Hurry up! before its gone. Grab the BESTSELLERS now.
Hurry up! before its gone. Grab the BESTSELLERS now.

Ajobdeep Bromho

Horror Tragedy Classics


4  

Ajobdeep Bromho

Horror Tragedy Classics


গড়কড়িদের ইতিহাস

গড়কড়িদের ইতিহাস

35 mins 385 35 mins 385

" বাহ্! খুব সুন্দর হয়েছে। এক কথায় দারুন।"

" Fantastic! Mind blowing! কিচ্ছু বলার নেই। আমি জাস্ট আপনার ফ্যান হয়ে গেছি।"

" সত্যিই আপনি অনবদ্য। আপনার লেখার জবাব নেই।"

এইরকম ভাবেই সন্ধ্যের থেকে প্রশংসার ঝড় আছড়ে পড়ছে আমার উপর। সত্যি বলতে আমার বেশ ভালোই লাগছে। একজন শিল্পীর এর থেকে বেশী আর কি চাই! শিল্পী এইজন্যই বলছি কারন সম্প্রতি আমার একখানি বই বেড়িয়েছে, নাম : A Lady with A Dark Tell। তারই সাফল্যতায় আমার প্রকাশক পার্ক স্ট্রিটের এক খ্যাতনামা পাঁচ তারা হোটেলে আজকের এই পার্টির আয়োজন করেছে। চারিদিকের জাঁকজমক, আলোক সাজ সরঞ্জাম, মানুষের কোলাহল, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ - এই সবকিছু নিয়েই যেন এখানে ছোটখাটো একপ্রকার উৎসব বসে গেছে, আর আমি হলাম সেই উৎসবের একমাত্র মধ্যমনি। কিন্তু এতকিছু হওয়া সত্ত্বেও একটা অন্যমনস্কতা বারবার আষাঢ়ের মেঘের মতো জমা হচ্ছিলো আমার মনের মধ্যে। এই যে এতকিছু, এত জাঁকজমক, এত মানুষের প্রশংসা, চর্চার শিরোনামে থাকা - এই সবকিছু আমার একার নয়। জানি সে হয়তো কোনোদিনই এই কৃতিত্বের ভাগ চাইতে আসবে না। তবুও সে না থাকলে হয়তো আমার এই গল্পখানি লেখাই হতো না। এবার আপনারা ভাবতেই পারেন যে, এই গল্পটা কি আমার নয়! আমি বলবো, না। জানি আপনারা শুনে অবাক হচ্ছেন। আমিও হয়েছিলাম সেদিন। হয়তো আপনাদের থেকে আরও অনেক বেশি। যেদিন ঘটনাটা ঘটেছিল। আমি নিজেও জানিনা সেদিন আসলে কি হয়েছিলো! সেদিনকার ঘটনার কোনো ব্যাখ্যাই আমার কাছে নেই।


আমি দীপরাজ। কলকাতার একটা বেসরকারি ইন্জিনিয়ারিং সংস্থায় মোটামুটি বেতনের একটা চাকরি করি। বুঝতেই তো পারছেন, বেসরকারি সংস্থা মানেই অত্যাধিক কাজ আর অত্যাধিক কাজ মানেই অত্যাধিক চাপ। তো এই অত্যাধিক কাজের চাপের মধ্যেও আমার যে সত্ত্বাটাকে এখনও বাঁচিয়ে রেখেছি তা হলো আমার লেখন। যাইহোক এবার আসল কথায় আসি। কলকাতায় আমি কর্মসূত্রে থাকলেও আমার আসল বাড়ী হলো ফুলসূড়ীতে। ফুলসূড়ীর ভৌগোলিক অবস্থান এক্ষেত্রে নিষ্প্রয়োজন, তাই আর সেটা উল্লেখ করছিনা। তবে ফুলসূড়ীতে আমাদের যৌথ পরিবার। সবাই একসাথে, মিলেমিশে থাকি। কিন্তু বছর দশেক হলো আমাকে চাকরির জন্য কলকাতায় চলে আসতে হয়েছে। তবে এই কর্মব্যস্ত জীবনের মাঝে হারিয়ে গেলেও রোজ রাতে বাড়ি ফিরে বাড়ির লোকের সাথে ফোনে কথা বলতে কখনই ভুলিনা। এরকমই একদিন রাতে বাড়িতে ফোন করে কথা বলছি, মায়ের কাছ থেকে খবর পেলাম যে, ঠাকুমার নাকি ভীষন শরীর খারাপ। তাই আর থাকতে না পেরে পরেরদিনই অফিস থেকে সাতদিনের ছুটি নিয়ে তারপরের দিনই সকাল সকাল বেড়িয়ে পড়লাম ফুলসূড়ীর উদ্দেশ্যে।

হাওড়া থেকে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ট্রেনে সফর করে যখন প্ল্যাটফর্মে নামলাম দেখি পংকা নিতে এসেছে। পংকা আমার কাকার ছেলে অর্থাৎ খুড়তুতো ভাই। ওকে দেখে আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না। সটান ছুটে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরলাম, " কিরে ভাই, কেমন আছিস?" পংকাও হেসে বললো," হ্যাঁ দাদা ভীষণ ভালো আছি। তুই কেমন আছিস রে?" এরকম কিছু ক্ষুদ্র কথোপকথনের পর পংকা আমার ব্যাগটা নিয়ে " চল দাদা" বলে এগিয়ে যেতে লাগলো। আমিও ওর পিছু পিছু প্ল্যাটফর্মের বাইরে এসে একটা ভ্যানে গিয়ে চড়লাম। ভ্যানে চড়ে আসতে আসতে পংকার সাথে আরও অনেক কথা হলো। প্রায় পনেরো মিনিট ধরে ভ্যানের ঝাঁকুনি খাওয়ার পর আমরা অবশেষে পৌঁছালাম। ভ্যান থেকে নেমে যখন বাড়ির ভেতরে ঢুকলাম আমায় দেখে বাড়ির মধ্যে যেন একপ্রকার হুলস্থুল পড়ে গেলো। মা তো আমাকে জড়িয়ে ধরে প্রায় কেঁদেই ফেললো, " বাবা, কেমন আছিস তুই? কতদিন পর তোকে দেখলাম!" একে একে বাবা, কাকা, কাকি এমনকি যার জন্য এতদূর থেকে ছুটে আসা অর্থাৎ ঠাকুমা, সবার সাথেই দেখা হলো। কিছুক্ষণ ঠাকুমার পাশে বসে কথা বললাম। দেখলাম ঠাকুমা আগের তুলনায় একটু সুস্থ আছে।

রাতের বেলা আমরা সবাই মিলে খেতে বসেছি। আমাদের বাড়িতে ডাইনিং টেবিলে বসে খাওয়ার রেওয়াজ কোনোদিনই ছিল না। আমরা আগাগোড়াই নীচে আসন পেতে তার উপর বসেই খাই। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। মা আমার পাতে আরেকটা মাছের টুকরো দিয়ে বললো," তা বাবু বললিনা তো মাছের কালিয়াটা কেমন হলো!" আমি খেতে খেতে বললাম," উহু! তোমার কোনো জবাব নেই মা! সেই স্বাদ! এখনও একটুও পাল্টায়নি।" বাবা বললো," সে না হয় হলো। তা বল কলকাতায় কাজ কেমন চলছে?"

- সব ঠিকই আছে। তবে কি জানোতো কাজের প্রচন্ড চাপ। মাঝে মাঝেতো দম নেওয়ার ফুরসৎ-ই পাইনা।

- সেতো নিশ্চয়ই। মনে রাখবি সব সময় সৎ পথে পয়সা কামাতে গেলে কষ্ট করতেই হবে।


বাবার কথা শেষ হতেই কাকি বলে উঠলো," তা দীপু বাবা! অনেক দিনতো গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরলে। এবার বিয়েটা করে ফেলো দেখিনি। আমারও তো সখ হয় একটু কাকি শ্বাশুড়ি হওয়ার।" কথাটা শুনে সকলে হেসে উঠলো। মা বললো," হ্যাঁ রে বাবা! কাকিমা তো ঠিক কথাই বলেছে।" আমি লজ্জায় মাথা নিচু করে নিলাম। এর মাঝে আবার কাকাও ফোড়ন কেটে উঠলো। বাবার দিকে তাকিয়ে বললো," দেখো দাদা! দীপু আবার যেন শহরের প্যান্ট জামা পড়া কোনো মেয়েকে না বিয়ে করে নিয়ে আসে!" আবার সবার সমবেত হাসি। আমি চুপচাপ মাথা নিচু করেই খেতে লাগলাম। আঁর চোখে দেখলাম পংকা সবার কথা শুনে মিচকি মিচকি হাসছে। হঠাৎ বাইরে থেকে কিসের একটা হট্টগোল ভেসে এলো। মনে হলো যেন কিছু মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে চেঁচামেচি করছে। ঘরে উপস্থিত সকলেই তাদের হাসি থামিয়ে দিয়ে সরব হয়ে উঠলো। বাবা বললো," কি ব্যাপার! এত চিৎকার চেঁচামেচি কিসের!" বলেই উঠে পড়লো। আমিও বাবাকে দেখে আর চুপচাপ বসে থাকতে পারলাম না। বাবার পিছন পিছন আমিও উঠে পড়লাম। বাইরে এসে দেখলাম যে, আমাদের পাশের বাড়ি মানে বিশু কাকাদের বাড়িতে বেশ কিছু লোক দাঁড়িয়ে উঁকি ঝুঁকি মারছে এবং একে অপরের সাথে কথা বলছে। প্রত্যেকের মুখেই উত্তেজনার ছাপ। আমি আর বাবা এগিয়ে গেলাম কি হয়েছে ব্যাপারটা দেখতে। " দাঁড়া দাদা" বলে পংকাও আমাদের পিছন পিছন আসলো। বিশু কাকার বাড়ির সামনে যেতেই এক বিকট কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমরা তিনজনেই তাড়াতাড়ি করে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়লাম। ভেতরে ঢুকেই দেখলাম বিশু কাকা বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাঁপছে। চোখ দুটো বিস্ফারিত এবং স্হির। তাঁর পাশেই বিশু কাকার স্ত্রী মানে কাকিমা বিশু কাকার হাত ধরে হাউমাউ করে কেঁদে চলেছে," একি হলো গো তোমার!" একটু ঝাঁকুনি দিয়ে বললো," কি হলো গো! কথা বলছো না কেন! কি হয়েছে তোমার?" ব্যাপারটা যে কি তা কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। ঘরে উপস্থিত বাকি আর সবার দিকে তাকালাম। তাদের মুখেও উদ্বেগের চাহনী। বাবা পাশেই দাঁড়ানো একটা মাঝ বয়সী লোককে জিজ্ঞেস করলো," হারাণ, কি হয়েছে রে বিশুর? ওর বউ ওমন করে কাঁদছে কেন? শরীর টরীর খারাপ করলো নাকি?" লোকটি বেশ হতাশ হয়েই বললো," দাদা কি আর বলি! শরীর খারাপ করলেও না হয় হতো! কিন্তু সে সব তো কিছুই হয়নি। ওকে বোধহয়..." লোকটি তাঁর কথা শেষ করার পূর্বেই " দেখি দেখি সরুন। রাম গুনিন এসেছেন" বলে বিশু কাকার ছেলে আরেকটি লোককে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। লোকটিকে দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, তিনি একজন ভূত বিশেষজ্ঞ মানে ওঝা। গায়ে একটা কালো আলখাল্লা, কাঁধে একটা লাল রঙের পুঁটলি এবং গলায় অজস্র রং বেরঙের পুঁতির মালা। বিশু কাকার ছেলে লোকটিকে একটা টুল এগিয়ে দিলো। লোকটি টুলটি টেনে একদম বিশু কাকার মুখের সামনে গিয়ে বসলেন। ততক্ষণে বিশু কাকার বউও একটু শান্ত হয়েছে। লোকটি প্রথমে বিশু কাকার কপালে হাত রেখে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। দেখে মনে হলো তিনি বোধহয় বিশু কাকার চোখে কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করছেন। কিছুক্ষণ উঁকি ঝুঁকি করার পর কপাল থেকে হাত সরিয়ে বিশু কাকার বউকে বললেন," ভয় নেই মা। তোর স্বামীর তেমন কিছুই হয়নি। সামান্য দৃষ্টি লেগেছে মাত্র। তবে আজ কিন্তু ও বেশ বড়সড় বিপদে পড়তে যাচ্ছিলো। শুধু সঠিক সময়ে ওকে পাওয়া গেছে বলে ও এইবারের মতো রক্ষা পেলো।" কথাটা শোনার পর বিশু কাকার বউ চোখ বন্ধ করে কপালে হাত ঠুকে বেশ কয়েকবার প্রনাম করলো। লোকটি " দাঁড়া" বলে নিজের পুঁটলিটাতে হাতরে একটা মাদুলি গোছের কিছু একটা বার করলেন। তারপর সেটা মুখের সামনে ধরে বিড়বিড় করে বেশ কিছুক্ষন কি সব বলে সেটাতে পরপর তিনবার ফুঁ দিয়ে বললেন," এই নে মা! এই মাদুলিটা আজ মধ্যরাতে ওকে পড়িয়ে দিবি। তাহলেই ওর সব বিপদ কেটে যাবে।" এই বলে লোকটি আবার বিশু কাকার কপালে হাত রেখে আবার মুখ দিয়ে কি সব বিড়বিড় করে বিশু কাকার আপাদমস্তক লম্বা লম্বা তিনটে ফুঁ দিয়ে উঠে পড়লেন। বিশু কাকার ছেলে এগিয়ে এলো তাঁকে বাহির অবধি ছেড়ে দেবে বলে। ওরা বেড়িয়ে যাওয়ার পর লক্ষ্য করলাম বিশু কাকাকে আগের তুলনায় একটু স্বাভাবিক দেখাচ্ছে। চোখে মুখে সেই ভয় ভাবটা আর নেই। বাবা এবার টুলটা টেনে নিয়ে বিশু কাকার সামনে গিয়ে বসে বললো, " হ্যাঁ রে বিশু! কি হয়েছিল রে তোর?" বিশু কাকা একটু থেমে থেমে বললো," আর দাদা কি বলবো! আজকে আমাদের কারখানায় কাজের চাপটা একটু বেশি থাকায় আমাদের সকলকেই একটু বেশীক্ষন থাকতে হয়েছিল। রাত সাড়ে আটটার সময় কারখানা থেকে সাইকেল চালিয়ে ফিরছিলাম। গাঁয়ে ঢুকেই কি মনে হতে ভাবলাম একেই অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে ফিরতে, তাই আর ঘুরে যাবো না। এই ভেবে আমি গড়কড়িদের বাড়ির রাস্তাটা ধরলাম। দিব্যি গুনগুন করতে করতে সাইকেল চালিয়ে আসছিলাম। হঠাৎ গড়কড়িদের বাড়ির গেটের সামনে আসতেই স্পষ্ট দেখলাম কেউ একজন সাদা শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে। তা দেখেই আমি অজ্ঞান হয়ে সাইকেল থেকে মাটিতে পড়ে গেলাম। তারপর আমার আর কিছু মনে নেই।" পিছন থেকে হারাণ নামক লোকটি ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলো," হ্যাঁ দাদা! অনেক রাত হচ্ছে দেখে বিশুর বউ আমার বাড়িতে এসে কান্নাকাটি করতে থাকে। তখন আমি, বিশুর ছেলে এবং পাড়ার কয়েকজন মিলে বিশুকে খুঁজতে বের হই। সারা পাড়া জুরে খোঁজাখুঁজি করার পর শেষমেশ ওকে খুঁজে পাই ওই গড়কড়িদের বাড়ির গেটের সামনে। দেখি বিশু সেখানে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। পাশে ওর সাইকেলটাও পড়ে। তারপর তো আমরা সবাই মিলে ওকে ধরে ঠরে নিয়ে আসি।" বাবা সব শুনে বললো," হুম সত্যিই বিশু আজ তুই বড়ো বিপদ থেকে বেঁচে গেছিস। ওরা না খুঁজে পেলে যে কি হতো; সেটাই ভাবছি... আচ্ছা তুই শুয়ে থাক একটুক্ষণ। আমি এখন যাই বুঝলি।" তারপর বিশুর বউর দিকে তাকিয়ে বললো," আচ্ছা বৌমা যদি কিছু অসুবিধা হয় তাহলে আমাকে ডেকো কেমন!" বলে বাবা টুল ছেড়ে উঠে বেড়িয়ে পড়লো। পিছন পিছন আমি আর পংকাও বেড়িয়ে পড়লাম।

রাত্রিবেলা অনেকক্ষণ ধরেই এপাশ ওপাশ করে চলেছি। কিন্তু কিছুতেই ঘুম আর আসছে না। বারবার গড়কড়িদের বাড়িটার কথাই মনে পড়ে যাচ্ছে। গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার পর এই আদিম বাড়িটার কথা আমি একপ্রকার ভুলেই গিয়েছিলাম। কিন্তু বিশু কাকাদের বাড়িতে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনার পর থেকেই আবার সবকিছু মনে পড়ে যেতে লাগল। সত্যি বলতে ছোটবেলা থেকেই এই বাড়িটাকে ঘিরে অনেক গল্প আমি শুনেছি। রীতিমতো হানাবাড়ি বলেই এটি খ্যাত। শুনেছিলাম তাদের বাড়ির বড় বৌ নাকি ভীষন দুশ্চরিত্রা ছিলেন। নিজের দেওরের সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তারপর হঠাৎ একদিন নাকি তাঁর মৃতদেহ ঝুলন্ত অবস্থায় তাঁরই ঘর থেকে পাওয়া যায়। সবাই বলে সে আত্মহত্যা করেছিলেন। আর তারপর থেকেই তাঁর আত্মা নাকি সেই বাড়িতেই ঘোরাঘুরি করে। এই সবই আমার শোনা কথা মাত্র। এতবছরে আমি কোনদিনই চাক্ষুষ কোনো ভূতকে প্রত্যক্ষ করিনি সেখানে। যাইহোক কাল একবার ওই বাড়িটাতে যাবো ভাবছি। কারন মনের মধ্যে ভীষণ কৌতুহল হচ্ছে।

পরেরদিন সকালে আমি আর পংকা কি একটা কাজে স্টেশন গিয়েছিলাম। ফেরার পথে বললাম," চল ভিতরের রাস্তা দিয়ে যাই। তাড়াতাড়ি হবে।" পংকা একটু থেমে গিয়ে মুখ কাচুমাচু করে বললো," কিন্তু দাদা ভিতরের রাস্তাটাতো..."

- গড়কড়িদের বাড়ির সামনে দিয়ে যায় তো!

পংকা কিছু বললোনা। কেবল উপর নীচ মাথা নাড়লো। আমি একটু ধমকের সুরে বললাম," তাতে কি হয়েছে! এই সাত সকালে বুঝি তোর জন্য ওখানে ভূত অপেক্ষা করছে! ভীতু কোথাকার! নে চল এবার।" এই বলে আমি হাঁটতে শুরু করলাম। দেখলাম পংকা সেই একই রকম কাচুমাচু মুখ করে আমার পিছন পিছন হাঁটছে। মিনিট দশেক হাঁটার পর ভগ্নপ্রায় পাঁচিল দিয়ে ঘেরা একখানি বিরাট আকারের বাড়ি চোখে পড়লো। বলাই বাহুল্য, এইটিই হলো সেই গড়কড়িদের বাড়ি। শুনেছি একটা সময়ে তারা নাকি খুব বিত্তশালী ছিলেন। সেই ছাপটা আজও সেই আদিম দশাসই বাড়িটিতে স্পষ্ট। বাড়িটার মেইন গেটটার সামনে আসতেই আমার পা নিজের থেকেই থেমে গেলো। পংকা আমাকে দাঁড়িয়ে যেতে দেখে উদ্বিগ্ন ভাবে বললো," এই দাদা! তুই দাড়িয়ে গেলি কেন এখানে?" আমি পংকার সেই কথায় কোনোরকম কর্ণপাত না করে বাড়ির গেটটার দিকে একটুখানি এগিয়ে গেলাম। পংকা আরও বললো," এই দাদা! তুই কি করছিস? এবার ঢুকবি নাকি বাড়িটার ভেতরে!" আমি পংকার দিকে তাকিয়ে একটা শয়তানি হাসি দিয়ে ওর ভাবনাটাকে সম্মতি জানালাম। পংকা আবারও কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো কিন্তু ওকে থামিয়ে দিলাম। বাড়িটাকে বাইরে থেকে দেখলেই গাটা বেশ ছমছম করে ওঠে। পাঁচিল ঘেরা জমিটার মধ্যে ঝোঁপ ঝারের সমাবেশ। দেখলেই বোঝা যায় বহুদিন এখানে কোনো মানুষের পা পড়েনি। সেই অবিন্যস্ত ঝোঁপ ঝাড়গুলির মধ্যেই যেন ভগ্নদশা সম্পন্ন আদিম বাড়িখানি আপন মনে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্বকে জাহির করে যাচ্ছে। মনুষ্যহীন কঙ্কালসার বাড়িটিকে দেখলেই মনে হয় যে, কতো গল্প, কতো রহস্যই না লুকিয়ে রেখেছে সে তার নিজের অভ্যন্তরে। আমি যেন মনে মনে এক চরম কৌতুহল অনুভব করছিলাম বাড়িটার প্রতি। তাই আমি আর দেরি না করে বাড়ির মেইন গেটটা খুলতে গেলাম। দেখলাম সেটা ভীষণ শক্ত। দীর্ঘদিন ধরে অপব্যবহারের ফলে এবং বৃষ্টির জল লেগে সেটি শক্ত হয়ে গিয়েছে। বেশ কয়েকবার ঠেলাঠেলি করতেই সেটি একটা বিকট শব্দ করে খুলে গেলো। আমি মনে মনে একটু বিজয়ীর হাসি হাসলাম। আর সময় নষ্ট না করে ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকতে লাগলাম। পেছন থেকে বেশ কয়েকবার ফিসফিসিয়ে গলায় পংকা " দাদা! দাদা" করলো বটে কিন্তু সেই মুহূর্তে আমার ওই বাড়ির প্রতি অসীম কৌতুহলের কাছে পংকার সাবধান বানী অতি তুচ্ছ বলে মনে হচ্ছিলো। আগেই বলেছি বাড়িটা আকারে বিশাল। তেতলা বিশিষ্ট বিরাট বাড়িখানির সামনে একটা লম্বা টানা বারান্দা। তার ধারেই চারটে বিশাল উঁচু ও মোটা গোছের থাম। সেগুলি আবার লোহার তৈরি রেলিং দিয়ে একে অপরের সাথে যুক্ত। মাঝখান বরাবর একটি ছয় ধাপের সিঁড়ি উঠে গেছে বারান্দার দিকে। তারপরই এক বিরাট কাঠের তৈরি দরজা। যদিও সেখানে এখন লতা জাতীয় উদ্ভিদগুলি নিজেদের অধিকার জমিয়ে সেই জায়গাটাকে প্রায় ঢেকে ফেলেছে। আমি সেই দিকে ধীরে পায়ে এগোতে লাগলাম। অতি সাবধানে পা ফেলে এগোচ্ছি কারণ এই পোড়ো বাড়িটিতে ভূতের থেকেও যেটা বেশি বিপদজনক তা হলো সাপ। এখানে ভূত থাকুক ছাই না থাকুক তবে এই ঘন আগাছার জঙ্গলে সাপ থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। পিছন পিছন পংকাও আমার শার্টটাকে খামচে ধরে এগোতে লাগলো। বেশ কিছুটা এগোতেই হঠাৎ সামনের দিকে একটা ঝোঁপ একটু নড়ে উঠলো। পংকা কাঁদো কাঁদো গলায় বললো," দাদা চলনা। বাবা জানতে পারলে খুব রাগ করবে।" আমি আবার একটা চাপা ধমক দিয়ে বললাম," চুপ! আগে দেখতে দে।" বুঝতে পারলাম পংকা আমার শার্টটাকে আরও জোড়ে খামচে ধরেছে। আমরা আবার চলতে শুরু করলাম সেই একইরকম ধীরে ধীরে। আমার চোখ কিন্তু সেই দিকেই স্থির। আবারও ঝোপটা নড়ে উঠলো। এবার যেন মনে হলো ঝোঁপটা ওই জায়গায় নয় তার থেকে একটু সরে গিয়ে নড়ে উঠলো। বুক যে আমারও ঢিপঢিপ করছিলো না তা নয়। কিন্তু পংকার সামনে সেই ভাবটাকে মুখে আনা একদম চলবে না। চলতে চলতে যখন আমরা আরেকটু এগিয়েছি তখনই হঠাৎ ঝোঁপটা তীব্র বেগে নড়ে উঠতে শুরু করল। তবে সেটা এক জায়গায় স্থির নয়। সেটা বিদ্যুৎ-এর গতির মতোই এগিয়ে আসছে আমাদেরই পথের দিকে। বুঝলাম পংকা আমার বাঁ হাতের কনুইটাকে শক্ত করে চেপে ধরেছে। আমিও আমার হাতের মুঠি দুটোকে শক্ত করে নিলাম। একটা আশঙ্কা যেন মাথায় ভারী হয়ে উঠছে ক্রমাগত। স্থির দৃষ্টিতে অপেক্ষা করে আছি সেই অজানা বস্তুটির জন্য। ঝোঁপের একদম শেষ দিকটা নড়ে উঠতেই পংকা তারস্বরে চিৎকার করে উঠলো," ওরে বাবা রে!" আর ঠিক তখনই ঝোঁপ থেকে ক্ষীপ্র বেগে বেড়িয়ে এলো একটি বিড়াল। সাদা ধবধবে রং। তবে লেজের দিকটা লালচে। আমাদের দেখেই বিড়ালটি আবার তার গতি পরিবর্তন করে গড়কড়িদের বাড়ির বারান্দাটার দিকে দৌড়াতে শুরু করলো। দৌড়াতে দৌড়াতে বাড়ির পিছনের দিকটায় গিয়ে একটা ঝোপের আড়ালে মিলিয়ে গেলো। আমি একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। তারপর একটু থেমে থেমে হেসে বললাম," কিরে, তোর প্যান্ট ভেজেনিতো!" পংকা আমার কনুই থেকে হাতটা সরিয়ে বললো," দাদা! বাজে কথা বলিসনা তো।" এবার আমি আরেকটু জোরে হেসে উঠলাম," দেখলিতো তোর ভূত! বিড়াল হয়ে কেমন ঘুরে বেড়াচ্ছে! ভীতুর ডিম একটা! আমি যদি এখানে না থাকতাম তাহলে তো তোর..." বাড়িটার বারান্দার একদম ডানদিকে চোখ যেতেই আমার বুকটা ধক করে নড়ে উঠলো। মনে হলো কোনো মহিলা বোধহয় সেখানটাতে দাঁড়িয়ে ছিলো। আমি কথাগুলো শেষ না করেই দৌড়ে সেদিকে যেতে লাগলাম। পংকা উদ্বিগ্ন ভাবে বললো," আরে দাদা, কোথায় যাচ্ছিস? কি রে!" আমি পংকার প্রশ্নের কোনো জবাব না দিয়ে কয়েকটা ঝোঁপ টপকিয়ে যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছালাম দেখলাম কেউ নেই। বেশ অবাক হলাম। এইমাত্র তো কাউকে দেখলাম বলেই মনে হলো... তাহলে কি ভুল দেখলাম! পংকাও দেখলাম " এই দাদা" করতে করতে অতি সাবধানে ঝোঁপগুলো কে পেড়িয়ে আমার পাশে এসে দাঁড়ালো। চোখে মুখে কৌতুহল স্পষ্ট," দাদা কি হয়েছে? ওমন করে দৌড়ালি কেন?" আমি আবার এদিক ওদিক ভালো করে তাকিয়ে নিয়ে বললাম," নারে কিছু না, চল।"

- তাহলে ওমন করে দৌড়ালি যে!

এবারে পংকাকে মৃদু ধমক দিয়ে বললাম," বললাম না, কিছু না।" বলেই মেইন গেটটার দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। পংকাও আমার পিছু ধরলো। যখন মেইন গেটটা দিয়ে বেরোচ্ছি তখন আরেকবার পিছন ফিরে বাড়িটার দিকে চাইলাম। এরপর গেটটা বন্ধ করে পংকাকে নিয়ে সোজা বাড়ির অভিমূখে রওনা দিলাম।

সেদিন রাতেও আমার তেমন ভাবে ঘুম হলোনা। অনেক রাত অবধি জেগে জেগে সেই বাড়িটার কথাই ভাবতে লাগলাম। সকালের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর জন্যই বোধহয় বাড়িটার প্রতি একটা অমোঘ টান অনুভব করছিলাম মনে মনে। সকালবেলা যাকে আমি দেখলাম তা কি সত্যি নাকি শুধুই আমার মনের ভুল! হঠাৎ বিশু কাকার মুখ থেকে শোনা কথাগুলো মনে পড়ে গেলো। মনে মনে বেশ রোমাঞ্চ অনুভব করছিলাম। এইসবই ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। পরেরদিন সকালে স্থির করলাম যে, আবার যাবো সেখানে। তবে এবার একা যাবো। পংকা কে নেবো না। যদিও পংকা কে হাজারবার বললেও যে ও যাবে না তা আমি খুব ভালো করেই জানি। তাই দুপুরে তাড়াতাড়ি খাওয়া সেরে বেড়িয়ে পড়লাম। যদিও মা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলো যে, কোথায় যাচ্ছি! আমি স্টেশনের কথা বলে বেড়িয়ে পড়েছিলাম। আমাদের বাড়ি থেকে গড়কড়িদের বাড়ি যেতে মিনিট কুড়ির মতো সময় লাগে হেঁটে গেলে। কিন্তু রাস্তায় বেড়িয়ে যেটা নিয়ে সবথেকে বেশি চিন্তায় পড়লাম তা হলো বৃষ্টির আশঙ্কা। দেখলাম আকাশে ঘন কালো মেঘ জমেছে। সঙ্গে ছাতাও নেই। তাড়াহুড়োর মাথায় সেটা নিতেই ভুলে গেছি। তা হোক, সে না হয় একটু বৃষ্টিতে ভিজলাম। কিন্তু গড়কড়িদের বাড়িতে না গেলে চলবে না। তা বেশ দ্রুতপদেই সেইদিকে হাঁটতে লাগলাম। পনেরো মিনিটের মধ্যে আমি সেখানে পৌঁছে গেলাম। আমি বাইরে থেকে বাড়িটার দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম। ঠিক কালকেরই মতো এই বাড়িখানি নিজের অস্তিত্বকে একইরকম ভাবে জাহির করে যাচ্ছে। কোথাও এতটুকু পরিবর্তন নেই। এদিক ওদিক ভালো করে দেখে নিয়ে বাড়ির গেটটা খুলে ভিতরে ঢুকলাম। না! তবে কালকের মতো কিন্তু আজ কোনো ঝোঁপও নাড়লো না আর কোনো বিড়ালও ঝোঁপের ভিতর থেকে বেরিয়েও এলোনা। সবকিছু স্বাভাবিকই মনে হচ্ছিলো। কালকের মতো আজও অতি সাবধানে পা ফেলে এগোতে লাগলাম। প্রথমে বারান্দাটায় উঠলাম। এদিক ওদিক ভালো করে দেখে নিলাম। চারিদিক বেশ নিস্তব্ধ। পায়ের তলায় চাপা পড়া পাতার সুক্ষ্ম আওয়াজও ভীষণ ভাবে গমগমিয়ে উঠছিলো। আমি অতি সন্তর্পনে বারান্দা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে বাড়িটার ডানদিক বরাবর চলতে শুরু করলাম। বাড়িটার ডানদিকের দেওয়াল বরাবর হাঁটার সময় পায়রার ঘুটুর ঘুট শব্দ শুনতে পেলাম। দেখলাম ডানদিকের দেওয়ালে বেশ অনেকগুলি পুরনো আমলের বিরাট বিরাট জানলা। তাদের মধ্যে মাঝের একটা জানলা কোনো কারণে ভেঙ্গে গিয়ে তার একটা পাল্লা বাইরের দিকে খুলে সামান্য হেলে রয়েছে। ধীরে ধীরে সেই জানলাটির দিকে এগোতে লাগলাম। জানলাটির খুব কাছে আসতেই হঠাৎ জানলাটিকে সামান্য নাড়িয়ে দিয়ে একটা পায়রা আচমকাই ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে গেলো। এই ব্যাপারটা এতটাই আকস্মিক ছিলো যে, একটু হলেই আমার হৃদস্পন্দন প্রায় বন্ধ হওয়ার জোগাড় হচ্ছিলো। আমি একটা হাফ ছাড়ার মতো নিঃশ্বাস ফেলে কিছুক্ষণ বুকে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। এরপর হৃদস্পন্দনটা কিছুটা স্বাভাবিক হতেই আমি আবার চলতে আরম্ভ করলাম। আরও কিছুটা এগোতেই ঝোঁপ ঝাড় ও গাছপালার ফাঁক দিয়ে একটা জলাশয় নজরে পড়ল। জলাশয়টি বাড়িটার একদম শেষ সীমানায়। জলাশয়টির কাছে যেতেই বুঝতে পারলাম সেটি সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো একটি মস্ত বড় পুকুর। যদিও পুকুরের জল প্রায়ই দেখাই যাচ্ছে না কচুরিপানার জন্য। তবুও পুকুরটির আয়তন দেখে সহজেই তার গভীরতা আন্দাজ করা যায়। আমি বেশ মন দিয়েই পুকুরটিকে দেখছি এমন সময় হঠাৎ ঝপ করে একটা শব্দ হলো। জলের মধ্যে ভারি কিছু ফেললে যেমন শব্দ হয় কতকটা সেইরকম। আমি সচকিত ভাবে এদিক ওদিক ভালো করে তাকালাম। বুঝলাম শব্দটি এসেছে আমারই অদূরে থাকা একটি শান বাঁধানো চাতালের সামনে থেকে। সেটা হয়তো কোনো এক কালে গড়কড়িদের বাড়ির পুকুরের ঘাট ছিলো। কিন্তু এখন সেটা লোপ পেয়ে চাতালটুকুই যা পড়ে আছে। তাও তার মাঝ বরাবর বিরাট ফাটল। আমি সেইদিকে একটু একটু করে এগিয়ে যেতেই দেখলাম চাতালটির গা বেয়ে কয়েক ধাপ সিঁড়ি পুকুরের দিকে নেমে গেছে। সিঁড়িগুলির অবস্থাও জীর্ণ। ঘাটটির খুব কাছেই একটি মাছ ঝপ করে লাফ দিয়ে উঠলো। বুঝতে পারলাম যে, আগের শব্দটাও এরকমই কোনো এক মাছের লাফানোর ফলেই হয়েছিল। আমি আপন মনেই একটু হেসে উঠলাম। হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন বলে উঠলো," আপনি কি কাউকে খুঁজছেন?" আচমকাই বুকটা কেঁপে উঠলো আমার। নিমেষে মুখের হাসিখানি ম্লান হয়ে গেল। নিজের অজান্তেই যেন একটা চাপা আর্তনাদ গলা চিরে বেড়িয়ে এলো। চকিতে পিছন ফিরে চাইতেই দেখি আমার থেকে মাত্র কয়েক হাত দূরে একজন মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন। মহিলাটির পরণে একটি সাদা শাড়ী, যার আঁচল মাটি অবধি লুটাচ্ছে। মাথার চুলগুলি উস্কো খুস্কো এবং খোলা। মুখখানি অদ্ভুত ভাবে ভাবলেশহীন। চোখের চাহনি স্থির। এরকম একটা সুনসান ফাঁকা জায়গায় ভূতের ভয়ের থেকেও অন্য আরেক দ্বিতীয় ব্যক্তির উপস্থিতি যেন আমাকে ভীষণ অস্থিরতার মুখে ফেলে দিয়েছিলো। তার উপর তার সেই প্রশ্ন এবং তার ভাবলেশহীন চেহারা যেন আমাকে ক্রমশ অপ্রস্তুত করে তুলছিলো। বুঝে উঠতে পারছিলাম না যে, কি জবাব দেবো! কোনোরকমে একটা ঢোক গিলে আমি আমতা আমতা করে বললাম," না... মানে..." আমার কথা শেষ করার পূর্বেই মহিলাটি বললেন," আপনার সাহস দেখে আমি সত্যিই অবাক হচ্ছি! গ্রামের কেউ দিনের বেলাতেই এই বাড়ির ধার দিয়েও ঘেঁসে না, আর আপনি কিনা ভিতরে ঢুকে রীতিমতো ঘুরে বেড়াচ্ছেন!" আমি চুপ করে রইলাম। আমার এখানে আসার স্বপক্ষে যুক্তি দেখানোর মতো যথেষ্ট শব্দ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। মনের মধ্যে কেমন একটা অপরাধ বোধ জাগছিলো। চোর চুরি করতে ঢুকে কোনো কারণে হঠাৎ ধরা পড়ে গেলে যেমন তার মনের অবস্থা হয় ঠিক সেইরকম অবস্থা আমারও হচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো যেন আমি এই বাড়ির সীমানায় অনধিকার প্রবেশ করতে গিয়ে ধরা পড়ে গিয়েছি। আর রেহাই নেই আমার। হয়তো এবার কেউ বা কারা এসে এই অপরাধের জন্য আমাকে শাস্তি দেবে। কিন্তু সেইসব কিছুই হলো না। বরং তার জায়গায় সেই মহিলাটির ভাবলেশহীন মুখে একটা স্মিত হাসি প্রকাশ পেলো। আমাকে একপ্রকার অবাক করে দিয়ে তিনি বললেন," ভালোই হলো। কতদিন পর কোনো মানুষকে এখানে দেখলাম। তা আপনার উদ্দেশ্য যাইহোক না কেন, আপনাকে দেখে কিন্তু আমি সত্যিই খুব খুশী হয়েছি।" আমি তেমন অবাক হয়েই তার কথাগুলো শুনছিলাম। " আসুন না, দাঁড়িয়ে কেনো! এই এখানটা বসে কথা বলি!", এই বলে মহিলাটি আমার দিকে এগিয়ে এসে সেই ভাঙ্গা চাতালটার উপর গিয়ে বসলেন। ততক্ষণে আমার অবাক ও অস্বস্তি - দুই-ই কাটতে শুরু করেছে। আমিও তার দেখাদেখি চাতালটির আরেক পাশে গিয়ে বসলাম। আমাদের দুজনেরই দৃষ্টি এখন কচুরিপানায় মোড়া পুকুরটির দিকে। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে মহিলাটি বললেন," তা এখানে কি মনে করে? কোনো চুরি টুরির মতলবে বুঝি! তা এসে মন্দ করেননি। শুনেছি এই বাড়ির ভেতরে নাকি এখনও বিস্তর সোনা দানা আছে।" আমি একটু সলজ্জ ভাবে হেসে বললাম," না না... তা একদমই নয়। আপনি আমাকে ভুল ভাবছেন।"

- তাহলে আপনি এই পোড়ো ভূতের বাড়িটাতে কি করছেন শুনি!"

আমি তার দিকে ফিরে বললাম," তাহলে আপনিও মানেন যে, এটি ভূতের বাড়ি!" আমার কথা শুনে তিনি বেশ জোরেই হেসে উঠলেন। বললেন," অন্তত গোটা গ্রামের মানুষ তো তাই মনে করে।"

- আর আপনি?

এবার মহিলাটি হাসি থামিয়ে বললেন," আমি! সত্যি বলতে এতদিন ধরে তো এখানে আসছি, তবে আজ পর্যন্ততো তো কিছুই দেখতে পেলাম না।" আমি অবাক হয়ে বললাম," আপনি এখানে রোজ আসেন?"

- হুম।

- আপনার ভয় করে না?

- ওমা! ভয় আবার কিসের! ভূত কোনোদিনও দেখিনি সেতো আপনাকে আগেই বললাম। যদি বাঘ ভাল্লুক থাকতো তাহলেও না হয় একটা কথা ছিলো। কিন্তু সেটাও তো নেই, তাই না!" ভদ্রমহিলার এই রসিকতা যেন কিছুক্ষণ আগেও দেখা তার সেই ভাবলেশহীন চেহারার সাথে একেবারেই বেমানান। " তবে কি জানেন!", মহিলাটি আবার বলতে শুরু করলেন," এই বাড়িতে আসা, এই বাড়ির চারপাশে ঘোরা, তারপর এই পুকুরপাড়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকার পিছনে একটি বিশেষ কারণ আছে।" আমি বললাম," কি কারণ? জানতে কি পারি?"

- আসলে এই বাড়িটা আমাকে ভীষণ ভাবে টানে। কেনো জানিনা এই বাড়িটাকে দেখলে আমার খুব আপন বলে মনে হয়। এর প্রতিটা আনাচ কানাচ যেন আমার কাছে খুব চেনা ঠেকে।"

এবার আমি একটু ভ্রু কুঁচকে বললাম," পুনর্জন্ম ঘটিত ব্যাপারও হতে পারে। হয়তো আপনি আগের কোনো এক জন্মে এই বাড়িরই সদস্যা ছিলেন।"

আমার কথা শুনে তিনি আবার একটু স্মিত হাসলেন। " জানেন এই বাড়ির কিন্তু একটা ভয়ংকর ইতিহাস আছে", বললেন মহিলাটি। আমি বললাম," শুনেছি এই বাড়ির বড় বৌমা নাকি দুশ্চরিত্রা ছিলেন। তাঁর নিজের দেওরের সাথে অবৈধ সম্পর্ক রেখেছিলেন। পরে লজ্জায় নাকি তিনি নিজের ঘরেই গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন।" মহিলাটি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন," ঠিকই শুনেছেন। এই অজুহাতটুকু দেখিয়েই সেদিন শ্যামলাল বাবু তাঁর পরিবারের মান রক্ষা করেছিলেন সবার কাছে। তারপর প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই গল্পটাকেই সত্যি ভেবে নিয়ে বয়ে চলেছে। আপনি বিদেশি লোক। এই গ্রামের মানুষেরা আপনাকে যা বলেছে আপনি তাই শুনেছেন। এতে আপনার কোনো দোষ নেই।" লক্ষ্য করলাম মহিলাটির গলায় অভিমানের ছাপ ফুটে উঠেছে। আমি বললাম," মাপ করবেন, আমি কোনো বিদেশি লোক নই। আমার জন্ম এখানেই, এই গ্রামে। তবে এই কয়েক বছর হলো চাকরির জন্য আমাকে কলকাতায় থাকতে হয়..." আমি আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলাম কিন্তু মহিলাটি যেন ছোঁ মেরে আমার মুখ থেকে কথাটা কেড়ে নিয়ে বললেন," তাহলে তো বলতেই হয় আপনিও ওদেরই মতো একটা মিথ্যে ইতিহাসের বাহক।" এবার তাঁর গলায় রাগ স্পষ্ট। হঠাৎ তাঁর এমন করে রেগে যাওয়ার কারণ বুঝতে না পেরে বললাম," সেতো না হয় বুঝলাম। কিন্তু আপনি কেন এই ইতিহাসটাকে মিথ্যে বলছেন?"

- আমি কখনই বলছিনা যে, ইতিহাসটা সম্পূর্ণ মিথ্যে। আমি এটা বলছি যে, ইতিহাসের কিছু অংশকে ইচ্ছে করেই মিথ্যে সাজানো হয়েছে।"

মহিলাটির কথায় এতটা আত্মবিশ্বাস দেখে আমি বেশ বিস্মিত হলাম। বললাম," মানে?"

- মানে এই যে, সেদিন গড়কড়িদের বাড়িতে যাকিছু ঘটেছিলো এবং বাইরে সবার সামনে যা কিছু রটানো হয়েছিলো - এই দুটোর মধ্যে যথেষ্ট ফারাক আছে। শ্রেফ নিজেদের মান রক্ষার স্বার্থে শ্যামলাল বাবু একটা ভূয়া খবর রটিয়ে ছিলেন।"

কথাটা শোনার পর আমি একটু উত্তেজিত হয়ে বললাম," এই শ্যামলাল বাবুটি কে? তাঁর নাম আগেও একবার শুনলাম বলে মনে হলো! আর কিসেরই বা ভূয়া খবর?" মহিলাটি খানিকক্ষণ চুপ করে পুকুরটির দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন। তারপর জোড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শান্ত গলায় বলতে লাগলেন," শ্যামলাল বাবু মানে শ্যামলাল গড়কড়ি ছিলেন এই বাড়িই মালিক। প্রচুর বিত্তবান ছিলো এই গড়কড়ি পরিবার। যদিও এই অর্থ শ্যামলাল বাবুর নিজের সঞ্চয় ছিলো না। শুনেছি শ্যামলাল বাবুর প্রপিতামহ নাকি এককালে খুব বদ লোক ছিলেন। ইংরেজ আমলে তিনি নাকি সাহেবদেরকে মেয়ের জোগান দিতেন আর বিনিময়ে তিনি প্রচুর অর্থ পেতেন। দূর দূর থেকে অসহায় মেয়েদেরকে ধরে নিয়ে এসে জোর খাটিয়ে তিনি তাঁর এই অসৎ ব্যবসাটিকে দীর্ঘদিন বহাল তবিয়তে চালিয়ে যান। এইভাবে একটা সময় তিনি প্রচুর অর্থের মালিক হয়ে ওঠেন। তারপরই এই গ্রামে এই বিশালায়তন বাড়িখানি তৈরী করান। তারপর তাঁর মৃত্যুর এক প্রজন্ম পর শ্যামলাল বাবু বংশানুক্রমিক ভাবে এই বাড়ি এবং সকল সম্পত্তির অধিকারী হন। বলতে গেলে তিনি ছিলেন খুব দাম্ভিক। তাঁর দম্ভে তাঁর বাড়ি তথা পুরো গ্রাম কাঁপতো। আর যাই হয়ে যাক তিনি তাঁর দম্ভ, নিজের মান যশকে কখনই ফিকে হতে দিতেন না, তা সে যে কোনো মূল্যেই হোক না কেন! এটাতো গেলো শ্যামলাল গড়কড়ির কথা। এবার আসল কথাটা বলি যা নিয়ে এই বাড়ির ইতিহাস। শ্যামলাল বাবুর ছিলো দুই পুত্র, একজন রমাপতি আর আরেকজন উমাপতি। বড় ছেলে রমাপতি ছিলো অত্যন্ত বিলাসী এবং চারিত্রিক গুনমানে একদম নিম্ন প্রকৃতির। মদ, বাজারের মেয়ে ছেলে এই ছিল তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী। বাবার এদিকে বিরাট কাপড়ের ব্যবসা কলকাতায়। সেদিকে তার কিন্তু কোনো ধ্যান ছিলনা। সারাদিন বসে বন্ধুদের সাথে আড্ডা, মদ খাওয়া, বাঈজীদের নাচ দেখা এমনকি আপনাদের কলকাতায় কি একটা জায়গা আছে না! কি নাম যেন... আরে যেখানে খারাপ খারাপ মেয়েরা থাকে..."

আমি বললাম," সোনাগাছি?"

- হ্যাঁ হ্যাঁ। ওইখানেই অবাধ যাতায়াত ছিল এই বাড়ির বড় ছেলের। এদিকে ছোট ছেলে উমাপতি কিন্তু একেবারেই এর বিপরীত চরিত্রের মানুষ ছিল..."

লক্ষ্য করলাম মহিলাটির মুখে একফালি হাসির রেখা ফুটে উঠেছে। " ...যেমন কর্মঠ, তেমনই মেধাবী", মহিলাটি আবার বলতে শুরু করলেন," সেই সময় সে কলকাতায় থেকে পড়াশুনা করতো। বাড়িতে খুব একটা আসতনা। তবে রমাপতির আচরণ নিয়ে শ্যামলাল বাবু ভীষণই চিন্তিত ছিলেন। ছেলের মদের নেশার কথা তিনি আগে থেকেই জানতেন। কিন্তু তাঁর বড় ছেলের সোনাগাছিতে প্রায়শই যাতায়াত এবং খারাপ মেয়ে ছেলেদের সাথে ওঠা বসার কথা জানতে পেরে তাঁর মাথায় যেন বজ্রাঘাত হলো। তিনি স্থির করলেন যে, এবার রমাপতির বিবাহ দিতে হবে। কারন শ্যামলাল বাবুর দৃঢ় ধারণা ছিল যে, রমার বিয়ে হয়ে গেলে সে তার খারাপ অভ্যেসগুলোকে ছেড়ে দেবে। প্রথমদিকে রাজি না হলেও পরে বাবার ধমকানিতে রমাপতি বিবাহ করতে রাজি হয়ে যায়। দিনটা সঠিক মনে না থাকলেও সালটা আমার স্পষ্ট মনে আছে। ১৩৯৫ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মাসে তুমুল ঝড় বৃষ্টি মাথায় নিয়ে গড়কড়িদের বাড়ির বড় বউ হয়ে এলো পাশের গ্রামের মেয়ে পূরবী। পূরবীর বয়স তখন মোটে তেরো বছর। জানেন নিশ্চয়ই তখনকার দিনে খুব অল্প বয়সেই মেয়েদেরকে বিয়ে দেওয়া হতো!"

" হুম জানি", বলে আমি একটু নড়েচড়ে বসলাম।

- তো সেই বাচ্চা মেয়েটি প্রথমবার তার শ্বশুর বাড়িতে পা রেখে এই বিরাট বাড়ি, এত লোকের সমাগম, এত আয়োজন - এই সবকিছু দেখে ভীষণ ঘাবড়ে গিয়েছিল। লোকে বলতো পূরবী নাকি অপরূপা সুন্দরী ছিলো। শুধু তার রূপের জন্যই শ্যামলাল মশাই গরীবের মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও তাকে বাড়ির বড় বউ করে এনেছিলেন। রমাপতির মা তাকে বরণ ডালা দিয়ে বরণ করে ঘরে তুললেন। সারা গড়কড়ি বাড়ি জুড়ে তখন আনন্দের স্রোত বইছে। কালরাত্রি, নিয়ম, আচার অনুষ্ঠান, খাওয়া দাওয়া এই সমস্ত কিছু যখন পেড়িয়ে গেল, ঠিক তখনই ঘনিয়ে এলো সবচেয়ে ঘনিষ্ঠতম মূহুর্তটি - পূরবী ও রমাপতির বাসর রাত। রমাপতির ঘরকে গোলাপ ও রজনীগন্ধা ফুলে মুড়িয়ে ফেলা হলো। সারা ঘর ফুলের গন্ধে মম্ মম্ করছে। তারই মাঝখানে খাটের উপর লাল বেনারসি পড়ে একা বসে আছে পূরবী। তার মাথায় বিরাট ঘোমটা। ব্যাকুল হৃদয় ক্রমাগত প্রমাদ গুনে চলেছে তার স্বামীর গৃহ প্রবেশের। সেই প্রমাদ গোনারও একটা সময় অবসান হলো যখন দরজা খোলার আওয়াজ শুনতে পেল সে। বুঝলো রমাপতি ঘরে ঢুকে দরজার খিল তুলে দিয়েছে। পুরবীর মনে তখন যেন ঝড় বইছে। বুকের ভেতরটা জোড়ে জোড়ে বেজে উঠছে। রমাপতি গুনগুন করতে করতে পূরবীর সামনে এসে বসলো। রমাপতি সেদিনও কিন্তু আকন্ঠ মদ গিলে ঘরে ঢুকেছিল। তবে তেরো বছরের মেয়ে পূরবীর কাছে তা ছিল একেবারেই অজানা। রমাপতি মাদকতায় জড়িয়ে যাওয়া কন্ঠে " কি গো" বলে তার কাঁধে হাত রাখতেই পূরবী একটু সরে বসলো। পূরবীর এমন কান্ড দেখে রমাপতি খ্যাক খ্যাক করে হেসে উঠলো," কি গো বউ! কাছে এসো। তুমি কি ভয় পাচ্ছো আমাকে?" পূরবী উপর নীচ মাথা নাড়লো। রমাপতি আবারও হেসে উঠলো," ভয়ের কি আছে! আমি তো তোমার স্বামী। স্বামীকে কি কেউ ভয় পায় নাকি!" বলে আস্তে করে পূরবীর বিরাট ঘোমটাখানি তুলে দিলো।

ঘোমটার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসা পূরবীর চাঁদ পানা মুখখানি সূর্যোদয়ের মতো সারা ঘরকে আলোকিত করে তুললো। পূরবী মাথা নীচু করে বসে আছে। রমাপতি আস্তে করে তার মুখখানি সামান্য উপরের দিকে তুলে তারপর তার নিজের মুখখানি কিছুটা অগ্রসর করতেই পূরবী নিতান্ত অবুঝের মতোই বলে উঠলো," আপনার গা দিয়ে কি বিশ্রী গন্ধ বেরোচ্ছে! কি মেখেছেন আপনি?" কথাটা শুনেই রমাপতি হাসতে হাসতে বিছানায় ঢলে পড়লো‌। বেশ কিছুক্ষণ এইভাবে হাসার পর বললো," ও ঠিক তুমি পড়ে বুঝে যাবে।" এমন করেই তাদের বাসর রাতখানি অতিবাহিত হলো। এরপর আস্তে আস্তে পূরবীর উপর আদর যত্নের পাশাপাশি সংসারের দায় ভারও এসে পড়লো। তার কর্ম নৈপুণ্যতায় পূরবী হয়ে উঠলো বাড়ির সবার প্রিয়। সবার বলতে রমাপতিকে ছেড়ে আর বাকি সবার। এবার আপনি ভাবতেই পারেন যে, রমাপতি কেন নয়! তার কারণ শ্যামলাল বাবু যে উদ্দেশ্য নিয়ে রমাপতির বিবাহ দিয়ে ছিলেন তা তো সাধিত হয়নি বরং দিন দিন যেন তা ক্রমশ বাড়তে লাগলো। রমাপতি যেন উচ্ছন্নে যেতে লাগলো আরও। সোনাগাছিতে যাতায়াতটা মাঝে মধ্যে থেকে প্রায় নিয়মিত হতে শুরু করলো তার। ফলে সবকিছু পেয়েও পূরবী তার স্বামীর ভালবাসা থেকে বঞ্চিত রয়ে গেলো। বদ্ধ ঘরে একাকিত্বে অনেক চোখের জল ফেলেছিলো সে। যার খবর এই বাড়ির কেউই রাখেনি। এমনভাবেই ছয় বছর কেটে গেলো। একদিন পূরবী রান্নাঘরে বসে কাজ করছে হঠাৎ শরীরটা খারাপ করতে লাগলো তার। আচমকা গা পাকিয়ে ওঠে। দৌড়ে গিয়ে বাইরে রোয়াকে দাঁড়িয়ে বমি করতে থাকে সে। চাকর বাকরেরা তাকে ধরে ঘরে নিয়ে যায়। ডাক্তার ডাকা হয়। শ্যামলাল বাবু, তাঁর স্ত্রী, বাড়ির চাকর বাকরেরা সকলেই শুয়ে থাকা পূরবীর দিকে উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। ডাক্তার বাবু নারি টিপে, ভাল করে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বললেন," শ্যামলাল বাবু..." শ্যামলাল বাবু ব্যস্ত হয়ে বললেন," হ্যাঁ ডাক্তার বাবু বলুন! কি বুঝলেন?" ডাক্তার বাবু কিছুটা গম্ভীর থেকে একটা চওড়া হাসি দিয়ে বললেন," সুখবর শ্যামলাল বাবু! আপনার বৌমা তো সন্তান সম্ভবা।" কথাটা শোনার পর শ্যামলাল বাবুর যেন আনন্দ আর ধরেনা। ডাক্তার বাবু আরও বললেন," ওর এখন বিশ্রামের প্রয়োজন। খেয়াল রাখবেন যাতে কোনো ভারী কাজ না করে।" গড়কড়িদের বাড়িতে আবার খুশীর জোয়ার উঠলো। গ্রামে গ্রামে সেই খবরও রটে গেল। রমাপতির কাছেও সেই খবর গিয়ে পৌঁছালো। তৎক্ষণাৎ কলকাতা থেকে ফিরে এলো সে। পূরবী বিকেলবেলা নিজের ঘরে শুয়ে আছে এমন সময় ব্যস্ত ভাবে রমাপতি ঘরে ঢুকলো। পূরবী রমাপতিকে দেখেই উঠে বসতে যাচ্ছিলো কিন্তু রমাপতি ব্যস্ত ভাবে এগিয়ে এসে বললো," আরে কি করছো!" তারপর তাকে শুইয়ে দিয়ে বললো," শুয়ে থাকো।" পূরবী বললো," জল খাবারের ব্যবস্থা করি!"

- তুমি এতো ব্যস্ত হয়োনা। তুমি শুয়ে থাকো। বাড়িতে আরও লোক আছে।"

এই প্রথমবার পূরবী তার স্বামীর চোখে তার প্রতি ভালোবাসা লক্ষ্য করেছিল। সেটা তার পৃথিবীতে আগত সন্তানের জন্য হোক না কেন, তাতেই পূরবী খুব খুশি ছিল। যা পূরবী পারেনি তা তার গর্ভজাত সন্তানটি করে দেখিয়েছে। রমাপতির সমস্ত বদ অভ্যাসগুলি কমতে কমতে প্রায় বন্ধই হয়ে গেল। সে তার পৈত্রিক ব্যবসায় মন দিলো। এইভাবে বেশ ভালোই কাটছিল পূরবীর দিনগুলো। স্বামীর ভালবাসার যেটুকু অভাব ছিল সেটুকুও পূরণ হলো। তবে কথায় আছে না সবার কপালে সুখ সয়না। কারন পূরবী নিজেও জানতোনা যে, তার জীবনে নতুন মোর আসতে চলেছে। শুরু হতে চলেছে নতুন একটি অধ্যায়।

দশ মাসের মাথায় গিয়ে বাঁধল এক বিপত্তি। ছাদের থেকে নামতে গিয়ে আচমকাই সিঁড়ি থেকে পা হড়কে পড়ে যায় পূরবী। অসহ্য যন্ত্রণায় কোকিয়ে ওঠে সে। সারা বাড়িতে তখন হই হই রব। রমাপতি, শ্যামলাল বাবু, তাঁর পত্নী, বাড়ির চাকর বাকর সকলের মুখেই দুশ্চিন্তা। সকলেই পূরবীর ঘরের বাইরে অপেক্ষা করছে। ভেতর থেকে ভেসে আসা পূরবীর চিৎকারে সকলেরই মন ভারাক্রান্ত। কি হবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না রমাপতি। ক্রমাগত পায়চারি করে যাচ্ছে সে। মাঝে মাঝে সে তার বাবা আর মায়ের দিকে করুন দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে বটে কিন্তু তাদেরও তো সেই একই মানসিক অবস্থা। এদিকে দাইমা পূরবীকে বারবার শান্ত করবার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু প্রসব যন্ত্রনায় পূরবীর প্রান উষ্টাগত। কয়েক মুহূর্ত এরকম চলার পর হঠাৎ চিৎকার স্তব্ধ হয়ে যায়। বাইরে উপস্থিত সবাই দরজার দিকে তাকিয়ে। সবার চোখে কৌতুহল। কিছুক্ষণ বাদে দাইমা দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন। মুখ থমথমে। রমাপতি একপ্রকার ছুটে এসে প্রশ্ন করল," কি খবর? কি হয়েছে?" দাইমা মাথা নিচু করে নিলেন। শ্যামলাল বাবুও বললেন," আরে কি হয়েছে, বলবে তো!" শ্যামলাল বাবুর স্ত্রীও বললেন," কি হলো গো! তুমি চুপ করে কেন? কিছু বলছো না যে! পূরবী ঠিকাছে তো? আর ওর বাচ্চা!" কথাটা শেষ করতেই দাইমা ভারাক্রান্ত গলায় বললেন," মা ঠাকুরণ! বড় বৌদিমনি একটি মৃত পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছেন", বলেই কেঁদে ফেললেন। সংবাদটি শুনতেই শ্যামলাল বাবুর স্ত্রী ধপ করে পড়ে যাচ্ছিলেন তৎক্ষণাৎ শ্যামলাল বাবু তাঁকে ধরে ফেললেন," রমার মা! কি হলো তোমার?" শ্যামলাল বাবুর গলায়ও কান্নার বেগ। রমাপতি দাইমার দুকাধে হাত রেখে সজোরে ঝাঁকুনি দিয়ে বললো," এইসব তুমি কি বলছো! না এ হতে পারে না।" দাইমা মুখে সাদা শাড়ির আঁচল গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। রমাপতি দাইমাকে সড়িয়ে দৌড়ে ঘরে ঢুকে গেল। " পূরবী... দাইমা এসব কি..." কথাটা শেষ করার আগেই দেখতে পেলো পূরবীর পাশে ফর্সা, ফুলের মতো একটি নিষ্পাপ মুখ চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে যেন গভীর ঘুমে মগ্ন। রমাপতিকে দেখে পূরবীও হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলো। রমাপতি আস্তে আস্তে শিশুটির পাশে গিয়ে বসল। তার সদ্যজাত মৃত সন্তানের কপালে হাত বোলাতে বোলাতে রমাপতিও নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না। অঝোর কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। পূরবী মনে মনে তার নিজের ভাগ্যের প্রতি ধিক্কার জানাচ্ছিল। রমাপতি হঠাৎ কান্না থামিয়ে বললো," হারামজাদি! সন্তানটাকে এইভাবে খেয়ে ফেললি!" রমাপতির গলায় তীব্র আক্রোশের ছায়া," দূর হ মাগী চোখের সামনে থেকে। বজ্জাত মেয়ে ছেলে কোথাকার! আমি তোর মুখও দেখতে চাই না। আমার ছেলেটাকে না নিয়ে তোকে তো নিয়ে যেতে পারতো," বলে আবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো সে। পূরবীর এই ক্লেশ ভাগ্য, সদ্য সন্তান হারানোর কষ্ট এবং স্বামীর দেওয়া লাঞ্ছনা - এইসবই যেন লোহার কিলের মতো তার বুকে বিঁধতে লাগলো।

দেখতে দেখতে এই ঘটনার আরও পাঁচ মাস কেটে গেলো। রমাপতি আজকাল বাড়িতে আসা বলতে গেলে পুরোই বন্ধ করে দিয়েছে। পুরনো অভ্যেসগুলো আবার নতুন করে মাথা চাড়া দিয়ে উঠে আরও প্রখর রূপ ধারণ করেছে। শ্যামলাল বাবু আর তাঁর স্ত্রী প্রয়োজন ছাড়া পূরবীর সাথে তেমন কথাও বলেন না। বলতে গেলে এই বাড়ি তথা সারা বিশ্বে সে এখন একা। সারাটা দিন ঘরের মধ্যে মন মরা হয়ে বসে থাকে সে। এতগুলো মাস পরেও তার সন্তানের কোমল, শান্ত মুখখানি বারবার চোখের সামনে ফুটে ওঠে তার। আর তখনই দুচোখ বেয়ে অশ্রুধারা ক্ষীণ ভাবে বেয়ে পড়ে। এমনই একটা দুপুরে পূরবী তার নিজের ঘরে বসে কাঁদছিল এমন সময় যেন একপ্রকার ঝড়েরই মতো ঘরে ঢুকলো বছর কুড়ির এক যুবক। " বৌমনি" বলতেই পূরবী চোখ মুছে দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে কালো রঙের স্যুট ও প্যান্ট পড়া একটি সৌম্যকান্তি চেহারার যুবক তার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। মাথায় বাঁদিক থেকে সিঁথি কেটে আঁচড়ানো চুল, গালে হাল্কা দাঁড়ি। মুখ দেখে চিনতে না পারলেও" বৌমনি" ডাকটা শুনে পূরবীর বুঝতে অসুবিধা হলোনা যে, এই যুবকটিই হলো এই বাড়ির ছোট ছেলে এবং তার একমাত্র দেওর, উমাপতি। পূরবী পালঙ্ক থেকে নেমে বললো," কে? উমাপতি না!" উমাপতি সহাস্যে মাথা নাড়াল," বাবা! চিনতে পেরেছ তাহলে! আমি তো ভাবলাম চিনতে পারবে না আমায়।"

- ওমা কেন চিনব না! একটা মাত্র দেওর বলে কথা!

দুজনেই হেসে উঠলো। উমাপতি বললো," জানো বৌমনি তোমাদের বিয়েতে আমার আসার খুব ইচ্ছে ছিলো। কিন্তু হয়ে উঠলো না।

- কেন?

- আর বলো না। পড়ার এতই চাপ, তার উপর সামনে আবার পরীক্ষাও ছিল। যাও একটু ভেবেছিলাম আসবো, বাবা চিঠিতে এমন কড়া ভাবে নিষেধ করলেন যে, আসার আর সাহসই হলো না।

- হুম বুঝলাম। তা বসো না। দাড়িয়ে আছো কেন?

বলে উমাপতিকে টেনে পালঙ্কের উপর বসালো। উমাপতি বললো," বলো কেমন আছো?" পূরবীর মুখ থেকে এবার হাসিটা ম্লান হয়ে গেলো। বললো," ভালই আছি। খারাপ কি করে থাকি বলো!" উমাপতি একটু রসিকতা করে বললো," সেতো বুঝলাম তবে তোমার এই ভাল থাকার মধ্যে সেই ভালটা নেই কেন যেটা আমি শুনবো বলে আশা করেছিলাম?"

পূরবী এবার উমাপতির বিপরীত দিকে পালঙ্কের উপর বসে বললো," বৌমনিকে কথার প্যাঁচে ফেলা হচ্ছে বুঝি! খুব দুষ্টুমি শিখেছো দেখছি কলকাতায় থেকে!", বলে আবার হেসে উঠলো দুজনে। হঠাৎ করে হাসি থামিয়ে দিয়ে পূরবী বললো," এই দেখেছো কথায় কথায় জিঞ্জেস করতেই ভুলে গেছি।‌ খেয়েছো কিছু? অতদূর থেকে এলে। নিশ্চয়ই কিছু খেয়ে আসনি। হাত মুখ ধুয়ে নাও আমি কিছু নিয়ে আসছি। উমাপতি ব্যস্ত হয়ে বললো," তোমার কিচ্ছু আনতে হবে না বৌমনি। আমি পরে খাবো। সত্যি বলতে এখন একদম খিদে নেই।"

- যাহ্! ওমন বললে হয় নাকি!

- আরে সত্যি বলছি। তুমি বসো তো আগে!

- তা কতদিনের জন্য এলে বাড়িতে?

- বেশীদিনের জন্য না। এই মাসখানেক।

- তারপর আবার চলে যাবে?

- হুম যেতে তো হবেই।

এইভাবে দেখতে দেখতে পূরবী ও উমাপতির আলাপচারিতা ধীরে ধীরে বন্ধুত্বের শৃঙ্খলতায় আবদ্ধ হয়ে পড়লো। তাদের মধ্যেকার একে অপরের প্রতি টান যেন আরও দৃঢ় হলো। তখনও কিন্তু তাদের এই সম্পর্কটাকে ভালবাসা বলা চলে কিনা জানিনা! উমাপতি তখনও ছিল অবিবাহিত। কাজেই এই বাড়িতে উমাপতির নারীর সান্নিধ্য লাভের একমাত্র মাধ্যম ছিল তার আদরের বৌমনি। সপ্তাহ দুয়েক কাটার পর একদিন এক পূর্নিমার রাতে বাড়ির ছাদ বাগানটা তে মন মরা হয়ে বসেছিল পূরবী। জ্যোৎস্না স্নিগ্ধ চাঁদটাকে দেখতে দেখতে অজান্তেই তার নিঃশেষিত সন্তানটির অবয়ব ফুটে ওঠে চোখের সামনে। মনের অগোচরে জমে থাকা কষ্টগুলো প্রচন্ড মেঘ করে এসে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ছিল। এমন সময় পেছন থেকে তার কাঁধের উপরে একটি স্নেহে আসক্ত হাতের স্পর্শ অনুভব হলো। সঙ্গে সঙ্গে হাত দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বললো," ওমা... এখনও শোওনি তুমি!"

- কি করে বুঝলে যে, আমি!"

- আমি সব বুঝতে পারি... বসো না-

উমাপতি পূরবীর পাশে বসতে বসতে বললো," হায় রজনী! তাইতো ভাবি আজি আঁখি এতো বিনিদ্র কেন!

- কেন?

- বাহ্ রে! ছাদের উপর বৃষ্টি পড়ছে তার ছিটে তো আমার গায়েও লাগছে নাকি! এতে কি ঘুম আসে!

- কি বলছো এসব তুমি! কোথায় বৃষ্টি পড়ছে! আজতো আকাশ পরিষ্কার। দেখছো না চাঁদ কত যত্ন করে জ্যোৎস্নায় ভিজিয়ে তুলছে পৃথিবীটাকে।

- তাতেও তার ব্যর্থতা বৌমনি।

- কিসের ব্যর্থতা?

- চাঁদ যে তোমাকে ভেজাতে পারছে না। কেন দুহাতের তালুতে চোখের জলগুলোকে আস্কারা দাও!

পূরবী মাথা নিচু করলো। আবার তার চোখের কোনে একটি বিন্দু জল ক্ষনিকের জন্য চমকিয়ে উঠে গাল বেয়ে গড়িয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেল। উমাপতি পূরবীর কাঁধে একটা হাত রাখল। বললো," কেন বারবার সেই পুরনো স্মৃতিগুলো কে মনে করে কাঁদো!" এবার পূরবীর বিন্দু বিন্দু চোখের জলগুলি ঘন ধারায় পরিনত হলো। বললো," কি করবো উমা! তুমি বলো! তোমার দাদা, তোমার বাবা-মা এরা প্রত্যেকে আমাকে দোষী ভাবে। সবাই মনে করে আমার গর্ভের সন্তান নাকি আমার জন্য মারা গেছে। তারা কেউই আমার সাথে ঠিক করে কথা পর্যন্ত বলে না। সবাই আমাকে এক ঘরে করে দিয়েছে। কেন উমা! আমি তো মা। তাকেতো আমি পেটে ধরেছিলাম। মা কখনও চায় তার নিজের সন্তানকে মেরে ফেলতে!"

"বৌমনি দয়া করে চুপ করো", বলে উমাপতি পূরবীর দুই গালে হাত রাখতেই পূরবীর যেন মাথা খারাপ হয়ে গেল। সমস্ত হিতাহিত জ্ঞান ভুলে, স্থান-কাল-পাত্রের কোনো পরোয়া না করেই সে উমাপতিকে জড়িয়ে ধরলো। তার বুকে মুখ গুজে অকাতরে কাঁদতে লাগলো। উমাপতিও বোধহয় পূরবীর মতো সবকিছু ভুলে গিয়েছিল। তাই সেও তাকে আকড়ে ধরে বলেছিল," এরা বড়ই নিষ্ঠুর বৌমনি। বড়ই স্বার্থপর এরা।" উমাপতিকে আলিঙ্গন করে পূরবীর অন্তরে যে আগুনের সঞ্চার হয়েছিল সেই আগুনের আঁচ বোধহয় উমাপতিও অনুভব করতে পেরেছিল। হয়তো উমাপতিরও ইচ্ছে ছিল সেই আগুনে দগ্ধ হওয়ার। তাই আর সে পূরবীকে বাঁধা দেয়নি। আস্তে আস্তে তারা একে অপরের মধ্যে বিলীন হতে শুরু করলো। হারিয়ে গেল তাদের তীব্র অনুভূতিগুলোর মধ্যে। সেদিনের শান্ত চাঁদও পূরবীর চাপা শীৎকারে বিহ্বল হয়ে পড়েছিল। মিলন হয়েছিল তাদের, আর পূরবীর হয়েছিল পূর্ন মিলন। তাদের এই সম্পর্ক গভীর অতলে তলিয়ে গেলো, যার নাম ভালোবাসা।

এমন করতে করতে গোটা একটা মাস ফুরিয়ে আসলো। উমাপতিরও কলকাতায় ফেরার সময় এসে গেলো। পূরবীর মন ভার। কারন এই কদিনে সে উমাপতিকে এতটাই আপন করে নিয়েছিল যে, তার শূন্যতাকে সে কোনো কিছু দিয়ে পূরণ করতে পারছিলো না। তাদের ভালবাসা গভীর হলো বটে কিন্তু সমস্যা একটা রয়েই গেল। উমাপতির সাথে পূরবীর এই মেলামেশার ব্যাপারটা সারা গড়কড়ি বাড়িতে রাষ্ট্র হতে বেশি সময় লাগলো না। যথারীতি তা শ্যামলাল বাবুরও কান অবধি গিয়ে পৌঁছালো। সেদিন ছিল রবিবার, যেদিন উমাপতি কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। তবে যাওয়ার পূর্বে সে পূরবীর সাথে দেখাও করেছিল। এমনকি পত্র পাঠানোর কথাও দিয়েছিল। শেষবারের মতো অতি সন্তর্পনে জড়িয়ে ধরে উমাপতিকে বিদায় দিলো পূরবী। উমাপতি চলে যাওয়ার পর বাড়ি শূন্য। আগের মতো আবারও সব চুপচাপ। তবে পূরবী কিন্তু আর মন খারাপ করে কাঁদেনি। সেদিন রাত্তিরে সে আপন মনে নিজের ঘরে বসে গুনগুন করছিল এবং তার কোনো এক ছেঁড়া পোষাককে সেলাই করছিলো। এমন সময় হঠাৎ রমাপতি সজোরে ধাক্কা দিয়ে দরজাটা খুলে ঘরের ভেতরে ঢুকলো। ওরকম ভাবে দরজা খোলার আওয়াজ হওয়াতে সে চমকে উঠেছিল। দেখলো যে, রমাপতি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তারই দিকে স্থির ভাবে তাকিয়ে আছে।তার দু'চোখ লাল।তার গা থেকে বেরোনো মদের উগ্র গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছিল সারা ঘরময়। রমাপতি অবিন্যস্ত ভাবে পা ফেলে এগিয়ে এসে পূরবীর পাশে বসলো। পূরবীর মন কিন্তু আনচান করছিলো সেদিন। সে নিজেও জানে না কেন! সেদিন তার নিজের স্বামীকে বড্ড অচেনা বলেই বোধ হচ্ছিলো তার। কিছুক্ষণ স্থির ভাবে তাকিয়ে থেকে রমাপতি পূরবীর চুলে আঙ্গুলি সঞ্চালন করতে করতে আড়ষ্ট গলায় বললো," শুনলাম উমা নাকি চলে গেছে!" পূরবী একটু ইতস্তত করে বললো," হুম... আজ সকালেই।"

- তাহলে নিশ্চয়ই তোমার মন খারাপ, তাই না! আজতো আর আদর করবার কেউ নেই।

আস্তে আস্তে রমাপতি তার হাতটাকে গালের কাছে নামালো। পূরবী বললো," কি বলতে চাইছো তুমি?" এবার রমাপতি পূরবীর চোয়াল দুটোকে শক্ত করে চেপে ধরে ধমক দিয়ে বললো," চুপ কর হারামজাদি! কিছু জানিনা ভেবেছিস! বাবা আমাকে সব কথা বলেছেন। তুই এই কদিনে আমার ভাইয়ের সাথে কি কি করেছিস, সব খবর পেয়েছি আমি।" এবার আরেকটু জোরে চাপ দিয়ে বললো," ছি! ছি! লজ্জা করলো না এই বাড়ির বড় বউ হয়ে এই বাড়িরই ছোট ছেলের সাথে নোংরামী করতে! বাড়ির চাকর বাকরেরা পর্যন্ত জেনে গেছে। এরপর আস্তে আস্তে সারা গ্রামের লোক জানবে। তখন কোথায় থাকবে আমাদের মান সম্মান!" পূরবী তখন রমাপতির হাতটাকে নিজের চোয়াল থেকে ছাড়িয়ে তীব্র ভৎসনার সুরে বললো," মান সন্মান! হুঁ! এই বাড়ির বড় ছেলে যখন রাতের পর রাত সোনাগাছির ওই বেশ্যাগুলোর সঙ্গে কাটিয়ে আসে তখন তোমার পরিবারের খুব মান সম্মান থাকে, তাই না!" কথাটা শোনা মাত্রই রমাপতির দুচোখে আগুন জ্বলে উঠলো। উঠে দাঁড়িয়ে " খানকি মাগী! তোর এত বড় স্পর্ধা! তুই আমার দিকে আঙ্গুল তুলিস!" বলেই রমাপতি একটা চড় কষিয়ে দিলো পূরবীর গালে। পূরবী সেই চড়ের দাপট সহ্য করতে না পেরে পালঙ্কের একটা কোনায় গুতো খেয়ে আর্তনাদ করে উঠলো। কপাল ফেটে রক্ত ঝরছে ততক্ষণে। সেদিকে পরোয়া না করেই রমাপতি পূরবীর চুলের মুঠি ধরে তাকে টেনে তুললো। পূরবী ব্যাথায় গুঙিয়ে উঠলো। কিন্তু তার এই গোঙানির শব্দ রমাপতির কানকে ছুঁতেও পারলোনা। " মেরে আজ তোর চামড়া গুটিয়ে দেবো। বেহায়া মেয়ে ছেলে কোথাকার!" বলতে বলতে রমাপতি পূরবীর পরণের শাড়িখানি জোড় করে টেনে খুলে ফেললো। ব্লাউজ ও সায়া পরিহিত পূরবী দু'হাত দিয়ে নিজের বুকের উপর হাত রেখে নিজের লজ্জাকে নিবারণের চেষ্টা করছে। তার দু'চোখ দিয়ে টপটপ করে অনবরত জল গড়িয়ে যাচ্ছে। রমাপতি দেওয়ালে ঝোলানো চাবুকখানি হাতে নিয়ে হিংস্র শাপদের মতো এগিয়ে এসে সজোরে আঘাত করতে লাগলো তাকে। পূরবীর চিৎকার যেন সেই চাবুকের আঘাতকে হার মানিয়ে সারা ঘরকে দখল করে নিচ্ছিলো। শুধু ঘরময় নয়, সেই চিৎকারের উন্মাদনা শ্যামলাল বাবুর ঘর এমনকি নীচ অবধিও পৌঁছেছিল। কিন্তু শ্যামলাল বাবু এবং তাঁর স্ত্রী কেউই এগিয়ে আসেননি। হয়তো এটা তাদেরই উস্কানি। এরকম আরো কিছুক্ষন চলার পর আস্তে আস্তে পূরবীর গলার স্বর শান্ত হয়ে এলো। একটা সময়ের পর চাবুকের জয়ধ্বনি ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। রমাপতি দেখলো পূরবী আর কোনো সাড়া দিচ্ছে না। নিশ্চল ভাবে মাটিতে লুটিয়ে আছে। রমাপতি চাবুকটা ফেলে দিয়ে উদ্বিগ্ন ভাবে বেশ কয়েকবার পূরবীর নাম ধরে ডেকে উঠলো। তাতেও কোনো সাড়া না পাওয়াতে জোরে জোরে গায়ে হাত দিয়ে ঝাঁকুনি দিতে লাগল সে। কিন্তু তখনও পূরবী অসার। রমাপতি ভয় পেয়ে কয়েক পা পিছিয়ে গেল। তারপরেই চিৎকার করে উঠলো," বাবা! বাবা!" কিছুক্ষণের মধ্যেই শ্যামলাল বাবু ভিতরে ঢুকলেন। পিছন পিছন তাঁর স্ত্রীও। ভিতরে ঢুকতেই দেখলেন পূরবী মাটিতে অর্ধনগ্ন অবস্থায় উবু হয়ে পড়ে আছে, দেহ নিথর। আর রমাপতি পাথরের মতো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে। চোখগুলো ভয়ে যেন বেড়িয়ে আসবে এক্ষুনি। শ্যামলাল বাবুর পরিস্থিতি বুঝতে কোনো অসুবিধাই হল না। "

এইটুকু বলে মহিলাটি থামলেন। আকাশে মেঘ গুরগুর শব্দ করে বর্ষার আগমনী বার্তা জানিয়ে দিলো। আমি আকাশের দিকে একবার তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম," তারপর! তারপর কি হলো?" মহিলাটি একটু নড়ে চড়ে উঠলেন। তারপর একটা লম্বা শ্বাস টেনে বললেন," তারপরের ইতিহাসটা খুবই সংক্ষিপ্ত। পরেরদিন বাড়িতে পুলিশ এলো। শ্যামলাল বাবু ব্যক্তিগত ভাবে পুলিশের বড় সাহেবের সাথে সলা পরামর্শ করলেন। পুলিশ, উকিল, ডাক্তার - উপর মহল থেকে নীচ অবধি সকলকেই প্রচুর অর্থ খাওয়ানো হলো। ময়নাতদন্তের বিবরণীকেও বদলানো হলো। রটানো হলো যে, পূরবীর চরিত্র ঠিক ছিলো না। সে এই বাড়িরই ছোট ছেলে উমাপতির সাথে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেছিলো। কিন্তু উমাপতি তাতে রাজি না থাকায় সে শ্যামলাল বাবুকে ব্যাপারটা জানায় এবং শ্যামলাল বাবু সেইজন্য পূরবীকে চূড়ান্ত অপমান করেন। ফলে পূরবী সেই অপমানের লজ্জায় সেইদিন রাতেই নিজের ঘরে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে... এবার আপনিই বিচার করুন যে, পূরবী দুশ্চরিত্রা ছিলো কিনা!" আমি একটু ভেবে নিয়ে বললাম," দেখুন সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে গেলে পূরবী অবশ্যই দুশ্চরিত্রা। যেহেতু তিনি তার নিজের দেওরের সাথে অবৈধ সম্পর্ক রেখেছিলেন। তবে এতো গেল সমাজের কথা। কিন্তু মানবিকতার নজরে আমি আর যাই বলিনা কেন পূরবী দেবীকে কখনই দুশ্চরিত্রা বলতে পারিনা। কারন রমাপতি যতটা ক্ষত তার মধ্যে সৃষ্টি করেছিলেন, উমাপতি সেই সবটাই তার ভালবাসা দিয়ে পূরণ করে দিয়ে গেছেন। হোকনা তা অল্পদিনের জন্যই!

- তাহলে আপনি মানছেন পূরবী নির্দোষ?

- আলবাত মানছি।

আমার সম্মতি শুনে মহিলাটি হেসে উঠলেন। সেই হাসি একজন বিজয়ীর মতোই হাসি। আমি বললাম," তবে একটা বিষয় নিয়ে কিন্তু আমার এখনও খটকা গেলনা।" মহিলাটি বললেন," কি বিষয়?"

- আপনি যাকিছু বললেন তা সবই গড়কড়িদের অন্দরমহলে ঘটনা। আপনি এতকিছু জানলেন কি করে? এটা কি আদৌ...!"

কথাটা শেষ করার আগেই কতকগুলো পায়ের আওয়াজ শুনতে পেলাম। পায়ের আওয়াজগুলি সেইখান থেকেই আসছে যেখান থেকে আমি এই ঘাটের দিকটাতে এসেছি। তারপরেই দেখলাম দেওয়ালের আড়াল থেকে পংকা, বাবা, হারান কাকা এবং গ্রামের আরও অন্য দুজন বেড়িয়ে এলো। পংকা আমার দিকে আঙ্গুল তুলে বললো," ওইতো দাদা! বলেছিলাম না ও এইখানেই থাকবে!" আমাকে দেখে পংকা, বাবা আরও বাকি সবাই হনহনিয়ে এগিয়ে আসছে আমারই দিকে। বাবা বলে উঠলো," কি সর্বনাশ! তুই এখানে একা একা বসে কি করছিস?" আমি অবাক হয়ে বললাম," আমি একা কোথায়! আমার সাথেতো..." বলে মহিলাটির দিকে ইশারা করতে গিয়ে আমার হাত পা বরফ হয়ে গেল। কোথায় সেই সাদা শাড়ি পড়া মহিলা! দেখলাম সেই ফাটল ধরা চাতালটাতে আমি ব্যতিত আর কেউ নেই। এরই মধ্যে কোথায় উধাও হয়ে গেল সে! হঠাৎ বিশু কাকার কথাগুলো মনে পড়ে গেল। আমি তাড়াতাড়ি করে উঠে দাঁড়ালাম। ঠিক তখনই আরেকবার মেঘের গর্জনের সাথে সাথে এক ফোঁটা দু ফোঁটা করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো। ওরা আমার সামনে এসে দাঁড়াতেই বাবা বললো," কিরে! ওইদিকে ইশারা করে কি দেখাচ্ছিলি?" আমি একটু থেমে থেমে বললাম," না... কিছু না। তোমরা... কি করে জানলে... আমি... এখানে এসেছি!" বাবা বললো," কি করে আবার! অনেকক্ষণ হয়ে গেল ফিরছিসনা দেখে তোর মাকে জিজ্ঞাসা করছিলাম তোর কথা। এমন সময় পংকা এসে জানালো যে, তুই নাকি গতকাল ওকে নিয়ে এই বাড়িটাতে ঢুকেছিলি। তাই তুই হয়তো এই বাড়িতে আসতে পারিস... এই ভেবেই তো আমি পংকাকে নিয়ে রওনা দিই। পথে আবার হারানের সাথে দেখা। ওকে সব বলাতে ও আবার আমাদের দুজনকে একা যেতে বারণ করলো। গ্রামের আরও দুজনকে সঙ্গে নিয়ে তারপর সবাই মিলে তোকে এখানে খুঁজতে এলাম।" আমি মৃদু হেসে আকাশের কালো মেঘের দিকে চেয়ে বললাম," চলো। বৃষ্টির বেগ আরও বাড়বে মনে হচ্ছে!"

(সমাপ্ত)


Rate this content
Log in

More bengali story from Ajobdeep Bromho

Similar bengali story from Horror