Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

Manasi Ganguli

Abstract


4.8  

Manasi Ganguli

Abstract


ঠাকুর দেখা

ঠাকুর দেখা

5 mins 811 5 mins 811

   মাসির বাড়ি জগদ্ধাত্রী পুজোয় বেড়াতে এসেছে রিমা। অনেকদিনের শখ জগদ্ধাত্রী পুজো দেখার, সে হয়েই ওঠে না। সেসময় স্কুলের ছুটি থাকে না তাই আসাও হয় না। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে এবছর ওর কলেজের প্রথমবর্ষ। পুজোর মধ্যে শনি-রবিবার পড়েছে আর শুক্রবার কলেজের প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে ছুটি। একটা দিন কলেজ কামাই করে বৃহস্পতিবার সপ্তমীর দিন সকাল বেলায় ও মায়ের সঙ্গে এসেছে মাসির বাড়ি। জলখাবার খেয়েই বেরিয়ে পড়েছে ওরা ঠাকুর দেখতে। মাসি সকালে বেরোননি সবার খাবার ব্যবস্থা করতে হবে বলে,তাই মাসতুতো দাদা বাপ্পা ওদের নিয়ে বেরিয়েছে। কখনো দেখেনি রিমা এত বড় বড় ঠাকুর, দুচোখ ভরে দেখছে ও। মাকে বলছে, "দেখো মা কি জমকালো ঠাকুর, দেখলেই ভক্তিতে মাথা নত হয়ে যায়।" মায়ের চোখেও ততোধিক বিস্ময়। ঘুরে ঘুরে অনেক ঠাকুর দেখল ওরা। দিনের বেলাতেও লোকে-লোকারণ্য। "এত ঠাকুর, রোজ দুবেলা বেরোলে তবেই সব দেখা যাবে",বাপ্পা বলল মাঝেমাঝে টোটোতে চাপলেও বেশিটাই হাঁটতে হচ্ছিল। পায়ে ব্যথা করছিল যদিও তবু দেখার আগ্রহে তাই নিয়েই হেঁটে চলেছে ওরা। বাড়ি ফিরতে অনেকটা বেলা হয়ে গেল। মাসি বললেন, "খাবার সব পান্তা হয়ে গেল যে রে"। রিমা বলল, "কাল থেকে মাসি তুমি রান্না করবে না বাড়িতে। রাস্তায় কত দোকান, স্টলে স্টলে কত রকমের খাবার পাওয়া যায় দেখলাম। কোনো দরকার নেই বাড়িতে রান্না করার, তুমিও আমাদের সঙ্গে বেরোবে, সবাই একসঙ্গে মজা করতে করতে ঠাকুর দেখব।"

     মাসি আগে বাংলার বাইরে থাকতেন মেসোর চাকরিসূত্রে। রিটায়ারমেন্টের পর মেসো তাঁর বন্ধুর বাড়ির পাশে এই বাড়িটি করে এখানে থাকতে শুরু করেন। সেও ৫-৬ বছর হয়ে গেল। মাসির বাড়িতে এলেও এই জগদ্ধাত্রী পুজোর সময় আসা হয়নি আগে কখনো। বাপ্পা তো পাড়ার পুজোয় মেতে থাকে,কেবল মাসি এসেছে বলে ওদের ঠাকুর দেখাতে নিয়ে বেরিয়েছে,তাও সন্ধ্যেবেলা যাবে না বলেই দিয়েছে সে। বাড়ি ফিরে খাওয়া-দাওয়া করে একটু রেস্ট নিতে না নিতে রিমা আবার রেডি হতে শুরু করেছে। এবেলা মাসি-মেসোর সঙ্গে বেরোবে ওরা। চারিদিকে আলোর রোশনাই, বিভিন্ন জায়গায় কত মেলা বসেছে কিন্তু খুব বেশি ঠাকুর দেখা হলো না ওদের মেসো অত হাটতে পারছিলেন না। রিমার মন ভরল না। মাসি বললেন,"আছিস তো এই কদিন, অনেক ঠাকুর দেখাবো তোকে। আর বিসর্জনের দিন সমস্ত ঠাকুরের শোভাযাত্রা বেরোবে যখন শহরজুড়ে সেদিন তোকে সব দেখাবো।" কদিন ঘুরে ঘুরে অনেক ঠাকুর দেখা হল রিমার, গিয়ে সব গল্প করতে হবে বন্ধুদের,খুব উত্তেজিত ও। মাসিকে বলেই দিল, "মাসি প্রতিবছর আসবো আমি জগদ্ধাত্রী পুজোয়, ঠিক আছে তো?" মাসি বলেন, "পাগলি মেয়ে,আমি কি না বলেছি? নিশ্চয়ই আসবি,আমারও ভালো লাগবে তাতে। তোর দাদাটা তো সারাদিন রাত পাড়াতেই মেতে আছে, তোরা এসেছিস বলে ঘুরতে নিয়ে গিয়েছিল কেবল আর তোরা রয়েছিস বলে যদি বা একটু দেখা পাওয়া যায় বাড়িতে কিন্তু বিসর্জনের দিন তার টিকিটিও দেখা যাবে না।"

    পরের দু'দিন খুবই আনন্দে কাটল রিমার, ঠাকুর দেখা,মেলায় ঘোর়া, নানারকম খাবার খাওয়া বিভিন্ন স্টল থেকে, নাগরদোলায় চাপা কিছুই বাকি রাখেনি আজ রিমা। মাসি ওর আশ মিটিয়ে ঘুরতে দিয়েছেন ওকে। এরপর বিসর্জনের বাজনা বাজল। বিসর্জনের শোভাযাত্রার গল্প অনেক শুনেছে রিমা,আজ দেখবে নিজের চোখে,খুব খুশি ও। এছাড়া মাসির কাছে বায়না, "অত বড় ঠাকুর কিভাবে লরিতে তোলে আর কিভাবেই বা গঙ্গায় বিসর্জন হয় তা আমাকে দেখাতে হবে কিন্তু মাসি"।মাসি বোনঝির সব আবদার মেটাতে চান। মা বলেন, "পরেরবার তো আবার আসবি বললি,তা ওটা না হয় পরের বারেই দেখিস। ক'দিন তো মাসিকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরালি।" রিমা শুনতে চায় না,"না এবারেই দেখব"। মাসি বলেন, "ঠিক আছে,ঠিক আছে আমি নিয়ে যাব তোকে।" পাড়ার ঠাকুর লরীতে তোলার সময় মাসি নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে আনলেন রিমাকে। কত অভিজ্ঞতা হচ্ছে রিমার এই জগদ্ধাত্রী ঠাকুর দেখতে এসে। দুপুরে তাড়াতাড়ি খাওয়া-দাওয়া সেরে মাসি বেরিয়ে পড়লেন বোনঝিকে নিয়ে। মা আর পারছেনা তাই যাবে না বলল। সব ঠাকুর শোভাযাত্রায় অংশ নেয় না,সেইসব ঠাকুর পুজোর পর গাড়িতে তুলে দুপুরের মধ্যে বিসর্জন দিয়ে দেওয়া হয়। মাসী ওকে টোটোতে চাপিয়ে গঙ্গার ঘাটে নিয়ে গেলেন। সেখানেও প্রচুর ভিড় বিসর্জন দেখতে,কেউ বা রাতের জায়গা পাকা করতে দুপুর থেকেই দখল করে রাখছে। কত দূর দূরান্ত থেকে মানুষ এসে বিভিন্ন জায়গা দখল করে রাখছে রাতের শোভাযাত্রা দেখবে বলে। কোনো বাড়ির বাইরের রোয়াক আর খালি নেই, তাদের নিজেদের দখলে নেই, সব বাইরের মানুষজন এসে দখল করে বসে আছে। একের পর এক ঠাকুর আসছে ড্যাং কুরাকুর করে ঢাকের বাদ্যির সাথে। অতবড় ঠাকুর কত কসরত করে গঙ্গার ঘাটে নামিয়ে বিসর্জন দেওয়া,অবাক হয়ে দেখলো রিমা। এসব দেখে বাড়ি ফিরতে বেশ সময় লাগল, রাস্তায় প্রচুর ভিড় জ্যাম লেগে গেছে তাই।

    বাড়ি ফিরে মাকে সেসব গল্প করল রিমা উত্তেজিত হয়ে। সন্ধ্যেবেলায় মাসি,মেসো,মা সবার সাথে বেরল রিমা ঠাকুরের শোভাযাত্রা দেখতে। অবাক চোখে দেখে সে আর খুশিতে চোখ মুখ ভরে ওঠে। এক একটা ঠাকুরের সঙ্গে কত গাড়ি, কত আলো,কত মানুষ চারিদিকে। বাজনা বাদ্যি, আলোর রোশনাইয়ের এই উৎসবে শামিল হতে পেরে খুব খুশি ও। এক জায়গায় বসে ওরা ঠাকুর দেখছিল, বাপ্পা চেয়ার ভাড়া করে রেখেছিল সবার জন্য। একটু রাত বাড়তে মা আর মেসো বাড়ি যাবার জন্য অস্থির হয়ে পড়েন। রিমার মুখ ভার হয়ে যায়। মাসি মায়ের কাছে বাড়ির চাবি দিয়ে ওদের বাড়ি গিয়ে খাওয়া দাওয়া করে শুয়ে পড়তে বলেন। এরপর রিমাকে তিনি বলেন, "চল আমরা ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখে নিই, এখন সব ঠাকুর রাস্তায়। এক জায়গায় বসে না থেকে ঘুরে দেখলে অল্প সময়ে অনেক ঠাকুর দেখা হয়ে যাবে।" মাসি বোনঝি ঘুরতে লাগল রাস্তা ধরে। ওই রাস্তাতেই পরপর সব ঠাকুর যাচ্ছে। ঘুরতে ঘুরতে ওরা চলে এসেছে প্রায় গঙ্গার ঘাটের কাছে,যদিও বিসর্জন এখন হবে না সারারাত ধরে সারা শহর পরিক্রমা করে তবেই বিসর্জন হবে পরদিন সকালে। "বাপরে এখানে যে প্রচণ্ড ভিড়ের চাপ!" মাসি ঘাবড়ে গিয়ে বোনঝির হাতটা শক্ত করে ধরেন কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই ভিড়ের চাপে হাত ছেড়ে গেল দুজনের। ওরা ছিটকে গেল দুদিকে। অত ভিড়ে ওরা কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছে না। মাসি 'রিমা রিমা' করে চিৎকার করছেন, রিমাও 'মাসি মাসি' করে কিন্তু কারো ডাকই কারো কানে পৌঁছায় না। ব্যান্ডের বাজনায় হারিয়ে যাচ্ছে ওদের ডাক। দুজনে উল্টোপথে দুজনকে খুঁজে যাচ্ছে আর আরো দূরে সরে যাচ্ছে পরস্পরের থেকে। ভিড়ের চাপে রিমা ছিটকে একটা গলিতে গিয়ে পড়লো। গলির মুখে কয়েকটি ছেলে ওর দিকে তাকিয়ে। গলির মুখে এত জ্যাম সেখান থেকে বেরোতে পারে না, বেরতে গেলে ছেলেগুলোর সামনে গিয়ে পড়বে,তাই পিছতে থাকে ও। রাস্তা ঘাট চেনা নয়,ভয় পেয়ে যায় রিমা, কি করে ফিরবে সে? মাসিকেই বা পাবে কোথায়? ছেলেগুলোকে ওর দিকে এগোতে দেখে ও পিছতে থাকে। তাতে ও জনারণ্য থেকে অনেক দূরে গিয়ে পড়ে। সেখানে বাড়িঘর কম, চারিদিক অন্ধকার, যে কটা আছে,সব ঠাকুর দেখার হিড়িকে বন্ধ। ছেলেগুলি কাছে এসে পড়ায় রিমা বুঝতে পারল সবকটা মদ্যপ। ভয়ে রিমার গলা বসে গেছে, চেঁচাতেও পারছে না,কান্নায় বুকটা ফেটে যাচ্ছে।

     মাসি ওদিকে সারারাত কেঁদে কেঁদে তাকে খুঁজে বেরিয়েও না পেয়ে ভাবেন যদি কোনোভাবে বাড়ি ফিরে থাকে,তাই বাড়ি চলে আসেন আর বাড়িতে তাকে না দেখে বিপদের আশঙ্কায় পাগলের মতো ছুটে বেরিয়ে যান থানায়। সারারাত পুলিশও সব সামলাতে ব্যস্ত, তাদেরও পাওয়া দুষ্কর। তবু একজন সহৃদয় অফিসার সব শুনে খোঁজবার আশ্বাস দিলেন।

    এক্ষেত্রে যা হবার সে রাতে তাই হয়েছিল। রিমাকে পাওয়া গেল তবে জীবন্ত নয় মৃত অবস্থায়। তার মৃতদেহ গলিটার এক প্রান্তে এক ঝোপের মধ্যে থেকে উদ্ধার হল দিনের শেষে,বেশবাস ছেঁড়া অবস্থায়। একদিকে ঠাকুরের বিসর্জনের বাজনা বাজছে হইহই করে,আরেকদিকে রিমার বিসর্জন হয়ে গেল সবার অলক্ষ্যে।


Rate this content
Log in

More bengali story from Manasi Ganguli

Similar bengali story from Abstract