রাত কী রাণী
রাত কী রাণী
শহরের একপ্রান্তে এক জমিদার বাড়ী , জৌলুসহীন হয়ে পড়ে আছে এক কোণে। কপর্দকশূন্য বৃদ্ধর কাছে কেউ আসে না এখনও শুধু বৃদ্ধ মালী এখনো ছেড়ে যায় নি।
তার কেরামতিতে এই ভগ্নস্তূপেও জন্মায় অসংখ্য ফুল ও ফল গাছ।।
জমিদারবাড়ির বারান্দায় বসে রজত কিশোর যখন দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, তখন চারপাশটা কেবল নিস্তব্ধ থাকে না, তা এক ভারি হয়ে আসা ইতিহাসের মতো মনে হয়। জৌলুশহীন সেই বাড়ির প্রতিটি ইটের খাঁজে আটকে আছে ক্ষয়িষ্ণু আভিজাত্যের দীর্ঘশ্বাস। পঙ্গু রজত কিশোরের বাগানটিই এখন তার একমাত্র জগৎ, যেখানে হাসনুহানা, রজনীগন্ধা আর কামিনীর মাদকতা রাতে এক মায়াবী জগত তৈরি করে।
দাদুর শেষ কথাগুলো তাঁর মস্তিষ্কে এখনো অনুরণিত হয়—"গুপ্তধন থাকবে রাতের রাণীর কাছে, অভাবের ছায়া পড়বে না কোনোদিন।" কিন্তু কে এই রাতের রাণী? সেই উত্তর রজত কিশোরের কাছে চিরকালই এক ধাঁধা হয়ে রয়ে গেছে। আর তিনি দারিদ্র অতিক্রম করতে পারছেন না।
এদিকে, ভাগ্নে সজল কিশোরের চোখে তখন লোভের আগুন। সে সম্পত্তির গন্ধে পাগল। মামার পঙ্গু শরীরের অসহায়তাকে পুঁজি করে সে ধনসম্পদের খোঁজ জানতে চায়।মায়ের কাছে শুনেছিল যে মায়ের দাদু মামাকে গুপ্ত ধনের হদিস দিয়ে গেছেন।মামা চুপ করে থাকেন।
একদিন সজল মামার গলা টিপে ধরে," বলো, বলতেই হবে।"
রজত কিশোর বাধ্য হয়ে অস্ফুট স্বরে সেই দুর্বোধ্য সংকেতটুকু বলে দেন—"রাতের রাণীর কাছে।"
সজল রেইকী করে জানতে পারে যে শহরের অপর প্রান্তে রূপোগলিতে থাকেন রাতের রাণি নামে পরিচিতা মসুর বাঈজী খুশবুজী, যাঁর নানীর কাছে নিয়মিত যাতায়াত ছিল শুভ্র কিশোরের, মানে মায়ের দাদুর।
সজল নিশ্চিত, সেই ধন নানীর উত্তরাধিকার সুত্রে এখন খুশবুর সিন্দুকেই বন্দী।
খুশবুর মায়ফিলে সেদিন তবলার বোলে তখন খুশবুজী কন্ঠে সুরেরা খেলা করছিল,
"রাত কি খামোশি মে দিল কা ফাসানা হ্যায়
আঁখো মে অশ্ক নেহি, এক ইশক পুরানা হ্যায়
আও না বালম, ইস চাঁদ কি রোশনি লে লে
তেরে বিনা তো ইয়াহা সব কিছু বেগানা হ্যায়, ......"
শ্রোতারা বলেন ,"সাবাশ।"
সজল বলে," খামোশ।"
খুশবুর ভ্রূ কুঞ্চিত হয়, কন্ঠ থামে না।
"ইস শেহর-এ-জুদাই মে সব কিছু বেকারানা হ্যায়
রাত ঢলে তো ভি তেরা ইনতেজার রাহেগা
ইশক তো ওহ দরিয়া হ্যায়, জিসকা না কিনারা হ্যায়
চাঁদ ভি শর্মা যায়ে তেরে হুস্ন কি ...."
সজল তখন ধূর্ত শিকারির মতো গানে বাধা দিয়ে গর্জে ওঠে। কিন্তু খুশবুজী, যার প্রতিটি শব্দে সুরের মূর্ছনা, সে কেবল মিটিমিটি হেসে গায়:
"রাত কি খামোশি মে দিল কা ফাসানা হ্যায়,
আঁখো মে অশ্ক নেহি, এক ইশক পুরানা হ্যায়...
হাওয়া কি লেহরো মে খুশবূ কি তেরানা হ্যায়।"
সজল ধৈর্য হারায়। সে মনে করে গান দিয়ে পেট ভরে না, মোহরই আসল সম্পদ। সে হুমকি দেয়।
সজল কিশোর বলে "গানে চিঁড়ে ভেজে না। জমিদার বাড়ীর ধন ওয়াপস করো, নেহী তো...."
"নেহী তো কেয়া? কেয়া করেগা তুম? পাগল কাঁহিকা.. এ বাহাদুর হঠাও ইয়ে হুজুর কো।"
বাহাদুর ঘাড় ধাক্কা দেয়।
সজল কালনাগের মতে ফোঁস ফোঁস করতে করতে মামার ঘরে এসে দেখে রজত কিশোর ঘাড় এলিয়ে পড়ে আছেন, মালী পায়ের কাছে বসে কাঁদছে। পারিবারিক ডাক্তার ঘোষ পুলিশে খবর দিয়েছেন।
রজত কিশোর খুন হয়ে গেলেন!
সজলকে অ্যারেস্ট করলো পুলিশ।
সজল সব বলল।মাঝরাতের রাণীর কাছে তাদের সমাপত্তি চাইতে গেছিল বলে খুশবু মামাবাবুকে মেরেছে।
খুশবু গ্রেপ্তার হয়েও খালাস পেলেন, কারণ ওই রাতে সারারাত তিনি গান করেছেন।সাক্ষী আছে।
ডাক্তার ঘোষ পুরোনো বন্ধু, তিনি গোয়েন্দা ধূর্জটি ধরের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন।
গোয়েন্দা ধূর্জটি ধর একটি হাসনুহানার ঝোপের নীচে গভীরে লুকানে মোহরের ঘড়া বার করলেন।
হাসনুহানাই তো মধ্যরাতের রাণী। তার কাছেই গচ্ছিত ছিল সম্পত্তি।
রজতের গলার দাগ সজলের আঙুলের সঙ্গে মিলে গেল।
সজলের যাবজ্জীবন কারাদন্ড হলো।
সজলের হাতের আঙুলের ছাপ রজত কিশোরের গলার নীল দাগে মিলে গেল। সে চেয়েছিল ধন, কিন্তু পেল জেলখানা। আর সেই মোহর? তা সরকারের খাসমহল হয়ে গেল।
কারন তা বৃটীশ আমলের।
হাসনুহানার ঝোপের পাশে দাঁড়িয়ে খুশবুজীর সেই গানটা যেন আজও শোনা যায়।
"রাত কি রাণী" আসলে কোনো নারী ছিল না, ছিল সময়ের সেই নিষ্ঠুর পরিহাস, যা মানুষকে ধন দেয় ঠিকই, কিন্তু কেড়ে নেয় তার আত্মা। বাগান জুড়ে তখনো হাসনুহানার মাদকতা, যেন সেই ধনের অভিশাপ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।
******
