Mitali Chakraborty

Abstract Classics Inspirational


3  

Mitali Chakraborty

Abstract Classics Inspirational


যজ্ঞ:-

যজ্ঞ:-

4 mins 272 4 mins 272

দাশগুপ্ত ভবনে আজ সকাল থেকেই খুব লোক সমাগম। আজ দাশগুপ্ত বাড়ির ছোট ছেলে অরিন্দমের বিয়ে বলে কথা। এই পরিবারের শেষ বিয়ে বলে দূরের, কাছের সকল স্বজন পরিজনেরা আমন্ত্রিত। আর আমন্ত্রণ রক্ষা করতে এসেছেনও সকলে। বিয়েবাড়িতে ব্যস্ততা তখন তুঙ্গে। ওইদিকে বাচ্চাদের হুল্লোড়, চেঁচামেচি। এইদিকে বয়স্ক সকলে একসাথে হয়েছেন এত্তোদিন পর। সব কিছু মিলিয়ে এক আনন্দ উৎসবের পরিবেশ দাশগুপ্ত ভবনে। মহিলারা ব্যস্ত বিয়ের নিয়ম কানুন পূরণ করা নিয়ে। পুরো জমজমাট বিয়েবাড়ি।

এদিকে বরকর্তা অনিমেষ বাবু সকাল থেকে বিয়ের অনেক আচার-বিধি পালন করে নিজের ঘরে একটু শুয়েছেন। সকালের আচার অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর পুরোহিত মশাই বলে গেছিলেন বিয়ে সংক্রান্ত আরো কিছু সান্ধ্যকালীন আচার অনুষ্ঠান অনিমেষ বাবুকে পালন করতে হবে। তাই একটু পাওয়ার ন্যাপ নিয়ে ফ্রেশ হতে চাইছেন তিনি! কিন্তু এত শোরগোল হইচইয়ের মধ্যে কি আর ঘুমোনো যায়? তাই একবার এপাশ ওপাশ করে কিছুক্ষন পরে না ঘুমিয়েই উঠেই পড়লেন অনিমেষ বাবু।  

বিকেল হতেই বাড়ির মেয়ে বৌমাদের সাজগোজ শুরু হয়ে গেলো। অনেকেই আবার বাড়ির মেয়েদের সাজসজ্জার বহর দেখে বলছেন, "তোমরাই সাজবে নাকি শুধু? আমাদের ছেলেটা বিয়ে করতে যাচ্ছে তাকেও একটু সাজাও!" অরিন্দম তখন বসে বসে মোবাইল ঘাটছিল। তাদের কথায় একটু লজ্জা পেয়ে উঠে চলে যাবে তখুনি তার বড়বৌদিদি বলে উঠলো, "এই ঠাকুরপো, লজ্জা পেয়ে পালাচ্ছো কোথায়? এসো তোমাকেও একটু সাজিয়ে দেই!"

অরিন্দম আরো লজ্জা পেয়ে তড়িঘড়ি ওখান থেকে সরে যেতে চাইছে তখুনি অনিমেষ বাবু অরিন্দমকে ডেকে বললেন 

- তোর দাদা কৈ রে অরিন?

অরিন্দমের কিছু বলার আগেই বড় বউ বললো

- বাবা, ও তো একটু বেরিয়েছে। কিছু হয়েছে কি? চিন্তান্বিত লাগছে আপনাকে?

- না বৌমা। সে ঠিক আছে। 

অনিমেষ বাবু চলে যেতেই সকলে আবার ব্যস্ত হয়ে পরে সাজসজ্জার জন্য।


*************************


এদিকে বর সহ বরযাত্রী সকলে তৈরি, কিন্তু পুরোহিত মশাইয়ের দেখা নেই! অনিমেষ বাবু আর অরিন্দমের দাদা বারবার ফোন করেও তেনাকে পাচ্ছেননা। যতবার চেষ্টা করছেন বলছে ওনার ফোন এই মুহূর্তে নেটওয়ার্কের বাইরে। এমতাবস্থায় চিন্তা হওয়াটা খুব স্বাভাবিক। একটি অটো এসে থামলো তখন দাশগুপ্ত বাড়ির সামনে। অটো থেকে নামলেন এক মহিলা। পরনে লাল পাড় শাড়ি, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, কাঁধে একটি কাপড়ের ঝোলানো ব্যাগ। সকলেই একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন ওনার দিকে। ভাড়া মিটিয়ে সকলকে নমস্কার জানিয়ে তিনি জানতে চাইলেন অনিমেষ বাবুর ব্যাপারে। অনিমেষ বাবু এগিয়ে এসে প্রতি নমস্কার করে বললেন

- আজ্ঞে আপনাকে তো চিনতে পারছি না!

- আমি সুলতা ভট্টাচার্য্য। শ্রী সুখেন ভট্টাচার্য্য আমার বাবা।

চকিত হয়ে ওঠেন অনিমেষ বাবু। 

- আপনি সুখেন বাবুর কন্যা? আসুন আসুন ভেতরে আসুন। বড় বৌমা এনার জন্য চা মিষ্টির ব্যবস্থা করো। 

- না না, তা নিয়ে ব্যস্ত হবেন না। আপনি একটু শুনুন যে কারণে আমার আজকে আপনাদের বাড়িতে আসা।

অনিমেষ বাবু বিনম্র নিবেদন জানিয়ে তাঁকে ভেতরে এসে বসতে বললেন। সুলতা দেবী ভেতরে প্রবেশ করে নির্দিষ্ট স্থানে বসে বললেন,

- আসলে সকাল বেলায় বিয়ের সমস্ত রীতি নীতি শেষ হলে পরে বাড়ি যাওয়ার পথে বাবা একটি দুর্ঘটনার শিকার হন। বাড়ি ফেরার সময় ভুল বশত এক স্কুটার ধাক্কা মারে ওনাকে। বাবা সামলাতে না পেরে পরে যান,পায়ে আর ডান হাতে চোট পেয়েছেন। আমরা বাবাকে হাসপাতাল নিয়ে যাই। ডাক্তার বাবাকে আজ সারাদিন বিশ্রাম নিতে বললেন। এই অবস্থায় বাবার পক্ষে সম্ভব ছিলোনা আপনাদের এখানে আসা। আর দুর্ঘটনার জেরে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাবার মোবাইলটিও, তাই তিনি আমাকেই পাঠালেন। 

- একি দুর্ঘটনা ঘটে গেলো হঠাৎ!! ভগবান করুন সুখেন বাবু তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যান। আমি সন্ধ্যে থেকেই ওনার মোবাইলে চেষ্টা করছি, কিন্তু কোনোভাবেই যোগাযোগ করতে পারছিলাম না। চিন্তা হচ্ছিল বড়ো। কিন্তু এই মুহূর্তে অন্য পুরোহিত আমরা কোথায় পাবো? কি করি এখন? এইদিকে বর সহ আমরা সকলে তৈরি বিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার জন্য!

- চিন্তা করবেন না! আমি আছি তো!

- আপনি???

- হ্যাঁ। বাবার সঙ্গে থেকে থেকে শিখেছি সকল পুজো আর্চা। নিয়ম নীতি। আপনি ভাববেন না। আপনার ছেলের বিয়েটা সুষ্ঠ ভাবে সম্পাদন করতে পারবো। 

- কিন্তু! আপনি...... না মানে!

সুলতা দেবী মৃদু হেসে বললেন,

- হ্যাঁ আমি একজন মহিলা। আর আমাদের সমাজে মহিলা পুরোহিত এখনও তেমন স্বীকৃতি পায়নি। কিন্তু আপনিই বলুন আমাদের কি বাকি পুরোহিতদের ন্যায় সাম্য বা সমানাধিকার পাওয়ার যোগ্যতা নেই? 

এবারে মুখ খুললো অরিন্দম। করজোড়ে নমস্কার করে বললো

- আপনি সত্যিই নমস্য সুলতা দিদি। আপনি একটি নায্য প্রশ্ন করেছেন। সত্যিই আমরা তো এইভাবে কখনো ভেবে দেখিনি! শুধু পুরুষরাই কেন পৌরহিত্য করবেন? মহিলারা কম কিসে? আজকের যুগে নারী পুরুষ সবাই সমান, আর সকলের জন্যই রয়েছে সকল কাজ করার সমান অধিকার। বিয়ের মণ্ডপের সকল আচার অনুষ্ঠান আপনার দ্বারাই সম্পন্ন হোক দিদি। কি বলেন আপনারা সকলে?

দাশগুপ্ত বাড়ির সকলে তখন সমস্বরে " হ্যাঁ " বলে সম্মতি জানালেন। সত্যিই নারী পুরুষ নির্বিশেষে সাম্য বা সমানাধিকার সকলেরই প্রাপ্য। 



Rate this content
Log in