STORYMIRROR

Rashmita Das

Horror Fantasy Thriller

4  

Rashmita Das

Horror Fantasy Thriller

নরকের দ্বার

নরকের দ্বার

34 mins
2

প্রাসাদ তুল্য বাড়ি জুড়ে কদিন ধরে উৎসবের আমেজ।সকাল থেকে রাত পর্যন্ত লোক সমাগম লেগেই আছে।চৌধুরী পরিবারের এই বংশে নতুন প্রজন্মের প্রদীপ জন্ম নিয়েছে।তাই সারা বাড়িতে এখন আত্মীয় সমাগম,আলোর সজ্জা,খুশির রোশনাই।কিন্তু এতসবকিছুর ভীড়ে রৌনক যেন বড় একাচোরা,চুপচাপ।মুখজুড়ে যেন একরাশ দুচিন্তার কালোমেঘের ঘনঘটা।সে লোকজনের ভীড় এড়িয়ে নিরালায়,কখনো ছাদে,কখনো বা বাগানে গিয়ে মুষ্ঠিবদ্ধ দুই হাতের তালুর ওপর চিবুকখানি রেখে আকাশের দিকে চেয়ে বড়ো উদাসী।পড়াশোনায় মন বসছে না কিছুতেই।দুশ্চিন্তার ওর দুটি কারণ আছে।এক,সামনের সপ্তাহেই ওর চাকরির ইন্টারভিউ,আর দুই,স্নেহা।প্রথমটির তুলনায় দ্বিতীয়টির জন্য জন্য অত্যন্ত জটিল পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে রৌনক।কলেজে প্রথম বর্ষ থেকে ফুলের মতো নিষ্পাপ আর সুন্দর এই সরল মেয়েটিকে ভালোবেসে এসেছে রৌনক এবং এখন তারা পরস্পরকে জীবনসঙ্গী করতে অঙ্গীকারবদ্ধ।তাদের দুজনের মধ্যে কার সামাজিক প্রতিপত্তি আর বংশমর্যাদা আছে,কার নেই...এইসব নিয়ে তারা কোনোদিনও ভাবেনি।কিন্তু আজ যখন রৌনক একজন গরীব কেরানীর মেয়ের হাত ধরে বাবা মায়ের সামনে এসে বিয়ে করার কথা বলেছিল,তখন স্নেহাকে দেখে তাঁদের প্রথমটায় ভারি পছন্দ হয়ে গেলেও তার বাবার সাধারণ মানের অল্প মাইনের চাকরি আর সাধারণ মানের জীবনযাপন করা পারিবারিক পরিচয় পেয়ে সাথে সাথে থমকে গেলেন বাবা মা দুজনেই।তাঁরা রৌনককে সাফ জানিয়ে দিলেন,একজন অতি সাধারণ বিত্ত...কেরানির মেয়েকে পুত্রবধূ করলে তাঁদের বংশমর্যাদা আর সামাজিক প্রতিপত্তি ধূলোয় মিশে যাবে।তাই সে যেন এই মেয়েকে বিয়ে করার চিন্তাটা মাথা থেকে একেবারে ঝেড়ে ফেলে।মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে রৌনক।সামাজিক প্রতিপত্তি আর বংশমর্যাদা,এই নিয়ে তাদের বিরাট যৌথ পরিবারের দম্ভের আস্ফালনের যে সুদৃঢ় ভিতটি সে ছোট থেকে চাক্ষুষ করে এসেছে,তার প্রতিটি ইঁটই আসলে দামী শ্যাম্পেন ও মদের ফোয়ারা ছেটানো ব্যয়বহুল পার্টি,আহার অনুষ্ঠান,এবং দামী গাড়ি,পার্থিব সুখস্বাচ্ছন্দ্যের ঝকঝকে রাজমহল গড়ে তার চমক ও ঝলকানি দিয়ে মানুষের সমীহ আদায় বই আর কিছুই নয়,এটা একটু জ্ঞান বয়স থেকেই উপলব্ধি করেছে রৌনক।কিন্তু ও ছেলেবেলা হতেই সকলের থেকে কিছুটা ভিন্ন চিন্তা,কিছুটা নিজস্বতা নিয়েই বড় হয়ে উঠেছে।ও উৎসব অনুষ্ঠানে সোনার চেন,বিদেশী ব্র্যান্ডের দামী জামাকাপড় পরে যেত বলে ওর কখনোই মনে হয়নি,পাশের যে বাচ্চা ছেলেটিকে তার বাবা মা তুলনামূলকভাবে কমদামী পোশাক পরিয়ে এনেছেন,সে ওর অবজ্ঞা বা অপমানের পাত্র।মূল্যবোধ ও মতাদর্শ নিয়ে এই সংঘাত ওর সাথে ওর পরিবারের যে কোনোদিনই বন্ধ হওয়ার নয়...সেটা পরিষ্কার বোঝে রৌনক।তাই সে এখন একটা চাকরির জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করে যাচ্ছে।ও জানে,একবার নিজের পায়ের তলার জমিটা শক্ত করে নিলে পরেই অনেক মুশকিল আসান হয়ে যাবে।ইতিমধ্যে এখন ওর জেঠতুতো দাদার ছেলে জন্মানো উপলক্ষে সারাবাড়ি জুড়ে চলছে উৎসবের আবহ আর লোকসমাগম।এই বংশের নতুন প্রজন্মের প্রথম প্রদীপ আসার উপলক্ষে কদিন ধরে চলা এই কাঙালিভোজনে উৎসব অনুষ্ঠানের আবহে ও ওর নিজের জীবনের এই জটিলতর আবর্তের তীরে দাঁড়িয়ে,যেন বড় একা...বড় অসহায়। বড় রাজপরিবারের বংশের ছেলে রৌনক।রাজত্ব এখন আর নেই।কিন্তু ঠাঁটবাট,বংশের জৌলুস এবং পারিবারিক বংশমর্যাদার ঐতিহ্য নিয়ে এখনো সেই ঔজ্জ্বল্য হারায়নি।নানা বিদেশি আধুনিক ডিজাইনের আসবাবপত্র ও শৌখিন দ্রব্য দিয়ে বাড়ির অন্দরমহলের প্রতিটি কোণার আধুনিকীকরণ করা হলেও ঝকঝকে পোচ দেওয়া এই রাজবাড়িটা আসলে শতাধিক বছরের পুরোনো।গীর্জার প্রার্থনাসভার প্রায় দ্বিগুণ আয়তনের এই বাড়ির বৈঠকখানা।প্রতিটি ঘরেই ছোটখাটো ফুটবল ম্যাচের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।রাজকীয়তার দম্ভ যেন এই বাড়ির প্রতিটি ইঁটে বিদ্যমান।অসংখ্য ঘরগুলির সিঁড়ির কাছে একটি ঘর সবসময়ই তালাবদ্ধ থাকে।এই বন্ধ ঘরটির সাথে একটি গুপ্ত ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে।ঘরটি নাকি অভিশপ্ত।এই ঘরটিতে প্রবেশ করা বারণ।যদিও কখনো সখনো এই ঘরের তালা খুলে ঢোকা হয়,ঝাড়পোছ করার জন্য...কিন্তু ঘরের পূর্বদিকের জানালাটা খোলা নিষিদ্ধ।একটা অভিশাপ আছে ওই জানালাটায়।ওই ঘরের দিকে পা বাড়ানোতেও সকলের মনে একটা ভীতি কাজ করে। রৌনক অবশ্য ঘরের ভিতরকার ঘর,বারান্দা,দরজা,জানলা...এইসব নিয়ে কোনোদিনই খুব একটা মাথা ঘামায়নি।বহু বছর পূর্বে ওদের এই  রাজবাড়ীতে এক তান্ত্রিক এসেছিলেন কয়েকদিনের আশ্রয় চেয়ে।পরিবারের সকলের মুখে মুখে ঘুরে আসছে এই গল্প।ওই তান্ত্রিককে থাকতে দেওয়া হয়েছিল এই ঘরে।এই রাজবাড়ির পূর্বপুরুষ তথা তৎকালীন রাজা তাঁকে নিজ শয্যাকক্ষের কাছাকাছি বেশ খাতির আপ্যায়ন করেই রেখেছিলেন তাঁর মতো অলৌকিক শক্তিধারী...অপার ক্ষমতাসম্পন্ন এক তান্ত্রিক ও তন্ত্রসাধনার যাবতীয় সুফলকে তাঁর হাতের মুঠোয় আনবার জন্য।কোনো এক অজ্ঞাত কারণে...তান্ত্রিকের সাথে রাজার প্রবল মতবিরোধ আরম্ভ হয়।প্রায়দিন তাঁদের প্রবল বাকবিতন্ডা কথা কাটাকাটি হত।কিন্তু তবু...এই ভীষণ শক্তিধারী তন্ত্রক্ষমতাসম্পন্ন তান্ত্রিককে হাতের মুঠোয় রাখার তাগিদেই তিনি প্রতিটি বাকবিতন্ডা ও বিবাদের পরক্ষণেই তান্ত্রিককে নরম স্বরে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ঠান্ডা করতেন আর তাঁর রুষ্ট হয়ে রাজবাড়ী থেকে বিদায় নেওয়া হতে প্রতিবারই আটকাতেন।এইভাবে বেশ কিছুদিন কাটবার পর তান্ত্রিকের মন রাজবাড়ী থেকে ক্রমশ বিমুখ হতে হতে একটা সময় তিনি রাজবাড়ী থেকে বিদায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন।তিনি তাঁর ঝোলা গুছিয়ে টুছিয়ে দুই তিনদিনের মধ্যেই রওনা দেবেন।এরই মধ্যে একদিন এক নিস্তব্ধ দুপুরে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতোই তান্ত্রিকের এই ঘরের দরজায় পদাঘাত করে ঢুকে পড়ে একদল রাজকর্মচারী।আর তারপর সে ঘরে ঢুকলেন রাজা স্বয়ং।রাজা নিস্পৃহ কন্ঠে বললেন..."তুমি রাজবাড়ির অনেক কথা জেনে ফেলেছ তান্ত্রিক।তোমাকে তো আর এই রাজবাড়ী হতে এত সহজে মুক্তি দেওয়া যায় না...!' এই বলে তিনি তাঁর দুই হাতে সজোরে তালি দিলেন।সাথে সাথে রাজকর্মচারীর দল এসে তান্ত্রিকের হাত পা শক্ত করে বেঁধে ফেলল।রাজা তাঁর অসি হতে মুক্ত করলেন তাঁর সুবিশাল তরবারি।জানলা দিয়ে প্রবেশ করা সূর্যের আলো তার ওপর পড়ে...তা আপন তেজোদৃপ্ততার স্বমহিমায় ঝলসে উঠল।পরক্ষণেই তা স্নান করল তান্ত্রিকের হৃৎপিন্ড ফুঁড়ে চলকে ওঠা তাজা রক্তে।এরপর তান্ত্রিকের দড়ি দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বাধা রক্তাক্ত মৃতদেহটি রাজকর্মচারীরা ধরাধরি করে এই ঘরের জানলা দিয়ে ছুঁড়ে নিক্ষেপ করে দিয়েছিল অনতিদূরে।আর তারপর জানলাটি বন্ধ করে,তান্ত্রিকের সব জিনিসপত্র...পোঁটলাপুটলি ঘর থেকে বার করে ঘরটি সাফসুতরো করে...ঘরটির দরজা বন্ধ করে তালা দিয়ে চলে যায় যে যার কাজে...রাজা চলে যান নাচমহলে।তারপর হতেই শোনা যায়...এই ঘরের জানলাটি অভিশপ্ত।ঘরটি পারতপক্ষেও খোলা টোলা হয় না।সবাই ঘরটিকে কেমন একটা এড়িয়ে চলে।একটা চাপা ভয়...একটা আতঙ্ক...খোপের অন্ধকার ফুঁড়ে সর্বদা বার হতে চায়...এখনো...এই এত প্রজন্ম পরেও। এখন চারদিকে আনন্দ উৎসবের মেজাজ।সারা বাড়ির কোথাও এতটুকু নিরিবিলি জায়গা পাবার পর্যন্ত জো নেই।শুধুমাত্র এই ঘরটির কাছাকাছি এসে পৌঁছলাই মনে হয়...বাতাস কেমন যেন নিস্তব্ধ...ভারি...থমথমে।এখন রৌনক কোনোভাবে...একটা চাকরির ব্যবস্হা করার জন্য একেবারে মরিয়া।এই প্রাচুর্য আর বিলাস সর্বস্ব সোনার খাঁচা থেকে নিজেকে মুক্ত করে খোলা আকাশের সামনে জীবনের শুন্য পাত্রখানি মেলে ধরার এটিই হল একমাত্র উপায়।তাই রৌনক এখন এই উৎসব মুখর বাড়িটিতে খুঁজছে একটু নিরিবিলি স্হান...যেখানে বসে ও ওর চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারবে।ভ্রাতুষ্পুত্রের জন্ম উপলক্ষে...বাড়ি জুড়ে যে উৎসব অনুষ্ঠান চলছে...সেটা উপেক্ষা করে অন্যত্র কোথাও যাবার পর্যন্ত অনুমতি নেই এখন ওর।অতএব ও এখন শুধু খুঁজছে একটু ফাঁকা...নিরিবিলি একটা জায়গা...যেখানে ও ওর পরীক্ষার প্রস্তুতিটা সেরে নিতে পারবে।ওর এই চাকরি বা ইন্টারভিউ নিয়ে ওর বাবা মায়ের কোনো মাথা ব্যথাই নেই।উল্টে ওনারা ওকে বলেন...রাজপরিবারের ছেলে হয়ে ছোট চাকরি করার জন্য এত উতলা হওয়ার কিছু নেই তোমার।কিন্তু সেসব কথা কানে নিলে রৌনকের চলবে না একেবারেই। সারাবাড়ি টহল দিয়ে...সমস্ত ঘরের পাশ...সমস্ত বারান্দা ঘুরে...হঠাৎ ও তালাবন্ধ...এই অভিশপ্ত ঘরের সামনেটায় এসে থমকে গেল।হঠাৎ ওর মনে হল...এখন ওর পড়াশোনার জন্য এই ঘরের দরজাটা খুলে দেবার জন্য বলে দেখতে ক্ষতি কি! ও ঘরের তালাবন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে এমন ভাবনাচিন্তা করছে...এমন সময়ে ও দেখল...ওর ঠাকুর্দা অদূরে দাঁড়িয়ে বড়পিসিকে দিয়ে...মানদা দিদাকে বেত্রাঘাত করাচ্ছেন।এই দৃশ্য রৌনকের জন্মইস্তক চেনা ছবি।ও ছোট থেকেই দেখে আসছে...পান থেকে চুন খসলেই এ বাড়ির দাসদাসীদের বেত্রাঘাত করার ফর্মান জারি করা হয়।কিন্তু আজ ওর সবকিছু বড়ো অসহ্য ঠেকল।ও হনহন করে হেঁটে পৌঁছোলো ঠাকুর্দার ঘরে।বিরক্তি ঠাসা কন্ঠে ও বলল..."আঃ বড়পিসি...কি হচ্ছে কি?একটা মানুষকে এইভাবে পিটিয়ে তোমরা কোন স্বর্গের সিঁড়ি তৈরি করছ বলো তো?" ---যা জানিস না...সে নিয়ে হুট করে মন্তব্য করতে আসিস না খোকা।বড়দের সাথে এইভাবে কথা বলতে শিখিয়েছে বুঝি তোর বাবা? ---শোনো বড়পিসি...আমাকে যা খুশি বলো...কিন্তু আশি পেরোনো এই হাড় জিরজিরে বুড়ি মানুষটা এমন কিছু অপরাধ করতে পারে না...যে এইভাবে পশুর মতো বেতের বাড়ি মারতে হবে...এটা একটা ছোট বাচ্চাও বুঝবে।ছেড়ে দাও মানদা দিদাকে।তোমার কাছে আমি হাতজোড় করছি বড়পিসি...!" মানদা দিদার সারা পিঠে দাগড়া দাগড়া টাটকা রক্তের রেখা ফুটে উঠেছে।তিরতির করে কাঁপছে তার শুকনো ঠোঁটদুটো। ---আচ্ছা ঠিক আছে।খোকার কথায় আজকের মতো তোকে ছেড়ে দিলাম মানদা।আর কোনোদিন যদি তোর হাত থেকে একটা কাপও ভাঙে...তাহলে ওইদিন তোর একটা হাড়ও আস্ত থাকবে না এই বলে দিলাম।দূর হ আমার চোখের সামনে থেকে। একরাশ ঘৃণা ছুঁড়ে ঘরের দরজার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে রাগত দৃষ্টিতে ঠাকুর্দা তাকালেন মানদা দিদার দিকে রক্তচক্ষু নিয়ে। মানদা দিদা তাঁর বয়সের ভারক্লিষ্ট ভগ্ন শরীরটা অবর্ণনীয় যন্ত্রনার সাথে অতি কষ্টে সঞ্চালিত করে ভাঙ্গা কাপপ্লেটগুলো আস্তে আস্তে করে কুড়িয়ে নিয়ে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। রৌনক ঠাকুর্দাকে রাগত স্বরে বলল..."দাদামশায়...আমার আপনার কাছে একটা আর্জি আছে।সামনে আমার চাকরির পরীক্ষা।এখন বাড়ির এই উৎসবের পরিবেশে আমার পড়াশোনায় বড্ড ব্যাঘাত হচ্ছে।তাই আমি চাই,কয়েক দিনের জন্য সিঁড়ির ডানপাশের ঘরটা আমার পড়াশোনার জন্য খুলে দেওয়া হোক।" বন্ধ দরজার এই অভিশপ্ত ঘরটি খোলার কথা শুনে ঠাকুর্দা সচকিত হয়ে বলে উঠলেন..."সিঁড়ির ডানপাশের ঘর?না না...ও ঘর খোলাখুলির প্রয়োজন নেই।" ---"প্লিজ দাদামশাই...এই কটাদিনের তো ব্যাপার...সারাবাড়িতে কোনো জায়গা নেই...যেখানে একটু পড়ায় মন বসাতে পারব।" ---"ওই ঘরে যেও না দাদুভাই।তুমি তোমার পড়ার জন্য...যে ঘর চাও...সেই ঘর আমি ফাঁকা করে দিচ্ছি।কেউ সেখানে ঢুকবে না।তুমি সারাদিন ওই ঘরেই তোমার মতো থেকো...পড়ো...তোমায় কেউ বিরক্ত করবে না।ঠিক আছে?" ---"কিন্তু দাদামশাই...।" ---"আর কোনো কিন্তু না...আমরাও পরিবারের সাথে মিলেমিশে...অ্যাডজাস্টমেন্ট করে বড় হয়েছি।তুমিও ঠিক ম্যানেজ করে নিতে পারবে।ঘরের অনুষ্ঠান অনুষ্ঠানের মতো চলুক...তুমি তোমার পড়া করো।বুঝেছ?আর তাছাড়া চ্যাটার্জী মশাইএর নাতনির সাথে তোমার বিয়ের পাকা কথা হয়ে আছে।আমি সব ব্যবস্হা করে দিচ্ছি তোমার জন্য।একটা চাকরি যদি নিজের যোগ্যতায় পাও...তো আমি বুক ফুলিয়ে বলতে পারব...নাতি আমার পারিবারিক ব্যবসার ওপর নির্ভর না করে নিজের যোগ্যতায় চাকরি পেয়েছে।আমি সবাইকে বলে দেব...তোমার যে সামনে পরীক্ষা...সেটা যেন মাথায় নিয়ে আনন্দ উৎসব যা করার করে।" বিয়ের কথা পাকা হওয়ার কথা শুনে এইবার মৃদু আস্ফালন দেখানোর চেষ্টা করল এই অকস্মাৎ বিয়ের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে।যদিও সে জানে...এই পরিবারে ঠাকুর্দার কথাতেই সূর্যোদয় হয়...আর সূর্যাস্তও তাঁর আঙুলের ইশারাতেই সংঘটিত হয়।অতএব ঠাকুর্দা যখন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছেন...সেটা যার জীবনকে কেন্দ্র করেই হোক না কেন...সেটাকে অতিক্রম করার ক্ষমতা এই পরিবারের কারোরই নেই।রৌনক এখন চতুর্দিকে শুধুই অন্ধকার দেখছে।সে এখন শুধুমাত্র একা বসে কাঁদবার জন্য একটা নিরালা স্হান খুঁজছে।ওর মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।একদম বোবা হয়ে কাঠপুতুলের মতন দাঁড়িয়ে রইল কয়েক মূহুর্ত।ওর মাথার মধ্যে শুধু একটাই কথা তোলপাড় করতে লাগল।ঠাকুর্দার কথা ওকে কাটতেই হবে।সাহস আনতেই হবে যেমন করে হোক।হঠাৎ ও পুরো এঁড়ে বাছুরের মতো একটা গোঁ ধরে বসল।যে ঘরটা খুলতে ঠাকুর্দা বারণ করলেন এক্ষুনি...সেই ঘরটাই ওকে এখন খুলে দিতে হবে পড়াশোনার জন্য।নাতির এমন পাঞ্জাবির আস্তিন খামচানো ছেলেমানুষি গোঁ দেখে একটু নরম হলেন ঠাকুর্দা।মৃদু হেসে বললেন..."আচ্ছা ঠিক আছে।সত্যিই...সামনে চাকরির পরীক্ষা বলে কথা...একটা নিরিবিলি জায়গা সত্যিই দরকার পড়াশোনা করার জন্য।ও ঘরের আশেপাশে এমনিতেই কারোর যাতায়াত নেই...ও ঘরটাই এখন পড়াশোনা করার জন্য ঠিক জায়গা।তুমি তোমার বইপত্তর গুছিয়ে কাল সকালে চলে আসো...তার আগে ওই ঘর মানদাকে দিয়ে ঝাঁটপোছ করিয়ে রাখব'খন।কিন্তু মনে রেখো...ভুলেও পূবের জানলাটা খুলবে না।কেমন!" চাপা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ঠাকুর্দার ঘর থেকে হনহন করে বেরিয়ে আসে রৌনক। রৌনক ছোট একটি ব্যাটারি চালিত উজ্জ্বল আলো জ্বালিয়ে নিয়ে সজোরে চালিয়ে দিল টেবিল ফ্যানটি।তারপর ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল ঘরখানি।ঘরটি আয়তনে সুবিশাল।ঘরের ভিতর মোট দশটি মোটা মোটা থাম।থামগুলি অপূর্ব কারুকার্য খচিত।গোটা ঘরটিতে জানলা ওই একটিই।কেমন একটা ভ্যাপসা গন্ধ আসছে নাকে।রৌনক আর বেশি কিছু ভাবার মধ্যে না গিয়ে আলো আর ফ্যান ঠিকঠাক জায়গা মতো বসিয়ে নিয়ে নিজের বইখাতা নিয়ে বসে পড়ল।ডায়েরির খাপে রাখা স্নেহার ছবিটা বার করল একবার।ভালোবাসার একটি কোমল স্পর্শে আলতোভাবে তাকে রাঙিয়ে দিয়ে অতঃপর ছবিটি উল্টো করে ওই খাপটিতে রেখে দিল সযত্নে।এখন সমস্তকিছুকে একপাশে সরিয়ে রেখে...ওকে চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।অন্য কোনোদিকে মন দিলে এখন ওর চলবে না। ব্যাটারি চালিত বাতিটির আলো অত্যন্ত উজ্জ্বল।এই এতবড় ঘরটির মধ্যেও তার ঔজ্জ্বল্যের তীব্রতা এতটুকুও কম মনে হচ্ছে না।রৌনক বাতিখানা ঘরের কোণায় এনে রাখা বড় টেবিলটিতে রেখে নিজের বইখাতা সেখানে গুছিয়ে রাখতে শুরু করল।কিন্তু সে অনুভব করল...এই ঘরটির মধ্যেকার বাতাসের প্রতিটি কণাতে মিশে রয়েছে নিকষ আঁধারসম কোনো এক অজ্ঞাত...গূঢ় রহস্য।সেই রহস্য যেন কারোর বেঁধে দেওয়া শক্ত বাঁধনের দৃঢ়তার যন্ত্রনায় আটকা পড়ে রয়েছে...আর মুক্তি পাবার জন্য আকুলিবিকুলি করছে।বাতাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা কিছু না জানা শব্দেরা...যেন একটু বাঁধন আলগা করে দিলেই বাঁধভাঙ্গা বন্যার মতো আছড়ে ভেঙ্গে পড়বে।নাঃ...এই মায়া জড়ানো অপার্থিব কোনো এক সুরের মোহে আচ্ছন্ন এমন একটি ঘরে আর যাই হোক...পড়াশোনাটা হবে না।রৌনক বুঝতে পারে...এই ঘরে বইখাতা নিয়ে বসলেও...লেখাপড়ায় মন ওর কিছুতেই বসবে না।কিন্তু তাও...কোনো এক অজ্ঞাত অমোঘ টান...ও অনুভব করছে...যা ও কোনোমতেই উপেক্ষা করতে পারছে না।ও নিজেই ক্রমশ কেমন যেন মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে।ও বইখাতা গোছানো মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে অগ্রসর হতে থাকল পূর্বের জানলার দিকে।পরিবারের সকলের মুখে রৌনক জন্মইস্তক শুনে আসছে...এই জানলা একটি অভিশপ্ত জানলা।এই জানলা খুললেই নাকি জানলার ওপারে উন্মুক্ত হয়ে পড়বে নরকের দ্বার।ও ধীরপায়ে এগোতে এগোতে জানলার সামনেটায় গিয়ে থামল।আলতো হাত রাখল জানলার রাজকীয় কারুকার্যখচিত পাল্লাতে।হাত রাখামাত্র ও এমন একটা সাংঘাতিক বৈদ্যুতিক শক এর মতো একটা কিছু অনুভব করে...লাফিয়ে এক সেকেন্ডের মধ্যে..."উরিব্বাস!"...বলে পাচ সাত পা লাফিয়ে...পিছিয়ে গেল।ও নিজের হাতটা ধরে বসে পড়ল মেঝেয়।ও অবাক দৃষ্টিতে লক্ষ্য করল...হাতটা মূহুর্তের মধ্যে রক্ত জমাট বাঁধার মতো লালবর্ণ ধারণ করেছে।এবং ধীরে ধীরে সবিস্ময়ে ও দেখতে থাকল...ওর হাতটা আস্তে আস্তে করে স্বাভাবিক বর্ণে ফিরে আসছে।ও একেবারে হতভম্ব হয়ে বসে রইল বেশ কিছুক্ষণ।অনেকগুলি যন্ত্রনাক্লিষ্ট মানুষের চাপা আর্তনাদ বহু যোজন দূর হতে ক্রমশ যেন স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।ওর কানে ওই যন্ত্রনায় জর্জরিত কিছু মানুষের কন্ঠের দগ্ধ বেদনার্ত আকুতি যেন ক্রমশ স্পষ্ট হতে শুরু করল...তারা সমস্বরে বলছে শুধু..."ওরে বাছা...রক্ষা কর আমাদের...মুক্তি দে...!" ওই আর্তধ্বনি রৌনকের বুকের ভিতরটা যেন এফোঁড় ওফোঁড় করে দিচ্ছিল।ও আর থাকতে না পেরে...দুই কান চাপা দিল সজোরে।ও এবার মনে মনে স্হির করে নিল..."যাই হয়ে যাক...এ জানলাটা একবার খুলে ওকে দেখতেই হবে। রৌনক আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের ভিতরটা হাতড়াতে লাগল।ও তন্নতন্ন করে খুঁজতে শুরু করল জানলাটির পাল্লাদুটি যে তালা দিয়ে আটকানো রয়েছে,তার চাবিটি।খুঁজতে খুঁজতে ক্রমশ ওর তন্দ্রা আসতে শুরু করল।লম্বা লম্বা হাই উঠতে থাকল ওর।আর শেষ পর্যন্ত না পেরে...ও টেবিলের নীচেই বসে পড়ল...আর তারপর ঘুমোনোর জন্য পাতা বিছানাটার কাছাকাছি পৌঁছনোর আগেই তলিয়ে গেল অতল নিদ্রায়। ক্রমশ রৌনক অনুভব করতে শুরু করল...ও আর ইহজগতে নেই।ও পৌঁছে গেছে কোনো এক অন্ধকার জগতে।সেখানে শুধুই নিকষ কালো অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই নেই।এই কালো ফুঁড়ে একবিন্দু আলোরও বোধহয় ওর নিকট পর্যন্ত পৌঁছনোর স্পর্ধা নেই।হঠাৎ এই অন্ধকারের বুকে দৃশ্যমান হতে থাকল একরাশ সাদা ধোঁয়া।ধোঁয়া ক্রমশ গাঢ় ও ঘন হতে শুরু করল।ক্রমশই ওই আলোয় ফুটে উঠতে শুরু করল কতকগুলি মানুষের অবয়ব।ও চোখ কচলে সবিস্ময়ে চাইল সেইদিকে।দেখল...ওই মানুষগুলির চেহারা ও মুখমন্ডল ক্রমশ স্পষ্টরূপে ধরা দিতে শুরু করছে ওর চোখে।ওই মুখগুলি ওর চেনা।এই ঘরের প্রবেশপথের লাগোয়া যে প্যাসেজটি রয়েছে...ওই প্যাসেজের দুই ধার জুড়ে যে অয়েলপেন্টিংগুলি রয়েছে...সেই মূক প্রতিকৃতিগুলিরই জীবন্ত রূপ এই চেহারাগুলি।হ্যাঁ।রৌনকের চিনতে কিছুমাত্র ভুল হল না।ধোঁয়ার ভিতরে একটু একটু করে ফুটে ওঠা এই অবয়ব...এই মানুষগুলিই ওর দোর্দণ্ডপ্রতাপ পুর্বপুরুষদের জীবন্ত প্রতিরূপ! ক্যানভাসে রংতুলি দিয়ে কয়েদ করে রাখা দাপুটে সেই মুখগুলি আজ যখন রৌনকের সামনে জীবন্তরূপে দেখা দিল...রৌনক দেখল...তাঁদের এই মুখগুলি যন্ত্রনাক্লিষ্ট রক্তাক্ত ও আতঙ্কগ্রস্হ।তাঁরা সমস্বরে বলে চলেছেন..."ওরে বাছা...রক্ষা কর আমাদের...মুক্তি দে...!" ঘরের জানলার ডানপাশটায় মেঝেটা খুঁড়তে শুরু কর।চাবি হাতে পাবি।ওটা হস্তগত কর বাছা...!আমাদের মুক্তি দে!" তাঁদের এই আর্তনাদ যেন রৌনকের মাথার ভিতরে দামামা বাজাতে আরম্ভ করল।ধড়ফড় করে উঠে বসল রৌনক। কি ভয়ঙ্কর স্বপ্ন!দুচোখ ডলে নিয়ে ও টেবিলের নীচ হতে উঠল ধীরে ধীরে।ঘরের ভিতরকার এই গুমোট এবং ভ্যাপসা গন্ধটা ওর নাকে এখন অনেকটাই সয়ে এসেছে।তবুও...কিছুক্ষণ আগে হলেও রৌনক ওর পড়াশোনার জন্য ভুল জায়গা নির্বাচন করেছে...এটা বিরক্তির সাথে বারবার স্বদউক্তির দ্বারা মনে মনে আওড়াতে আওড়াতে বইপত্র গুটিয়ে নিয়ে ঘর থেকে বাইরে যাওয়ার উদ্যোগ নিত।কিন্তু এখন ও একটা সাংঘাতিক চাপা উত্তেজনা আর কৌতূহল নিয়ে উঠে বসে জানলার ডানপাশের মেঝেটা ঘরের একপাশে জড়ো করে রাখা কোদাল,বল্লম,বর্শার স্তূপ হতে একটা কোদাল হাতে তুলে নিয়ে উন্মত্তের মতো কোপাতে লাগল।বাইরে এত জোরে গান বাজছে...যে এই শব্দ কারোরই শ্রুতিগোচর হচ্ছে না।মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে সেটা মোটামুটি ছয় হাত মত গভীর হল।রৌনক পরিশ্রান্ত হয়ে মাটিতে পড়ে হাঁপাতে লাগল।এমন সময় হঠাৎ ও কুড়ুলের গায়ে একটা অদ্ভুত ধরণের উড়ন্ত পতঙ্গ দেখতে পেল।পতঙ্গটির ডানাদুটি টগবগে রক্তের মতো উজ্জ্বল লাল।তার শুঁড়দুটি অত্যন্তই দীর্ঘকায় আর ওই রক্তাভ ডানাদুটিতে একটি করে মড়ার খুলির চিহ্ন উজ্জ্বল সাদা রংএর দ্বারা ওই মায়াবী আলো আঁধারির ঘরের মধ্যেও স্পষ্টভাবে প্রস্ফুটিত হচ্ছে।রৌনক ভীষণ কৌতূহল বশত ওই পতঙ্গটিকে আরো স্পষ্টভাবে দেখবার জন্য উঠে আসতেই পতঙ্গটি হঠাৎ বোঁওও করে উড়ে গিয়ে একেবারে গর্তের ভিতরে ঢুকে গেল।রৌনক ওই অদ্ভুত পতঙ্গটিকে অনুসরণ করে গর্তের ভিতরে উঁকি দিতেই দেখল...পতঙ্গটি একটি কাদামাখা অথচ চকচকে পুঁটলির ওপরে গিয়ে বসেছে।এবার রৌনক অত্যন্ত বিস্ময় নিয়ে ধীরে ধীরে পুঁটুলিশুদ্ধ পতঙ্গটিকে দুহাতে উঠিয়ে নিল।এবার পতঙ্গটি আবার বোঁওও করে উড়ে গিয়ে একেবারে সোজা জানলার গায়ে গিয়ে বসল।রৌনক এবার সেখানকার বাতাসে ভাসমান ইশারাটি চট করে বোধগম্য করে ফেলল।ও আর কালবিলম্ব না করে...ওই পুঁটুলিটি খুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।পুঁটুলিটির মুখে বাঁধা কয়েকশো বছরের পুরোনো গিঁটটি অনেক্ষণ ধরে কসরত করে অবশেষে খুলে ফেলল রৌনক।পুঁটুলি খুলে রৌনক দেখল...ওর ভিতরে সত্যিই একখানা চাবির গোছা রয়েছে।কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হল...ওই চাবির গোছার দশ বারোটি চাবিই আসলে একটি তালা খোলার জন্যই।রৌনক আর দেরি না করে...সঙ্গে সঙ্গে চাবির গোছার মধ্যে একটি চাবি দিয়ে কয়েকশো বছর ধরে বন্ধ হয়ে পড়ে থাকা অভিশপ্ত তালাটি খুলতে প্রাণপণ শক্তির প্রয়োগ করতে লাগল।অনেক্ষণ ধরে শরীরের প্রায় সর্বশক্তি প্রয়োগ করার পর হঠাৎ সারাঘর কাঁপিয়ে সজোরে "খড়াং" শব্দ করে তালাটি খুলে গেল।রৌনক উঠে দাঁড়িয়ে জানলার পাল্লাদুটি ধীরে ধীরে দুইদিকে প্রসারিত করতে শুরু করল।শতাধিক বছরের পুরোনো জানলাটি...দীর্ঘ যুগ ধরে পড়ে থাকার ফলপ্রসূ জং ধরে এমন দশা হয়েছে...যে খুলতে ওকে প্রচন্ড শারীরিক শক্তি প্রয়োগ করতে হচ্ছে।জানলার পাল্লাদুটি "ক্যাঁচ...ক্যাঁচ...ক্যাঁচ...অ্যাঁ...চ শব্দে দুইদিকে প্রসারিত হল ধীরে ধীরে।হঠাৎ একতাল বিশালাকৃতি লেলিহান অগ্নিগোলক একটা কলিজা কাঁপানো "ব্যুম" শব্দ করে...প্রায় আছড়ে এসে পড়ল জানলার পাল্লা ভেদ করে...আর তারপরেই আরো ততোধিক জোরে শব্দ করে সেটি বিস্ফোরণের মতো ফেটে গিয়ে বাতাসে ঘন কালো ধোঁয়া হয়ে ছড়িয়ে পড়ল ঘরের চারদিকে।আর সেই ধোঁয়া ফুঁড়ে ঝড়ের মতো... দীর্ঘ বন্দীত্ব হতে অকস্মাৎ মুক্তির উল্লাসে যেন তীরের ফলার মতো ঝাঁকে ঝাঁকে বেরিয়ে আসতে শুরু করল ডানায় মড়ার খুলি অঙ্কিত রাশি রাশি সেই রক্তবর্ণ পতঙ্গের ঝাঁক। এই ঝড় থেমে গেলে রৌনক অনুভব করল...একটা নেশাতুর সুগন্ধ ওকে যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে।ও যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওই হাতছানিতে সাড়া দিয়ে ওই জানলার ভিতরে এসে প্রবেশ করতে থাকল ধীরে ধীরে।দেখল...জানলার ওপারে একটা সিঁড়ি নেমে গেছে নীচে।চারপাশে কুন্ডলীকৃত সাদা ধোঁয়া।ও সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামতে শুরু করল ধীরে ধীরে।যত নীচে নামতে থাকল...,ততই সেই মোহাচ্ছন্ন করে তোলা সুগন্ধটি ক্রমশ পরিণত হতে থাকল...একটা বিকট পচা দুর্গন্ধে।সিঁড়ির চতুর্দিকে...লেলিহান অগ্নিশিখা আর চারপাশে ক্রমশ স্পষ্ট হতে শুরু করল...সমস্বরে একটা বুকফাটা হাহাকার আর হৃদয় এফোঁড় ওফোঁড় করে তোলা মর্মবিদারক রোদন ধ্বনি।ক্রমশ দুই কানে হাতচাপা দিয়ে বসে পড়ার মতো অবস্থা হল রৌনকের।কিন্তু এখন রৌনকের জেদ গেছে।এই সিঁড়ির শেষ কোথায়...সেটা ওকে দেখতেই হবে।ও নীচে নামছে তো নামছেই।চতুর্দিকে শুধুই দগ্ধ কঙ্কালের স্তূপ।কোথাও ওই লেলিহান অগ্নিশিখায় জীবন্ত দগ্ধ হচ্ছে কর্ণবিদারক আর্তনাদরত কোনো মানুষ।রৌনক দুই চোখ বিস্ফারিত করে বিস্ময়ে সব দেখে চলেছে নিশ্চুপে।অবশেষে সিঁড়ি যেখানে এসে শেষ হল...সেখানে কাঙালের মতো বুকভরা আকুতি নিয়ে দুই হস্ত প্রসারিত করে ওর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে রয়েছেন কয়েকজন মানুষ!এঁদের চিনতে কোনো অসুবিধা হল না রৌনকের।যে ঘরের অভিশপ্ত জানলাখানি নিয়ে ফিসফাস আর চাপা ভীতি দেখে এসেছে রৌনক জন্ম ইস্তক...সে ঘরের প্রবেশপথ...ওই সরু প্যাসেজটির দুইধারবিশিষ্ট জুড়ে এই মানুষগুলিরই তৈল চিত্রাঙ্কন করা প্রতিকৃতি ও দেখে এসেছে জন্ম ইস্তক।আর এঁদেরকেই এইমাত্র ঘুমের ভিতরে স্বপ্নে দেখেছে রৌনক খানিকক্ষণ আগে।ও অবাক বিস্ময়ে দেখতে থাকল...শৌর্যের সাথে উন্নতশির সেইসব প্রতিকৃতির মানুষগুলি আজ ওর সামনে কি অবর্ণনীয় দীন হীন কাঙালের মতো ওঁদের পরিশ্রান্ত শীর্ণ ও ক্লিষ্ট দুই চোখ মেলে,দুই হাতের তালু ওর সামনে প্রসারিত করে ভিখারীর ন্যায়ে করুণ কন্ঠে শুধু মিনতি করে চলেছে..."মুক্তি দে বাছা...আমাদের মুক্তি দে...!" রৌনক এইসব দেখেশুনে প্রচন্ডভাবে বিচলিত হয়ে পড়ল।ও এখন পরিষ্কার বুঝতে পারছে...ও এখন ওর রক্তমাংসের শরীরটা নিয়ে যেখানে এসে পড়েছে...সেটা একটা অপার্থিব জগৎ।বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ ওর ছিন্ন হয়ে পড়েছে খানিক আগে। জানলাখানি খোলা এ বাড়িতে ভীষণভাবে নিষিদ্ধ।কয়েক শতাব্দী ধরে এই নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে অক্ষুণ্ণ ভাবে।ও আন্দাজ করে নিয়েছিল...নিশ্চয়ই সকলের ধারণা...এই জানলা খোলার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে একটা কোনো ভয়াল সর্বনাশের অশনিসংকেত।তবে ও মানুষের এই ধরণের বিশ্বাসকে আমল দেয়নি কোনোকালেই।একখানা জানলা বন্ধ হওয়া অথবা খোলার সঙ্গে এই পরিবারের কোনো ইতিহাস জড়িয়ে থাকতে পারে...এটা ভেবে বরাবরই হাসি আসত ওর।কিন্তু আজ নিজের চোখ কান সব একসঙ্গে ওর এতদিনের এই অবিশ্বাসের মুখে প্রতিটা মূহুর্তে এইভাবে বিদ্রূপ ছুঁড়ে দিতে শুরু করল...তখন ক্ষণিকের জন্য পুরোপুরি হতভম্ব...স্হবির হয়ে পড়ল রাতুল।কিন্তু রাতুল বরাবরই যথেষ্ট সাহসী ছেলে।ভয়ডর টা ওর বরাবরই কম।আস্তে আস্তে নিজেকে ঠিক সামলে নিল রাতুল।যন্ত্রনাক্লিষ্ট কঙ্কালসার ওই মানুষগুলির চোখের দিকে মেলাল দৃষ্টি। ঠান্ডা গলায় বলল..."আপনাদের আমি চিনতে পেরেছি।আমি আপনাদের অনেক গল্প শুনেছি বাপ ঠাকুর্দার কাছে।কিন্তু এ কোন জায়গা?আর আপনারা এখানে এলেন কিভাবে? আর আপনারা এইখানে আমাকে ডেকে এনেছেন কেন?আমার কাছে আপনারা কি চান? ---"মুক্তি...মুক্তি...মুক্তি...!" তীব্র আকুতিতে মিশ্রিত সম্মিলিত ওই চিৎকারের প্রতিধ্বনিতে যেন সেখানকার চারপাশ কেঁপে উঠল ভীষণভাবে। ---"মুক্তি!কিন্তু আমি কি করে দেব আপনাদের মুক্তি?"  ওই শীর্ণকায় বিদেহী আত্মাদের একজন বলে উঠল..."আমি বলব তোমায়।আর কোনো লুকোছাপা নয়।সমস্ত পাপের জট আজ ছাড়াব এক এক করে। এই বলে তিনি শুরু করলেন তাঁর কাহিনী। ---সে প্রায় তিনশো বছর আগের কথা।এ রাজ্যের বড় জমিদার ছিলেন...রাজা সূর্যকান্ত বর্মন।দেশে তখন মুঘলদের রাজত্বকাল থাকলেও...এ রাজ্যের লোকেরা তাঁকেই রাজা হিসেবে মান্যিগন্যি করত।আমি ছিলাম তাঁর খাস বেয়ারা। আমি রাজার ফাই ফরমাশ খাটবার জন্য বহাল চাকরদের সঙ্গে এই রাজমহলের ভিতরেই থাকতাম আর তাদের সাথে মিলেমিশে রাজার ফাই ফরমাশ খাটতাম।রাজার আনুগত্য আর বাৎসল্যে আমার জীবন কাটছিল বেশ।কিন্তু আমার সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়।একদিন রাজার পদসেবা করার সময়ে... তাঁর প্রিয় কন্যা রুক্মিনী আসলেন তাঁর সাথে দেখা করতে।রাজা তখন হাতের ইশারায় আমাকে ইশারায় সেখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন। আমি তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে সরে যাই।কিন্তু তারা কেউই লক্ষ্য করেননি...ঘরের পর্দার আড়াল হতে রুক্মিনীর বক্ষদেশের দিকে তাক করা আমার কামুক দৃষ্টি!হ্যাঁ।ওইদিন হতেই আমার যেন রোখ চেপে গিয়েছিল।কিন্তু কি করি!এ তো আর গা গঞ্জের চাষাভুষো ঘরের মেয়ে নয় যে উসখুস করা আমার এই লালসাকে প্রশ্রয় দিতে পারব...এ যে স্বয়ং জমিদারের কন্যা!কি করি...মনের আগুন মনেই চেপে নিলাম।দিন চলতে লাগল।কিন্তু ক্রমশ বুঝতে পারলাম...আমার মনটা এতটাই উচাটন হয়ে পড়েছে...যে কোনো কাজে মন বসাতে পারছি না।আমার রক্তের প্রতিটি কণা এমন তপ্ত লাভার মতো ছটফট করতে শুরু করতে শুরু করে দিয়েছে...যে আমি নিজেকেই নিজে সামলে রাখতে আর পারছি না।একটা সময়ে আমি মনে করলাম...জন্মেছি যখন...মরতে একদিন হবেই আজ নয় কাল...!একবার যদি এই রুক্মিনীর শ্বেতশুভ্র শরীরখানি মনের আঁশ মিটিয়ে চেখে নিই...তাহলে মৃত্যুদন্ডেও কোনো আফশোশ থাকবে না।আমি মনে মনে একটা ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের ছক কষতে আরম্ভ করে দিলাম।একদিন দুপুরে রাজকুমারী রুক্মিণীর স্নানের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।তাঁর সারা শরীরে হলুদ...চন্দন আর ফুলের পরাগ মিশ্রিত সুগন্ধির প্রলেপ দিচ্ছিল তাঁর দাসীরা।এরপর যখন রুক্মিণী তাঁর একঢাল ঘন কালো চুল খুলে...একাকিনী এগিয়ে আসছিলেন স্নানঘরের দিকে...আমার ভিতরের পিশাচটাকে শান্ত করে রাখাটাই...নিজের সঙ্গে নিজেদ প্রচন্ড লড়াই মনে হচ্ছিল যেন আমার কাছে।রুক্মিণী জানতেন না...কোন ফাঁদে পা দিতে যাচ্ছেন তিনি।কি ভয়ংকর পরিণতি অপেক্ষা করে রয়েছে তাঁর জন্য!তিনি ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেননি...যে তাঁর স্নানঘরের পদ্মফুলসদৃশ অপূর্ব সুন্দর কারুকার্যখচিত  স্নানের টবটির ভিতরে আজ আর জল নয়...তাঁর সুডৌল শরীরখানি ভক্ষণ করার জন্য লাল ঝরিয়ে বসে রয়েছে এক মানুষরূপী  কামুক পিশাচ।এই রাজবাড়ির সংলগ্ন একটা বিরাট পুষ্করিনী ছিল।তারই সংলগ্ন একটি জায়গাতে জমিদার কন্যা রুক্মিনীর মনের মতো করে তাঁর জন্য সুসজ্জিত রূপে প্রস্তুত করা হয়েছিল একটি অপূর্ব স্নানঘর।জমিদার কন্যার এই স্নানঘরখানি সম্পূর্ণরূপে  পুরুষ বর্জিত।ওই স্নানঘরের আশেপাশে যদি কোনো পুরুষের পা পড়ে যায় ভুলক্রমে...তার যে আর প্রাণে বাঁচার আর কোনো আশাই নেই...এ আমি ভালো করেই জানতাম।আর যদি কেউ কোনোভাবে জেনে যায়...যে আমার মতো একজন তুচ্ছ বেয়ারা খোদ জমিদার কন্যার স্নানঘরের ভিতরে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে রয়েছে...তাহলে আমার শরীরের যতগুলো টুকরো করা হবে...তা গোনা মানুষের অসাধ্য হবে...এও আমি ভালোভাবেই জানতাম।কিন্তু আমার ভিতরে ভয়ংকর রোখ চেপে গিয়েছিল।আমার মনের ভিতরে কেউ যেন ভীষণভাবে গর্জন করে বলছিল...এমন একখানি কুকুরের জীবন ধুঁকে ধুঁকে দীর্ঘদিন নিজেকে শেষ করতে করতে মরার চাইতে...একদিন মনের সমস্ত লালসা কামনা মিটিয়ে নিয়ে...স্বর্গীয় সুখলাভ করে তারপর মরাই ঢের ভালো।আমার নেশা আর রোখ...দুইই চেপে বসেছিল ভীষণভাবে।সকলের চোখ এড়িয়ে...কৌশল করে...কিভাবে যে আমি রুক্মিণী দেবীর এই স্নানের টবটির ভিতরে এসে নিজেকে লুকিয়ে নিয়েছিলাম...সে ঈশ্বর জানেন...আর আমি জানি।রুক্মিণী দেবীর পায়ের শব্দ স্পষ্ট হচ্ছিল একটু একটু করে...আর আমার ভিতরে যেন প্রতিটি মূহুর্তে শত শত বিষধর সাপ শত শত ফণা তুলে জেগে উঠছিল সোল্লাসে! অবশেষে স্নানঘরের দরজার কাছে এসে থেমে গেল পায়ের শব্দ।দ্বার বন্ধ করার শব্দ শুনতে পেলাম স্বকর্ণে।আমার মনে হল...এ শব্দ নয়...আমার যাবতীয় লালসার অবসানের মাহেন্দ্রক্ষণ...আর আমার সমস্ত কুপরিকল্পনার ছাড়পত্র। রুক্মিণী স্নানঘরের ভিতরে ঢুকে এলেন।তারপর স্নানঘরের দরজাখানি বন্ধ করে ভিতর থেকে আটকে দিলেন।ধৈর্যের বাঁধ আমি আর রাখতে পারছিলাম না।স্নানের টব থেকে চোখটা অল্প তুলে যা দেখলাম...তাতে আমি আমার সমস্ত বাহ্যজ্ঞান...বোধ দ্রুতবেগে লোপ পেতে শুরু করল।আমি দেখলাম...একটা একটা করে পোশাক খুলে রুক্মিণী নিজের শরীর অনাবৃত করতে শুরু করছেন।কিছুক্ষণের মধ্যেই রুক্মিণী নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিরাবরণ করে নিলেন।তারপর গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে তাঁর পদ্মফুল সদৃশ সুদৃশ্য স্নানের টবটিতে প্রবেশ করতে উদ্যত হলেন।ব্যাস...তার ঠিক এক মূহুর্তের মাথায় তাঁর ওই অনাবিল ফুরফুরে মেজাজ আর খুশি বদলে গেল...বিনা মেঘে বজ্রপাতসদৃশ অযাচিত আতঙ্কে।তবে চিৎকার করবার সুযোগ তিনি পেলেন না।তাঁর মুখ আমি চেপে ধরেছিলাম আমার বজ্রমুষ্ঠি দ্বারা।মনে মনে অনুভব করছিলাম এক রাজকীয় তৃপ্তি।যাকে স্পর্শ করার কথা স্বপ্নেও চিন্তা করাটাও গ্রামের যেকোনো পুরুষের জন্য দুঃসাধ্য...আজ।সে-ই এখন পুরোপুরি আমার হাতের মুঠোয়!স্ফূর্তি আর উল্লাস তখন আমার মস্তিষ্কের ওপরে এমনই উদ্দাম নৃত্য আরম্ভ করে দিয়েছে...যে পাপপুন্য...ইহকাল পরকালের হিসাব...এমনকি মৃত্যুভয়ও তার ফুৎকারে উবে গেল নিমেষের মধ্যে।রুক্মিণীর মুখ আমি এতটাই জোরে চেপে ধরেছিলাম...যে সেই চাপের ধকল সইতে না পেরে...দমবন্ধ হয়ে আসল রুক্মিণীর।নিমেষের মধ্যেই জ্ঞান হারালেন তিনি।দুচোখ বন্ধ হয়ে এল তাঁর।নিস্তেজ হয়ে নেতিয়ে পড়লেন আমার হাতের উপরে।এমন আত্মসমর্পণের পর আমি আর কালবিলম্ব করিনি।পদ্মদল সদৃশ কোমল দেহখানির ওপর যেভাবে আমার আখ পেষার পৈশাচিক খেলা চলল কিছুক্ষণ ধরে...তার নীরব সাক্ষী হয়ে রইল শুধু ওই স্নানঘরের চারটি স্হবির দেওয়াল!উত্তেজনা আমার এতটাই চরমে ছিল...যে আমার শরীর খুব তাড়াতাড়ি এলিয়ে পড়ল একরাশ ক্লান্তি আর অনির্বাচনীয় এক স্বর্গীয় পরিতৃপ্তি নিয়ে।কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছিলাম...আমার অন্তিম সময় আসতে আর খুব বেশি দেরি নেই।কারণ এই স্নানঘরে,জনমানুষের চোখ এড়িয়ে যেভাবে এসে পৌঁছেছিলাম...এখান থেকে বেরোনোর সময়ে আমার ভাগ্য আমার ওপর ততটা সদয় হওয়ার সুযোগ অত্যন্তই কম।আর একবার যদি ধরা পড়ে যাই...তাহলে আমার মৃত্যু যতখানি ভয়ংকর হতে চলেছে...এই পৃথিবীতে কারোর এতটা ভয়ংকর মৃত্যু হয়নি আর হওয়ারও নয়।সামনে পড়ে রয়েছে রুক্মিণীর নিরাবরণ অচৈতন্য দেহখানি।আর তাঁর কোমরের পাশ হতে  বেরিয়ে আসছে রক্তের ধারা।এইবার প্রথম...আমার শরীরের সমস্ত রোমকূপ দাঁড়িয়ে গেল ভয়ে।এতদিন ধরে আমার ভিতরে চলতে থাকা একটা ভয়াল নেশার ঘোর এতক্ষণে কেটে গেল পুরোটাই।এতক্ষণে আমার ঠিকভাবে বোধগম্য হল...কি ভয়ংকর সর্বনাশটাই না আমি ঘটিয়েছি!এবার আমার মনের ভিতরে ভীষণভাবে চাগাড় দিয়ে উঠল মৃত্যুভয়। হায়!ক্ষণিকের মজা লোটার জন্য আমি আমার আস্ত জীবনটাকেই আমি শূলে চড়ালাম।এটা অন্তত বুঝতে আমার বেগ পেতে হয়নি...যে রুক্মিণী যদি একবার ওর এই অচৈতন্য অবস্হা কাটিয়ে উঠে জেগে যায়...তাহলে ওই মূহুর্তটাই হবে আমার অন্তিম লগ্নের ঘন্টাধ্বনি।না...রুক্মিণীকে আর প্রাণে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না।একবার যদি এই দুষ্কর্মের কথা কেউ জেনে ফেলে...তাহলে রুক্মিণীর ইজ্জত নষ্ট করার জন্য শাস্তি আমার কোনো অংশে কম হবে না।তার চেয়ে ইজ্জত নষ্ট করবার পরে একেবারে প্রাণে মেরে ফেলে যদি যদি একবার সকলের চোখ এড়িয়ে স্নানঘর থেকে একবার পালিয়ে যেতে পারি...তাহলে আমি পরিত্রাণ পেলেও পেয়ে যেতে পারি।রুক্মিণীর স্নান করার সময়ে কেউ যাতে সে চত্বরে না যায়...এই বিষয়ে জমিদার মশাইএর কড়া হুকুম রয়েছে।এমনকি কোনো চাকরানিরও সেখানে যাওয়া নিষেধ ওই সময়ে।অতএব চারদিকটা যে শুনশান...সেটা আমি ভালোভাবেই জানতাম।আর রুক্মিণী বেশ অনেকটা সময় নিয়েই স্নান করে।কিন্তু সেই সময়ের মেয়াদও ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসছিল।আর কিছুক্ষণের মধ্যেই যে স্নানঘরের কাছাকাছি রুক্মিণীর দেখাশোনা করার জন্য বহাল করা চাকরানি আর দেহরক্ষীর এসে হাজির হতে চলেছে...এটা মনে আসতেই আমার বুকের ভিতরে যেন শত শত কামারের হাতুড়ি পেটা আরম্ভ হল।আর সেইসাথে আমি চেয়ে দেখলাম...একটু একটু করে চেতনা ফিরে আসছে রুক্মিণীর।আমি আর কালবিলম্ব করলাম না।সঙ্গে সঙ্গে আসুরিক শক্তি প্রয়োগ করে ওর গলা টিপে ধরলাম।আর দেখলাম...দমবন্ধ হয়ে আসছে রুক্মিনীর।অতঃপর ওর শরীর থেকে বেরিয়ে গেল প্রাণ।ওর প্রাণহীন দেহখানি ফের লুটিয়ে পড়ল মেঝের ওপরে। এরপর আর এক মূহুর্তও দেরি না করে...আমি অত্যন্ত সুকৌশলে স্নানঘর হতে বেরিয়ে এসে চারপাশটা একবার সভয়ে দেখে নিলাম।জমিদারের হুকুম মতো দরজার কাছাকাছি  কেউ ছিল না।কিন্তু স্নানঘরের এই চত্বরটি  খানিক দূর হতেই ভেসে আসছিল কিছু মেয়েলি কথপোকথন আর হাসি কথার মৃদু আভাস।আমি আর কালবিলম্ব করলাম না।অত্যন্ত সুকৌশলে সকলের নজর এড়িয়ে আমি সেখান থেকে বেরিয়ে এলাম।তারপর আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।কারণ আমি বুঝে গিয়েছিলাম...আমি সমস্ত সন্দেহের উর্দ্ধে চলে গিয়েছি।কারণ...এই পুরো ব্যাপারটাই ঘটেছে অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে।আমার মধ্যাহ্নের ভোজন করার জন্য বরাদ্দ সময়ের ভিতরেই পুরো কাজটা সন্তর্পণে শেষ করে নিয়েছি আমি।সকলে জানে...আমি নিজের ঘরে এসে ভোজন করছি।নিজের ঘরে না ঢুকে আমি কোনদিকে এসেছি...সেইদিকে লক্ষ্য করেনি কেউ।আমার মতো একটা তুচ্ছ বেয়ারার মাথায় যে রুক্মিণীর স্নানঘরের আশেপাশে আসবার চিন্তাও আসতে পারে...এটা সকলের কল্পনারও অতীত।আমার নিজের ঘর পর্যন্ত চলে আসতে খুব বেশি সময় লাগেনি আমার।ওইদিন রাত্রি পর্যন্ত আমি অভুক্ত রয়ে গেলাম বটে...কিন্তু পরিত্রাণ পেয়েছি গেলাম নিজের ভয়ংকর পরিণতির কবল থেকে।আমি রুক্মিণীর স্নানঘর থেকে পালিয়ে নিজের ঘরে এসে পৌঁছনোর খানিক পরেই শুরু হয়ে গেল বিরাট শোরগোল।এরপর ক্রমে এই জমিদার বাড়ির অন্দরমহলে রুক্মিণীর মৃত্যুর খবরটা ছড়িয়ে গেল।জমিদার সূর্যকান্ত বর্মন তাঁর একমাত্র কন্যা রুক্মিণীর মৃত্যুতে এতটাই শোকস্তব্ধ হয়ে পড়লেন...যে নিজের স্বাভাবিক স্হিতিটাই ক্রমে হারাতে শুরু করলেন।রুক্মিণী ছিল জমিদার মহাশয়ের প্রাণ।ওর এইরকম একটা অকাল অপমৃত্যুর শোক আর নিতেই পারলেন না তিনি।বস্তুত...রুক্মিণীর স্নানঘরের দরজা পর্যন্ত পা রাখবার সাহস এখানে  কোনো দাসীর পর্যন্ত নেই...সেখানে কোনো এক বেয়ারা যে এমন দুঃসাহস রাখতে পারে...এটা সকলেরই কল্পনার উর্ধ্বে ছিল।সবাই এখন সন্দেহের তালিকায় নাম ভরতে শুরু করল... জমিদার মহাশয়ের প্রভাব প্রতিপত্তিশালী শত্রুদের।হত্যাকারীর খোঁজ করতে করতে জমিদার মহাশয়ের সমস্ত বোধবুদ্ধি একেবারেই বিলুপ্তির পথে চলে গেল।আমি ছিলাম তাঁর অত্যন্ত প্রিয় খাস চাকর।আমার করা সেবাযত্নের থেকে যে আরাম তিনি পেতেন...তা তিনি অন্য চাকরের হাতে সেইভাবে পেতেন না।এ কথা তিনি আগে আমাকে একাধিকবার বলেছেন...এমনকি...তিনি মাঝেমধ্যে অল্পবিস্তর পুরস্কৃতও করেছেন।এমন একটা হৃদয়বিদারক স্পর্শকাতর সময়ে...এক সকালে আমি যখন তাঁর পা টিপে দিচ্ছিলাম...তখন হঠাৎই তিনি কেঁদেকেটে আমার কাছেই ভেঙ্গে পড়লেন।আমি দেখলাম...এখন জমিদার মহাশয়ের যা অবস্হা...এখন তাঁকে যে যেমন বলবে...যে যা বোঝাবে...তিনি তাই বুঝবেন।যুক্তি দিয়ে কোনোকিছু ভাববার বা বিচার বিবেচনা করবার ক্ষমতা তিনি পুরোপুরিই হারিয়ে বসে রয়েছেন। ওই সময়ে...আমার মাথায় খেলে গেল একটা ধূর্ত অভিসন্ধি।আমি জমিদার মহাশয়কে বলতে শুরু করলাম..."রুক্মিণীকে কে হত্যা করেছে...সেটা আমি জানি।" এবার যুক্তিবুদ্ধি হারিয়ে বসা জমিদার মহাশয়কে আমি পুরোপুরি নিজের হাতের খেলনা হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে দিলাম। "আজ এটা দিন...তাহলে কে খুন করেছে আমি বলব। আজ ওটা দিন...তাহলে কে খুন করেছে আমি বলব।" এভাবে খেলতে খেলতে...একে একে তাঁর সমস্ত ধন দৌলত...এই সুবিশাল প্রাসাদতুল্য বাড়িটা...এবং সব শেষে তাঁর জমিদারিটা পর্যন্ত কুক্ষিগত করে নিয়ে তাঁকে পথের কাঙাল করে একদিন তাঁকে এই জমিদার বাড়ী থেকেই দূর দূর করে তাড়িয়ে দিলাম। সেই থেকে বংশ পরাম্পরায় জমিদার বাড়ির ফাই ফরমাশ খাটা এই খাস চাকর...হয়ে গেল খোদ জমিদার।মেঘ না চাইতে জলের মতোই অকস্মাৎ অর্থ...বিত্ত...প্রতিপত্তির মালিক হয়ে আমার দিন কাটছিল বেশ।কিন্তু হঠাৎ আমার জীবনে দেখা দিতে শুরু করল এক ভয়াল দুর্যোগের ঘনঘটা...। মানুষের সাথে কথা বলার সময়ে...আহারের মাঝে...নিদ্রার সময়ে...অষ্টপ্রহর আমার সাথে ছায়ার মতো লেপ্টে থাকত রুক্মিণীর প্রেতাত্মা।সে উঠতে বসতে...শুতে খেতে...চলতে ফিরতে...তার ক্রোধান্বিত দুই রক্তবর্ণ চোখ দিয়ে প্রতিহিংসার আগুন ঝরিয়ে আমাকে প্রতি মূহুর্তে চোখে আঙুল দিয়ে যেন মনে করিয়ে দিত...আমার কৃতকর্ম...আমার পাপের কথা।তার ওই বজ্রকঠিন রক্তচক্ষু নিঃসৃত ক্রোধের অগ্নিশিখায় আমি প্রতিনিয়ত যেন ভস্ম হতে থাকলাম।ধীরে  ধীরে আমার সমস্ত কাজেকর্মে ভুল হতে শুরু করল।শরীর জুড়ে আরম্ভ হতে থাকল রোগব্যাধির তান্ডব।আমি ক্রমশই মৃত্যুমুখে যাত্রা করতে থাকছিলাম।অপরদিকে এও বুঝতে পারছিলাম...যে আমার বিশ্বাসভাজনদের মধ্যে কেউ কেউ আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা শুরু করেছে আমার এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে।আমি ক্রমশই মৃত্যুমুখে ঢলে পড়ছি আর চোখ মেলামাত্র দেখছি...আমার শয্যায়...আমার মাথার কাছেই বসে রয়েছে সেই প্রেতাত্মা।সে আমার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে প্রতিহিংসাপূর্ণ কন্ঠে ঘুমপাড়ানি গান গেয়ে চলেছে মিহিসুরে।জ্বলন্ত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে ধরিত্রী কাঁপিয়ে তোলা কন্ঠে আমাকে অট্টহাসির আস্ফালনে বলে চলেছে..."মরবি...মরবি...বংশশুদ্ধ ছারখার হয়ে মরবি।" আমি আমার আসন্ন সর্বনাশ চোখের সামনে হতে দেখছিলাম প্রতি মূহুর্তে।আমি বুঝেছিলাম...এই প্রেতাত্মাকে কোনোভাবে রোধ করা বা গুম করে আটকে রাখা দরকার।না হলে আর কিচ্ছু অবশিষ্ট থাকবে না।সবকিছু জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাবে।আমি লোক পাঠিয়ে একজন তান্ত্রিক কে ডেকে পাঠালাম...আর সবিস্তারে তাঁকে সবকিছু জানালাম।তিনি সব শুনেটুনে নিদান দিলেন...রুক্মিণী জীবদ্দশায় ঈশ্বরের ব্রততে নিজেকে উৎসর্গ করেছিল ও অনেক পুণ্য অর্জন করেছিল।তাঁর মতো নিষ্কলঙ্ক পবিত্রতা খুব কম মানুষের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া সম্ভব।এ ছাড়া জীবদ্দশায় রুক্মিণী তন্ত্রসাধনাতেও দীক্ষালাভ করে সেই সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান অর্জন করেছিল।রুক্মিণীর ভিতরে তাই রয়েছে দৈবশক্তি।এই দৈবশক্তিসম্পন্ন পবিত্র আত্মা যখন পাপের সংহার করার জন্য এইভাবে উদগ্রীব হয়ে উঠেছে...তখন তাকে ঠেকানো রীতিমতো দুঃসাধ্য।একমাত্র অপবিত্র পৈশাচিক শক্তি দ্বারাই ওর এই অপ্রতিরোধ্য গতি রোধ করা সম্ভব হলেও হতে পারে।পৈশাচিক শক্তির অস্তিত্ব টের পেলেই এই দৈবশক্তিসম্পন্ন পবিত্র বিদেহী আত্মা আর এই রাজবাড়ির ধারেপাশে ঘেঁষবে না। তাঁর দেওয়া বিধান অনুসারে...তখন থেকে শুরু করে...আগামী তিন পুরুষ একটি করে সন্তানবতী অন্তঃসত্ত্বা নারীর শিরশ্ছেদ করে তার ওই মুন্ডহীন ধড়ের সাথে রতিক্রিয়ার মাধ্যমে সম্ভোগ করে তাকে অপবিত্র করতে হবে এবং এরপর ওই মৃত শরীরের ওপরে শবসাধনা করে মন্ত্রঃপূত করতে হবে ওই মুন্ডহীন নারীশরীরটি।এরপর ওই মন্ত্রঃপূত ধড়টি জমিদার বাড়ির একটি ঘরে থাম তৈরি করে তার ভিতরে সংরক্ষণ করতে হবে।তিন পুরুষ কেটে যাওয়ার পর ওই বিদেহী আত্মা চিরকালের মতো প্রতিশোধ স্পৃহা ত্যাগ করে পরলোকে গমন করবে।আর কোনো ভয় থাকবে না।আমার বংশের ওপর আর কোনো বিপদের আঁচ আসবে না। আমি তাঁর এই কথা শুনে আর কালবিলম্ব করলাম না।তান্ত্রিকের সঙ্গে যে ঘরে বসে এই কথপোকথন চলছিল...সেই ঘরে তখনই আমাদের জলখাবার নিয়ে যে অষ্টাদশী তন্বী সুন্দরী পরিচারিকার আগমন ঘটেছিল...তাকেই তালি বাজিয়ে লোক ডেকে কয়েদ করালাম,এবং দিন কয়েকের মধ্যেই এই জমিদার বাড়ির মন্দিরে সেই মেয়েটির শিরশ্ছেদ করা হল।তারপর ওর সেই মুন্ড ও ধড়ের মধ্যে তান্ত্রিক নিজের কাঁধে সযত্নে তুলে নিলেন রক্তের লালে স্নান করে ওঠা যন্ত্রনাক্লিষ্ট সদ্য ছটফট করে সদ্য ছটফটানি বন্ধ হয়ে পড়া নিথর দেহখানি।তারপর সবেগে ঢুকে এলেন এই ঘরটাতে...যে ঘরের জানলা এখন তুমি খুলেছ।তারপর সেই ঘরে...বন্ধ দরজার আড়ালে তান্ত্রিক আমাকে নির্দেশ দিলেন.. পরিচারিকার ওই মুন্ডহীন ধড়ের সঙ্গে রতিক্রিয়া করে সম্ভোগের মাধ্যমে তাকে অপবিত্র করতে। নারী শরীরের প্রতি আমার লালসা বরাবরেরই।এখানে কোনো জাতধর্ম বিচারের বালাই আমার অন্তত কোনোকালেই ছিল না।কিন্তু তা বলে একটা শিরশ্ছেদ করা মুন্ডহীন নারী শরীরের সাথে সম্ভোগ!আমার হাত পা কেমন অসাড় হয়ে আসতে থাকল।গুলিয়ে উঠতে থাকল সারা শরীর।পৈশাচিক শক্তিকে ডেকে আনার অভিপ্রায় নিয়ে যে কার্যে লিপ্ত হয়েছি আমি...তাতে ক্রমশ আমি নিজেই যে রূপান্তরিত হতে চলেছি একটা জলজ্যান্ত রক্তমাংসের পিশাচ এ! আমার ভিতরে কুন্ঠা আর আড়ষ্টতা দেখে এবার জোর হুংকার দিয়ে আমায় তিরস্কার করে উঠলেন  তান্ত্রিক।আমি ভয়ে আরো চার প পিছিয়ে গেলাম।তান্ত্রিক গর্জন করে বলে উঠলেন...পিশাচ সাধনায় যদি বাধা পড়ে...তাহলে তার রোষানল হতে কারোর পরিত্রাণ নেই।সবকিছু একেবারে ছারখার হয়ে যাবে।শ্মশান হয়ে যাবে চারপাশের সমস্তকিছু!" কি আর করা...একান্ত নিরুপায় হয়ে  আমি প্রস্তুত করে নিলাম নিজের মনকে।দরজা বন্ধ।ঘরের ভিতরে শুধু তান্ত্রিক আর আমি।মাঝখানে এই মুন্ডহীন নিথর দেহটি রাখা রয়েছে।তান্ত্রিক বসে গেলেন যজ্ঞকুণ্ডের পাশে।যজ্ঞের আয়োজন করতে শুরু করলেন।সাথে শুরু করলেন একাগ্রচিত্তে মন্ত্রোচ্চারণ।আমি এখন এই পরিস্থিতির হাতের কাঠপুত্তলিকা ভিন্ন আর কিছুই যে নই...সেটা উপলব্ধি করলাম।কি আর করা...সামনে যজ্ঞকুণ্ডের সামনে মন্ত্রোচ্চারণরত তান্ত্রিক মগ্ন তাঁর সাধনাতে...আর আমি এক এক করে নিজের বস্ত্র উন্মোচন করে নিজেকে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র করে নিয়ে...তারপর নিজের ভিতরে কার্যতই একটা পিশাচকে জাগিয়ে তুললাম।এক শরীর কামক্ষুধা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম ওই মুন্ডহীন নগ্ন শরীরটার ওপরে...! যজ্ঞকুণ্ডে কাঠপোড়ার চিড়বিড় শব্দের সাথে সাথে প্রতিধ্বনিত হতে থাকল তান্ত্রিকের মুখ হতে উচ্চারিত দুর্বোধ্য মন্ত্র...আর মন্ত্রোচ্চারণের মাঝে মাঝে আমার শরীরের ওপর তান্ত্রিক ছেটাতে থাকলেন শিরশ্ছেদ হওয়া কাটা মুন্ড হতে নিঃসৃত হওয়া রক্ত।আমি জাগতিক সবকিছুকে উপেক্ষা করে নিজেকে শুধুই অবগাহন করতে থাকলাম কাম পৈশাচিকতার অতল গর্ভে।সময় অতিবাহিত হতে থাকল তার নিজের গতিতে।এইভাবে কখন রাতের অন্ধকার কেটে ক্রমে আকাশ ফর্সা হতে শুরু করেছে সেটা টের পাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে আর ছিলাম না আমি।আমি সংজ্ঞাহীন হয়ে লুটিয়ে পড়ে রয়েছি মুন্ডহীন এক নারীদেহের পাশে।কিন্তু তান্ত্রিকের চোখে তখনো কোনো ক্লান্তি নেই।নেই কোনো ক্ষুধা বা পিপাসার্ত জৈবিক অনুভূতি।সমস্তকিছুর উর্দ্ধে চলে গিয়েছেন তিনি।ক্রমে যখন আস্তে আস্তে করে আমার অক্ষিপল্লব উন্মোচিত হতে শুরু করল...তখন আবছা দৃষ্টিতে আমি দেখলাম...তান্ত্রিক শবসাধনা করছেন।তবে সেই মূহুর্ত বেশিক্ষণ স্হায়ী হল না।ফের সব দৃশ্যগুলি ভীষণভাবে আবছা হতে শুরু করল।আস্তে আস্তে আমি আবার চেতনা হারালাম। চেতনা যখন ফিরল...আমি তখন বিছানায় শয্যাশায়ী।সারা শরীরে যেন বিষের মতো ব্যথা।আমার বিছানার পাশেই একটা আরাম কেদারায় বসে রয়েছেন তান্ত্রিক।যেন আমার চেতনা ফেরার অপেক্ষাতেই বসে ছিলেন তিনি।আমি চোখ মেলে তাঁর দিকে চাইতেই তিনি বজ্রগম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলেন..."যত তাড়াতাড়ি পারো...তোমার স্নান...আহারাদির সেরে নাও।তোমার অতি প্রয়োজনীয় আর একটা কাজ বাকি রয়েছে।সেই বিষয়ে আলোচনা করতে হবে।" আমার মন বলে উঠল..."এরপরে আর কি বাকি থাকতে পারে!জমিদারের চাকর ছিলাম।তাঁর হাত পা টিপে...সেবাযত্ন করে...অতিবাহিত করতাম একটা তুচ্ছাতিতুচ্ছ জীবন।সেই আমি এতসব ভয়ঙ্কর পৈশাচিক কাজ নিজে হাতে করব...এ কখনো দুঃস্বপ্নেও ভেবেছিলাম!কিন্তু কি আর করা...একবার যখন পাপের পাঁক মেখে নিয়েছি...তখন তার থেকে নিষ্কৃতি পাওয়াও তো আর এত সহজ নয়...!" মুখে তান্ত্রিকের কথায় সম্মতি জানিয়ে...বিছানা থেকে উঠলাম। দুপুরের আহারের পর আবার এই ঘরের দরজা বন্ধ করে আমি আর তান্ত্রিক বসলাম মুখোমুখি।আর আমাদের দুজনের মাঝে শায়িত আমার দ্বারাই ভুক্ত উচ্ছিষ্ট...পরিচারিকার মুন্ডহীন ধড়।বলা বাহুল্য...আমার ততক্ষণে লজ্জা...ঘেন্না...ভয়...সবকিছুই পুরোপুরি লোপ পেয়ে গিয়েছে।আমি সাবলীলভ।বে বসে সোজাসুজি তাকালাম তান্ত্রিকের চোখের দিকে।তান্ত্রিক গম্ভীর কন্ঠে বললেন..."মন্ত্রঃপূত এই মুন্ডহীন ধড়টি রাজবাড়ির একটি ঘরে একখানি থাম তৈরি করে তার ভিতরে সংরক্ষণ করে রাখতে হবে।এইরূপে তিন পুরুষ কেটে যাওয়ার পরে ওই বিদেহী আত্মা চিরকালের মতো পরলোক গমন করবে।কারণ...এই উচ্ছিষ্ট নারী শরীরের ভেট পেয়েই জেগে উঠবে একটি একটি কদর্য পৈশাচিক শক্তি...যার সামনাসামনি হওয়ার কোনো অভিপ্রায় তাঁর আর থাকবে না।ঘৃণায় ওই বিদেহী আত্মা এই স্হান পরিত্যাগ করবে।আর কোনো ভয় থাকবে না।তুমি ও তোমার বংশ সম্পূর্ণভাবে বিপদমুক্ত হবে।" আমি বুঝলাম...তান্ত্রিকের করনীয় কার্যাদি এইবার সম্পন্ন হয়ে গিয়েছে।তিনি এখন আমাকে জানিয়ে দিলেন...এবার আমার করনীয় কি।আমি তান্ত্রিককে তাঁর যথাযোগ্য সম্মানী দিয়ে তাঁকে বিদায় দিলাম। এরপর আমি আর কালবিলম্ব করলাম না।ওই মুন্ডহীন শরীরটাকে এই ঘরের দেওয়ালে একটি বাঁশের সাহায্যে দাঁড় করিয়ে তার চারপাশে বালি সুড়কি লেপে মজুরদের দিয়ে তৈরি করানো হল সুদৃশ্য থাম। এরপর কেটে গেল বেশ কিছু বছর।আর কোনো গোলযোগ হয়নি এরপর।সব আতঙ্ক ও ঝড় শান্ত হয়ে গিয়েছিল একেবারে।আমি আমার পুত্রকে নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলাম...সেও যেন কোনো এক তান্ত্রিককে দিয়ে অনুরূপভাবে এই ঘরটিতে আরেকটি থাম তৈরি করিয়ে নেয় এবং তার পুত্রকেও যেন এই কাজ করার জন্য নির্দেশ দেয়।আমার চল্লিশোর্ধ্ব বয়সেই হঠাৎ ভ্রমণে বেরিয়ে একটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে আমি মারা যাই।মরার পর আমার পাপের কারণে আমার ঠাঁই হয় এই নরকে।আমার পুত্রও এরপর অনুরূপভাবে সেই একই কাজ এক তান্ত্রিককে দিয়ে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করে।আমার প্রপৌত্রও যখন এই কাজ করানোর জন্য যখন এক তান্ত্রিককে এই জমিদার বাড়ির অন্দরমহলে আপ্যায়ন করে নিয়ে আসে...তখন সেই তান্ত্রিক সম্পূর্ণ বৃত্তান্ত শুনে ভয়ংকরভাবে ফুঁসে ওঠেন এবং জমিদার বাড়ির ভিতরে পুরুষানুক্রমে চলে আসা এই নৃশংস হত্যালীলা ও পাপের বিরুদ্ধে ছুঁড়ে দেন একদলা ঘৃণা।তিনি কিছুতেই এ কাজ করতে রাজি হলেন না।তীব্র গর্জনের সাথে বলে উঠলেন...কোনো নিম্ন তন্ত্রের সাধনা তিনি করেন না। এমন পাপকাজ তো কখনোই নয়। শত অর্থ...সম্পদ...আর প্রাচুর্যের লোভ দেখিয়েও তাঁকে নিরস্ত করা সম্ভব হল না।তিনি তল্পিতল্পা গুটিয়ে জমিদার বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলেন।ঠিক তখনই আমার প্রপৌত্র অতর্কিতে তাঁর ঘরে প্রবেশ করে তাঁকে আটকে দেয়।সজোরে তালি বাজিয়ে ডেকে নেয় কর্মচারীদের। তারা আসার পর আদেশ শোনামাত্রই...আর কালবিলম্ব না করে শক্ত ও মোটা দড়ি দিয়ে তান্ত্রিকের হাত ও পা কষে শক্ত করে বেঁধে ফেলে।আমার প্রপৌত্র এই বংশের কালো সত্য উন্মোচিত হয়ে পড়া আটকাতে তৎক্ষণাৎ সেই তান্ত্রিকের বুকে ছুরি বসিয়ে দেয়।হাত পা দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা অবস্হাতে ছুরিবিদ্ধ হয়েও তান্ত্রিক প্রাণত্যাগ করেননি।তাঁর জীবনের অন্তিম মূহুর্ত যেন পাপ ও অনাচারের বিরুদ্ধে প্রবল দ্রোহের ন্যায়ে স্ফূলিঙ্গ হয়ে হৃৎপিন্ড ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা রক্তস্রোতের সাথে চলকে চলকে বেরিয়ে আসছিল।তক্ষুনি আমার প্রপৌত্র...কর্মচারীদের আদেশ দিল।জানলার বাইরে তান্ত্রিককে ছুঁড়ে ফেলার সময়,দুজন কর্মচারী তান্ত্রিকের মাথার দিকটা ধরেছিল...আর দুইজন পায়ের দিক।এরপর যখন তারা রক্তাক্ত তান্ত্রিকের জীবন্ত দেহখানি বস্তার ন্যায়ে জানলার বাইরে ছুঁড়ে ফেলতে উদ্যত হল...আর আমার প্রপৌত্র কক্ষত্যাগ হেতু দরজার দিকে আগুয়ান হল...ঠিক তক্ষুনি হঠাৎ যেন প্রকৃতি প্রবল রোষানলে একেবারে তেড়েফুঁড়ে উঠল।ত্রিভুবন কাঁপিয়ে একেবারে আলোড়ন তুলে আরম্ভ হল যেন এক অতিপ্রাকৃতিক ঝড়ঝঞ্ঝা।আর প্রকৃতির সেই প্রবল রোষানলকেও ছাপিয়ে পিষে দিয়ে কক্ষের বাতাস গর্জে উঠেছিল তান্ত্রিকের মুখনিঃসৃত অন্তিম হুংকারে...এক ভয়াল অভিশাপে।জানলা দিয়ে তাঁর জীবন্ত দেহখানি নিক্ষেপ করার অন্তিম মূহুর্তে তিনি তীব্র ঘৃণা ও ক্রোধান্বিত ধিক্কারে অভিশাপ বর্ষণ করেন।যে জানলা দিয়ে তুই নিজের বংশের পাপাচার লুকোতে আমার বুকে তরবারি বিঁধিয়ে জঞ্জালের ন্যায়ে ছুঁড়ে ফেলার জন্য উদ্যত হচ্ছিস...সেই জানলা দিয়েই তোদের জন্য নরকের দরজা উন্মোচিত হবে।তোরা বংশ পরাম্পরায় এইখানেই আসবি নিজেদের পাপের বোঝা নিয়ে।এই বংশের রক্তধারী কোনো জীবন্ত মানুষ সেখানে পৌছানো ব্যতীত...অনন্তকাল ছটফট করবি মুক্তির জন্য।অভিশাপ দিয়ে গেলাম...অভিশাপ...! কর্মচারীরা ওই তরবারি বেঁধা রক্তাক্ত শরীর হতে বেরিয়ে আসা ওই তেজোস্কৃয় হুংকারে মূহুর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।ধরিত্রী ফালাফালা করা হুংকারে গর্জে উঠল আকাশ।কয়েক মূহুর্ত পর কর্মচারীরা সম্বিৎ ফিরে পেয়ে তাদের কাজে মনোনিবেশ করল।দুইজন তান্ত্রিকের পা আর দুইজন মাথা ধরে...উন্মুক্ত দ্বার জানলার বাইরে তান্ত্রিকের হাত পা বাঁধা আধমরা শরীরখানি সজোরে নিক্ষেপ করে দিয়ে আদেশমতো জানলার কপাট বন্ধ করে দিয়ে তালা দিয়ে চলে গেল।তারপর অন্য একজন তান্ত্রিককে অনেক টাকার লোভ দেখিয়ে এক গণিকাকে হাতের সামনে পাওয়ায়...তাকেই ধরেবেঁধে এনে করানো হল শিরশ্ছেদ।তারপর এই ঘরে তার মুন্ডহীন ধড়ের ওপরে চলল বারো ঘন্টাব্যাপী শবসাধনা।অতঃপর সেই ধড়টিকে একটি বাঁশের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে নির্মিত হল এই ঘরের তৃতীয় থাম।আর প্রতিবারের মতোই এই ঘরের মাটি খুঁড়ে পুঁতে দেওয়া হল ধড় হতে শিরশ্ছেদ করে ফেলে দেওয়া মুন্ডখানি।তৃতীয় মুন্ডটি পোঁতার পর ওই তিনটি নরমুন্ড প্রোথিত জায়গাটি ঘিরে আঁকা হল একটি সুন্দর কারুকার্যখচিত নকসা।ওই নক্সার রেখা বরাবর ছড়িয়ে দেওয়া হল চকমকি পাথরের গুঁড়ো।ওই ঘনঘোর কালরাত্রির অমোঘ পৈশাচিকতার সাথে পাপের কালোয় কর্দমাক্ত...আঁধারে নিমজ্জিত এই কক্ষে...ধিকিধিকি জ্বলে উঠেছিল সে অপূর্ব নক্সা।কুন্ডলীকৃত ধোঁয়ার সাথে সাথে চিরকালের মতো বিদায় নিয়েছিল যাবতীয় অমঙ্গল।বলি হওয়া গণিকার একটি বালিকা কন্যা ছিল।সে এই পরিবারের দাসীমহলে ঠাঁই পেল।পরবর্তীকালে সে আমার প্রপৌত্রের পুত্র...অর্থাৎ তোমার দাদুর রক্ষিতা হিসাবে গন্য হয়।তোমার দাদু উচু বংশমর্যাদাসম্পন্ন এক অভিজাত কন্যাকে বিয়ে করে...কিন্তু সে ছিল সন্তানধারণে অক্ষম।তোমার দাদুর জন্য জ্যোতিষী ভবিষ্যদ্বানী করেছিলেন...যে একের অধিকবার যদি সে বিয়ে করে...তাহলে সেটা হবে ওর মৃত্যুর কারণ।তাই তোমার দাদু কিছুদিন বাদে স্ত্রীকে গোপনে হত্যা করে এই পরিবারের বংশমর্যাদা রক্ষার্থে সেই রক্ষিতার গর্ভস্থ সন্তানদেরই নিজ মহিষীর গর্ভজাত সন্তান হিসাবে পরিচয় দিয়ে এই পরিবারের বংশগরিমা অক্ষুণ্ণ রাখে। বুঝলে বাছা...পাপ এই বংশের মজ্জায় মজ্জায়।আর তারই জ্বলন্ত অগ্নিদাহে...অভিশাপে আমরা পুড়ছি ।তান্ত্রিকের অন্তিম যাত্রাকালে তাঁর মুখনিঃসৃত অভিশাপে আমরা তাই বংশ পরাম্পরায় দগ্ধ হচ্ছি।মরণের পরে আমার ও আমার বংশজাত প্রত্যেকের আত্মা এসে বন্দী হয়েছে এই নরকে।নরকের এই লেলিহান আগুনের দহনে পুড়ে পুড়ে আমাদের এ যন্ত্রনাক্লিষ্ট আত্মাখানি এখন শুধুই মুক্তি চায়...মুক্তি...! কয়েক মূহুর্ত সব নিশ্চুপ।নীরবতা ভেঙ্গে রৌনক দ্বিধামিশ্রিত কন্ঠে বলে উঠল... ---"সব বুঝলাম।কিন্তু আপনাদের মুক্তি যদি আমিই দিতে পারি...সে আমি দেব কিভাবে?" ---"বাছা...তুমি আর দেরি না করে এই থাম তিনটি ভেঙ্গে ফেলো।আর মেঝেতে যে তিনটি জায়গায় খুলি পোঁতা আছে...সেই জায়গায় একটি করে খুলির চিহ্ন আঁকা রয়েছে আর তার ওপরে অপূর্ব নক্সা আঁকা রয়েছে।তুমি সেখানকার মেঝে খুঁড়ে...খুলি তিনটি বার করো।তারপর সেগুলো এই জানলার সামনে নিয়ে এসে জড়ো করে...তার চারধারে তুমি নতুন করে আঁকো ওই নক্সা।তারপর ওই নক্সা বরাবর চকমকি পাথরের গুঁড়ো ছড়িয়ে...ওতে আগুন ধরিয়ে দাও।তারপর ওই জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের সামনে বসে বারে বারে তোমার পূর্বপুরুষদের যাবতীয় পাপাচারের কথা ঈশ্বরের কাছে স্বীকার করে তাঁর কাছে...এবং এই তিনটি বলি হওয়া অভাগা নারীর আত্মার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো।একমাত্র তাহলেই আমরা সবাই এই অনন্ত দহনের সর্বগ্রাসী জ্বালা থেকে চিরতরে মুক্তি পেয়ে যাব। রৌনক বুঝতে পারল,তান্ত্রিকের অভিশাপ মতো সত্যিই এই ঘরের জানলা দিয়ে ধরিত্রীতে উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে নরকের দ্বার।যেটা বন্ধ করার একমাত্র উপায় হল...এঁদের মুক্তি। রৌনক আর দেরি না করে পিছন ঘুরে সিঁড়ির পথ ধরল।সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল ওপরে...এবং পৌঁছে গেল ফের সেই জানলার উন্মুক্ত দরজার সামনে।ও ধীর পায়ে নরক হতে পুনর্গমন করল ধরিত্রীর বুকে।নরকের উন্মুক্ত দ্বার হতে এখনো ভেসে আসছে মর্মবিদারক আর্তচিৎকার...আর ক্রন্দনের প্রবল আর্তধ্বনি।চতুর্দিকে রক্তের মতো লাল...পিঠে মড়ার খুলি আঁকা লক্ষ লক্ষ উড়ন্ত পতঙ্গ...চারদিকে উড়ে বেড়াচ্ছে।রৌনক সিঁড়ি বেয়ে উঠে এল ধরিত্রীর বুকে।নিশ্চুপে ঘরের ভিতরে ঢুকে...হাতে নিল কোদাল।তারপর সমস্ত বাহুবল একত্রিত করে নিয়ে দুু্র্বার গতিতে একবার...দুইবার...বারবার শুধু থাম লক্ষ করে সজোরে কোদাল চালাতে লাগল।একটা সময় তিনটি থামই হঠাৎ সড়সড় করে বালির স্তূপের মতো খসে পড়তে লাগল।ঘরের বাতাসের প্রতিটি কণায় প্রতিধ্বনিত হতে থাকল বলি হওয়া তিনজন মেয়ের যন্ত্রনাক্লিষ্ট আর্ত চিৎকার।রৌনক যেন চেতনা আর তন্দ্রার মাঝামাঝি কোনো এক মোহাচ্ছন্ন ঘোরে আবিষ্ট হয়ে পড়ছি ক্রমশ।ও প্রায় যন্ত্রচালিত'র মতোই মেঝেতে খুলিচিহ্ন আঁকা স্হান তিনটি খুঁজে নিল।দীর্ঘ বছর পার হয়ে যাবার পর পুনরায় ওই চিহ্নত্রয় ঘিরে রৌনকের দ্বারা অঙ্কিত নকসা এবং তা আগুনের দ্বারা প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠল।চারপাশে বাতাসের প্রতিটি কণা যেন জ্বালাময়ী হয়ে উঠেছে বলিপ্রদত্ত তিনজন নারীর আর্তচিৎকারে।রৌনক যন্ত্রের মতো হাঁটু গেড়ে বসল ওই জ্বলন্ত নক্সার সমুখে।সদউক্তির দ্বারা নিজের পূর্বপুরুষদের কৃতকর্ম ও পাপাচারের কথা তাদের হয়ে স্বীকার করল ও তাদের হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করল ঈশ্বরের কাছে।হঠাৎ রৌনক দেখল...কুন্ডলীকৃত ধোঁয়ায় আবছা হয়ে জীবন্ত হয়ে উঠেছে এক শ্বেতবস্ত্র পরিহীতা সালঙ্কারা নারীর পূর্ণ অবয়ব।তার দেহের নিম্নাংশ রক্তে স্নাত।তাঁর অশ্রুসিক্ত দুইচোখে অব্যক্ত যন্ত্রনার ছাপ। রৌনকের বুঝতে কোনো অসুবিধা হল না...এই জমিদার কন্যা রুক্মিণী।রৌনক ওর হাতদুটিতে জড়ো করে তাঁর উদ্দেশ্যে প্রণাম জানাল ও ওর পূর্বপুরুষের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করল।মূক পূর্ণিমার অনাবিল মায়া মাখানো মুখখানিতে ক্রমশ প্রশান্তির একটি ছাপ দেখা দিল।ক্রমশ কুন্ডলীকৃত ধোঁয়ার সাথেই সেই অবয়বখানি বাতাসের সাথে মিলিয়ে গেল।ধিকিধিকি আগুন ক্রমশ নিভে আসতে থাকল।বাতাসে প্রলয় জাগিয়ে তোলা মর্মবিদারক আর্তধ্বনি ক্রমশ ম্রিয়মান হয়ে আসতে থাকল।সারা ঘর জুড়ে কিলবিল করে ওঠা সারি সারি...রক্তের মতো লাল...পিঠে মড়ার খুলি আঁকা...দীর্ঘ শুঁড়বিশিষ্ট লক্ষ লক্ষ উড়ন্ত পতঙ্গ...যেন এক অলঙ্ঘনীয় আহ্বানে সাড়া দিয়ে...প্রায় ধাক্কাধাক্কি করে...এ ওর গায়ের ওপর উঠে গিয়ে...নীচে পড়ে গিয়ে...কোনোরকমে রেসের খাতায় নাম লেখানো অশ্বের ন্যায়ে তুমুল ক্ষীপ্রতার সাথে শুধু ওই জানলার দিকে ধাবমান হচ্ছে।মোটামুটি তিন কি চার মিনিটের মধ্যে ঘরখানিতে আর কোনো উড়ন্ত পতঙ্গের অস্তিত্বই আর রইল না।ঘরের ভিতরে পড়ে থাকা বালির স্তূপ উধাও।এমনকি মেঝেতে সদ্য আঁকা ওই কারুকার্য খচিত এবং পোড়া ছাই...এমনকি তিনটি মড়ার খুলিও একেবারে উধাও।ঘরের বাতাস একদম নিশ্চুপ...শান্ত।রৌনক এবার জানলার দিকে গেল।অবাক কান্ড...জানলার ওপাশে...এখন না আছে কোনো অপার্থিব অন্ধকার...আর না আসছে কোনোরূপ ক্রন্দন বা আর্তধ্বনি।বরং জানলার বাইরে এখন ঝলমল করে জেগে উঠেছে সকালের সূর্য।দেখা যাচ্ছে প্রাসাদতুল্য এই বাড়িটির পিছনে অবস্থিত ফলের বাগানখানি।সকাল সকাল বাগানের মালী গাছের পরিচর্যার কাজে ব্যস্ত।হঠাৎ এক প্রবল ক্লান্তি রৌনককে একেবারে ঘিরে ফেলল।ও আর জেগে থাকতে পারল না।খোলা জানলার নীচেই ও গভীর নিদ্রাচ্ছন্ন হয়ে ঘুমিয়ে একেবারে কাদা হয়ে গেল। বেশ খানিকক্ষণ বাদেই ঘরের দরজায় জোরে জোরে ঘা পড়ার শব্দে রৌনক হঠাৎ ধড়ফড় করে জেগে উঠে বসল।ভালো করে চোখদুটো ডলে নিয়ে ও দরজা খোলার জন্য এগিয়ে গেল।রাতের ঘোর ও বিস্ময় তার এখনো পুরোপুরি না কাটলেও এটা ও ভালোভাবেই বুঝতে পারছে...এই ঘরের থাম উধাও...আর খোলা জানলা...এই দুটি কারণে ওর কপালে ঘোরতর দুঃখ আছে।দাদু হয়তো ওকে খুব কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তি দেবেন।বাড়ি থেকে বিতাড়িত করে দেওয়াটাও অস্বাভাবিক হবে না।ভাবী পরিস্থিতির মোকাবিলা ও কি করে করবে...তার কোনো দিশা পেল না রৌনক।ওর বুকের ভিতর এক অজানা অশনিসংকেতের হৃৎস্পন্দন সজোরে বেজে চলেছে।ও ধীরপায়ে আগুয়ান হল দরজার দিকে।দরজা খুলে দেখল...দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে রয়েছে বাগানের মালী রামুকাকা। ---"ছোট দাদাবাবু...আপনি?কাল এ ঘর পরিষ্কার করার জন্য যখন খোলা হয়েছিল...আমি বড়বাবুকে বলে কিছু কোদাল আর বর্শা এখানে রেখে দিয়েছিলুম।এখন কোদালটা দরকার পড়ল তাই এলুম।তা ছোটবাবু...আপনি এই ঘরে একা কি করতেছেন?" রৌনক ঘর থেকে কোদালটা নিয়ে রামুকাকার হাতে দিয়েই বইপত্র গুছিয়ে নিয়ে হনহন করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।ঘরের বাইরে বেরিয়ে সকলের মুখে ও যা শুনল...এবং স্বচক্ষে যা দেখল...তাতে ওর চক্ষুকর্ণের বিবাদ থেকে গিয়ে অবশেষে অদ্ভুত একটি বাস্তবের সম্মুখীন হল রৌনক।গতকাল রাত্রি হতেই দাদু একেবারে বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গিয়েছেন।শিশুর মতো হাত পা ছুঁড়ে কেঁদে চলেছেন।মাথার চুল দুহাতে ছিঁড়ে উন্মত্তচিত্তে নিজের সারা জীবনের পাপাচার আর কৃতকর্ম অতিথিপূর্ণ এই অনুষ্ঠান বাড়িতে সব লোকজনকে ডেকে ডেকে বলে চলেছেন তিনি চিৎকার করে সব লোকজনকে ডেকে ডেকে বলছেন...কি কারণে ও কিভাবে তিনি তাঁর স্ত্রী কে স্বহস্তে হত্যা করেছিলেন এবং তাঁর সন্তানদের প্রকৃত গর্ভধারিণী মা মানদা দিদার হাতদুটিতে টেনে ধরে সব মানুষজনকে ডেকে ডেকে গণিকা কন্যা মানদা দিদার...এই পরিবারে আসল পরিচয়টা উন্মুক্ত কন্ঠে বাহির করছেন আর তার দুই পায়ে লুটিয়ে পড়ে ক্ষমা চাইছেন  শেষমেষ দাদুকে হাসপাতালেই ভর্তি হতে হল।সারা জীবন ধরে লাঞ্ছনা গঞ্জনা আর ক্রীতদাসীর মতো নির্যাতন সহ্য করার পর অবশেষে যেদিন মানদা দিদার জীবনের এক এবং একমাত্র ইচ্ছা...স্বপ্ন আজ সত্যি হল।সত্যিই যখন নিজ মুখে মানদা দিদাকে সকলের সামনে বিনা কাকুতি মিনতিতেই সসম্মানে নিজের স্ত্রী হিসাবে পরিচয় দিলেন এবং মানদা দিদার স্হান আসলেই এই পরিবারের ঠিক কোনোখানে তা দেখিয়ে দিলেন...তখন এই অযাচিত সম্মান বা প্রাপ্তির ভার আর সামলাতে পারল না মানদা দিদা।নিজের পরিবারের সকলের সামনে তার আসল পরিচয় নিয়ে দাঁড়াবার আগেই হঠাৎ হৃদযন্ত্র স্তব্ধ হয়ে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে ইহলোক ত্যাগ করল মানদা দিদা।গোটা পরিবার জুড়ে এমন এক অঘটনের আবহে...অভিশপ্ত জানলার ওই ঘরটিতে যে আগের দিন পরিবারের কোনো সদস্য রাত কাটিয়েছিল...এই কথাটা আর বাহির হয়নি।অতএব এরপরে অভিশপ্ত জানলাটি খোলা অবস্হায় দেখার পর পরিবারের সকলে ভীষণভাবে ধাক্কা খেলেও রৌনককে আর কারোর কাছে বকুনি খেতে হয়নি। এরপর কেটে গিয়েছে বেশ কিছুদিন।ইতিমধ্যে রৌনকের দাদু এবং মা এবং বাবার দ্বারা নির্বাচিত...এই পরিবারের হবু পুত্রবধূ তথা রৌনকের হবু স্ত্রীর বাবা একদিন এসে জানিয়ে গেলেন...শরীরে একজন গণিকার রক্ত বইছে...এমন কারোর সাথে তিনি নিজের মেয়ের বিয়ে দিতে চান না।পাকা কথাবার্তা হয়ে থাকা বিয়ের আয়োজনে এক লহমায় জল ঢেলে দিয়ে তিনি বেরিয়ে গেলেন।ছেলের এই অপমানটা একেবারেই হজম করতে পারলেন না রৌনকের বাবা।শুধু এটিই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।চতুর্দিকে এখন এই পরিবার ও তার বংশমর্যাদা...আভিজাত্যের চিরকালিন দম্ভকে সব মানুষজন হাসির খোরাক বানিয়ে মজা লুঠতে শুরু করেছে।কেন!মানদা দিদা একজন গণিকা কন্যা বলে?রৌনকের বাবা শিশুকাল হতে  তাকে দাসীরূপে দেখে এসেছেন।নির্যাতিতা...লাঞ্ছিতা মানুষটার ভিতরে সুলক্ষণা...লক্ষ্মীশ্রী আচার ব্যবহারে কেউ কোনোদিন এতটুকুও কমতি দেখেনি।সে বিনা স্বীকৃতিতেই যেমনভাবে স্নেহময়ী মা হয়ে উঠেছে...তেমন তার দাসীবৃত্তি দিয়েই নিজের সবটুকু যত্ন ও পরিচর্যা দিয়ে দুহাতে আগলে রেখে এসেছে এই এতবড় সংসারটাকে।সারাজীবনে নিজের প্রাপ্য সম্মানটুকু সে পায়নি।শুধু গণিকা কন্যা বলেই কি সেই মানুষটা বা তার গর্ভজাত সন্তানেরা সকলে অশুচি? বংশ মর্যাদা...বা আভিজাত্য এই শব্দগুলি...যাকে সম্বল করে রৌনকের বাবা এতকাল চলতেন...আজ সেই সবকিছুকেই বড্ড ফোঁপরা মনে হতে লাগল তাঁর।অপরদিকে তিনি দেখলেন...তাদের পারিবারিক সব সত্য জানা সত্ত্বেও স্নেহা ও তার পরিবারের...রৌনকের প্রতি মনোভাব এতটুকুও খাটো হয়নি।স্নেহা আগের মতোই একভাবে অন্তর থেকে ভালোবাসে রৌনককে।হ্যাঁ।এই মেয়েই তাঁর ছেলের জন্য উপযুক্ত।ছেলের চাকরি পাওয়ার খবরটা শোনার পর তিনি আর বেশি কিছু ভাবলেন না।একটি শুভদিন দেখে তিনি রৌনক আর স্নেহার চারহাত এক করে দিলেন সারাজীবনের মতো। সমাপ্ত            



Rate this content
Log in

Similar bengali story from Horror