স্যাকুবাসের ক্ষিদে
স্যাকুবাসের ক্ষিদে
স্যাকুবাসের ক্ষিদে আকাশ ফর্সা হতে শুরু করেছে সবে সবে।মুখ হাত ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিয়ে...গরম ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ হাতে নিয়ে দোতলার ঝুলন্ত ব্যালকনিতে বসে রয়েছে ঋক একমন শান্তি নিয়ে।চুরুক চুরুক শব্দ করে কাপ থেকে কফি খাচ্ছে ঋক...আর ভাবছে...জীবনের এই সিদ্ধান্তটা যদি বেশ কিছু বছর আগে নেওয়া যেত...তাহলে বেশ কিছু কর্দমাক্ত অধ্যায় কোনো অস্তিত্বই করে নিতে পারত না ওর জীবনে...। ওর মতো শিল্পী মানুষের পক্ষে...ঘরে স্ত্রীর সঙ্গে লঙ্কা ধনেপাতা নিয়ে আসবার জন্য ধ্যাতানি খাওয়া...কিংবা কানা বেগুন কিনে আনার জন্য বৌএর কাছে গালাগালি খাওয়া...টিভির রিমোট নিয়ে স্পোর্টস চ্যানেল নাকি সিরিয়াল...এইসব নিয়ে তর্কাতর্কি করাটা যাস্ট যায় না।ঋক ওর জীবনসঙ্গী হিসেবে চেয়েছিল এমন একজন মেয়েকে...যে চিন্তায় ভাবনায় আর পাঁচটা মেয়ের চাইতে অনেকটা আলাদা।যে ওকে বুঝবে...ওর শিল্পীসত্ত্বাটাকে এক করে নিতে সক্ষম হবে নিজের সত্ত্বার সঙ্গে।ময়ূরাক্ষীকে যেদিন প্রথম দেখেছিল ঋক...সেদিন ওই ক্ষণিকের দৃষ্টি বিনিময়েই যেন ঋকের বুকে উত্তাল হয়ে উঠেছিল এক দামাল ঝড়!সেদিন ময়ূরাক্ষীর নাম বা পরিচয় কিছুই জানত না ঋক।কিন্তু ওর চোখে চোখ রেখে কথা বলার সময়ে ওর মনে হয়েছিল...হ্যাঁ...এই তো সেই...যার হাত ধরার জন্য ও অপেক্ষা করে রয়েছে।এই মেয়ে যে আর পাঁচটা মেয়ের থেকে অনেক...অনেক আলাদা...সেটা ঋক অনুভব করেছিল ওই প্রথম সাক্ষাতেই।চিত্রকার হিসেবে নিজের একক প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিল ঋক সেইদিন। অটোগ্রাফ নেবার জন্য হুমড়ি খেয়ে ওর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়া জনসাধারণের ভিতর থেকে ময়ূরাক্ষীকে খাতা আর পেন বাড়িয়ে ধরতে দেখেছিল ঋক।সেই মূহুর্তেই ওর ভিতরে যেভাবে তোলপাড় করা এক দামাল ঝড় আরম্ভ হয়েছিল...সেটায় ও নিজেই বেশ খানিক বেসামাল হয়ে পড়েছিল ভিতরে ভিতরে।তবে...পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়েছিল ঋক।অটোগ্রাফ দিতে দিতেই.... গলায় বেশ একটা পোশাকী গাম্ভীর্য নিয়ে এসে...অটোগ্রাফপ্রার্থীর উদ্দেশ্যে জিজ্ঞাসা করে উঠেছিল ঋক..."আর্ট,পেইন্টিং এইসব কি ভালোবাসো?" ঋকের মুখে প্রশ্ন শুনে সেদিন ময়ূরাক্ষী বিহ্বলিত হয়ে উঠেছিল।আপ্লুত কন্ঠে ও বলে উঠেছিল..."হ্যাঁ স্যার...পেইন্টিংএর প্রতি আমার বরাবরেরই খুব ঝোঁক ।টুকটাক আঁকিও নিজের মতো।আমি আপনার বিশাল বড়ো ফ্যান।" ব্যাস...সেই ছিল শুরু।অচিরেই ঋকের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে প্রথম সারিতে জায়গা করে নিতে একেবারেই সময় লাগেনি ময়ূরাক্ষীর।খুব অল্প সময়ের ভিতরেই সময় এমন এল...ঋকের সমস্ত ছাত্রছাত্রীরা বিদায় নেওয়ার পরেও ঋক ময়ূরাক্ষীর হাতের সাথে হাত মিলিয়ে ক্যানভাসের ওপরে হাজারো রঙের মাধুকরী মিশ্রিত টুকরো টুকরো স্বপ্নের জলছবি সৃষ্টিতে নিমগ্ন হয়ে পড়ত।সময় যে কিভাবে নিঃশব্দে বয়ে যেত...তা ওদের নিজেদেরই খেয়াল থাকত না।জীবনের পথে হাঁটবার জন্য ঋক এক হৃদয় উষ্ণ ভালোবাসার সাথে আঁকড়ে ধরেছিল ময়ূরাক্ষীর হাত।মনের ভিতরে জ্বলে উঠেছিল হাজারো প্রদীপের রোশনাই। কিন্তু হায়...জীবনে এত অর্থ...খ্যাতি...প্রাচুর্য...আর সফলতা পাওয়ার পরে...আজ এতবড় পরাজয়ের মুখোমুখি হতে হবে...এটা কি দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পেরেছিল ঋক! ময়ূরাক্ষী শেষ পর্যন্ত ওকে ধোঁকা দিয়ে চলে যাবে অন্য পুরুষের কাছে...এ যে ওর স্বপ্নেরও অতীত ছিল! যে মেয়েটাকে নিজের হৃদয় নিংড়ে উৎসর্গ করেছিল পৃথিবী উজাড় করা ভালোবাসা...সেই মেয়েটা যখন কিছুদিনের জন্য মেলামেশা করে...আনন্দ উপভোগ করে তারপর উড়ে চলে গেল অন্য বাসায়...তখন মন ভাঙ্গার এই যন্ত্রনা আর নিতে পারল না ঋক। প্রচন্ডভাবে ভেঙ্গে পড়েছিল।ওর যেন মনে হচ্ছিল...এত অর্থ...যশ...খ্যাতি...সবকিছুই বৃথা।জীবনে বেঁচে থাকাটাই যেন অর্থহীন মনে হত ওর। ছেলের এহেন অবস্হা দেখে...ঋকের বাবা সৌমেন বাবু আর মা বৈশাখী দেবী যারপরনাই ভেঙ্গে পড়লেন।নাওয়া খাওয়া ভুলে গিয়ে যেভাবে ছেলে নিজের এত সুন্দর একটা জীবনকে নিজের হাতে ধ্বংস করছে একটু একটু করে...তাতে ওঁদের দুজনেরই বুক যেন ফেটে যাচ্ছিল।তাঁরাই কোনোমতে ঋককে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ওকে পাঠালেন ব্যাঙ্গালোরে...কিছুদিনের চেঞ্জের জন্য।সৌমেন বাবুর ছোটভাই অর্থাৎ ঋকের ছোটকাকার কর্মস্থল সেখানে।কটাদিনের জন্য কাকার কাছে গিয়ে ঘুরে আসার প্রস্তাবটা মন্দ লাগেনি ঋকের।বাবা মায়ের কথার ওপরে আর কথা না বাড়িয়ে...ও অচিরেই রাজি হয়ে গিয়েছিল এই প্রস্তাবে। ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিয়ে কাকার বাড়িতে পা তো রাখল ঋক।কিন্তু সেখানে পা রাখার পর থেকেই ওর রীতিমতো মাথার চুল ছিঁড়তে বসার উপক্রম হয়েছে।প্রতিদিন নিয়ম করে ছোটকাকা আর ছোটকাকিমার দাম্পত্য কলহে...ওই বাড়িতে কোনো তৃতীয় ব্যক্তির টিকে থাকাই সবচাইতে বড় শাস্তি।তবে খুড়তুতো ভাইবোনেরা হতচকিত কিংকর্তব্যবিমূঢ় দাদাকে আড়ালে ডেকে ফিসফিস করে বলেছে..."তুমি এইসবে একদম কান দিয়ো না দাদা...এটা বাবা মায়ের প্রতিদিনের নিত্য রুটিন।এ না হলে ওঁদের ভাতই হজম হবে না...!" ঋক দেখল...সত্যিই তাই।সকাল থেকে ঝগড়া শুরু হয় আর তা চলে সন্ধ্যা কি রাত পর্যন্ত।আর তার পরেই সুন্দর দুজনে সংসারের দরকারী কথাবার্তা সারে...হাতে হাত মিলিয়ে শুতে চলে যায়। এই তো চলছে।কিন্তু ওই বিচ্ছিরি ঝগড়া জন্মইস্তক দেখে দেখে এদের অভ্যাস থাকলেও...ঋকের রীতিমতো প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে আসার উপক্রম হয়েছে। একটা সুন্দর শান্ত নিরিবিলি পরিবেশে নিজের মতো করে যে একটু সময় কাটাবে...মনের ক্ষততে লাগাবে একটু প্রলেপ...তার কোনো উপায়ই নেই।ওর মনে হল..."দুত্তোর...এক্ষুনি ব্যাগপত্র গুছিয়ে এখান থেকে কেটে পড়ি...।" আবার ব্যাঙ্গালোর আর তার আশেপাশের পাহাড়ী জায়গার সৌন্দর্য ওকে ক্রমেই আকর্ষণ করতে শুরু করে দিয়েছে।বেশ কিছুদিন এইভাবে চলার পর অতিষ্ঠ হয়ে...ঋক একটা কাজ করে ফেলল।ব্যাঙ্গালোরের কাছাকাছি একেবারে গ্রাম্য একটা জায়গা বেছে...সেখানে নিজের থাকবার জন্য একটা বাংলো বাড়ি ভাড়া নিয়ে নিল। ঠিক করল...এই পাহাড়ী নির্জনতা আচ্ছাদিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এমন অপূর্ব জায়গাতেই ও থেকে যাবে...যতদিন ওর ইচ্ছা। কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে ও ভাবছে...কলকাতার রাস্তায় তো চলাফেরা করাটাই দায়।দক্ষিণ ভারতের এই পাহাড়ী গ্রাম্য নির্জনতায় মুক্ত বিহঙ্গের মতোই নিজেকে একাকার করে দেওয়া যাবে প্রকৃতির বুকে...। পাহাড়ের বুকে এই সুন্দর সাজানো বাংলোটাতে এখন পুরোপুরি নিজের মতো করেই এখন থাকে ঋক।ওর শোবার ঘরের সামনে রয়েছে একটা সুবিশাল ঝুল বারান্দা।এই ঝুলবারান্দাতে...একটা আরামকেদারায় বসে কফির কাপে চুমুক দিয়ে বড় শান্তি অনুভব করছে ঋক।ব্যালকনিতে কফির কাপ হাতে বসে...সামনে বিস্তৃত পাহাড়ের সৌন্দর্যের অপার সৌন্দর্যের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে ঋক...আর ভাবছে...এই নির্জন সৌন্দর্যের স্নিগ্ধ ক্রোড়ে আচ্ছাদিত থেকেই যদি কাটিয়ে দেওয়া যায় জীবনটা...তাহলে বেশ হয়।ক্যানভাস,রং তুলি সবকিছুই ও আনিয়ে নিয়েছে এখানে।এখন ও নিজের মতো এখানে থাকে... ছবি আঁকে...আর উপভোগ করে একান্ত নিরালায় রংতুলি আর ক্যানভাসের সাথে এক অনাবিল সখ্য।আপাতত কলকাতায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা ওর একেবারেই নেই।এখন ও শুধু চায়...মানুষের কোলাহলবিহীন এক অপার নির্জনতা...যেখানে ও শুধু ক্যানভাস আর রংতুলি ছাড়া আর কিছুই দখল নেবে না ওর জীবনে। দৃশ্য দুই দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর একচোট ঘুমিয়ে নিয়েছে ঋক।শরীর একেবারে চনমনে।এই সময়ে...ও ঘুরতে বেরোয়।পাহাড়ের কোলে আপন মনে বিচরণ করে করে পাহাড়ী সৌন্দর্যটা নিজের মতো করে উপভোগ করে ঋক।তারপর চলে যায় লোকালয়ে।সেখান থেকে মনমতো কেনাকাটা...বাজার করে নিয়ে ফিরে আসে বাংলোয়।এই রুটিন একদম এক এবং অবিচ্ছেদ্যভাবে জুড়ে গিয়েছে ওর এই একান্ত নিরালায় আচ্ছাদিত জীবনের সঙ্গে।কিন্তু আজ আর ওর কিছু কেনাকাটা করার নেই।অতএব ও ঠিক করে নিল...আজ সাথে করে একখানা ছোট্ট ক্যানভাস আর সাথে কিছু রং আর তুলি নিয়ে বেরোবে।একটা পছন্দের জায়গা বেছে নিয়ে ।সেইমতো পরিকল্পনা করে ও মোটামুটি দুপুর থাকতে থাকতেই বেরিয়ে পড়ল।পাহাড়ের গায়ে একটা সুন্দর জায়গা বেছে...বসে পড়ল ঋক...আর এক এক করে বার করতে শুরু করল রং তুলি আর ক্যানভাস।তারপর পেন্সিল দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই ক্যানভাসের গায়ে তৈরি করে নিল নতুন ছবির একখানি খসড়া।কিন্তু ঋকের কপালটাই খারাপ...সাথে সাথেই তুমুল বেগে নামল বৃষ্টি।সাথে সাথে সব জিনিসপত্র ব্যাগের ভিতরে পুরে নিয়ে ঋক প্রচন্ড বেগে দৌড় দিল।কোনো একটা গাছতলা খুঁজে সেখানে দাঁড়াতে হবে...যতক্ষন না বৃষ্টিটা একটু কমছে...!দৌড়াতে দৌড়াতে...একটা বড় ডালপালাওয়ালা একটা গাছ খুঁজে পেয়েও গেল ঋক খুব শীঘ্র।সেই গাছের তলায় একেবারে কাকভেজা হয়ে দাঁড়িয়ে ও অপেক্ষা করতে লাগল...বৃষ্টি থামবার জন্য।অল্প সময়ের মধ্যে বৃষ্টি কমেও এল।এবার চারপাশটা একটু পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান হল ঋকের কাছে।কিন্তু তার ভিতরেই...এমন একটা জিনিস ওর চোখে পড়ে গেল...যেটার ওপরে ওর চোখ পুরোপুরি আটকে গেল।সামনে ছোট একটা পাহাড়ী টিলা রয়েছে...আর তার গায়ে একটা ছোট সুড়ঙ্গ পথ দেখা যাচ্ছে।সুড়ঙ্গটা ছোট হলেও একটা মানুষ ওর ভিতর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে ঠিক ভিতরে ঢুকে যেতে পারবে।বৃষ্টির বেগ কমে আসতে শুরু করল...কিন্তু ঋকের ভিতরে একটু একটু করে পুঞ্জীভূত হতে শুরু করল একটা চাপা কৌতূহল...! বৃষ্টির বেগ এখন একেবারেই কমে গিয়েছে। নিজের অজান্তেই যে কখন ঋক ওই সুড়ঙ্গের দিকে পা বাড়িয়ে দিয়েছে...সেটা ওর নিজেরই খেয়াল নেই।এক পা এক পা করে যখন ও সেইদিকে এগোতে শুরু করেছে...তখন ক্রমেই কোনো এক সূক্ষ্ম মায়ার জালে...একটু একটু করে আবিষ্ট হতে শুরু করেছে ঋক নিজেরই অজান্তে...!হঠাৎ ওর হাতটা কেউ যেন চেপে ধরল। "ও দিকে যাবেন না বাবু...!" ঋক প্রচন্ড অবাক হয়ে গেল।এই নির্জন জায়গায় এতক্ষণ ধরে তো ও একাই ছিল।চারপাশে তো কোনো মানুষের চিহ্ন পর্যন্ত ছিল না...হঠাৎ করে চোখের পলকের ভিতরে একজন আস্ত মানুষ ওর সামনে কোথা থেকে এসে উদয় হল!লোকটাকে আপাদমস্তক একবার নিরীক্ষণ করে নিল ঋক।লোকটার বেশভূষা ভারী অদ্ভুত।অন্ততপক্ষে আজকের যুগে কোনো মানুষ এরকম পশুর চামড়া দিয়ে তৈরি আজব পোশাক আর পশুর হাড় দিয়ে তৈরি এরকম অদ্ভুত দর্শন গয়না পরতে পারে...এ চোখের সামনে না দেখলে বিশ্বাসই করতে পারত না ঋক।লোকটার মাথাভর্তি নোংরা জটা আর মুখ ভর্তি জঙ্গুলে দাঁড়িগোফ দেখে বেশ খানিকটা ভিরমিই খেয়ে গেল ঋক।লোকটা ঋকের হাতটা বেশ জোরেই চেপে ধরে রয়েছে।যেন ওই সুড়ঙ্গপথের দিকে আর যাতে ও পা বাড়াতে না পারে...সেই চেষ্টায় একেবারে বদ্ধপরিপক সে।কয়েক মূহুর্ত পরে নিজেকে সামলে নিয়ে ঋক সাথে সাথে ওর হাতখানি ছাড়িয়ে নিল লোকটার ওই বজ্রমুষ্ঠির থেকে।তারপর বলল... "কেন?ওদিকে আমি গেলে তোমার সমস্যা কি?" ভীত সন্ত্রস্ত কন্ঠে...লোকটা বলে উঠল... ---"সমস্যা আমার নয় বাবু...তবে ওইখানে গেলে আপনার ভয়ঙ্কর বিপদ হবে।নিজের ভালো যদি চান...তাহলে এদিক পানে আর আসবেন না।চলে যান...নিজের জান নিয়ে চলে যান এখান থেকে!" ---"আচ্ছা...হিংস্র জন্তুর উপদ্রব আছে বুঝি?" বলে উঠল ঋক। ---"হিংস্র জন্তু নয়...এখানে লুকিয়ে রয়েছে এর চাইতেও ভয়ঙ্কর বিপদ!তাই তো আমি...আমরা অনন্ত আগুনের তপ্ত প্রদাহের জ্বালায় ছটফট করে চলেছি আজ অব্দি।অনন্তলোকে আজ অব্দি প্রবেশ করার অধিকার নেই আমাদের।আমি চাই না...আমাদের মতো দুর্দশা আর কারোর হোক।আপনি এক্ষুনি এখান থেকে চলে যান।" লোকটার কথা শুনে এইবার বেজায় হাসি পেল ঋকের...আর এতক্ষণে ওর কাছে সবটা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। মনে মনে ভাবল..."আচ্ছা...লোকটা তাহলে বদ্ধ পাগল!তাই রাস্তায় রাস্তায় একা একা ঘুরে বেড়ায় আর যাকে পায় তাকে ধরে উল্টোপাল্টা প্রলাপ বকে। ঋক মনে মনে একচোট হেসে নিয়ে...তারপর ব্যাগ থেকে একটা বিস্কুটের প্যাকেট বার করল...আর সাথে বার করল দুটো একশো টাকার নোট।তারপর লোকটার হাতে দিয়ে বলল..."এই নাও...এটা রাখো...ক্ষিদে পেলে খেয়ে নেবে।" তারপর পা বাড়াল বাংলোর দিকে।রং আর ক্যানভাস গুছিয়ে ছবি আঁকতে বসে যা একখানা বিচ্ছিরি বাধা এল...এতে ওর ছবি আঁকার মেজাজটাই এক্কেবারে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। অগত্যা...ধীরপায়ে ফিরে যাওয়ারই পথ ধরল...। বাংলোয় ফিরে আসার পর থেকেই মনটা কেমন যেন উদাস হয়ে রয়েছে ঋকের।যতবার ও রংতুলি গুছিয়ে বসছে ক্যানভাসের সামনে...ততবারই ওর মন যেন হারিয়ে যাচ্ছে বারে বারে...!বাংলোর এই নিস্তব্ধতায় তো ওকে বিরক্ত করার মতো কেউ নেই...আর ঝড়বৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক কোনো বাধাবিঘ্নও নেই।কিন্তু তা সত্ত্বেও...ওর মনটা কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে বারে বারে।কিছুতেই ও শান্তিমতো আঁকায় মন বসাতে পারছে না। শেষমেষ খানিকটা বাধ্য হয়েই...ও ক্যানভাস ছেড়ে উঠে এল নিজের ঘরে।নিজের মাথাটা দুইহাতে চেপে ধরে বসে রইল খানিকক্ষণ।বাংলোর সমস্ত দেখাশোনা আর রান্নাবান্না করার জন্য একজন চব্বিশ ঘন্টার লোক রয়েছে।তাকেই সে এবার জোরে হাঁক দিল... "নিবারণ কাকা...ও নিবারণ কাকা... আমাকে এক কাপ গরম কফি বানিয়ে দাও তো...!" --- "জ্বি দাদাবাবু...এক্ষুনি বানিয়ে আনছি। " খানিক বাদে নিবারণ কফির কাপ হাতে ঋকের শোবার ঘরের দরজায় টোকা দিল। জড়ানো গলায় ঋক বলে উঠল..."ভিতরে এসো...।" নিবারণ ট্রে থেকে কফির কাপটা ঋকের বেডসাইড টেবিলের ওপর রেখে...আমতা আমতা স্বরে বলে উঠল..."দাদাবাবু...একটা কথা বলব?" কফির কাপের দিকে হাত বাড়িয়ে...সেটা হাতে নিয়ে বলল ঋক..."বলো।" ---বলছিলুম...ইয়ে...মানে...ময়ূরাক্ষী নামের একটি মেয়ের বাবা আজ আপনাকে তাঁর মেয়ের বিয়ের কার্ড পাঠিয়েছেন।ওটা আপনার টেবিলে রাখা রয়েছে।" ---"তো...আমি কি করব?ওই কার্ড হাতে ধেই ধেই করে নেত্য আরম্ভ করব?" প্রচন্ড রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে দুচোখে একরাশ আগুন নিয়ে কথাগুলো বলল ঋক। ঋকের ওই ভয়ঙ্কর রূপ দেখে ক্ষণিকের জন্য একটু থমকে গেল নিবারণ। দুচোখে তেমনই জ্বলন্ত আগুনের রোষানল নিয়ে ফুঁসতে ফুঁসতে ঋক বলল..."শোনো নিবারণ...ওই নামের কোনো মেয়ে সাথে জড়িত কোনো কিছু আমার সামনে আনবে না।ওই নাম মুখে উচ্চারণ পর্যন্ত করবে না।বুঝতে পেরেছ?" এবার বেশ ঘাবড়ে গেল নিবারণ।তারপর আমতা আমতা স্বরে বলে উঠল..."দাদবাবু...বিয়ের কার্ডের সঙ্গে একখানি চিঠিও এসেছে।ওই যে দিদিমনি...যার নাম নিতে আপনি মানা করলেন...তারই লেখা...!" ঋক এবার রীতিমতো গর্জন করে বলে উঠল..."ওইসমস্ত নোংরা আবর্জনা এক্ষুনি আমার সামনে থেকে নিয়ে যাও আর আগুনে পুড়িয়ে দাও।" ভয়ে কাঠপুতুলের মতো কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল নিবারণ। ঋক ফের ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল..."কি হল...হাঁ করে দাঁড়িয়ে রয়েছ কেন?টেবিল থেকে ওইসব হাতে নাও আর আগুনে দাও।যাও।" ঋকের ধমক শুনে এবার তাড়াতাড়ি করে নিবারণ টেবিল থেকে বিয়ের কার্ড আর চিঠির খামটা নিয়ে ঘর থেকে তড়িঘড়ি বেরিয়ে গেল। চোখবন্ধ করে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলল ঋক।মনে মনে বলে উঠল..."শালা...এই এতদূরে চলে এসে রয়েছি নিজের মতো...সেখানেও স্বস্তি নেই!" কফির কাপে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে ও ফের বন্ধ করল চোখ।এবার আস্তে আস্তে ওর চোখে ভেসে উঠতে শুরু করল একটা দৃশ্য।হ্যাঁ...এই দৃশ্য ওর চেনা।গতকালই তো এই জায়গার একেবারে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিল সে!ওই পাহাড়ী গুহার সুড়ঙ্গের ওই দৃশ্যখানি এখন ওর বন্ধ চোখের অন্তর্দৃষ্টিতে একেবারে জীবন্ত হয়ে উঠতে শুরু করেছে।ওই গুহার ভিতরে একটা কিছু রয়েছে...যা ওকে ভীষণভাবে টানতে আরম্ভ করেছে।কোনোকিছুতেই আর মন বসানো সম্ভব হচ্ছে না।গরম কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে ও মনস্হির করে ফেলল...কাল সকালেই একবার সেখানে যেতেই হবে।আর অদ্ভুত ব্যাপারটা ঘটল সাথে সাথেই! সঙ্গে সঙ্গে যেন কানের কাছে কেউ যেন ফিসফিস করে বলে উঠল..."আয়...আয়...আয়...!" প্রচন্ডভাবে চমকে গিয়ে ঋক তাকাল চারপাশে।কই...কেউ কোথাও নেই! পরক্ষণে ঋক সামলে নিল নিজেকে।এ নিশ্চয়ই মনের ভুল।ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল...ঘড়ির কাঁটা এখন প্রায় নটা ছুঁইছুঁই।এখন আর আঁকাটাকা হবে না।কম্বলটা খুলে নিয়ে তার ভিতরে একখানি বই নিয়ে ঢুকে গেল ঋক।তারপর বড় আলোটা নিভিয়ে...ছোট নাইটল্যাম্পটা জ্বালিয়ে নিল।মনে মনে ঠিক করল...আজ আর রাত না করে তাড়াতাড়ি খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়াটাই শ্রেয় হবে। দৃশ্য তিন রাত গভীর।হঠাৎ করেই ধড়ফড় করে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল ঋকের।চারপাশে তাকিয়ে দেখল ঋক...জানলা দিয়ে গোল থালার মতো পূর্ণিমার চাঁদটা একটা মোহময় স্নিগ্ধতার আবেশে জড়িয়ে রয়েছে যেন।একটা মিষ্টি সুগন্ধ ভেসে আসছে যেন নাকে। "এত সুন্দর একটা মায়াবী রাতে...মড়ার মতো বিছানায় শুয়ে আছিস কেন রে বোকা...ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে আয়...আয়...!" কে যেন ফিসফিস করে ওর কানের কাছে বলে উঠল ফের।সর্বাঙ্গে যেন কাঁটা দিয়ে উঠল ঋকের।ও মন্ত্রমুগ্ধের মতো বিছানা থেকে নেমে এল।তারপর এক পা এক পা করে নেমে এল নীচে।সদর দরজার সামনে চলে এল।তারপর খুলে ফেলল বাংলোর সদর দরজাখানি।কোনো এক অমোঘ...দুর্নিবার টান যেন ক্রমাগত ওকে হাতছানি দিয়ে ডেকে চলেছে।যে ডাক উপেক্ষা করার কোনো ক্ষমতাই নেই ওর।এক পা এক পা করে এগিয়ে চলেছে ঋক...অজানা কোনো গন্তব্যের দিকে...! কোনো এক অমোঘ শক্তি... যেন আঙুলে সুতো পেঁচিয়ে...সেই সুতোয় বাঁধা পুতুলের মতোই নিজের মতো করে...সন্তর্পনে একটু একটু করে ঋককে নিজের দিকে টেনে নিচ্ছে সকলের অজ্ঞাতে।ঘুমের চাদরে মোড়া এই দুনিয়ার বুকে ঘটে চলেছে এক অপার্থিব ঘটনা...যা মানুষের বুদ্ধি ও ব্যাখ্যার পুরোপুরি উর্দ্ধে।ঋকের বন্ধ দুচোখে ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে...বুনো জঙ্গলে পরিপূর্ণ একখানি রাস্তা।আর সেই রাস্তার সামনে ক্রমাগত একটি নারী ছায়ামূর্তি হাতছানি দিয়ে ওকে পথ দেখিয়ে চালিত করে চলেছে তার নিজের গন্তব্যে।ঋকের কানের কাছে মূহুর্মূহু ভেসে উঠতে থাকল এক চাপা ফিসফিসানি..."আয়...আয়...আয়...!" আর ততই যেন আরো দ্রুতগতিতে ও ওই হাতছানি অনুসরণ করে সামনের দিকে এগোতে থাকল দ্রুতপায়ে...! দৃশ্য চার আস্তে আস্তে তন্দ্রাটা কাটতে শুরু করেছে ঋকের।চোখ মেলে ও তাকাল চারপাশটায়।আর সাথে সাথে ও চমকে উঠল ভীষণভাবে।এ কোথায় শুয়ে রয়েছে সে!এ তো একটা অন্ধকার কুঠুরি!কিন্তু অন্ধকার হলেও...চারপাশটা...একটা উজ্জ্বল সাদা আলোয় ভীষণভাবে ঝলমল করছে আর সেই আলোয় ও চারপাশটা একদম স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।নরম বিছানা ফেলে কিভাবে এই শ্যাওলা পড়া পিচ্ছিল পাথরের গায়ে শুয়ে এতক্ষণ ধরে মড়ার মতো ঘুমিয়েছিল সে...কিছুতেই সেটা ভেবে পেল না ঋক।একটা পাহাড়ী গুহার ভিতরে এখন ও রয়েছে...এটা স্পষ্ট বুঝতে পারছে ঋক।কাছেই কুলকুল করে বইছে প্রাকৃতিক জলধারার অনর্গল স্রোত।চারপাশটা কিরকম ভ্যাপসা হয়ে রয়েছে আর চারদিকে শ্যাওলা পড়ে রয়েছে।কিভাবে এই গভীর সুড়ঙ্গে এসে পড়েছে ঋক...এটা কোনোমতেই মনে করতে পারছে না ঋক।দুইহাতে নিজের মাথাখানি চেপে ধরল প্রবল অসহায়তার সঙ্গে। কিছুক্ষণ এভাবে কাটার পর ও বুঝতে পারল...এখন এখান থেকে বেরোনোর রাস্তাটা খুঁজে বার করতে হবে।এখন এইটাই হল ওর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।গা হাত পা ঝেড়ে উঠে দাঁড়াল ঋক।চারপাশটা ভালো করে দেখে নিল একবার।নাঃ...এই জায়গাটা তো বেশ বড় আর প্রশস্ত তো বটেই...তার সাথে খুবই জটিল।বাইরে বেরোনোর পথটা এত সহজে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে না।ও হেঁটেচলে...ঘুরে ঘুরে জায়গাটা দেখতে শুরু করল ভালো করে।অনেক্ষণ ঘোরাঘুরি করার পর ওর বোধগম্য হল...এটা আসলেই একটা কোনো উপাসনা করার জায়গা।অত্যন্তই প্রাচীন।কতযুগ ধরে যে এখানে মানুষের পা পড়েনি...বলা শক্ত।এই পুরো জায়গাটা একটা উজ্জ্বল আলোয় একেবারে আলোকিত হয়ে রয়েছে।আর এই আলোর উৎস যে ত্রিকোণ বস্তুটি...সেটা ভালোভাবেই দেখতে পাচ্ছে ঋক।ওর হাতের কড়ে আঙুলের মাপের একখানি ছোট্ট ক্রিস্টাল যেটি ভূগর্ভস্হ এই অদ্ভুত জায়গাটির একেবারে কেন্দ্রস্হলে অবস্হান করছে।যত সময় যেতে থাকল...ঋক ততই যেন কেমন মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়তে আরম্ভ করল।এখান থেকে বেরোনোর চিন্তা ওর মাথা থেকেই ক্ষণিকের জন্য বেরিয়ে গেল।ও অবাক বিস্ময়ে চারদিকটা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল আর ভাবতে লাগল...এত সুন্দর অপূর্ব কারুকার্যখচিত জায়গাখানি তৈরি করিয়েছে কে?কতদিন আগে?তার উদ্দেশ্যই বা কি ছিল!একরাশ বিস্ময় যেন ক্রমে ঘিরে ধরতে আরম্ভ করল ওকে।এক পা এক পা করে ও এইবার ক্রিস্টালটার দিকে এগিয়ে এল।কি দিয়ে তৈরি এই ক্রিস্টাল।এই ছোট্ট ক্রিস্টাল থেকে যেভাবে আলো ঠিকরে বেরিয়ে চারদিকটা একেবারে আলোয় ভরিয়ে রেখেছে...তাতে...এটা যে আসলেই কোনো বহুমূল্য রত্ন...তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশই নেই।ধীরপায়ে এগিয়ে এসে ও এবার হাত বাড়াল ক্রিস্টালটির দিকে।ওর হৃৎপিন্ডে একটা কাঁপুনি দিয়ে উঠল।ওর মনে হল...ওর পায়ের তলার মাটিটা যেন হঠাৎই প্রবলভাবে দুলে উঠল।কিন্তু ওই ছোট্ট ক্রিস্টালটির মধ্যে রয়েছে এক দুর্নিবার আকর্ষণ...যাকে ক্রমাগত ওকে টেনে চলেছে নিজের অভিমুখে।হঠাৎ করেই...এক ঝলকের মধ্যে ওর গতরাতের ঘটনাগুলো ভাসাভাসা হয়ে ওর মনের ভিতরে আলোছায়ার মতোই লুকোচুরি খেলতে শুরু করল ।হ্যাঁ...গককাল তো রাত্রে তো বিছানায় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল ও...ধড়ফড় করে ঘুমটা ভেঙ্গে যায় হঠাৎ।আর তারপর সারা শরীরে...সমস্ত শিরায় শিরায়...যেন অনুভূত হতে শুরু করে একটা প্রচন্ড টান।সে টান উপেক্ষা করার মতো ক্ষমতাই ছিল না ওর!কিন্তু তারপর...তারপর কি হয়েছিল!কিভাবে ও এসে পড়ল এই নির্জন সুড়ঙ্গের গুপ্ত উপাসনালয়ে!না...না...কিছুতেই মনে করতে পারছে না ঋক।কিন্তু ও একটা জিনিস স্পষ্ট বুঝতে পারছে।গতরাতে যে টান ও অনুভব করতে শুরু করেছিল হঠাৎ করে...এই ক্রিস্টালটির কাছে আসবার পরেই সেটা পরিপূর্ণতা পেয়েছে।এত সুন্দর উজ্জ্বল একটা ক্রিস্টাল...এইভাবে জনমানুষের অজ্ঞাতে এইভাবে পড়ে রয়েছে...আর সেটা এখন ওরই হাতের সামনে রয়েছে!মনে মনে প্রবল আনন্দিত হল ঋক।হাত বাড়িয়ে ক্রিস্টালটা হাতে তুলে নিল।আর সাথে সাথে একটা দমকা হাওয়া যেন হঠাৎ মুক্তির উল্লাসে প্রবল গতিতে উথালপাথাল করতে শুরু করে দিল ওর চারপাশে।একটা ক্ষীন অট্টহাসির শব্দ যেন চারপাশের দেওয়াল চিরে বেরিয়ে আসতে উদ্যত হল ভীষণভাবে!" দৃশ্য পাঁচ "দাদাবাবু...আপনি কোথায় গিয়েছিলেন?সকাল থেকে আপনাকে কত খুঁজলাম...ভয়ে আমার এখনো হাত পা কাঁপছে।" নিবারণের মুখে এমনধারা কথা শুনে বেশ খানিক অসন্তুষ্টই হল ঋক।গম্ভীর গলায় বলে উঠল..."এত হাত পা কাঁপাকাঁপির কি আছে!আমি কি বাচ্চা ছেলে নাকি...যে ঘর থেকে একা বেরোলে আমি হারিয়ে যাব!" ---"না...মানে ইয়ে...আপনি যদি জুতো পরে বেরোতেন...আমি চিন্তা করতুম না...কিন্তু আপনি তো ঘুমের মধ্যে বেরিয়ে গিয়েছিলেন!" ---"তো?" কটমট করে তীব্র একটা রাগের দৃষ্টি নিক্ষেপ করল এবার ঋক।বলে উঠল..."আচ্ছা...তুমি কি আমার আয়া নাকি আমি তোমার অভিভাবকত্বে এখানে রয়েছি...ঠিক করে বলো তো...আমার মা...আমার দেখাশোনা যাতে ভালোভাবে হয়...সেই কারণে আমার মামার বাড়ির গৃহকর্ম থেকে তোমায় অব্যহতি দিয়েছেন আর আমার সাথে পাঠিয়েছেন।এর মানে এই না...যে তুমি নিজেকে আমার গার্জেন ভাবতে আরম্ভ করে দেবে আর আমার গতিবিধির জবাবদিহি চাইতে শুরু করবে।নিজের অধিকারের সীমা বুঝতে শুরু করো এখন থেকে...নইলে কিন্তু ফল ভালো হবে না!" বেশ ঝাঁঝের সঙ্গেই কথাগুলো বলে হনহন করে ভিতরে ঢুকে নিজের ঘরে গিয়ে সশব্দে দরজা বন্ধ করে দিল ঋক।নিবারণ অবাক বিস্ময়ে...স্হির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ!মনে মনে বলে উঠল... "দাদাবাবু...আমি তোমাকে জন্মাতে দেকিচি।তোমার মা...তোমার মামা মাসিরা তোমায় যতখানি ভালোবাসেন...তার চাইতে আমি কিছু কম ভালোবাসি নে!আমার মন বলছে...এই রুদ্রমূর্তি তোমার নয়।এই রাগের আড়ালে একটা তো কিছু রয়েছে।তোমার মা তোমাকে দেখে রাখবার জন্যি আমায় এখানে তোমার সঙ্গে পাঠিয়েছেন।সে দায়িত্ব আমি ঠিক পালন করে যাব...সে তুমি যতই আমায় গালমন্দ করো না কেন...!" এই বলে চোখ মুছতে মুছতে নিবারণ চলল রান্নাঘরের দিকে...সকালের জলখাবার তৈরি করার জন্য। সপাটে দরজা বন্ধ করে...আর কোনোদিকে না তাকিয়ে...সাথে সাথে চটপট করে শোবার ঘরের সমস্ত দরজা আর জানলাগুলো বন্ধ করে ফেলল ঋক...মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই।এই উজ্জ্বল সকালেও...ঋকের ঘর এখন একেবারে ঘুটঘুটে অন্ধকার।ঋকের বুকের ভিতরে যেন কেউ হাতুড়ি পিটছে এখন।উত্তেজনা আর যেন বাঁধ মানতে চাইছে না কোনোমতে।দরজা জানলা সব বন্ধ করে নিয়ে এইবার ও পকেট থেকে সন্তর্পণে বার করে ফেলল সেই অদ্ভুত বস্তুটি।জিনিসটা পকেট থেকে বার করতেই যেন চোখ ঝলসে উঠল ঋকের!সারা ঘর একেবারে আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল নিমেষে!গতকাল থেকে ওর সাথে যা যা ঘটে চলেছে...তার সবটা কিনারা করে উঠতে এখনো যদিও অপারগ ঋক...কিন্তু কিছু কিছু ও বুঝতে শুরু করেছে।গতকাল রাত্রে যে এই শোবার ঘরে...ঘুমন্ত অবস্হাতেই চলতে শুরু করেছিল ঋক...আর চলতে চলতে পৌঁছে গিয়েছিল সেই ভূগর্ভস্হ গুহার ভিতরের গুপ্ত সুড়ঙ্গের অভ্যন্তরে...যে গুহার সামনে গতকাল সন্ধ্যাবেলাতেই ও দাঁড়িয়েছিল!আর ঘন কুয়াশার মতোই ওর মনের ভিতরে একটু একটু করে পুঞ্জীভূত হতে শুরু করেছিল একটা দুর্নিবার কৌতূহল!সেই গুহার ভিতর হতে বাইরে বেরিয়ে আসবার পর সমস্তটা বুঝতে পারে ঋক।কিন্তু মাঝরাতে...ঘুমের ভিতরে নিজের বিছানা থেকে উঠে কি করে এই গুহার ভিতরে এসে পৌঁছালো...তার কোনো কূলকিনারাই করে উঠতে পারছে না ঋক।কিন্তু এখন আর কিভাবে কি হল...সেসব নিয়ে মাথা ঘামানোর মন ওর আদৌ নেই।ওর এখন চোখ আটকে রয়েছে শুধুমাত্র...সুড়ঙ্গের ভিতরের ওই গুপ্ত...প্রাচীন উপাসনালয় থেকে সাথে করে নিয়ে আসা এই আশ্চর্য ক্রিস্টালটির দিকে।এত সুন্দর একখানি জিনিস...শুধু ও কেন...এই গোটা পৃথিবীতে আর কেউ চাক্ষুষ করেছে কিনা সন্দেহ!জানলা দরজা বন্ধ হয়ে থাকা অন্ধকার ঘরখানি ওই ছোট্ট ক্রিস্টালটি একেবারে আলোয় ভরিয়ে তুলেছে! ক্রিস্টালটা হাতে নিয়ে ভালো করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগল ঋক।ক্রমেই ও কেমন যেন মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়তে শুরু করল।বাতাসে যেন ভেসে উঠতে শুরু করেছে একটা চাপা ফিসফাস শব্দ...অনুভব করল ঋক।হঠাৎ এইসবকিছুকে ছাপিয়ে...দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হল জোরে জোরে! "দাদাবাবু...আপনার জন্য গরম গরম লুচি আর আলুর দম করেছি।তাড়াতাড়ি খেয়ে নিন...ঠান্ডা হয়ে যাবে...!" ঘোর থেকে এক ঝটকায় বাইরে বেরিয়ে এল ঋক।বেশ খানিকটা অসন্তুষ্টও হল।কিন্তু তার পরক্ষণেই ও নিজেকে সামলে নিল।নাঃ...নিবারণ কাকার ওপরে অযথা রাগ দেখিয়ে লাভ নেই।মা তো নিয়ম করে নিবারণ কাকাকে ফোন করে সব খোঁজখবর নেন।যদি শোনেন...কোনো কারণে ঋক মাথা গরম করছে...তাহলে অযথা জটিলতা সৃষ্টি হবে।একা নিজের মতো করে কাটানোর এই স্পেসটুকু এখন সবচাইতে বেশি প্রয়োজন এখন ওর।নিবারণ কাকার কথায় দুশ্চিন্তা করে..মা যদি হঠাৎ এখানে আসবার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেন...তাহলে ওর একূল ওকূল দুকূলই যাবে।এর চাইতে নিবারণ কাকাকে তার মতো করে ম্যানেজ করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।আর মাথা গরম করল না ঋক।ও চটপট করে ক্রিস্টালটা লুকিয়ে ফেলল।তারপর ঠান্ডা গলায় সাড়া দিল নিবারণ কাকার ডাকে..."হ্যাঁ...এই তো...দরজা খুলছি...।" দরজা খুলতেই ঋক দেখল...নিবারণ কাকা ওর দিকে কেমন একটা সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে।যেন একটা কোনো গন্ডগোলের গন্ধ নাকে অনুভব করতে পারছে সে...আর সেটার উৎসস্থল খুঁজে বার করার জন্যই...ঘরের আনাচ কানাচ সার্চ করবার জন্য তৎপর হয়ে উঠেছে।এই ব্যাপারটা যে ঋকের জন্য মোটেই সুখকর কোনো বার্তাবহনকারী নয়...এটা এখন ও মর্মে মর্মে অনুধাবন করতে পারছে।এখআ এই প্রাসাদতুল্য এই নির্জন ফাঁকা বাংলোয় ও নিজের মতো একা একা বেশ আছে।এই একাকীত্বের অনন্য সুখটুকুতে নিজের মাও এখন যদি এসে ভাগ বসাতে চান...সেটা কোনোমতে বরদাস্ত করা যাবে না।অগত্যা এখন নিবারণ কাকাকে পট্টি পরিয়ে...আর মাখন লাগিয়ে রাখা ব্যতীত আর কোনো উপায়ই নেই। ঋক নিবারণ কাকার হাত থেকে লুচি আর আলুর আদমের প্লেটখানি নিয়ে নিল নিজের হাতে...তারপর মুখে বেশ নিশ্চিন্তি মাখানো স্নিগ্ধ হাসি নিয়ে ও বলে উঠল..."লুচি আর আলুর দম করলে আজ নিবারণ কাকা!ওঃ...তুমি গ্রেট...তোমার কোনো তুলনা হয় না।এই জন্যই তো মা আমার দেখভাল করার জন্য তোমায় পাঠিয়েছেন...তুমিই ভালো করে জানো...আমার কি পছন্দ!" এই বলে...প্লেট থেকে খপ করে লুচি ছিঁড়ে...খানিকটা আলির দম মাখিয়ে...গপ করে মুখে পুরে দিল ঋক। ---"উমমমম....জাস্ট সুপার্ব!" তারপর নিবারণ কাকার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল..."নিবারণ কাকা...আমি তো খাচ্ছি...এইবার তুমি গিয়ে খেয়ে নাও যাও...বেলা অনেক হল।" এই বলে ঋক প্লেটখানি হাতে নিয়ে...দরজা খোলা রেখেই...রান্নাঘরের সামনে...ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসে পড়ল জলখাবারটা শেষ করার জন্য।ওর ঘরের দরজা হাট করে খোলা।খেতে খেতে ঋক বলে উঠল...আজ তোমার সময় হলে...আমার ঘরখানা একটু ঝেড়েপুঁছে পরিষ্কার করে রেখো তো...আমি তো ছবি আঁকা নিয়েই ব্যস্ত থাকি...ঘরটা এত অগোছালো হয়ে রয়েছে...যে চোখে দেখার মতো নয়।" কথাটা বলে আড়চোখে ঋক তাকাল নিবারণ কাকার দিকে।ও ভালো করেই জানে...এখন যদি ঘরখানা নিবারণ কাকার জন্য পুরোপুরি ও খুলে দেয়...তাহলেই নিবারণ কাকার মন থেকে সমস্ত সন্দেহ মুছে যাবে।আর এরপর মা যদি ফোন করে এখানকার খোঁজখবর জানতে চান...তাহলে তিনি পুরোপুরিই নিশ্চিন্ত হবেন।তল্পিতল্পা গুটিয়ে এখানে চলে আসার চিন্তা তাঁর মাথায় আর আসবে না।আর আসল জিনিসটা তো ঋক ইতিমধ্যেই নিজের পকেটস্থ করে নিয়েছে।ছোট্ট একটা ক্রিস্টালের জন্য বড় কোনো ঝঞ্ঝাট চাগাড় দিয়ে ওঠার মতো সমস্ত সম্ভবনা ও এইভাবে চুরচুর করে দিয়ে এইবার বেশ খানিকটা শান্তি অনুভব করছে ঋক।এই ছোট্ট ক্রিস্টালটা যে আসলেই ওর অস্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গিয়েছে...এই ব্যাপারটা দ্বিতীয় কারোর না জানাই সর্বদিক হতে কাঙ্খিত। দৃশ্য ছয় রাত গভীর!ছবি আঁকার ঘরে এখন একমনে ছবি আঁকায় মগ্ন ঋক।ওর ছবি আঁকার ঘরখানি এতটাই বড়...যে সেটি প্রায় একটি হলঘরের সমান।ওই ঘরের একটা পাশে ঋক ওর ছবি আঁকার সমস্ত সরঞ্জাম ও ক্যানভাস নিয়ে বসে প্রতিদিন।দিনের মধ্যে বেশীর ভাগ সময়...ওর এই ঘরের ভিতরেই কেটে যায়।খুব বেশিদিন হয়নি...এখানে এসেছে ঋক...যে কদিন ও এখানে ছিল সেই তুলনায় বেশ অনেকগুলো তেলরং করা অপূর্ব চিত্র ওর তৈরি করা হয়ে গিয়েছে।সেগুলি এই ঘরের একখানি কোণা অলঙ্কৃত করে রয়েছে রাজকীয়ভাবে।আর তারই পাশে...এখন ঋক রংতুলি নিয়ে মগ্ন নতুন কোনো অপূর্ব চিত্র সৃষ্টি করার প্রয়াসে...!" কিন্তু সবচাইতে অদ্ভুত ব্যাপার যেটা...সেটা হল...এখন এই ঘরে ঋক কোনো আলো জ্বালেনি।কিন্তু তা সত্ত্বেও এই ঘরের প্রতিটি কোণায় কোণায় যেন ঠিকরে উঠছে...বলা ভালো...রীতিমতো গর্জে উঠেছে একখানি তীব্র উজ্জ্বল সাদা আলো।ওই আলো নির্গত হচ্ছে যে উৎস থেকে...সেটি আর কিছুই নয়...ঋকের সঙ্গে থাকা ওই অদ্ভুত ক্রিস্টাল! ঋকের মস্তিষ্ক তো ওকে বলছে...এই ক্রিস্টালটা যত সুন্দরই হোক...এটা আখেরে একটা নির্জীব বস্তুভিন্ন আর কিছুই নয়।কিন্তু ঋকের অন্তরাত্মা যেন প্রতি মূহুর্তেই ওর কানে কানে চাপা স্বরে...ফিসফিসিয়ে বলে চলেছে...এই ক্রিস্টালটি নিছকই কোনো জড়বস্তু নয়...!এর ভিতরে যেন রয়েছে প্রাণের চাপা অস্তিত্ব...যা প্রতিনিয়ত যেন ছটফট করে চলেছে আত্মপ্রকাশের জন্য! ঋক এখন আঁকার ঘরে দরজা বন্ধ করে মগ্ন ছবি আঁকা তে।ও সাদা ক্যানভাসের গায়ে ফুটিয়ে তুলছে একটি নারীর অবয়ব...একরাশ উন্মত্ততা নিয়ে!ওর নেশাতুর আঙুলের কারিকুরিতে দ্রুতবেগে জীবন্ত হয়ে উঠতে শুরু করেছে একটি কামুক নারীর অর্ধনগ্ন অবয়ব।এমন ছবি...আগে কখনো আঁকেনি ঋক।কিন্তু আজ ওর অঙ্গুলিসঞ্চালনের দ্রুততার তীব্র ফল্গুধারার সাথে সাথে ক্যানভাসের গায়ে দ্রুতগতিতে জেগে উঠতে শুরু করেছে...এবং জীবন্ত হতে আরম্ভ করেছে দুটি কামোদ্দীপক আগুন চোখ...যার লেলিহান শিখায় অকাতরে আত্মাহুতি দিতে রাজী হবে যেকোনো পুরুষ! বিকশিত হতে শুরু করেছে গলিত...তপ্ত মোমের মতো কায়া...যার স্পর্শ পাওয়ার তৃষ্ণায় ব্যাকুল হয়ে...যেকোনো পুরুষ পিছলে যাবে কোনো অতল গহ্বরে...! এক একটি ছবি শেষ করতে...ঋকের মাসখানেক মতো সময় লাগে।কিন্তু কি অদ্ভুত ব্যাপার...!মাত্র এক ঘন্টা আগেই যে ক্যানভাস পুরোপুরি অব্যবহৃত ছিল...এখন তার ভিতরে যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে তেল রংএ অঙ্কিত এক পূর্ণযৌবনাদ্দীপ্ত কামুক নারী।সে যেন ওই ক্যানভাসের আবরণ ছিঁড়েখুঁড়ে বেরিয়ে আসতে মরিয়া!তুলি যদিও ছিল ঋকেরই হাতে...কিন্তু এই ছবি যেন ঋকের নিজস্ব অঙ্গুলিচালনার প্রতিচ্ছবি নয়...কোনো এক অপার্থিব শক্তি...যেন ওর হাত দিয়ে এই ছবি সৃষ্টি করিয়ে নিয়েছে।ছবি আঁকা শেষ করে...এবার ঋক ক্যানভাসের দিকে তাকিয়ে রইল এক অপার বিস্ময় নিয়ে!এ সে কি সৃষ্টি করল এইমাত্র!সত্যি বলতে কি...রংতুলি হাতে নিয়ে যখন ছবি আঁকা আরম্ভ করেছিল সে...তখন কিন্তু ওর মনে চিত্রের সম্পূর্ণ অন্য একটি খসড়া ফুটে উঠেছিল...যেখানে কোনো মানুষের অস্তিত্বই নেই।পাহাড়ী প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে নিজের দুইহাতে কয়েদ করতে গিয়েছিল সে ক্যানভাসের গায়ে...এইমাত্র...।মাথায় ছিল সম্পূর্ণ অন্য একটি চিত্র...আর হাতে ফুটে উঠল অন্য ছবি!এ কি করে সম্ভব!ঋক পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল ক্যানভাসের সামনে।এইমাত্র ওর হাতের অঙ্গুলিসঞ্চালনে...ক্যানভাস জুড়ে প্রতীয়মান হয়ে উঠেছে যে নারী...সে যেন ভীষণভাবে জীবন্ত...কামক্ষুধার তৃষ্ণাজনিত তাড়নায় সে যেন ভীষণভাবে ব্যাকুল!যেন এক্ষুনি সে ক্যানভাসের ওই নিষ্প্রাণ আবরণখানি ছিঁড়েফুঁড়ে দিয়ে...ক্যানভাস ফুঁড়ে জীবিত হয়ে ওঠার জন্য হয়ে উঠেছে মরিয়া!ঋক এবার তাকাল সদ্য অঙ্কিত নারী অবয়বটির চোখের দিকে।ওই চোখে যেন ক্ষণে ক্ষণে উথলে উঠছে এক দুর্নিবার তৃষ্ণার আগুন!ঋকের ক্রমশ মনে হতে শুর করেছে...দুনিয়া জগৎ ভুলে ওই আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মাহুতি দেওয়াতেই তার মোক্ষলাভ!ওই গলিত মোমের মত তপ্ত শরীরখানি যেন প্রতিটি মূহুর্তে হাতছানি দিয়ে ডাকছে ঋককে...! সেই ডাক উপেক্ষা করার কোনো ক্ষমতাই ওর নেই।আস্তে আস্তে ঋক মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল।অতল নিদ্রা ক্রমশ গ্রাস করতে শুরু করল ঋককে। দৃশ্য সাত ---"হ্যালো...নিবারণ কাকা...?" ---"হ্যাঁ গো দিদিমনি...বলো...।" ---"ঋক এখন কি করছে?ও ঠিক আছে তো?" ---"হ্যাঁ গো দিদিমনি...তুমি কোনো চিন্তা কইরো না।দাদাবাবু কালকে রেতে ঘুমের মধ্যে কোথাও চলে গিয়েছিলেন...কিন্তু সকালে ঠিক ফিরে এসেছেন।একদম সুস্হ স্বাভাবিক।কোনো অস্বাভাবিকতাই নেই।তারপর তো খাওয়াদাওয়া সবই ঠিকঠাকভাবে করলেন।আর আমি যতটুকু বুঝলুম...এখন আর কোনো সমস্যাই নেই।দিব্যি হাসিখুশিই রয়েছেন সারাটাদিন।এখন আঁকার ঘরে গেছেন ছবি আঁকতে।তুমি বেশি চিন্তা কইরো নে দিদিমনি...দাদাবাবু আজকে না হলেও...কাল ঠিকই বুঝতে পারবেন সবটা।" ---"নিবারণ কাকা...আমার পাঠানো চিঠিটা ও আজও খুলে দেখল না তাই না?" বিপরীত প্রান্ত থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে...এবার বাচ্চা মেয়ের মতোই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল ময়ূরাক্ষী।কান্নাভেজা কন্ঠে ও বলে উঠল... ---"ও ভাবল কি করে...যে আমি ওকে ফেলে অন্য কাউকে বিয়ে করে নেব...!আমি যে কিভাবে আমার বাবার কাছ থেকে পালিয়ে গিয়ে একটা হোস্টেলের ব্যবস্হ করে...একা পড়ে রয়েছি...সে খবরটা যে ওকে দেব...সেই উপায় পর্যন্ত নেই আমার।ফোন...ফেসবুক...সবকিছুতে আমায় ব্লক করে রেখে দিয়েছে।" কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল ময়ূরাক্ষী। নিবারণ কাকা বলে উঠল... ---"আসলে দিদিমনি...ভুলটা আমারই হয়েছে।যেদিন তোমার চিঠিখান আর তোমার বাবার পাঠানো বিয়ের নেমন্তন্নের কার্ড একসাথে এসে পৌঁছেছিল এখানে।আমি তো তখন এতকিছু জানতুমও না ছাই।তোমার নামটাও প্রথম জেনেছিলাম ওইদিনেই।ফড়ফড় করে দাদাবাবুকে সবটা বলে ফেলেছিলুম...কে তাঁকে বিয়ের নেমন্তন্নের কার্ড পাঠালে...আর কে পাঠালে চিঠি...!আমার মুখে এইসব শুনে তিনি রাগে আর ওইগুলো ছুঁয়ে পর্যন্ত দেখলেন না।এখন কপাল চাপড়াই আমি...সেদিন যদি তোমার ওই চিঠিখানির খামের ওপর থেকে কায়দা করে তোমার নামটা মুছে দিতে পারতুম...তো দাদাবাবু তোমার চিঠিখানি খুলে পড়তেন।তিনি বুঝতেন...তিনি যেমনটা ভাবছেন...আসলে তেমন কিছুই ঘটেনি।এইভাবে নিজের শহর...নিজের ঘর ছেড়ে এইখানে পড়েও থাকতেন না।আমার একটা ভুলেই পরিস্থিতি আরো ঘোরালো হয়ে গেল...!" ---"নিবারণ কাকা...তুমি নিজেকে দোষারোপ কোরো না...কপালে যা আছে সেটা আমরা আর খন্ডাই কি করে বলো...।তবে এটা সত্যি...একমাত্র মৃত্যু ছাড়া...পৃথিবীর আর কোনো শক্তিই আমাকে ঋকের থেকে আলাদা করতে পারবে না।ও আজ বুঝছে না...কিন্তু কাল ঠিকই বুঝবে।তুমি শুধু ঋককে ভালোভাবে দেখেশুনে রেখো...।" ---"হ্যাঁ মা...আমি এখানে থাকতে দাদাবাবুর যত্নের কোনো ত্রুটি হবে না।তুমি চিন্তা কোরো না মা...আমি সবসময়ই তোমার সাথে যোগাযোগ রাখব আর দাদাবাবুর খবর জানাব।" ---"ঠিক আছে নিবারণ কাকা।এখন রাখছি তাহলে।" আস্তে আস্তে ঋকের তন্দ্রাটা ভাঙতে শুরু করল।চোখ মেলে তাকাতেই ঋক প্রবলভাবে আঁতকে উঠল।এ সে কি দেখছে!ভালো করে চোখদুটো একবার কচলে নিল ঋক।নাঃ...কোনো ভুল নেই...এখন ও চোখের সামনে যা দেখছে...সেটা মোটেই কোনো অলীক স্বপ্ন নয়।ঘোর বাস্তব!আর তাছাড়া নিজের শরীরে যে কোমল স্পর্শ এখন সে অনুভব করছে...তার নেশাতুর কামুকতার আস্ফালনে যেন টগবগ করে ফুটে উঠতে শুরু করেছে ওর রক্তের প্রতিটি কণা!এখন ওর মন...মস্তিষ্ক...চোখ...সবই অবশেষে এই বাস্তব চিত্রটার সঙ্গে একত্রিত হয়ে গিয়েছে।সম্ভব আর অসম্ভবের পরিখা অতিক্রম করে...ঋক এখন হয়ে উঠেছে ভীষণ রকমের উচাটন।ওর ছবি আঁকার এই ঘরেই...ক্যানভাসের সামনে...মেঝের ওপরে শায়িত অবস্হায়...এখন ওর শরীর ঘেঁষে বসে রয়েছে এক নারী।রক্তমাংসের নারী।সে কিভাবে...কোথা থেকে এল বন্ধ দরজার ভিতরে ঋকের একান্ত নিরালায় শিল্পচর্চার এই সাম্রাজ্যে...সেই প্রশ্নটা এখন পুরোপুরিই উহ্য।আর এই রহস্যের কোনো কিনারা করবারও কোনো অভিপ্রায় নেই ঋকের।ও এখন পরিষ্কার বুঝতে পারছে...ধীরে ধীরে নিজের ওপরে সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারাতে বসেছে ঋক।নিজেকে সমর্পণ করতে শুরু করেছে ওই নারীটির কালোদিঘির মতো টলটলে চোখের অনির্বাচনীয় কামুকতার অতল গহ্বরে! ঋক এটা এখন পরিষ্কার বুঝতে পারছে...ওর শরীর ঘেঁষে বসে থাকা এই নারীটি আর কেউ নয়।খানিকক্ষণ আগে এই মেয়েটিরই প্রতিকৃতি সে ক্যানভাসের গায়ে ফুটিয়ে তুলেছিল একটা ঘোরের ভিতরে।এখন ক্যানভাসের দিকে তাকাল ঋক।ক্যানভাসের ভিতরে মেয়েটির অবয়বটুকুর জায়গা এখন একদম ফাঁকা...সাদা।ওই প্রতিকৃতিই...যে কোনো যাদুবলে রক্তমাংসের শরীর নিয়ে ধরা দিয়েছে ওর সামনে...এ বিষয়ে আর কোনো সন্দেহ রইল না ঋকের।কিছুক্ষনের আগে ক্যানভাসের গায়ে যে অবয়বখানি তেলরঙের চিত্ররূপী এক জড়পদার্থ ছিল...এখন সেই অবয়বটিকে রক্তমাংসের শরীরে সামনে বসে থাকতে দেখে...ঋকের মস্তিষ্ক ক্রমেই দুর্বল হতে শুরু করে দিয়েছে। ওই রক্তমাংসের নারীটিকে এখন সে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছে...আর ক্রমেই সেই তালে তাল মিলিয়ে...ওর রক্তে যেন গর্জে উঠতে শুরু করেছে এক ভয়ঙ্কর তুফান। কামদেবতা যেন ঝড়ের গতিতে এসে ভর করছেন ঋকের ওপরে...আর ঋক ক্রমে সমস্ত চেতনার উর্দ্ধে উঠে গিয়ে নিজেকে সঁপে দিতে শুরু করেছে ওই অলৌকিক কামের অতল গহ্বরে।ক্যানভাস থেকে জীবন্ত হয়ে উঠে আসা ওই কামুক নারীটি আস্তে আস্তে ঋকের ঘাড়ে...হাতের তালুটি রেখে...ওর চুলের ভিতরে আলতো অঙ্গুলিসঞ্চালনের মায়াবী খেলায় মেতে উঠল।ওর মুখের একেবারে সামনে নিয়ে এল নিজের মুখ।ঋক অনুভব করল...ওর কপাল বেয়ে ধীরে ধীরে চিবুকের দিকে নামতে শুরু করেছে মেয়েটার স্নিগ্ধতার পরশ মাখানো তপ্ত শ্বাস।পাগল পাগল লাগতে শুরু করল ঋকের।শেষ পর্যন্ত আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না ঋক।নিজের দুইহাত দিয়ে...এক ঝটকায় মেয়েটাকে টেনে নিয়ে এল নিজের একেবারে সামনে।তারপর আর কালবিলম্ব না করে মেয়েটির সিক্ত অধরে ডুবিয়ে দিল নিজের ঠোঁট।রংতুলি দিয়ে...মেয়েটির শরীরে যে পোশাকের আবরণ সৃষ্টি করেছিল ক্যানভাসে...ওই পোশাকের তন্তুজ প্রতিরূপটিকে...দুইহাত দিয়ে সবলে...একটানে ছিঁড়ে ফেলল ঋক।তারপর নিজের পরনের সূতির জামাখানি খুলে ফেলে...সজোরে ছুঁড়ে ফেলে দিল মেঝেয়।তারপর ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যেতে আরম্ভ করল নিষিদ্ধ কামের অতল সমুদ্রে...! আকাশ ফর্সা হতে আরম্ভ করেছে।পাখিরা জেগে উঠতে শুরু করেছে।একটা ঠান্ডা...সতেজ বাতাস জানলা দিয়ে প্রবেশ করতে শুরু করেছে।বন্ধ দরজার ভিতরে ঋক তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে রয়েছে।গতকাল রাতের আবেশ তখনো কাটেনি ওর।তন্দ্রার ঘোরে ওর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল এক মৃদু শীৎকারের শব্দ।নিজের বাহুপাশে ফের বেঁধে... আলিঙ্গন করতে গেল সেই মায়াবিনী নারীটিকে...! আর সেই চেষ্টা করতে গিয়েই ও ক্রমে টের পেতে শুরু করল...মেয়েটা ওর আশেপাশে নেই।তন্দ্রাটা এইবার এক ঝটকায় কাটিয়ে নিয়ে ঘুম থেকে ধড়ফড় করে জেগে উঠে উঠল ঋক। চারপাশে তাকিয়ে দেখল...না...এ ঘরের ভিতরে ও নিজে ছাড়া আর তো কেউই নেই!ওর বুকের ভিতরে যেন তোলপাড় করে উঠল এক ভীষণ হাহাকার!সারারাত যার সাথে সঙ্গমের উত্তাল জোয়ারে গা ভাসিয়ে উন্মত্ততার শিখরে পৌঁছে গিয়েছিল ঋক... সকাল হতেই সে বেমালুম উধাও হয়ে যাবে... এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না ঋক।ওর মনটা ভীষনভাবে উচাটন হয়ে উঠল।ওর ঘুমের আমেজ খানখান হয়ে গেল এক লহমায়।এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল ঋক। ঋকের এতক্ষণে যুক্তিবুদ্ধি সবকিছু একেবারে লোপ পেয়ে গিয়েছে।ওর নিজেরই হাতে সৃষ্ট ... তৈলচিত্রের একখানি অবয়ব... কিভাবে ওর সামনে জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে...এ নিয়ে কোনো প্রশ্নেরই উদ্রেক হচ্ছে না ওর মনে...! প্রখর মরূভূমির তাপদাহের ভিতরে একটি যন্ত্রনা ক্লিষ্ট... পিপাসার্ত চাতক পাখি যেভাবে ছটফট করে ওঠে... ঋকের অবস্থা এখন একেবারে সেইরকম।ও সশব্দে ঘরের দরজাটা খুলে ফেললো। তারপর বেপরোয়া শিকারীর মতো সারাবাড়ি খোঁজাখুঁজি শুরু করে দিল। সারারাত ঋক যে আঁকার ঘরে ছিল... নিবারণ কাকা সেটা মোটেই জানত না।বেড টি নিয়ে ঘরের দিকে আসতে গিয়ে যখন সে দেখল...ঋক উদ্ভ্রান্তের মতো সারাবাড়ি ছুটে ছুটে কাকে যেন খুঁজে চলেছে প্রাণপণে... তখন সে বেশ খানিকটা ঘাবড়েই গেল। ---"দাদাবাবু... কিছু খুঁজছেন?" ---"একটা মেয়েকে দেখেছ? নীল গাউন পরা একটা মেয়ে?" ---"এই বাঙলোয় মেয়ে!" রীতিমতো চোখ কপালে তুলে বলে উঠলো নিবারণ কাকা। এবার ঋক নিজেকে খানিকটা সামলে নিল।না... নিবারণ কাকাকে এইসব কিচ্ছু জানতে বা বুঝতে দেওয়া যাবে না। গলা খাকারি দিয়ে ঋক বলে উঠলো..."সারারাত আঁকার ঘরে ছবি শেষ করতে করতে ওইখানেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম...কি সব উদ্ভট স্বপ্ন! আমার বেড টি টা দাও তো... মাথাটা বড্ড ধরেছে।" পুরো ব্যাপারটা ঋক চট করে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিল যখন... তখন যেন কথার খই ফুটতে আরম্ভ করলো নিবারণ কাকার মুখে। ---"তোমায় কতবার বলেছি দাদাবাবু... রাত্তির জেগে ছবি এঁকোনি... আমার কথা যদি একটু শুনতে... তাহলে আর ভুলভাল স্বপ্ন দেখতে নি। তোমার জন্যি গরম চা করে আনিছি। নাও ধরো।আর বলো দিকি আজকে কি আনবো?মাছ না চিকেন?" ঋক গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে একটা খোশমেজাজী আবেশ নিয়ে বলে উঠল..."তুমি তোমার যা মন চায় তাই নিয়ে এসো। তোমার হাতের যেকোনো রান্নাই তো সুপার হিট...!" ---"তুমি হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও দাদাবাবু... আমি তোমার জলখাবার নিয়ে আসছি এখন...।" নিবারণ কাকা প্রসন্ন মুখে ঋকের এঁটো চায়ের কাপ আর ট্রে টা নিয়ে চলে গেল রান্নাঘরের দিকে। নিবারণ কাকা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই সাথে সাথে ঋক নিজের ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে নিল। তারপর বাঁ হাতের বন্ধ মুঠোখানি আস্তে করে খুলল। হ্যাঁ... মেয়েটার ফেলে যাওয়া ঝুমকো কানের দুল টা সকালের আলো পড়ে রীতিমতো চকচক করে উঠছে যেন...! নিবারণ কাকার সামনে ঋক প্রতিদিনের মতো স্বাভাবিক আর সাবলীল আচরণ করে পরিস্থিতি ঠিকঠাক রাখলেও... ভিতরে ভিতরে ও প্রচন্ডভাবে উচাটন হয়ে পড়েছে।নিবারণ কাকা ওর সামনে থেকে চলে যাওয়ার সাথে সাথেই...হাতের চায়ের কাপখানা সশব্দে টেবিলে রেখে দুই হাতে মাথাটা চেপে ধরে বসে পড়ল ঋক। ওর উথাল পাথাল মনের ভিতরে এখন উঠেছে এক উদ্দাম ঝড়।মেয়েটা তো সারারাত ওর সঙ্গে ওর ঘরেই ছিল। ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে কোথায় উধাও হয়ে গেল! নাঃ... মেয়েটাকে যেমন করেই হোক... খুঁজে বার করতেই হবে। ঋকের এখন মনে হচ্ছে...রাতের ওই মায়াবিনী আগন্তুক ই যেন ওর প্রাণভোমরা।ওকে যদি আর খুঁজে না পাওয়া যায়! উঃ...আর কিছু ভাবার মতো অবস্থাই এখন আর নেই। যতক্ষণ না ফের সে মায়াবিনী নারীকে নিজের দৃঢ় বাহুবন্ধনে আবৃত করতে পারছে ঋক... ততক্ষণ ওর মনে এতটুকুও শান্তি নেই। নিজের হাতে সৃষ্ট শৈল্পিক অবয়বখানি... ক্যানভাস হতে জীবন্ত রূপ নিয়ে এইভাবে ঋকের সামনে এসে... যৌবনের এক সমুদ্র তৃষ্ণার জন্ম দেবে ওর প্রতিটি রোমকূপ জুড়ে...এ যে কল্পনার ও অতীত! বস্তুত... ময়ূরাক্ষীর কাছ থেকে প্রতারিত হওয়ার পরে... গোটা নারীজাতির প্রতিই সমস্ত অনুভূতি...সম্মান পুরোপুরি মুছে গেছে ঋকের মন থেকে। এখন ঋকের দৃষ্টিতে... নারী শুধুমাত্র স্ফূর্তির সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই না।আর এখন তো... দীর্ঘদিন পরে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতোই... অকস্মাৎ এক নারী শরীরের কামুক স্পর্শ...ওর প্রতিটি রোমকূপে জাগিয়ে তুলেছে পাগল করা তুফান... তখন ঋকের ভিতর থেকে যেন বেরিয়ে আসতে উদ্যত হয়েছে এক ক্ষুধার্ত নেকড়ে। তাকে শান্ত রাখাটাই এখন দুষ্কর হয়ে পড়েছে ঋকের পক্ষে...! নিজের ঘরে ঢুকে ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিল ঋক।ওর ভিতরে যে ছটফটানি টা চলছে... সেটা নিবারণ কাকার কাছ থেকে পুরোপুরি লুকিয়ে রয়েছে রাখতে হবে যেভাবেই হোক...! সকাল থেকে ক্রমশ বেলা গড়িয়ে দুপুর হল। স্নান সেরে নিয়ে দুপুরের আসার করতে বসার সময় হয়ে এল...কিন্তু ঋকের ঘরের দরজা এখনো খোলার কোনো নামগন্ধ নেই! নিবারণ কাকা ঋকের পছন্দের কষা চিকেন কারি আর তার সাথে বাসন্তী পোলাও...আর চাটনি পায়েস রেঁধে... টেবিলে সাজিয়ে...থালায় খাবার বাড়তে বাড়তে চ্যাচাতে শুরু করল..."দাদাবাবু...ও দাদাবাবু...আপনের ভাত বাড়িছি... খেতে আসেন...!" কিন্তু ঋকের কোন সাড়াশব্দই নেই...! আসলে ঋক এখন পরিষ্কার বুঝতে পারছে...এখন নিবারণ কাকার মুখোমুখি হওয়া মানেই বিপদ।নিবারণ কাকা ওকে জন্মাতে দেখেছে বলা চলে।ওকে দেখলেই নিবারণ কাকা ঠিকই বুঝতে পারবে...ঋকের অবস্থা এখন একেবারেই স্বাভাবিক নয়! কিন্তু এইভাবে দরজা বন্ধ করে থাকলে যে আরো ই হিতে বিপরীত হবে! কাজেই এক মন দ্বিধা নিয়ে ঋক দরজাটা খুলল অবশেষে...! ঋকের চোখমুখের অবস্থা দেখে নিবারণ কাকা একটা কিছু আন্দাজ করল। কিন্তু সে এটা বুঝল...ঋককে কোনো কিছু জিজ্ঞাসা করে কোন লাভ নেই।কোনো উত্তর মিলবে না। নিবারণ কাকা আর ঋককে কিছু জিজ্ঞাসা করার মধ্যে না গিয়ে... গম্ভীর মুখে শুধু বলে উঠল..."দাদাবাবু... টেবিলে আপনার খাবার বেড়ে রাখিচি।ঠান্ডা হয়ে যাবে...চলেন... খেতে বসবেন চলেন।" মনে মনে তার একটাই চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকল... এইবার বৈশাখী দিদিমনিকে একটা খবর দিতেই হবে। নিজের মা কে সামনে পেলে... নিশ্চয়ই ঋক দাদাবাবু নিজের মনের সব কথা খুলে বলতে পারবে... যেটা ও এখন শুধু প্রাণপণে চাপার চেষ্টা করে চলেছে...!" খাবার টেবিলে বসে খেতে খেতে ঋক আড়চোখে তাকাচ্ছে বারবার নিবারণ কাকার দিকে।নিশ্চয়ই । নিবারণ কাকা একটা কিছু আঁচ করতে পেরেছে।চুপচাপ বসে খেতে খেতে ঋক ভাবছে... নিবারণ কাকার সামনে এখন যত কম থাকা যায় ততই মঙ্গল।একবার যদি মায়ের কানে কোনোকিছু যায়...তাহলে মা ঠিক চলে আসবেন এখানে।সবকিছু তখন ভেস্তে যাবে পুরোপুরি। ঋক তাড়াতাড়ি করে খাবারটা শেষ করে... হাতমুখ ধুয়ে নিয়ে ঘরে পরার জামাকাপড় বদলে নিল। তারপর ঘরের বাইরে এসে... জোরে হাঁক পেরে বলে উঠল..."নিবারণ কাকা...আমি একটু বেরোলাম... ফিরতে রাত হবে।" মোটামুটি সন্ধ্যার মধ্যেই ঘরে ফিরে এল ঋক। নিবারণ একেবারেই কাকা আশা করতে পারেনি...ঋক ভালো ছেলের মতো দিনের আলো নেভার আগে আগেই ফিরে আসবে ঘরে।এমনিতে এখানে ঋকের চেনা পরিচিত কেউ নেই।আর সেই কারণেই তো নিজের জন্মস্থান থেকে পালিয়ে এতদূরে...এমন এক নিরিবিলি জায়গায় থাকতে আসা...যেখানে কেউ ঋককে চিনবে না... অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য কেউ হামলে পড়বে না।নিজের মত নিশ্চিন্তে সময় কাটানো যাবে।কিন্তু তাই বলে... একটা সম্পূর্ণ অচেনা অজানা জায়গা... যেখানে কেউ চেনে না ঋককে... ঘরের বাইরে কথা বলা বা সময় কাটানোর মতো কেউই নেই... সেখানে ঋক দীর্ঘ সময় ধরে ঘরের বাইরে একা একা ঘুরে বেড়ানোর কি যে রসদ পায়...সে ঈশ্বরই জানেন। ঋকের ভাড়া করা এই বাংলোটা এমনিতেই শহর থেকে অনেকটাই দূরে।এই গ্রাম্য জায়গায় কোন ক্যাফে... শপিং মল কিছুই নেই... যেখানে ইচ্ছামতো ঘুরেফিরে সময় কাটানো যায়...।দিনের আলো নেভার পরে পরে এখানকার স্হানীয় লোকেরা যে যার ঘরে ঢুকে যায়।এমন এক জায়গায়...ঋক ঘরে ঢুকতে রাত নটা... দশটা করে আজকাল প্রতিটা দিন। নিবারণ কাকা তাই আজকাল সন্ধ্যার জলখাবার বানানোর পাট ই চুকিয়ে দিয়েছে কিছুদিন হল। আজ হঠাৎ ঋক সন্ধ্যা ছটা বাজার আগেই কলিং বেল বাজাল যখন... নিবারণ কাকা যথেষ্ট অবাকই হল। ঘরে ঢোকামাত্র ঋক জুতো খুলতে খুলতে বলে উঠল..."নিবারণ কাকা...বড্ড ক্ষিদে পেয়েছে। সন্ধ্যার জলখাবার কি বানিয়েছ?" ---"তুমি তো এই সময়টা ঘরে ফেরো না দাদাবাবু...আজ আগে থেকে বললে পারতে...আমি তাহলে সন্ধ্যার জলখাবার তৈরি করে রাখতুম...।" ---ঠিক আছে ঠিক আছে...ও কোনো ব্যাপার না।ঘরে দই আছে না?" ---হ্যাঁ তা আছে। ---"তাহলে ওই দিন দিয়ে একটু চিঁড়ে মেখে দাও এখন।আর শোনো... টিফিনটা সেরে নিয়েই আমি আঁকার ঘরে ঢুকব।তারপর আমাকে একদম ডাকবে না।আমার রাতের খাবারটা টেবিলে রেখে দিয়ে শুয়ে পড়বে...যদি আমার রাত হয়। বুঝেছ?" ঋকের কথা শুনে হতভম্ব নিবারণ কাকা মাথা চুলকে বলে উঠল..."আচ্ছা ঠিক আছে।" মনে মনে ভাবল... ছেলে দুধের সাথে মুড়ি অথবা দই এর সাথে চিঁড়ে দেখলেই পোঁ পাঁ দৌড় দেয় চিরকাল... সেই ছেলে আজ নিজে থেকে দিল দিয়ে চিঁড়ে খেতে চাইছে! রান্নাঘরে গিয়ে ফ্রিজ খুলে দই বার করতে করতে নিবারণ কাকা ভাবতে লাগল... পরিস্থিতি খুব একটা স্বাভাবিক দিকে যাচ্ছে না। ব্যাপারটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওর বাড়িতে জানাতে হবে...! আঁকার ঘরে দরজা বন্ধ করে ঋক একটা ধবধবে পরিস্কার ক্যানভাস আর সাথে রং তুলি গুছিয়ে বসে গেল... একটা নতুন ছবি আঁকতে।গতকাল রাতে যে অপূর্ব সুন্দর একখানি নারী অবয়ব সে সৃষ্টি করেছিল ক্যানভাস জুড়ে... সেই অবয়বখানি হঠাৎ জীবন্ত রক্তমাংসের নারী তে রূপান্তরিত হয়ে উঠে এক সমুদ্র কাম ক্ষুধা নিয়ে যেভাবে ওর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল...তার রেশ এখনো পর্যন্ত ওর কাটেনি। ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই সেই মায়াবিনী নারীকে আর দেখতে পায়নি ঋক।মেঘ না চাইতেই জল এর মতো হঠাৎ করে ওর পুরুষ শরীর... জীবনে প্রথম পেয়েছিল নারী শরীরের স্পর্শ।ক্ষণিকের ওই নৈসর্গিক নেশাচ্ছন্ন মূহূর্ত বেশিক্ষণ ধরে রাখতে না পারার অব্যক্ত যন্ত্রনাটা ভুলতেই ঋক নতুন করে রং সাজিয়ে তুলি হাতে ধরেছে এখন। কিন্তু শত চেষ্টা করেও... কিছুতেই আঁকায় মন বসাতে পারছে না ঋক।ওর মনের ভিতর থেকে কে যেন ফিসফিসিয়ে বলছে বারে বারে..."একজনকে হারিয়েছিস বলে দুঃখ করছিস কেন... ক্যানভাসের গায়ে যাকে তুই নিজে সৃষ্টি করেছিস নিজের হাতে... সেই তো জীবন্ত রক্ত মাংসের নারীর রূপ নিয়ে ধরা দিয়েছিল তোর সামনে... তোর শরীর জুড়ে জাগিয়ে তুলেছিল কামের উথাল পাথাল বন্যা। হাতে তুলি ধরে ফের ক্যানভাসে নতুন কোনো মায়াবিনী নারী অবয়ব কয়েদ করা শুরু করে দে... জলদি... দেরি করিস না...!" তুলি হাতে ঋক হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে থাকে শুধু। অদূরেই রাখা রয়েছে সেই ক্যানভাসখানি...যেখানে গতকাল রাতের আঁকা চিত্রখানি যেন ব্যাঙ্গাত্মক দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে ঋকের দিকে। ক্যানভাসের ভিতরে যে জায়গা জুড়ে ছিল একটি নারীর অবয়ব... এখন সেই জায়গাখানি পুরোপুরি ফাঁকা।টাটকা রংএর পোঁচ এর ভিতরে...সুন্দরী নারীর আকৃতি বিশিষ্ট অংশখানি এমনভাবে সাদা হয়ে রয়েছে...যেন ওই জায়গাটুকু সন্তর্পনে বাঁচিয়ে আঁকা হয়েছে ছবিখানি। তুলি হাতে ঋক এখন দাঁড়িয়ে শুধু ভাবছে... যাকে সে হারিয়েছে... তাকে ফিরিয়ে আনার কোনো উপায় তো জানা নেই। আজকে এই ফাঁকা ক্যানভাসের বুকে সৃষ্টি করতে হবে আরেকটি অপূর্ব সুন্দরী নারীর অবয়ব...! তুলি হাতে ঋক সাদা ক্যানভাসের সামনে বোবার মতো কেবল দাঁড়িয়ে রইল।এই ঘরের চারদিকে ঋকের আঁকা বিভিন্ন ধরনের ছবি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।এই ঘরের ভিতরেই গত কয়েকদিন ধরে ঋক সযত্নে লালন করে চলেছে ওর শিল্প সত্ত্বাকে। কিন্তু এখন এই ঘরের ভিতরে... ফাঁকা ক্যানভাসের সামনে তুলি হাতে দাঁড়িয়ে...ওর বড় অসহায় লাগতে শুরু করেছে।ওর মনে হচ্ছে...ওর ভিতরের শিল্পী সত্ত্বাখানি যেন অতল ঘুমের শহরে তলিয়ে গিয়েছে। অনেক্ষন ধরে ক্যানভাসের সামনে তুলি হাতে দাঁড়িয়ে থাকার পর ঋক বুঝতে পারল...এখন ওর হাত থেকে আর আঁকা বেরোবে না। অগত্যা... রং তুলি ফের জায়গা মতো গুছিয়ে রেখে ও বেরিয়ে এল আঁকার ঘর হতে। শোবার ঘরে এসে একটা বড় আড়মোড়া ভাঙল। জোরে হাঁক দিয়ে ডাকল নিবারণ কাকাকে। ---"নিবারণ কাকা...ও নিবারণ কাকা...এক কাপ কফি দিয়ে যাও তো... জলদি!" এই বলে ওয়াশরুমে চলে গেল... বেসিনের কলটা খুলে খুব জোরে জোরে চোখেমুখে জলের ঝাপটা দিতে শুরু করল।কলের শীতল জল ওর চোখেমুখে পড়ার সাথে সাথে শরীরটা চাঙ্গা লাগতে শুরু করল ঠিকই...কিন্তু ওর মনের ভিতরে এখন যে তীব্র অন্তর্দহন চলছে...তা যে ঠান্ডা হওয়ার নয় কোনোমতেই... সেটা অচিরেই বুঝতে পারল ঋক। বাথরুম থেকে বেরিয়ে...ঋক বিছানায় বসে পড়ল ধপ করে।টাওয়াল দিয়ে মুখটা মুছে... সেটা বিছানার একপাশে ছুঁড়ে ফেলল ঋক। তারপর বেডসাইড টেবিলের ড্রয়ার খুলে মাথা ধরার ট্যাবলেট বার করতে গেল।আর ড্রয়ার খোলার সাথে সাথেই ফের ওর চোখে পড়ে গেল সৌখিন খামে মোড়া... ময়ূরাক্ষীর বিয়ের কার্ডখানি। ওটা চোখে পড়ার সাথে সাথেই ঋকের মাথায় যেন আগুন জ্বলে উঠল। চিড়বিড় করে জেগে উঠল যেন ওর ভিতরে ঘুমিয়ে পড়া...একটা বিকৃত মস্তিষ্কের কাম পিশাচ। সমগ্র নারীজাতির প্রতি উত্তাল হয়ে উঠল একদলা ঘৃণা।ওর শরীর মন জুড়ে ভীষণভাবে তেড়েফুঁড়ে উঠতে আরম্ভ করল তীব্র ঘৃণা দ্বারা লালায়িত বিকৃত ধর্ষণকাম। ময়ূরাক্ষীর চেহারাটা এক ঝটকায় ভেসে উঠল ওর চোখের সামনে।প্রচন্ড ক্রোধমিশ্রিত ভয়াল ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠল ওর শিরায় শিরায়।ওর মনে হতে লাগল...এক লহমায় মেয়েটার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর নিটোল শরীরটাকে ছিঁড়েখুঁড়ে খায়।আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয় ওর সম্ভ্রম আর সতীত্ব। দুই হাতে নিজের মাথাটা চেপে ধরল ঋক।আর বারে বারে ওর শুধু মনে হতে লাগল... নারী হল বিশ্বাসঘাতকতারই প্রতীক। এদের সাথে সুখের নীড় তৈরি করার স্বপ্ন দেখা যায় না। এদের শুধুই ভোগ করে...অতঃপর ছিবড়ে করে ফেলে দেওয়া যায়।জোর করে ও নিজের মনের আয়নায় হঠাৎ জেগে ওঠা ময়ূরাক্ষীর ছবিখানি মুছে ফেলার জন্য মরিয়া হয়ে উঠল।আর সেই সাথে ওর শরীর জুড়ে উত্তাল হয়ে উঠতে শুরু করল কামক্ষুধার ভয়াল আস্ফালন।ঋক অচিরেই বুঝতে পারল... ক্যানভাস জুড়ে কামের প্রবল ক্ষুধা নিবৃত্ত করার জন্য মায়াবিনী নারীর অবয়ব সৃষ্টি করার উপযুক্ত সময়...সকাল কিংবা সন্ধ্যা নয়।যে সময়ে ঘুমের চাদরে আবৃত হয়ে পড়ে অর্ধ পৃথিবী... সেই মধ্যরাত ই... ক্যানভাসের গায়ে কামুক নারীর অবয়ব তৈরি করার মাহেন্দ্রক্ষণ! হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল।ঋক দরজা খুলে দেখল... নিবারণ কাকা কফির কাপ শুদ্ধ একটা ট্রে নিয়ে মলিন মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মুখে একটা হাসি এনে ট্রে টা হাতে নিল ঋক। তারপর বলল..."নিবারণ কাকা... এইবার একটা ফাটাফাটি সিনারি আঁকা আরম্ভ করব।আজ সকাল থেকেই শুধু ভাবছিলাম... নতুন ছবিটা কি নিয়ে শুরু করা যায়...তো হঠাৎ মাথায় এল...এত সুন্দর একটা জায়গায় রয়েছি কদিন ধরে...তো এই জায়গার সৌন্দর্যটা ক্যানভাসে একবার কয়েদ করব না...!তাই তো আজ ওরকম হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেলাম... একটা সুন্দর দৃশ্য আমার মনের ক্যামেরায় একদম লেন্স বন্দি করে নিয়েছি বুঝলে!আজ রাত থেকেই কাজ শুরু করব।" এই বলে সুড়ুৎ করে কফির কাপে একটা লম্বা চুমুক দিল ঋক। নিবারণ কাকা ওই একই রকম মলিন মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল কাঠ পুতুলের মতো।যদিও নিবারণ কাকা ছবিটবি র বিষয়ে কিছুই বোঝে না...আর সবচাইতে বড় ব্যাপার হল... নিজের কাজের প্রেক্ষাপট বা চিন্তা ভাবনা নিয়ে নিবারণ কাকার সাথে আলোচনা করতে বসার মতো মতিভ্রম হওয়ার লক্ষণ এই প্রথমবার ঋকের মধ্যে দেখল নিবারণ কাকা। নিবারণ কাকা এইবার পরিষ্কার বুঝতে পারল...ঋক প্রাণপণে একটা কিছু চাপা দেওয়ার চেষ্টা করে চলেছে প্রাণপণে। ঋক হঠাৎ প্রসঙ্গ পাল্টে বলে উঠল..."আচ্ছা নিবারণ কাকা... মায়ের সঙ্গে এখন কথা হয় তোমার?" ---"না মানে ইয়ে... বৈশাখী দিদিমনি যে মোবাইল ফোনটা দিয়েছিল তোমার সাথে এখানে আসার সময়ে... ওটা আজকাল কাজটাজ করছে না খুব একটা... মাসখানেক আগে কথা হয়েছিল শেষ।" নিবারণ কাকার কথাটা শুনে বেশ খানিকটা নিশ্চিন্ত হল ঋক। তারপর বলে উঠল... "ঠিক আছে... এখন তুমি যাও... তোমার কাজ করো।আমি এখন একটু বিশ্রাম নেব।" নিবারণ কাকা ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই সাথে সাথে দরজাটা বন্ধ করে দিল ঋক। নিবারণ কাকা রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে মনে মনে ভাবতে লাগল..."ঠিক সময়মতো মোবাইল খারাপ হওয়ার গল্প মাথায় এনে পরিস্থিতি ম্যানেজ করা গেছে। এখন আর দেরি করা ঠিক নয়।যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বৈশাখী দিদিমনিকে ফোন করে এখানকার সবকিছু জানাতে হবে। ওদিকে দরজাটা বন্ধ করে...তারপর সাথে সাথেই কফির কাপটা ওয়াশরুমে নিয়ে গিয়ে কফি ভর্তি কাপটা বেসিনের ওপর উল্টে ধরল ঋক।কাপ থেকে সবটা কফি এক নিমেষে বেসিনের ওপরে পড়ে...অতঃপর মিলিয়ে গেল জঞ্জালের মতো।আর অপরদিকে...ঋক প্যান্টের পকেট থেকে বার করে আনল...মদ। বোতলটা হাতে নিয়ে একবার জিভটা চেটে নিল ঋক। মনে মনে ভাবল...আজ রাতে ক্যানভাসের বুকে যে নারী অবয়ব তৈরি করবে সে...সেটি হবে গতকালের থেকে আরো দশগুণ সুন্দরী...আর শতগুণ নেশাতুর। দৃশ্য আট আস্তে আস্তে করে চোখ মেলে তাকাতে শুরু করল ঋক। ভোরের আলো ফুটে উঠেছে। চারপাশে পাখিরা একটু একটু করে জেগে উঠতে শুরু করছে। তাদের কিচিরমিচির শব্দ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করছে চারদিকে।নতুন একটা দিনের উদযাপনে প্রকৃতি যখন সেজে উঠছে... তখনো আগের রাতের ঘোর পুরোপুরি কাটেনি ঋকের। নিজের বাহুবন্ধনে খুব শক্ত করে ধরে রেখেছিল গতরাতে ক্যানভাস ফুঁড়ে জেগে ওঠা সেই মায়াবিনী নারীকে।ঋক দৃঢ়ভাবে মনস্থির করে নিয়েছিল...এই মেয়েটাকে ও কিছুতেই আগের রাতের মতো ফাঁকি দিয়ে চলে যেতে দেবে না। সঙ্গমের সময়টায় তাই ঋক মেয়েটার নগ্ন শরীর টা নিজের শরীরের সাথে একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে নিয়ে রেখেছিল শক্ত করে। কিন্তু হায়...ঘুম থেকে ধড়ফড় করে জেগে উঠে ঋক বুঝতে পারল...ফের ওকে ফাঁকি দিয়ে মেয়েটা পালিয়ে গেছে।শত চেষ্টা সত্ত্বেও...এই মেয়েটাকেও আর নিজের কাছে ধরে রাখতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হল ঋক। অদৃষ্টের এই নির্মম উপহাস আর নিতে পারল না ঋক। ক্ষ্যাপা সিংহের মতো রীতিমতো ফুঁসতে শুরু করল ঋক।একটা রাতের জন্য শরীর জুড়ে আদিম রিপু র তুমুল তুফান জাগিয়ে তুলে...পরের দিন ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই ঘর থেকে বেমালুম গায়েব হয়ে যাচ্ছে!এহেন প্রহসন কোনোমতে আর মেনে নিতে পারছে না ঋক।এক ঝটকায় শোয়া থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল ঋক। তারপর উন্মত্তের মতো সারাঘর ছুটে ছুটে মাথা কুটতে আরম্ভ করল ঋক।ছবি আঁকার জন্য...হলঘরের মতো সুবিশাল এই নির্বাচন পছন্দ করেছিল ঋক।এই ঘরের চারদিকে এলোমেলো ছড়ানো ছিটানো রয়েছে ছোট বড় নানা ক্যানভাস।কোনোটায় সম্পূর্ণ ছবি রয়েছে...আর কোনোটায় এক আধবার খামখেয়ালী মনে তুলির আঁচড় বুলিয়ে রাখা অসম্পূর্ণ ছবি। এই ঘরটা ঋকের একার সাম্রাজ্য।এই ঘরে ঋক নিজে ছাড়া আর কারোরই ঢোকার কোন অনুমতি নেই।যখন ঋক থাকে এই ঘরের ভিতরে... তখন এই ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে রাখে।আর যখন সে থাকে না ঘরের ভিতরে... তখন দরজা বাইরে থেকে তালাবন্ধ করে রাখে ঋক।আর এই ঘরের জানলাগুলির গ্রিলের ডিজাইন এমনই...যে মানুষের পক্ষে এ জানলা দিয়ে ঘরের বাইরে বার হওয়ার কথা মাথায় আনাটাই পুরোপুরি অবান্তর কল্পনা মাত্র। তাহলে!প্রতি রাতের শেষে... মেয়েগুলো ঘরের ভিতর হতে কিভাবে গায়েব হয়ে যায়! এই রহস্যের কোন কূলকিনারা করতে পারছে না ঋক। আকাশ যত ফর্সা হচ্ছে...ওর মনের ভিতরের অস্হিরতা ততোধিক বেড়ে চলেছে।পরপর দুই রাত্রি নারী শরীরের স্পর্শ পাওয়া ঋকের ভিতরে যেন জেগে উঠতে শুরু করে দিয়েছে...হঠাৎ মানুষের রক্তের স্বাদ পাওয়া কোনো হিংস্র শ্বাপদ! ওর শিরায় শিরায় ফল্গুধারার মতো ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে তীব্র শরীরী ক্ষুধা! না...এই ভয়ঙ্কর ক্ষুধাকে বশে রাখা কোনোমতেই সম্ভব নয়। একটি রাতের জন্য নিজেকে আপন সৃষ্টিকর্তা তথা ঋকের কাছে সমর্পণ করে... নিজের সদ্য প্রাপ্ত রক্তমাংসের শরীরকে হতে এক লহমায় বস্ত্রমুক্ত করে সমস্ত লাজ সম্ভ্রমকে বিনা দ্বিধায় ঋকের সামনে পাপোশের মতো বিছিয়ে দিয়ে... উত্তাল সঙ্গমের জোয়ারে ওর সঙ্গে গা ভাসিয়ে দিয়ে...ওর রক্তের প্রতিটি কণায় মত্ত তুফান ছুটিয়ে দিয়ে... দিনের আলো ফোটার সাথে সাথে মেয়েগুলো কোথায় চলে যায়! এর উত্তর খুঁজে না পেলেও... একটা জিনিস পরিষ্কার বুঝতে পারছে ঋক।এই মেয়েগুলো আসলেই অপার্থিব কায়া ভিন্ন আর কিছুই নয়। ক্যানভাসে অঙ্কিত নারী অবয়বগুলিই কোনো এক অলীক যাদুমন্ত্রে রক্তমাংসের জীবন্ত রূপ নিয়ে ওর সামনে ধরা দেয় শুধুমাত্র একটি রাতের জন্য।ওদের জন্ম যদি অতিপ্রাকৃতিক হয়...আর সেই রহস্য যদি ঋকের আয়ত্তের বাইরে হয়... তাহলে ওদের অন্তর্ধানও যে অতিপ্রাকৃতিক কোনো রহস্যের মোড়কে আবৃত থাকবে... এইটাই স্বাভাবিক।ঋক চারপাশে চেয়ে দেখল। সকাল হয়ে এসেছে।ওর প্রতিটি শোণিত কণার সঙ্গে দস্যুর মতো দাপট নিয়ে গর্জে উঠছে যেন এক বিকৃতকাম ধর্ষক!যাকে রাত পোহালে আর কোনোমতে শান্ত রাখা যাবে না। হঠাৎ ঋকের মনে হল...এত মাথা কুটে মরার আদৌ কোন দরকারই নেই ওর।রাতে এই ঘরে ক্যানভাসের সামনে দাঁড়ালে পুনরায় ওর হাতে ফের সৃষ্টি হবে নতুন কোনো নারীর অবয়ব।আর তারপর সে নিজেই নিজেকে অনাবৃত করবে ঋকের সামনে।আর তারপর নিজেকে কার্পেটের মতো বিছিয়ে দেবে ঋকের শরীরী ক্ষুধার তলায়! প্রতি রাতেই একটি করে আনকোরা নতুন নারী শরীর ঋক পাবে নিজের শরীরের ক্ষুধা মেটানোর জন্য... সকলের অগোচরে!এ কি কম বড়ো প্রাপ্তি ওর জীবনে! এরপরে রাত পোহালে মেয়েগুলো কোথায় অদৃশ্য হয়ে যায়...সে বিষয়ে ওর আদৌ মাথা ঘামানোর কোন দরকারই নেই।এই চিন্তাটা আসতেই মনে মনে খুশি হয়ে উঠল ঋক। এতক্ষণ ধরে ওর মনের ভিতরে চলতে থাকা তুমুল উচাটন ভাব এক লহমায় রূপান্তরিত হল এক অনাবিল স্ফূর্তি তে! হঠাৎ ঘরের বাইরে থেকে নিবারণ কাকার গলা শোনা গেল। ---"দাদাবাবু... আপনার ব্রেকফাস্ট তৈরি করে টেবিলে রেখে দিয়েছি। আপনি ভোর না হতেই আঁকার ঘরে চলে আসবেন বুঝতে পারিনি।সারাঘর খোঁজাখুঁজি করে সময় নষ্ট করতুম না। খাবার ঠান্ডা হচ্ছে...চলেন বাবু... খেতে চলেন।" বন্ধ দরজার ভিতর থেকে ঋক উত্তর দিল... ---"তুমি আমার জন্য একটু গরম কফি বানাও...আমি এক্ষুনি এসে খেতে বসছি এখন...।" দৃশ্য নয় ---"কি বলছ নিবারণ কাকা? ঋকের কি হয়েছে?ও কি লুকোনোর চেষ্টা করে চলেছে ক্রমাগত?" ফোনের ওপার থেকে ভেসে এল ময়ূরাক্ষীর উদ্বিগ্ন কন্ঠস্বর। ---"সেইটেই তো কিছুতেই বুঝতেছি নে দিদিমনি...! কদিন ধরে ঋক দাদাবাবুর ভাবগতিক আমার এক্কেবারে ঠিকঠাক লাগছে না।ওপর ওপর তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছেন...যাতে আমি কিচ্ছুটি না বুঝতে পারি। কিন্তু তাকে দেখলেই যে কেউ বুঝতে পারবে... ভিতরে ভিতরে দাদাবাবু কেমন যেন বদলে যায় যাচ্ছেন প্রতিদিন।কোনো একটা অজানা বিপদ আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে যেন গিলতে শুরু করেছে দাদাবাবুকে...!" ---"সর্বনাশ... অজানা একটা জায়গায় গিয়ে থাকতে শুরু করে শেষমেষ কোন বিপদে পা দিল ঋক!ওখানে তো ওর চেনা পরিচিত কেউই নেই!কাকু কাকিমা জানেন ব্যাপার টা?" উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলে উঠল ময়ূরাক্ষী। ---"অজ্ঞে না ময়ূরাক্ষী দিদিমনি...ওঁরা এখনো এই বিষয়ে কিছুই জানেন না।আমি তো নিজে বৈশাখী দিদিমনিকে ফোন করে এখানকার হাল হকিকত জানাতে গিয়েছিলুম।কিন্তু ফোনে কথা বলে জানতে পারি... বৈশাখী দিদিমনি এখন হাসপাতালে ভর্তি। ওকে নিয়ে এখন পরিবার শুদ্ধ সবাই ব্যস্ত।ঋক দাদাবাবুকে এই খবরটা দিতে ওরা সবাই বারণ করে দিয়েছে।ছেলেটা এমনিতেই যে মানসিক অবস্থায় দিন কাটিয়েছে এতদিন...এ তো ওরা সবাই দেখেছে এতদিন... এখন একটু শান্তির জন্য এতটা দূর পাড়ি দিয়ে থাকতে শুরু করেছে নতুন একটা জায়গায়...তাই ওকে আর কোনো দুঃসংবাদ দিয়ে বিচলিত করতে ওরা চাইছে না। কিন্তু আমার মন বলছে... দাদাবাবুকে সামলানোর জন্য এখন আমি যথেষ্ট নই। বৈশাখী দিদিমনি র পর একমাত্র তুমিই পারবে ঋক দাদাবাবুকে সামলাতে।" চিন্তান্বিত কন্ঠে বলে উঠল নিবারণ কাকা। "তোমার কথা আমি বুঝতে পারছি নিবারণ কাকা... ইনফ্যাক্ট...এখন তোমার মুখ থেকে ওখানকার হাল হকিকত শোনার পর আমার নিজেরই এখন মনে হচ্ছে... এক্ষুনি ওখানে ছুটে যাই...! কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হল এটাই...আজ আমার আর ঋকের মধ্যে সবকিছু যদি ঠিকঠাক থাকত... তাহলে আজ ওর সবকিছু ছেড়েছুঁড়ে এতদূরে গিয়ে থাকবার কোনো দরকারই পড়ত না।আমার বাবার সঙ্গে কাকুর যে পুরোনো শত্রুতাটা ছিল... আমাদের দুজনকে এক হতে দেখে... আমার বাবার ভিতরে সেইটাই এমনভাবে চাগাড় দিয়ে উঠেছে...যে আমাকে ঋকের কাছ থেকে সরিয়ে... ঋককে মানসিকভাবে ধ্বংস করে দেওয়ার কদর্য খেলায় এখন মেতে উঠেছেন তিনি। সাত তাড়াতাড়ি আমার বিয়ের ব্যবস্থা করে...কার্ড বিলি করতে শুরু করে দিয়েছিলেন তিনি... আমাকেও জোর জবরদস্তি ঘরে বন্ধ করে রেখে দিয়েছিলেন।কিন্তু বিয়ের আগেই আমি সেখান থেকে পালিয়ে আসি।এখন একটা হোস্টেলে থেকে... একটা ছোট চাকরি করে করে কোনোমতে আমার দিন গুজরান হয়। অথচ তোমার দাদাবাবু আমাকে পুরোপুরি ভুল বুঝে বসে আছে।এখন যদি আমি ওখানে যাই... তাহলে আমাকে দেখামাত্র ঋকের ভিতরের ক্ষতগুলো আবার চিড়বিড় করে জেগে উঠবে।আমার কোনো কথাই কানে তুলবে না। স্রেফ আমাকে চলে যেতে বলবে। বুঝলে নিবারণ কাকা...আমি ওর সামনে গেলে বরং হিতে বিপরীত হবে।" একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কথাগুলো বলল ময়ূরাক্ষী। ---"কথাটা তো তুমি ঠিকই বলেছ মা... কিন্তু আমি এখন কি যে করি...ঋক দাদাবাবুর একটা কিছু এদিক ওদিক হয়ে গেলে...আমি বৈশাখী দিদিমনিকে কি জবাব দেব!আর তাছাড়া...ঋক দাদাবাবুকে আমি জন্মাতে দেখেছি। আমার কোলে পিঠে তিলতিল করে বড় করে তুলেছি। দাদাবাবুর কোনো বিপদ আমি দেখতে পারব নি...!" কান্নায় ভেঙে পড়ল নিবারণ কাকা। ময়ূরাক্ষী ফোনের ওপার থেকে বলে উঠল... ---"তুমি চিন্তা কোরো না নিবারণ কাকা...আমি দেখছি... ঋকের কিছু হলে আমিও যে শেষ হয়ে যাব। তুমি এখন ফোন রেখে তোমার কাজকর্ম করো। ফোনে বেশি কথা বললে ঋক আবার সন্দেহ করবে।আমি একটা না একটা ব্যবস্থা করবই।যে ভাবেই হোক...!" দুপুর গড়িয়ে এল... ঋকের শোবার ঘরের দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ।ঋক সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে নেওয়ার পরে নিবারণ কাকাকে বলে রেখেছিল... সারারাত আঁকার ঘরে ও ছবি আঁকা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। এখন কাজের চাপ যাচ্ছে একটু...তাই এখন থেকে ঋক রাতে আঁকার ঘরেই থাকবে আর সকালটা ঘুমোবে।অতএব এই সময়টায় যেন ওকে বিরক্ত না করা হয়।" নিবারণ কাকা ঋকের কথাগুলো শুনে চুপচাপ মাথা নেড়ে চলে গিয়েছিল ওর ঘর থেকে।ঋকের ঘাড়ের কাছে একটা লম্বা আঁচড়ের দাগ... নিবারণ কাকার দৃষ্টি এড়ায় নি।এই এতবড় বাংলোর ভিতরে ঋক আর সে নিজে...এই দুই পুরুষ মানুষ ছাড়া তৃতীয় কোনো ব্যক্তির উপস্থিতির কোন প্রশ্নই নেই। ঋকের ঘাড়ের কাছে যে আঁচড়ের দাগ সে লক্ষ্য করেছে...তা যে বন্য সোহাগের নিদর্শন... এটা বোঝার মতো বয়স এবং পরিপক্কতা... দুইই যথেষ্টই রয়েছে নিবারণ কাকার। আর এখানেই সমস্ত হিসেব যেন চূরচূর হয়ে যাচ্ছে নিবারণ কাকার।যে ঋককে নিজের হাতে... কোলে পিঠে করে মানুষ করেছে সে... সেই স্বচ্ছ... দিলখোলা ছেলেটা কি তবে একটু একটু করে নিজেকে নোংরা পাঁকে নিমজ্জিত করে ফেলেছে... সকলের অজ্ঞাতে! কাজের নাম করে...লুকিয়ে নিজের আঁকার ঘরে মেয়ে ঢুকিয়ে স্ফূর্তি করা আরম্ভ করেছে তবে!এতবড় অধঃপতন!" এতবড় একটা ধাক্কা সামলে ওঠা রীতিমতো কষ্টেকর হয়ে পড়েছিল তার কাছে। মনে মনে নিবারণ কাকা দিন কয়েক ধরে চলতে থাকা ঋকের আচার আচরণের সমস্ত অসংগতির একটা ব্যখ্যা খুঁজে পেলেও... মুখে কিছুই প্রকাশ করেনি।ঋক নিজের শোবার ঘরে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ার পর... নিবারণ কাকা চুপচাপ চলে যায় রান্নাঘরে। তারপর রান্না চাপাতে শুরু করে নিজের চোখের জল চেপে।এখন সে পরিষ্কার বুঝতে পারে... এইভাবে একটা অচেনা অজানা জায়গায় এসে থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণেই ঋকের সামনে অধঃপতনে নামবার সিঁড়ি উন্মুক্ত হয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়ে গেছে। নিজের বাড়িতে... নিজের বাবা মা... পরিবারের সাথে থাকলে পরে এমনটা কখনোই হত না। মনের ভিতরে জমে ওঠা এমন হাজারো মেঘের সমারোহে রীতিমতো হাঁসফাঁস অবস্থা নিবারণ কাকার।মলিন মুখে নিবারণ কাকা দুপুরের খাবার বেড়ে নিয়ে ঋককে ডাকবার জন্য পা বাড়াল। দৃশ্য দশ নিবারণ কাকার সঙ্গে ফোনে কথা বলার পর থেকেই প্রচন্ডভাবে বিমর্ষ হয়ে রয়েছে ময়ূরাক্ষী।ঋককে নিয়ে দুশ্চিন্তা করে করে ও প্রায় নাওয়া খাওয়া ভুলতে বসেছে।হোস্টেলের রুমমেটদের সাথে রুম শেয়ার করে থাকে এখন ময়ূরাক্ষী। ও যদিও খুবই বড়লোক ঘরের মেয়ে...ছোট থেকেই সমস্তকিছু না চাইতেই হাতের সামনে পেয়ে যাওয়াটাই ওর অভ্যাস।কিন্তু এই অভ্যাসটা কোনোদিনই মাথায় চড়তে দেয়নি ময়ূরাক্ষী। নিজের আগ্রহেই ও রান্নাবান্না আর ঘরের কাজকর্ম শিখে নিয়েছে ভালোভাবেই। কাজেই...ঘর হোক কি বাইরে...দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে গিয়ে..."আমি তো জানি না...কোনোদিন হাত দিয়ে কুটো নেড়ে দুটো করিনি..." জাতীয় ধনীদুলালি সুলভ ন্যাকামি ওর মধ্যে মোটেই নেই।কিন্তু তা সত্ত্বেও...আজকাল প্রতিটা কাজে ও রুমমেটদের কাছে খুঁটিনাটি ভুল করার জন্য গাল খাচ্ছে। অফিসেরও বস ইতিমধ্যে ওকে ওয়ার্কিং দিয়ে রেখেছেন...এরপর আর একটা ভুল করলে এরপর চাকরিটা আর ওর থাকবে না।এই ভরা পৃথিবীর মধ্যে...নিজেকে বড় অসহায় মনে হচ্ছে ময়ূরাক্ষীর। একাকীত্বের তীব্র যন্ত্রনা ওকে যেন কুরে কুরে খাচ্ছে।এই তো কটাদিন আগের কথা...জীবন কত সুন্দর ছিল...! ভালোবাসার মানুষের আগমন...ওর জীবনে এনেছিল অকাল বসন্ত। জীবনটা নতুন রঙে সেজে উঠেতে শুরু করেছিল।ওই সময়ে।কলেজ লাইফ থেকে ঋক...ময়ূরাক্ষীর ক্রাশ ছিল।ওর সেই স্বপ্নের মোহে...হঠাৎ যেন আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ থেকে বেরিয়ে এসেছিল জীন।ম্যাজিকের মতোই যেন ছিল মেঘ না চাইতেই জলের মতো হঠাৎ পাওয়া সেই অমোঘ প্রাপ্তি।হঠাৎ বন্ধুদের সাথে আর্ট গ্যালারিতে এসে...সই শিকারিদের ভীড়ের মাঝে ঋককে প্রথম চাক্ষুষ করেছিল ময়ূরাক্ষী। ওর বুকের ভিতরে সেদিন যে তোলপাড় করা ঝড় উঠেছিল...তার শরিক হয়েছিল ঋক ও।ক্যানভাস আর তুলিকে সামনে রেখে... প্রাথমিক ভাবে তাকে উপলক্ষ বানিয়ে...তার ই সাহচর্য নিয়ে এক হতে শুরু করেছিল দুজনে।ক্যানভাসে তুলি বোলানোর অছিলায়...সকলের অগোচরে দুটি হাত এক হতে হতে ক্রমশ তা সমাপ্তি পেয়েছিল দুটি ওষ্ঠের নিমগ্ন নিবিড়তায়।ওই সময়ে গোটা পৃথিবী ছিল একদিকে...আর ওরা দুজনে পাড়ি দিয়েছিল অজানা কোন নৈসর্গিক অমৃত সুধার সন্ধানে... অন্য এক জগতে।তখনো পর্যন্ত ময়ূরাক্ষী জানত না... ঋকের বাবার সঙ্গে ওর নিজের বাবার পুরোনো ব্যবসায়িক শত্রুতার কথা। আজ এই কারণেই এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে...যে ঋক ওকে ভুল বুঝে... মাঝপথেই ছেড়ে দিয়ে চলে গিয়েছে বহুদূর। আর ওকে একা ঘর থেকে পালিয়ে এসে... একটা ছোট চাকরি নিয়ে... হোস্টেলে থেকে... এইভাবে সাফার করতে হচ্ছে!এখন ওর শুধু মনে হচ্ছে...বাবারা কি সত্যিই নিজের সন্তানের প্রকৃত শুভাকাঙ্ক্ষী হয় প্রতি ক্ষেত্রে? নিজের স্বার্থ আর ইগোকে জেতানোর জন্য কিছু কিছু বাবা... নিজের সন্তানের জীবনকে নরক বানিয়ে ফেলতে এতটুকুও কার্পন্য করে না।মনে মনে যেমন রাগে ফুঁসছে ময়ূরাক্ষী... ঠিক তেমনই ভীষণভাবে বিচলিত হয়ে পড়েছে। একমাত্র যে মানুষটা ওর পরিস্থিতিটা বুঝতে পারছে...সে হল ওর বাল্যবন্ধু...তিয়াসা।ও ব্যাঙ্গালোর থেকে কলকাতায় ফিরেছে দিন কয়েক হল। রয়েছে ওর মাসির বাড়ি। একটা রবিবার বিকেলে... দুই বান্ধবী দেখা করল একটা ক্যাফে তে।সমস্ত বৃত্তান্ত শুনে তিয়াসা খুবই চিন্তিত হয়ে পড়ল।ও বলল... ---"দ্যাখ...যা হয়েছে... সেটা খুবই দুঃখজনক সন্দেহ নেই। তবে আমি তোকে বলব...তুই আর দেরি না করে ঋকের কাছে যা।তুই তো কোনো অন্যায় করিসনি... ওকে ঠকাসনি...অতএব ওর সামনাসামনি হয়ে তোর দ্বিধা টা কিসের?" ---"না না... দ্বিধা নয়...তুই ব্যাপার টা বুঝতে পারছিস না...এখন পরিস্থিতি এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে...ঋক আমার মুখ দর্শন পর্যন্ত করতে চাইছে না প্রবল বিদ্বেষ আর ঘৃণায়। ফেসবুক... হোয়াটসঅ্যাপ...ফোন সবকিছুতে ব্লক করে দিয়েছে আমাকে। অগত্যা আর কোনো উপায় না দেখে...আমি আমার পরিস্থিতি পুরোটা জানিয়ে... একটা চিঠি পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু সে চিঠিও ঋক ঘৃণায় ছুঁয়ে পর্যন্ত দেখেনি।আমার নাম যদি কেউ ওর সামনে ভুল করেও উচ্চারণ করে ফেলে...তাকে হয়তো গলা টিপে মেরেই ফেলবে ঋক। এহেন উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে...আমি যে ঠান্ডা মাথায় ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াব বা কোনো কথা বলব... সেই পরিস্থিতিটাই নেই।" উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলে উঠল ময়ূরাক্ষী। ধোঁয়া ওঠা গরম কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে তিয়াসা বলে উঠল..."তাহলে তো একটা কথা মানতেই হবে বস... ঋক চ্যাটার্জি...ময়ূরাক্ষী ম্যাডামের প্রেমে এখন এক্কেবারে হাবুডুবু খাচ্ছেন।" ---"কি বলছিস তুই তিয়াসা...? সবটা শোনার পর শেষ পর্যন্ত এটা কি করে মনে হচ্ছে তোর বল দিকি... যেখানে একটা মানুষ... ঘৃণায় আমার নাম শুনলে পর্যন্ত তেড়ে আসছে...সে কিনা আমাকে ভালোবাসে?তোর দেখছি বুদ্ধিশুদ্ধি সব লোপ পেয়েছে।" ব্যাজার মুখে বলে উঠল ময়ূরাক্ষী। ---"ওরে গাধা...মাথাটা কি শুধু প্রেমের আগুনে জ্বলেপুড়ে কষ্ট পাওয়া আর দুশ্চিন্তা করার কাজে ব্যবহার করার জন্য দিয়েছেন ভগবান? মস্তিষ্কের ভিতরের গ্রে ম্যাটারটা একটুখানি সচল কর... ভেবে দেখ দেখি...যার প্রতি তোর কোনো অনুভূতিই নেই...তার নাম যদি তোর সামনে নেওয়া হয়... তাহলে তোর ভিতরে কোনো প্রতিক্রিয়া মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে কি?" একটু চিন্তা করে ময়ূরাক্ষী বলে উঠল..."না... কখনোই নয়...!" "একদম...!এই কথাটা তুই নিজে এবার ঠান্ডা মাথায় ভাব...আর বোঝার চেষ্টা কর...আমি ঠিক কি বলতে চাইছি!" তিয়াসার এই কথাটা... এবার সত্যিই ময়ূরাক্ষীর ভিতরে ভীষণভাবে নাড়া দিল। সত্যিই তো...রাগ আর ভালোবাসা...যে একটাই কয়েনের দুটো উল্টোপিঠ...এইটা তো এর আগে সেভাবে মাথায় আসেনি...!যখন ঋক আসল সত্যি টা জানতে পারবে...তখন ওর এই "আগুন" রাগ টাই যে আবেগঘন ভালোবাসার সমুদ্রে রূপান্তরিত হবে... এটা এখন ও খুব ভালোভাবেই অনুধাবন করতে শুরু করল। তিয়াসা এবার নিজের চেয়ারটা উঠিয়ে নিয়ে ময়ূরাক্ষীর একেবারে কাছ ঘেঁষে বসল। তারপর ওর আলতো করে ওর পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলে উঠল..."বুঝতে পারছিস? আসলেই তোর প্রেমের উত্তাল স্রোতে... পুরোপুরি ভরাডুবি হয়েছে ঋক বাবুর।তা না হলে... হঠাৎ করে বলা নেই...কোয়া নেই... বিখ্যাত চিত্রশিল্পী রাতারাতি অজ্ঞাতবাসে চলে গেলেন কোন খুশিতে?বল দেখি...প্রেস মিডিয়া না হয় আসল ব্যাপারটা জানে না। কিন্তু অ্যাটলিস্ট তোর তো এখন বোঝা উচিত...এই পরিস্থিতিতে দুজনে দুজনের থেকে দূরে সরে থাকলে জটিলতা কমবে বই বাড়বে।তোর উচিত... ইমিডিয়েটলি ঋকের সামনাসামনি হয়ে ওকে আসল পরিস্থিতি টা জানানো। একমাত্র এইটাই সমস্ত সমস্যার সমাধান।বুঝেছিস?" দৃশ্য এগারো রাত গভীর। বিছানায় শুয়ে শুধু এপাশ ওপাশ করে চলেছে ময়ূরাক্ষী। কিছুতেই ঘুম আসতে চাইছে না। ফোনে নিবারণ কাকার বলা কথাগুলো যেন ওর কানের কাছে বেজে চলেছে সমানে...! ও অনুভব করতে পারছে...ঋক নিশ্চয়ই কোনো বিপদের মধ্যে রয়েছে। এখন সত্যিই হাত পা গুটিয়ে কলকাতায় বসে থাকলে আর চলবে না। ঋকের সামনাসামনি হলে ও কি করবে?রাগ করবে... চিৎকার করবে...গালাগালি দেবে... বড়জোর অপমান করবে...!আর তো কিছু নয়... নিজের ভালোবাসাকে বাঁচানো... তাকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনে জীবন বাজি রাখতেও এখন রাজী ময়ূরাক্ষী!সেখানে এইসব তো অনেক তুচ্ছ! ও মনে মনে ঠিক করে নিল...এই চাকরি আর এই হোস্টেল ছেড়ে এইবার ও নিজে পাড়ি দেবে ব্যাঙ্গালোর। ঋকের সামনাসামনি গিয়ে দাঁড়াবে।এর জন্য ওকে যে মাসুল ই দিতে হোক না কেন...ও প্রস্তুত।নিজের পরিণতির পরোয়া ও করে না। অফিসে রিজাইন লেটার দিয়ে... হোস্টেলের পাওনা গন্ডা মিটিয়ে... ময়ূরাক্ষী ব্যাঙ্গালোর পাড়ি দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে দিয়েছে ইতিমধ্যেই।ওর অফিসের কলিগরা... হোস্টেলের রুমমেটরা... সবাই এইবার বুঝতে পারল... মেয়েটার ভিতরে কোনো একটা উথালপাথাল চলছে...যার কারণে... এরকম হঠকারী র মতো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।বাড়ির সাথে বিয়ে নিয়ে মনোমালিন্য হওয়ায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে হোস্টেলে থেকে চাকরি করছে ময়ূরাক্ষী... এটা সবাই মোটামুটি জানে।এখন নিজের জন্ম শহর ছেড়ে যখন দূরে পাড়ি দেওয়ার তোড়জোড় করতে শুরু করেছে ময়ূরাক্ষী...তখন অনেকেই ওকে সাবধান করে বলেছে..."নিজের চেনা জায়গা ছেড়েছুড়ে...এইভাবে একা দেশের অন্য প্রান্তে চলে যাওয়াটা একেবারে ই নির্বুদ্ধিতার পরিচয় হবে।" ময়ূরাক্ষী এদের কারোর কারোর কাছে প্রত্যুত্তোরে শুধু একটাই কথা বলেছে। "একজন মানুষ সেখানে বিপদের মধ্যে রয়েছে। আমাকে গিয়ে তাঁকে বাঁচাতে হবে।" নিজের ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিয়ে ময়ূরাক্ষী ট্রেনের টিকিটের ব্যবস্থা করে ফেলল অল্প সময়ের মধ্যেই। কলকাতা শহরের বুকে এমনিতেও ওর নিজের বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না।বাবার কড়া আদেশে...এখন পরিবারের সকলে তো বটেই...এমনকি মায়ের পর্যন্ত ওর সঙ্গে যোগাযোগ করার সমস্ত রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছে।এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার পর...এতদিনের চেনা পরিচিত আত্মীয় স্বজনদের কাছেও হঠাৎ করেই ও অচেনা হয়ে গিয়েছে। এখন একটা চাকরি আর একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই নিয়ে টিকে ছিল কোনোমতে...!কিন্তু এখন... ট্রেনে পা রাখার পরে ওর জীবনের একমাত্র গন্তব্য... শুধু ঋক।নিজের সর্বস্ব ছেড়ে রেখে... একটা ভিন্ন ভাষার ভিন রাজ্যে গিয়ে উঠতে চলেছে ময়ূরাক্ষী... একটা অনিশ্চিত জীবন আর ততোধিক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে...! ব্যাঙ্গালোর রওনা দেওয়ার আগের দিন... হঠাৎই ময়ূরাক্ষীর কাছে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল তিয়াসা। ব্যাগপত্র গোছগাছ সেরে নিয়ে...টিভিটা খুলে নিউজ চ্যানেল সার্চ করতে ব্যস্ত ময়ূরাক্ষী।হঠাৎ এইভাবে হাঁপাতে হাঁপাতে তিয়াসা র এইভাবে ঘরে ঢোকায়... বেশ হতচকিত হয়ে গেল ময়ূরাক্ষী। ময়ূরাক্ষী আজ রাত পোহালেই এই হোস্টেল ছেড়ে চলে যাবে।ওর ঘনিষ্ঠ বান্ধবী তিয়াসা কে হোস্টেলের মেসের মালকিন ভালোভাবেই চেনেন।কাজেই একটা মেয়েদের মেসের ভিতরে এইভাবে হঠাৎ করে তিয়াসার পৌঁছে যাওয়াটা খুব একটা অবাক হওয়ার মতো বিষয় নয়।কিন্তু মেয়েটা যেভাবে হাঁপাতে হাঁপাতে প্রায় ছুটে এসে ঢুকল ঘরে...তাতে বেশ অবাকই হয়ে গেল ময়ূরাক্ষী! ওকে আর কিছু বলবার সুযোগ না দিয়ে...তিয়াসা বলে উঠল..."ময়ূরাক্ষী...তুই যাওয়া ক্যানসেল কর...গোটা দক্ষিণ ভারত জুড়ে যা ভয়ঙ্কর হত্যালীলা চলছে... এখন সেখানে যাওয়ার চিন্তাটাও মনে আনা উচিত নয়! ইতিমধ্যে টিভিতেও সঞ্চালকের সরগরম কন্ঠস্বরে পঠিত খবর শুনে ক্ষণিকের জন্য হতভম্ব... স্তব্ধ হয়ে গেল ময়ূরাক্ষীও...তিয়াসার কথার কোনো প্রত্যুত্তোর দেবার বদলে টিভির দিকে তাকিয়ে রইল হাঁ করে...! টিভিতে এখন এই একটাই ব্রেকিং নিউজ। দক্ষিণ ভারতে হঠাৎই এক নৃশংস নরখাদকের আবির্ভাব হয়েছে। হঠাৎ হঠাৎ করে নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে কিছু মানুষ...আর তার দিন কয়েক পর...মিলছে...তার হাড় সর্বস্ব ক্ষতবিক্ষত লাশ।লাশ না বলে... কঙ্কালই বলা সঠিক হবে এক্ষেত্রে। কারণ... তাদের সারা শরীর থেকে কেউ যেন বীভৎস ভাবে মাংস ছিঁড়ে খুবলে খেয়ে... উচ্ছিষ্ট হিসেবে শুধুই ফেলে রেখে দিয়েছে হাড় সর্বস্ব কঙ্কালটা। কঙ্কালগুলো উদ্ধার হওয়ার পর...হাড়ের গায়ে লেগে থাকা যৎসামান্য মাংস ও টাটকা রক্ত দেখে... এটা বুঝতে বাকি থাকে না... মানুষটাকে অল্প সময় আগেই কামড়ে... ছিঁড়ে... খুবলে খাওয়া হয়েছে।আর খাওয়া শেষ হওয়ার সাথে সাথেই পালিয়ে গিয়েছে ওই পিশাচটা।এত অল্প সময়ের মধ্যে... একটা আস্ত মানুষকে খুবলে খেয়ে যে পালিয়ে যেতে পারে...সে যে আসলেই ভয়ঙ্কর কোনো অপার্থিব অপশক্তি...এতে সন্দেহের কোনো অবকাশই নেই! দৃশ্য বারো কাঁপা কাঁপা কন্ঠে তিয়াসা বলে উঠল..."দ্যাখ ময়ূরাক্ষী... কদিন আগে আমি তোকে বলেছিলাম... এখন তোর ঋকের কাছে যাওয়া উচিত... সমস্ত জটিলতার এইটাই একমাত্র সমাধান!কিন্তু এখন এই আমিই তোকে বারণ করছি ওখানে যেতে...। ওখানে এখন পদে পদে শুধু ভয়ঙ্কর সর্বনাশের ফাঁদ পাতা রয়েছে।" ---"মানে...কি বলছিস তুই!ঋকের কাছে যাওয়ার সমস্ত বন্দোবস্ত করে শেষে বিপদের ভয়ে আমি যাওয়া ক্যানসেল করে দেব?" উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলে উঠল ময়ূরাক্ষী। তিয়াসা এবার ময়ূরাক্ষীর কাছ ঘেঁষে বসল। তারপর ওর হাতটা চেপে ধরে বলে উঠল..."আরে না রে...আমি ঋকের কাছ থেকে তোকে দূরে সরে যাওয়ার কথা মোটেই বলছি না...আমি শুধু বলতে চাইছি...তোর এই মুহূর্তে ওই ভয়ঙ্কর বিপদে ঘেরা জায়গায় না যাওয়াই ভালো।তুই বরং ঋককে ওখান থেকে কলকাতায় ফিরিয়ে আনার একটা উপায় বার কর মাথা থেকে...!" ---"তুই যা বলছিস...সেসবই আমি বুঝছি তিয়াসা... কিন্তু ঋকের অবস্থাও এখন যথেষ্ট ঘোরালো। নিবারণ কাকার সঙ্গে এখন রেগুলার কথা হয় আমার।তার কাছ থেকেই আমি এমন কিছু জানতে পেরেছি...যে ঋককে নিয়ে দুশ্চিন্তায় আমার ঘুম উড়ে গিয়েছে।ওকে এখন ওই জায়গা থেকে সরানো একেবারেই সহজ ব্যাপার নয়... এটা পুরোপুরি স্পষ্ট। পরিস্থিতি যদি এমন জায়গায় মোড় না নিত...তাহলে আমাকে এইভাবে চাকরি ছেড়ে...এই মেস ছেড়ে... সর্বপরি কলকাতা ছেড়ে এইভাবে হয়তো ছুটে যেতাম না। সময়টাকে আরেকটু থিতু হওয়ার জন্য সময় দিতাম। তিয়াসার কথার প্রত্যুত্তোরে বলে উঠল ময়ূরাক্ষী। ---দ্যাখ ময়ূরাক্ষী...আমি তো এখানে থাকি না... ইনফ্যাক্ট এই ওয়েস্ট বেঙ্গলের পাট চুকিয়ে বহু বছর আগে আমরা চলে গিয়েছি। এখন এখানে মাসির বাড়ি বেড়াতে এসেছি দিনকয়েকের জন্য। ছুটি ফুরোলেই এখান থেকে পাততাড়ি গোটাতে হবে আমাকে।কলকাতায় যদি আমার নিজের বলতে কিছু থাকত... তাহলে এই পরিস্থিতিতে আমি তোকে ঠিক আটকে দিতাম। টেনে নিয়ে গিয়ে রেখে দিতাম আমার কাছে... কিন্তু আমার হাত পুরোপুরি বাঁধা। ছোট্ট থেকে পাশাপাশি বাড়িতে থেকে বড় হয়েছি আমরা... তোকেই আমি নিজের বোন বলে ভাবি।আজ সেই জায়গা থেকে তোকে বলছি শোন... টিকিট ক্যানসেল করে দে...আমরা বরং ঠান্ডা মাথায়... ঋককে ওখান থেকে সরিয়ে এখানে আনার একটা কোনো উপায় বার করি...বুঝলি?" বলে উঠল তিয়াসা। বাস্তবিকই... খবরে যা যা বলছে...একটার পর একটা বীভৎস মৃত্যুর যে বর্ণনা শ্রুতি গোচর হচ্ছে...তাতে এই সময়ে ময়ূরাক্ষীর পক্ষে সেখানে পা রাখাটা একেবারেই নিরাপদ নয়। শুধু তাই নয়... এখন ঋকের ও উচিত... পত্রপাঠ সেই জায়গা র পাট চুকিয়ে... কলকাতা ফিরে আসা। এখন সেই নিয়ে চিন্তাভাবনা করে একটা কোনো উপায় বার করাটাই হচ্ছে বিচক্ষণতার পরিচয়। ইতিমধ্যেই চাকরির রিজাইন লেটার জমা দিয়ে দিয়েছে ময়ূরাক্ষী। ট্রেনের টিকিট হয়ে রয়েছে।এখন এহেন পরিস্থিতিতে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল ময়ূরাক্ষী।বিরাট এক দোটানায় পড়ে...এখন পুরোপুরি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছে ময়ূরাক্ষী। দৃশ্য তেরো আজকাল... সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলেই...তীব্র গতিতে হৃদস্পন্দন বেড়ে উঠতে থাকে ঋকের।যেন ওর বুকের ভিতর দিয়ে প্রচন্ড গতিতে ছুটতে শুরু করে দুরন্ত এক্সপ্রেসের ট্রেন। ঘড়ির কাঁটা গুলোকে বড় অলস মনে হতে থাকে ওর।ওর মনে হয়... সন্ধ্যা পার হওয়ার পরেই...ঘড়ির কাঁটাগুলো যেন হাই তুলতে শুরু করে। সামনে এগোতে চায় না এক্কেবারে।ঋকের সারা শরীর জুড়ে চাগাড় দিতে আরম্ভ করে অদম্য কামের নেশা! এখন আর ও বোকার মতো আগের রাতে ক্যানভাসে ওর নিজের অঙ্কিত নারী অবয়ব হতে... রক্তমাংসের জীবন্ত রূপ নিয়ে জেগে ওঠা... নারী শরীর সারারাত উন্মত্ততার সাথে লেহন করে...তাকে ভোগ করার পর... পুনরায় তাকে কাছে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করে না।এখন ও জানে...এক সমুদ্র উত্তাল কামনার ডালি সাজিয়ে ক্যানভাস হতে জেগে উঠবে ওর আঁকা প্রতিটি নারী অবয়ব... প্রতি রাতে...!তারা নিজের হাতে...ক্যানভাসে অঙ্কিত নিজের সমস্ত আবরণ উন্মুক্ত করতে শুরু করবে একটু একটু করে।আর তারপর নিঃশর্তভাবে নিজেকে সঁপে দেবে ঋকের বাহুবন্ধনে।এরপর গোটা রাত ধরে চলতে থাকবে...বন্য কামনার উন্মত্ত তুফান। ঋকের ভিতরে সে জাগিয়ে তুলবে লোভাতুর একটি কালসর্প।মত্ত নেশার ঘোরে চূর হয়ে শেষমেষ ঋক সম্ভোগ সম্পূর্ণ করে... তলিয়ে যাবে অতল নিদ্রায়।আর তারপর ওই মায়াবিনী নারীর অন্তর্ধানের সাথে সাথে পৃথিবীর বুকে প্রস্ফুটিত হতে শুরু করবে একটি নতুন দিনের আলো...! সেই আলোর সঙ্গে হারিয়ে যাবে গতরাতের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অপার মায়া। রক্তের প্রতিটি কণায় তুফান ছুটিয়ে তোলা সেই মোহময়ী নারীটির দেখা আর পাওয়া যাবে না কখনোই। সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ে গোটা ঘরটা যখন আলোয় আলোকিত হয়ে পড়ে...তখন ঋক ওই নারীকে খোঁজার কোনো চেষ্টার মধ্যে আর যায় না।আঁকার ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে...হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে নেয়। তারপর নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে নিয়ে দুপুর পর্যন্ত টানা ঘুমোয়।তারপর স্নান করে... দুপুরের খাবার খেয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে ঘর থেকে। সন্ধ্যার পর ঘরে ফিরে আসে...চা কফি খায়...। এরপর অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে রাত আরো গভীর হওয়ার জন্য।রাত দশটার পর থেকেই ওর হৃদস্পন্দন ছুটতে শুরু করে দুরন্ত গতিতে।ঘড়ির কাঁটা যত রাত বারোটা বাজার দিক নির্দেশ করতে করতে এগিয়ে যায়...তত ই ঋকের শিরায় শিরায় ফল্গুধারার মতো জেগে উঠতে থাকে আনকোরা এক নতুন নারী শরীরকে স্পর্শ করা...তাকে ভোগ করার ক্ষিদে! ওর মাথাচাড়া দিয়ে উন্মত্ত হয়ে উঠতে আরম্ভ করে বন্য কাম ক্ষুধা।নিজেকে ধরে রাখাটাই রীতিমতো মুশকিল হয়ে পড়ে তখন ঋকের পক্ষে।রাত বারোটা বাজার সাথে সাথেই ঋক ক্ষীপ্র গতিতে ছুটে চলে যায় আঁকার ঘরে। বন্ধ দরজার আড়ালে... সকলের অগোচরে...ঋক পুনরায় ক্যানভাসের বুকে আনকোরা নতুন এক নারী অবয়ব সৃষ্টিতে মত্ত হয়ে পড়ে। এই রুটিন ই চলছে বিগত কয়েকদিন ধরে।আর যত দিন যাচ্ছে...ততই ঋকের মানসিক স্থিতি...যেন দ্রুতগতিতে হ্রাস পেতে থাকছে।ওর চোখের চাহনির জুড়ে যেন খেলা করতে শুরু করেছে এক বিকৃত উন্মত্ততার কদর্য ক্ষুধা!যেটাকে ঋক প্রাণপণে রেখে ঢেকে রাখার চেষ্টা করে চলেছে প্রতিনিয়ত...কিন্তু ওর ওই প্রচেষ্টা পুরোপুরিই ব্যর্থতার পর্যবসিত হয়। নিবারণ কাকার চোখকে ফাঁকি দিয়ে চলার চেষ্টা করে ঋক। নিবারণ কাকাকে এখন ও বলে রেখেছে... আজকাল গভীর রাতের নিশ্চিদ্র নিরালাতেই ওর আঁকায় ভালোভাবে মন বসে।তাই আঁকার জন্য ও এখন মধ্যরাতকেই বরাদ্দ করে নিয়েছে।তাই সকাল হলে ও আঁকার ঘর থেকেই বেরিয়ে আসবে... শোবার ঘর থেকে নয়।সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে নিয়ে তারপর ঘুম...এই রুটিনেই এখন থেকে ও চলবে।নিবারণ কাকা চুপচাপ ঋকের কথামতো...সকাল সাতটা নাগাদ টেবিলে ব্রেকফাস্ট রেডি করে রেখে আঁকার ঘরের দরজা বাইরে থেকে নক করে ওকে খেতে ডাকে...ঋক যখন টেবিলে বসে ব্রেকফাস্ট খায়... তখন নিবারণ কাকা ঋকের শোবার ঘরে গিয়ে ওর বিছানা ঝেড়ে পরিষ্কার করে রাখে।দুপুর হলে টেবিলে সাজিয়ে রাখে পঞ্চব্যঞ্জন।এইভাবেই এখন চলছে দিন।কিন্তু নিবারণ কাকা আস্তে আস্তে পরিষ্কার বুঝতে পারছে...যত দিন যাচ্ছে...ঋকের আচার আচরণে তত বদল আসতে শুরু করেছে।ওর যে মস্তিষ্কের বিকৃতি দেখা দিতে শুরু করেছে...এটা এখন নিবারণ কাকার কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট।নিবারণ কাকা এখন মনেপ্রাণে চাইছে...যত তাড়াতাড়ি সম্ভব...ময়ূরাক্ষী দিদিমনি চলে আসুক এখানে...!এই পরিস্থিতিতে... একমাত্র ওই পারবে ঋককে সঠিক রাস্তায় ফেরাতে... ওকে মানসিক উদ্বেগ থেকে বাইরে বার করে এনে... ওকে সঠিক দিশা দেখিয়ে...পুনরায় ওকে স্বাভাবিক জীবনের ছন্দে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে। দৃশ্য তেরো রাত গভীর।লেডিস মেসের ঘরের একটা কোণায় নির্ঘুম ময়ূরাক্ষী... হাঁটুতে মাথা গুঁজে চুপচাপ বসে আছে।হাজারো মানসিক দ্বন্দ্ব ও চিন্তার ঝড়ের দাপটে একেবারে দিশাহারা অবস্থা ওর।ঋকের হাসিমুখটা বাইরে বারে ভেসে উঠছে ওর মনের আয়নায়...আর তত ই যেন দিশাহারা হয়ে পড়ছে ময়ূরাক্ষী।মানুষটা এখন ওকে পুরোপুরি ভুল বুঝে... দূরে সরে রয়েছে।কিন্তু একবার যখন ও আসল সত্যিটা জানতে পারবে...তখন ঋক আবার আগের মতো ওকে জড়িয়ে নেবে নিজের বাহুবন্ধনে...! সারাজীবনের মতো ওকে শক্ত করে বেঁধে নেবে নিজের অস্তিত্বের সাথে...!যত তাড়াতাড়ি সম্ভব... ঋকের সামনাসামনি হওয়াটাই এখন দরকার সবার আগে।নিজের ভালোবাসাকে বাঁচানোর জন্য সবকিছু করতে প্রস্তুত ময়ূরাক্ষী।কিন্তু সবকিছুর পাশাপাশি এটাও সত্যি... গোটা দক্ষিণ ভারত জুড়ে এখন যে ভয়ঙ্কর হত্যালীলার তান্ডব শুরু হয়েছে...তাতে মাথা ঠাণ্ডা রেখে... বিচক্ষণতার সাথে পদক্ষেপ নেওয়াটাকেই সর্বাগ্রে প্রাধান্য দেওয়া দরকার। নাহলে যে সমস্ত চিন্তাভাবনার পাশা উল্টে... হিতে বিপরীত হয়ে যেতে পারে...! সারারাত ধরে রীতিমতো ছটফট করতে করতে ময়ূরাক্ষী শুধু ভেবে চলেছে...এখন ওর ঠিক কি করা উচিত...!ওর মস্তিষ্ক নির্দেশ দিচ্ছে...কলকাতাতেই থেকে... নিবারণ কাকার সঙ্গে পরামর্শ করে...ধীরেসুস্থে চিন্তাভাবনা করে ঋককে কোনোভাবে কলকাতায় ফিরিয়ে আনার উপায় খোঁজার চেষ্টা করতে।আর তার পাশাপাশি...ওর উথালপাথাল মন বলছে... সব সংশয় তুচ্ছ করে... ঋকের কাছে ছুটে যেতে...! সারারাত ধরে ওর মন আর মস্তিষ্কের ভিতরে চলতে থাকা তীব্র দ্বন্দ্বের অবসান হল ভোরের দিকে। শেষ পর্যন্ত মনেরই জয় হল।সব দ্বিধা...সংশয় তুচ্ছ করে... শেষমেষ ও ব্যাঙ্গালোরে পাড়ি দেওয়ার ই সিদ্ধান্ত নিল। দৃশ্য চোদ্দো রাত কেটে ভোর হয়ে এসেছে। নিবারণ কাকা ঋকের জন্য ব্রেকফাস্ট তৈরি করতে ব্যস্ত রান্নাঘরে।এমন সময়ে... হঠাৎ কাছাকাছি... মর্মভেদী চিৎকার আর সেই সাথে গগনবিদারক ক্রন্দনধ্বনি আর আর্তনাদ শুনে...তার অন্তরাত্মা যেন কেঁপে উঠল। কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে হঠাৎ এই শোরগোল... এটা বেশ আন্দাজ করতে পারছে নিবারণ কাকা।চারপাশে এখন যে নৃশংস হত্যালীলা আরম্ভ হয়েছে... সেই ভয়াবহতার তীব্রতা... ইতিমধ্যেই তার মনের ভিতরে পুঞ্জীভূত করতে শুরু করেছে প্রবল আতঙ্ক।প্রতিদিন রাশি রাশি মানুষ ভয়ঙ্করভাবে মরতে শুরু করেছে দিনকয়েক ধরে।যেসব মৃতদেহ উদ্ধার হচ্ছে... তাদের হাড় থেকে নৃশংসভাবে খুবলে খাওয়া হয়েছে মাংস।আর তার চারপাশটা ভেসে থাকে টাটকা রক্তে। দক্ষিণ ভারতের বুকে নরমাংসভোজী কোনো এক ভয়াল পিশাচের আবির্ভাব হয়েছে...যে অল্প সময়ের ভিতরেই একটা আস্ত মানুষের মাংস খেয়ে...নরকঙ্কালটা উচ্ছিষ্টের মতো ফেলে রেখে উধাও হয়ে যায়।প্রতিদিন শুধু নিখোঁজের তালিকা ক্রমশই লম্বা হয়ে চলেছে আর তাদের খোঁজ যখন মিলছে অবশেষে... তখন তাদের হাড় সর্বস্ব কঙ্কাল টুকু ব্যতীত আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। এই ভয়ঙ্কর চিৎকার আর কান্নার আওয়াজ শুনে... নিবারণ কাকার বন্ধ করে নেয় নিজের দুই চোখ। নানাবিধ দুশ্চিন্তা আর প্রবল আতঙ্ক ঘিরে ধরতে শুরু করে তাকে। চারপাশে এমন পরিস্থিতি ঘনিয়ে এসেছে দেখে...ঋকের পরিবারের সকলে ওকে বারেবারে কলকাতায় ফিরে আসার জন্য রীতিমতো কাকুতি মিনতি করতে শুরু করে দিয়েছে... কিন্তু ঋক ওর নিজের জেদ আঁকড়ে ধরে বসে রয়েছে।না...ও কোনোমতে এই নির্জন নিরালার শান্তি চুলোদ্দরে দিয়ে... কলকাতায় ফিরে যাবে না। নিবারণ কাকা নিজেও ঋককে বারবার কলকাতায় ফিরে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করে... শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে।ঋকের সাফ কথা..."তোমার যদি যেতে হয়... তাহলে তুমি ফিরে যেতে পারো।আমি তোমাকে আসতে বলিনি আমার সাথে।" কি আর করা... বৈশাখী দিদিমনির মুখটা বারে বারে মনে পড়ে যায় নিবারণ কাকার।নিজের একমাত্র ছেলেটাকে দেখাশোনা করে রাখার জন্য ওকে বড়ো ভরসা করে এখানে পাঠিয়েছে বৈশাখী দিদিমনি।এখন সে...এই বিপদের সময়ে ঋককে এখানে একলা রেখে ফিরে আসতে এতটুকুও সায় পাচ্ছে না নিজের মন থেকে...! এই বৈশাখী দিদিমনির দাদু একদিন স্বজনহারা যুবক নিবারণকে কাজ দিয়েছিলেন নিজের বাড়িতে। তাকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিয়ে পরিবারের একজন করে নিয়েছিলেন।এরপর একে একে তিনি নিজের ছেলের বিয়ে দিলেন... তারপর সারাবাড়ি আলো করে বৈশাখী দিদিমনি এল ঘরে...! বৈশাখী দিদিমনিকে নিজের হাতে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছে নিবারণ কাকা।এরপর সময়ের স্রোতে বৈশাখী দিদিমনি বিয়ের যুগ্যি হল। বৈশাখী দিদিমনির শ্বশুরবাড়ি অনেকটা কাছাকাছি হওয়ায়... নিবারণ কাকার খুশির সীমা ছিল না।এরপর যখন বৈশাখী দিদিমনির কোল আলো করে ঋক দাদাবাবু এল... তারপর থেকে বলতে গেলে...ও নিবারণ কাকার কোলে পিঠেই মানুষ। বাপ মা...পরিবারের স্বজনেরা অকস্মাৎ অগ্নিকাণ্ডে মারা যাওয়ার পর নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে কলকাতায় এসে একটি অভিজাত বাড়িতে কাজ করতে শুরু করার পর নিবারণ কাকা ওই পরিবারকেই নিজের পরিবার মনে করে নেয়।বিয়ে থাও করেনি সে।সেই নিবারণ কাকার বয়স তিনকাল থেকে এখন এককালে এসে ঠেকেছে।নিজের কোনো পিছুটান নেই তার...যার তাড়নায় এই ভয়ঙ্কর বিপদেসঙ্কুল স্হান থেকে সরে গিয়ে আত্মরক্ষা করার তাগিদে ব্যাকুল হয়ে উঠবে নিবারণ কাকা।বরং এখন তার মনেপ্রাণে শুধু ঋকের জন্য দুশ্চিন্তা...ক্রমশই তোলপাড় ঝড় তুলছে। ঋকের ব্রেকফাস্ট রেডি করে ডাইনিং টেবিলে রেখে... নিবারণ কাকা চলে গেল ঋকের আঁকার ঘরের দরজার সামনে।চারপাশে এমন আতঙ্ক আর কান্নার রোল উঠেছে...যে এই পরিস্থিতিতে ঘরের ভিতরে কোনো মানুষের পক্ষে নির্বিঘ্নে ঘুমিয়ে থাকাটাই রীতিমতো অসম্ভব ব্যাপার।অথচ...ঋক এখনো যে কি করে দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে যাচ্ছে...কে জানে...! অনেক্ষন ধরে একনাগাড়ে দরজায় ধাক্কা দেওয়ার পর অবশেষে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল ঋক।আর বেরিয়ে আসার সাথে সাথেই পড়ি কি মরি করে আঁকার ঘরের দরজায় চাবি দিয়ে দিল।সত্যিই...ওই আঁকার ঘরটায় যে কি গুপ্ত জিনিস রয়েছে...তা ঈশ্বরই জানেন।ওই আঁকার ঘরে...ঋক নিজে ব্যতীত দ্বিতীয় কোন ব্যক্তির প্রবেশ পুরোপুরি নিষিদ্ধ।এই ব্যাপারটা কিছুদিন আগেও খুব একটা ভাবাত না নিবারণ কাকাকে। কিন্তু... আজকাল ঋকের সমস্ত আচার আচরণ এবং কার্যকলাপ রীতিমতো অস্বাভাবিক মনে হয় নিবারণ কাকার।ওই ঘরের ভিতরে কি এমন মহামূল্যবান সম্পদ অতি যত্ন সহকারে লুকিয়ে রেখে দিয়েছে ঋক...যার খবর ও কাউকেই জানাতে চায় না? দরজা টা বন্ধ করে নিয়ে ঋক এগিয়ে গেল বাথরুমের দিকে। ঋকের দিকে তাকিয়ে নিবারণ কাকার ভিতরে কেমন যেন কু ডাকতে আরম্ভ করল।কারণ... ঋকের টি শার্টের গলা র ওপরের দিকের যেটুকু অংশ দৃশ্যমান হচ্ছে...তাতে ওর ঘাড়ের কাছটায়... একটা লম্বা আঁচড়ের দাগ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ইদানিং নিজের জন্য বরাদ্দ ঘরটায় শোয় না নিবারণ কাকা। ঋকের জন্য দুশ্চিন্তার তাড়নায়...দু চোখের পাতা এক করতে পারে না সে আজকাল।বাংলোর মেইন দরজার একেবারে সামনে সোফায় শোয় নিবারণ কাকা।আর তার ঘুমও হয় এক্কেবারে পাতলা।অতএব ঋকের পক্ষে... বাইরে থেকে ঘরের ভিতরে মেয়ে নিয়ে এসে স্ফূর্তি করার কোনো সম্ভাবনাই নেই।ঋকের যে চরিত্র স্খলন হচ্ছে... এটা নিবারণ কাকা টের পেয়েছে। কিন্তু রাতে আঁকার ঘরের ভিতরে সে কার সঙ্গে কামলীলা য় মত্ত হয়ে ওঠে! ঋকের আঁকার ওই ঘরটাতে ঋক আর যাই লুকিয়ে রাখুন না কেন...তার চোখে ধূলো দিয়ে...একজন রক্তমাংসের নারীকে বাইরে থেকে নিয়ে এসে নিজের ঘরে রেখে দেবে দিনের পর দিন...এ যে এক কথায় অসম্ভব! হতভম্ব নিবারণ কাকা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল স্হবির হয়ে।কি করবে...কি বলবে... কিছুই ভেবে পেল না।এমন সময়ে... হঠাৎ ঋক পিছনে ঘুরে দাঁড়িয়ে পড়ল।তারপর বলে উঠল..."অ্যাই... আপনি কে বলুন তো?আমার বাংলোয় আপনি কি করছেন?" দৃশ্য পনেরো ---"হ্যালো হ্যালো... ময়ূরাক্ষী দিদিমনি?আমি নিবারণ কাকা বলছি!" ---"হ্যাঁ নিবারণ কাকা...বলো...ঋক ঠিক আছে তো?" ---"শোনো ময়ূরাক্ষী দিদিমনি... একটা সময়ে আমি তোমাকে বলেছিলাম... তুমি ঋক দাদাবাবুর কাছে চলে এসো...তার সবথেকে প্রয়োজন শুধু তোমাকে... কিন্তু এখন সেই আমিই তোমাকে বলছি... তুমি এখানে আসার চিন্তা আর মাথাতেও এনো না... তুমি ট্রেনের টিকিট ক্যানসেল করে ফিরে যাও মা...!" ট্রেনের কামরার চারপাশে এবং ভিতরে... অনর্গল চিৎকার চ্যাঁচামেচি জুড়েছে ফেরিওয়ালারা।এহেন পরিস্থিতিতে...কান পাতা দায় হয়ে পড়েছে ময়ূরাক্ষীর। ফোনের ওপার থেকে ভেসে আসা নিবারণ কাকার গলা অনেক কষ্ট করে শোনা যাচ্ছে বটে... কিন্তু এখন ফোনের ওপারে থাকা মানুষটার উদ্দেশ্যে কিছু বলার চেষ্টা করতে যাওয়াটাই বৃথা। ময়ূরাক্ষী চিৎকার করে উত্তর দিল... ---"হ্যাঁ নিবারণ কাকা... তুমি কি বলছ?আমি কিচ্ছু শুনতে পাচ্ছি না।আমি ট্রেনে উঠে পড়েছি বুঝলে...পরশু সকালে ব্যাঙ্গালোর পৌঁছে যাব। তুমি আমাকে বাংলোর লোকেশন টা আরেকবার সেন্ড করে দিও।" নিবারণ কাকা ট্রেনের ভিতরের পরিস্থিতি বুঝে... আরো গলার স্বর যতটা সম্ভব উঁচু করে বলার চেষ্টা করল... ---"আমি বলতে চাইছি... তুমি ফিরে যাও ময়ূরাক্ষী দিদিমনি...এখন যা পরিস্থিতি...তাতে এখানে এসে আর তুমি কিছু করতে পারবে না। পরিস্থিতি একেবারে হাতের বাইরে চলে গেছে। তুমি এখানে এলে...বরং তোমার প্রাণের সংশয় রয়েছে। তুমি ফিরে যাও।" ---"কি বললে নিবারণ কাকা? ফিরে যাব?তাও আবার বিপদের ভয়ে? নেভার... পরিস্থিতি যাই আসুক... মৃত্যুকেও আমি পরোয়া করি না বুঝলে? ঋককে ছেড়ে বেঁচে থাকার বদলে ঈশ্বর যদি আমায় নৃশংস মৃত্যু দেন... তাহলেও সেটা আমি হাসিমুখে মেনে নেব।আমি পরশু সকালেই চলে আসব।" আর কোনো কথা না বলে... ময়ূরাক্ষী ফোন কেটে দিল। নিবারণ কাকা মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে... হতভম্বের মতো বসে রইল। দিশাহারা নিবারণ কাকা এখন পুরোপুরি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে শুধু ভাবছে... এবার কি হতে চলেছে! চারদিকে এই পৈশাচিক মৃত্যুর হাহাকার দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। কিছুদিন আগেও পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ ছিল না।দিন দিন যেভাবে চারদিকে নৃশংস নরমেধ যজ্ঞ চলছে...তার ভিতরে জেনেবুঝে একটা নাতনির বয়সী মেয়ে ঝাঁপ দিতে চলেছে... এটা কিছুতেই মন থেকে মেনে নিতে পারছে না নিবারণ কাকা।তার শুধুই মনে হচ্ছে...আজ একটা নিরপরাধ মেয়ে শুধুমাত্র তার পরামর্শ শুনে নিজের জীবনের এতবড় একটা সর্বনাশের কালগহ্বর খুঁড়তে শুরু করেছে নিজের হাতে।আর এখানে এসে যখন ও বর্তমান পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে... তখন ই ও বুঝতে পারবে... চাকরি ছেড়ে...নিজের শহর ছেড়ে...এই মৃত্যুপুরীতে ঝাঁপ দেওয়াটা কত বড় ভুল সিদ্ধান্ত ছিল...! নিবারণ কাকা বুঝতে পারল... এখন ময়ূরাক্ষীকে শত চেষ্টা করেও আর এখানে আসা থেকে আটকানো যাবে না। একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিবারণ কাকা মনে মনে বলল...কার অদৃষ্টে যে ঈশ্বর কোন ললাটলিপি লিখে দিয়েছেন...তা কেবল তিনিই জানেন! দৃশ্য ষোলো ট্রেনের আপার বার্থে শুয়ে শুয়ে খবরের কাগজের পাতায় ডুব দিয়েছে ময়ূরাক্ষী। সামনের পাতায় হেডলাইনে... বড়ো বড়ো অক্ষরে জ্বলজ্বল করছে এই মুহূর্তে দক্ষিণ ভারতের বুকে ঘনীভূত হয়ে উঠতে থাকা মৃত্যুর ত্রাসের বার্তা!কাগজে ছাপা খবরের প্রতিটি লাইন মনযোগ সহকারে পড়তে ব্যস্ত ময়ূরাক্ষী। খবরের কাগজের প্রতিবেদন আর সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন ভিডিও দেখার পর একটা ব্যাপার এখন পুরোপুরি বুঝতে পারছে ময়ূরাক্ষী। এইসমস্ত নৃশংস হত্যালীলার শিকার যারা হচ্ছে... তাদের প্রত্যেককেই বয়সের একটা নির্দিষ্ট গোত্রে ফেলা যায়।এই পৈশাচিক নর মেধ যজ্ঞের শিকার যারা... তারা প্রত্যেকেই উঠতি যুবক পুরুষ মানুষ। তাদের প্রত্যেকের ভিতরেই... উঠতি যৌবনের আগুন টগবগ করে ফুটতে শুরু করেছিল সদ্য...! হয়তো বহ্নিশিখায় আত্মাহুতি দেওয়া উন্মত্ত পতঙ্গের মতোই তারা ঝাঁপ দিয়েছিল এই পৈশাচিক মৃত্যুর অতল গহ্বরে...!এই মানুষগুলি... হঠাৎ করেই একদিন নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল।আর তার দুই কি তিনদিন পর মিলেছে তাদের অস্হি সর্বস্ব উচ্ছিষ্ট রূপী দেহাবশেষ! অল্প সময়ের ভিতরে কামড়ে খুবলে নরমাংস ভক্ষণ যে করতে পারে...সে যে আসলে কোনো ভয়ঙ্কর অপশক্তি...এটা বুঝতে এখন আর কারোর বাকি নেই। হঠাৎ করে... বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো দাক্ষিণাত্য জুড়ে এ কোন অভিশাপ নেমে এল! কিভাবে জেগে উঠল এই পৈশাচিক অপশক্তি! আজকের যুগে দাঁড়িয়ে...সম্ভব অসম্ভবের ভিতরে সমস্ত ব্যবধান ঘুচিয়ে... বিজ্ঞান আর কুসংস্কারের ভিতরের সমস্ত দ্বন্দ্বকে এক লহমায় প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়ে... কোন প্রলয়ের ধ্বংসলীলার অশনিসংকেত মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করেছে?এর দিশা খুঁজে পাচ্ছে না কেউই! কোনো বিপদের মোকাবিলা করতে গেলে...সেই বিপদের উৎস সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়াটাই জরুরী সবার আগে।আর এখানেই শুধু অতল অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই নজরে আসছে না।এই পৈশাচিক হত্যালীলা শুরু তো হয়ে গিয়েছে দক্ষিণ ভারতের দিকে দিকে...এর পরে তা আরো কতদূর বিস্তৃত হতে চলেছে...এর শেষই বা কোথায়...জানে না কেউই। ময়ূরাক্ষীর অন্তরাত্মা জুড়ে...ক্রমশ দানা বাঁধতে শুরু করল তীব্র আতঙ্ক! ঋকের মতো যৌবনপ্রাপ্ত পুরুষ মানুষই যে এই পৈশাচিক অপশক্তির লোভনীয় শিকার! দৃশ্য সতেরো রাত গভীর...!ঋকক্যানভাসের বুকে সদ্য সৃষ্টি করেছে এক অপূর্ব সুন্দরী নারীর অবয়ব।রাত বারোটা বাজার পরেই ঋকের ডানহাত জুড়ে যেন উন্মত্তের ন্যায়ে প্রবাহিত হতে আরম্ভ করে এক বৈদ্যুতিক তরঙ্গ...!আজকাল প্রতি রাতে একটি করে আনকোরা নতুন নারীর শরীর ভোগ না করলে চলে না ঋকের!এ যেন এক ভয়ঙ্কর নেশা!এই নেশার অতল গহ্বরে কিভাবে যে একটু একটু করে বিলীন হয়ে চলেছে ঋক...তার ওর নিজেরই চেতনার সম্পূর্ণ উর্দ্ধে।আঁকার ঘরের মাঝ বরাবর রাখা রয়েছে উজ্জ্বল সাদা ক্রিস্টালখানি।আর তার আলো বিচ্ছুরিত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে এই সুবিশাল কক্ষের কোণায় কোণায়। সেই আলোতেই... সৃষ্টি হয়েছে আজকে রাতে ঋকের হাতে আঁকা নারী অবয়ব খানি। অবয়বখানি সম্পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথেই...সেটি যেন ছুরির ফলা র মতো সেই অবয়ব যেন প্রতিপলে বিদ্ধ করে চলেছে ঋকের ভিতরের কামাতুর নেকড়েটার কাম ক্ষুধাকে।আর ঋক অপেক্ষা করতে পারছে না। ক্যানভাস ফুঁড়ে ওই অবয়বের রক্তমাংসের জীবন্ত রূপ নিয়ে বেরিয়ে আসার অপেক্ষায়... ঋকের কলিজা যেন ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে! একটা একটা করে জামার বোতাম খুলতে শুরু করেছে ঋক।ওর শরীর ফুঁড়ে জেগে উঠতে শুরু করেছে উন্মত্ত কাম তৃষ্ণা...! দৃশ্য আঠারো সকাল দশটা নাগাদ কলিং বেল বাজবার শব্দ শুনে নিবারণ কাকা ছুটে এসে দরজা খুলে দিল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে ময়ূরাক্ষী। দরজার দুই প্রান্তে শক্ত করে হাত রেখে নিবারণ কাকা সময়ে বলে উঠল..."তুমি ফিরে যাও ময়ূরাক্ষী দিদিমনি... এখানকার বাতাসের প্রতিটি কণায় কণায় বিপদ ফণা তুলে রয়েছে।" ---"ফিরে যাওয়ার জন্য আমি আসিনি নিবারণ কাকা...সরো...আমায় ভিতরে ঢুকতে দাও।" কোনো ইতস্তত না করেই... ময়ূরাক্ষী গটগট করে ঢুকে গেল বাংলোর ভিতরে। লাগেজ পত্র দরজার একপাশে রেখে... ব্যাকুল কন্ঠে ও ডাকতে শুরু করল..."ঋক...ঋক...!" নিবারণ কাকা অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চেয়ে রইল সেদিকে।মনে মনে প্রমাদ গুনতে শুরু করল...। নিবারণ কাকা ভালোভাবেই বুঝতে পারছে...এই মেয়েটা নিজের সারাটা জীবন... উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ... সমস্ত কিছুকে অতল অন্ধকারে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ঋকের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে...যে ঋকের কাছে আপাতত... শুধুমাত্র একরাশ ঘৃণা... অপমান আর প্রত্যাখ্যান ছাড়া আর কোনোকিছুই ও প্রত্যাশা করে না।তা সত্ত্বেও... মেয়েটা এইভাবে এতটা পথ পাড়ি দিয়ে এখানে ছুটে এসে কতখানি প্রেম... ব্যাকুলতা আর ভালোবাসা নিয়ে ডেকে চলেছে ঋকের নাম ধরে...!এমন একটি মেয়েকে জীবন সঙ্গিনী হিসেবে পাওয়াটা যেকোনো মানুষের জন্যই ভাগ্যের ব্যাপার।অথচ ঋক শেষেই কিনা এই মেয়েটাকেই ভুল বুঝল! ময়ূরাক্ষীর দিকে তাকিয়ে... নিবারণ কাকার এখন রীতিমতো মায়া হতে লাগল।বেচারি মেয়েটা এখনো বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে পুরোপুরি কিছুই জানে না।যদি ওকে ঠিকমতো বলবার সুযোগটুকু পাওয়া যেত... তাহলে মেয়েটা আর কষ্ট করে এতদূর পর্যন্ত আসতই না।অন্তত এখানে এখন ওর আসাটা যে পুরোপুরিই অর্থহীন...সেটা যখন ও বুঝতে পারবে... তখন ভীষণভাবে আঘাত পাবে মেয়েটা...! আসন্ন পরিস্থিতি সম্পর্কে আর কোনোকিছু ভাবনাচিন্তার মধ্যে না গিয়ে... নিবারণ কাকা সবটাই অদৃষ্টের হাতে ছেড়ে দিল। একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে... ময়ূরাক্ষীর উদ্দেশ্যে বলে উঠল..."ঋককে এখন ডেকে কোনো লাভ নেই।ও সারারাত আঁকার ঘরে থাকে আর সকালে ঘুমোয়।বেশ কিছুদিন হল... এইভাবেই চলছে।তুমি বরং এক কাজ করো...আমি তোমাকে গেস্টরুমটা দেখিয়ে দিচ্ছি... তোমার জিনিসপত্র সব সেখানে রেখে...স্নান করে নাও...আমি তোমার জন্য গরম গরম লুচি ভেজে দিচ্ছি।" নিবারণ কাকার কথা শুনে চিন্তিত কন্ঠে ময়ূরাক্ষী বলে উঠল..."আচ্ছা... আমার চোখের আড়ালে গিয়ে... নিজের পরিবারের চোখের আড়ালে গিয়ে... এখন যা খুশি তাই আরম্ভ করে দিয়েছে ঋক! কোনো বারণ নেই...শাসন নেই... খুব স্ফূর্তি! তুমি চিন্তা কোরো না নিবারণ কাকা... এখন আমি এসে গেছি... ওকে কি করে ঠিক পথে নিয়ে আসা যায়...সে আমি ভালোই জানি।চলো বরং... ঘরখানাই বরং আমায় দেখিয়ে দাও...একটু স্নান করে নিই... বাথরুমে গিজার আছে তো?" দৃশ্য উনিশ ---"ঋক দাদাবাবু...একজন এয়েচেন তোমার সঙ্গে দেখা করতে...তার তোমার সঙ্গে কিছু কথা আছে... তাকে ডাকব?" নিবারণ কাকার কথা শোনামাত্র... এক্কেবারে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল ঋক। ---"অ্যাই...আপনি কে বলুন তো... আপনাকে আমি চিনি না... কোনোদিন দেখিওনি...আর নির্লজ্জের মতো আমার ঘরে কি মতলবে পড়ে আছেন?দূর হয়ে যান আমার ঘর থেকে...!" এবার রীতিমতো কপাল চাপড়াতে শুরু করল নিবারণ কাকা।হায় ভগবান...এ ছেলের মাথা তো পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেছে!এখন নিজের বাবা মাকে পর্যন্ত চিনতে পারবে কিনা সেইটাই সন্দেহ! কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে... নিবারণ কাকা বলে উঠল... "ঠিক আছে দাদাবাবু...আমি চলে যাচ্ছি... কিন্তু একজন আপনার সঙ্গে কথা বলবে বলে দাঁড়িয়ে আছে বাইরে... তাকে ডাকি?" ---"আমার সঙ্গে কথা বলতে চায়?কিন্তু আমি তো চাই না... আমার বাংলোয় আমি ছাড়া অন্য কাউকে দেখতে আমি পছন্দ করি না...সব চলে যাও... সবাই দূর হয়ে যাও আমার চোখের সামনে থেকে...!আউট!" নিবারণ কাকা আরো কিছু বলতে যাবে...এমন সময়ে পিছন থেকে তাকে থামিয়ে দিল ময়ূরাক্ষী।ও যে কখন ঋকের ঘরের কাছাকাছি চলে এসেছে... সেটা টের পায়নি নিবারণ কাকা। নিবারণ কাকা ময়ূরাক্ষীর মুখ দেখে বুঝতে পারল...ও বর্তমান পরিস্থিতি টাকে পুরোপুরি অনুধাবন করতে পেরেছে এতক্ষণে।এখন ওকে সামনে দেখলে... ওকে আদৌ চিনতেই পারবে না ঋক... সেই ভয়ঙ্কর সত্যিটাকে ও হজম করার চেষ্টা করে চলেছে এখন...মনেপ্রাণে...! ময়ূরাক্ষী চোখের ইশারায়... নিবারণ কাকাকে সেখান থেকে চলে যাওয়ার অনুরোধ করল।নিবারণ কাকা মাথা নীচু করে বিদায় নিল ঋকের ঘর থেকে। ঋক বিছানায় বসে বসে আপন মনে শুধু বিড়বিড় করে চলেছে।ওর এমন অপ্রকৃতিস্থ আচার আচরণ দেখে এতটুকুও ঘাবড়ে গেল না ময়ূরাক্ষী।ও গটগট করে ঋকের ঘরের ভিতরে ঢুকে এসে... ভিতর থেকে সজোরে দরজাটা বন্ধ করে দিল। চমকে গিয়ে...ঋক তাকাল দরজার দিকে।আর সাথে সাথে ময়ূরাক্ষী এক ঝটকায় ওর গায়ে জড়িয়ে রাখা মখমলে চাদর খানি খুলে ফেলে দিল মাটিতে। উন্মুক্ত হয়ে পড়ল...ওর স্বল্পবসনা উন্মুক্ত যৌবনের ফল্গুধারা...! সাথে সাথে একেবারে তারা পড়ে গেল ঋকের মুখে...। প্রচন্ড গালি নিয়ে তেড়ে গিয়ে... নতুন আগন্তুক কে নিজের ঘর থেকে বার করে দিতে উদ্যত হয়েছিল যে ছেলেটা...সে পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গেল! একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে...ও তাকিয়ে রইল ময়ূরাক্ষীর শরীরের দিকে... শিকারীর মতো দৃষ্টি নিয়ে। ময়ূরাক্ষীকে দেখে ওকে একটা আনকোরা নতুন নারী শরীর ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছে না ঋকের।যেরকম সুখ পাওয়ার আশায় প্রতিরাতে ওর শিরায় শিরায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে উন্মত্ত কাম ক্ষুধার ঢেউ... এখন এই অসময়ে... হাতে তুলি না ধরতেই ওর একেবারে সামনে এসে হাজির! মন খুশি হয়ে উঠল ঋকের। নিজের জামার বোতামগুলোর দিকে ওর হাত চলে গেল অনায়াসেই...! না... নিজের প্রেমিকাকে আদৌ চিনতে পারেনি ঋক। নিজের বিগত অতীতের কথা... নিজের ঘর... পরিবার... প্রেমের সম্পর্ক... এসবের কোনকিছুই এখন ওর মাথাতে আর নেই। কিছুদিন আগেও যদি ময়ূরাক্ষীকে ঋক সামনাসামনি দেখত... তাহলে বাঁধভাঙ্গা বন্যার মতো আছড়ে পড়ে বেরিয়ে আসত ওর যাবতীয় ক্রোধ... ক্ষোভ! কিন্তু এখন ময়ূরাক্ষীকে সামনে থেকে দেখে... আনকোরা নতুন একটা ভোগের বস্তু ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছে না ঋকের। ময়ূরাক্ষী ওর অন্তরের সমস্ত লাজ আব্রু...গায়ের সাথে জড়িয়ে থাকা অতিরিক্ত খোলসের মতোই এক লহমায় উন্মোচন করে...আগুন গরম আবেদন নিয়ে এক পা এক পা করে এগিয়ে আসতে শুরু করল ঋকের কাছে...!আর সেই প্রখর আগুনের ক্ষীপ্র আঁচে...ঋকের অন্তরাত্মা যেন মোমের মতো গলে যেতে শুরু করল একটু একটু করে...! ঋকের ভিতরে যে উদ্দাম ঝড় উঠেছে...তার রেশ যেন ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশের প্রকৃতি জুড়ে!তুমুল বৃষ্টির দাপটে... জানলার পাল্লা গুলো সশব্ঊ আছড়ে পড়তে শুরু করেছে। ময়ূরাক্ষী কাছে আসতেই...ঋক নিজের সংযম পুরোপুরি হারিয়ে বসল।বুভুক্ষু নেকড়ের মতো... ময়ূরাক্ষীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল ঋক। ওকে দুইহাতে সজোরে টেনে ধরে...নিজের বিছানায় এনে ফেলল ঋক।অন্তর্বাসের ফিতে দুহাতে টান দিয়ে উন্মুক্ত করে নিল নিজের পরিতৃপ্তির ডালি।তারপর নিমগ্ন চিত্তে আত্মগহন করল আদিম রিপুর নৈসর্গিক নেশায়...! দৃশ্য কুড়ি ---"নিবারণ কাকা... ঋকের সব দায়িত্ব আমার ওপরে দিয়ে...তুমি নিশ্চিন্তে এখান থেকে যাও...!এখন থেকে ঋকের সাথে এখানে শুধু আমি থাকব।আমি এখানে ওর সঙ্গে থেকে...ওর দেখভাল করে... ওকে একদম সুস্থ করে তুলব।তোমায় কথা দিচ্ছি...!" ---"মা ময়ূরাক্ষী... তুমি এখন আমার কাছে প্রতীজ্ঞা বদ্ধ হচ্ছ...আর আমি প্রতীজ্ঞা বদ্ধ হয়ে রয়েছি দু দুটি পরিবারের কাছে...!ঋকের জন্মদাত্রী মা বৈশাখী আর তার পরিবার... অন্যদিকে ঋকের পৈতৃক সূত্রে পাওয়া পরিবার...এই দুই জায়গায় আমি যে ঋকের জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য! ঋককে তুমি নিজের প্রাণের থেকেও বেশি ভালোবাসো...সে আমি জানি।কিন্তু... এখন এই পরিস্থিতিতে ঋককে এখানে রেখে...আমি কি করে ফিরে যাই বলো দেখি...!" ---"নিবারণ কাকা... তুমি বেহুলার কথা শুনেছ নিশ্চয়ই... নিজের স্বামীকে যমের দুয়ার থেকে লড়াই করে ফিরিয়ে এনেছিল নিজের কাছে... দেবতাদের সামনে তর্জনী তুলে অদৃষ্টের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল সে। মনে করো না...এই কলিযুগে... সেই আবার নতুন রূপ নিয়ে জন্ম নিয়েছে...!" ---"কিন্তু...।" ---"কোনো কিন্তু নয় নিবারণ কাকা... তুমি নিশ্চিন্তে ফিরে যাও...এখন এই বাংলোর ভিতরে... ঋকের সঙ্গে আমার একা থাকাটা খুবই জরুরী...। তুমি তোমার মনিবের বাড়িতে ফিরে গেলে পুরো ব্যাপারটা ঘেঁটে যাবে।তুমি বরং এক কাজ করো... কাউকে কিছু জানানোর দরকার নেই।তুমি নিজের জন্মস্থান... নিজের গ্রামে গিয়ে কদিন থেকে... ঘুরে এসো... তোমার ভালো লাগবে। ---"আমার গ্রাম...আমার নিজের জন্মস্থান...এখন আমার মন থেকে পুরোপুরি মুছে গেছে... এখন সেখানে আমার নিজের বলতে আর কিছুই নেই। তবে এমন পরিস্থিতিতে... যদি ঋকের মঙ্গলের জন্য দরকার হলে আমি এখান থেকে চলে যেতে পারি অন্যত্র।এখন ঋকের পরিবারের সবাই ওকে এখান থেকে নিয়ে যাওয়ার জন্য উন্মুখ... কিন্তু ও একজনকেও এই বাংলোর ঠিকানা দিতে নারাজ। এমনকি ব্যাঙ্গালোরে প্রথম পা রাখার পর... নিজের যে কাকার ফ্ল্যাটে উঠেছিল ঋক... সেই কাকাকে পর্যন্ত এই বাংলোর ঠিকানা ও জানায়নি। বৈশাখী দিদিমনির কাকুতি মিনতিতে অবশেষে আমাকে ও ঠাঁই দিয়েছিল এই বাংলোয়। স্টেশনে গিয়ে ও নিজে আমাকে নিয়ে আসে এখানে...আর তারপর আমাকে দিয়ে দিব্যি করিয়ে নেয়...আমি যেন এই বাংলোর ঠিকানা ওর দুই পরিবারের কাউকেই না দিই...!তাই আমি আজ পর্যন্ত এখানকার ঠিকানাটা ওদের কাউকে দিতে পারিনি। তুমি ঋকের পরিবারের অন্তর্ভুক্ত নও...তাই তোমাকে ঠিকানা জানালে দিব্যি ভঙ্গের অনর্থ ঘটবে না...তাই তোমাকেই ভরসা করে এখানকার ঠিকানা বললুম আমি। এখন তুমি এসে গেছ... তোমার কাছে আমি ঋক দাদাবাবুর দায়িত্ব দিয়ে একেবারে নিশ্চিন্ত।বৈশাখী দিদিমনি তো তোমাকে পুত্রবধূ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েই দিয়েছে। এরপর একে একে ঋকের যে বাবাও পুরোন শত্রুতা ভুলে ঠিক তোমাকে আপন করে নেবেন দেখো...! নিজের পাজামার পকেট থেকে নিবারণ কাকা বাংলোর চাবি বার করে ময়ূরাক্ষীর হাতে তুলে দিল। একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল..."সবটা দেখে রেখো মা... এখন যদি বৈশাখী দিদিমনি সুস্থ থাকত... তাহলে সে অবশ্যই এখানে চলে আসত... নিজের মা কে এখানে আসতে বাধা দিতে পারত না ঋক।সবই কপাল... কলকাতা ছেড়ে... চাকরি ছেড়ে... তোমাকেই আসতে হল এখানে... সাবধানে থেকো...আমি গ্রামে যাওয়ার একটা টিকিটের বন্দোবস্ত করি গে...!" এই বলে নিবারণ কাকা রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। ময়ূরাক্ষী চাবির গোছাটা হাতে নিয়ে... একরাশ বিস্ময় নিয়ে হাঁ করে তাকিয়ে রইল ঋকের আঁকার ঘরের বন্ধ দরজার দিকে। ইদানিং যে ঋকের চারিত্রিক অবনতি ঘটতে শুরু করেছে...এটা ও এখানে আসার পর নিবারণ কাকার কাছে শুনেছে। ঋকের ভাব গতিক দূর থেকে দেখে...ও এটাও বুঝতে পেরেছিল...ঋক এখন পুরোপুরি স্মৃতিভ্রষ্ট হয়েছে।ওর মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গিয়েছে।তাই তো নিজেকে পুরোপুরি প্রস্তুত করেই ময়ূরাক্ষী গিয়েছিল ঋকের ঘরে।এরপর সে ঘরে যা যা ঘটল...তাতে ও এখন একটা বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত। এখন প্রতিটি রাতে ঋকের দরকার নারীর শরীর।এই একটা জিনিসই অমৃত সুধার মতো পান করে টিকে রয়েছে এখন ঋক। কিন্তু ও তো আজকাল প্রতিরাতে আঁকার ঘরে থাকে। সারারাত ছবি আঁকার অছিলায় ওই বন্ধ দরজার ভিতরে আসলে কি ঘটে?কি রহস্য লুকিয়ে রয়েছে ওই ঘরের ভিতরে? দৃশ্য একুশ ময়ূরাক্ষীকে স্পর্শ করার পর থেকেই... ঋকের ভিতরে একটা পরিবর্তন এসে গিয়েছে।ও আজকাল... আঁকার ঘরে পা রাখাটাই পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। ময়ূরাক্ষীর উষ্ণ স্পর্শের নেশায় উন্মত্ত হয়ে ওঠে ঋক... প্রতিরাতে।না... ঋকের কখনো মনে কখনোই এই প্রশ্নের উদ্রেক হয়নি... ময়ূরাক্ষী কে!কি ওর পরিচয়! হঠাৎ করে ও ঋকের দরজায় কেন এসে দাঁড়িয়েছে!আর তারপর বিনা সংকোচে...বিনা দ্বন্দ্বে... নিজেকে সঁপে দিয়েছে ওর বাহুডোরে... এইসবের কারণ খোঁজার চেষ্টা করতে যায়নি ঋক।ও শুধুমাত্র ময়ূরাক্ষীকে প্রবলভাবে আঁকড়ে ধরে রয়েছে নিজের কাছে।ঋক জানে... শুন্য ক্যানভাসে বুকে...ওর আঁকা নারীর অবয়বগুলি রক্তমাংসের জীবন্ত রূপ নিয়ে ক্যানভাস থেকে বেরিয়ে আসবে।ধরা দেবে ওর সামনে।নিজেকে উন্মুক্ত করে... বিছিয়ে দেবে ওর সামনে।চূড়ান্ত সম্ভোগের উদ্দাম নেশায়... সারারাত ধরে দামাল ঝড়ের দাপটে তৃপ্তির চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে যাবে ওর কামক্ষুধা...!কিন্তু দিনের আলো ফোটার সাথে সাথেই সারারাত ধরে ওর প্রতিটি রোমকূপে শিহরণ তুলে দেওয়া ওই কামুক নারী... অদৃশ্য হয়ে যাবে।আর কোনদিন ওই নারীর দেখা পাবে না ঋক। ক্যানভাসের যে অংশে ওই নারীর অবয়ব অঙ্কিত ছিল... সেই অংশটি রয়ে যায় সাদা... ফাঁকা। প্রতিরাতে এক এক করে যে মেয়েগুলির জন্ম দিয়ে চলেছিল ঋক নিজের হাতের শৈল্পিক টান এ... রাত পোহালেই সেই মেয়েগুলো কোথায় যায়!জানে না ঋক।আর এখন ও জানতেও চায় না।কারণ... এখন প্রতিরাতে যে নারীর সঙ্গ সুখ ও লাভ করে... সেই নারী দিনের আলো ফুটে উঠলে আর ওকে ছেড়ে চলে যায় না। বরং দিনের আলো ফোটার সাথে সাথে সে ওর প্রতি আরো যত্নশীল হয়ে ওঠে।ওর খেয়াল রাখে... নিজের হাতে রান্না করে খাওয়ায়...।তাই এখন আর প্রতিরাতে... ঋকের ভিতরে... উথালপাথাল করা কোনো নেশা চাগাড় দিয়ে ওঠে না। কাম ক্ষুধা নিবারণের জন্য একবুক তৃষ্ণা নিয়ে ছুটে যায় না আর আঁকার ঘরে...! ময়ূরাক্ষীর সংস্পর্শে এসে...ঋক ক্রমশ একটু একটু করে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে... বিকৃত কাম- নেশার কবল থেকে।কিন্তু এখনো ও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেনি।এখনো ফিরে পায়নি নিজের অতীত জীবনের স্মৃতি...!ময়ূরাক্ষীকে আঁকড়ে ধরে... একটা নতুন জীবন বাঁচতে আরম্ভ করেছে ঋক... যেখানে ও নিজের সুন্দর একটা পৃথিবী খুঁজে পেয়েছে। "আমি কে?কি আমার পরিচয়?এই বাংলোয় আমি একলা এইভাবে কেন থাকি?এই মেয়েটাই বা কে? হঠাৎ করে সে আমার কাছে এসে কেন থাকে?ওর স্পর্শে আমি কেন বারবার নিজেকে হারিয়ে ফেলি! কেন ওকে এত কাছের...এত আপন মনে হয়!কে হয় ও আমার?" এই প্রশ্নগুলো ঋক নিজের মনে মনে বারংবার আওড়াতে থাকে। নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করে... কিন্তু কোনো উত্তর খুঁজে পায় না। কিন্তু ঘূণাক্ষরেও... ময়ূরাক্ষীকে কোনো প্রশ্ন করে না ঋক। অনেক দিন পর কোনো নারী রাতের অন্ধকারে ওর সারা শরীরে... নিষিদ্ধ আলোড়নের তুফান ছুটিয়ে তুলে... দিনের আলো ফোটার সাথে সাথেই আর চলে যায় না ওকে ফেলে রেখে...!এই মেয়েটাকে একেবারে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করা যায়... ভরসা করা যায়। দৃশ্য বাইশ সুবিশাল এই বাংলোর ভিতরে... একান্তে...ঋকের সাথে ময়ূরাক্ষীর এই নিবিড় বন্ধনের গভীরতা ক্রমেই আরো সুমধুর... আরো গাঢ় হতে শুরু করেছে।এত বড় এই বাংলোর ভিতরে...দুটি কপোত কপোতী সকলের অগোচরে মেতে উঠেছে... নৈসর্গিক প্রণয়ের অনাবিল মাধুর্য্যে...!ময়ূরাক্ষী এই বাংলোয় এসে পা রেখেছে...চার কি পাঁচ দিন হয়েছে সবে।এরই মধ্যে... ঋকের ভিতরে এতখানি পরিবর্তন দেখে... ময়ূরাক্ষীর মনে খুশি যেন আর ধরে না...!ও জানে... ধীরে ধীরে ঋক সুস্থ হয়ে উঠছে... এইভাবেই...আর কিছু সময় পর...আস্তে আস্তে ওর সমস্তকিছু মনে পড়ে যাবে। কিন্তু এই তিন কি চারদিনের ভিতরে...এই বাংলো আর তার আশেপাশের কিছু কিছু ব্যাপার...ওর মনকে ভীষণভাবে নাড়িয়ে দিয়ে চলেছে ক্রমাগত...! ওই আঁকার ঘরের দরজাটা ঋক কোনোমতে খুলতে চায় না।বা বলা ভালো...ও নিজে ছাড়া... দ্বিতীয় কোনো মানুষের সামনে ও কোনোমতে ওই ঘরটাকে উন্মুক্ত করতে চায় না। মানুষ যেমন... নিজের লজ্জা নিবারণের জন্য বস্ত্র ধারণ করে... এবং জনসমক্ষে সে স্হান উন্মুক্ত করে না কখনোই...ওই ঘরখানাও যেন ঋকের কাছে সেইরকমই কিছু।ওই ঘরে...সকলের অগোচরে...এমন কিছু রয়েছে...যা কোনো মানুষ যদি ঘূণাক্ষরেও দেখে ফেলে... তাহলে কেলেঙ্কারির শেষ থাকবে না...!কি রহস্য লুকিয়ে আছে ওই ঘরটাতে? কিন্তু ইদানিং...ও বড়ো আনমনা থাকে আজকাল... কিছু কিছু হিসেব... মেলাতে পারে না কিছুতেই...! ময়ূরাক্ষী ঋককে নিজের প্রেমের বাঁধনে শক্ত করে বেঁধে নিতে সক্ষম হলেও...রাত একটু ঘনিয়ে এলেই...ওর দুচোখ জুড়ে নেমে আসে ঘুম। ঋকের নিরাবরণ শরীর জুড়ে উথালপাথাল করে ওঠা পৌরুষের তীব্র আস্ফালনের ওপরে...এক কলস শীতল জল নিক্ষেপ করে... ময়ূরাক্ষীর দুচোখে নেমে আসে গভীর ঘুম।পরের দিন সকালে ঘুম ভেঙ্গে ময়ূরাক্ষী দেখে... বিছানায় ওর পাশের জায়গা খালি।অতঃপর ঋক বেরিয়ে আসে ওর আঁকার ঘর থেকে! ঋকের গলায়... ঘাড়ে আঁচড় আর কামড়ের টাটকা চিহ্ন দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে ওঠে ময়ূরাক্ষী। প্রতি রাতে তো শুরুর আগেই সবকিছু শেষ হয়ে যায়! আগ্নেয়গিরির ভিতরে প্রলয়ের আগুন একটু একটু করে জমাট বাঁধতে বাঁধতেই... হঠাৎ শীতল হয়ে নিভে যায় একেবারে।ঋকের কাম ক্ষুধা অতৃপ্ত থেকে যায় প্রতিরাতেই। অথচ সকাল হতেই ওর শরীর জুড়ে... তীব্র শরীরী ক্ষুধা নিবারণের চিহ্ন স্বরূপ ওই দাগগুলো উৎপন্ন হয় কি করে! নিবারণ কাকার কথাগুলোর বাস্তব প্রতিরূপ... এখন ময়ূরাক্ষী নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছে প্রতিদিন।ওই আঁকার ঘরে কি তবে ঋক সকলের অগোচরে লুকিয়ে রেখেছে কোনো মেয়ে কে? এই রহস্যের উদঘাটন করতেই হবে...যে করেই হোক।অন্য কোনো নারীর স্পর্শে প্রতিরাতে ঋকের শরীরে জ্বলে ওঠে কামের আগুন... এই চিন্তাটা ওর মনের ভিতরে ছুরির ঘায়ের মতো দগদগে ক্ষত তৈরি করতে থাকে। এক রাতে... ময়ূরাক্ষী ঋকের ঘরে আর শুতে গেল না।অন্য একটা ঘরে নিজের শোবার বন্দোবস্ত করে নিল।ময়ূরাক্ষীর ভিতরের খটকাগুলো ক্রমশ ভীষণভাবে দানা বাঁধতে শুরু করে দিয়েছে।এমনিতে রাত গভীর না হলে ওর ভালো করে ঘুম আসে না কোনোকালেই...অথচ ইদানিং ঋকের কাছে রাতে শুতে গেলেই দুচোখ জুড়ে এভাবে ঘুম কেন নেমে আসে! এরপরেই যে ঋক নিজের ঘর... নিজের বিছানা ছেড়ে আঁকার ঘরের দিকে পা বাড়ায়...এ বিষয়ে এখন আর কোনো সন্দেহই নেই ওর। সব খটকা... সমস্ত প্রশ্নগুলো যে আসলেই একসূত্রে গাঁথা...এটা ও নিজের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দ্বারা স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে। ঋকের কাছে না গেলে এভাবে ওর দুচোখ জুড়ে ঘুম নেমে আসবে না...এটা বুঝতে এখন আর বাকি নেই ময়ূরাক্ষীর।ঋকের সাথে অমূলক কিছু মন কষাকষির মিথ্যা নাটক করে...ও অন্য একটি ঘরে নিজের শোবার বন্দোবস্ত করে নিল।ওর মাথার ভিতরে চলছে সম্পূর্ণ অন্য চিন্তা।রাত আরো একটু গভীর হলেই ঋক ওর আঁকার ঘরের দিকে পা বাড়াবে।ঘনীভূত হতে থাকা সব রহস্যের একটা কোনো কিনারা করবার কোনো উপায় খুঁজে বার করার এইটাই একমাত্র সুযোগ! রাত গভীর। চারদিক নিস্তব্ধ...শুনশান!বাংলোর ভিতরে এখন বিরাজ করছে পিন পড়া নৈঃশব্দ্য!হঠাৎ...ওই নিস্তব্ধতায় ছুরি মেরে...ঋকের আঁকার ঘরের দরজায় ক্যাঁ...অ্যা...অ্যা...চ করে একটা শব্দ হল। সাথে সাথে ময়ূরাক্ষীর বুকের ভিতরে যেন কামারের হাপর পেটা আরম্ভ হল।উত্তেজনাটাকে অতি কষ্টে সামলে নিয়ে... বিড়ালের মতো নিঃশব্দে এক পা এক পা করে ঘর থেকে বেরিয়ে এল ময়ূরাক্ষী।ও জানে...ঋক এক্ষুনি ফের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসবে। ঋকের জামার পকেট থেকে সিগারেট ধরানোর লাইটার টা...ও বুদ্ধি করে আগে থেকেই সরিয়ে রেখেছিল।ওই ঘরের ভিতরে ঢোকার জন্য একটা সুযোগ তৈরি করে নেওয়ার জন্য।এখন ঋকের আঁকার ঘরের বাইরে... তস্করের মতো লুকিয়ে ওৎ পেতে রয়েছে ময়ূরাক্ষী। টানটান উত্তেজনার শিহরণ খেলে উঠছে ওর রন্ধ্রে রন্ধ্রে! প্রত্যেকটা মূহুর্ত যেন এখন ওর কাছে এক একটা সহস্রাব্দের সমান! এইভাবে কিছু সময় পার হওয়ার পর... অবশেষে ফের ক্যাঁ... অ্যা... অ্যা...চ শব্দ সহকারে খুলে গেল ঋকের আঁকার ঘরের দরজা খানি। সিগারেটের লাইটারের সন্ধান করতে এখন ও পা বাড়িয়েছে নিজের শোবার ঘরের অভিমুখে।মনে মনে ময়ূরাক্ষী... সেই সেটারই অপেক্ষায় প্রহর গুনছিল। এখন ওর দুইহাত মুষ্ঠিবদ্ধ হয়ে উঠল।পা হয়ে উঠল সচল।ও জানে...ওই ঘরের ভিতরে আসলেই কি রহস্য লুকিয়ে আছে...এটা দেখা এবং জানার জন্য... মাত্র কয়েক মিনিট সময় বরাদ্দ...! তস্করের মতো পা টিপে টিপে... অসাবধানতাবশত খুলে রাখা আঁকার ঘরের দরজার চৌকাঠে...অবশেষে ময়ূরাক্ষী পা রাখল তস্করের মতো।আর সাথে সাথেই ওই ঘরের অভিমুখে প্রবাহিত হতে থাকা ঋকের পদধ্বনি ময়ূরাক্ষীর ভিতরে প্রবল উত্তেজনার সৃষ্টি করল।এত তাড়াতাড়ি শোবার ঘর থেকে লাইটার টা নিয়ে ঋক আঁকার ঘরের কাছে পৌঁছে যাবে... এটা আদৌ ভাবতে পারেনি ময়ূরাক্ষী।ও এখন স্পষ্ট বুঝতে পারছে... এখন আর এই ঘরের বাইরে পা রাখার আর কোনো রাস্তা খোলা নেই। এখন এই ঘরের বাইরে পা রাখলেই ও হাতেনাতে ধরা পড়ে যাবে ঋকের সামনে। ভীষণভাবে উতলা হয়ে উঠল ময়ূরাক্ষী। দিশাহারা হয়ে... তৎক্ষণাৎ ও ওই ঘরেরই ভিতরে... মেঝে অব্দি কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা একটা ক্যানভাসের আড়ালে ও লুকিয়ে পড়ল।ঋক আপন মনে... একরাশ স্ফূর্তি নিয়ে শিষ দিতে দিতে... নিজের আঁকার ঘরে ঢুকে...দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে ছিটকিনি তুলে দিল।ঋকের আঁকার ঘরের রহস্য উদঘাটন করতে এসে... এইভাবে এই ঘরের ভিতরে আটকা পড়ে যেতে হবে...এটা ঘূণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি ময়ূরাক্ষী।তবে এতে একটুও না ঘাবড়ে... বরং মনে মনে ভাবল... ভালোই হল একদিকে... এখন এই ঘরের ভিতরে লুকিয়ে থেকে... সরাসরি সবকিছু নিজে চাক্ষুষ করার একটা সুযোগ পাওয়া গেল। মনে মনে নিজেকে শান্ত করে নিল ময়ূরাক্ষী।এই ঘরের ভিতরে এখন ঋক নিজে ছাড়াও... দ্বিতীয় কোনো মানুষের অস্তিত্ব রয়েছে...এটা ওকে কোনোমতে বুঝতে দেওয়া যাবে না। নিজের নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের শব্দের গতিকেও...যথাসম্ভব শ্লথ করে নিল ময়ূরাক্ষী। তারপর সন্তর্পনে লুকিয়ে থেকে চারপাশটা নিরীক্ষণ করতে শুরু করল।খানিক পরেই ও বুঝতে পারল...এই ঘরের ভিতরে কোনো বৈদ্যুতিক আলো জ্বলছে না।সুবিশাল এই ঘরের একেবারে মাঝ বরাবর রাখা রয়েছে অদ্ভুত একটা বস্তু।সূচালো ত্রিভুজ আকৃতি বিশিষ্ট... উজ্জ্বল সাদা...ছোট একটি ক্রিস্টাল।তার থেকেই অবিরাম নির্গত হয়ে চলেছে উজ্জ্বল দ্যুতি সম্পন্ন সাদা আলো।ওই আলোতে... আলোকিত হয়ে রয়েছে এই সুবিশাল ঘরের প্রতিটি কোণা। একটা সিগারেট শেষ করে নিয়ে...সেই আলোতেই ঋক...হাতে রং তুলি হাতে নিয়ে মেতে উঠেছে চিত্রাঙ্কনে। চুপিসারে আড়াল হতে... একরাশ বিস্ময় নিয়ে ময়ূরাক্ষী দেখতে থাকল... কিভাবে ঝড়ের গতিতে ক্যানভাসের বুকে ফুটে উঠতে শুরু করেছে...এক অপূর্ব সুন্দরী...কামোদ্দীপক যৌবনে পরিপূর্ণ এক নারীর অবয়ব!ক্যানভাসের বুকে ক্রমশ ফুটে উঠতে ওই নারীর অবয়ব খানি যত পরিপূর্ণতার দিকে যাচ্ছে...ততই যেন ঋকের চোখেমুখে চলকে উঠতে শুরু করেছে অপ্রতিরোধ্য লালসার লেলিহান শিখা!ওর চোখের চাহনি উথলে বেসামালভাবে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে উলঙ্গ কাম ক্ষুধা!ঋকের লকলকে চাহনির ক্রমবর্ধমান নির্লজ্জ ক্ষুধার সাথে একেবারে সমান তালে তাল মিলিয়ে...ক্রমশ যেন জীবন্ত হয়ে উঠতে শুরু করেছে ক্যানভাসের বুকে অঙ্কিত ওই নারী অবয়ব খানি...! এমন অতিপ্রাকৃতিক ঘটনা চোখের সামনে ঘটতে দেখে... প্রচন্ড গতিতে ছুটতে আরম্ভ করল ময়ূরাক্ষীর হৃদস্পন্দন। নিজের ভিতরে চলতে থাকা সমস্ত প্রবল বেগে ধাবমান উদ্দাম দোলাচল...উদ্বেগ কোনোমতে সামলে নিল ময়ূরাক্ষী।ও এটা পরিষ্কার বুঝতে পারছে... এতদিন ধরে...একটু একটু করে যে ধোঁয়াশা পুঞ্জীভূত হয়ে এই বিরাট অন্ধকার তৈরি করেছে... সেই অন্ধকার ভেদ করে...তার আসল রহস্য উদঘাটন করতে হলে... এখন এই ক্যানভাসের আড়ালে আত্মগোপন করে... নিঃশব্দে সবটা শুধু নিরীক্ষণ করে যেতে হবে।নিজের মনকে শক্ত করে নিল ময়ূরাক্ষী। যেকোনো প্রকার অতিপ্রাকৃতিক শিহরণের নীরব সাক্ষী হওয়ার জন্য নিজের মনকে পুরোপুরি প্রস্তুত করে নিল ও। একরাশ বিস্ময় নিয়ে ও দেখতে থাকল... ক্যানভাসে সদ্য অঙ্কিত নারী অবয়বখানি ধীরে ধীরে রক্ত মাংসের জীবন্ত নারীর রূপ নিয়ে বেরিয়ে আসছে। জীবন্ত রূপ ধারণ করার সাথে সাথে...ওর চোখেমুখে ফুটে উঠতে শুরু করেছে সহস্র যুগ ধরে উপোসী হয়ে পড়ে থাকা তীব্র কাম ক্ষুধা।ওই জীবন্ত প্রতিমূর্তি... দুই হাতে...ধীরে ধীরে উন্মুক্ত করতে শুরু করেছে নিজের সমস্ত আবরণ।ঋক একটু আগেই রংতুলি দিয়ে ক্যানভাসের গায়ে...যে কারুকার্যখচিত সুন্দর পোশাক দিয়েছিল ওই অপরূপা নারীর শরীরে...তা এক লহমায় উন্মুক্ত করে ফেলল মেয়েটা। ওদিকে ঋকও সম্পূর্ণরূপে বেসামাল হয়ে পড়েছে।বুভুক্ষু নেকড়ের মতো বিকৃত কামক্ষুধা ফুটে উঠছে ওর চোখে মুখে...সারা শরীর জুড়ে...!ও এক এক করে খুলতে আরম্ভ করেছে ওর জামার সব বোতামগুলো। উজ্জ্বল সাদা ক্রিস্টালটির থেকে এতক্ষণ ধরে যে আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছিল...তা যেন আরো দশগুণ বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠল।বিস্ময়ে হতবাক হয়ে ময়ূরাক্ষী নিষ্পলক দৃষ্টিতে দেখতে থাকল... সদ্য ক্যানভাস থেকে রক্তমাংসের নারী রূপে বেরিয়ে আসা নারীটি নিজেকে সম্পূর্ণরূপে বেআব্রু করে ফেলে... ঋকের বাহুডোরে আবদ্ধ হচ্ছে চোখের নিমেষে...!আর ঋক ও উন্মত্তের মতো হারিয়ে যাচ্ছে নেশাতুর কামরসের নিষিদ্ধ হাতছানিতে...! এইবার ময়ূরাক্ষীর সহ্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেল।ঋককে অন্য কোনো নারীর সংস্পর্শে এইভাবে আসতে দেখে... ময়ূরাক্ষীর মনের ভিতরে ভয়াল আগুনের বারুদ জ্বলে উঠল।ও নিজেকে আর সংযত রাখতে পারল না। প্রবলভাবে রাগান্বিত হয়ে... ময়ূরাক্ষী এইবার ঋকের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল... ক্ষীপ্র বাঘিনীর মতো...! কিন্তু এ কি...!ঋক...তার নিজের হাতে সৃষ্ট নারী অবয়বের ওই মানবী প্রতিরূপের সাথে... মেতে উঠেছে সম্ভোগের চূড়ান্ত নেশায়! পৃথিবী এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে গেলেও... এখন ঋকের হুঁশ ফেরানো সম্ভব নয়।ও এখন বিচরণ করছে এক অপার্থিব দুনিয়াতে।ওই দুনিয়া থেকে এই মূহুর্তে ওকে বার করে আনা কোনোমতেই সম্ভব নয়।ময়ূরাক্ষী ক্যানভাসের আড়াল হতে বের হয়ে এসে... ভয়ঙ্কর ক্রোধের সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে সঙ্গমরত ঋককে ওই মেয়েটার বাহুবন্ধন থেকে ছাড়ানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠল। কিন্তু না...কোনো লাভ হল না।ঋককে এখন ধারালো কোনো অস্ত্র নিয়ে কোপাতে শুরু করলেও...ও এই উন্মত্ত সঙ্গমের ঘোর থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না কোনোভাবেই।বেশ কিছুক্ষণ বৃথা চেষ্টার পর হাঁপিয়ে উঠল ময়ূরাক্ষী। দুই হাত কপালে ঠেকিয়ে... পরিশ্রান্ত... বিদ্ধস্ত হয়ে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল।ওর দুচোখ উথলে প্রবাহিত হতে শুরু করল অশ্রুর ফল্গুধারা...!এইভাবে আরো কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর... হঠাৎ একটা সময় ময়ূরাক্ষীর চোখ চলে গেল ওই উজ্জ্বল সাদা ক্রিস্টালটির দিকে। কারণ...এই ঘরের ভিতরে... এখন উষ্ণ শীৎকারের শব্দ ছাপিয়ে আরো একটা শব্দ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। একটা চাপা কান্নার শব্দ!এই ঘরের বাতাসের প্রতিটি কণায় কণায় এই চাপা আর্ত ধ্বনি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে ধীরে ধীরে।এই নিস্তব্ধ নিশুতি রাতে... চার দেওয়ালের ভিতরে এই অপার্থিব ক্রন্দনধ্বনি শুনে...যেন ক্রমাগত ময়ূরাক্ষীর শরীরের রক্ত যেন জল হয়ে যেতে শুরু করল।এমন মর্মভেদী হাহাকার...ওর অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে তুলল। ভয়ঙ্কর কোনো প্রলয়ের অশনিসংকেত ময়ূরাক্ষীর শিরায় শিরায় যেন ভীষণভাবে শিহরণ তুলতে শুরু করল।বন্য কাম ক্ষুধা নিবারণে নিমগ্ন ঋক আর মেয়েটিকে দেখে... এবার ক্রোধের বদলে... আতঙ্কের উদ্রেক হল ময়ূরাক্ষীর। এখন ও স্পষ্ট বুঝতে পারছে... এতক্ষণ ধরে ও যেসব অপার্থিব ঘটনা ও চাক্ষুষ করেছে...তার সঙ্গে এই আশ্চর্য ক্রিস্টালটির একটা সংযোগ রয়েছে।সঙ্গমে মত্ত ঋক এখন ময়ূরাক্ষীর উপস্থিতি সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে অজ্ঞাত। ময়ূরাক্ষী ওদের দুজনের পাশ কাটিয়ে... এবার ধীরে ধীরে... মন্ত্রমুগ্ধের মতো এগিয়ে চলল ঘরের মাঝ বরাবর রাখা ওই ক্রিস্টালটির অভিমুখে...! এরপর ক্রিস্টালটি তুলে নিল নিজের হাতে।আর তারপর... সাথে সাথেই যে ঘটনাটা ঘটল...সেটার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না ময়ূরাক্ষী।ওই ক্রিস্টালটা নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সাথে সাথেই... ওই ঘরের ক্যানভাসের ভিতরে নারীমূর্তির আদলে যে শুন্যস্হানগুলি এতক্ষণ ও চাক্ষুষ করেছিল... সেগুলো ক্রমশ পরিপূর্ণতা পেল চোখের নিমেষে।এক একটি ক্যানভাসের গায়ে অঙ্কিত এক একটি নারী অবয়ব এইবার স্পষ্ট হয়ে উঠল।আর সেই অবয়বগুলির ভিতরে একটি অবয়ব দেখে...যেন হৃৎপিণ্ড খুলে হাতে চলে আসবার উপক্রম হল ময়ূরাক্ষীর।ও এটা ভালোভাবেই বুঝতে পারছে... এই অবয়বগুলিই অঙ্কিত হয়েছিল ঋকের হাতে। কিছুদিন আগে...বছর ছাব্বিশের একজন পুরুষকে ছলনায় ভুলিয়ে কব্জা করে...অতঃপর তার শরীরের সমস্ত মাংস খেয়ে উচ্ছিষ্ট রূপে তার হাড় সর্বস্ব কঙ্কালটা ফেলে রেখে পালানোর সময়ে... একজনের চোখে পড়ে গিয়েছিল ওই আততায়ী। না... তাকে ধরা সম্ভব হয়নি আর। তবে ওই সাক্ষীর বর্ননা শুনে... পুলিশ একটি স্কেচ তৈরি করায়...আর তা ছড়িয়ে যায় দিকে দিকে।যে ওই আততায়ীকে ধরিয়ে দিতে পারবে... তাকে বিশাল অঙ্কের টাকা দিয়ে পুরস্কৃত করা হবে এই ঘোষণা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে।ওই স্কেচ ময়ূরাক্ষীরও চোখে পড়েছে।এখন ক্যানভাসের গায়ে ফুটে ওঠা নারী অবয়বগুলি দেখে...তার ভিতরে একটি অবয়ব দেখে...ওর সেটিকে শনাক্ত করতে এতটুকুও ভুল হল না। যে নর মাংসখাকী পিশাচটাকে খুঁজে বার করার জন্য এখন সকলে মরিয়া...সে যে আসলেই এরকমই এক নিশুতি রাতে... ঋকের হাতে সৃষ্টি হয়েছে ক্যানভাসের বুকে...এই ভয়াবহ সত্যটা অনুভব করে শিহরিত হয়ে উঠল ময়ূরাক্ষী। এতদিন ধরে অবিরাম চলতে থাকা পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডগুলো যে কোনো মানুষের দ্বারা সংঘটিত হওয়া সম্ভব নয়... এসবের পিছনে রয়েছে কোনো অলৌকিক শক্তির হাত...এটা সকলেই আন্দাজ করতে পেরেছে। কিন্তু দক্ষিণ ভারতের বুকে ঘনিয়ে ওঠা এই ভয়াবহ হত্যালীলার আঁতুড়ঘর যে ঋকের এই আঁকার ঘর...এটা দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারেনি ময়ূরাক্ষী।এত বড় একটা ধাক্কা...কোনোমতে করে সামলে ওঠার চেষ্টা করছে ও। ঠিক এই সময়ে যে দৃশ্য ও চাক্ষুষ করল...তাতে ওর মনের ভিতরে দানা বাঁধতে থাকা সমস্ত চিন্তার জটগুলো এক লহমায় কুয়াশা মুক্ত হল। ক্যানভাসের গায়ে ঋকের হাতে সৃষ্ট নারী অবয়বের ওই জীবন্ত প্রতিমূর্তিটি এবার সম্ভোগ শেষে এই ঘরের জানালার কাছে পা বাড়িয়েছে।আর তারপর তার অপার্থিব অবয়বখানি জানলার গ্রিল ভেদ করে এই ঘরের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে।আর ওই সময়েই ময়ূরাক্ষী দেখতে পেল...ওই নারীর ঠোঁটের দুইপাশে দুটি তীক্ষ্ণ স্বদন্ত। কামের নেশাগ্রস্ত ঋকের এই মানসিক অবস্থাকে ব্যবহার করে...ওর হাতে জন্ম নিয়ে...এরপর এই দাঁত দিয়েই ওই পিশাচিনী প্রতিদিন পুরুষ মানুষের মাংস খেতে শুরু করবে! এটা মনে আসতেই...গা টা একেবারে ঘিনঘিন করে উঠল ময়ূরাক্ষীর। ময়ূরাক্ষী দেখল...ঋক পুরোপুরি অচৈতন্য অবস্থায় মেঝেতে পড়ে রয়েছে।ওর হাতে তখনো ধরা রয়েছে ওই ক্রিস্টালটা। ময়ূরাক্ষী খেয়াল করল... ক্রিস্টালের ভিতর থেকে... ক্ষীণ সুরে ভেসে আসছে একটা চাপা ক্রন্দনধ্বনি মিশ্রিত তীব্র আর্ত ধ্বনি।কোনো এক নারী কন্ঠ বারবার শুধু বলে চলেছে..."আমাকে মুক্তি দাও... আমাকে মুক্তি দাও...!" একবুক সাহস সঞ্চয় করে... কাঁপা কাঁপা কন্ঠে ময়ূরাক্ষী বলে উঠল..."কে...কে তুমি?" ---"আমি কে সেই প্রশ্নের উত্তর জানা এই মুহূর্তে জরুরী নয়।এই যে চারপাশে পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড চলছে নির্বিচারে...এ যদি বন্ধ করতে চাও... তাহলে এক্ষুনি স্যাকুবাসের প্রতিমূর্তি ওই পলায়নরতা পিশাচিনীর পিছু করো। এক্ষুনি যাও...জলদি...!" ময়ূরাক্ষী আর কোনোকিছু ভাবনাচিন্তার মধ্যে দিয়েই আর গেল না।ও তাড়াতাড়ি করে ঋকের আঁকার ঘরের দরজা সশব্দে খুলে... প্রচন্ড গতিতে ছুটতে আরম্ভ করল। বাতাসে ভাসমান ওই নারী প্রতিমূর্তি ছুটে চলেছে তীব্র গতিতে।আর এতক্ষণে ওই নারীমূর্তির সমস্ত সৌন্দর্য মিলিয়ে গিয়েছে।সে পরিণত হয়েছে এক বিকট দর্শন পিশাচিনী... স্যাকুবাসের প্রতিমূর্তি তে।এখন এই মুহূর্তে ময়ূরাক্ষীর ভিতরে ভয়... ঘৃণা সবকিছু মুছে গিয়েছে।যে ভয়ঙ্কর ত্রাসে আচ্ছাদিত হয়ে রয়েছে গোটা দাক্ষিণাত্য...তার প্রকৃত উৎস এখন ও একা শুধু জানে। শুধু তাই নয়...এই সবকিছুর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত হয়ে রয়েছে ওর ভালোবাসার মানুষটি।বিপদের স্রোত এখন মাথার ওপর দিয়ে বইতে শুরু করেছে।যেমন করেই হোক... সবকিছু এখন ওকেই রক্ষা করতে হবে। সেই সাথে বাঁচাতে হবে ঋকের প্রাণ। ঈশ্বর নিজে হয়তো ওকেই এই দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন...!এই সত্য মনে মনে উপলব্ধি করল ময়ূরাক্ষী। তীব্র গতিতে হাওয়ায় ধাবমান ওই অপার্থিব কায়াখানিকে অনুসরণ করতে শুরু করল ময়ূরাক্ষী। ছুটতে ছুটতে ও পেরিয়ে যেতে শুরু করল পথঘাট... পাহাড়ী রাস্তা...! এইভাবে ছুটতে ছুটতে ভীষণভাবে হাঁপিয়ে উঠল ময়ূরাক্ষী।দম ফুরিয়ে আসতে শুরু করল ওর। কিন্তু না... কোনোমতে ও আর থামবে না।শরীরে যতক্ষণ প্রাণ আছে... ততক্ষণ ও ছুটতে থাকবে।ওই পিশাচিনীর গন্তব্যে ওকে পৌঁছতেই হবে যেমন করেই হোক! এতখানি পথ এইভাবে ছুটে ছুটে... ময়ূরাক্ষীর মুখে রক্ত উঠে আসার উপক্রম হয়েছে। কিন্তু তাও... বেপরোয়া সৈনিকের মতো...ও শুধুই ছুটে চলছে। এইভাবে ছুটতে ছুটতে... অবশেষে একটা সময় ওর চোখে পড়ল... একটা ছোট পাহাড়ী টিলার ভিতরে একটা সংকীর্ণ সুড়ঙ্গ পথ ধরে ওই অপার্থিব কায়াখানি একটু একটু করে মিলিয়ে যাচ্ছে।আর কালবিলম্ব করল না ময়ূরাক্ষী।ওও ওই সুড়ঙ্গ পথ অনুসরণ করে সেদিকে ছুটে গেল...আর তারপর ওই সংকীর্ণ সুড়ঙ্গ পথের ভিতরে খুব কষ্ট করে প্রবেশ করল। হঠাৎ বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো... সেখানে শোনা গেল একটি পুরুষ কন্ঠের চিৎকার। চমকে উঠল ময়ূরাক্ষী।ও ভালো করেই বুঝতে পারছে...এ আর কারোর নয়... ঋকের গলা! এবার আতঙ্কিত কন্ঠে ময়ূরাক্ষী চিৎকার করে উঠল..."ঋক... তুমি এখানে কি করছ? এক্ষুনি তুমি চলে যাও এখান থেকে।" ---"না ময়ূরাক্ষী...আমি আর তোমাকে একা ফেলে দূরে চলে যাব না।ওই ক্রিস্টালটা তোমার সাথে ওই বাংলো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই আমার সবকিছু মনে পড়ে গেছে। নিবারণ কাকা তোমার ব্যাপারে বিস্তারিতভাবে সমস্তকিছু লিখে দিয়ে গেছে একটা কাগজে।আমি ওই চিঠি পড়ে তোমার ব্যাপারে সমস্ত সত্যিটা জানতে পেরেছি।তোমাকে আমি অনেক কষ্ট দিয়েছি ময়ূরাক্ষী...আমার জন্য তুমি এতদিন অনেক কষ্ট সয়েছ।আর আমি তোমাকে কোন কষ্ট পেতে দেব না। এইখানে আমি...একজন পূর্ণবয়স্ক যুবক পুরুষ... স্বেচ্ছায় নিজেকে সঁপে দেব ওদের খাদ্য হিসেবে।আমি এতক্ষণ আড়ালে থেকে সবটাই শুনেছি।" বলে উঠল ঋক। ---"না... তুমি আমার কথা শোন... এখানে এখন তোমার খুব বিপদ... তুমি এখান থেকে চলে যাও।" ভয়ার্ত কন্ঠে বলে উঠল ময়ূরাক্ষী। ---"না... তোমাকে মৃত্যুর মুখে আমিই ঠেলে দিয়েছি।আমার সন্তান এখন তোমার গর্ভে... তাকে তুমি স্যাকুবাসের ক্ষুধার বলি হতে দিও না। এখানেই আমি ওই ক্রিস্টালটা পাই।ওই সময়ে বাইরে একজন আমাকে বারে বারে এখানে পা বাড়াতে নিষেধ করত। কারণ ও জানত... কোনো পূর্ণবয়স্ক যুবক পুরুষকে নিজের কাছে টেনে আনার জন্য সবসময় মরিয়া হয়ে থাকে এই সহস্র বর্ষ প্রাচীন উপাসনালয়।ও জানত... সহস্র বছর আগে...ওর হাতের সৃষ্ট নারী অবয়বগুলি যে পৈশাচিক হত্যালীলা চালিয়ে গিয়েছিল...ওই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে চলেছে আমার হাত দিয়ে।আমি তাকে পাগল ভেবে তাড়িয়ে দিয়েছি।তার সাবধান বাণী কানেই তুলতে চাইনি।আজ আমার সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে তুমি নিজের গর্ভস্থ সন্তানকে সাথে নিয়ে এইভাবে স্যাকুবাসের বলি হবে...এ আমি কিছুতেই মেনে নেব না। তুমি নেমে এসো ওখান থেকে...! এই বলে ঋক ছুটে গিয়ে ময়ূরাক্ষীর হাত ধরে ওকে ওই বেদি থেকে টেনে নামিয়ে আনতে উদ্যত হল। ওই পাহাড়ী সুড়ঙ্গের সংকীর্ণ পথ ধরে... ময়ূরাক্ষী অবশেষে যেখানে পৌছাল... সেই জায়গাটা দেখে এবার ও বিস্ময়ে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেল।ও নিজের হাতে তখনো ক্রিস্টাল টি ধরে রেখেছিল।আর তার থেকেই উজ্জ্বল সাদা আলো নির্গত হয়ে চলেছিল... সেই আলোতে চারপাশটা ভালো করে দেখে... ময়ূরাক্ষী বুঝতে পারল...এটা আসলেই একটা প্রাচীন উপাসনালয়।এত সুন্দর একটা উপাসনালয় কোন দেবতার আরাধনা করার জন্য কবে তৈরি করা হয়েছিল...এর কোনো কূলকিনারা খুঁজে পেল না ময়ূরাক্ষী। হঠাৎ ও টের পেতে শুরু করল...ওর চারপাশে এক এক করে জড়ো হতে শুরু করেছে অনেক মানুষরূপী পিশাচিনীর বিকৃত দর্শন কায়া। প্রচন্ড আতঙ্কে এবার ওর গলা চিরে একটা চাপা আর্তনাদ বেরিয়ে এল। এবার হঠাৎ ওর হাতে ধরা ওই ক্রিস্টালটির ভিতর হতে কেউ যেন কথা বলে উঠল। "এখানে তোমাকে কেন আনা হয়েছে...সেটা জান?" ভীষণভাবে চমকে উঠল ময়ূরাক্ষী।ওর হাত থেকে ক্রিস্টালটা নীচে পড়ে গেল। তার ভিতর থেকে ফের কথা বলে উঠল একটি নারী কন্ঠস্বর! "তুমি নিজেকে স্বেচ্ছায় বলি দাও।নিজেকে ওদের ভোজ্য মাংস রূপে উৎসর্গ করো। একমাত্র এই উপায়েই তোমার ঋক চিরতরে সুস্থ হয়ে ওর পূর্বের জীবন ফিরে পাবে। নাহলে সারাজীবন ওর হাত দিয়ে জন্ম নিতে থাকবে স্যাকুবাসের লক্ষ লক্ষ প্রতিরূপ...আর গোটা পৃথিবী পরিণত হবে শ্মশান পুরীতে।" আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে ময়ূরাক্ষী বলে উঠল..."আমাকে ছেড়ে দাও...দয়া করে আমাকে এখান থেকে যেতে দাও... ঋককেও মুক্তি দাও...আমরা তো কোনো দোষ করিনি...!" ---"হ্যাঁ জানি... তোমাদের কারোরই কোনো দোষ নেই। কিন্তু এইটাই অদৃষ্ট।এটা মেনে নাও... স্বেচ্ছায় নিজেকে উৎসর্গ করো... ঋকের হাতে সৃষ্ট স্যাকুবাসের প্রতিরূপ ওই ক্ষুধার্ত পিশাচিনীদের খাদ্য হিসেবে। তুমি এখনো জানো না... তোমার গর্ভে রয়েছে একটি পুত্রসন্তান।ওরা তোমার শরীর ছিঁড়ে ওই সদ্যজাত পুরুষ শিশুর ভ্রূণ খাওয়ার জন্য উন্মত্ত হয়ে উঠেছে।ওই চেতনাহীন শিশুর মা হিসেবে তুমি যদি স্বেচ্ছায় ওই মাংস উৎসর্গ করো...এবং বাকি উদরপূর্তি জন্য উৎসর্গ করো নিজের শরীরের সব মাংস... তাহলেই সবকিছু রক্ষা পাবে।আর আমিও মুক্তি পাব চিরতরে।" ক্রিস্টালের ভিতর থেকে ওই বিদেহী আত্মা বলে উঠল। ভয়ে... ঘেন্নায় জড়োসড়ো হয়ে গেল ময়ূরাক্ষী। কিন্তু এই অবস্থাতেও...ওর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল একটা প্রশ্ন। ---"কে...কে তুমি?" ---"আমি?আমি সেই হতভাগিনী মেয়ে... যাকে...তার আপন পিতা স্বহস্তে হত্যা করেছিল। প্রায় হাজার বছর আগে...এই দক্ষিণ ভারতের রাজপরিবারের জন্ম নিয়েছিলাম আমি।আমার পিতা ছিলেন ভীষণ নিষ্ঠুর এবং অত্যাচারী রাজা। গরীবদের মানুষ বলেই গণ্য করতেন না তিনি। প্রয়োজনে নিজের পরিবারের মানুষদেরকেও তিনি নিজের হাতে হত্যা করতে পিছপা হতেন না। কিন্তু আমি...মনের দিক থেকে ছিলাম পিতার একেবারে বিপরীত চরিত্র।আর এই কারণে আমি চিরকালই পিতার চক্ষুশূল ছিলাম। যৌবনে পদার্পণ করতে...আমি এক দরিদ্র চিত্রশিল্পীর প্রেমে পাগল হয়ে উঠলাম।এখন তুমি যে পাহাড়ী টিলার ভিতরের সুড়ঙ্গের গহ্বরে দাঁড়িয়ে রয়েছ...এই জায়গায় ছিল এক আদিবাসী যাযাবরদের অস্হায়ী আস্তানা।ও এখানেই থাকত...একটা ছোট্ট ঝুপড়ি বেঁধে।আমি একদিন আমার দাসীদের সাথে ঘুরতে বেরিয়েছিলাম। হঠাৎ আমার চোখে পড়ে...এক সৌম্য দর্শন যুবক ছেলে... একটা গাছের তলায় আনমনে বসে ছবি আঁকছে।আমি মুগ্ধ দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে রইলাম।ওই পাহাড়ী সুড়ঙ্গের সংকীর্ণ পথ ধরে... ময়ূরাক্ষী অবশেষে যেখানে পৌছাল... সেই জায়গাটা দেখে এবার ও বিস্ময়ে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেল।ও নিজের হাতে তখনো ক্রিস্টাল টি ধরে রেখেছিল।আর তার থেকেই উজ্জ্বল সাদা আলো নির্গত হয়ে চলেছিল... সেই আলোতে চারপাশটা ভালো করে দেখে... ময়ূরাক্ষী বুঝতে পারল...এটা আসলেই একটা প্রাচীন উপাসনালয়।এত সুন্দর একটা উপাসনালয় কোন দেবতার আরাধনা করার জন্য কবে তৈরি করা হয়েছিল...এর কোনো কূলকিনারা খুঁজে পেল না ময়ূরাক্ষী। হঠাৎ ও টের পেতে শুরু করল...ওর চারপাশে এক এক করে জড়ো হতে শুরু করেছে অনেক মানুষরূপী পিশাচিনীর বিকৃত দর্শন কায়া। প্রচন্ড আতঙ্কে এবার ওর গলা চিরে একটা চাপা আর্তনাদ বেরিয়ে এল। এবার হঠাৎ ওর হাতে ধরা ওই ক্রিস্টালটির ভিতর হতে কেউ যেন কথা বলে উঠল। "এখানে তোমাকে কেন আনা হয়েছে...সেটা জান?" ভীষণভাবে চমকে উঠল ময়ূরাক্ষী।ওর হাত থেকে ক্রিস্টালটা নীচে পড়ে গেল। তার ভিতর থেকে ফের কথা বলে উঠল একটি নারী কন্ঠস্বর! "তুমি নিজেকে স্বেচ্ছায় বলি দাও।নিজেকে ওদের ভোজ্য মাংস রূপে উৎসর্গ করো। একমাত্র এই উপায়েই তোমার ঋক চিরতরে সুস্থ হয়ে ওর পূর্বের জীবন ফিরে পাবে। নাহলে সারাজীবন ওর হাত দিয়ে জন্ম নিতে থাকবে স্যাকুবাসের লক্ষ লক্ষ প্রতিরূপ...আর গোটা পৃথিবী পরিণত হবে শ্মশান পুরীতে।" আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে ময়ূরাক্ষী বলে উঠল..."আমাকে ছেড়ে দাও...দয়া করে আমাকে এখান থেকে যেতে দাও... ঋককেও মুক্তি দাও...আমরা তো কোনো দোষ করিনি...!" ---"হ্যাঁ জানি... তোমাদের কারোরই কোনো দোষ নেই। কিন্তু এইটাই অদৃষ্ট।এটা মেনে নাও... স্বেচ্ছায় নিজেকে উৎসর্গ করো... ঋকের হাতে সৃষ্ট স্যাকুবাসের প্রতিরূপ ওই ক্ষুধার্ত পিশাচিনীদের খাদ্য হিসেবে। তুমি এখনো জানো না... তোমার গর্ভে রয়েছে একটি পুত্রসন্তান।ওরা তোমার শরীর ছিঁড়ে ওই সদ্যজাত পুরুষ শিশুর ভ্রূণ খাওয়ার জন্য উন্মত্ত হয়ে উঠেছে।ওই চেতনাহীন শিশুর মা হিসেবে তুমি যদি স্বেচ্ছায় ওই মাংস উৎসর্গ করো...এবং বাকি উদরপূর্তি জন্য উৎসর্গ করো নিজের শরীরের সব মাংস... তাহলেই সবকিছু রক্ষা পাবে।আর আমিও মুক্তি পাব চিরতরে।" ক্রিস্টালের ভিতর থেকে ওই বিদেহী আত্মা বলে উঠল। ভয়ে... ঘেন্নায় জড়োসড়ো হয়ে গেল ময়ূরাক্ষী। কিন্তু এই অবস্থাতেও...ওর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল একটা প্রশ্ন। ---"কে...কে তুমি?" ---"আমি?আমি সেই হতভাগিনী মেয়ে... যাকে...তার আপন পিতা স্বহস্তে হত্যা করেছিল। প্রায় হাজার বছর আগে...এই দক্ষিণ ভারতের রাজপরিবারের জন্ম নিয়েছিলাম আমি।আমার পিতা ছিলেন ভীষণ নিষ্ঠুর এবং অত্যাচারী রাজা। গরীবদের মানুষ বলেই গণ্য করতেন না তিনি। প্রয়োজনে নিজের পরিবারের মানুষদেরকেও তিনি নিজের হাতে হত্যা করতে পিছপা হতেন না। কিন্তু আমি...মনের দিক থেকে ছিলাম পিতার একেবারে বিপরীত চরিত্র।আর এই কারণে আমি চিরকালই পিতার চক্ষুশূল ছিলাম। যৌবনে পদার্পণ করতে...আমি এক দরিদ্র চিত্রশিল্পী...বিজয়ের প্রেমে পাগল হয়ে উঠলাম।এখন তুমি যে পাহাড়ী টিলার ভিতরের সুড়ঙ্গের গহ্বরে দাঁড়িয়ে রয়েছ...এই জায়গায় ছিল এক আদিবাসী যাযাবরদের অস্হায়ী আস্তানা।ও এখানেই থাকত...একটা ছোট্ট ঝুপড়ি বেঁধে।আমি একদিন আমার দাসীদের সাথে ঘুরতে বেরিয়েছিলাম। হঠাৎ আমার চোখে পড়ে...এক সৌম্য দর্শন যুবক ছেলে... একটা গাছের তলায় আনমনে বসে ছবি আঁকছে।আমি মুগ্ধ দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে রইলাম। জাত...বংশ মর্যাদা... সমস্তকিছুর উর্দ্ধে গিয়ে আমি তাকে মন দিয়ে বসলাম।সব সংকোচ তুচ্ছ করে...আমি তাকে নিজের কাছে টেনে নিলাম। কিন্তু ক্রমে আমাদের গোপন প্রণয়ের খবর পিতাকে জানিয়ে দেয় তার এক গুপ্তচর।এটা শুনে পিতা আমার ওপর প্রচন্ড ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন এবং কারারক্ষীদের ডেকে আমাকে বন্দি করার নির্দেশ দেন। আমাকে হাতে পায়ে শিকল পরিয়ে কারাগারের পথে যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল... সেই সময়ে... প্রচন্ড চাকুরীর সাথে আমি ওই কারারক্ষীদের ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দিই...আর তারপর সেখান থেকে পালিয়ে যাই।বিজয়কে বিয়ে করে একটা শান্তির সংসার পাতবার স্বপ্ন দুচোখে ভরে নিয়ে...আমরা দুজনে বহুদূরে কোথাও পালিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতে যাওয়ার মূহুর্তে...আমরা দুজনে পিতার পাঠানো লোকেদের কাছে ধরা পড়ে যাই।পিতা আর আমার কোনো কথা শুনলেন না। আমার কোনো কথা আর শুনলেন না।আমাকে আর তাকে ধরে বেঁধে নিয়ে এলেন এই ভূগর্ভস্থ উপাসনালয়ের ভিতরে। যুদ্ধে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার জন্য... তিনি তন্ত্র সাধনার আশ্রয় নিতে শুরু করেছেন... এই ভয়ঙ্কর সত্যটা আমি ওইদিনই জানলাম। "তন্ত্র সাধনা?" বিস্মিত কন্ঠে অস্ফুটে উচ্চারণ করল ময়ূরাক্ষী। ---হ্যাঁ... তন্ত্র সাধনা। জনমানুষের অজ্ঞাতে... তিনি উপাসনা করতে শুরু করেছিলেন ভয়ঙ্কর অপশক্তি... স্যাকুবাসের! স্যাকুবাস কামুক নারীর রূপ নিয়ে প্রথমে পুরুষের মন ভোলায়।আর তারপর তাকে জ্যান্ত ছিঁড়েখুঁড়ে রক্তাক্ত করে...। তারপর ভক্ষণ করে ওই পুরুষের শরীরের সমস্ত মাংস।পিতা... গোপনে এই উপাসনালয় তৈরি করিয়ে... এখানে স্যাকুবাসের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনায় ছিলেন। ---"এটা কি তবে স্যাকুবাসের উপাসনালয়?" ---"হ্যাঁ। তুমি ঠিকই বুঝেছ।এই উপাসনালয়ে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করার মাহেন্দ্রক্ষণেই আমাদের দুজনকে এখানে ধরে আনা হয়েছিল।ওই সময়ে শুধু দরকার ছিল একজন মাধ্যম...যে তার সারাটা জীবন ধরে... জন্ম দিয়ে যাবে স্যাকুবাসের হাজারো সত্ত্বা। আমি পিতার পায়ে কেঁদে পড়ে প্রার্থনা করেছিলাম... আমাদের দুজনকে তিনি যেন আলাদা না করেন...! আমার আকুতি শুনে গম্ভীর কন্ঠে তিনি বলেছিলেন..."বেশ।তুমি হলে আমার ঔরসজাত সন্তান। তোমার প্রার্থনা আমি নিশ্চয়ই শুনব। কিন্তু তোমাকে তোমার কৃতকর্মের শাস্তি পেতেই হবে।" আমি বলেছিলাম..."আপনি যা সাজা দেবেন...আমি তাই মাথা পেতে নেব পিতা...!" ---"তারপর কি হল?" বিস্মিত কন্ঠে জিজ্ঞাসা করল ময়ূরাক্ষী। ---"তারপর?পিতা সেই মাধ্যম হিসেবে বেছে নিলেন আমার বিজয় কে।তিনি তাঁকে মৃত্যুদন্ড দিলেন না। ভয়ঙ্কর এক তন্ত্র সাধনা করে তিনি তার ভিতরে প্রবেশ করালেন অপশক্তির বীজ। এরপর নিজের হাতে আমার শিরশ্ছেদ করলেন।আর তারপর আমার আত্মাটা একটা পাথরের ভিতরে বন্দি করে ফেললেন।এরপর ওই পাথরটা...একটা অপূর্ব দর্শন ক্রিস্টালের রূপ নিল। পিতা আমার কথা রেখেছিলেন...।ওইদিনের পর থেকে ওই ক্রিস্টালটিই আমার বিজয়ের একমাত্র অবলম্বন।সে চাইলেও আর এই ক্রিস্টালটিকে নিজের কাছছাড়া করার ক্ষমতা ওর ছিল না। এরপর পিতা তাকে মুক্তি দিলেন। সেই দিনের পর...তার হাতের রংতুলি দ্বারা অঙ্কিত হতে শুরু করল... অপূর্ব সুন্দরী নারীর অবয়ব।আর তারপর...তারা ওর সঙ্গে সঙ্গমে লিপ্ত হত।এটা তার নেশায় পরিণত হল।প্রতিরাতে...ওর ভিতরে জেগে উঠতে থাকল... কাম ক্ষুধায় ছটফট করতে থাকা পুরুষ সত্ত্বা...যার ভিতরে প্রেম... ভালোবাসার কোনো অস্তিত্ব ই নেই।ওই দুর্নিবার নেশার কবলে পড়ে... প্রতিরাতে ও একটা করে নারী অবয়ব সৃষ্টি করত আর সে রক্তমাংসের নারীর রূপ নিয়ে বেরিয়ে আসার পর তার সঙ্গে সম্ভোগে মত্ত হয়ে উঠত। সম্ভোগের পর ও গভীর ভাবে নিদ্রামগ্ন হয়ে পড়ত।আর তারপর চিত্র হতে সৃষ্ট...জীবন্ত ওই নারী পরিণত হত পুরুষ মানুষের মাংসখাকী পিশাচ... স্যাকুবাসে! পিতা তাদের ব্যবহার করতে শুরু করেন... নিজের শত্রু দমনের কাজে।এই পিশাচদের নিজের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন পিতা।তাই পৈশাচিক হত্যার শিকার তারাই হত...যারা পিতার শত্রু ছিল।অন্য কোনো পুরুষের কোনো ক্ষতি ওরা করত না। আমার ভালোবাসার মানুষের হাতেই সৃষ্টি হয় ওই অপশক্তির হাজারো বীজ।এই কারণে ওই পিশাচিনীদের দ্বারা ওর ও কোনো ক্ষতি হওয়ার পথ বন্ধ ছিল। কিন্তু হঠাৎ পিতা... কোনো আততায়ীর হাতে খুন হয়ে যান।পিতার মৃত্যুর পর... বিজয়ের হাতে সৃষ্ট পিশাচিনীদের নিয়ন্ত্রণ করার মতো আর কেউ রইল না।এবার তারা হয়ে উঠল নিয়ন্ত্রণহীন... লাগামছাড়া।তারা ইচ্ছামতো যেকোনো নিরীহ সাধারণ মানুষকে ওদের শিকার বানাতে শুরু করল। চারপাশে এই পৈশাচিক হত্যালীলা দেখে... বিজয় তখন উপলব্ধি করল... এইভাবে নির্বিচারে এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড চলতে থাকলে... গোটা পৃথিবীটা একদিন শ্মশানে পরিণত হবে। কিন্তু এখন চাইলেও তার সাথে থাকা এই ক্রিস্টালটা পরিত্যাগ করার ক্ষমতা ওর নেই।আর এই ক্রিস্টাল ওর সঙ্গে থাকার কারণেই...যে প্রতিরাতে আমার সঙ্গে মিলিত হওয়ার বাসনা... ওকে টেনে নিয়ে চিত্র তৈরী করার জন্য টেনে আনে... এটাও ও স্পষ্টভাবে বুঝতে শুরু করেছিল।ওর ই হাত দিয়ে প্রতিদিন জন্ম নিচ্ছে নরমাংসখাকী স্যাকুবাস...এটা ও যত বুঝতে শুরু করে...তত নিজের প্রতি ঘৃণা আর অদম্য পাপবোধের তাড়নায় পাগল হয়ে জলে...পাথরে... অন্তরীক্ষে... উন্মাদের মতো মাথা কুটতে আরম্ভ করে।এই অপশক্তিকে স্তব্ধ করার মন্ত্র ওর জানা ছিল না। নিজেকেই নিজে উন্মাদের মতো আঘাত করতে করতে...এই উপাসনালয়ে ক্রিস্টালটি রেখে...এর থেকে পরিত্রাণ পেতে মাথা কুটে ও প্রাণত্যাগ করে অবশেষে। এরপর...ওর বিদেহী আত্মা এই উপাসনালয়ের আশেপাশেই ঘোরাফেরা করে মুক্তির তৃষ্ণা বুকে নিয়ে।আর আমিও ক্রিস্টালের ভিতরে ছটফট করে চলেছি মুক্তির জন্য। কান্না জড়ানো কন্ঠে এই কথা বলে... এবার স্তব্ধ হয়ে গেল ক্রিস্টালের ভিতরে বন্দি ওই বিদেহী আত্মা। ---"সবটা বুঝলাম... তোমাদের দুজনের সাথে যা হয়েছে...তা নিঃসন্দেহে অন্যায়... দুঃখজনক। কিন্তু তুমি আমাকে কেন বলি দিতে চাইছ স্যাকুবাসের কাছে?কেন আমার পেটের সন্তানকে ভেট হিসেবে নিবেদন করতে চাইছ?বলো... উত্তর দাও...!" ভূগর্ভস্থ এই উপাসনালয়ের বাতাসের প্রতিটি কণা কাঁপিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল ময়ূরাক্ষী। ---"তোমাকে বলি দিতে চাইছি... কারণ... স্যাকুবাসকে...এই পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করার উপায় মাত্র একটাই... স্যাকুবাসের চাই পুরুষ মানুষের শরীরের মাংস।আর কোনো পুরুষ যদি স্বেচ্ছায় নিজেকে স্যাকুবাসের কাছে নিজেকে উৎসর্গ করে... তাহলেই এই অপশক্তি এই পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।আমার কথা কোনো পুরুষের কর্ণগোচর হওয়া সম্ভব নয়।তাই ঋককে আমি শত চেষ্টা করেও কিছু বলতে পারিনি।ওর কাছে আমি একটা জড়বস্তু ভিন্ন আর কিছুই ছিলাম না।তোমাকে আমি সব কথা বলতে পেরেছি... কারণ... তুমি নারী।তোমার গর্ভে এখন একটি পুরুষ সন্তান রয়েছে...ওই সন্তান যদি তুমি স্বেচ্ছায় স্যাকুবাসের খাদ্য হিসেবে অর্পণ করে নিজেকে বলি দাও... তাহলেও তা একইভাবে ফলপ্রসূ হবে। স্যাকুবাস চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে পৃথিবীর বুক থেকে...ঋক সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবে...আর পরিশেষে আমরা দুজন মুক্তি পাব চিরতরে...!" ক্রিস্টালের ভিতর থেকে ওই বিদেহী আত্মা বলে উঠল। ভূগর্ভস্থ উপাসনালয়ের ভিতরে কয়েক মূহুর্ত বিরাজ করল পিন পড়া নৈঃশব্দ্য। হঠাৎ ময়ূরাক্ষী বলে উঠল..."আমি রাজি।আমি স্বেচ্ছায় স্যাকুবাসের খাদ্য হিসেবে নিজেকে... আমার পেটের সন্তানকে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত।" কান্নাভেজা কন্ঠে নিজের পেটে হাত বোলাতে বোলাতে করুণভাবে বলে উঠল ময়ূরাক্ষী। ময়ূরাক্ষীর এই কথা শুনে... ক্রিস্টালটি যেন আরো সহস্রগুণ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।চারপাশে এক এক করে এসে ভীড় করল... ঋকের হাতে সৃষ্ট স্যাকুবাসের প্রতিরূপ...পিশাচিনীগুলি। ওদের বিকৃত অট্টহাস্যের পৈশাচিকতায় এই ভূগর্ভস্থ উপাসনালয়ের বাতাসের প্রতিটি কণায় ছড়িয়ে পড়ছে মৃত্যুর ভয়ঙ্কর শিহরণ! হঠাৎ উথলে ওঠা বিকট পচা দুর্গন্ধের দাপটে...ময়ূরাক্ষীর মনে হল...ওর সাত জন্মের অন্নপ্রাশনের ভাত উগরে বেরিয়ে আসার উপক্রম হয়েছে। ---"তবে আর দেরি কেন!যাও... তোমার শরীরের সমস্ত পোশাক খুলে রেখে...মাঝখানে যে উঁচু বেদীটা দেখছ... ওইখানে এসে বসে পড়ো।আর তারপর আমার বলা মন্ত্রগুলো উচ্চারণ করতে শুরু করো...!" ক্রিস্টালের ভিতর থেকে বলে উঠল ওই নারী কন্ঠ। ময়ূরাক্ষী স্তব্ধ হয়ে...নির্বিবাদে...এক এক করে খুলে ফেলতে শুরু করল নিজের সমস্ত পোশাক। তারপর এক পা এক পা করে হেঁটে গেল উপাসনালয়ের কেন্দ্রস্থলে।ও দেখল... একটা উঁচু বেদী রয়েছে।ও ধীরপায়ে সেই বেদীতে উঠে গিয়ে বসল। ক্রিস্টালের ভিতর থেকে...বাতাস কাঁপিয়ে নির্গত হতে শুরু করল দুর্বোধ্য কিছু মন্ত্র।হিসহিস শব্দে... লোভাতুর ক্ষুধানিবৃত্তির উল্লাস শুরু হল ওই বিকট দর্শন পিশাচিনীদের ভিতরে।টপ টপ করে মাটিতে ঝরতে শুরু করল ওদের আঠালো লালা! সম্পূর্ণ নগ্ন শরীরে...ময়ূরাক্ষী বেদীর ওপর বসে...আর কোনোকিছুতে ভ্রূক্ষেপ না করে... একাগ্রচিত্তে শুধু শুনে শুনে উচ্চারণ করে চলল ওই মন্ত্র। ধীরে ধীরে...ওর নগ্ন শরীরের চারপাশে তৈরি হয়ে উঠতে শুরু করল...এক রক্তাভ আবরণ।ওর মুখমন্ডলটুকু বাদে... পুরো শরীরটাই আস্তে আস্তে ঢেকে যেতে শুরু করল। হঠাৎ বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো... সেখানে শোনা গেল একটি পুরুষ কন্ঠের চিৎকার। চমকে উঠল ময়ূরাক্ষী।ও ভালো করেই বুঝতে পারছে...এ আর কারোর নয়... ঋকের গলা! এবার আতঙ্কিত কন্ঠে ময়ূরাক্ষী চিৎকার করে উঠল..."ঋক... তুমি এখানে কি করছ? এক্ষুনি তুমি চলে যাও এখান থেকে।" ---"না ময়ূরাক্ষী...আমি আর তোমাকে একা ফেলে দূরে চলে যাব না।ওই ক্রিস্টালটা তোমার সাথে ওই বাংলো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই আমার সবকিছু মনে পড়ে গেছে। নিবারণ কাকা তোমার ব্যাপারে বিস্তারিতভাবে সমস্তকিছু লিখে দিয়ে গেছে একটা কাগজে।আমি ওই চিঠি পড়ে তোমার ব্যাপারে সমস্ত সত্যিটা জানতে পেরেছি।তোমাকে আমি অনেক কষ্ট দিয়েছি ময়ূরাক্ষী...আমার জন্য তুমি এতদিন অনেক কষ্ট সয়েছ।আর আমি তোমাকে কোন কষ্ট পেতে দেব না। এইখানে আমি...একজন পূর্ণবয়স্ক যুবক পুরুষ... স্বেচ্ছায় নিজেকে সঁপে দেব ওদের খাদ্য হিসেবে।আমি এতক্ষণ আড়ালে থেকে সবটাই শুনেছি।" বলে উঠল ঋক। ---"না... তুমি আমার কথা শোন... এখানে এখন তোমার খুব বিপদ... তুমি এখান থেকে চলে যাও।" ভয়ার্ত কন্ঠে বলে উঠল ময়ূরাক্ষী। ---"না... তোমাকে মৃত্যুর মুখে আমিই ঠেলে দিয়েছি।আমার সন্তান এখন তোমার গর্ভে... তাকে তুমি স্যাকুবাসের ক্ষুধার বলি হতে দিও না। এখানেই আমি ওই ক্রিস্টালটা পাই।ওই সময়ে বাইরে একজন আমাকে বারে বারে এখানে পা বাড়াতে নিষেধ করত। কারণ ও জানত... কোনো পূর্ণবয়স্ক যুবক পুরুষকে নিজের কাছে টেনে আনার জন্য সবসময় মরিয়া হয়ে থাকে এই সহস্র বর্ষ প্রাচীন উপাসনালয়।ও জানত... সহস্র বছর আগে...ওর হাতের সৃষ্ট নারী অবয়বগুলি যে পৈশাচিক হত্যালীলা চালিয়ে গিয়েছিল...ওই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে চলেছে আমার হাত দিয়ে।আমি তাকে পাগল ভেবে তাড়িয়ে দিয়েছি।তার সাবধান বাণী কানেই তুলতে চাইনি।আজ আমার সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে তুমি নিজের গর্ভস্থ সন্তানকে সাথে নিয়ে এইভাবে স্যাকুবাসের বলি হবে...এ আমি কিছুতেই মেনে নেব না। তুমি নেমে এসো ওখান থেকে...! এই বলে ঋক ছুটে গিয়ে ময়ূরাক্ষীর হাত ধরে ওকে ওই বেদি থেকে টেনে নামিয়ে আনতে উদ্যত হল। প্রচন্ড বলপ্রয়োগের দ্বারা টেনে হিঁচড়ে ময়ূরাক্ষীকে বেদী থেকে নামিয়ে আনল ঋক। ময়ূরাক্ষী ছিটকে গিয়ে সজোরে পড়ল শক্ত পাথরের গায়ে।আর সাথে সাথে মাথা ফেটে ও চেতনা হারাল। এবার ঋক নিজেকে সম্পূর্ণরূপে বস্ত্রমুক্ত করে...ওই বেদিতে গিয়ে বসল।আত্ম উৎসর্গের মন্ত্রোচ্চারণে কাঁপিয়ে তুলল বাতাসের প্রতিটি কণা।ওর মন্ত্রোচ্চারণ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই ওর নিজের হাতে সৃষ্ট স্যাকুবাসের সমস্ত জীবন্ত প্রতিরূপ পিশাচিনীগুলি নরমাংস ভোজনের আনন্দে উল্লসিত হয়ে উঠল।সোল্লাসে...ওরা ঋকের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়তে যাবে...এমন সময়ে... হঠাৎ একটা বলপূর্বক ধাক্কায় দূরে ছিটকে পড়ে গেল ঋক। চমকে উঠে তাকিয়ে...ও যাকে দেখল... তাকে এখন এই জায়গায় এই অবস্থায় দেখে... প্রচন্ড অবাক হয়ে গেল।এ যে নিবারণ কাকা! ---নিবারণ কাকা তুমি?" বিস্ফারিত চোখে সবিস্ময়ে প্রশ্ন করল ঋক। ---"হ্যাঁ আমি।আমি তোমাকে এই ভয়ঙ্কর বিপদের মধ্যে রেখে চলে যেতে পারি?আমি এই কদিন তোমার আশেপাশেই ছিলাম। তোমার দিকে নজর রাখছিলাম যাতে কোনো বিপদ না হয় তোমার... তুমি এক্ষুনি ময়ূরাক্ষী মাকে নিয়ে পালাও এখান থেকে...!এই ভূগর্ভস্থ উপাসনালয়ের দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে বসেছে।তোমার আত্মোৎসর্গের সত্ত্বাখানি আমি নিলাম।ওই পিশাচ রা আমার শরীরের মাংস ভক্ষণ করে... চিরতরে বিদায় নেবে এই পৃথিবী হতে।দরজা বন্ধ হয়ে পড়তে আর বেশি সময় বাকি নেই। তাড়াতাড়ি পালাও দাদাবাবু...!" সত্যিই... চারপাশে শুরু হয়েছে ধ্বংসলীলা।এই উপাসনালয়ের দেওয়াল...পাথর ভেঙ্গে খসে পড়তে আরম্ভ করেছে। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ ও গতিতে ভূগর্ভস্থ উপাসনালয়ের ভিতরে...এক ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। নিবারণ কাকাকে এখানে একা ফেলে এইভাবে পালিয়ে যেতে ঋকের মন কিছুতেই সায় দিল না। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে আর কিছুক্ষণ এখানে থাকলে... তিনজনকেই এইখানে সমাধিস্থ হতে হবে। নিবারণ কাকার কথা শেষ না হতেই... তীক্ষ্ণ স্বদন্ত নিয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল বিকট দর্শন পিশাচদের দল।মহা উল্লাসে তারা নিবারণ কাকার সারা শরীর ছিঁড়ে খুবলে খেতে আরম্ভ করে নর মাংস! মর্মভেদী আর্তচিৎকারে ওর রক্ত শীতল হয়ে উঠল।আর তার সাথে সাথে...উজ্জ্বল সাদা ক্রিস্টালটি ক্রমশ পরিণত হতে শুরু করল একটা কালো পাথরে!ওই পৈশাচিক দৃশ্য চাক্ষুষ করে... দুচোখে অন্ধকার দেখল ঋক।অমানুষিক আতঙ্কে ও ক্ষণিকের জন্য স্হির হয়ে গেল।কিন্তু পর মূহুর্তেই ওর শুনতে পেল... ময়ূরাক্ষীর মুখ থেকে বেরিয়ে মৃদু শব্দ বেরিয়ে আসছে।ঋক ময়ূরাক্ষীর মুখের কাছে কান পেতে শোনার চেষ্টা করল...ও কি বলতে চাইছে।কান পেতে ও শুনতে পেল... ময়ূরাক্ষী অনর্গল শুধু একটাই কথা বলে চলেছে। "এখান থেকে পালাও ঋক... এখান থেকে পালাও!" সাথে সাথে ওর মাথার কাছ ঘেঁষে আছড়ে পড়ল বিরাট পাথরের একটা চাঁই। চারদিকে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে।ঋক বুঝল...এই উপাসনালয় আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ধ্বংস হয়ে যাবে।যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ময়ূরাক্ষীকে সাথে নিয়ে ওকে পালাতে হবে এখান থেকে।আর কালবিলম্ব না করে...ঋক ময়ূরাক্ষীকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল নিজের দুই হাতে। তারপর ভূগর্ভস্থ ওই উপাসনালয়ের বাইরে বেরোনোর পথ ধরল।ওই সংকীর্ণ পথ ধরে... কোনোমতে ওরা বেরিয়ে এল অবশেষে...ওই অতল মৃত্যুপুরী হতে...! আজ ঋক আর ময়ূরাক্ষীর ফুলশয্যার রাত। আকাশে সুন্দর গোল চাঁদ উঠেছে।ঋক... ময়ূরাক্ষীর হাত ধরে সকলের অলক্ষ্যে উঠে এসেছে বাড়ির ছাদে। ---ঋক... ময়ূরাক্ষীর পেটে আলতো হাত বুলিয়ে বলল... "বিয়ের এক বছরের মাথাতেই বাড়িতে নতুন অতিথির আগমন ঘটতে চলেছে...এটা যখন সবাই জানতে পারবে... তখন সবাই ভীষণ খুশি হবে।" একটা খুশির হাসি চলকে উঠল ময়ূরাক্ষীর চোখেমুখে। ---"আমাদের বাবারা পুরোন শত্রুতা ভুলে শেষ পর্যন্ত ধূমধাম করে আমাদের বিয়ে দিলেন... এইটাই অনেক বড়ো প্রাপ্তি।" ---"হ্যাঁ...তা যা বলছ।তবে পৃথিবীর সকল বাবাদের থেকে আমি কিন্তু অ্যাডভান্স। অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর পেটে ছেলে সন্তান আছে না মেয়ে সন্তান...এটা সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগে বিনা পরীক্ষায় জানা সম্ভব নয়।কিন্তু আমি তো এখন থেকেই আমার ছেলের জন্য জাম...খেলনা কিনতে শুরু করব।" ---"হ্যাঁ তা যা বলছ।আর শোন...কাল পরশু কিন্তু নিবারণ কাকার শেষকৃত্য সম্পন্ন করব।ওই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়াতে চারদিকে সব মানুষের মনে এখন স্বস্তি এসেছে। কিন্তু এর পিছনে লুকিয়ে থাকা আসল রহস্য জানে না কেউই...!কিন্তু আমরা তো জানি...ওই মানুষটা সেদিন আমাদের বিপদে ওইভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্ম বলিদান করেছিলেন বলেই আজ আমরা এইভাবে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি।" বলে উঠল ময়ূরাক্ষী। ঋক ময়ূরাক্ষীর কথায় সম্মতি জানিয়ে বলে উঠল... ---"হ্যাঁ...সে তো অবশ্যই... কলকাতায় ফেরার পর এই কথাটা আমার মাথায় রয়েছে। মানুষটা যখন কাছে ছিল...তখন কারণে অকারণে কত গালমন্দ করেছি। নিবারণ কাকা যে আসলেই আমাদের পরিবারেরই একজন হয়ে উঠেছিল...সেটা বুঝতেই বড় দেরি হয়ে গেল...! সমাপ্ত

