ছাতার বাসায় ছাতারে
ছাতার বাসায় ছাতারে
আমাদের শৈশবে ছাতার এত দেখনদারি ছিলনা। স্টীলের হ্যান্ডেলের চল তখনো হয় নি। কাঠের হ্যান্ডেল দেওয়া কালো ছাতার চল ছিল তখন। আর ফোল্ডিং ছাতা তখনো বেরোয়নি বাজারে।
কাঠের হ্যান্ডেলের একটা একটা টুকটুকে লাল ছাতা উপহার দিয়েছিলেন ছোটমামা শিলং থেকে এনে।
শিলংএর বাচ্ছারা নাকি ওইরকম ছাতা নিয়ে স্কুলে যায়।
স্কুলে আমার প্রেস্টিজ বেশ বেড়ে গিয়েছিল, কারণ সবার কালো ছাতা, আর আমারটা লাল।
তখন ক্লাস ফোর।সেবার ক্লাস টেস্টে অংক খাতায় কবিতা লিখেছিলাম।
আসলে প্রশ্ন গুলো খুব শক্ত ছিলো।
মলিনা ম্যাম ইচ্ছা করে শক্ত প্রশ্ন দিতেন, যাতে সবাই ওনার কোচিং ক্লাসে ভরাতি হয়।
তাই দেখছি যে যারা ওনার কাছে পড়ে, তারা টকাটক করে অংক করছে, বাকিরা আঙুল চুষছে।
আমি সময়ের অপব্যবহার না করে একটা কবিতা লেখার চেষ্টা করলাম।
"ওরে আমার ছাতা,
কোথায় পাবি আমার মত
দিগ্গজের মাথা!
ছাতা মাথার শোভা?
নাকী
মাথা ছাতার শোভা!
ভেবে ভেবে দুকান
আমার করছে যে ভোঁভা।"
এই অবধি লিখেছি, অমনি দিদি খাতা টেনে নিলেন,মোছার সময়
দিলেন না।
ফলাফল : পঁচিশে গোল্লা।
মন্তব্যে : খুব খারাপ।
সঙ্গে গার্জেন কল।
বাড়ী ফিরে বাবা ওই ছাতার বাড়ী আমার পিঠে আচ্ছা করে দিলেন কয়েক ঘা। ফলে কাঠের হ্যান্ডেল
ফেটে গেলো।
আমার কবিতার প্রশংসা করেছিলেন একমাত্র ঠাকুমা।
ছাতাটা এককোণে পড়ে থাকলো।
আমার মনটা খুব খারাপ। ছোটমামা চিঠিতে লিখলেন," পরের বার আবার একটা সুন্দর ছাতা নিয়ে যাবো।"
মা ছাতা সারানোর মিস্ত্রী ডাকলেন।
কিন্তু ওই মাপের শৌখীন হ্যান্ডেল পাওয়া গেল না। তাই মন খারাপ করে ছাতাটা বারান্দার এক কোণে পরে রইলো।
আমাদের বাড়ীটা ছিল বেশ বড়ো।
মস্ত উঠোন। একধারে রান্না ঘর, আরেক ধারে বাসন ধোবার চাতাল।
কল থেকে মোটা হয়ে পড়ত গঙ্গার জল।
একধারে ছিল বেজায় বড় একটা বাথটব( কোন সাহেব নাকী জ্যাঠামশাইকে উপহার দিয়েছিলেন)।
টবের পাশে একটা ঝাঁকড়া পেয়ারা গাছ। আহা কী অপূর্ব তার স্বাদ!
রান্নাঘর থেকে বাসন নিয়ে চাতালে যেতে হলে বরষাকালে বেশ ভিজতে হতো। তাই গীতা মাসী একদিন বললে," ওই ভাঙা ছাতাখান দাও তো দিদি, মাথাটা একটু বাঁচুক।"
ক্লাস ফোরে পড়া মেয়েকে দিদি বলায় আমার মনটা দিলদরিয়া হয়ে উঠলো, আমি সেই ভীষণ প্রিয় লাল ছাতাখানা গীতা মাসীকে দিলাম।ওইটা একহাতে মাথার ওপর ধরে ও কাজ চালাত।
একদিন দুপুরে এলো কালবৈশাখী
ঝড়। পাকা পেয়ারা গুলো টুপটাপ ঝরে পড়তে লাগলো। তারপর এলো বৃষ্টি। গীতা মাসী ওই ছাতা নিয়ে পেয়ারা কুড়োতে লাগলো।
সেই সময় আবার ঝড় উঠলো। দমকা হাওয়ায় আমার ছাতা উড়ে পেয়ারা গাছের একটা শক্ত পোক্ত ডালে আটকে গেলো।
ছাতাটা ওইখানেই থাকলো। আমি চেষ্টা করেছিলাম পেড়ে আনতে। কিন্তু কাকেদের সঙ্গে আমার শত্রুতা ছিল। একবার পেয়ারা পাড়তে গিয়ে কাকে ডিম চুরি করেছিলাম, সেই থেকে আমাকে দেখলেই ওরা ঠুকরে দেয়।
ছাতা টা পাড়তে গিয়েও কাকের তাড়া খেয়ে নেমে এলাম।
ছাতারে আর শালিখ দুটো পাখিই খুব ঝগরুটে।সারাটা দুপুর জ্বালিয়ে মারে। আমার তো মর্ণিং স্কুল, তাই দুপুরটা কাটে প্রকৃতির সঙ্গে।
মা বাবা অফিসে। ঠাকুমা ঘুমোন।
আমার অবাধ স্বাধীনতা।
মা অংক কষতে দিয়ে যান, আমি ছবি আঁকি, কবিতা লিখি।
ওইদিন ছাতারে গুলো খুব ঝগড়া করছিল। উঠোনে গিয়ে দেখি গাছের তলায় একটা ছানা পড়ে আছে, তাকে ঘিরে সবাই চ্যাঁচাচ্ছে।
ঠাকুমাকে ডাকলাম। উনি এসে ছানাটাকে তুলে তুলোর ওপর রাখলেন। পাতার স্তূপের ওপর পরেছিল বলে বেঁচে গেছে। ঠাকুমা ফোঁটা ফোঁটা করে জল দিলেন।
একটু সুস্থ হলে ঠাকুমা বললেন, পড়লো কোথা থেকে?
বাহাদুর আঙুল তুলে গাছের দিকে দেখাতে আমরাও ওদিকে তাকালাম।
ওমা! আমার ছাতাটা কাত হয়ে আটকে আছে। তার মধ্যে কটা ছানা মুখ বার করে আছে।
তাহলে ছাতা হয়েছে ছাতারের বাসা! ওরা তো বাসা করতে জানে না। তাই ছাতার মধ্যে কটা খড়কুটো ফেলে বাসা বানিয়েছে।
"ওরে ছাতা, তোর কাজটি খাসা,
হয়ে গেলি ছাতারের বাসা।
আহারে আহা।"
এবার আর অংক খাতায় লিখিনি, রাফ খাতায় লিখেছি, যার নাগাল কেউ পাবেনা।
পুনশ্চ: ছোটমামা পরেরবার যে ছাতাটা আনলেন তার রং ছিল
লাল হলুদ। ইস্টবেঙ্গলের রং বলে আমি একদিনো ওটা ব্যবহার করিনি। ছোটমামাকে বলেছি পরেরবার যেন মেরুন সবুজ আনেন।
