দিকে এগোতে লাগলাম। কিছুটা এগোতেই একটা বিশ্রী পচা গন্ধ নাকে আসতে আমার প্রায় অন্নপ্রাশনের ভাত বেড়িয়ে আসার উপক্রম হলো। সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে রুমালটা বের করে নাকে চেপে ধরে এগোতে লাগলাম। দরজাটার একদম কাছে আসতেই আর্তনাদটা আস্তে আস্তে শিথিল হয়ে পড়লো। এখন সেখানে চাপা গোঙানির শব্দটুকুই খালি শোনা যাচ্ছে। আমি আস্তে করে দরজার উপর কান পাততেই একটা মৃদু কচকচানি শব্দ শুনতে পেলাম। মনে হচ্ছে কেউ বোধহয় শক্ত রবার জাতীয় কিছু চিবোচ্ছে। তাহলে এটাই কি গোপাল বাবুর স্ত্রীর ঘর! এক চরম সংশয় নিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে দরজার একটা পাল্লায় ঈষৎ ঠেলা দিতে সেটি নিঃশব্দে কিছুটা খুলে গেলো। সেইদিকে চোখ রাখতেই আমার মেরুদন্ড বেয়ে যেন একটি শীতল স্রোত নেমে গেলো। দরজার আড়ালে থাকা ঘরটা এখন প্রায় উন্মোচিত আমার সামনে। সারা ঘর জুড়ে লাল নিয়নের আলো থৈ থৈ করছে। আমার থেকে হাত পাঁচেক দূরে আমারই দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন গোপাল বাবু আর তার থেকে আরেকটু দূরে বসে আছে একটি মহিলা। শীর্ণকায় শরীরের উপর মাথার জট পাকানো চুলগুলো অবিন্যস্ত ভাবে ঝুলে রয়েছে। আবার কোথাও কোথাও চুলের অভাবে মাথার সাদা চামড়া দেখা যাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে কেউ যেন সেখান থেকে চুল খাবলে তুলে নিয়েছে। পরনে একটি জীর্ণ ধূসর রঙের নাইটি। যদিও তা দিয়ে তার লজ্জা নিবারণ হচ্ছে না। লক্ষ্য করলাম মহিলাটি সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে কি একটা চিবোচ্ছে। কারণ কচ্ কচ্ শব্দটা আমি বেশ স্পষ্টই শুনতে পাচ্ছিলাম। কিন্তু ওটা কি! এরপরে যা দেখলাম তারপর আমি আমার স্নায়ুর উপর আর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারলাম না। আমার গোটা শরীরটা থরথর করে কেঁপে উঠলো। আমি স্পষ্ট দেখলাম সেই মহিলাটির কোলে একটি বছর নয়ের মেয়ে নিথর ভাবে শুয়ে রয়েছে। তার চোখ দুটি মরা মাছের মতো স্থির। মেয়েটির মুখ দিয়ে এবং ঘাড় বেয়ে অঝোর ধারায় রক্ত বেয়ে পড়ছে আর সেই মহিলাটি ওই ফুলের মতো কোমল শরীরটাকে... আর সহ্য করতে পারছিলাম না। সেই নারকীয় দৃশ্য যেন ফাঁসির দড়ির মতোই আমার গলাটাকে আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরতে চাইছিলো। আমার কৌতুহলের নিবৃত্তি যে এইভাবে হবে তা আমি স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারিনি। ব্যাস্ অনেক হয়েছে! আর এক মুহূর্তও এখানে নয়। আমাকে পালাতে হবে! এই দরজা, এই বাড়ি, এই অঞ্চল - সবকিছু ছেড়ে পালাতে হবে। আমি আমার সমস্ত স্নায়ুকে আবার নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু ততক্ষণে সেই ভয়ানক দৃশ্য দেখে অতর্কিতেই আমার মুখ দিয়ে একটা অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে পড়ে আর তারপরেই গোপাল বাবু এবং মহিলাটি চকিতে আমার দিকে ফিরে তাকায়। এতক্ষণ ধরে আমি মহিলাটির কেবল পেছন দিকটাই দেখতে পাচ্ছিলাম। কিন্তু এখন আমার দিকে মুখ ফেরাতেই আমার রক্ত যেন জল হয়ে গেলো। ওহ্ কি ভয়ানক সেই চেহারা! যেন সাক্ষাৎ নরকের পিশাচ বসে রয়েছে। মুখটি অস্বাভাবিক রকমের সাদা, ফ্যাকাশে ও ক্ষতদাগে পরিপূর্ণ। কপাল চওড়া। কপালের দুপাশে ও মাথা জুড়ে চাক চাক মাংস পিন্ড ঢিপির মতো উঁচু হয়ে তাকিয়ে রয়েছে। তীক্ষ্ণ ফলার মতো দাঁত। সমগ্র শরীর ও মুখ রক্তে রঞ্জিত। আমাকে দেখা মাত্রই মহিলাটি এক তীব্র অমানষিক গর্জন করে আমার দিকে তেড়ে আসতে চাইলো। কিন্তু সে পারলো না। একটা ঝনঝন শব্দ হওয়ার সাথে সাথেই সে আটকে পড়লো। ভালো করে চাইতেই বুঝতে পারলাম তার একটা পা দেওয়ালের সঙ্গে মোটা শেকল দিয়ে বাঁধা। কিন্তু ভয়ে ততক্ষণে আমি দু পা পিছিয়ে গিয়েছি। মহিলাটি তবুও বারবার গর্জন করে আমার দিকে তেড়ে আসবার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য হাঁ করে দেখছিলাম। হঠাৎ গোপাল বাবুর ক্রুদ্ধ কন্ঠে আমার সম্বিত ফেরে। তিনি বললেন," আমি বলেছিলাম না আপনাকে ওইখানেই বসে থাকতে!" এবার যেন তিনি হুংকার দিয়ে উঠলেন। "বলুন!" সেই হুংকারে আমার বুক কেঁপে উঠলো। এতদিন ধরে যে গোপাল বাবুকে আমি চিনতাম আজ যেন সে উবে গিয়েছে। ওই রক্তিম আলোতে তাঁর চোখ দুটি যেন আগুনের চুল্লির মতো জ্বলছে। ওরকম একটা অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে আমার ভাবনা চিন্তা, এমনকি কথা বলার ক্ষমতাটা পর্যন্ত লোপ পেয়ে গেলো। কোনো কিছু বুঝে উঠবার আগেই আমি ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড় লাগালাম। " দাঁড়ান! দাঁড়ান বলছি!" বলে গোপাল বাবুও আমার পেছনে দৌড়াতে আরম্ভ করলেন। দৌড়াতে দৌড়াতে যখন আমি বসবার ঘরটাতে আসলাম ঠিক তখনই ধড়াম করে ভারি কিছু একটা জিনিস আমার ঘাড়ে এসে লাগলো। একটা আর্তনাদ করে আমি মেঝেতে পড়ে গেলাম। ঘাড়ে অসহ্য যন্ত্রনা হচ্ছে। একটুখানি মুখ তুলে চাইতে দেখলাম গোপাল বাবু আমার ঠিক সামনেটায় এসে দাঁড়িয়েছেন। করুণ ভাবে বললেন," ডাক্তার বাবু আপনি ঠিক আছেন তো?" আমি কোনো উত্তর দিলাম না।

" বিশ্বাস করুন ডাক্তার বাবু আমি কিন্তু ইচ্ছে করে আপনাকে আঘাত করতে চাইনি। আপনি তখন ওইভাবে পালালেন বলে... যাগ গে বাদ দিন ওসব কথা।"

আমি আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালাম। গোপাল বাবু আবার বললেন," তবে দোষটা কিন্তু আপনারই ডাক্তার বাবু। আপনাকে বলে গেলাম যে, বসুন আমি রমাকে খাবারটা দিয়ে আসছি। কিন্তু..."


গোপাল বাবুর কথাগুলি শুনে আমার সর্বাঙ্গ যেন জ্বলে উঠলো। আমি তাঁর কথা শেষ না হতেই ভৎসনার সুরে বললাম," খাবার! ওটা কোনো খাবার ছিলো না দারোগা বাবু। আপনি একটা বাচ্চা মেয়েকে এইভাবে হত্যা করতে পারলেন! এই জঘন্য কাজটি করবার আগে আপনার একবারের জন্যও বুক কাঁপলো না!" কথাটা শুনতেই গোপাল বাবু হো হো করে হেসে উঠলেন। তাঁর এই হাসি যেন আমার কান দুটিকে বিষিয়ে তুলছিলো। তিনি সেইভাবেই হাসতে হাসতে বলতে লাগলেন," কি করবো বলুন! আমার রমার যে ওটাই একমাত্র খাবার। আচ্ছা ডাক্তার বাবু বাঘ যখন কোনো মানুষের বাচ্চাকে টেনে নিয়ে গিয়ে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়, তখন কি আপনি সেই কাজকে জঘন্য বলে মনে করেন! হুম! বলুন! হা হা হা হা... কি বলুন! চুপ করে কেন? জানি বলতে পারবেন না! কারণ আপনিও জানেন এটাই প্রকৃতির নিয়ম। একজন খাদক তো আরেকজন খাদ্য। হা হা হা হা..."


গোপাল বাবুর হাসি যেন আর থামছে না। দেখে মনে হচ্ছে স্বয়ং মৃত্যুর দূত আমার সামনে উপনীত হয়েছে এবং কাউর প্রান হরণের পূর্বে চরম উল্লাসে মেতে উঠেছে। আমি দাঁতে দাঁত চেপে বললাম," আপনি... আপনি পাগল হয়ে গেছেন! আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে দারোগা বাবু! এইসব অযৌক্তিক কথা বলে আপনি নিজের অপরাধকে ঢাকবার চেষ্টা করছেন।"


এবার তিনি হাসি থামিয়ে বললেন," অযৌক্তিক! আমার স্ত্রীর মানসিক ব্যাধি আপনার অযৌক্তিক বলে মনে হচ্ছে!"

" মানসিক ব্যাধি নয় দারোগা বাবু!" আমি রিরি করে উঠলাম। " আপনার স্ত্রী একটি নরখাদক। A bloody... man eater!"

" চুপ করুন!" গোপাল বাবু ধমক দিয়ে উঠলেন। " ওখানেই জিহ্বাকে লাগাম দিন ডাক্তার বাবু! আপনি ভুলে যাচ্ছেন রমা আমার স্ত্রী।"


গোপাল বাবুর এই আচম্বিত ধমকানিতে আমি একটু সংকুচিত হয়ে পড়েছিলাম ঠিকই, তবে নিজেকে সামলে নিতে বেশীক্ষন সময় লাগলো না। ততক্ষণে দেখলাম গোপাল বাবুর স্বর নরম হয়ে গিয়েছে। ধরা গলায় বলতে লাগলেন," মাফ করবেন ডাক্তার বাবু! আপনি আমার অতিথি জেনেও আপনার সাথে অনেক দুর্ব্যবহার করেছি। এর জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। আসলে আপনি ঠিকই বলেছেন যে, আমার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। আর কেন হবে নাইবা বলুন! দীর্ঘ দশ বছর ধরে রমার এই অসুস্থতা মহামারির মতন বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি। কাউকেই কিচ্ছু বলতে পারিনা। খুব ভয় হয় বুঝলেন। কেউ যদি রমার এই মনুষ্য মাংস পিপাসার কথা ঘুনাক্ষরেও টের পায় তাহলে আর ওকে বাঁচাতে পারবো না। সবাই মিলে হয়তো ডাইনি অপবাদে পিটিয়েই মেরে ফেলবে। সাথে আমাকেও। নিজের জীবন নিয়ে আমার বিশেষ পরোয়া নেই। সত্যি বলতে আর বেঁচে থাকতে ইচ্ছেও করে না। তবে যতদিন নিজে বেঁচে আছি ততদিন রমাকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই। আমি মরে গেলে পর কি হবে তা জানি না! হ্যাঁ এটা সত্যি যে, রমা একেবারেই প্রকৃতিস্থ নয়। ও ওর নিজের বোধ, বুদ্ধি, জ্ঞান, অনুভূতি, ভারসাম্য - সবই হারিয়ে ফেলেছে। তাই বলে কি ওকে মেরে ফেলবো! আপনিই বলুন।"


আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই তিনি বলতে থাকলেন। "আমি জানি আপনি কি বলবেন! অনেক যুক্তি উপস্থাপন করে আমার খারাপ দিকগুলিকে আপনি তুলে ধরবেন। তারপর সবশেষে আমাকে একজন হত্যাকারী হিসেবে চিহ্নিত করবেন। কি! কিছু ভুল বললাম!" বলে গোপাল বাবু একটু বিশ্রী ভাবে হাসলেন। আমি প্রত্যুত্তরে দাঁত কিড়মিড় করে বললাম," যথেষ্ট হয়েছে। আপনাকে আর এক মূহুর্তও আমি সহ্য করতে পারছি না। এতদিনের এই ভালো মানুষী চেহারাটার নেপথ্যে যে এরকম একটা কুৎসিত মুখ লুকিয়ে রয়েছে জানলে আমি কখনই আপনার সাথে..."


তাঁর বিশ্রী হাসিটা যেন আরও প্রকট হয়ে উঠলো। হাসির দমকে আমি আমার বাকি ক্ষোভগুলিকে প্রকাশ করতে পারলাম না। গোপাল বাবু বললেন," সেটাও আপনার অতিরিক্ত কৌতুহলের জন্যই হয়েছে ডাক্তার বাবু। আমি কখনই চাইনি যে, আপনি আমার বাড়িতে আসুন। সেদিন যখন আপনি রমাকে দেখতে আসার প্রস্তাব দেন তখন একটু মনে মনে অসন্তুষ্ট হয়েছিলাম ঠিকই। তারপর একটু ভাবনা চিন্তা করে আপনার প্রস্তাবে রাজি হয়ে যাই। বলতে পারেন একপ্রকার বাধ্য হয়েই আপনাকে বাড়িতে আসার সম্মতি দিতে হয়েছিলো। যাতে আপনার মনে কোনোরকম সন্দেহের উদ্রেক না হয়। ভেবেছিলাম আপনাকে এখানে এনে বার কয়েক চা আর সিগারেট খাইয়ে এবং এদিক সেদিককার গল্প করে আপনাকে আবার ফেরৎ পাঠিয়ে দেবো। সবকিছু আমার পরিকল্পনা মতোই চলছিলো এবং পুরোটাই চলতো যদি না ওই বাচ্চা মেয়েটির মুখ থেকে কাপড়টা সরে যেতো! যাইহোক যখন আপনি রহস্যের এতটাই জেনে ফেলেছেন তখন আর বাকিটা রহস্য রেখেই বা কি লাভ! আমার ছেলের কথা খেয়াল আছে তো! আর এটাও বলেছি যে, ছেলের যখন আট বছর বয়েস তখন রমার রোগটা ধরা পড়ে এবং তারপরেই ছেলেকে আমার মা বাবার কাছে রেখে আসি। তো এতগুলো বছর তো ছেলে ওখানেই ছিলো। একদিন হঠাৎ দেশের বাড়ি থেকে ফোন এলো যে, ছেলে নাকি আমাদের কাছে আসতে চাইছে। আমি রাজি হলাম না। কারণ ওকে ওর মায়ের এই অবস্থার কথা জানতে দিতে চাইছিলাম না। এর আগেও কখনোই তাকে জানানো হয়নি। তবে ব্যাপার হচ্ছে আমি নিজেও রমার এই নর মাংস ভক্ষণের প্রবৃত্তি সম্পর্কে অবগত ছিলাম না। দিব্যি নটা বছর আমি ওকে মুরগি ও খাসির কাঁচা মাংস খাইয়ে আগলে রেখেছিলাম। কিন্তু আমার ছেলের আগমনই আমাকে এক বিরাট উপলব্ধির মুখে পতিত করলো। সব... সব বদলে গেলো।" গোপাল বাবু একটু থামলেন। লক্ষ্য করলাম তাঁর দু'চোখ জল জমে ভারি হয়ে উঠেছে। তারপর তিনি চোখ মুছে নিজের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে আমাকে কোনরকম সাধা সাধির লৌকিকতা না দেখিয়ে নিজেই একটা সিগারেট জ্বালিয়ে অন্যমনস্ক ভাবে টানতে টানতে বললেন,"


এক বছর আগেরই ঘটনা। আমার ছেলের তখন ষোল কি সতেরো বছর বয়স। অনেকবার বারণ করেছিলাম আসতে কিন্তু ও শুনলো না। তাছাড়া ওকে দোষ দিই বা কি করে! ওর তো কিছুই জানা ছিলো না। তো ছেলে বাড়ি আসবার পর থেকেই আমি ওকে চোখে চোখে রাখতে লাগলাম। তার মা ভীষণ অসুস্থ, আর রোগটা ছোঁয়াচে - এই বলে কোনো রকমে ছেলেকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে রমার ঘরের আশে পাশে ঘেঁষতেও বারণ করে দিলাম। দুটো দিন ঠিকঠাকই কাটলো। তিনদিনের দিন দুপুর বেলা ছেলে ঘরে বসে টিভি দেখছিলো আর আমি ওর ব্যাগ গুছিয়ে রাখছিলাম। কারণ ঠিক করেছিলাম সেদিনই ওকে আবার দেশের বাড়ি পাঠিয়ে দেবো। সত্যি বলতে ও থাকাকালীন আমার মনের মধ্যে সব সময় একটা ভয় কাজ করতো। যদি ও ওর মায়ের ব্যাপারটা জেনে যায় তাহলে কি জবাব দেবো! কি করে বোঝাবো ওকে! সে সামর্থ্য আমার ছিলো না। তাই মানে মানে ওকে ফেরৎ পাঠাতে পারলেই বাঁচোয়া। বিকেলের দিকে বাবা ওকে নিতে এলো। সবকিছু তৈরী করেই রেখেছিলাম। বাবার সঙ্গে দু একটা কথা বলতে বলতে ছেলের জন্য রান্না করা খাবারগুলিকে ব্যাগে ঢুকিয়ে যেই তাকে ডাকতে গেলাম দেখি ছেলে ঘরে নেই। কেন জানিনা বুকের ভেতরটা আচমকাই একটা মোচড় দিয়ে উঠলো। এমন সময় ছেলের হঠাৎ চিৎকার! আমি সঙ্গে সঙ্গে রমার ঘরের উদ্দেশ্যে ছুটলাম। পেছন পেছন বাবাও। প্যাসেজটাতে আসতেই দেখলাম রমার ঘরের দরজা হাট করে খোলা। ছেলের অদম্য আর্তনাদে যেন প্যাসেজের প্রতিটা আনাচ কানাচ ভরে উঠেছিলো। দম বন্ধ হয়ে আসছিলো আমার। তবুও কোনো রকমে নিজেকে সামলে নিয়ে রমার ঘরের সামনে আসতেই যা দেখলাম তা দেখার জন্য হয়তো জল্লাদদের মতন পাষাণ মনের প্রয়োজন হয় মানুষের। দেখলাম ছেলে তার মায়ের কোলে শুয়ে অসহায়ের মতো ছটফট করছে আর ওর মা ওকে দু'হাত দিয়ে চেপে ধরে হাজার বছরের বুভুক্ষের মতন তার নিজের ছেলের শরীর থেকে মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে। ছেলের সারা শরীর তখন রক্ত বর্ণে অধ্যুষিত। হঠাৎ একটা ধুপ করে শব্দ হলো। পাশ ফিরে দেখলাম বাবা সেই নৃশংস দৃশ্য দেখে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছে। কিন্তু তখন তাকে সামলাবার মতো আমার মানসিক পরিস্থিতি ছিলো না। সেই মর্মান্তিক ঘটনাকে আমি দু'চোখ ভরে গিলছিলাম। সম্মোহিতের মতোই নির্বিকার ভাবে আমি আমার ছেলের করুণ পরিণতির জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। একটা সময়ের পর আমার এই অপেক্ষারও অবসান ঘটলো। আমার ছেলের সেই অ্যাসিডের মতো কান জ্বালিয়ে দেওয়া চিৎকার আস্তে আস্তে শিথিল হয়ে এলো। লোপ পেলো তার মায়ের কোলে এলিয়ে পড়া দেহটার ছটফটানি। এই দৃশ্যের চমকতায় আমি যেন পাথর হয়ে গিয়েছিলাম। পরে সম্বিত ফিরে পেতে মাথায় যেন দাবানল জ্বলে উঠলো। ইচ্ছে করছিলো ওই নরকের কীটটাকে এক্ষুনি গলা টিপে মেরে ফেলতে। কিন্তু পারিনি বুঝলেন। আমি কিচ্ছু করতে পারিনি। নিজের ছেলের মৃত্যুর প্রতিশোধের চেয়ে রমার প্রতি আমার ভালবাসা যেন আমার প্রতিহিংসার মাঝখানে এসে দাঁড়িয়ে ছিলো। আমি সেদিনকার মতো ধীরে ধীরে রমার ঘরের দরজা বন্ধ করে দিই। আর মনে মনে জেদ ধরে বসি, রমা আজ তার নিজের সন্তানের মাংস খেয়ে যে পৈশাচিকতার সূত্রপাত ঘটিয়েছে তা আমি থামতে দেবো না। কখনই না। হা হা হা হা... যত মানুষ লাগে লাগুক। আমি ওকে খাওয়াবো। প্রয়োজনে দিন রাত এক করে দেবো। কিন্তু নিজের স্ত্রীর ক্ষুধাকে অপূর্ণ রাখবো না। আর ঠিক তাই শুরু করলাম। কিন্তু ব্যাপার হচ্ছে বড় মানুষদের ধরে এনে রমার কাছে চালান করাটা ভীষণ বিপদজনক আর এতে ঝুঁকিও আছে। তাই ছোট ছোট বাচ্চাদেরকে চুরি করতে আরম্ভ করলাম। প্রত্যেকদিন একটা দুটো করে বাচ্চা ধরি আর রমার কাছে চালান করে দিই। সত্যি বলতে এই কাজটা আমি নিয়মিত ভাবেই করে আসছি। বড্ড ভালবাসি রমাকে!" একটা বিশ্রী হাসির সাথে গোপাল বাবু তাঁর কথা শেষ করলেন। চকিতে আমার মাথার মধ্যে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেলো। আমি উত্তেজিত হয়ে বললাম," তার মানে... এতদিন ধরে বারুইপুরে যে বাচ্চা চুরির ঘটনাটা ঘটছে..."

" তার একচ্ছত্র নায়ক হলাম আমি।" গোপাল বাবু খলখল করে হেসে উঠলেন। " আবার খলনায়কও বলতে পারেন। প্রশাসন ভাবছে এগুলি হয়তো কোনো বিরাট দলের চক্রান্ত! কিন্তু তারা তো জানে না যে, আমি একাই এই ঘটনাটিকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছি! হা হা হা হা... আর দেখুন অদ্ভুত ভাবে এই মামলার তদন্তের ভার পড়লো আমারই উপর। কি বোকা না আমাদের প্রশাসন! হা হা হা হা..." রাগে তখন আমার শরীর কাঁপছে। আমি চিৎকার করে বললাম," You bustered! আপনি আপনার স্ত্রীর থেকেও বেশি ভয়ঙ্কর!"

কথাটা শুনে তিনি যেন আরও জোড়ে হাসতে লাগলেন।

আমি বলতে লাগলাম," আপনি নিরীহ শিশুগুলিকে নৃশংস ভাবে হত্যা করেছেন। আপনি... আপনি একটা খুনী। আপনাকে আমি ছাড়বো না!" বলে আমি ক্ষীপ্র বেগে গোপাল বাবুর দিকে তেড়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু পর মূহুর্তেই তিনি তাঁর নাইট রোবের পকেট থেকে একটা রিভলবার বের করে আমার দিকে উঁচিয়ে আমার গতি রোধ করলেন। " খবরদার! এক পাও এগোবেন না। না হলে কিন্তু এক গুলিতে এক্ষুনি আপনার ভবলীলা সাঙ্গ করে দেবো। তারপর আপনার লাশটাকে রমার কাছে চালান করে দেবো।" বলে আবার বিশ্রী ভাবে হাসলেন। আমি নিথর ভাবে তাঁর রিভলবারের সোজাসুজি দাঁড়িয়ে তাঁর কথাগুলি শুনছিলাম। তিনি আবার বললেন," এমনিতেও আপনাকে আর ছাড়া যাবেনা ডাক্তার বাবু! কারণ আপনি প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশীই জেনে ফেলেছেন। কাজেই মরতে আপনাকে হবেই।"

গোপাল বাবুর এই হুমকিকে আমি আর হজম করতে পারছিলাম না। তাঁকে নিরস্ত করবার উপায় খুঁজতে লাগলাম। ঠিক তখনই আরেকটি আশ্চর্য ঘটনা ঘটে গেলো যা আমার কাছে এমনকি গোপাল বাবুর কাছেও একদম অপ্রত্যাশিত ছিলো। হঠাৎ সেই ভয়ানক গর্জনটা আবার শুনতে পেলাম। এবার যেন সেটা আমার পেছন দিক থেকে ভেসে আসছে। লক্ষ্য করলাম মূহুর্তের মধ্যে গোপাল বাবুর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। তাঁর বিস্ফারিত চোখ দুটি আমাকে ছাড়িয়ে আমারই পশ্চাতে কোনো কিছুর উপর আটকে গিয়েছে। আমি তাঁর দৃষ্টি অনুসরণ করে পেছন ফিরে চাইতেই দেখি সেই ভয়ানক মহিলা, যাকে আমি কিছুক্ষন আগেও ওই মৃদু লাল আলোয় রিক্ত ঘরটাতে এক নিরীহ বাচ্চা মেয়ের মাংস ভক্ষণ করতে দেখেছি, সে এখন কোনো উপায়ে মুক্ত হয়ে মন্থর গতিতে আমাদেরই দিকে এগিয়ে আসছে। আমারও বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠলো। আমি সঙ্গে সঙ্গে গোপাল বাবুর দিকে নজর ফেরাতে দেখলাম তিনি রিভলবারটাকে নামিয়ে ফেলেছেন। বুঝলাম এই সুযোগ। যা করার এক্ষুনি করতে হবে। আমি বিদুৎ বেগে গোপাল বাবুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। আমার এই আকস্মিক আক্রমণে তিনি প্রথমে একটু থতমত খেয়ে গেলেন। কিন্তু পরক্ষণে একটু ধাতস্থ হতেই তিনিও আমার উপর চড়াও হলেন। শুরু হলো আমাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি। গোপাল বাবু তাঁর সমগ্র শক্তি দিয়ে আমাকে নিরস্ত করবার চেষ্টা করতে লাগলেন। আমিও সহজে হার মানলাম না। যথাসম্ভব শারীরিক বল প্রয়োগ করে তাঁকে প্রতিহত করবার চেষ্টা করতে লাগলাম। ততক্ষণে মহিলাটি আরও কাছে চলে এসেছে। এইভাবে কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তি চলবার পর হঠাৎ একটা কান ফাটানো শব্দে দুজনেই থমকে গেলাম। নাকে বারুদের পোড়া গন্ধ ভেসে এলো। বুঝলাম রিভলবারটা থেকে গুলি চলেছে। তবে সেটা যে, আমার গায়ে লাগেনি সেই বিষয়ে আমি নিশ্চিত। কারণ তখনও আমি বেঁচে আছি। উল্টোদিকে গোপাল বাবুকে দেখলাম স্থির ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তবে কি গুলিটা... হঠাৎ পেছন দিক থেকে আসা গর্জনের শব্দটা থেমে গিয়ে মেঝের উপর ধপ করে ভারী কিছু পড়ে যাওয়ার একটা আওয়াজ পেলাম। গোপাল বাবুর হাতটা আলগা হয়ে গিয়ে রিভলবারটি মেঝেতে খসে পড়লো। গোপাল বাবু আচমকাই চিৎকার করে উঠলেন। " রমা!" তারপর আমাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে ব্যস্ত ভাবে ছুটলেন। আমি পেছন ফিরে দেখলাম মহিলাটির শরীরটা মেঝেতে পড়ে রয়েছে। সেই শরীরে কোনো স্পন্দন নেই। গোপাল বাবু ব্যস্ত ভাবে মহিলাটির গায়ে হাত দিয়ে ডাকতে লাগলেন। " রমা! এই রমা! রমা...!" কিন্তু কোনো সাড়া দিলোনা। তেমন ভাবেই পড়ে রইলো। বারকয়েক ডাকাডাকির পর গোপাল বাবু আর যেন নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। মহিলাটির শরীর আঁকড়ে ধরে হাউমাউ কাঁদতে আরম্ভ করলেন। " রমা! চোখ খোলো... ডাক্তার বাবু এ কি করে ফেললাম আমি!" গোপাল বাবুকে দেখে আমারও মনটা কেমন বিষন্ন হয়ে পড়লো। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন," এ সব আমার পাপের ফল ডাক্তার বাবু! যাকে বাঁচাবো বলে এতকিছু করলাম, নিজের বাড়ি ছেড়ে দিলাম , সবার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে দিলাম, এমনকি নিজের ছেলেকে পর্যন্ত... আজ সেই মানুষটাকেই নিজের হাতে মেরে ফেললাম।"

বড় মায়া হচ্ছিলো লোকটির উপর। ইচ্ছে করছিলো তাঁর কাঁধে হাত রেখে সমবেদনা জানাতে। কিন্তু না তিনি একজন অপরাধী। অসংখ্য নীরিহ শিশুকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছেন তিনি। কাজেই তাঁকে সমবেদনা জানালে একজন হত্যাকারীর অপরাধকে ক্ষমা করা হবে। তিনি ক্ষমার অযোগ্য। তাই মুখে একটা কঠিন ভাব এনে বললাম," সেদিন যদি আপনার ছেলের হত্যার প্রতিশোধটা নিয়ে নিতেন তাহলে এতগুলো শিশুর হত্যার দায় আর আপনার উপর এসে পড়তো না। শাস্তি তো আপনাকে..." আমার কথাগুলি শেষ করতে পারলাম না। তার আগেই একটা মৃদু গোঙানির শব্দে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। স্পষ্ট দেখলাম মহিলাটি পুনরায় নড়াচড়া করতে আরম্ভ করেছে। গোপাল বাবু কান্না থামিয়ে সবিস্ময়ে সেদিকে তাকালেন। বেশ কয়েকবার নড়াচড়া করবার পর হঠাৎ একটা তীব্র গর্জনে আমার কান বন্ধ হয়ে গেলো। দেখলাম মহিলাটি হিংস্র শাপদের মতন গোপাল বাবুকে জাপটে ধরে তাঁর ঘারের উপর কামড় বসিয়ে দিলো। গোপাল বাবু জোরে আর্তনাদ করে উঠলেন। তিনি ক্রমাগত হাত-পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে বললেন," আ... বাঁচান... বাঁচান আমাকে... আ আ আ... ডাক্তার বাবু... দয়া করুন...!" কিন্তু তাঁর কোনো কথাই আমার কান অবধি এসে পৌছালো না। নির্বোধ শিশুর মতোই পুরো দৃশ্যটিকে হা করে দেখতে লাগলাম। হঠাৎ আরেকটা গর্জনে আমার চেতনা ফিরলো। আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। সেই ভয়ঙ্কর পৈশাচিক হত্যালীলাকে সামনে রেখে এক পা দু পা করে পেছতে লাগলাম। আবার গোপাল বাবুর যন্ত্রনা বিদীর্ণ গলা শোনা গেলো। " আ... ডাক্তার বাবু... বাঁচান... বাঁ...চান... আমাকে... আ...!" কিন্তু ততক্ষণে অনেকটা পিছিয়ে গিয়েছি। হঠাৎ একটা সমতল স্থানে আমার পীঠ ঠেকে গেলো। পেছন ফিরতেই দেখলাম সদর দরজার কাছে পৌঁছে গিয়েছি। আর একটুও সময় অপচয় না করে কোনো রকমে দরজাটা খুলে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগলাম। চারিদিক তখন অন্ধকারে পরিপূর্ণ।

সেদিন রাতে কিভাবে বাড়ি ফিরেছিলাম সেই প্রসঙ্গে আর গেলাম না। তবে সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার রেশ কাটতে আমার অনেকটা সময় লেগে গিয়েছিলো। তার মাঝে একদিন একটা নিউজ চ্যানেলে শুনতে পেলাম বারুইপুর থানার দারোগা গোপাল চন্দ্র দাস নিখোঁজ হয়ে গিয়েছেন। পুলিশ সেই ব্যাপারে তদন্ত করতে গিয়ে তাঁর বাড়ি থেকে একটি নৃশংস ভাবে ঘুবলে খাওয়া মৃতদেহ উদ্ধার করেছে। পুলিশের ধারণা সেটা দারোগা মহাশয়েরই লাশ। মৃতদেহটিকে আপাতত ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে সঠিক ভাবে কোনো তথ্য না দিতে পারলেও পুলিশ অনুমান করছে কোনো বন্য প্রাণীর আক্রমণের কারণেই এমনটা ঘটেছে। তবে সেরকম কোনো প্রানীর হদিস পায়নি। এছাড়াও সেই বাড়ি থেকে পুলিশ অনেকগুলি হারের টুকরো ও বেশ কিছু শিশুর পচনগ্রস্ত খাওয়া দেহও উদ্ধার করেছে। পুলিশের মতে হারগুলি মানুষের। আরও বিস্তারিত তথ্যের জন্য সেগুলিকে পরীক্ষাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। তবে সেগুলি কোথা থেকে এলো এবং কেনই বা এলো সেই ব্যাপারে পুলিশ তদন্ত চালাচ্ছে। খবরটা শুনে আমি মনে মনে বেশ প্রসন্নই হলাম। ভাবলাম গোপাল বাবুর উপযুক্ত শান্তিই হয়েছে। নিজের স্ত্রীর কাছেই নিজেকে... হঠাৎ আমার গাটা শিউরে উঠলো। সংবাদ সূত্র অনুযায়ী গোপাল বাবুর বাড়ি থেকে কেবল মাত্র তাঁর মৃতদেহ, শিশুদের মৃতদেহ এবং হারের টুকরো ছাড়া আর কিছুই নাকি পাওয়া যায়নি। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে গোপাল বাবুর স্ত্রী গেলো কোথায়!



Rate this content
Log in

More bengali story from Ajobdeep Bromho

Similar bengali story from Horror